হজরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ( সাবেক জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর) একটি বিরাট কার্গো কমপ্লেক্স আছে। এই বিমান বন্দর দিয়ে বিদেশ যত কার্গো বা মাল আসে তা কমপ্লেক্সেই রাখা হয়। এখান থেকেই কাস্টমস ফর্মালিটিস সমাধা করে সরকারী পাওনা বা রাজস্ব দিয়ে মাল খালাস করে নিতে হয়।
সারা বিশ্বে কোথাও সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেল গুলোর স্বাধীনতা নেই। যেমন নেই নিরপেক্ষ বলে কোন ধরনের কোন বিষয় এ জগতে। সংবাদপত্র বা টিভি যারা সত্যিকারের মানুষ তাদের কথা বলেনা। যারা এ জগতে মিডিয়ার ষহযোগিতা পেতে চায়, বন্ধুত্ব চায় তারা মিডিয়ার কাছ থেকে কোন সমর্থন পায়না। চলমান জগতে সাতশ’ কোটি মানুষের মধ্যে পাঁচশ’ কোটি মানুষ মৌলিক অধিকারের কাছাকাছি কোথাও পৌঁছাতে পারেনা। এই পাঁচশ’ কোটি মানুষের জন্যে মিডিয়া কখনই কোন কথা বলেনা। এইতো মানবতা বিরোধী ইরাক যুদ্ধের সময় আমেরিকানরা ছয়শ’ এম্বেডেড বা অনুগত সাংবাদিককে প্রশিক্ষন দিয়ে ইরাকে পাঠিয়েছিল তাদের পক্ষে রিপোর্ট পাঠাবার জন্যে। আমেরিকার সরকার ও কর্পোরেট হাউজ গুলো সে দেশের বড় বড় মিডিয়া নিয়ন্ত্রন করে। এখানে জনগণের স্বাধীনতা বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কখনই থাকেনা। সাংবাদিকরা যে ভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা ভাবে সে ধরণের স্বাধীনতা কোথাও নেই। ক’দিন আগে মার্ডক মিডিয়া সাম্রাজ্যের কেলেংকারীর কথা প্রকাশ হয়ে পড়েছে। সেটাও বৃটিশ সরকার ও বড় পুঁজির মালিকদের আভ্যন্তরীন লড়াইয়ের ফল। বারলোসকোনির মিডিয়া গুলো তাঁর দুর্দিনে তাঁর বিরুদ্ধে লিখে সুনাম কুডিয়েছে। এটাও এক ধরনের কৌশল। সেই মিডিয়াই আরেক সময় বারলোসকনির ক্ষমতায় ফিরে আসার ব্যাপারে লড়াই করবে।
সুদুর অতীতে সংবাদপত্রের মালিক থাকতেন জমিদার রাজা মহারাজা ও সম্রাটগণ। সংবাদপত্রে যারা কাজ করতেন তাঁরা হচ্ছেন কর্মচারী। সে যুগ পেরিয়ে আমরা গণতন্ত্রের যুগে এসেছি। পশ্চিমারা দাবী করে তাঁরা গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক। তারাই বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র রক্ষায় নিবেদিত রয়েছে। তাঁদের গণতন্ত্রের নমুনা আমাদের দেশে বা এশিয়া আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে তারা প্রতিস্ঠা করতে চায়। সংবাদপত্র গুলোকেও পশ্চিমারা সেভাবে প্রভান্বিত করে চলেছে। পশ্চিমারাই আমাদের সাংবাদিকদের ট্রেনিং দেয়। যাদের ট্রেনিং দেয় তাদের সারাজীবনের জন্যে অনুগত রাখতে চায়। পশ্চিমা গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ধারণা থেকে আমরা কখনই বেরিয়ে আসতে পারিনি আমাদের ঔপনিবেশিক মানসিকতার কারণে। এ ধরণের মানিকতার কারণেই পশ্চিমারা আমাদের হেয় চোখে দেখে। পশ্চিমাদের অনুসরন না করেই চীনারা আজ জগতের শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্রমনা নয়। ফলে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতাও গণতান্ত্রিক চর্চা করতে প্রায় ভুলে গেছে। পশ্চিমা জগতের প্রায় সব বিখ্যাত কাগজই কর্পোরেট হাউজ গুলোর নিয়ন্ত্রন প্রভাবাধীন রয়েছে। এরা সত্য কথা বলেনা, লিখেনা। ইতোমধ্যে সেখানে তৃতীয় মতের কাগজ ও অনলাইন নিউজপেপার বেরিয়েছে। এসব মিডিয়া জনগণের চাঁদায় চলে। কর্পোরেট হাউজের মালিকাধীন কাগজ গুলোর মুখোশ খুলে দেয়াই এসব ইনফরমাল মিডিয়ার কাজ। আমেরিকা ইউরোপের বিখ্যাত কলামিস্টরা তৃতীয় মতের মিডিয়ায় লিখে চলেছেন। পশ্চিমা দেশের কর্পোরেট হাউজ ও রাজনীতিকদের মুখোশও খুলে দিচ্ছে জনগণের এই মিডিয়া। সত্য তথ্য প্রকাশ করার কারণে উইকিলিকসের প্রতিস্ঠাতা এ্যাসান্জ এখন জেলে আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকরা নিহত হচ্ছেন। নির্যাতনের কথা নাইবা বললাম। কোন সংগঠণ বা সংস্থা সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধ করতে পারেনি। কারণ ধনী কর্পোরেট হাউজ গুলো রাজনীতিকদের সাথে আঁতাত করেই জনগণকে শোষন করে। অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনকে সরকার গুলো কিভাবে দমন করেছে বা এখনও করছে তা আপনারা সবাই জানেন। আমরিকার সাধারন মানুষ দেশের অর্থনীতির মাত্র এক পারসেন্ট নিয়ন্ত্রণ করে। বাকী ৯৯ ভাগ অর্থনীতি কায়েমী স্বার্থবাদী কর্পোরেট হাউজ গুলো নিয়ন্ত্রন করছে। অকুপাই আন্দোলনটি হচ্ছে আমেরিকার সাধারন মানুষের আন্দোলন। চলমান অর্থনীতি কোন ভাবেই আমেরিকার জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত নয়। আমেরিকানরা বুঝতে পেরেছে তাদের পুঁজিপতিরা তাদের কি নির্মম ভাবে শোষণ করছে। রা্ট্র হিসাবে আমেরিকাও তার জন কল্যাণমুখী আদর্শ হারাতে বসেছে। এখন আমেরিকার নেতারা বলতে শুরু করেছেন আগামী শতক এশিয়ার। আমেরিকাকে এশিয়ার দিকেই নজর দিতে হবে। এর মানে হচ্ছে আমেরিকার সরকার তার দেশের পুঁজিপতিদের জন্যে এশিয়ায় নতুন বাজার খুঁজতে মাঠে নিমেছে। তাই আমেরিকা ও তার ইউরোপীয় দোসররা এশিয়ায় নানা ধরণের গোলযোগ সৃস্টি করে চলেছে। একমাত্র চীন ছাড়া এশিয়ার প্রায় সব দেশকে নিজেদের হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। ভারতকে চীনের মোকাবিলা করাবার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। চীন এ ব্যাপারে খুবই সজাগ। কিন্তু ভারতের মিডিয়া এই ব্যাপারে একেবারেই মূর্খ দেশ প্রমিকের ভুমিকা পালন করছে।
৭০ সালের আগে পূর্ব পাকিস্তানের মিডিয়া নিজ অঞ্চলের জনগণের অধিকারের ব্যাপারে অনেক সোচ্চার ছিল। সামবাদিকরাও এ ব্যাপারে অনেক লড়াকু ভুমিকা পালন করেছে। তখন কাগজের মালিকরা আজকের মালিকদের মতো ছিলেন না। রক্ষণশীল পাকিস্তানপন্থী মালিকরাও পূর্ব পাকিস্তানের অধিকারের কথা সোচ্চার গলায় বলেছেন। কিন্তু ৭২ সাল থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের মিডিয়া আর স্বাধীন থাকেনি। মুক্তিযুদ্ধ আর বংগবন্ধুর কথা বলে ছোটখাট সাপ্তাহিক পত্রিকা ছাড়া সব কাগজ সরকারের দালালে পরিণত হয়েছিল। শ্লোগান ছিল এক নেতা এক দেশ, বংবন্ধু বাংলাদেশ। তখন অনেকেই বলেছেন, আইনের শাসন নয়, মুজিবের শাসন চাই। সাংবাদিকেরা সরকার ও বংগবন্ধুর আনুগত্য লাভের জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। অনেকেই বাড়ি গাড়ি পদ পদবী পেয়েছিলেন। বংবন্ধু নিজেও মনে করতেন বা ভাবতেন, তিনি যখন দেশকে, দেশের মানুষ ভালবাসেন তাহলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কি প্রয়োজন। তিনিতো দেশের জন্যেই সবকিছু করছেন। বিরোধী দল বলতে তখন তেমন কিছু ছিলনা। এর পরেও তিনি এক দলীয় রাজনীতি ও সরকারী ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। সব পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে চারটি সরকারী কাগজ রেখেছিলেন। সাংবাদিকরা বুকে পোস্টার লাগিয়ে শ্লোগান দিয়েছেন, আমরা সবাই বংগবন্ধুর কলম সৈনিক। বহুদলীয় সরকার ব্যবস্থা রহিত করার বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা কোন কথা বলেনি। হাজার হাজার সাংবাদিক বেকার হয়ে পড়লেও সাংবাদিকরা কোন কথা বলার সাহস পাননি। কারণ সবাই ভাবতেন সরকারের সমালোচনা করলেই বিপদ হতে পারে। অনেকেই ভাবতেন সরকারের পক্ষে থাকাটাই দেশপ্রেমের পরিচয়। বাকশাল নামক একদল দিয়ে বংগবন্ধু সমাজতান্রিক রাস্ট্র ব্যবস্থা চালু করার চেস্টা করেছিলেন।
বাংলাদেশে এখন বেশীর ভাগ কাগজ ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মালিক বড় বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ গুলো। এসব গ্রুপ তৈরী হয়েছে জনগণের সম্পদ লুন্ঠন করে। লুন্ঠিত সম্পদ রক্ষা করার জন্যে তাঁরাই মিডিয়ার মালিক হয়েছেন। ৮৩ সালে যে উদ্যোক্তা ব্যান্ক প্রতিস্ঠা করতে দশ লাখ টাকা জোগাড় করতে পরতেন না বা পারেননি সে উদ্যোক্তাই এখন একাই এক হাজার কোটি টাকা দিয়ে ব্যান্ক প্রতিস্ঠা করতে চান। এসব কর্পোরেট হাউজই এখন সরকার ও গণতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রন করতে চায়। সাংবাদিকরা অনায়াসেই এসব হাউজের কাগজ ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে চাকুরী করে যাচ্ছেন। সম্পাদকদের বেতন বাড়ি গাড়ি সহ লাখ দেশেকে উঠে গেছে। কিছু কিছু সম্পাদক নিজেরাও কাগজের শেয়ার পাচ্ছেন। কবি সাহিত্যিকরাও এসব কাগজে আনন্দে চাকুরী করছেন। এক কাগজ অন্য কাগজের বিরুদ্ধে লিখে চলেছে। মালিক যা বলছে সাংবাদিকরা তাই লিখে যাচ্ছেন। আমি এমন কথা বলছিনা যে, চাকুরী করে সাংবাদিকরা মন্দ কাজ করছেন। তাঁরা শ্রমজীবী মানুষ জীবিকার জন্যে কারখানার মালিকের নির্দেশেই কাজ করবেন। নিয়মিত বেশী বেশী মুজুরী পাওয়াই সাংবাদিকদের লক্ষ্য। দেশে এখন বহু কাগজ আছে যারা অনেক সময় বুঝে অথবা না বুঝে বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কথা বলে। কিসে বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণ হতে পারে সে ব্যাপারেও সংবাদপত্র গুলোও একমত হতে পারেনা।
