Feeds:
Posts
Comments

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এখনও তৈরি হয়নি। এ কাজটি সম্পন্ন করবেন ইতিহাসবিদগন। আর সম্পন্ন হবে হয়ত আরও ৫০ বছর পর। এখন তর্ক বিতর্ক চলছে। এর ফাঁকে তথ্য উপাত্ত বেরিয়ে আসছে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের কিছু দলিল দস্তাবেজ সংগৃহীত হয়েছে। সে গুলো কিছু প্রকাশিত হয়েছে। আরও প্রকাশিত হবার অপেক্ষায় আছে। ভারতও বাংলাদেশ ডকুমেন্ট নামে বহু খন্ডের দলিল প্রকাশ করেছে।
সমস্যা হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও ভারতকে নিয়ে। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টিকে তাদের একক এবং অতি একান্ত নিজস্ব মনে করে। এতে আর কারো কোন অবদান আছে তা আওয়ামী লীগ স্বীকার করতে বা মানতে রাজী নয়। ভারতও তাই মনে করে। ভারত নিজের স্বার্থ অনুযায়ী নিজের মতো করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা করতে চায়।গুন্ডে ফিল্মের কথা সবাই জানেন। এই ফিল্মে পরিচালক বা প্রযোজক নিজেদের মতো করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেছে। হঠাত্‍ দেখা গেলো বাংলাদেশের কিছু মানুষ দেশপ্রেম দেখাবার জন্যে হেৈচৈ শুরু করে দিয়েছিল। বাংগালীদের এমন স্বভাব চিরদিনের কিনা জানিনা। হামবড়া ভাব ছাড়া আর কিছু দেখাতে পারেনা। রিকশাওয়ালাও সংবিধানের ব্যাখ্যা দেয়। আমি যদি বলি মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস লেখা বা তার জন্যে তথ্য উপাত্ত জোগাড় করে দেয়া সরকারের কাজ। রাজনীরিকরাতো নিজেদের গৌরব ছাড়া আর কিছু দেখতে পারেনা। এজন্যেই মণিষী রা বলে গেছেন, রাজনীতিকরা আজকের ভাবতে অভ্যস্ত, আর রাষ্ট্রনায়করা আগামীদিন ও আগামী প্রজন্ম নিয়ে ভাবে। আমাদের দেশে এখন কোন রাষ্ট্র নায়ক নেই।
বংগবন্ধুর হয়ত সে সুযোগ ছিল যদি তিনি পাকিস্তান বন্দীদশা থেকে ফিরে এসে গান্ধীজী, মাও জে দংয়ের মতো জীবন যাপন করতেন। তিনি তা করতে পারেননি। ফলে তিনি ইতিহাসের পাতায় বিতর্কিত হয়ে থাকবেন। সে রাষ্ট্রের দায়িত্ না নেওয়ার জন্যে অনেকেই তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি তাজউদ্দিন সাহেবকে দিয়ে সরকার চালাতে পারতেন। বরং ঘটনা উল্টো দিকে ঘুরেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান পরিচালক ও প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে বংগবন্ধু আস্থায় নিতে পারেননি। একদলীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করার ব্যাপারেও তিনি তাজউদ্দিন সাহেবের সাথে আলোচনা করেননি। তিনি আমলে নিতেন মুজিব বাহিনীর নেতা শেখ মনির কথা। কারণ, দিল্লীর আস্থাবান মুজিব বাহিনীর নেতারা প্রবাসী সরকারকে মানতোনা। তাদের প্রধান কাজ ছিল মুক্তিযুদ্ধ যেন বামপন্থীদের হাতে না চলে যায়। ভাত সরকারের পক্ষ থেকে জেনারেল উবানই মুজিব বাহিনীর দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনিও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি বই লিখে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতীয় জেনারেল, পাকিস্তানী জেনারেল ও বাংলাদেশের সামরিক নেতারা অনেক বই লিখেছেন। আমরা সব বই পড়িনি। লেখকগণ প্রত্যেকেই নিজ নিজ দৃষ্টিকোন থেকে সে সময়ের ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করেছেন। আর এই যুদ্ধের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল আমেরিকা, রাশিয়া, ভারত চীন ও পাকিস্তান। পাকিস্তানএর সামরিক শাসকগন নিজেদের আভ্যন্তরীন রাজনীতি অনুধাবন না করে শক্তি প্রয়োগ করে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান করতে চেয়েছিলেন। রাশিয়াতো ভারতের পার্টনার ছিল। আমেরিকা পাকিস্তানকে অস্ত্র দিয়ে সমর্থন করেছে। পূর্বপাকিস্তানে যে গণহত্যা চলছে তা নিক্সন ও কিসিঞ্জার স্বীকার করতে চায়নি। তাঁরা দুজনই তখন চীনের সাথে সম্পর্ক তৈরির ব্যাপারে ব্যস্ত ছিলেন। তবে তাঁরা আসা করেছিলেন রাজনৈতিক সমাধান হয়ে যাবে । কিন্তু উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। ঢাকায় আমেরিকার কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড তাঁর প্রতিদিনের টেলিগ্রামে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর অত্যাচারের কথা বলেছেন। এজন্যে ব্লাডকে তাঁর চাকুরীতে নানা ধরণের হেনস্তা হতে হয়েছে। তখন দিল্লীতে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত মিষ্টার কিটিংসও ব্লাড এর মতোই পাকিস্তানী সামরিক জান্তার অত্যাচারের খবর বর্ণনা করে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাতে কিসিঞ্জার কোন কান দেননি। যুদ্ধে পাকিস্তানের পতনের পর নিক্সনকে তিনি অভিনন্দন জানিয়েছেন। কারণ , নিক্সন নাকি পশ্চিম পাকিস্তানকে রক্ষা করেছেন। আর ইন্দিরা গান্ধীও ১৬ই ডিসেম্বরের পর এক তরফা ভাবে সিজফায়ার যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করেন। আর পাকিস্তানও তা মেনে নেয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ইচ্ছাও তাই ছিল। ভারতের আকাংখা পূরণ হলো। পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হলো। হয়ত ভূট্টোর ইচ্ছাও তাই ইচ্ছাও তাই ছিল। কিন্তু বংগবন্ধুর ইচ্ছা ছিল ৬ দফার আদলে একটি অখন্ড শক্তিশালী ফেডারেল পাকিস্তান। বাংলাদেশের সাধারন মানুষ স্বাধীনতা চেয়েছে এ কথা সত্যি। কারণ, পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক শাসক গোষ্ঠি। ১৭৫৭ সালের পর থেকেই এখানকার সাধারণ মানুষ শোষিত হয়ে আসছে। সে শোষন পাকিস্তান আমলেও অব্যাহত ছিল। ফলে ৬ দফার উত্‍পত্তি হয়েছে। ৬ দফা ছিল পূর্ণাংগ স্বায়ত্ব শাসন বা তার চেয়ে একটু বেশী। পাকিস্তানীরা তা মানেনি আঞ্চলিক রাজনীতির ষড়যন্ত্রের কারণে। লাহোর প্রস্তাব ছিল ফেডারেল পাকিস্তানের প্রস্তাব। শক্তিশালী ফেডারেল কাঠামো মানলে ভারতও খন্ডিত হতোনা। বর্তমানে এ অঞ্চলে রাজনীতি চলছে তার প্রধান নিয়ামক শক্তি হলো ভারত। বাংলাদেশ ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় ভারতের অর্থনৈতিক বা রাজনৈতি প্রভাবের মধ্যেই রয়েছে। ভারতের কথা না শুনলে এদেশে ১/১১র মতো সরকার আবার আসবে।
কিন্তু সমস্যা হলো বর্তমান আওয়ামী লীগকে নিয়ে। তাঁরা নিজেদের মতো করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বানাতে চান। মুক্তিযুদ্ধকে তাঁরা তাঁদের মতো করে ভাবেন। এখানেই ইতিহাসের সাথে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষ। আর একবার মিথা বা অসত্য বললে সেই অসত্যকে নিয়ে চিরজীবন চলতে হয়। এতে ইতিহাসে বিভ্রান্তি তৈরি হয় ক্ষতি হয় জাতি। বাংলাদেশে যে ঐতিহাসিক দ্বন্ধ চলছে তা আওয়ামী লীগের তৈরি করা। রাজনীতিকরা অবারিত ভাবে অসত্য কথা বলেন এবং সত্য ও তথ্যকে কলংকিত করেন। আমাদের সকলকেই মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ আজ বাস্তব ও স্বাধীন। ৭১ সালে পর্দার অন্তরালে কার কি ভুমিকা ছিল তা দেশবাসীর জানা উচিত। ৭১এর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সারা পৃথিবীতে বই লেখা হচ্ছে। সে ব্যাপারে আওয়ামী লীগের কিছু আসে যায়না। বংগবন্ধু নিজেও দেশে ফিরে এসে পর্দার অন্তরালে কি ঘটেছে তা বলতে পারতেন। তিনি হয়ত মনে করেছিলেন, দেশ যখন স্বাধীন হয়েই গেছে তাহলে অজানা কথা গুলো বলে আর কি লাভ।
বংগবন্ধুকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে সামরিক আদালতে বিচারের ঘোষণা দিলে প্রেসিডেন্ট নিক্সন তাতে হস্তক্ষেপ করেন। ফলে জেনারেল ইয়াহিয়া লিখিত ভাবে অংগীকার করলেন, শেক মুজিবকে ফাঁসিতে ঝুলানো হবেনা। জি ডব্লিউ চৌধুরী এক সাক্ষাতকারে বলেছেন,‘শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেয়ার কথা পাকিস্তান সরকার কোনদিন কল্পনাও করেনি। কিছু মাথা গরম জেনারেল হয়ত ফাঁসি দেয়ার কথা ভেবেছিলেন। পাকিস্তানে নিযুক্ত আমেরিকার রাস্ট্রদূত জোসেফ ফাল্যান্ড বলেছেন, যুদ্ধের উপর যখন ইতিহাস লেখা ্বে ,তকন প্রমানিত হবে ,যুক্তরাষ্ট্রের নীতিমালা এবঁ আমাদের স্থানীয় কর্ম তত্‍পরতা শেখ মুজিবকে বাঁচিয়ে রাখে। আমি ইয়াহিয়াকে বলেছি, ‘আমাদের উপলব্ধি হচ্ছে , মুজিবই হচ্ছে পাকিস্তানের ভবিষ্যত। পূর্ব ও পশ্চিমের চাবিকাঠি। পাকিস্তানের জেল থেকে পিআইএ বিমানে করে ৮ই জানুয়ারী লন্ডনে নেমে এক সাংবাদিককে বলেছিলেন, তাঁরা আমাকে ফাঁসিতে ঝুলাতে চেয়েছিল। কিন্তু ৭২এর ১৮ই জানুয়ারী বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রষ্টকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে শেখ সাহেব ফাঁসির গল্পটি প্রকাশ করেন। রাজনীতিতে এ রকমটা করতে হয়। এর দ্বারা নাকি জনগণের কাছে ইমেজ তৈরি হয়।
কিসিঞ্জার আরও লেখেছেন,১৪ই জুলাই আমাদের কলকাতার কজনস্যুলে এসে কলকাতার আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছন, শেখ সাহেবকে মুক্তি দিয়ে ৬ দফার ভিত্তিতে আলোচনা করলে সমঝোতা হতে পারে। তা না হলে স্বাধীনতা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবেনা। অপরদিকে শেখ সাহেবের আইনজীবী একেব্রোহি বলেছেন, ইয়াহিয়া খান তাঁর ২৬শে মার্চের ভাষণে শেখ মুজিবকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ অভিহিত করে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলাকে আইনগত দৃষ্টিকোন থেকে নড়বড়ে করে ফেলেছেন। ইয়াহিয়ার এ বিবৃতি আদালতকে প্রভাবান্বিত করবে। ১৯৭২ সালের ২৯শে ফেব্রুয়ারী সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওয়াশিংটন পোষ্টে লিখেছিলেৃন, পাকিস্তান সরকার সমঝোতা করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধি রাজি হননি।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের পদ দখল করে ভুট্টো ২৭শে ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডির একটি বাংলোতে শেখ সাহেবের সাথে দেখা করেন। এর আগের দিন শেখ সাহেবকে লয়ালপুর থেকে রাওয়ালপিন্ডি আনা হয়। এরপর আবার দুজন মিলিত হন ৮ই জানুয়ারী। এদিনই ভুট্টো জানালেন, ভাই আপনি মুক্ত। এখন নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন। এ সময়ে কি কথা হয়েছিল তার রেকর্ড দলিল পাকিস্তানের কাছে। ৮ই জানুয়ারী ভুট্টো শেখ সাহেবকে রাওয়ালপিন্ডি বিমান বন্দরে বিদায় জানালেন আর সাংবাদিকদের বললেন, ‘পাখি উড়ে গেছে’( বাংলাদেশ ডকুমেন্ট, ২য় খন্ড ৬০২পৃ)। হিথ্রো বিমান বন্দরে নেমে শেখ বললেন, ‘আমি মিস্টার ভুট্টোর সাফল্য কামনা করি’( বাংলাদেশ ডকুমেন্ট ২য় খন্ড ৬০২পৃ)। বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সেরাজুর রহমান বলেছেন, শেখ সাহেব তকনও জানতেন না বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। কারণ, ভুট্টো তাঁকে সমঝোতা বা লুজ ফেডারেল সরকারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ৭০ সালে নির্বাচনের পরে পাকিস্তানের রাজনীতিতে গোলযোগ সৃষ্টি করেছিলেন ভুট্টো। তিনিই দুই প্রধানমন্ত্রীর থিওরী দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন উভয় অঞ্চলে কোন দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তাই যৌথ শাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। যতদূর শুনেছি, বংগবন্ধু অখন্ড পাকিস্তানের স্বার্থেই ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর সাথে সমঝোতা করতে চেয়েছিলেন। আমরা এও শুনেছি , ৬দফার পুরো বাস্তবায়ন না করেও তিনি সমঝোতায় রাজী ছিলেন। কিন্তু কি সমঝোতা হয়েছিল বা কেন শেষ পর্যন্ত কেন আলোচনা গেল? কে এজন্যে দায়ী? ভুট্টো, ইয়াহিয়া বা ইন্দিরা গান্ধী বা পাকিস্তানের সামরিক জান্তা কে অনেকেই দায়ী করেন। ইন্দিরা গান্ধী কেন পাকিস্তান ভাংতে চেয়েছিলেন তা নানা ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। পাকিস্তানকে ভাংগার জন্যে ভারতের নেতারা ৪৭ সাল থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, এ কথা কারও অজানা নয়। ভারত ৭১ সালে যে সুযোগ পেয়েছে তা কাজে লাগিয়েছে নিজেদের স্বার্থে। বংগবন্ধু ইচ্ছে করেই ভারত যাননি। তিনি হয়ত মনে করেছিলেন, ভারতে গেলে সমঝোতার সকল পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। আমেরিকাও চায়নি পাকিস্তান ভেংগে যাক। এ তথ্য আমরা পেয়েছি বিভিন্ন দলিলে। আমেরিকা চেয়েছিল রাজনৈতিক সমঝোতা। সে সমঝোতা হতে দেয়নি ভারত ও রাশিয়া। কিন্তু আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সন কিছুতেও