শুরুতেই বলেছি সাংবাদিকের স্বাধীনতা মানে একজন শ্রমিকের অধিকারের স্বাধীনতা। কর্পোরেট হাউজ গুলোর অত্যাচারের কারণে পশ্চিমে তৃতীয় মত প্রকাশের অন্দোলন দিন দিন জোরদার হচ্ছে। থার্ড মিডিয়ায় এখন বিখ্যাত সব কলামিস্টরা জনগণের পক্ষে লিখে যাচ্ছেন। সাংবাদিক লেখক সাহিত্যিক কবিরা যদি সরকার ও কর্পোরেট হাউজ গুলোর কাছে সারেন্ডার করেন তাহলে গণতন্ত্র আর রক্ষা করা যায়না। সরকার গুলো স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ ও দেশের মানুষ। চলমান অবস্থায় সরকারের নেতারা মিডিয়ার বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছে। মানে সরকার অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। এর মানে কর্পোরেট হাউজ গুলো সরকারের সমালোচনা করতে শুরু করেছে। এর মানে তারা বুঝতে পেরেছেন, পুঁজি রক্ষা করতে হলে নতুন মিত্রের অনুসন্ধান করতে হবে। যেমন বিশ্বব্যাপী আমেরিকার নিস্ঠুরতা শোষণকে সে দেশের কর্পোরেট হাউজ গুলো সমর্থন করে। যখন বনিবনা হয়না তখন দেশের প্রেসিডেন্টকেই তারা হত্যা করে। আমেরিকার সরকার গুলোর টিকে থাকা নির্ভর করে কর্পোরেট হাউজগুলোর মর্জির উপর। সত্যি কথা বলতে কি আমেরিকার গণতন্ত্র মানে কর্পোরেট হাউজ গুলোর গণতন্ত্র। পশ্চিমা বিশ্বের সর্বত্রই এই অবস্থা বিদ্যমান।
বাংলাদেশে সব সরকারের আমলেই কমবেশী সংবাদপত্র দলন হয়েছে। কোন সরকার বেশী দলন চালিয়েছে, কোন সরকার কম দলন করেছে, এই যা ফারাক। সাংবাদিকরা এখন দুই রাজনৈতিক দলে বিভক্ত। ফলে সাংবাদিকদের মুজুরীর আন্দোলনও দূর্বল হয়ে পড়েছে। মানবাধিকারের অবস্থাও এখানে তেমন ভাল নেই। মানবাধিকারের বড় বড় কথা আলোচনা আছে। কিন্তু দেশের আইনের বেশীর ভাগই বৃটিশ ঔপনিবেশিক আমলে তৈরী হয়েছে এদেশের মানুষকে অত্যাচার করার জন্যে। সরকার গুলোর মনোজগতে রয়েছে সেই বৃটিশ আইন গুলো। ফলে আধুনিক বাংলাদেশ রাস্ট্রও নিজেকে রক্ষার নামে নাগরিকদের উপর অত্যাচার করে। এবং চলমান আইন রাস্ট্রকে সেই অধিকার দিয়েছে। রাস্ট্র সংবিধানের নামে বা কাগজে কলমে নাগরিকদের কাছে অনেক গুলো ওয়াদা করেছে, যা বাস্তবায়নের চেস্টা কখনই করা হয়নি। ওসব ওয়াদা হচ্ছে কাগুজে ওয়াদা। রাস্ট্র মনে করে ওসব ওয়াদা পূরণের কোন প্রয়োজন নেই। মানবতা বিরোধী ও নাগরিক বিরোধী যেসব আইন রয়েছে তা পরিবর্তনের কোন মহল আজ পর্যন্ত করেনি। বাংলাদেশের সংবিধান যাঁরা রচনা করেছেন তাঁরা পাকিস্তান আমলের সংবিধানকে অনুসরন করেছেন। পাকিস্তান তা পেয়েছিল বৃটিশদের কাছ থেকে। বৃটিশরা বহু আইন ধার করেছিল মোগলদের কাছে থেকে। রাস্ট্রনেতারা নিজেদের অজান্তেই কায়েমী স্বার্থের পক্ষে কাজ করে গেছেন। সাংবাদিকরাও একই অবস্থার শিকার। নাগরিক বা মানুষের অধিকার থাকলেইতো সংবাদপত্র ও গণতন্ত্রের সা্বাধীনতা থাকবে। দেশের বুদ্ধিজীবীদের এ বিষয়ে ভাববার সময় বহু আগেই এসে গেছে। কিন্তু মনোজগতে তাঁরা স্বাধীন নন বলেই আমাদের অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। রাস্ট্র যদি তার নাগরিকদের স্বাধীনতা অপারগ তাহলে সংবাদপত্র আর সাংবাদিকদের স্বাধীনতার কথা ভাবা একেবারেই অবান্তর।
Posted in Articles | Leave a Comment »
আপনারা কেউ যদি কখনও আগার গাঁওয়ের পাসপোর্ট অফিসের দিকে যেয়ে থাকেন তাহলে দেখবেন মানুষের ভীড় কাকে বলে। ফাঁকে ফাঁকে সেনা বাহিনীর পোষাক পরা কিছু মানুষকেও দেখবেন। আমাদের সেনা বাহিনী এখন মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট(এমআরপি) ইস্যু করার কাজে সরকারকে সহযোগিতা করছে। সেনা বাহিনী সরকারের অন্যান্য বাহিনী ও কর্মচারীদের চেয়ে অনেক বেশী কর্মদক্ষ এ ব্যাপারে আমার মনে কারো কোন সন্দেহ নেই। শুনতে পাই দালাল ছাড়াই দেশের নাগরিকগণ খুব কম সময়ে দ্রুত গতিতে নতুন পাসপোর্ট নিতে পারেন ও পুরাতন পাসপোর্ট রিনিউ করাতে পারছেন। ওই এলাকায় গেলে আগের মতো দালাল দেখা যায়না। কিন্তু ব্যবস্থাপনা আরও ভাল হলে লোক গিজ গিজ করা দেখা যেতো না। পাসপোর্ট অফিসের আশে পাশের রাস্তা গুলো তেমন ভাল নয়। এদিক ওদিক ঝুপড়ি দেখা যায়। আমার মনে হয় ইচ্ছা করলে এলাকাটা আরও সুন্দর করা যেতো। ময়লা ও অপরিচ্ছন্ন থাকাটা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অপরিচ্ছনতার বিষয়টা শুধু এই অফিসে নয়। সব সরকারী অফিসেরই এই অবস্থা। কোন কোন অফিসের দেয়ালে লিখা রয়েছে পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অংগ। বেসরকারী কয়েকটি জমি উন্নয়নকারী অফিসে দেখেছি সারা দেয়ালে কোরাণের আয়াত লিখা রয়েছে। এসব অফিসের মালিকরা অন্যের জমি জবর দখল করে মাটি ভরাট করে বা উন্নয়ন করে। পরে প্লট করে তা বিক্রি করে। ক্রেতার বিশ্বস্ততা অর্জনের জন্যে দেয়ালের গায়ে পবিত্র কোরাণের আয়াত ঝুলিয়ে রাখে ।
ক’দিন আগে আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক গিয়েছিলেন তাঁর পাসপোর্ট নবায়ন করতে।ভদ্রলোকের জাতীয় পরিচয়পত্র বা ন্যাশনাল আইডি নেই। তিনি একজন প্রবাসী। জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহের জন্যে তিনি প্রথম গিয়েছিলেন উপজেলা নির্বাচী অফিসে। তাঁরা বললেন, পাসপোর্ট নবায়ন করে নিয়ে আসুন, আমরা আপনাকে ভোটার করে নিবো এবং আইডি ইস্যু করার জন্যে অনুরোধ জানাবো। ভদ্রলোক আবার পাসপোর্ট অফিসে গেলেন। তাঁকে আবার বলা হলো আইডি আনতে । তিনি এবার গেলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সপ্তম তলায়। সেখানে বলা হলো, আপনি নির্বাচী অফিসে যান। আবার নির্বাচী অফিসে যাওয়া হলো। জেলা নির্বাচনী অফিসার ভালো মানুষ। তিনি বললেন, জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট নিয়ে আমরা আপনাকে ভোটার করে নেবো। এক সাথে আপনার জাতীয় পরিচয় পত্রও হয়ে যাবে। পাসপোর্ট নবায়ন করার ব্যাপারেও তাঁরা জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট চাইলেন। এবার জন্ম নিবন্ধন সনদের জন্যে নগর ভবনে দৌড়ঝাপ করো। আগে একজনকে পাঠিয়ে রেকি করা হলো কোথায় কার কাছে গেলে কাজটা হবে। পরে একদিন ওই নগর ভবনে গিয়ে একজন কর্মচারীকে জিগ্যেস করা হলো অমুক কোথায় বসেন। সেই কে্মচারী যে রুম নাম্বার দিলেন সেখানে কিছু যুবক, কর্মচারীও হতে পারে বা ক্ষমতাসীন দলকে ভালবাসে এমন যুবকও হতে পারে। তারা বিষয় না জেনেই উত্তর দিলো জন্ম তারিখ ও জন্মস্থান বদলানো যায়না। যুবকদের হাব ভাব দেখে মনে হলো তারা ওখানে কাজ করছেনা, নিজেদের সরকার বিধায় একটু আড্ডা বা আরাম আয়েশের জন্যে মিলিত হয়েছে। অথবা নিজেদের সরকার বিধায় ওখানে নাম তালিকা ভুক্ত করে কিছু তদবীর বা দেন দরবার করে।
আমাদের দেশে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে কয়েক লাখ লোককে কোন ধরণের কাজ না করে জীবীকা নির্বাহ করতে হয়। যারা বেশী কর্মঠ তারা বিভিন্ন অফিসে যায় এবং জোর করে কাজ আদায় করে নেয়। অনেকেই টেন্ডার বাক্স ছিনতাই করে। যারা একটু কৌশলী তারা শান্তিপূর্ণ ভাবে কাজ ভাগ করে নেয়। কাজ ভাগ করা মানে টাকা ভাগ করে নেয়া। এরা হলো রাজনৈতিক কর্মী বা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র যুবক ও স্বেচ্ছা সেবক। জন্ম নিবন্ধনতো তেমন কোন গুরুত্পূর্ণ কাজ নয় । তাই সেখানে হয়ত শুধু বেতন দেয়ার জন্যে কিছু দেশপ্রেমিক মুক্তিযুদ্ধের শক্তি বলে জাহির করা কিছু যুবককে শক্তি চর্চার জন্যে বসিয়ে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশতো এখন কোটা দিয়ে চলে। মহিলা কোটা, পাহাড়ী কোটা, জেলার কোটা ও মুক্তিযোদ্ধা কোটা। মেধার কোটার কথা এখনও শুনিনি। থাকলেও তা হয়ত ১০/১২ পারসেন্ট হবে। বাংলাদেশে মেধার কোন গুরুত্ব নেই। এখনতো ছাত্র নেতা হতে গেলে কোন মেধা লাগেনা। এক দুটা ফার্স্ট ডিভিশন না হলে হলে বা ডাকসুতে নমিনেশন পাওয়া যেতোনা। এখন এসব লাগেনা। এখনতো ছাত্র নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই ঘর সংসার করেন। ছাত্র বয়সেই গাড়ি ঘোড়া চড়েন। মাসে লাখ লাখ টাকা আয় না করলে নেতৃত্ব থাকেনা। কিছুদিন আগে খবরের কাগজে ছাপা হয়েছে, ছাত্রীদের জোর করে রাতে নেতাদের কাছে পাঠানো হয়। যেতে না চাইলে হল থেকে বের করে দেয়া হয়। প্রসংগক্রমে এ বিষয়ের উল্লেখ করলাম। আজ আমার মূল বিষয় জাতীয় পরিচয়পত্র। একটা পরিচয়পত্র পেতে একজন উচ্চ শিক্ষিত নাগরিকের কি কস্ট হয়। পরিচয়পত্র পাওয়া একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। যে কোন সময়ে যে কোন স্থানে এই আইডি কার্ড বা পরিচয়পত্র পাওয়া উচিত। এখন প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে নাগরিকদের কি অধিকার আছে। কাগজে কলমে সংবিধানেতো নাগরিকদের অনেক অধিকার আছে। দেশের নাগরিক বা জনগণের নাম নিয়েইতো যত রকমের আইন তৈরী হচ্ছে। জনগণের নাম নিয়েইতো দেশ চালানো হয়। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪০ বছর পার হয়ে গেছে। এর মানে পাকিস্তান বা ভারত কেউই আমাদের আর শাসন করতে পারবেনা। আমরাই আমাদের দেশ চালাবো। আমাদের কেউই শোষন নির্যাতন বা অত্যাচার করতে পারবেনা। আমাদের রাস্ট্র পাকিস্তান বা ভারতের মতো হবেনা। আমাদের রাস্ট্র ষোলয়ানাই হবে দেশের কল্যাণে নিবেদিত।
Posted in Articles | Leave a Comment »
বাংলাদেশের রাস্ট্রপতির পদ একটি সম্মানিত সাংবিধানিক অবস্থান। বেশ কয়েক বছর আগে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন সাহেব বলেছিলেন, কবর জিয়ারত আর মিলাদ পড়া ছাড়া রাস্ট্রপতির কোন কাজ নেই। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় রাস্ট্রপতির পদ একটি অলংকার। তিনি রাস্ট্র নামক প্রতিস্ঠানের পতি। যদিও পতি হিসাবে সংসার চালাবার কোন দায় দায়িত্ব তাঁর নেই। সবাই তাঁকে সম্মান করেন তাই তিনি সম্মানিত। আমাদের দেশের মানে রাস্ট্রের ম্যানেজার বা নায়েব হচ্ছে সরকার। সরকার রাস্ট্রপতিকেও যেকোন মূহুর্তে বিদায় করে দিতে পারে। কারণ সরকারই রাস্ট্রপতির নিয়োগ দান করে। পাকিস্তান আমলের কথা আজ নাইবা বললাম। ওই আমলে গণতন্ত্র কখনই বিকশিত হতে পারেনি। ৭০ সাল নাগাদ ২৩ বছরে পাকিস্তানে সামরিক সরকারই ক্ষমতায় ছিল ১৩ বছর। রাজনীতিবিদরা কখনই শান্তিতে দেশ চালাতে পারেনি। আমলারাও সব সময় রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে লেগে ছিলেন। এসব কারণে পাকিস্তান ভেংগে গেছে। ভাংগা পাকিস্তানটার অবস্থাও তেমন ভাল নয়। সেখানে সেনা বাহিনী দেশের নির্বাচিত সরকারকে ধমকি দেয়। ৭১ সালে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী নিজেরাই দেশটাকে ভেংগে দিয়েছে। বংবন্ধু ছিলেন নির্বাচিত মেজরিটি পার্টির নেতা। তাঁর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে জেনারেল ইয়াহিয়া জুলফিকার আলী ভুট্টোর উসকানীতে নানা টালবাহানা করেন। তবুও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা যেতো। পাকিস্তানের সেনা বাহিনী তা না করে সামরিক হামলা চালিয়ে সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিল। ওই হামলার ফলে ভারতের প্রিক্রিয়া কি হতে পারে তা পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ভাবেনি অথবা গুরুত্ব দেয়নি। সামরিক হামলার ফলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিতে পারে তা ভাবেনি।পাকিস্তানের বন্ধু চীন বা আমেরিকা পাকিস্তানের ভূমিকাকে সমর্থন জানায়নি। অপরদিকে ভারত রাশিয়া জোট বেঁধে পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছে। জন্মলগ্ন থেকেই ভারত পাকিস্তানের সাথে শত্রুতা জারী রেখেছিল। ৭০ এর আগে দুইবার যুদ্ধে জড়িত হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান। ৭১ সাল ছিল ভারতের জন্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সুযোগ। ভারত ষোলয়ানা এই সুযোগের ব্যবহার করে। পাকিস্তানকে পরাজিত করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘হাজার সালকা বদলা লিয়া’। কেন তিনি এই বাক্যটি ব্যবহার করেছিলেন তার একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত রয়েছে। এর আগে এ বিষয়ে বহুবার বলেছি। আজ আর উল্লেখ করতে চাইনা।
বংগবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফিরে এসেছেন নতুন রাস্ট্রের রাস্ট্রপতি হিসাবে। মুক্তিযুদ্ধের গঠিত প্রবাসী সরকারেরও তিনি ছিলেন রাস্ট্রপতি। কিছুদিন পর তিনি হয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রী। একদলীয় বাকশাল সরকার গঠণ করে তিনি আবার হলেন রাস্ট্রপতি। পরবর্তী সরকার প্রধানগণ বাকশালী সরকারের রাস্ট্রপতির ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন। রাস্ট্রপতি হিসাবে বংগবন্ধু কখনই সরাসরি নির্বাচিত হননি।তাঁর দলীয় সংসদই তাঁকে নির্বাচিত ঘোষণা করেছে। তিনি যখন যা চেয়েছিলেন তাই হয়েছেন। তখন মনে হতো তিনিই সবকিছু। সংবিধানের কোন বালাই নেই ।তিনি যা ভাববেন তাই হবেন। কারো কিছু বলার নেই। ঠিক এ সময়ে তাঁর ভাগ্নে যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলুল হক মনি তাঁর নিজের কাগজ বাংলার বাণীতে লিখলেন ‘ আইনের শাসন নয়, মুজিবের শাসন চাই’। পল্টনের বক্তৃতায় শেখ মনি আরও বললেন, জাতির পিতার কোন সমালোচনা করলে জ্বিব টেনে ছিঁড়ে ফেলা হবে। চাটুকার দল বংগবন্ধুকে জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। চারিদিকে এক আতংকের পরিবেশ তৈরী হয়েছিল। বিরোধী দল বলতে তেমন কিছু ছিলনা।
স্বৈর শাসক জেনারেল এরশাদের পতনের পর আওয়ামী লীগের চাপে পড়ে বিএনপিকে সংসদীয় সরকার পদ্ধতির প্রস্তাব আনতে হয়েছিল। তেমন আলোচনা ছাড়াই সরকার ও বিরোধী দলের যৌথ উদ্যোগে সংসদীয় সরকার প্রতিস্ঠিত হলো। রাস্ট্রপতির সব ক্ষমতা রয়ে গেল প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তাড়াহুড়োর মাঝে কারো মনেই ছিলনা ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা। ফলে সংসদীয় সরকার পদ্ধতি চালু হলেও পুরো ক্ষমতা রাস্ট্রপতির স্থলে প্রধানমন্ত্রীর হাতে রয়ে গেল। এবং এখনও তাই আছে। ক্ষমতায় গেলে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা ওয়াজেদ সেই ক্ষমতা ভোগ করেন বা ব্যবহার করেন। ফলে সংসদ বা সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা ঠুটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে। ষে কোন ভাবেই হোক, দল একবার নির্বাচিত হলেই দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত বা মনোনীত হন আর সকল ক্ষমতার অধিকারী হন। তিনি হয়ে যান আধুনিক রাস্ট্রের রাজা বাদশা। আমেরিকা বা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিনিয়ত সংসদ ও জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে কোথাও জবাবদিহি করতে হয়না। সংসদ হয়ে পড়ে তাঁর বশংবদ বা আজ্ঞাবহ। নেতার কাছে সংসদের আজ্ঞাবহতা শুরু হয়েছে ৭২ সাল থেকে। মানে নেতা সংসদের চেয়ে অনেক বড়। বংবন্ধু ছিলেন একজন মহা বড় নেতা। তাঁর সামনে কথা বলার মতো কোন লোক ছিলনা। সংসদেও বিরোধী দলের হাতে গোণা মাত্র কয়েক জন সদস্য ছিল। তাঁদেরকেও বংগবন্ধু নিজের কর্মী মনে করতেন। ফলে বংগবন্ধু বুঝতে পারতেন না দল সরকার ও তাংর মাঝে ফারাক কি। তিনি মনে করতেন বাংলাদেশ তাঁর, তিনি বাংলাদেশের। ইতোমধ্যে অনেকেই লিখেছেন দেশের নাম বংগবন্ধুদেশ। এক সময় শ্লোগান ছিল এক নেতা এক দেশ, বংগবন্ধু বাংলাদেশ। বংগবন্ধু যে ক্ষমতা নিজের জন্যে রেখেছিলেন তা পরবর্তী পর্যায়ে চলে এসেছিল রাস্ট্রপতিদের হাতে। এখন আছে প্রধানমন্ত্রীদের হাতে।
চলমান আওয়ামী লীগ সরকারের অবস্থাও ৭২-৭৫ এর সংসদ ও সরকারের মতো। সংসদে বিরোধী দল বলতে তেমন কিছু নেই। যাঁরা আছেন তাঁরাও সরকার দলীয় সদস্যদের জ্বালায় অনেকদিন ধরে সংসদে যান না। ফলে এটি একদলীয় সরকারে পরিণত হয়েছে। বংবন্ধু ২৯৩ জন সদস্য নিয়েও সন্তুস্ট ছিলেন না। তাই তিনি সকল দলের বিলুপ্তি ঘটিয়ে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। এখন তাঁর কন্যা শেখ হাসিনাও তাঁর পিতার পদাংক অনুসরন করছেন। মনে হয় দেশে এখন শুধু আওয়ামী লীগই আছে। দেশটা আওয়ামী লীগের হয়ে গেছে। দল সরকার আর রাস্ট্র এখন এক হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা শুনলে মনে হয় দেশ চালাবার একমাত্র অধিকার শুধু আওয়ামী লীগের। মনে হয় শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের রাজনীতিই এখন বাংলাদেশ রাস্ট্রের রাজনীতি। রাস্তায় পুলিশ আনসার রেব সবই বিরোধী দল দমনের জন্যে সরকারী রাজনৈতিক বাহিনী হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সোজা কথায় বলা যেতে পারে দেশে গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের কোন নমুনা নেই। সভ্য দেশ গুলোতে মানবাধিকার কমিশন রয়েছে। সভ্যদেশের লেবেল পেতে হলে একটি মানবাধীকার কমিশন দরকার। তাই এটি গঠিত হয়েছে একজন আওয়ামী পন্থী শিক্ষককে এর চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়ে। তবে ড. মিজান মাঝে মাঝে খুবই চমক লাগানো কথাবার্তা বলেন এবং পাঠক দর্শক ও শ্রোতারা তাঁর কথায় আনন্দিত হন।