বংগবন্ধুর মৃত্যুদন্ড চাননি। তিনি জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছ থেকে এই মর্মে লিখিত ওয়াদা আদায় করেছিলেন। ভুট্টোও শেখ সাহেবের মৃত্যুদন্ড চাননি। তিনিও নিক্সনের কাছে ওয়াদা করেছিলেন। কিন্তু ভুট্টো কি অখন্ড পাকিস্তান চেয়েছিলেন? গবেষণাই একদিন প্রমান করবে ভুট্টো কি চেয়েছিলে আর বংগবন্ধু কি চেয়েছিলেন। সে সময়ের জন্যে আমাদের বা পরের প্রজন্মকে অপেক্ষা করতে হবে। ভূ-রাজনৈতিক কারণেই আমেরিকা পাকিস্তানের বন্ধু হলেও তখন যে কোন ধরণের সামরিক ব্যবস্থা থেকে বিরত থাকে। ৭১ সালের পূর্ব বংগবন্ধু রাজনীতিতে আমেরিকা পন্থী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তিনি কখনই বাম রাজনীতির ধারাকে সমর্থন করেননি। ইন্দিরা গান্ধীও চাননি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ বামপন্থীদের দখলে চলে যাক। সেতা আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময়েও দেখেছি। সুতরাং, আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি অখন্ড পাকিস্তানকে ধ্বংস করেছে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ও ইন্দিরা গান্ধী। তাহলে সামরিক জান্তা অখন্ড পাকিস্তানকে কেন ধ্বংস করলো? পাকিস্তানের কারাগার থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে বংগবন্ধু কখনই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কারও সাথে আলাপ করতে চাননি। তাজউদ্দিন সাহেব নিজেও এ কথা বলেছেন। তবে বংগবন্ধু হয়ত শেখ মনির কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কিছু জেনে থাকতে পারেন। শেখমনি ও তাঁর বন্ধুরা মুজিব নগর সরকারের বিরুদ্ধেই ছিলেন। শেখ মনির নেতৃত্বেই মুজিব বাহিনী গঠণ করেছিল ভারত সরকার বা ইন্দিরা গান্ধী। জেনারেল উবান বা ভবাণী পুরের র’অফিস মুজিব বাহিনীকে দেখাশুনা করতো।


কাশ্মীরী, ফিলিস্তিনি, কুর্দিরা জাতি, কিন্তু তাঁদের কোন স্বাধীন দেশ নেই। স্বাধীন রাস্ট্র বা দেশ গঠণের জন্যে তাঁরা কয়েক যুগ ধরে সশস্ত্র যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। মানুষ নির্যাতিত হয়ে ভৌগলিক স্বাধীনতা চায়। কারন ভৌগলিক অধিকার না থাকলে আধুনিক যুগে রাস্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায়না। ইংরেজ ও হিন্দু শোষণ থেকে মুক্তি লাভের আশায় ভারতের মুসলমানেরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাংখায় পাকিস্তান চেয়েছিল। কিন্তু ভারতের কংগ্রেস বা হিন্দু নেতারা পাকিস্তান প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। এমন কি অখন্ড ভারতের কাঠামোতেও হিন্দু নেতারা মুসলমানদের ন্যায্য অধিকার মেনে নিতে চায়নি। হিন্দু নেতারা যদি হিনমন্যতায় না ভুগে দূরদর্শিতার পরিচয় দিতেন তাহলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন হতোনা। ভারতে বহু জাতি ও বহু ভাষা রয়েছে এ কথা কংগ্রেস নেতারা মানতে চাননি। তাঁরা মানতে চাননি ভারতে হিন্দু ছাড়া আরও বহু ধর্ম রয়েছে। মুসলমানেরা ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় জাতি। কংগ্রেসের ভন্ডামী ও তথাকথিত সেক্যুলারিজমের নামে মুসলমানদের অস্তিত্বই স্বীকার করতে চায়নি। ফলে, মুসলমান নেতারা( যাদের বেশীর ভাগই ছিলেন উচ্চ সমাজের প্রতিনিধি) বাধ্য হয়ে ১৯৪০ সালে পাকিস্তানের দাবী তোলে। কংগ্রেস নেতারা মনে করতেন, তারা সকল ভারতীয়ের প্রতিনিধিত্ব মূলক সংগঠণ। কার্যত ও বাস্তবতায় কংগ্রেস ছিল হিন্দুদের সংগঠণ। তাই ১৯০৬ সালে ঢাকায় নিখিল ভারতের মুসলমানদের নিজেদের সংগঠন মুসলীম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। আমি মনে করি হিন্দু নেতাদের ব্যর্থতার কারণেই মুসলীম লীগের জন্ম হয়েছে। কালক্রমে মুসলমানদের শক্তিশালী দরকষাকষির ফলেই ১৯৪৭ সালে ভারত ভেংগে নতুন রাষ্ট পাকিস্তানের জন্ম হলো, যা হিন্দু নেতারা কখনই মেনে নিতে পারেননি। ফলে দুই দেশের ভিতর জন্ম লগ্ন থেকেই বৈরিতা চলতে থাকে। পাঠক সমাজের স্মৃতিকে একটু ঝালিয়ে নেয়ার জন্যে পেছনের কথা গুলো বলেছি।
পাকিস্তান নামক কোন দেশ ৪৭এর আগে কোথাও ছিলনা। ইংরেজদের আগে ভারতে কয়েক শতাব্দী ধরে মুসলমান শাসন ছিল। হিন্দুস্তান শব্দটির স্রষ্টা বিদেশীরা। সিন্ধু,হিন্দুকুশ শব্দ থেকে হয়ত বিদেশীরা এই নাম করণ করে থাকতে পারে। তবে মুসলমানদের আগমনের আগে ভারত বা হিন্দুস্থান কখনও একদেশ ছিল। বিভিন্ন এলাকা বা অঞ্চল বিভিন্ন রাজা শাসন করতেন। এরা সবাই স্বাধীন ও সার্বভৌম ছিলেন। মুসলমানরাই এক ভারত বা হিন্দুস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। ইংরেজ শাসন কালে ভারতে সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দেয়া হয়। ফলে হিন্দু ও মুসলমানের ভিতর অধিকার ও ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। সেই বিরোধকে ইংরেজরা কাজে লাগায়। হিন্দু, প্যাগান, পৌত্তলিকরা মনে করেন ভারত একমাত্র তাঁদেরই দেশ। কারণ ধর্মীয় ভাবে ভারতে হিন্দুরা মেজরিটি। যদিও এখানে বহু ধর্ম ও বর্ণের মানুষ বাস করে। তবুও হিন্দুরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে এদেশ শুধু হিন্দুদের। এর ফলেই হিন্দু মেজরিটির সাথে মুসলমানদের বিরোধ তৈরি হয়। আমি এর আগে বহুবার বলেছি, হিন্দু নেতরা একটু উদার ও সহনশীল হলে ভারত ভাগ হয়ে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টি হতোনা। মুসলীম মেজরিটি এরিয়া নিয়েই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্যে কোন ধরণের যুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়নি। যদিও ১৭৫৭ সালের পরেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে মুসলমানেরা যুদ্ধ শুরু করে আর হিন্দুরা ইংরেজদের সাথে মিত্রতা স্থাপন করে সহযোগিতা করতে থাকে। ফলে মুসলমানরাই ছিল ইংরেজদের প্রধান শত্রু।
পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল পূর্ববাংলা ছিল সবচেয়ে বেশী শোষিত ও নির্যাতিত। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরেও সেই শোষণ ও নির্যাতন অব্যাহত থাকে এবং পূর্বাঞ্চলের গরীব মুসলমানদের ভিতর অসন্তোষ চরমে উঠে। আলাপ আলোচনা ও সমঝোতার নামে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা বংগবন্ধুকে ধোকা দিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। বংগবন্ধু তাদের প্রতারণা মূলক আলোচনা অব্যাহত রাখেন রাখেন ২৪শে মার্চ পর্যন্ত। যদিও বংগবন্ধু দৃঢভাবে বিশ্বাস করেছিলেন সমঝোতা হবে। এটা ছিল পাকিস্তানী সামরিক জান্তার চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও সীমাহীন শক্তি প্রয়োগ করে পাকিস্তান টিকিয়ে রাখার অপচেষ্টা। ২৫শে সারাদিন বংগবন্ধু সারাদিন নিজ বাসভবনে অপেক্ষা করেছেন কখন ঐতিহাসিক সমঝোতা পত্র আসবে। যদিও সমঝোতাপত্রে কি ছিল দেশবাসী আজও জানেনা। যদিও অনেকেই বলেন, সমঝোতা ছিল ৬ দফার ভিত্তিতে পাকিস্তানকে কনফেডারেশনে পরিণত করা। তাই বংগবন্ধু ২৫শে মার্চ রাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে তাজ উদ্দিন সাহেব যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র নিয়ে গিয়েছিলেন তা স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন। বরং বলেছিলেন, এই ঘোষণাপত্র তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার দলিল হয়ে যাবে। সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাবার কথা বলে নিজে ঘরে বসে থাকলেন। এ কথা তাজউদ্দিন সাহেবই বলেছেন।
অপরদিকে জেনারেল ইয়াহিয়া বুঝতে পেরেছিলেন যে শেখ সাহেব দলের স্বাধীনতাকামীদের প্রচন্ড চাপের মুখে রয়েছেন। তাই চাপ কমাবার জন্যে ইয়াহিয়া ৬ই মার্চ বংগবন্ধুকে একটি নম্বরবিহীন ফোন থেকে ফোন করলেন। ওইদিন ইয়াহিয়া একটি বার্তাও পাঠালেন বংগবন্ধুর কাছে। বার্তায় বললেন, ‘অনুগ্রহ করে দ্রুত কোন সিদ্ধান্ত নেবেন না।আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে,আপনার আকাংখা এবং জনগণকে দেয়া আপনার অংগীকারের পুরোপুরি মর্যাদা আমি দেবো। আমার কাছে একটি পরিকল্পনা আছে যা আপনার ৬ দফার চেয়েও বেশী খুশী করবে। আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ দ্রুত কোন সিদ্ধান্ত নেবেন না( নিয়াজীর আত্ম সমর্পনের দলিল,৬৪পৃ)।
৬ই মার্চ রাতে আওয়ামী লীগের হাই কমান্ডের বৈঠক বসলো। একটানা নয় ঘন্টা বৈঠক চললো। শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতাকামীদের পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। এর আগে গোপনে শেখ সাহেবের সাথে মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাডের সাথে শেখ সাহেবের সাথে বৈঠক হয়। ফলে ৭ই মার্চ ভাষণে শেখ সাহেব স্পষ্ট করে স্বাধীনতার কোন ঘোষণা দেননি। এসব ছিল ইয়াহিয়ার ছল চাতুরী। আর বংগবন্ধু সীমাহীন ভুল করেছেন তাঁকে বিশ্বাস করে। ৭ই মার্চের ভাষণে বংগবন্ধু ২৫শে মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যাওয়ার জন্যে ৪ দফা দাবী পেশ করলেন। ১) সামরিক আইন তুলে নিতে হবে,২) জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে,৩) সেনা বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে,৪) বাংলার মানুষ হত্যার কারণ অনুসন্ধানের জন্যে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি করতে হবে। এই ভাষণ সম্পর্কে জেনারেল ইয়াহিয়া বলেছেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে এটাই সর্বোত্তম ভাষণ।’( নিয়াজীর আত্মসমর্পনের দলিল ৬৬পৃ)। নিজের ভাষণ সম্পর্কে শেখ সাহেব নিজে কি বলেছেন। ৭২ সালের ১৮ই জানুয়ারী ডেভিড ফ্রষ্টকে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন,স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে কি পরিণতি হবে আমি জানতাম। তাই বলেছি ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ফ্রষ্ট প্রশ্ন করলেন আপনি যদি স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন তাহলে কি হতো? শেখ সাহেব বললেন, ওইদিন আমি এটা করতে চাইনি। কেননা, বিশ্বকে তাদের আমি এ বলার সুযোগ দিতে চাইনি যে, তারা বলুক মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং আঘাত হানা ছাড়া আমাদের আর কোন বিকল্প নেই। আমি চাইলাম তারাই আগে আঘাতটা হানুক এবং আমার জনগণ তা প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।( বাংলাদেশ ডকুমেন্টস: ২য় খন্ড ৬২পৃ)।
তাজউদ্দিন কন্যা শারমিন আহমদ লিখেছেন,২৫শে মার্চ রাতে তাজউদ্দিন সাহেব বংগবন্ধুর বাসায় গিয়েছিলেন তাঁকে আন্ডারগ্রাউন্ডে যাওয়ার জন্যে। কিন্তু শেখ সাহেব রাজী হলেন না। তিনি বললেন, যা নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকো। পরশুদিন ২৭শে মার্চ হরতাল ডেকেছি। ওই সময়ে পাশের রুমে বেগম মুজিব শেখ সাহেবের স্যুটকেস গুছিয়ে দিচ্ছিলেন। এর মানে শেখ সাহেবকে সেনাবাহিনী নিতে আসবে সেকথা বেগম মুজিব জানতেন। এর পরে তাজউদ্দিন সাহেব পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বাধীনতার ঘোষণা লিখে নিয়ে যান এবং সেটা দস্তখত করতে বলেন। তাঁর সাথে একটা টেপ রেকর্ডারও ছিল। তিনি আরও বললেন,আপনাকে বলে যেতে হবে আপনার অনুপস্থিতে কে নেতৃত্বে থাকবেন। রিচার্ড সিসন এবং লিও ই রোজ তাঁদের বই ওয়ার এ্যান্ড সিসেসন পাকিস্তান বইয়ে লিখেছেন, বৈঠক শেষে মুজিব একজন সিনিয়র সামরিক অফিসারকে জানালেন যে তিনি এবং ইয়াহিয়া ১১জন মন্ত্রীর সমন্বয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠণের ব্যাপারে একমত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী সহ ৬ জন পূর্ব পাকিস্তান থেকে, অপর ৫জন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। ৩জন ভুট্টোর দল পিপিপি ও ২জন ওয়ালী খানের ন্যাপ থেকে। আসলে সবকিছু ছিল ধোকা। শেখ সাহেব হয়ত বুঝতে পেরেছিলেন ধোকার বিষয়টি। তবুও তিনি আগে কোন ধরণের পদক্ষেপ নিতে চাননি। তিনি হয়ত এটা কৌশল হিসাবে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি মে করতেন তাঁর অনুপস্থিতিতেও তাঁর দল সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। তিনি কোন ভাবেই চাননি তাঁর বিরুদ্ধে পাকিস্তান ভাংগার অভিযোগ আসুক। ২৪শে মার্চেও বংগবন্ধু বলেছেন,আমরা শান্তিপূর্ণ মীমাংসা চাই। এর মানে এই নয় যে,আমি আমার দাবী ধেড়ে দেবো।( দৈনিক পাকিস্তান ২৪শে মার্চ) ২২শে মার্চেও বংগবন্ধু বলেছিলেন, যদি কোন অগ্রগতিই না হয় তাহা হইলে আমি আলোচনা চালাইয়া যাইতেছি কেন?