চলমান সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় রাস্ট্রপতির ক্ষমতা কি তা এতক্ষণে পাঠকরা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। তাহলে চলমান সংলাপের গুরুত্ব কতটুকু। রাস্ট্রপতি সাহেব এখন রাউন্ড টেবিল মার্কা আলোচনা সভার আয়োজন করেছেন সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ বা নির্দেশে। তবে আশা করছি, রাস্ট্রপতি সাহেব সকল দলের সাথে আলোচনা শেষ হলে একটি রিপোর্ট সরকারের কাছে পাঠাতে পারবেন। ইতোমধ্যে মহাজোট ছাড়া বাকী সব রাজনৈতিক দল কোয়ার টেকার সরকার ব্যবস্থা চালু করার জন্যে রাস্ট্রপতি সাহেবকে অনুরোধ জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সুরও পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই আওয়ামী লীগ বলেছে রাস্ট্রপতি সাহেব চাইলে তাঁরা কেয়ার টকার সরকার ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা করতে রাজী আছে। তাহলেতো আর কোন দ্বিধা দন্ধ থাকতে পারেনা। কেয়ার টেকার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু করা দরকার। দেশবাসী দেশে কোন ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সংঘাত দেখতে চায়না। তাই শান্তিপূর্ণ ভাবে সকল সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত। সুসভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আদব কায়দা চালু হওয়া দরকার। শুধু মাত্র শুদ্ধ ও সুস্থ রাজনৈতিক আচার ব্যবহারের অভাবে বাংলাদেশ তার কাংখিত লশ্যে পৌঁছাতে পারেনি। যতদিন না রাজনীতিবিদরা এ সত্য উপলব্ধি করবেন ততদিন এদেশের উন্নতি অসম্ভব। কেউ ভাল কথা বললেও রাজনীতিবিদরা ক্ষ্যাপে উঠেন। এইতো ক’দিন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার উপরে কথা বলে অর্থমন্ত্রীর রোষে পড়েছেন। আশি বছরের বৃদ্ধ অর্থমন্ত্রী জীবনের বেশীর ভাগ সময়ে ছিলেন সরকারী আমলা। অবসর গ্রহণের পর বিদেশে ঘুরে ঘুরে বিশ্বব্যান্কের কনসাল্টেন্সী খুঁজে বেড়াতেন। এরশাদ সাহেব এনে চাকুরি দিয়েছিলেন। বেশ কয়েক বছর এরশাদ সরকারের খেদমত করেছেন। এখন শেখ হাসিনার খেদমত করছেন। কথায় কথায় মানুষকে স্টুপিড রাবিশ বলে গালাগাল করেন। রাস্ট্রপতিকে সংলাপে লাগিয়ে দিয়ে আওয়ামী নেতারা সংলাপ বিরোধী অস্ত্রের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছেন। মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন জামাতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার জন্যে। যে দলটির জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। যে দলটি মোট ভোটারের ৮ থেকে ১২ ভাগ ভোটারের সমর্থন পেয়ে থাকে। মহাজোটের শরীক এরশাদের জাতীয় পার্টি ছাড়া বাকী সব দল মিলে এক ভাগ ভোটও নেই। মেনন বা ইনু সাহেবের এক হাজার ভোটও নেই। নৌকা না হলে তাঁরা চলতে পারেননা। সেই মেনন ইনু সাহেব এখন দেশের ভাগ্য বিধাতার ভুমিকা পালন করতে মাঠে নেমেছেন। এদেরকেই বংগবন্ধু বলেছিলেন, সাইনবোর্ড ফেলে দিয়ে আসার জন্যে। কিন্তু তাঁরা এখনও সাইনবোর্ড ফেলেননি। কারণ সাইনবোর্ড থাকলে তাঁরা লাভবান হন। আইন প্রতিমন্ত্রী চৌধুরী সাহেব সম্পর্কে সহজে কেউ মুখ খুলতে চান না। কারণ তাঁর মুখের ধার অন্য সবার চেয়ে বেশী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হয়ত তাঁর মুখ অনেক মিস্টি। রাজনীতিতে তিনি হয়ত মুখের জন্যেই পদ পদবী পেয়েছেন। ধারালো বা ছুরির ভাষায় কথা বললে তাঁর প্রভু হয়ত খুশী হন। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে আমি তাঁর কোন দোষ দেখিনা। ভারতের প্রেসিডেন্ট জ্ঞানী জৈল সিং বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী চাইলে তিনি ঝাড়ু দিতেও রাজী আছেন। আমাদের দেশেও এরশাদ সাহেবের একজন মন্ত্রী এ ধরণের কথা বলেছিলেন। আস্ত্রের ভাষায় কথা বলে আলোচনা করা যায়না। সকল অবস্থায় আলোচনা অব্যাহত না থাকলে গণতন্ত্র রক্ষা করা যাবেনা। ৫৮ সালে দেশে সামরিক শাসন জারী হয়েছিল আওয়ামী লীগের অগণতান্ত্রিক আচরনের জন্যে। ৭০ সালের অভূতপুর্ব বিজয়ের পরেও পাকিস্তানের সামরিক সরকারকে আলোচনার টেবিলে আটকিয়ে রাখতে পারেননি বংগবন্ধু। একজন নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ নেতা হিসাবে এটা ছিল বংগবন্ধুর অদূরদর্শিতা। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরে দেশে ফিরে এসেও বংবন্ধু একজন মহান গণতান্ত্রিক নেতা হিসাবে নিজেকে বিকশিত করতে পারেননি। কোন অদৃশ্য কারণে তিনি একদলীয় রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়লেন তা দেশবাসী আজও জানেনা। দেশবাসীতো তাঁকে বিশ্বাস করেছে। ৭০ সালে নিখিল পাকিস্তানের একচ্ছত্র নেতা বানিয়েছে। ৭৩ সালেও তাঁর দল আওয়ামী লীগ ৩শ’ সিটের ভিতর ২৯৩ সিট পেয়েছিল। কিন্তু তিনি জনগণের আস্থা রক্ষা করতে পারেননি। ফলে দেশে সামরিক শাসন জারী হয়েছে। ২০০৬ সালেও আওয়ামী লীগের অস্ত্রের ভাষা ব্যবহার ও অগণতান্ত্রিক আচরনের ফলে জেনারেল মইন ইউ আহমদের সরকার প্রতিস্ঠিত হয়। শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন, ওই সরকার তাঁদেরই আন্দোলনের ফসল। সরকারকে আওয়ামী লীগ সমর্থন জানাবে। জেনারেল মইন ক্ষমতা দখল করে নিজেকে ফোর স্টার জেনারেল বানালেন। যেমন আইউব খান নিজেকে ফিল্ড মার্শাল বানিয়েছিলেন। আজ জেনারেল মইন ও ফখরুদ্দিন নির্বাসনে জীবন যাপন করছেন। জেনারেল মাসুদকে ঘুষ দিয়ে সরকার দূরে সরিয়ে রেখেছে। এ ঘুষ না পেলে মাসুদ যেকোন সময়ে মুখ খুলতে পারে।
এসব কথা হলো প্রাসংগিক কথা। শুধুমাত্র পাঠকদের অনুধাবনের জন্যে। আওয়ামী লীগের সমস্যা হলো তারা সহজে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারেনা। আর আওয়ামী লীগ মনে করে ক্ষমতাটা শুধু তাঁদেরই জন্যে। বিশেষ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁরা মনে করেন দেশটা শাসন করার একমাত্র অধিকার তাঁদেরই। ফলে বিগত ৪০ বছরে দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও আদব কায়দা গড়ে উঠেনি। রাস্ট্রপতি সাহেব নিজেও একজন পুরাণো আওয়ামী লীগার। সারাজীবন বংবন্ধু ও আওয়ামী লীগ খেদমত করেছেন। এখনও তিনি বংবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার খেদমত করছেন। সারা জীবনের ত্যাগের বিনিময়ে তিনি রাস্ট্রপতি পদে সম্মানিত হয়েছেন। একজন রাজনীতিক হিসাবে এটা তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওনা। প্রশ্ন হলো, সরকারী দলের নির্দেশে সংলাপ করে তিনি কি কোন সমাধানে পৌঁছাতে পারবেন? সরকারের আলোচনার বিষয় হলো নির্বাচন কমিশন। বিরোধী দলগুলোর আলোচনার বিষয় হলো কেয়ারটেকার সরকার। সরকার কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছেন আদালতের এক রায়ের ছুতা ধরে। কেয়ারটেকার ব্যবস্থা বাতিল করার পেছনে সরকারের নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য আছে। সহনশীল সুন্দর রাজনৈতিক কালচার না থাকার ফলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে জনগণের কোন আস্থা নেই। ভাবতে অবাক লাগে এই আওয়ামী লীগই একদিন কেয়ারটেকার সরকার প্রতিস্ঠার জন্যে সারা দেশে জালাও পোড়াও আন্দোলন করেছিল। হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ নস্ট করেছে। সে সময়ে বিএনপি সরকার এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করলেও পরে সংসদে বিল এনে তা পাশ করে।