জেনারেল জ্যাকব তাঁর লিখিত ‘সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা- বার্থ অফ এ ন্যাশন’বইতে উল্লেখ করেছেন যে,তাজউদ্দিন আহমদ ছিলেন আপাদমস্তক এক গণতন্ত্রী। সেহেতু স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তৈরির সময় তিনি সকলের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোণার ব্যাপারে তাজউদ্দিন সাহেব জ্যাকবের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। জ্যাকব একটি ড্রাফট তৈরি করে তাজউদ্দিন সাহেবকে দেন। তিনি সেই ঘোষণা নামজাদা আইনজীবীদের দেখিয়ে ১১ই এপ্রিল ঘোষণা দেন এবং ১৭ই এপ্রিল বেদ্যনাথতলাকে মুজিব নগরকে প্রবাসী সরকারের রাজধানী করে সরকার গঠণের ঘোষণা দেন। ১১ই এপ্রিলের ঘোণায় তাজউদ্দিন সাহেব বলেন,জিয়াউর রাহমানই প্রথম ঘোষণা দিয়েছেন
ইন্সটিটিউট ফর ডিফেন্স ষ্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস এর পরিচালক কে সুব্রামানিয়াম বলেছেন,‘মেজর জিয়ার কার্যক্রম এবং পরদিন ২৬শে মার্চ ত্বড়িত সাড়া দিয়ে চট্টগ্রাম শহর দখল এবং অস্থায়ী সরকারের ঘোষণাদান একজন মধ্যম পর্যায়ের সামরিক অফিসারের তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয়ই কেবল বিধৃত করেনা,তাঁর দূরদর্শিতা ও পরিকল্পনাকেও প্রতিভাত করে।(দ্য লিবারেশন ওয়ার,১৫১-১৫২পৃ)।
মুজিবনগর সরকার বা বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার নিয়ে লেখার ফলে মুক্তিযুদ্ধের উপ সেনাধ্যক্ষ একে খন্দকারের বই নিয়ে ইতোমধ্যেই আওয়ামী নেতারা নানা ধরণের প্রলাপ বকতে শুরু করেছেন। কিন্তু এ ধরণের কথা এর আগে অনেক বইতে প্রকাশিত হয়েছে। কিছুদিন আগে প্রথমা প্রকাশিত বই মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর বইতেও বলা হয়েছে বংগবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা দেননি। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে কোন জাতির ভাগ্যে এমন হয়নি।মুক্তিযুদ্ধের ভিতর বাহির সহ আরও গোপন কথা নিয়ে বই বেরিয়েছে দেশে বিদেশে। মুক্তিযুদ্ধে কত লোক মারা গেছে তারও কোন সুরাহা আজও হয়নি। কেন এতো বিভ্রান্তি? কারা কার স্বার্থে এ বিভ্রান্তিকে জিইয়ে রাখতে চান। এ কথা সবাই জানেন যে কৌশলগত কারণে অনেক মিথ্যা কথা বলেন। তাঁরা মনে করেন সময়ের চাহিদা পূরণে বা জনগণকে সন্তুষ্ট রাখার জন্যে মিথ্যাকথা বলাতে কোন দোষ নেই। তাঁরা বুঝতে পারেন না যে তাঁদের কথা ইতিহাস হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকার, ভারত সরকারের অবস্থান যা প্রকাশিত হয়েছে তা আমরা কিছুটা জানি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু আগে বংগবন্ধু ও ইয়াহিয়া যে আলাপ করেছিলেন তার ফলাফল কি ছিল তা আজও আনুষ্ঠানিক ভাবে দেশবাসীকে জানানো হয়নি। কেন জানানো হয়নি। এর আগের লেখায় একে খন্দকারের বইয়ের বরাত দিয়ে বলেছি মুজিব বাহিনী গঠিত হয়েছে সরকারের অগোচরে বা সরকারের অনুমতি ছাড়া। মুজিব বাহিনীর সাথে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের কোন সম্পর্ক ছিলনা। বরং মনে হয়েছে মুজিব বাহিনীর ক্ষমতা প্রবাসী সরকারের চেয়েও বেশী। সরকারের কোন নির্দেশ মুজিব বাহিনীর নেতারা মানতেন না। এমন কি তাঁরা তাজউদ্দিন সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মানতেন না। মুজিব বাহিনীর সদর দফতার ছিল ভবানীপুরে চিত্ত সুতারের বাড়িতে। র’এর পূর্বাঞ্চলের সদর দফতরও ছিল ওই বাড়িতে। মুজিব বাহিনী ছিল উচ্চ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। তাঁদের অস্ত্রও ছিল আধুনিক। তাঁদের গুরু ছিলেন জেনারেল উবান ও চিত্ত সুতার। ইন্ডিয়া ডক্ট্রিন বইতে বলা হয়েছে মুজিব বাহিনী গঠন ছিল র’এর নীতিগত সিদ্ধান্ত। র’ মুক্তিযুদ্ধে আরও অনেক গ্রুপের সাথে সম্পর্ক রাখতো। তারা চাইতো বিভুন্ন গ্রুপের ভিতর অন্তর্কলহ লেগে থাকুক। কখনই যেন ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হয়। কালিদাস বৈদ্য তাঁর ‘বাংগালীর মুক্তিযুদ্ধের অন্তরালে শেখ মুজিব’বইতে স্পষ্ট করে বলেছেন যে,শেখ মুজিব কোনদিনও স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। কালিদাস বৈদ্যের মতে শেখ সাহেব বুঝতে পেরেছিলেন,শয়তানের সাথে চুক্তিতে আসার চেয়ে পাকিস্তানের সাথে সমঝোতায় আসাটা অনেক শ্রেয়। হেনরী কিসিঞ্জারের হোয়াইট হাউজের বছরগুলো বইতে বলেছেন,ইন্দিরা গান্ধীর নীতি ছিল স্বাধীন পূর্ববাংলা। আর লক্ষ্য ছিল কালক্রমে অখন্ড ভারত নীতিকে বাস্তবায়ন করা। কালিদাস বৈদ্য বাংলা সেনা নামক একটি সংগঠণের প্রধান। ভারতের পশ্চিম বাংলা থেকে এটি পরিচালিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে আওয়ামী লীগ ও অংগ সংগঠণ ছারা অন্য কাউকে সুযোগ দিতে চায়নি। মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীরা কোন ধরণের ভুমিকা রাখুক তা দিল্লী সরকার চায়নি। বামপন্থীদের দমনের জন্যেই নাকি মুজিব বাহিনী গঠন করা হয়েছিল। বিশেষ করে চীনপন্থীরা ছিল মুজিব বাহিনী ও ভারত সরকারের শত্রু। কমরেড নুর মোহাম্মদ লিখেছেন,যাঁরা দেশের ভিতরে থেকে যুদ্ধ করেছেন তাঁদেরকে মোকাবিলা করতে হয়েছে পাকিস্তান বাহিনী, ভারতীয় বাহিনী, মুজিব বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীকে। নুর মোহাম্মদ লিখেছেন, দেশের ভিতর হাজার হাজার বামপন্থী গণযোদ্ধাকে হত্যা করেছে অন্যান্য সকল বাহিনী। মুজিব বাহিনীর সাথে সমঝোতা করেও গণযোদ্ধারা রক্ষা পায়নি। দেশের ভিতরে তখন বহু বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। একে খন্দকারের বইতে এসেছে মুজিব বাহিনীতে যাঁরা ছিলেন তাঁরা শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সন্তান। অপরদিকে মুক্তি বাহিনীতে ছিলেন কৃষক শ্রমিকদের সন্তান। যাঁরা ঠিক মতো খাবার পায়নি, পোষাক পায়নি, অস্ত্র পায়নি। এঁরাই সবচেয়ে বেশী প্রাণ দিয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেও মুজিব বাহিনী তাজউদ্দিন বিরোধী ভুমিকা অব্যাহত রেখেছিল। শেখ সাহেব কখনই মুক্তিযুদ্ধের কোন কথা শুনতে চাননি। তাজউদ্দিন বলতে গেলেও বংগবন্ধু কোন আগ্রহ দেখাননি।
কেখক: কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
http://www.humannewspaper.wordpress.com


একে খন্দকারের ৭১ এর দিনগুলি / এরশাদ মজুমদার

এইতো ক’দিন আগে খন্দকার সাহেবের ‘ ১৯৭১ ভিতরে বাইরে’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি স্মৃতিকথা প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশণী। এটি প্রথম আলোর একটি প্রকাশনা সংস্থা। খুব অল্প সময়ে সংস্থাটি বেশ নাম করেছে। এই সংস্থার প্রকাশিত বই গুলো খুবই ভাল। বই গুলোর বিষয় ও মতের সাথে আমার অনেক দ্বিমত আছে। কোলকাতার আনন্দ বাজার ও আনন্দ পাবলিশার্সের যেমন লেখক ঘরাণা আছে তেমনি প্রথমা বা প্রথম আলোরও একটি লেখক ঘরাণা আছে। যদি বলি ভাই, আমার লেখা গুলো প্রকাশ করুন। তাঁরা তা করবেন না। কারণ আমি তাঁদের ঘরাণার লেখক বা সাংবাদিক নই। প্রথম আলো বা ডেইলী ষ্টারের সাংবাদিকতার মানও ভাল। যদিও আমি তাঁদের সম্পাদকীয় নীতি সমর্থন করিনা। খন্দকার সাহেব আওয়ামী ঘরাণার লোক। ক’দিন আগেও সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী ছিলেন। এখন রাতারাতি রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে গেছেন। কেউ কেউ তাঁকে কুলাংগার অকৃতজ্ঞ বলে গালমন্দ করেছেন। এঁরা কয়েক বছর আগে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন সাহেবকে বিশ্বাসঘাতক বলেছিলেন। তিনি খুবই বিনীত ভদ্রলোক। তাঁর বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে যাঁরা ছিলেন তাঁরাও  সবাই আওয়ামী অথবা দিল্লী ঘরাণার লোক। প্রকাশণা সংস্থাটিরও একই ইমেজ। একজন লোক বা সংস্থার ইমেজ তৈরি হয় তার আদব কায়দা, পোষাক আসাক, চলাবলা ,কথাবার্তা ও লেখালেখিতে। যেমন আমেরিকা এখন একটি যুদ্ধবাদী দেশ হিসাবে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত। কথায় কথায় , যেখানে সেখানে গায়ের জোর খাটাতে চায়। বিগত বিশ বছরে আমেরিকা বিশ্বব্যাপী কয়েক লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। এখন সে ইসলামী রাস্ট্র নামে একটি সংস্থা তৈরি করে ইরাক ও সিরিয়াতে আক্রমণ চালাচ্ছে বা চালাবার ফন্দি আঁটছে। এ তথ্য আমার নয়। গ্লোবাল রিসার্চ বা ডেমোক্রেসী নাও একথা গুলো প্রচার করেছে। সংস্থা দুটি আমেরিকার কর্পোরেট মিডিয়া বিরোধী প্রতিষ্ঠান। একই ভাবে ইসলামের নানা রূপের কথা আমরা শুনতে পাই। কেউ বলেন ,পলিটিকেল ইসলাম, কেউ বলেন, মিলিটেন্ট ইসলাম বা সন্ত্রাসী বা জেহাদী ইসলাম ও আধ্যাত্ববাদী ইসলাম। আমি যতদূর জানি আলকোরআনের বাইরে কোন ইসলাম নেই। ইসানবী(আ) নাকি বলেছেন, কেউ তোমার গালে এক চড় দিলে তুমি আরেক গাল এগিয়ে দাও। কিন্তু ইসায়ী ধর্মে বিশ্বাসীরা কি সেই পথ অনুসরণ করে? কারা বলছেন এসব কথা তা আমাদের মানে শান্তিবাদী মানুষকে বুঝতে হবে। এক সময় কমিউনিজমকে ধংস করার জন্যে আমেরিকা বেকুব মুসলমানদের ব্যবহার করেছে। এখন ইসলাম বা মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্যে চীন রাশিয়াকে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ ১৪/১৫ কোটি মুসলমানের দেশ। কিন্তু দেশ চালাচ্ছেন ধর্ম নিরপেক্ষ/ সেক্যুলার বা ধর্মহীন একশ্রেণী বা গোষ্ঠির লোক। আবার যাঁরা ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন তাঁরাও ঐক্যবদ্ধ নন। তাঁরা সুস্পষ্ট করে আজ পর্যন্ত নিজেদের কথাও বলতে পারেননি।
খন্দকার সাহেব সকল সরকারেরই চাকুরী করেছেন। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর উঠাবসা আওয়ামী ঘরাণার তথাকথিত ভারতপন্থী বুদ্ধিজীবীদের সাথে। সেই খন্দকার সাহেবই আজ রাষ্ট্রদ্রোহী হিসাবে আখ্যায়িত হচ্ছেন। খন্দকার সাহেবের সদ্য প্রকাশিত বইটি আমি পড়েছি। পুরো বইটিই মুক্তিযুদ্ধ , এর রাজনৈতিক দিক, সরকার ব্যবস্থাপনা, ভারতের ভুমিকা নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত অনুভুতি, চিন্তা ও অভিজ্ঞতার প্রকাশ ঘটেছে। এর সাথে আপনার বা আমার একশ’ভাগ দ্বিমত থাকতে পারে। আমি তাঁর সাথে অনেক বিষয়ে আবার দ্বিমত পোষণ করি।
খন্দকার সাহেবের এই বই নিয়ে জাতীয় সংসদে বেশ গরম আলোচনা হয়েছে। বইটি নিষিদ্ধ করার দাবী উঠেছে এবং লেখকের বিরুদ্ধেও মামলা করার কথা উঠেছে। খন্দকার সাহেব মুক্তিযুদ্ধের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছেন। মুজিবনগর সরকারের সদর দপ্তরে থেকে মুক্তিযুদ্ধের ভিতরের অফিসিয়াল বিষয় খুবই কাছে থেকে দেখেছেন। বইটি পড়ার মতো। এ ধরণের বই আরও বহু প্রকাশিত হয়েছে। ভারতের সেনাবাহিনীর বহু অফিসার আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন । আমাদের মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারেরাও লিখেছেন। এর আগেও প্রথমা প্রকাশিত আরেকটি বইতে খন্দকার সাহেব, এস আর মির্জা ও মঈদুল হাসনের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কথোপকথন প্রকাশিত হয়েছে। সে সময়েও নানা ধরণের গরম গরম কথা হয়েছে। খবরের কাগজে নানা কথা ছাপা হয়েছে। এবারও ছাপা হচ্ছে। এসব বিষয় জানার জন্যে দেশের মানুষ আগ্রহী। পত্রিকার পাঠকগণও উত্‍সাহী। কিছুদিন আগে ভারতের গুন্ডে ছবিতে নাকি আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের যুদ্ধ বলে নাকি আমাদের অপমান করা হয়েছে। কেউ কিছু বললে বা লিখলে যদি তা আওয়ামী লীগের পছন্দ না হয় তখনি আওয়ামী রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা গলা ফাটিয়ে গালাগাল শুরু করেন। আমার কথা হলো গালাগালির কি আছে? আপনি দলিল দস্তাবেজ দিয়ে আপনিও আপনার কথা বলুন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি বা এর ভিতরে ছিলাম তারা এখন নানা রংয়ের মুক্তিযুদ্ধ দেখছি। এখনতো আবার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নানা কাহিনী বের হচ্ছে। অনেকেইতো নানা রকম খেতাব ও স্যালুট নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতিরা এখন কি করবেন? আবার মুক্তিযুদ্ধ করেননি এমন শহীদদের সন্তান ও নাতিপুতিরা কি করবেন। ৭১ সালে অসুখে মারা গেছেন এমন মানুষও নাকি শহীদ খেতাব পেয়েছেন। তাই ৪৩ বছরেও মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ ও রাজাকারদের কোন তালিকা তৈরি হয়নি। কেউ এ বিষয়ে কথা বললেও তাঁদের উপর হামলা হয়। আমরা কী এক অবাক জাতি! নিজেদের বীরত্বের ইতিহাসও ঠিকমতো লিখতে চাইনা।
অর্থনৈতিক শোষণ, অবিচার অব্যাহত থাকলে পাকিস্তান টিকবেনা এমন কথা পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদেও উচ্চারিত হয়েছে। অপরদিকে ভারত ৪৭ সাল থেকেই পাকিস্তান ভাংগার জন্যে কাজ করে যাচ্ছিল। ২০০৭ সালের এপ্রিলে বেরেলির এক নির্বাচনী সভায় রাহুল গান্ধী বলেছেন,আমাদের পরিবার পাকিস্তান ভাংতে চেয়েছে, ভেংগে দেখিয়েছে। ইন্দিরা গান্ধীজী নিজেও ভারতীয় পার্লামেন্টে বলেছিলেন ‘হাজার সালকা বদলা লিয়া’( ৭১১ থেকে ১৯৭১)। এর আগে ৭০ সালের এক জনসভায় ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘ভারত কোনদিনও পাকিস্তানের অস্তিত্বকে মেনে নিতে পারেনি। ৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সমর্থন ও ডিসেম্বরে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ছিল অখন্ড ভারতনীতি বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ। ভারত এখনও মনে করে দূর্বল বাংলাদেশ ভারতের জন্যে কল্যাণকর। ভারত কখনই চায়না বাংলাদেশ শক্তিশালী হোক। মুসলমান জিগির তুলে কায়েমী স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করার জন্যেই একশ্রেণীর তথাকথিত মুসলমান নেতা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পাকিস্তান চেয়েছিলেন নির্যাতিত নিপীড়িত মুসলমানেরা। পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলার মুসলমানেরা ছিল সবচেয়ে বেশী নিপীড়িত। পাকিস্তানের নেতারা সাধারন মানুষকে হতাশ করেছেন। মাওলানা ভাসানীতো ৫৭ সালেই পাকিস্তানকে বিদায়ী সালাম দিয়েছিলেন। ইতিহাসের পাতায় ৪৭ থেকে ৭১ এর কথা বহুজন লিখেছেন। সে সময়ে বংগবন্ধু ও সোহরাওয়ার্দী সাহেব ছিলেন আমেরিকাপন্থী । আমেরিকার সকল কাজই তাঁরা সমর্থন করতেন।
৭১ সালে ভারত সরকার যে শেখ মনি, রাজ্জাক ,সিরাজুল আলম ও তোফায়েলের নেতৃত্বে মুজিব বাহিনী গঠণ করেছিলেন তা বাংলাদেশ সরকার জানতোনা। এটা ছিল ভারত সরকারের উচ্চ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত গোপন বাহিনী। এই বাহিনী বাংলাদেশ সরকার বা মুক্তিবাহিনীর কমান্ডের বাইরে ছিল। এরা তাজউদ্দিন সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী মানতোনা। আমরা এসব কথা তখনও শুনেছি। কিন্তু এবার খন্দকার সাহেব খোলাসা করে লিখেছেন। খন্দকার সাহেব বেশ খোলাসা করে অনেক কথা বলেই নিজের স্মৃতিকথা লিখেছেন। আপনারা কেউ যদি তখন মুক্তিযুদ্ধের সদর দপ্তরে থেকে থাকেন তাহলে আপনারা স্মৃতিকথা লিখুন। এখন যদি সাহস না হয় তাহলে লিখে আদালতের কাছে রেখে যান। বলবেন আপনার ইন্তিকালের পর প্রকাশ করার জন্যে। ইন্তিকাল শব্দটি ভাল না লাগলে বলুন পরলোক বা স্বর্গ লাভের পর। মুজিব বাহিনী কেন গঠণ করা হয়েছিল তা শুধু ইন্দিরাজীই জানেন। জেনারেল উবান শুধু এ বাহিনী গঠণ করে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের ব্যাপারে হয়ত ইন্দিরাজীর কোন স্বপ্ন বা পরিকল্পনা ছিল। এমনওতো হতে পারে বংগবন্ধু যদি পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে না আসেন তাহলে বাংলাদেশ কে চালাবে? তবে শুনেছি, রক্ষীবাহিনীতে মুজিব বাহিনীর অনেককেই চাকুরী দেয়া হয়েছিল। রক্ষীবাহিনীর প্রধান নাকি তোফায়েল সাহেব ছিলেন। দু:খ ও বেদনার বিষয় ৭৫এর আগষ্টে বংগবন্ধুকে রক্ষা করার জন্যে রক্ষীবাহিনী তেমন কোন ভুমিকা পালন করেনি।
একজন লেখক, কবি ও সাংবাদিক হিসাবে নিজের মনের কথা বলবো তেমন পরিবেশ এখন বাংলাদেশে নেই। আমরাতো পাকিস্তানী শোষণ ও শাসন থেকে মুক্তিলাভ করে একটি সুখী সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। বিশেষ করে বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক ও সাধারন মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে রাজনীতিকরা এখনও যা করার কথা ছিল তা করেন নি। অথচ নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে সবাই শতভাগ এগিয়ে গেছেন। খন্দকার সাহেবও নিজের কাছে প্রশ্ন করেছেন প্রিয় মাতৃভুমি কতটুকু আলোকিত হয়েছে।
বইটির এক জায়গায় খন্দকার সাহেব উল্লেখ করেছেন যে, সরকার গঠণের আগে ৪/৫ এপ্রিল তাজউদ্দিন সাহেব দিল্লী গিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করতে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে। এজন্যে তাঁকে জবাবদিহি করতে হয়েছে ভবানীপুরে অবস্থিত চিত্তরঞ্জন সুতারের কাছে। চিত্তবাবু বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র’এর দায়িত্বপ্রাপ্ত। চিত্তবাবু র’ কর্তৃক নিয়োজিত হয়ে বংগবন্ধুর সাথে সম্পর্ক তৈরি করেন ৬০এর দশকে। কালক্রমে তিনি বংগবন্ধুর বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠেন। দিল্লী যাওয়ার আগে তাজউদ্দিন সাহেব ভবানীপুর গিয়েছিলেন চিত্তর সাথে দেখা করতে। তখন চিত্ত সেখানে ছিলেন না। ভবানীপুরে র’এর দপ্তর ছাড়াও একটি গেষ্ট হাউজও আছে মুজিব বাহিনীর নেতাদের থাকার জন্যে। এই চিত্তবাবুই বংগভুমি আন্দোলনের নেতা। তাঁর দাবী হচ্ছে বাংলাদেশের ক’টা জেলা ছেড়ে দিতে হবে পূর্ববাংলা থেকে চলে যাওয়া হিন্দুদের জন্যে। বংগভংগ আন্দোলনের সামরিক শাখার প্রধান হচ্ছেন বৈদ্যবাবুু। পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত করে রাখার দায়িত্বেও নিয়োজিত রয়েছেন। এই দুই ভদ্রলোকই বাংলাদেশের প্রায়ই সকল জেলায় র’এর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন।
নেহেরু ডকট্রিন মানে হলো সুপ্রাচীন মহাভারত। ৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হলোও নেহেরুজী ৪৭ সালেই পাকিস্তান ভাংগার কাজে হাত দেন। ১৯৬৮ সালে র’প্রতিষ্ঠিত হলে পূর্ববাংলা বা বর্তমান বাংলাদেশে র’ সরাসরি কাজ করতে শুরু করে। বাংলাদেশকে স্থায়ী ভাবে অশান্ত করে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসাবে চিহ্নিত করে রাখাই র’এর বর্তমান কাজ। বাংলাদেশের কালচারেল ফ্রন্টে র’ সবচেয়ে বেশী সাফল্য অর্জন করেছে। আওয়ামী ঘরাণার বুদ্ধিজীবীদের প্রায় ১০০ভাগই র’এর কথায় চলে ধারণা করা হয়। ভারত চায় বাংলাদেশে সব সময় একটি অনগত সরকার, যে সরকার ভারতের নীতিকে অনুসরণ করবে। এমন কি ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ২০০৬ সালে বলেছেন,ঐতিহাসিক ভাবেই বাংলাদেশ ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল এক অখন্ড ভৌগলিক অবস্থানে অবস্থিত। আওয়ামী লীগকে ভারত তার বন্ধু রাজনৈতিক দল মনে করে। তাই এ দলটাকে যেমন করেই হোক ক্ষমতায় রাখতে চায়। ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচন তারই প্রতিফলন ও বাস্তবায়ন। বর্তমান সরকারকে ভারত নির্বাচিত ভাড়াটিয় মনে করে। পর্দার অন্তরালে ভারত নিজেকে বাংলাদেশের জমিদার মনে করে।