রাস্ট্রপতির সংলাপে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল জামাতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কেন আমন্ত্রণ জানানো হয়নি তার কারণও ব্যাখ্যা করা হয়নি। বাংলাদেশে জামাত একটি বৈধ রাজনৈতিক দল। ইসলামের আদর্শ উদ্দেশ্য ভিত্তিক রাজনৈতিক দল ভারত ও পাকিস্তানে আছে। এছাড়া আরব ও আফ্রিকায় বহু ইসলামিক দল আছে। ইসলামে রাজনীতি নিষিদ্ধ নয়। ইসলাম রাজনীতি শাসণ ব্যবস্থা থেকে পৃথক বা বিচ্ছিন্ন নয়। ইসলামে রাস্ট্র ও সরকার ব্যবস্থার সুস্পস্ট ব্যাখ্যা রয়েছে। এক সময় আমাদের দেশে কমিউনিস্ট পার্ট নিষিদ্ধ ছিল। কমিউনিজম ধর্ম বিরোধী রাজনৈতিক মতবাদ মনে করা হতো। এখন পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়েছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ইসলামী আদর্শ ভিত্তিক রাজনীতি করা যাবেনা। তাই সরকারের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে রাস্ট্রপতি জামাতকের সংলাপে ডাকেননি। এর মাধ্যমে তিনি নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন। এর আগে রাজনৈতিক দল ও সংবাদপত্র এ ধরনের আশংখা প্রকাশ করেছিল। তারা বলেছিলেন সংলাপ একটি পাতানো নাটক। এক সময় জামাতের সাথে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সখ্যতা ছিল। বিএনপির বিরুদ্ধে একযোগে আন্দোলনও করেছে এই দুটি দল। কিন্তু সেই সম্পর্ক বেশীদিন টিকেনি রাজনৈতিক কারণে। আওয়ামী লীগ ও তার চিন্তার সহযোগীরা সংসদে ২৬৩ সিট মানে সংসদে দুই তৃতীয়াংশেরও বেশী সিট পেয়ে জামাত বা ইসলামী রাজনীতি বন্ধ করার জন্যে মাঠে নেমেছে। কারণ তাঁরা মনে করেন জামাত ও ইসলামী দলগুলো রাজনীতিতে থাকলে আওয়ামী লীগ কখনই ক্ষমতায় আসতে পারবেনা। দেশবাসী সবাই জানেন যে ১/১১র সরকার মানে জেনারেল মইনের সরকার ক্ষমতায় না আসলে আওয়ামী কখনই ক্ষমতায় আসতে পারতোনা। ১/১১র সরকারের লক্ষ্যই ছিল জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী রাজনীতিকে চিরতরে উচ্ছেদ করা। তাদের লক্ষ্যের ফলাফলই হচ্ছে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার। যুদ্ধাপরাধের বিচারও একই রাজনীতির লক্ষ্যে পরিচালিত। আওয়ামী লীগ ভাল করেই জানে কয়েকজন লোককে ফাঁসী দিলে জামাতের রাজনীতি বন্ধ হয়ে যাবেনা। ইসলামী রাজনীতি করার অভিযোগে মুসলমান দেশগুলোতেই বহু বিখ্যাত নেতা ও দার্শনিকদের ফাঁসী দেয়া হয়েছে। এমন কি জামাতে ইসলামী দল হিসাবে নিষিদ্ধ হয়ে গেলেও ইসলামী রাজনীতির চিন্তাধারা বন্ধ হয়ে যাবে? না, কখনও বন্ধ হবেনা। তার প্রমান মধ্যপ্রাচ্য ও আরব দেশগুলোর রাজনীতি। তিউনিশিয়ায় ইসলামী সরকার প্রতিস্ঠিত হয়েছে। মিশরে ইসলামী সরকার প্রতিস্ঠিত হতে চলেছে। ইরাণে ইসলামী বিপ্লব সফল হয়েছে। সেই বিপ্লবকে সফল ও কার্যকরী রাখার জন্যে সেই দেশের মানুষ এখনও লড়াই করছে। আমেরিকান সরকার আলকায়েদা ও তালেবানদের সাথে যুদ্ধ করে এখন ক্লান্ত। তাই তারা এখন তালেবানদের সাথে সংলাপ শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ ভুল জুতা পায়ে দিয়ে ভুল পথ অতিক্রম করার চেস্টা করছে। তার এই পথযাত্রা কখনই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেনা।আমেরিকা যুগের পর যুগ ধরে যুদ্ধ করছে। জগতকে সংঘাতময় করে তুলেছে। কিন্তু আমেরিকা কোন যুদ্ধেই জিততে পারেনি।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
Posted in Articles | Comments Off
ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে দেশের মানুষ খুবই শংকিত হয়ে পড়েছে। দেশের মানুষ বুঝতে পারছেনা ভারত বাংলাদেশকে নিয়ে কি করতে চায়? আওয়ামী লীগও দেশকে কোন পথে নিয়ে যেতে চায়? সীমান্তে বাংলাদেশী( আওয়ামী লীগের জন্যে বাসংগালী) হত্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। শুনেছি , মুজিব নগর সরকারের সাথে ভারতের যে গোপন চুক্তি হয়েছিল তাতে ভারত চেয়েছিল বাংলাদেশের নিজস্ব কোন সেনা বাহিনী থাকবেনা। বাংলাদেশের বিদেশনীতিও ভারত দেখাশুনা করবে। বংগবন্ধু দেশে ফিরে এসে এই গোপন চুক্তি বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি জানান। এমন কি ভারতের অনুরোধকে প্রত্যাখ্যান করে বংবন্ধু লাহোরে ওআইসি সম্মেলনে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। ফলে বংগবন্ধুর সাথে ভারতের স্পর্ক কখনই উষ্ণ হয়নি। একটি ঘটনা আমি নিজেই জানি। তা হলো ভারত সরকারের প্রভাবশালী সচিব ডিপি ধর তখন কোন ধরণের নিয়ম নীতি ও প্রটোকলের তোয়াক্কা না করে যখন তখন ঢাকায় চলে আসতেন বংবন্ধুর সাথে দেখা করতে। এতে বংগবন্ধু বিরক্ত হতেন এবং বলতেন, কিরে তাজউদ্দিন তোরা হিন্দুস্তানের সাথে কি চুক্তি করেছিস? ধর কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ঢায় চলে আসে। এই জ্বালা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে বংগবন্ধু মাওলানা ভাসানীকে অনুরোধ করেছিলেন কিছু একটা করার জন্যে। ওই সময়ে মাওলানা সাহেবের হককথা বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে ভারতীয় আগ্রাসন থেকে। বংগবন্ধুর ব্যক্তিত্বের কাছে ভারত সরকার বা ইন্দিরা গান্ধী বেহায়ার মতো তেমন কিছু করতে সাহস করেননি।
যে ভৌগলিক এলাকায় আমার পূর্ব পুরুষ জন্ম গ্রহন করেছেন সেই এলাকার নাম এখন বাংলাদেশ। এর আগে এই ভৌগলিক এলাকার নানা নাম ছিল। শাসক ছিলেন নানা রাজা মহারাজা ও নবাব বাদশাহ। মাটির বয়স বিবেচনা করলে এই অঞ্চলের বয়স দশ হাজার বছরের কম নয়। যেখানে লাল মাটি আছে তার বয়স আরও বেশী। ওয়ারিশয়ানা সূত্রে আমি এদেশের মানুষ। রাজা বাদশাহর আমলে ছিলাম অধিকার হীন প্রজা। অধিকার নিয়ে আমরা তেমন সজাগও ছিলাম না। মানুষ হিসাবে আমাদের অবস্থান ও মর্যাদা সম্পর্কে আমরা শুরুতে জানতে পারি বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ, ঋষি , পয়গম্বর ও রাসুলদের কাছে থেকে।পীর আউলিয়া ও ধর্ম প্রচারকরা দেশে দেশে গিয়ে মানুষকে তার জন্মগত মৌলিক মানবাধিকার সম্পর্কে সজাগ উদ্বুদ্ধ করেছেন। কোন শাসক তার নিজের প্রজাদের কখনই অধিকার সচেতন করেননি। আধুনিক সমাজ ও রাস্ট্রে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সজাগ ও উদ্বুদ্ধ করেন মানব দরদী ও প্রেমী এক শ্রেণীর দেশ মানুষ। স্বাধীন চিন্তাধারার কবি সাহিত্যিক ও সাংবাদিকরাও জনসাধারনকে নিজেদের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সজাগ করে থাকেন। এ ভাবেই সমাজে জাগরন এসেছে। রাজা মহারাজা, বাদশাহ ও সম্রাটদের যুগ পেরিয়ে মানুষ গণতন্ত্রের যুগে এসেছে। মানুষ নিজের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সজাগ হয়েছে। গণতান্ত্রিক সমাজ রাস্ট্রের ধারনা মানুষের ভিতর এসেছে। আধুনিক রাস্ট্র প্রতিস্ঠিত হয়েছে।এই উপমহাদেশে গণতান্ত্রিক সমাজের ধারণা শুরু হয়েছে ইংরেজ আমলে। এদেশ বাসী ইংরেজদের বিদায় করে নিজেদের রাস্ট্র ও শাসন ব্যবস্থা প্রতিস্ঠার জন্যে সমাজের জাগ্রত শ্রেণী কথা বলতে শুরু করেন। সারা পৃথিবীতে আধুনিক রাস্ট্র ব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের সূচনা শুরু হয়। চীনে রাজ ব্যবস্থা থেকে সরাসরি বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। সমাজতান্ত্রিক নতুন গণচীন প্রতিস্ঠিত হয়েছে। উপ মহাদেশে ইংরেজ শাসনের কারণে আমরা পশ্চিমা ধ্যান ধারণা, গণতন্ত্র ও সরকার ব্যবস্থার উত্তরাধিকার পেয়েছি। আমরা এখনও মনে করি পশ্চিমা গণতন্ত্রই উচ্চতর। তা এখনও জারী আছে। আমাদের বাংলাদেশে সেই গণতন্ত্রই কার্যকর রয়েছে।
আধুনিক রাস্ট্রের জন্ম হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্যে। জাতিসংঘের ভুমিকা ও দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা। কিন্তু রাস্ট্রগুলো নিজ নিজ নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতিসংঘও ক্ষমতাবান রাস্ট্রগুলোর সীমাহীন প্রভাবের কারণে সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেনা। জাতিসংঘ এখন অপ্রয়োজনীয় কথামালার ক্লাবে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাবান রাস্ট্র গুলোর কারণে জাতিসংঘ স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারছেনা। সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের কারণে বিশ্ব এককেন্দ্রিক বা এক মাত্রিক হয়ে পড়েছে। ফলে আমেরিকা এখন সারা পৃথিবীকে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে এবং বিশ্ব অশান্ত হয়ে উঠেছে। টুইন টাওয়ার পতনের পর আমেরিকার মথা একেবারেই খারাপ হয়ে গেছে। যখন যেখানে ইচ্ছা ঢুকে পড়ছে, হামলা চালাচ্ছে। পাকিস্তান তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এই পাকিস্তান ৬০ বছর ধরে আমেরিকার তাবেদারী করে আসছে। আমেরিকার কারণে আজ পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিপন্ন। রাজনৈতিক ভাবে পাকিস্তানের অবস্থা এখন টালমাটাল। পাকিস্তানের বন্ধুত্বকে ত্যাগ করে আমেরিকা এখন ভারতের সাথে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে। ভারত ও এই হাতকে টেনে বুকে নিয়েছে। ঊভয়ের লক্ষ্য চীনকে মোকাবিলা করা।
বাংলাদেশ নামক রাস্ট্রটি জন্ম নিয়েছে রাগ বিরাগ অভিমান ও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ ও বহু ধ্বংসের মাধ্যমে। পূর্ব পাকিস্তানের বাংগালীরা কখনই যুদ্ধ চায়নি। তবুও তাকে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হয়েছে পাকিস্তানীদের কারণে। ২৫শে মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র জনগণের উপর আক্রমণ করে পাকিস্তানীরা ভুল করেছে। ৪৭ সালে পূর্ববংগ পাকিস্তানের সাথে ছিল শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে। নিখিল বংগদেশকে স্বাধীন দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে দিতে চায়নি কংগ্রেস নেতারা। ফলে বাংলা দুই ভাগ হয়ে গেল। পশ্চিম বাংলার হিন্দুরাও শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণে দিল্লীর অধীনে চলে গেল। মুসলমান বাংগালীদের সাথে পাকিস্তানের অবাংগালী মুসলমানদের শুরু থেকেই নানা কারণে বনিবনা হয়নি। হিন্দী ভারতবাসীর ভাষা না হওয়া সত্বেও তারা এই ভাষাকে লিংগুয়াফ্রাংকা হিসাবে মেনে নেয়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের বাংগালীরা উর্দূকে সার্বজনীন ভাষা বা লিংগুয়াফ্রাংকা হিসাবে মেনে নিয়েছে। সারা ভারতে বহু জাতি আছে। ভাষা ভিত্তিক বাংগালীরা সেখানে পাঁচ পারসেন্টের বেশী নয়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে বাংগালী মুসলমানরা ছিল ৫৬ ভাগ। কিন্তু দেশটা চালাতো অবাংগালী মুসলমানরা। ফলে সর্বদিক থেকে বৈষম্য বেড়ে চলে উভয় অঞ্চলের মাঝে। আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের সুযোগ থাকা সত্বেও পাকিস্তানীরা শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নেয়। ভারতের মতো বৈরী প্রতিনেশী ভারতের কথা চিন্তা না করেই পাকিস্তানের সামরিক জান্তা নিজ দেশের এক অঞ্চলের নিরস্ত্র জনগনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে। ফলে যা হবার তাই হলো। ভারত বাংগালী মুসলমানদের বন্ধু হিসাবে আবির্ভুত হলো। পাকিস্তান ভেংগে গেলো। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। শুরু হলো বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে বন্ধুত্বের টানাটানি। ভারত চায় বাংলাদেশের সাথে গভীর বন্ধুত্ব। বাংলাদেশ আস্তে আস্তে ভারতের বাজারে পরিণত হলো। কিন্তু ভারত শুধু বাজারে সন্তুস্ট নয়। চায় বন্ধুত্বে একাকার হয়ে যেতে। ভারতের কথা একেবারেই সোজা সাফটা।‘তোমরা চেয়েছিলে বাংগালী হতে। আমরা তোমাদের স্বাধীন করে দিয়েছি যোলয়ানা বাংগালী হতে। বাংগালীপনা বা বাংগালয়ানায় কোন ধরনের ভেজাল বা খাদ থাকতে পারবেনা। তোমাদের স্বাধীন করে দিয়েছি মুসলমান বা বাংগালী মুসলমান হওয়ার জন্যে নয়। শুরু হলো বন্ধুত্বের মাঝে টানাপোড়েন। ভারতের শাসক গোষ্ঠি চায় আমাদের ভাষা সংস্কৃতি ইতিহাস ঐতিহ্যকে পরিবর্তন করে দিতে। আজ থেকে ৫০ বা ১০০ বছর পরে যেন বাংলাদেশের মানুষ বলে আমাদের সীমান্ত বা সীমানার কোন প্রয়োজন নেই। সিকিমের প্রধানমন্ত্রী লেন্দুপ দর্জি নিজের দেশের পার্লামেন্টে আইন পাশ করিয়েছিলেন ভারতের সাথে সংযুক্তির জন্যে। তাই সিকিম আজ ভারতের একটি রাজ্য। তবে সেখানে একটি সুবিধা ছিল সিকিমের নাগরিকরা ছিলেন সবাই হিন্দু। সংস্কৃতি ও ধর্ম, ইতিহাস ঐতিহ্যগত ভাবে সিকিমবাসী ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতিরই ধারক বাহক। তাদের কাছে স্বাধীনতার চেয়ে ধর্মীয় চেতনা বেশী কাজ করেছে। সা্বাধীনতার তেমন দাম তাদের কাছে ছিলনা।তাই লেন্দুপ দর্জি গণতান্ত্রিক ভাবেই ভোটাভোটি করেই স্বাধীনতা ত্যাগ করেছিলেন।
কিছুদিন ধরে ভারত প্রায় প্রতিদিনই সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা করছে। ফেলানীর ঘটনা বাংলাদেশের সকল মানুষের মনকে নাড়া দিয়েছে। এইতো ক’দিন আগে বাংলাদেশী এক নাগরিককে ভারতের বিএসএফ পেটাতে পেটাতে উলংগ করে ফেলে। সারা পৃথিবীর মানুষ ওই অত্যাচারের দৃশ্য টিভিতে দেখেছে। ভারতের মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিএসএফ এর এই কর্মকান্ডের নিন্দা করেছে। বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো ভারতের আগ্রাসী নীতির নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্র সৈয়দ আশরাফ বলেছেন, সীমান্তের ঘটনা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। এ রকম অতীতে হয়েছে, এখনও হচ্ছে, আগামীতেও হবে। ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জী বলেছেন, মিডিয়া ঘটনাটিকে ফুলিয়ে ফাঁফিয়ে দেখিয়েছে। বিএসএফের মুখপাত্র বলেছেন, সবক দেওয়ার জন্যেই ওই বাংলাদেশীর উপর একটু বল প্রয়োগ করা হয়েছে। বাংলাদেশী হাবিলদারকে ধরে নিয়ে অত্যাচার করার ব্যাপারে এখন ক্ষমা চাওয়া হয়নি। ভারতীয় দূতাবাস বলেছেন, সীমান্তে যাদের উপর এ্যাকশান নেয়া হয় তারা সবাই ক্রিমিনাল। দিল্লী বলেছে, ঘটনাটা বড় নয়, কিন্তু কারা ছবি তুলে প্রচার করেছে। নিশ্চয়ই এর পেছনে পাকিস্তানের আইএসআই ও বাংলাদেশের ধর্মীয় দলগুলোর হাত রয়েছে।
ইতোমধ্যে রাজনীতির মাঠে নতুন এক মাত্রা যোগ হয়েছে। সেই মাত্রা হলো কথিত সেনা অভ্যুত্থানের খবর। সেনা বাহিনীর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে জাতিকে বা দেশবাসীকে বলা হয়েছে অভ্যুত্থান করার ষড়যন্ত্রকে নস্যাত করা হয়েছে। রাজধানীতে শক্তিশালী গুজব বিরাজ করছে যে, অনেক সেনা অফিসারকে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে।পত্র পত্রিকাতেও গ্রেফতারের খবর ছাপা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ধর্মান্ধ কিছু অফিসার ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত। কোলকাতার দক্ষিণপন্থী রক্ষণশীল সাম্প্রদায়িক আনন্দ বাজার পত্রিকার জয়ন্ত ঘোষাল বলেছেন, মৌলবাদীরা হাসিনা সরকারকে আঘাত করেছে। ঘোষাল বাবু পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কথা উল্লেখ করে বলেছেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে পাকিস্তানপন্থী মৌলবাদীরা হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তারা গণতান্ত্রিক স্যেকুলার উন্নয়নমুখী বাংলাদেশের অগ্রগতিকে রুখে দিতে চায়। ঘোষাল বাবুর লেখাটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর মনগড়া একটি ব্যাখ্যা। ভারত সরকার বলেছেন, সকল প্রকার ষড়যন্ত্র রুখে দিতে তাঁরা হাসিনার পাশে থাকবেন। এসব হচ্ছে কূটনৈতিক ভব্যতা ও সংস্কৃতি। বন্ধুত্ব দেখাবার জন্যে বলতে হয়। বংবন্ধুর সরকারের পতনের পর খোন্দকার মোশতাক রাস্ট্রপতি বা প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে বাণী পাঠিয়েছিলেন। শ্রীমতি গান্ধী বলেছিলেন, তাঁরা বাংলাদেশে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সরকার দেখতে চান। বংগবন্ধুর সরকারের সাথে ভারত সরকারের সম্পর্ক খুব উষ্ণ ছিল বলা যাবেনা বংগবন্ধু নিজেই বলেছিলেন তিনি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলীম রাস্ট্রের রাস্ট্র প্রধান। তাই অনেকেই মনে করেন বংগবন্ধুর সরকারের পতনের পেছনে ভারতের হাত ছিল। জেনারেল এরশাদ নির্বাচিত রাস্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখল করলে ভারত তাঁকে অভিনন্দিত করেছিলো। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিনি দিল্লীর সাথে আলাপ করেই ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। কোলকাতার আনন্দ বাজার গ্রুপের ম্যাগাজিন দেশ এর মন্তব্য ছিল বন্দুকের নলে প্রজাপতি। ঢাকার বাংলার বাণী বলেছিল, একটি গুলিও ফুটেনি। জিয়া ও খালেদা জিয়ার সরকার গুলোর সাথেও ভারতের সম্পর্ক খারাপ ছিল বলা যাবেনা। তবে কখনই উষ্ণ ছিলনা। হাসিনার সরকারকে ভারত সব সময় হৃদয় দিয়ে ভালবেসেছে।বিপদের সময় দিল্লী হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে বহু বছর দেখাশুনা করেছে। দিল্লীর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের মানুষ অবাক হয়নি। হাসিনার সাথে দিল্লীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক মধুর এটা সবাই জানেন। দিল্লীর একজন মন্ত্রীতো বলেই ফেলেছেন, ভারতের সাথে বাংলাদেশের এত মধুর সম্পর্ক এর আগে কখনই ছিলনা। একজনতো আবেগের তাড়নায় বলেই ফেলেছেন, বিগত একশ’ বছরেও ভারতের সাথে বাংলাদেশ এত ভাল সম্পর্ক ছিলনা। সত্যি কথা বলতে কি, ভারত বাংলাদেশে যুগের পর যুগ আওয়ামী লীগকে( বংগবন্ধুর বংশধরদের ) ক্ষমতায় দেখতে চায়। যেমন নেহেরুর পরিবার থেকে ভারত মুক্তি পাচ্ছেনা। লোকে বলে নেহেরু পরিবার ও কংগ্রেসের সাথে শেখ হাসিনার প্রায় আত্মীয়তার সম্পর্ক। তাই ভারতের স্বার্থ আর হাসিনার স্বার্থ প্রায় একই।