খন্দকার সাহেবের বইতে মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভুমিকা কি ছিল তা স্পষ্ট হয়েছে। ভারত চেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ যেন আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রনের বাইরে না যায়। মুক্তিযোদ্ধা নির্বাচনে আওয়ামী নেতাদের বাইরে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেয়া হয়নি। এ বিষয়টি আমি নিজেও দেখেছি। ফলে অনেক স্বাধীন মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ তৈরি হয়েছিল। এমন কি মুজিব বাহিনীও প্রবাসী সরকারের নির্দেশ মানতোনা। অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব যুক্তিপূর্ণ কথা বলেছেন। আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। বই নিষিদ্ধ করা বা লেখককে শাস্তি দেয়া সমস্যার সমাধান নয়। আরও তথ্য বহুল আরেকটি বই লিখে উত্তর দেয়াই উত্তম কাজ। আওয়ামী লীগের বহু জ্ঞানী বুদ্ধিজীবী আছেন। তাঁরা নিশ্চয়ই এর চেয়ে অনেক তথ্য বহুল বই লিখতে পারবেন।
আসলে তথ্যের ব্যাপারে সমস্যা গুলো তৈরি করেছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তাঁরা একবার বলেন, ৭ই মার্চের ভাষণই স্বাধীনতার ঘোষণা। আবার বলেন, বংগবন্ধু ২৬শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। সেই ঘোষণার ব্যাপারেও একেকজন এক কথা বলেন। তাজউদ্দিন সাহেব বলেছেন,স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে পাকিস্তানীরা তাঁর বিরুদ্ধে রাস্ট্রদ্রোহিতার মামলা আনবে। পাকিস্তানে বংগবন্ধুর বিরুদ্ধে রাস্ট্রদ্রোহিতার মামলা রুজু হলে তিনি বলেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে কি হচ্ছে তা তিনি জানেন না। আমার নিজস্ব বক্তব্য হলো, বংবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলেও তিনি আমাদের জাতীয় নেতা। তাঁর নেতৃত্বেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আমি বলবো পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বংগবন্ধুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আলোচনা ও সমঝোতার নামে ধোকা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ বংগবন্ধুকে নিয়ে নানা ধরণের গল্প বানাচ্ছে, যার কোনই প্রয়োজন নেই। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে বাংগালী বা বাংগালী মুসলমানের যুদ্ধ মনে না করে তাঁদের দলীয় যুদ্ধ মনে করে। ইতিহাসের সংকট এখানেই। ৭ই মার্চের ভাষণে জয় পাকিস্তান বলেছেন কিনা তখনকার কাগজ দেখলেই জানা যাবে। এ নিয়ে এত হে চৈ করার কি প্রয়োজন? সংসদে মন্ত্রী সাহেবরা যে ভাষায় কথা বলেছেন তাঁদের বন্ধু , সহযাত্রী ও সহমর্মীর বিরুদ্ধে তা কোন ভাবেই গ্রহনযোগ্য নয়।
তবে আমি বলবো, আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস রচনায় সকল সরকারেরই দায়িত্ব। দেশবাসীর কাছে আবেদন জানানো যেতে পারে যুদ্ধের সময়ের কাগজপত্র, দলিল দস্তাবেজ সরকারের জমা দেয়ার জন্যে। ইতিহাসের দুইটি ধারাই সংযুক্ত হওয়া দরকার। একটি রাজনৈতিক,অপরটি সামরিক।
লেখক: কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
http://www.humannewspaper.wordpress.com


ডিজিট মানে সংখ্যা। ডিজিটাইজড করা মানে হচ্ছে সকল কাকে কম্পিউটারাইজড করা। সেখান থেকেই ডিজিটাল শব্দটির উত্‍পত্তি। বাংলাদেশে এখন ডিজিটাল শব্দটি বহুল আলোচিত ও ব্যবহৃত। অনেকেই মজা করার জন্যে বলে থাকেন ডিজিট+ আল(digit+AL). অনেকেই বলেন আওয়ামী লীগের সংখ্যা তত্ব। আর এই সংখ্যাতত্বের গুরু হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য পুত্র। তিনি নাকি এনালগ বাংলাদেশকে ডিজিটাল করতে চান। সেজন্যে প্রধানমন্ত্রী এ খাতে বেশুমার টাকা পয়সা দিচ্ছেন। বেশ কয়েক বছর আগেই সরকারী অফিস গুলোতে বিশ্ব ব্যান্ক কম্পিউটার দিয়েছে বড় বড় সাহেবদেরকে। যদিই তাঁরা চলাতে পারেন না। অনেকেই ভবিষ্যত বংশধরদের  ডিজিটাল করার জন্যে ওই যন্ত্র বাসায় নিয়ে গেছেন। সরকারী খাতায় হয়ত রেকর্ড করা হচ্ছে এত জন সচিব, যুগ্ম সচিব, উপ সচিব, সহকারী সচিব, পরিচালক ডিজিটাল জ্ঞান লাভ করেছেন। যেমন  ধরুণ, বাংলাদেশের  শিক্ষার হার। একেক সরকার একেক রকম তথ্য পরিবেশন করেন। বাংলাদেশের সংখ্যা তত্বের বিষয়টা কেউ বিশ্বাস করেনা।


বিষয়টা নিয়ে এর আগেও আমি লিখেছি। একজন কলামিষ্ট হিসাবে দেশের মানুষের কাছে চিকিত্‍সা জগতের ব্যাস্তবতাকে তুলে ধরা নিজের কর্তব্য মনে করেই লিখেছি। আজ আবার লিখছি মনের কষ্ট প্রকাশ করার জন্যে। কয়েকদিন আগে রাজধানীর গুলশান এলাকার একটি তথাকথিত অভিজাত সাত তারা হাসপাতালের একটি খবর টিভি ,বেতার ও পত্রিকায় প্রচার ও প্রকাশিত হয়েছে। একজন মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী চিকিত্‍সা ও বাঁচার আশায় ওখানে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু ওই হাসপাতালের চিকিত্‍সা ব্যবস্থা তাঁকে বাঁচাতে পারেনি। আল্লাহপাক হয়ত এভাবেই তাঁর মরণ চেয়েছিলেন। সুতরাং আমরা বলবো ‘ইন্নাহ লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে’। এখানে বিষয়টা হচ্ছে লাশ নিয়ে হাসপাতালের ব্যবসা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানালেন পুরো বিল শোধ না করলে লাশ দেওয়া হবেনা। আহ্ কী চমত্‍কার ব্যবসা। শুনেছি , হাসপাতালের মালিকরা খুবই ধার্মিক। তাঁদের নাকি হজ্বের ব্যবসাও আছে। এই ব্যবসাতে নাকি তাঁরা খুবই নাম করেছেন। স্বাভাবিক ভাবেই দেশের মানুষ তাঁদের কাছে মানবিক আচরণ আশা করেছিলেন। ভারতের মাড়োয়ারী আর বিশ্বব্যাপী ইহুদীরা নাকি ব্যবসা আর মানবিকতাকে এক করে দেখেনা। তারা নাকি বলেন, দুনিয়া হচ্ছে ব্যবসা, আর আখেরাত হচ্ছে ধর্ম আর মানবতা। কিন্তু ইসলাম মানবতাতো মানুষেরই কাজ। মানুষকে দয়া দেখাতেই হবে। কারণ ,আল্লাহপাকের প্রধানতম গুণ হচ্ছে দয়া করা, দয়া দেখানো।  এমন আচরণের জন্যে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ও মালিকদের ইমেজ বা ভাবমুর্তি দারুণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও বাংলাদেশে ক্ষমতাবান ব্যক্তি , প্রভাবশালী ও ধনীরা ইমেজ নিয়ে তেমন ভাবেন বলে মনে হয়না। নারায়ন গঞ্জের সাত খুনের মামলায় প্রভাবশালীদের নাটক দেশের মানুষ দেখে চলেছে। টাকা আর প্রভাব দিয়ে সবকিছু করা যায় তাহলে আইনের অবস্থা কি হবে। এখনতো সরকার বিচারকদের ভয় দেখানোর জন্যে শাস্তির বিধান নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছেন। আমাদের চলমান সরকার ও সংসদকে  আওয়ামী ঘরাণার লোক ছাড়া কেউ বৈধ মনে করেনা ।

সাত তারা হাসপাতালের মালিকেরা এ রকম অমানবিক ব্যবহার করছেন কেন? স্বাধীনতা ও সরকারী কল্যাণে বেশ কিছু মানুষতো ধনের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। হাসপাতালের ব্যবসায় এত অমানবিক হওয়ার দরকার কি। বেশীর ভাগ হাসপাতাল বা চিকিত্‍সা ব্যবসায়ী নিজেরা এয়ার এম্বুলেন্সে বিদেশে যান পরিবার পরিজন নিয়ে চিকিত্‍সার জন্যে। বিদেশে মরে উড়োজাহাজে করে দেশে ফিরে আসেন। বড় করে কয়েকবার জানাজা হয়। কালো পোষাকের মেলা বসিয়ে কুলখানি হয়। খবরের কাগজে বেশ কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন সংগঠনের তরফ থেকে শোকবাণী প্রকাশিত হয়। অপরদিকে সাধার নাগরিক ও রোগীদের অবস্থা কাহিল। যদিও সংবিধানে ওয়াদা করা হয়েছে নাগরিকদের ভাত কাপড়,শিক্ষা ও চিকিত্‍সার ব্যবস্থা করবে রাষ্ট্র। এ ওয়াদা সব সময় জারী আছে। এখন রাষ্ট্রের কাছে তেমন টাকা পয়সা নেই। তাও ওয়াদা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছেনা। ওয়াদাতো বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ৪৭ সালেই।বিদেশীদের বিদায় করে  স্বদেশীদের দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের মানুষ সুখে শান্তিতে থাকবে। বিদেশী ইংরেজ সাহেবেরা চলে গেছে, কিন্তু সাধারন মানুষের ভাগ্যের তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। কারণ স্বাধীন বাংলাদেশের নেতারা এখনও অন্তর জগতে বৃটিশদের ভালবাসেন। বৃটিশদের ভাষা, পোষাক, বিদ্যা,আদব কায়দা জারী রেখেছেন। শুধুমাত্র দেশের অতি সরল সাধারন নাগরিকদের ধোকা দেয়ার জন্যে পাজামা পাঞ্জাবী পরেন। পাকিস্তান আমলে‘ মিটিংকা কাপড়া’ বলা হতো। সারাদিন স্যুট কোট পরে , রাতের বেলা বোতল খেয়ে জনসভায় যাওয়ার সময় মিটিংকা কাপড়া পরতেন। ফলে ৪৭ সাল থেকেই কিছু অসত্‍ রাজনীতিকের পাল্লায় পড়ে গেছেন। সিংগাপুরের লী কুয়াং বা মালয়েশিয়ার মহাথিরের মতো একজন নেতা আমাদের ভাগ্যে এলোনা। বৃটিশ আমলের ১৯০ বছর আর পাকিস্তান আমলের ২৩ বছর ধরে হিসাব করলে সাধারন মানুষ ২১৩ বছর শোষিত হয়েছে। এ কথা আমরা চোখ বন্ধ করে বলতে পারি। পাকিস্তান আমাদের প্রধান শত্রু। তারা ২৩ বছর শোষণ করেছে। বৃটিশরা ভদ্র জাতি। দেখতে সুন্দর, ইংরেজী জানে, নারী পুরুষে অবাধে মেলামেশা করে, ধর্মের বালাই নেই। তাই ১৯০ বছরের শোষণকে আমরা হাসি মুখে ভুলে গেছি। আমাদের নীতি হচ্ছে বড় মিয়া ‘চুদুর ভাই’ বলেছেন তাই আহ্লাদের আর সীমা নাই। আমার প্রশ্ন হলো,স্বাধীন সোনার বাংলার নেতারাতো আমাদের ভাই বেরাদর, অতি নিকট আত্মীয় স্বজন, এখন আমাদের কে শোষণ করছে? তারা কি আমাদের চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়? ৭০ সালের ব্যান্কের কেরানী এখন ব্যান্কের চেয়ারম্যান। পেশকার বা মুয়াজ্জিনের পোলা রাষ্ট্রপতি  হয়েছে। খুবই সুখবর। অতি সাধারন মানুষ রাষ্ট্র চালাচ্ছে। কিন্তু কই সাধারন মানুষতো এখনও ভাত কাপড় , চিকিত্‍সা, শিক্ষা ও মাথা গোঁজার ঠিকানা পায়না। রাস্ট্রের সাতশ’ কোটি টাকার বাজেট আড়াই লক্ষ কোটি টাকা হয়ে গেছে। ধনীরা রাষ্ট্রের টাকা মেরে দিয়ে রাতারাতি ধনী হচ্ছে, গরীবরা আরও গরীব হচ্ছেন। আমলা রাজনীতিকরা ধনীদের কাজ থেকে বখরা আদায় করছেন। এসব দেখে শুনে কিছু তরুণ যুবক মাস্তান হয়ে গেছে। তারাও এদিক ওদিক পিস্তল ঠেকিয়ে দু’পয়সা কামাচ্ছে।