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিডিআর এ সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা আর কথিত ক্যু একই সূত্রে গ্রথিত। একই উদ্দেশ্যে ঘটানো হয়েছে। বিডআরএ ৫০ এর বেশী সেনা অফিসারকে হত্যা আর এবারে ক্যুর অভিযোগ এনে বেশ কিছু অফিসারকে ধ্বংস করার নীল নকশা একই লক্ষ্যে পরিচালিত। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশের সেনা বাহিনীকে মানসিক ভাবে পরাভূত করে রাখা। ৭১ সালে ভারত মুজিব নগর সরকারকে অনুরোধ করেছিল সেনাবাহিনী গঠণ না করার জন্যে। সম্প্রতি আমরা লক্ষ্য করছি, ভারতের হেরিটেজ ফাউন্ডেশন গবেষণা করছে কিভাবে ইতিহাসের ভুল গুলোকে শোধরানো বা মেরামত করা যায়। তাই সেখানকার গবেষকরা বলছেন, ৪৭ সালে ভারত বিভাগ ভুল ছিল। ভাগের জন্যে তাঁরা দায়ী করেছেন গান্ধী, নেহেরু ও প্যাটেলকে। তাঁরা বলছেন, জিন্নাহ ভারত ভাগ চাননি। এই ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য অখন্ড বা নিখিল ভারত প্রতিস্ঠা করা। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের পক্ষে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে বেশ কিছু বুদ্ধিজীবী কাজ করছেন বলে জানা গেছে। ফাউন্ডেশনকে অর্থ যোগান দিচ্ছে আমেরিকা ও বৃটেনের বেশ কিছু থিন্কট্যান্ক।
শেখ হাসিনার এবারে ক্ষমতায় আসার পটভূমি বিশ্লেশন করলে দেখা যাবে তথকথিত নির্বাচন দেয়ার আগে সেনা বাহিনীর প্রধানকে দিয়ে ১/১১র সরকার প্রতিস্ঠা করা হয়। ষে সরকার দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করেছে। গ্রাম গঞ্জের হাট বাজারকে তচনচ করে দিয়েছে। বহু রাজনীতিক ও শিল্পপতিকে দেশছাড়া করেছে। সেনা প্রধান মইন উ আহমদ নিজেকে ফোর স্টার জেনারেল পদে নিয়োগ দিলেন এবং নিজেকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় আসীন করে ভারত সফরে গিয়ে ছয়টি ঘোড়া এনেছিলেন। ১/১১র সরকারটি প্রতিস্ঠা করেছিল ইইউ, ভারত ও বৃটেন।সেই সরকারের আদর্শ উদ্দেশ্য নিয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। তখন থেকেই আোয়ামী লীগ ভারত সরকারের এজেন্ড বাস্তবায়ন করে চলেছে। ভারত বহুবার বলেছে তারা বাংলাদেশে ধর্মমুক্ত স্যেকুলার সরকার চায়। দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত করার আমেরিকা ও ভারতের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে। ভারত ও আমেরিকা মনে করে সন্ত্রাস হচ্ছে ইসলাম। ২০০৮ সালেই ফরহাদ মজহার লিখেছিলেন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে ইসলাম মুক্ত করার জন্যে বিদেশীরা কর্মসূচী নিয়েছে। বেশ কিছুদিন আগে বৃটেন এদেশের মাদ্রাসা গুলোর উপর এক জরীপ চালিয়ে তাদের নিজেদের মন মতো প্রতিবেদন তৈরী করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় কিছুদিন আগে নিবন্ধ লিখে বলেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মাদ্রাসার ছাত্র রিক্রুট করা হচ্ছে।
সেনাবাহিনী ক’দিন আগে সংবাদ সম্মেলন করেছে বলেছে, কিছু ধর্মান্ধ সেনা অফিসার ব্যর্থ অভ্যুত্থানের চেস্টা করেছে। তাদের সেই চেস্টাকে ব্যর্থ করে দেয়াস হয়েছে। এই ব্যর্থ চেস্টার সাথে ১৫/১৬ জন অফিসার জড়িত। সেনা বাহিনী যা বলেছে তা হয়ত সত্য, কিন্তু দেশবাসী তা বিশ্বাস করেনি চলমান সময় ও রাজনীতির কারণে। তবে দেশবাসী বুঝতে পারছে, বাংলাদেশকে ইসলাম মুক্ত করার জন্যে আওয়ামী লীগ, ভারত, আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলো একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। আমেরিকার লস এন্জেলেস টাইমস দিল্লীর বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে বলেছে, সেনা বাহিনী থেকে কিছু ধর্মপ্রাণ অফিসারকে বাদ দেয়ার জন্যেই এই সেনা অভ্যুত্থানের খবর প্রচার করা হয়েছে। এসব কর্মকান্ডের লক্ষ্য হচ্ছে আগামী নির্বাচন। ভারত শেখ হাসিনাকে আবারও ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে চায়। তাই সরকার বিরোধী সকল দলকে কথিত অভ্যুত্থানের সাথে জড়াবার চেস্টা করা হচ্ছে।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
Posted in Articles | Comments Off
রাজধানীর ফাইভস্টার হাসপাতাল ও দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে নয় দিগন্তে আমার একটি লেখা ছাপা হয়েছে ২রা নবেম্বর,২০১১ তারিখে। পরে সেই লেখাটি আবার ছাপা হয়েছে দৈনিক দিনকালে। লেখাটি ছাপা হওয়ার পর থেকে আমি অনেক গুলো মেইল ও ফোন পেয়েছি। বিশেষ করে রাজধানীর ফাইভ স্টার হাসপাতাল গুলোর অব্যবস্থাপনা, কর্মচারীদের দুর্ব্যবহার ও ভুল চিকিত্সার অনেক অভিযোগ এসেছে আমার কাছে। বিশেষ করে যাদের প্রিয়জন এসব হাসপাতালের অবহেলার কারণে মারা গেছেন তাঁরা অনেকেই আমার সাথে যোগাযোগ করেছেন। লেখক হিসাবে আমার কলমের তেমন ক্ষমতা নেই আমি তাদের বেদনার ক্ষতে কিছুটা উপশম করতে পারি। এছাড়া হাসপাতালের মালিকরা হলেন অনেক টাকার মালিক। এর আগের লেখায় বলেছি, ফকিরাপুলে নোংরা পরিবশে প্যাথলজির দোকান খুলে এখন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মালিক। কেউ যদি ধনী হওয়ার সহজ উপায় বই লিখতে চান তাদের জন্যে বাংলাদেশ খুবই উপযুক্ত জায়গা। আমিতো দেখছি ব্যান্কের ক্লার্ক ব্যান্কের চেয়ার ম্যান। ৮৩ সালের ব্যান্ক প্রতিস্ঠা করার জন্যে যাঁরা দশ লাখ টাকা জোগাড় করতে পারেননি তাঁরা এখন এক হাজার কোটি টাকার মালিক। বাংলাদেশে এখন মহা বড় গ্রুপ হিসাবে পরিচিত ও মুল্যায়িত এক কর্পোরেট হাউজের মালিককে আমি নিয়ে গিয়েছিলাম আমার প্রিয় ব্যান্কার মুজিবুল হায়দার চৌধুরীর কাছে ১৯৮৫/৮৬ সালের দিকে মাত্র তিন কোটি টাকার জন্যে। সেই ভদ্রলোক এখন কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক।। চৌধুরী সাহেব হলেন এদেশের প্রথম বেসরকারী ব্যান্ক ন্যাশনাল ব্যান্কের প্রতিস্ঠাতা। এর পরে তিনি প্রতিস্ঠা করেন এনসিসি ব্যান্ক। তিনি ওই ভদ্রলোককে টাকা দিতে রাজী হয়েছিলেন। চৌধুরী সাহেব হলেন এদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ উন্নয়ন ব্যান্কার। হাজার হাজার যুবককে চাকুরী দিয়েছেন। হাজার হাজার যুবককে ব্যবসা বাণিজ্যে প্রতিস্ঠিত করেছেন। এসবতো হলো প্রাসংগিক কথা।
এইতো ক’দিন আগে পরলোকে চলে গেছেন আমাদের দেশের একজন বিখ্যাত শিল্পপতি স্যামসন এইচ চৌধুরী। তিনি বিখ্যাত স্কয়ার গ্রুপের প্রতিস্ঠাতা। তাঁর তিরোধানে শোক প্রকাশ করেছেন, রাস্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা। এতেই বুঝা যায় তিনি কত বড় মাপের শিল্পপতি ছিলেন। তিনিও শুরু করেছিলেন ছোট্ট একটি অষুধের দোকান দিয়ে। তিনি হাটি হাটি পা পা করে সামনের দিকে এগিয়ে গেছেন। তিনি ম্যারাথন দৌড়ের প্রতিযোগী ছিলেন। তাই বর্তমান পর্যায়ে আসতে তাঁর লেগেছে ৫০ বছরেরও অধিক সময়। কিন্তু যাঁরা হান্ড্রেড মিটারে বিশ্বাস করেন তাঁরাতো অত লম্বা সময় অপেক্ষা করতে পারেন না। বাংলাদেশের ধনীদের বেশীর ভাগই সরকারী কর শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ধনী হয়েছেন। শুরুর দিকে গার্মেন্টসের মালিকরা ডিউটি ফ্রি কাপড় খোলা বাজারে বিক্রী করে টাকা কামিয়েছেন। ম্যান পাওয়ারের ব্যবসায়ীরা মানুষকে ঠকিয়ে বিত্তবান হয়েছেন। আবাসন শিল্প নিয়ে লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে। রিহ্যাবের ১৫০০ সদস্যের ভিতর মাত্র ১৫/২০ জন নীতিবান লোক রয়েছেন। বিশেষ করে যাঁরা জমির ব্যবসা করেন তাঁরা কেউই আইনের ভিতর থেকে ন্যায় ব্যবসা করেন না। তার উপর রয়েছে অল্প সময়ে অধিক পরিমানে অর্থ আয় করা। কিস্তির টাকা সব শোধ করার পরও বহু মানুষ জমি বুঝে পাননি। সেদিক থেকে বিচার করলে স্যামসন চৌধুরী তূলনামূলক ভাবে একজন পরিচ্ছন্ন ব্যবসায়ী ছিলেন। অনেকেই বলেন তিনি খৃস্ট ধর্ম গ্রহন করে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন। বিষয়টা কতটুকু সত্য আমি জানিনা। চৌধুরী সাহেব উন্নততর চিকিত্সার জন্যে সিংগাপুর গিয়েছিলেন। এর মানে শেষ জীবনে নিজের হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ও চিকিত্সকদের উপর তাঁর আস্থা ছিলনা এবং সেখানেই তিনি শেষ নি:শেষ ত্যাগ করেন। তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি যে, স্কয়ার হাসপাতাল স্যামসন চৌধুরীর মতো মানুষের রোগ বা মর্যাদা অনুযায়ী তেমন উচ্চমানের নয়।