মানুষের কথা বলার অধিকার তার জন্মগত। ভাল মন্দ বুঝা ও যাচাই করার জ্ঞান বুদ্ধিও দিয়েছেন তার প্রতিপালক ও স্রষ্টা। আল্লাহতায়ালা মানুষকে জগতে তাঁর খলিফা করেই পাঠিয়েছেন। আল্লাহপাকের বহু গুণ তিনি মানুষকে দিয়েছেন। মানুষকে ভাবতে শিখিয়েছেন। মানুষকে ভাল মন্দের জ্ঞান দিয়ে সঠিক পথ কি তা দেখিয়ে দিয়েছেন। জগতে গণমানুষের প্রথম রাষ্ট্র হচ্ছে মদীনার রাস্ট্র। এ রাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন জগতের শেষ রাসুল(সা) ও শেষ নবী মুহম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মোত্তালিব। সে সময়ে এ জগতে সাধারন মানুষের কোন রাস্ট্র ছিলনা। আল্লাহপাকের ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার জন্যেই নবীজী মদীনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। মদীনা সনদ নিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী মাঝে মাঝেই কথা বলেন। তিনি ওয়াদা করেছেন মদীনা সনদ বাস্তবায়ন করবেন। কে বা কারা তাঁকে বুঝিয়েছেন যে,মদীনা রাষ্ট্র সেক্যুলার( ধর্মহীন) রাস্ট্র ছিল। যদিও আমাদের দেশে সেক্যুলার শব্দটির অনুবাদ করা হয়েছে ধর্ম নিরপেক্ষ। শব্দটির উত্‍পত্তি হয়েছে বৃটেনে। ধর্ম বিহীন জীবন যাপনে বিশ্বাসীরা রাজা বা রাস্ট্রকে বুঝিয়েছেন যে রাস্ট্র বা রাজার কোন ধর্ম থাকতে পারেনা। সেই শব্দটি কালক্রমে আমাদের দেশে চালু হয়ে গেছে।
পাঠক সমাজ প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, আমি ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি দেখছি। না, জগতের সকল ধর্ম ও মত স্বীকার করে যে মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব বা সেরা সৃষ্টি। মানুষের জন্যেই এ জগত সৃষ্টি করা হয়েছে। শব্দই হচ্ছে ব্রহ্মা। তিনি ও্ঁকার ধ্বনি দিয়েই জগত সৃষ্টি করেছেন। জগতে যত ভাষা আছে সব ভাষাই খোদার বা স্রষ্টার। সেই ভাষাতেই মানুষ নিজেকে প্রকাশ করে। জগতে যত খোদায়ী কিতাব আছে তা প্রকাশিত হয়েছে শব্দ আর ভাষার মাধ্যমে। যারা ভাষাবিদ তাঁরা মনে করেন ভাষা কালক্রমে মানুষের চেষ্টাতেই তৈরি হয়েছে। যে ভাবেই হোক না কেন, বুঝা গেল মানুষের জন্যে ভাষা অপরিহার্য। ভাষার মাধ্যমেই মানুষ মত প্রকাশ করে ,লেনদেন করে। ভাষার মাধ্যমেই মানুষ তাঁর ইচ্ছা অনিচ্ছার কথা বলে।
প্রাচীন যুগে যখন রাজা বাদশাহরা ছিলেন না তখন ও মানুষ গোত্র বা কৌম বা কওম ভুক্ত হয়ে থাকতো। নিজদের ভিতর নিজেরাই কওমের নিয়ম কানুন তৈরি করে জীবন যাপন করতো। এর পরে রাজা বা বাদশাহ ব্যবস্থা আসে। রাজা বাদশাহরা ও নিয়ম নীতি তৈরি করে দেশ ও প্রজাদের পরিচালনা করতেন। এর ভিতর অত্যাচারী বাদশাহরাও ছিলেন। যেমন ফেরাউন, নমরুদ, জার, সিজার। আধুনিক যুগেও আমেরিকার মতো অত্যাচারী সন্ত্রাসী অত্যাধুনিক রাস্ট্র আছে। আবার আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহরাও জনগণের অধিকারকে স্বীকার করেননা। সউদী আরবে কোন গণতন্ত্র নেই। আবার চীন বা মায়ানমারেও গণতন্ত্র নেই। এরা সবাই কিন্তু জাতিসংঘের সদস্য। আমেরিকা গণতন্ত্র কায়েমের জন্যে ভিন দেশ আক্রমণ করে ব্যাপক হারে মানুষ হত্যা করে। আমেরিকাই বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছে গণতন্ত্র, মানবতাবাদ ও কথা বলার অধিকার একটা শ্লোগান মাত্র। আসল কথা হলে শক্তি। এক সময় গণচীন বলতো ‘পাওয়ার কামস আউট অব ব্যারেল অব গান। মানে বন্দুকই ক্ষমতার উত্‍স। চীনে গণতন্ত্র নেই,তবুও আমেরিকা চীনের সাথে গভীর বন্ধুত্বে আগ্রহী। সউদী আরবে চলছে রাজতন্ত্র বা বাদশা্হী। সেদেশের বাদশাহর সাথে আমেরিকার রয়েছে গভীর বন্ধুত্ব। এর মানে গণতন্ত্র ও মানবতা বড় কথা নয়। সবকিছুই আমেরিকার স্বার্থ। তবে একথা স্বীকার করতে হবে যে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশ গুলোতে মত প্রকাশের অধিকার আমাদের চেয়ে হাজার গুণ বেশী, যদিও সেখানে  রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র সহ সকল প্রকার প্রচার মাধ্যমকে কর্পোরেট হাউজ গুলো নিয়ন্ত্রন করে। এসব হাউজও নাকি আমেরিকার সরকার গুলোকেও নিয়ন্ত্রন করে। বাংলাদেশ গরীব দেশ। রাজনীতিকরা ওয়াদা করেছিলেন সেনার বাংলা উপহার দিবেন। না, আমরা সেনার বাংলা পাইনি। ৭৪ সালে টিসিবি কর্তৃক মহান ভারত থেকে আমদানীকৃত সুন্দরী শাড়ি নিয়ে জাতীয় মজাদার আলোচনা হয়েছিল। সংসদে এর নাম দেয়া হয়েছিল সোনার বাংলা শাড়ি। সুন্দরী শাড়ি ছিল দশহাতি। পুরো শরীর ঢাকা যেতোনা। ওই শাড়ি পরলে ভিতরের সবকিছু দেখা যেতো। ওই সময়েই বাসন্তীর জন্ম হয়েছিল। সে শাড়ির অভাবে জাল পরেছিল। সে ছবি ছাপা হয়েছিল ইত্তেফাকে। মহান ভারত বললাম এ কারণে যে , বন্ধুদেশ নিয়ে এখন কোন মন্দ কথা বলা যাবেনা। বন্ধুদেশ নিয়ে লেখার অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে একবার মামলা হয়েছিল। যে কোন মন্দ আইন থাকলেই পুলিশ থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চ পর্যায় নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। ভারতে সম্প্রচার নীতিমালা বা প্রেস এন্ড পাবলিকেশন আইন চালু হয়েছে বৃটিশ আমলে। বৃটিশ আইনের মূল লক্ষ্য ছিল পরাধীন নাগরিকদের কঠোর নজরদারী ও নিয়ন্ত্রণে রাখা । সে আইন এখনও ভারত ,পাকিস্তান ও বাংলাদেশে চালু আছে। কোন সরকারই ওই সব আইকে গণমুখি করেনি, বরং নিবর্তন মূলক আইন দিন দিন বেড়ে চলেছে। বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নাগরিকদের শাস্তি দেয়ার জন্যে ৭৪ সালে স্পেশাল পাওয়ার এ্যাক্ট করেছেন। বৃটিশ আমলে করা নিবর্তন মূলক আইন ৫৪ ধারা এখনও জারী আছে। এই আইনের দ্বারা পুলিশ বা সরকার যে কোন নাগরিককে কোন কারণ না দেখিয়ে গ্রেফতার করতে পারেন। বিশেষ ক্ষমতা আইন বলে যে কোন নাগরিককে আটক করে বিনা বিচারে আটক রাখতে পারে। রাজনীতিতে অসত্য বা মিথ্যা একটি বড় অস্ত্র বা হাতিয়ার । এর মাধ্যমে জগতবাসী, দেশবাসী ও জনগণকে সহজেই বিভ্রান্ত করা যায়। অসত্য বা মিথ্যা কথা বলে ক্ষমতায় আসা যায়। মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করা আমেরিকা বা তার মিত্রদের ধর্মে পরিণত হয়েছে। লোকে বলে নিজেরাই টুইন টাওয়ার ধ্বংস করে বিশ্বব্যাপী অশান্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। গণ বিধ্বংসী মারণাস্ত্র আছে অভিযোগ করে সাদ্দামকে হত্যা করেছে, ইরাকের লাখ লাখ মানুষকে খুন করেছে। সেই ইরাক আজও অশান্ত এবং প্রতিদিন সেখানে মানুষ মারা যাচ্ছে। সেই অশান্তি সারা আরবে  ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনীতিতে মিথ্যা বলা নিজ দেশের মানুষ বা বিদেশীদের বিভ্রান্ত করা এখন আমেরিকার ব্যবসা।  বিশ্ব ব্যাপী যাঁরা দেশপ্রেমিকরা আজ কোনঠাসা। বংগবন্ধু সোনার বাংলা গঠণের কথা বলে দেশবাসীকে তাঁর সাথে থাকার জন্যে বা তাঁকে ভোট দেয়ার জন্যে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। দেশের মানুষ দরাজ দিলে ১৯৭০ সালে তাঁর দলকে ভোট দিয়েছেন। তেমন কোন বড় দল সেই নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেনি। তিনি বলেছিলেন দশ টাকা মন দরে চাল দিবেন। ছাত্রদের জন্যে ছয় আনা দামে কাগজ দিবেন। না এর কিছুই তিনি করতে পারেননি। বরং ৭৩এর নির্বাচনে তাঁর লোকেরা ভোটের বাক্স লুট করেছেন। ৭৪এ দেশে দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ৭৫এ এসে তিনি এক দলীয় রাজনীতি চালু করে তিনি শত শত সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সে সময়ে বংগবন্ধুর সরকার হাজার হাজার দেশপ্রেমিক যুবককে হত্যা করেছে। আওয়ামী লীগের লোকেরা এসব সত্য সব সময় অস্বীকার করে এসেছে। বংগবন্ধু একদল করেছিলেন ভিন্নমতকে জোর করে দমিয়ে রাখার জন্যে। তিনি হয় মনে করতেন ভিন্নমত না থাকলে দেশের উন্নতি হবে। তিনি কখনই সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন না। শুধুমাত্র কিছু দেশ ও কিছু লোককে সন্তুষ্ট করার জন্যে সমাজতন্ত্রের কথা বলতেন। সস্তা জনপ্রিয়তার জন্যে তিনি সব সময় যা বিশ্বাস করেন না তা বলতেন। আওয়ামী লীগ কখনই সমাজতান্ত্রিক দল ছিলনা। শেখ সাহেব সিপিবি, জাসদ সহ সকল বামপন্থি দলের লোকদের হত্যা করেছেন। সেদিক থেকে শেখ হাসিনা অনেক বুদ্ধিমতি। তিনি পিতার শত্রুদের দলে টেনে নিয়ে নিজের অধীনে রেখে ব্যবহার করছেন। লোকে বলে তাঁর কেবিনেটের মূল মন্ত্রীরাই হচ্ছেন বাম ঘরাণার লোক। এঁরাই তাঁকে বুদ্ধি দেয়।
বংগবন্ধু সরাসরি প্রকাশ্যে একদল করে ভুল করেছিলেন। হাসিনা সে ভুল করছেন না। তিনি ঘোষণা দিয়ে একদলীয় শাসন চালু করে বাকশালের মতো দেশ চালাচ্ছেন। তাঁর পিতা দমন করে বিরোধী দলকে ভীত সন্ত্রস্ত করে রেখেছিলেন। এখন হাসিনা বিরোধী দলের কঠোর দমননীতি চালাচ্ছেন। ২০১৩ সালে শত মানুষকে হত্যা করে বিরোধী দলের উপর দোষ চাপিয়েছেন। বিরোধী দলের রাজনীতি শুদ্ধ কি অশুদ্ধ বা ভুল কিনা সে নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বিরোধী দলকে সন্ত্রাসী বলে গালাগাল দেয়া ঠিক হচ্ছে কিনা সে নিয়ে সকল মহলেরই ভাবা দরকার। হয়ত শেখ হাসিনাকে হয়ত কেউ বুদ্ধি দিয়েছেন যে, কঠোর দমননীতি অবলম্বন করলে বিরোধী মত ও দল আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যাবে। এ ধরণের নীতি পাকিস্তানে আইউব খান, ইয়াহিয়া খান, ভারতে ইন্দিরা গান্ধীও গ্রহণ করেছিলেন। আজ আর সেই পাকিস্তান নেই। দমননীতি দ্বারা যে কোন দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হয়। স্বৈর শাসকরা এ বিষয়টা কখনই বুঝতে চায়না। ইন্দিরা গান্ধীও সিভিল ডিক্টেটর ছিলেন। তিনি গণতন্ত্রের নাম নিয়ে দেশবাসীর সাথে প্রহসন করতেন। তারই ভন্ডামীর কারণে আজ কংগ্রেসের এমন করুণ অবস্থা হয়েছে। বাংলাদেশ সউদী আরব বা মায়ানমার নয়। এ ধরণের দেশে গণতন্ত্র থাকেনা, তাই সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নও আসেনা। দমন নীতিকেই শাসকরা ক্ষমতার উত্‍স বলে মনে করেই জনগণকে বাধ্য রাখে কিছুকালের জন্যে।
আপনারা প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স এ্যাক্ট এর ইতিহাস পড়ুন। পাকিস্তান আমলে এমন কি আইউবের আমলেও ডেপুটি কমিশনাররা পত্রিকার ডিক্লারেশন দিতে পারতেন। এখন তারা তা পারেননা। পত্রিকার ডিক্লারেশনের ব্যাপারে ডিসি অফিস শুধুমাত্র পোষ্ট অফিসের ভুমিকা পালন করেন। আমি নিজেই এ অভিজ্ঞতার অধিকারী। ওই এ্যাক্টের দাদা পরদাদা হলো বৃটিশ প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স এ্যাক্ট। এখন পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি জন্যে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত ছুটতে হয়। মাঝখানে থাকে এসবি, এনএসআই, ডিজিডিএফআই সহ নানা ধরণের এজেন্সী। পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি পাওয়া গেলেও আপনাকে সরকারী বিজ্ঞপনের তালিকাভুক্ত করা হবেনা। সে ক্ষেত্রেও নানা এজেন্সীর ক্লিয়ারেন্স লাগে।
এখনতো অনলাইন পত্রিকা, স্যোসাল মিডিয়া, রেডিও, টেলিভিশন, ফেসবুক, ইউটিউব,টুইটার ইত্যাদি প্রকাশ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বহুকাল ধরেই পত্রিকা সহ বিভিন্ন প্রকাশ মাধ্যম স্বআরোপিত সেন্সরশীপ চালিয়ে যাচ্ছিল। সবাই মনে করে মত প্রকাশের চেয়ে পত্রিকাকে বাঁচিয়ে রাখা অনেক বেশী জরুরী। আমার দেশ, দিগন্ত টেলিভিশন ও মাহমুদুর রহমান এর জ্বলন্ত উদাহরণ।
যেমন পুলিশ আইনের তেমন কোন পরিবর্তন সংস্কার আজও হয়নি। এ ব্যাপারে দলই এক রকম । ক্ষমতায় গেলে গণ বিরোধী নিবর্তন কোন আইনেরই সংস্কার হয়না। তখন সব দলই ভাবে কিভাবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার কথা বলে নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করা যায়। চলমান সরকার ওই মনোভাবের কারণেই একটার পর একটা গণবিরোধী আইন করে চলেছে। তারই বহি:প্রকাশ ঘটেছে নতুন সম্প্রচার নীতিমালায়। নীতিমালা ঘোষণা করে সরকার তার মনের ভিতর পুষে রাখা গোপন মনোভাবকে প্রকাশ করে ফেলেছে। জগতের সকল স্বেচ্ছাচারী( অটোক্রেট/ডিক্টেটর) সরকার বা শাসক হোক সিভিল অথবা সামরিক দমননীতির বা জুলুমের মাধ্যমেই জনগণকে অধিকার হীন করে রাখতে চায়। ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচনের মাধ্যমেই সরকার প্রমান করেছে জনমতের কোন প্রয়োজন নেই বা জনমতকে তোয়াক্কা করার কোন দরকার নেই। যে কোন ভাবেই হোক সংসদে দুই তৃতীয়াংশ সিট বা সদস্য সংখ্যা থাকলেই যে কোন সরকার যা ইচ্ছা তাই করতে পারে এমন একটি ধারণা জনমনে ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে। মিশরের মোবারক, ফিলিপাইনের মার্কোস, ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো, সিরিয়ার আসাদ তথাকথিত গণতন্ত্রের নমুনা। জেনারেল আইউব ও দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার জন্যে বেসিক ডেমোক্রেসী চালু করেছিলেন। তিনিই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্ধীদের রাজনীতি থেকে নির্বাসনে দেয়ার জন্যে এবডো বা প্রোডা আইন চালু করেছিলেন। মিশরের দিকে একবার তাকান, জেনারেল সিসি(লোকে বলে তিনি নাকি ইহুদী সন্তান) নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেই দেশের তথাকথিত নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েছেন।এই ভদ্রলোক এখন ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে ইজরায়েলকে সমর্থন করছে। সউদী বাদশাহও সিসিকে সমর্থন দিচ্ছেন। বাদশাহ সউদী আরবে ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলা নিষিদ্ধ করেছেন।
বংগকন্যা মহান শেখ হাসিনা যদি তাঁর দৃষ্টিতে দেশের ভালোর জন্যে এবডো, প্রোডা আইন করেন দেশবাসীর বলার কি আছে? গণতন্ত্রের হিসাবে সংখ্যা তত্বের ভিত্তিতে মহান সংসদে তাঁর একশ’ ভাগ ক্ষমতা আছে। আমাদের দেশে এখন মহান শব্দটির ব্যবহার বেড়েই চলেছে। বলতে হবে মহান সংসদ, মহান সেনা বাহিনী, মহান আদালত, মহান রাষ্ট্রপতি, মহান বংগমাতা, মহান বংগপিতা, মহান বংগভ্রাতা ও দেশবাসী চালু করতে পারেন। মোঘল বাদশাহরা, রোমের সিজাররা, মিশরের ফেরাউনরা নানা ধরণের সম্মান সুচক খেতাব ব্যবহার করতেন। বৃটিশ আমলেও ছিল। পাকিস্তান আমলেও ছিল। বাংলাদেশেও আছে। কয়েকদিন আগে এক ভদ্র বাংগালী মহান ভারত থেকে ‘পদ্মভূষণ’খেতাব নিয়ে এসেছেন। বাংগালী বললাম এ কারণে যে , তিনি বাংলাদেশী হতে চান না।


আজানের সুর ও কিছু অসুর / এরশাদ মজুমদার

জানিনা সবাই পড়েছেন বা শুনেছেন কিনা? তবে ঈদের বিশেষ সংখ্যা প্রথম আলো’র সম্পাদক সাহেব নিশ্চয়ই পড়েছেন ও প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেই সৈয়দ সাহেবের ‘মরা ময়ুর’ নামের একটি কাব্যনাট্য বা নাট্য কাব্য প্রকাশিত হয়েছে। সৈয়দ সাহেব ভোরের কাককে আহ্বান করেছেন খুব জোরে কা কা করতে যাতে মুয়াজ্জিনের আজানটা যেন ডুবে যায় বা শোনা না যায়। সৈয়দদের ধর্মীয় কারণে আমাদের দেশের মানুষ এখনও সম্মান করে। সৈয়দ মানে নেতা বা ইমাম। রাসুলে করীম(সা) এর বংশধরদেরও সৈয়দ বলা হয়। হিন্দুদের ব্রাহ্মণদের মতো। তাঁর নামের অর্থ সত্যের সূর্য। আমরা সত্যের আলোও বলতে পারি। সৈয়দ সাহেব বাংলাদেশের একজন নামজাদা কবি ও ঔপন্যাসিক। আওয়ামী মহলে তাঁর দাম তোলায় তোলায়। বলা যেতে পারে তিনি আওয়ামী ঘরাণার ব্রাহ্মণ কবি ও বুদ্ধিজীবী।
দেশের মানুষ আরবী নামের কারণে তাঁকে একজন অতি সম্ভ্রান্ত মুসলমান মনে করতে পারেন। এ ধরণের মুসলমানকে আবার দিল্লী খুব পেয়ার করে। পদক দেয়। ক’দিন আগে ভারত থেকে আগত একজন আরবী নামধারী বুদ্ধিজীবী পদ্মভূষণ লাভ করেছেন। যদিও আমাদের মানে বাংলাদেশের সংবিধানে বিদেশী সম্মান গ্রহন নিষিদ্ধ রয়েছে বা মহামান্য রাস্ট্রপতির অনুমোদন নিতে হয়। আমাদের দেশে রাজনৈতিক কারণে মহামান্য সাহেব মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামীকে ক্ষমা করে দেন। পদ্মভুষণ গ্রহণের অনুমতি তিনিতো দিবেনই। যদিও কেন তিনি এই মূল্যবান পদক পদ্মভুষন পেয়েছেন তা দেশবাসী জানেন না। বুদ্ধিজীবী সাহেবের বাপ দাদার বাড়ি ভারতে ছিল। প্রতিবেশী দেশপ্রেমিক ও অসাম্প্রদায়িক বন্ধুদের দাংগার কারণে মাতৃভুমি ছেড়ে মুসলমানদের দেশ পাকিস্তান চলে এসেছিলেন আত্মীয় স্বজন সবাইকে নিয়ে। এখনতো আর পাকিস্তান নাই। এখন তাঁরা সবাই আবার মুসলমান পরিচয় ঝেড়ে ফেলে দিয়ে খাঁটি বাংগালী হয়ে গেছেন। সৈয়দ সাহেবেরও স্তান শব্দটা পছন্দ নয়। যদিও তিনি স্তান আমলেও একজন পেয়ারা নাগরিক ছিলেন। কাকের কা কা শব্দের জোরে তিনি আজানকে স্তব্দ করতে খায়েশ প্রকাশ করেছেন। সাথে তিনি মরা ময়ুর কাহিনীতে তাঁর কল্পনার একজন ম্যডাম নামের এক চরিত্রকে উপস্থাপন করেছেন। কল্পনার ম্যাডামকে অভিযুক্ত করেছেন নয়াস্তান বানাবার কাল্পনিক চেষ্টার জন্যে। ম্যাডাম শব্দটা নিয়ে এর আগেও সৈয়দ সাহেবের ঘরাণার লেখক বুদ্ধিজীবীরা অনেক কথা বলেছেন। এক সরকারী কবি এই বিষয়ে লিখে নাম কামিয়ে বাংগালীয়ানার সোল এজেন্ট আওয়ামী আমলে পুরস্কৃত হয়ে উচ্চ পদে আসীন হয়েছেন। ধাঙড় কন্যা বা স্ত্রীকে সৈয়দ সাহেব ম্যাডাম হিসাবে কল্পনা করে কাব্য রচনা করেছেন। তাঁর এই ম্যাডাম নাকি সংবিধানের সব কটা পৃষ্ঠা খেয়ে ফেলবেন। এবার শুনুন সৈয়দ সাহেবের ভাষায়:
‘ আমি থুতু দিই জনতার মুখে
যত আছে ভুখা নাঙা,
জানিসনে তোরা আমার স্বপ্ন
ওই নৌকার হাল ভাঙা!
মুক্তিযুদ্ধ, সোনার স্বদেশ, স্বপ্নের সব বাড়ি-
ভেঙে ফেলি আমি
লাথি মারি -লাথি মারি!
আরও কী?
ইতিহাস আমি চিবিয়ে চিবিয়ে
থেঁতো করে তবে ছাড়ি!
হঠ যাও সব, হট যাও!
তফাত তফাত হো যাও!
দেখো মেরি জান,
হামারি হাত ছে ক্যায়সে বানাউঁ
দেশ মে নয়াস্তান।
ফির নারা লাগায়া! ফির শ্লোগান!
হল্ট মেশিনগান’।
সৈয়দ সাহেব আবার খেলারামের উস্তাদ। তিনি সকল রকম কামের গুরু। তিনি কামদেব। তিনি শতযোনি সৃষ্টি করেও কন্যাকে কুমারী রাখতে পারেন। বাংলাদেশের সাহিত্যে লীলা খেলার জনক। তাই আওয়ামী ঘরাণায় তিনি পূজনীয় কবি ও সাহিত্যিক। মরা ময়ুর কাব্যনাট্যে তিনি আরও যত কামকর্মের বর্ণনা দিয়েছেন আমি তার উল্লেখ করলাম না। পাঠকগণ প্রথম আলোর বিশেষ সংখ্যাটি বেশী দামে কিনতে পারেন অথবা যাঁরা কিনেছেন তাঁদের কাছ থেকে ফটোকপি করতে পারেন। এতে প্রথম আলোর প্রচারও বাড়বে। তবে কবিতা বা বিমূর্ত শিল্পকর্মের বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা অবশ্যই থাকতে পারে। সেদিক থেকে আমার ভাবনার সাথে সৈয়দ সাহেবের ভাবনার মিল নাও থাকতে পারে।
আরেকজন সৈয়দ সাহেব আছেন যাঁর বাপদাদারা ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন মুসলমান হিসাবে। তিনি একজন নামজাদা অভিনেতা। মঞ্চ, সিনেমা, নাটক, সংস্কৃতি ,রাজনীতি
সবখানেই তিনি পাকা অভিনেতা। বাংলাদেশে কিছু হলেই তিনি এবং তাঁরা পূর্ব পুরুষের দেশে চলে যান। কি কারণে তাঁরা তাঁদের মাতৃভুমি ভারত মাতা ছেড়ে এদেশে চলে এসেছিলেন তা এখন আর বলতে চান না। যাঁরা একবার নিজ মাতৃভুমি ত্যাগ করতে পারেন তাঁরা বার বার দেশত্যাগ করতে পারেন। ৪৭ এর আগে পরে যাঁরা মাতৃভুমি ছেড়েছেন তাঁরা আসলেই রুটলেস বা শিকড়হারা। তাঁরা এখন একেবারেই আদি অকৃত্রিম বাংগালী হওয়ার কাজে নিবেদিত আছেন। ভারতও বাংলাদেশকে ষোলয়ানা বাংগালীদের রাষ্ট্র হিসাবে দেখতে চায়। এখানকার মুসলমানেরা যেন কখনই মুসলমান না ভাবতে পারে সেজন্যে শিকড়হীন সৈয়দদের কাজে লাগাচ্ছেন। ভারতের বক্তব্য হলো যদি তোমরা মুসলমানই থাকতে চাও তাহলে পাকিস্তান ছাড়লে কেন? আমরাতো তোমাদের স্বাধীন করে দিয়েছি খাঁটি বাংগালী হওয়ার জন্যে।
প্রথম আলো সম্পাদক মতি সাহেব এর আগে আজে বাজে জিনিষ ছাপিয়ে বায়তুল মোকাররমের খতিব সাহেবের কাছে গিয়ে তওবা করেছেন। প্রথম আলো বা একই বংশীয় বা গোত্রীয় লোকজন ও প্রতিষ্ঠান একটি ধর্মমুক্ত বা ধর্মহীন সমাজে বিশ্বাস করেন। এতে কারো কোন আপত্তি বা ওজর থাকার কথা নয়। এমন কি প্রথম আলো যদি ঘোষণা দেয় যে, প্রত্রিকাটি কোন ধর্মে বিশ্বাস করেনা। তাই ধর্মহীন একটা সমাজ প্রতিষ্ঠার দর্শন বা আদর্শ নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন। আমি মনে করি সে অধিকার তাঁদের আছে। মতি সাহেব একদা বাম চিন্তাধারার নেতা ছিলেন। এখন পুঁজিপতিদের সেবা করেন। তাঁর কাগজের( ফার্স্ট লাইট মানে যিশু)মালিক বৃটিশ আমলের খানদানের ওয়ারিশ। ওই খানদানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন একজন পেশকার। সাহেবেরা বলেন, পিএ বা পিএস। পরে তাঁরা নবাব বাহাদুর, খান বাহাদুর,খান সাহেব হয়েছেন। মালিক সাহেবের সাথে নাকি কোন এক উলফানেতার আত্মীয়তা রয়েছে।
আজান বা আযান শব্দটি আরবী। এর মানে আহবান করা, ডাক দেওয়া, অবহিত করা বা ঘোষণা দেওয়া। আজান চালু হয়েছে পহেলা হিজরী সনে মদিনায়। প্রার্থনার সময় হলে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বিভিন্ন ভাবে প্রার্থনার জন্যে আহবান। মুসলমানদের সালাত বা নামাজের আগেও এই আহবানের ব্যবস্থা ছিল। ভারতের হিন্দুরা ঘন্টা বাজিয়ে পূজা বা প্রার্থনার আহবান জানায়। উলু ধ্বনিও দেয়। শাঁখের আওয়াজও দেয়। ঢোল বাজায়। নাসারা বা খৃষ্টানদের গীর্জা থেকে নকুশ বা ঘন্টা বাজানো হয়। জুডায়িষ্ট বা ইহুদীরা শিংগায় ফুক দেয়। নবীজী(সা) আজানের সুমধুর ডাকের ব্যবস্থা করেন । যিনি আযান দিবেন তাঁর পদবী বা পদের নাম হলো মুয়াজ্জিন। ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হলেন হজরত বেলাল(রা)। তাঁর সুমধুর কন্ঠের ধ্বনি আজও বিশ্বে জারী রয়েছে। প্রতিদিন বিশ্বের লাখ লাখ মসজিদে পাঁচবার আজান দেয়া হয়। আজানের মধুর সুর শোনার জন্যেই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, মসজিদের পাশে আমার কবর দিও। কবরে শুয়ে আমি যেন সুমধুর আজানের ধ্বনি শুনতে পাই। আল্লাহপাক নজরুলের মুনাজাত শুনতে পেয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশেই শুয়ে আছেন। আল্লাহপাকের দরবারে কোটি কোটি শোকর। আমিতো মনে নজরুল ছিলেন একজন দরবেশ কবি। তাই মহান আল্লাতায়ালা তাঁর কথা শুনেছেন। সেই আজান সম্পর্কে সৈয়দ সাহেবের আকুতি কাকের কাছে। কাক যেন আজানের আওয়াজকে ডুবিয়ে দেয়। আজানের সুর নিয়ে এর আগেও বাংলাদেশের বেশ ক’জন বুদ্ধিজীবী আজে বাজে মন্তব্য করেছেন। তাঁদের অনেকেই জগতে নেই। আজান চলছে। খোদার হুকুমে আগামী দিনেও চলবে। সৈয়দ সাহেব আজানের উপর এত ক্ষ্যাপা কেন দেশবাসীর মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। তিনিতো সৈয়দ বংশর লোক। এ নামের বরকতেই হয়ত তিনি আজ সমাজে সম্মানিত। তাঁর কাছে কাকের সুর ভাল লেগেছে। তাই আজানের সুরকে ডুবিয়ে দেয়ার জন্যে কাকের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। আসলে তিনি কি ইসলাম ত্যাগ করেছেন? ইসলাম গ্রহণে কোন জবরদস্তি নেই। কিন্তু কোন মুসলমান যদি ইসলাম ত্যাগ করতে চায় তাকে মোনাফেক সাব্যস্ত করা হবে। মোনাফেকের অবস্থা কাফের( অবিশ্বাসী, সত্য প্রত্যাখ্যানকারী) এর চেয়েও খারাপ। সৈয়দ সাহেবের এ লেখায় বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মে আঘাত লাগতে পারে। তবে তিনি সৌভাগ্যবান যে, বিনা ভোটে নির্বাচিত ক্ষমতাসীন সরকার ধর্মের ব্যাপারে তেমন আগ্রহী নয়।
আজান বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মানুষের ধর্মীয় আচার ও বিশ্বাসের সাথে জড়িত। আজান শুনেই নামাজীরা মসজিদে যান বা ঘরে বসে নামাজ কায়েম করেন। সেই ৯০ ভাগ মানুষের ধর্মীয় অনুভুতিকে নিয়ে নিয়ে তিনি মসকরা করেছেন। আমি জানি, আমার এ লেখার বিষয় নিয়ে সৈয়দ সাহেবের ভক্তরা আমাকে গালমন্দ করবেন।
ধর্মের অধিকারের বিষয়টা জাতিসংঘের সনদে স্বীকৃত ও সংরক্ষিত। তবুও এ জগতে বহু পরধর্ম অসহিষ্ণু ও সাম্প্রদায়িক দেশ ও সরকার আছে যারা আজান ও কোরবানীকে নিয়ন্ত্রন করতে চায়। ভারতে বহু এলাকা আছে যেখানে মাইকে আজান দেয়ার অনুমতি নেই। ভারতে বহু এলাকা আছে যেখানে মসজিদ গুলোতে তালা ঝুলছে। ৪৭এর পরে সেসব এলাকা মুসলমান শূণ্য হয়ে গেছে। আমি একবার হজরত মোজাদ্দেদ আলফসানীর মাজারে গিয়েছিলাম। নামাজের ওয়াক্তে আজান দেয়া হয়না। কারণ সেখানে এখন হাতে গোণা কয়েকজন মুসলমান আছেন। বিরাট মসজিদ, কিন্তু নামাজী নাই। মোজাদ্দেদ আলফ সানী সাহেবই ইসলামের পূণর্জাগরণের জন্যে দিল্লীর বাদশা্দের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। বাদশাহ আকবর যে দ্বীনে ইলাহী চালু করার চেষ্টা করেছিলেন তা জারী থাকলে ভারত থেকে ইসলামের নিশানা মুছে যেতো।
ধর্মীয় কারণেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বিজয়ী শক্তি ইহুদীদের খুশী করার জন্যে ১৯৪৮ সালে ইজরায়েল নামক একটি ধর্মীয় রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। সেই থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি নির্বাসিত হয়েছে। সীমাহীন দু:খ ও বেদনার বিষয় হলো গাজায় চলমান গণহত্যায় সউদী আরব ও তার মিত্ররা ইজরায়েলকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এটা ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাসে একটি কলংকিত অধ্যায় হিসাবে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে। গাজায় গণহত্যায় ওআইসি কেন নিন্দা জানাতে পারেনি মহাসচিব বিবৃতি দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি সুস্পষ্ট করেই বলেছেন সউদী বাদশাহ ইসলামী বিপ্লবের ভয়ে ফিলিস্তিনীদের সমর্থন করেন না। আমার অন্তরে ভয় জেগেছে যে, সউদী বাদশাহরা আর কতদিন নিজেদের রক্ষা করতে পারবেন।
সোভিয়েত রাশিয়া ও গণচীন সহ সমাজতান্ত্রিক ব্লকের বহু দেশে বহুকাল ধরে ইসলাম সহ বহু ধর্ম নিষিদ্ধ ছিল। সংযুক্ত রাশিয়া ভেংগে যাওয়ার পর মসজিদের দুয়ার গুলো আবার খুলে যায়। মুসলমানেরা আবার ধর্ম চর্চা শুরু করেন। চীনে এখনও মুসলমানদের উপর অত্যাচার চলছে। এ বছরের রোজা রাখার ব্যাপারে বাধা সৃষ্টি করেছে চীন সরকার। চীনের উইঘুরের মুসলমানদের উপর উপর সীমাহীন অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। রোমে গিয়ে দেখেছি সেখানে একটি ইসলামিক সেন্টার আছে যার ভিতরে একটি মসজিদ আছে। মসজিদ নাম দিয়ে সেখানে কোন নামাজ ঘর করা যাবেনা। তবে আশার কথা হলো ইউরোপ ও আমেরিকা এ ব্যাপারে লিবারেল। সেখানে মুসলমান বাড়ছে এবং সাথে সাথে মসজিদও বাড়ছে। বৃটেনে পুরাণো গীর্জা বিক্রি হচ্ছে। মুসলমানেরা গীর্জার জায়গা ক্রয় করে মসজিদ বানাচ্ছেন। মুসলমানেরা ইসা নবীকে(আ) যেভাবে সম্মান করে খৃষ্টবাদে বিশ্বাসীরা সেভাবে সম্মান করেনা। তারাই ইসা নবীর(আ) নামে আজে বাজে বই লেখে ও সিনেমা বানায়। লাষ্ট টেম্পটেশান তার জলন্ত উদাহরণ। ইসা নবী(আ) মুসলমানদের বিশ্বাসে অংগ। যে কোন মুসলমানকেই ইসা নবীকে(আ) সম্মান করতেই হবে। তবে এ কথা সত্যি যে, বাংলাদেশে গুটি কতক বুদ্ধিজীবী আছেন যাঁরা মাঝে মধ্যেই ধর্ম সম্পর্কে, বিশেষ করে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে আজে বাজে কথা বলে থাকেন। কিছু বুদ্ধিজীবীকে মারা যাওয়ার পর শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হয়। নীরবতা পালন করে তাঁদের প্রতি সম্মান দেখানো হয় আর রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করা হয়। এটা নাকি ধর্ম নিরপেক্ষ বা ধর্মহীনদের শেষকৃত্যের নমুনা। আমাদের শহীদ মিনার নাকি সেক্যুলারিজমের কেন্দ্র। অনেকেই নাকি অছিয়ত করে যান তাঁদের জানাজার নামাজ না পড়ানো হয়। এসব অনুষ্ঠানে আমাদের মন্ত্রী সাহেরাও অংশ গ্রহণ করেন। বংগবন্ধুর আমলেই দাউদ নামের এক কবি ধর্মের বিরুদ্ধে কলম ধরে দেশ থেকে নির্বাসিত হয়েছেন। বংগবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন দাউদকে দেশে রাখলে ঝামেলা হতে পারে। একই ভাবে তসলিমা নাসরিন ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধ বলে বিদেশে খ্যাতি লাভ করেছেন। এখনও তিনি মাঝে মধ্যে আজে বাজে কথা বলে খবরের কাগজে স্থান করে নেন। বর্তমান আওয়ামী লীগ আমলেও তসলিমা নিজ মাতৃভুমিতে ফিরে আসছেন না।এর রহস্য কি তা তসলিমা নিজেই ভাল জানেন।
আজানের প্রসংগে আবার ফিরে আসি। আজান চালু করেছেন জগতনবী হজরত মোহাম্মদ(সা)। তিনিই আমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব আল কোরআন পেশ করেছেন। তাঁর কাছেই মানব জাতি ইসলামের কথা শুনেছে। হজরত আয়েশা(রা) বলেছেন, আল্লাহর রাসুল হচ্ছেন জীবন্ত কোরআন। আল্লাহপাক নিজেই বলেছেন, তোমরা আমার রাসুলকে(সা) ভালবাস,তাহলেই আমাকে ভালবাসা হবে। আমার রাসুলের(সা) নির্দেশিত পথে চলো। নবীজীকে আল্লাহপাক স্বয়ং জগতের রহমত বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আলকোরআন জগতবাসীর জন্যে শেষ কিতাব আর নবীজী হচ্ছেন শেষ নবী ও রাসুল। নবীজীর নির্দেশিত পথ হচ্ছে সালাত বা নামাজের সময় হলে মসজিদের মিনারে আজান দিয়ে আহবান জানানো হবে। সেই আজান সম্পর্কে বিদ্রুপ করার অর্থ কী? আর প্রথম আলোই কী ভাবে এমন একটি লেখা প্রকাশ করলেন? হঠাত্‍ কেন তিনি আজানের শব্দকে ডুবিয়ে দিতে কাককে আহবান জানালেন? বাংলাদেশের জ্ঞানী গুণীজনদের কাছে আমার আকুল আবেদন, আপনারা ধর্ম পালন না করুন এতে কারো কিছু বলার নেই। দয়া করে ধর্মে বিশ্বাসীদের মনে আঘাত দিয়ে কিছু লিখবেন না, কিছু বলবেন না। আপনাদের যদি কোন আদর্শ বা ধর্ম থাকে তা প্রচার করুন, কেউ আপনাকে বাধা দিবেনা। কিন্তু নিজের মত, আদর্শ বা ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে অন্যের ধর্মকে নিয়ে বিদ্রুপ করা নীতিবান লোকের কাজ নয়।
লেখক: কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
http://www.humannewspaper.wordpress.com

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 305 other followers