এতদিন আমাদের বিশ্বাস ও আস্থা ছিল যে, স্কয়ার হাসপাতাল আন্তর্জাতিক মানের চিকিত্সা দিয়ে থাকে। এখানকার ডাক্তারগণও বিশ্বমানের। কিন্তু চৌধুরী সাহেব এবং তাঁর পরিবার পরিজন নিজেরাই প্রমান করেছেন যে, তাঁদের হাসপাতাল ধনীদের জন্যে নয়। তাহলে কারা এই হাসপাতালের চিকিত্সা গ্রহণ করবেন। আমিতো নিয়মিত এই হাসপাতালে আসা যাওয়া করি। জরুরী কারণে হাসপাতালে ভর্তিও হই। রুগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। নিজের প্রিয়জনের জীবন বাঁচাতে অনেক গরীব মানুষও জমি জমা বিক্রি করে এই হাসপাতালে চিকিত্সার জন্যে আসেন। আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাত দেখিয়ে গরীব রুগীদের কেবিনে ভর্তি হতে বাধ্য করেন। যাতে করে প্রতিদিন রুগীর আত্মীয় স্বজনের কাঁধে ১৭/১৮ হাজার টাকার বিলের বোঝা আসে। স্কয়ারের রুগীরা স্কয়ারের অষুধ কিনতে বাধ্য। শুনেছি এ ব্যাপারে ডাক্তারদের কাছে কোন অপশান নেই। এমন কি ডাক্তার সাহেবেরা প্রেসক্রিপশনটা রুগীদের হাতে না দিয়ে সরাসরি নিজেদের ফার্মেসীতে পাঠিয়ে দেন কম্পিউটারের মাধ্যমে।
রাজধানীর ফাইভ স্টার হাসপাতাল গুলোর উপর সরকারের নজরদারী কেমন আছে জানিনা। এসব হাসপাতালের মান সম্পর্কেও দেশবাসী অবহিত নয়। এখানেতো সবকিছুই টাকার বিনিময়ে হচ্ছে। তাহলে কোয়ালিটি কন্ট্রোল হচ্ছে কিনা রুগীরা জানবে কেমন করে। এই হাসপাতাল গুলো আয়কর দিচ্ছে কিনা তাও দেশবাসী জানেনা। না, মানবতার সেবার কথা বলে আয়কর রেয়াত নিচ্ছে? শুনেছি , স্কয়ার ইতোমধ্যেই নিজেদের মূলধন তুলে নিয়েছে। এর মানে হচ্ছে মুনাফা শতকরা একশ’ ভাগের চেয়েও বেশী। আমাদের দেশে এমন ডাক্তারও আছেন, যাঁদের মাসিক আয় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এঁরা কি পরিমাণ আয়কর দেন তাও দেশবাসী জানেনা। আমার জানতে ইচ্ছা করে বিদেশী হাসপাতাল গুলো বাংলাদেশে অফিস খুলে বসে আছে কেন? নিশ্চয়ই তারা এখানে ভাল রুগী পায়। বেশ ক’বছর আগে আমি কয়েকদিন কোলকাতার বিড়লা হাসপাতালে ছিলাম। তখন ঢাকায় এনজিওগ্রাম হতোনা। হাসপাতালে থাকার সময় সবচেয়ে ভাল দেখেছি নার্সদের ব্যবহার। তারা ছিল সদা হাস্য। না ডাকতেই এসে হাজির। না চাইতেই চা নাশতা। এসবতো তারা বিনে পয়সায় করেনা। পয়সা গেলেও রুগীরা খুব খুশী। কিন্তু আমাদের ফাইভ হাসপাতাল গুলো টাকা নিচ্ছে ভারত বা ব্যান্ককের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। আমাদের হাসপাতাল গুলোর সেবার মান খুব উঁচু দরের নয়। যদি হতো তাহলে স্যামসন চৌধুরী সাহেব নিজ হাসপাতালেই চিকিত্সা নিতেন। ধনীদের ব্যাপার স্যাপার না হয় একটু আলাদা। কিন্তু মধ্যবিত্তরা কি করবে। তারাতো বিদেশ যেতে চায়না বা যেতে পারেনা। আশাতো ছিল ফাইভ স্টার হাসপাতাল গুলো মধ্যও উচ্চ বিত্তদের সেবা দিবে। এর আগে আমি লিখেছিলাম, স্কয়ারের কর্মচারীদের কিছু বললেই তাঁরা বলেন অভিযোগ বইতে লিখুন। এর মানে অভিযোগে কিছু হয়না। আমি স্কয়ারের ওয়েব সাইটে যেয়ে মেইল করে অভিযোগ জানিয়েছিলাম। কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া বা উত্তর পাইনি। স্কয়ারের জনসংযোগ বিভাগও খুবই দূর্বল। মিডিয়ার সাথে এর কোন সম্পর্কই নেই।
বিভিন্ন ফাইভ স্টার হাসপাতাল সম্পর্কে আমার কাছে অনেক গুলো মেইল এসেছে। তন্মধ্যে যাদের প্রিয়জন নিহত বা মারা গেছেন তাঁরা অনেকেই খুবই বেদনা ভারাক্রান্ত মন ও হৃদয় নিয়ে আমার সাথে দেখা করেছেন। অনেকেই প্রচুর কাগজপত্র নিয়ে এসেছেন। তাঁরা বলেছেন প্রতিকারের আশা করিনা। শুধু অভিযোগ গুলো, দু:খ ও বেদনা গুলো আপনাকে শুনিয়ে মনকে কিছুটা হালকা করতে চাই। আপনারাই বলুন, এমন বেদনার কথা না শুনে বা না লিখে কি পারা যায়? আজ মরহুম সেরাজুল ইসলাম সাহেবের ঘটনাটা পাঠক সমাজের কাছে তুলে ধরতে চাই। ইসলাম সাহেব একজন বড় সরকারী কর্মচারী ছিলেন। ২০১১ সালে পবিত্র হজ্বে গিয়েছিলেন। পায়ের অসুখ নিয়ে দেশে ফিরেছেন ২৩শে ডিসেম্বর। বারডেম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২৪শে ডিসেম্বর।বলা হলো সেরাজুল ইসলাম সাহেব সেলুলাইটিস ইনফেকশানে আক্রান্ত। অপারেশন করতে হবে।২৫শে ডিসেম্বরেই জরুরী ভিত্তিতে তাঁর পায়ে অপারেশন করা হয় বারডেমে। ড্রেসিংয়ের অসুবিধার কারণে তাঁকে স্কয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করার উদ্যোগ নেয়া হয়। মরহুমের কন্যা শারমিন জানিয়েছেন, ৫ই ডিসেম্বর তাঁরা স্কয়ারের এ্যাডমিশন যোগাযোগ শাখায় করেন। কিন্তু হাসপাতালের সংশ্লিস্ট কর্মকর্তারা বেড বা কেবিন নেই বলে জানান। পরের দিন মানে ৬ই ডিসেম্বর তাঁরা আবার স্কয়ারে যান। তখন তাঁদের বলা হলো, দৈনিক ১৭ হাজার টাকা ভাড়ায় সুইট পাওয়া যাবে। কোন উপায় না দেখে বাধ্য হয়ে শারমিন ও তাঁর আত্মীয়রা সেরাজ সাহেবকে সুইটে ভর্তি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কথা ছিল কেবিন খালি হলে তাঁকে সেখানে শিফট করা হবে। সুইট ভাড়া ১৭ হাজার টাকার কথা চিন্তা করে শারমিন তাঁর চাচার পরিচিত একজনের সহযোগিতা কামনা করেন। সে ভদ্রলোক কেবিনের ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু এতে এ্যাডমিশন শাখার মৌসুমী নামের এক স্টাফ শারমিনদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে শুরু করে। যাক, শেষ পর্যন্ত কেবিন পাওয়া যায় এবং সেরাজ সাহেব ডা: রুহুল আমিন জোয়ারদারের তত্বাবধানে ভর্তি হন। সেরাজ সাহেব ১০/১২ দিন স্কয়ার হাসপাতালে ছিলেন। মরহুমের কন্যার অভিযোগ এ সময়ে তাঁর বাবার ডা: জোয়ারদার কখনই ভাল ব্যবহার করেননি। বরং আচরনটা কিছুটা রূঢ ছিল। জানিনা, শারমিন বাবার মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে আবেগে এই অভিযোগগুলো করেছেন।
১৭ই ডিসেম্বর ডা: জোয়ারদার জানালেন রুগীর প্লাস্টিক সার্জারী করতে হবে এবং শমরিতা হাসপাতালের ডা: কালামের কাছে রেফার করেন। শারমিন জানালেন সেদিন তাঁর বাবা সুস্থই ছিলেন এবং সবার সাথে স্বাভাবিক কথা বার্তা বলছিলেন। ঐদিন বিকেল চারটার দিকে ডা; ইমতিয়াজ নামের একজন ডাক্তার দুদিজন নার্স নিয়ে সেরাজ সাহেবকে ড্রেসিং করতে যান। রুগীর আত্মীয় স্বজনকে রুমের বাইরে অবস্থান করতে বলেন। শারমিনরা বাইরে অবস্থান করছিলেন। মিনিট দশেক পর একজন নার্স একটি নরমাল স্যালাইন আনতে অনুরোধ জানান।স্যালাইন আনার জন্যে সেরাজ সাহেবের একজন আত্মীয় ১২ তলা থেকে এক তলায় যান। ফিরে আসতে সময় লেঘেছে মাত্র ৮ মিনিট। নার্সকে স্যালাইন দেয়ার জন্যে কেবিনে গিয়ে দেখেন রুগীর মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে এবং তিনি শ্বাস নিতে পারছেন না। শারমিন তখন চিত্কার করে অক্সিজেন দিতে ডাক্তারকে অনুরোধ জানান। রুগীর বিচানার কাছেই অক্সিজেন ট্যাপ থাকলেও তা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। পরে দেখা গেলো তা অকেজো ছিল। পাঁচ মিনিট পর অক্সিজেন সিলিন্ডার এনে লাগানো হয়। কিন্তু রুগী অক্সিজেন নিতে পারছিলেন না। এ সময়ে শারমিনকে কেবিনে থাকতে দেয়া হয়নি। আরও ৭ মিনিট পরে সিপিআর টীম এসে রুগীকে ইলেক্ট্রিক শক দেয়ার চেস্টা করা হয়। ১০ মিনিট ডা: ইমতিয়াজ কেবিন থেকে বের হয়ে জানালেন রুগীর হার্টবিট পাওয়া যাচ্ছেনা। এর পরে জানানো হলো রুগীর হার্র্টবিট পাওয়া গেলেও তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন। ডা: ইমতিয়াজ রুগীর আত্মীয় স্বজনকে জানালেন, তাঁরা অনুমতি দিলে রুগীকে আইসিইউতে নেয়া যেতে পারে। আইসিইউতে নেয়ার পাঁচ মিনিট পর ডা: ইমতিয়াজ জানালেন রুগীর ব্রেনে রক্ত চলাচল বন্ধ থাকার কারণে তাঁর ব্রেন ডেমেজ হয়ে গেছে।
হাসপাতালের একজন নার্স শারমিনকে জানিয়েছিল যে, সেরাজ সাহেব ড্রেসিংয়ের সময় বার বার তাঁর কস্ট ও খারাপ লাগার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ডাক্তার বা নার্স কেউ তা ভ্রুক্ষেপ করেননি। সেরাজ সাহেবের কন্যা শারমিন তাঁর বাবার মৃত্যুর জন্যে ডা: ইমতিয়াজ ও তাঁর টীমকে দায়ী করেছেন। এ ব্যাপারে রুগীর আত্মীয় স্বজন হাসপাতালের ডিরেক্টর মেডিসিন ডা: সানোয়ার হোসেনের সাথে দেখা করে তদন্তের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। ডা: সানোয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর ওয়াদা পালন করেননি। যদি তদন্ত করা হতোও তাহলেও তেমন কিছু হতোনা। আমরা অতীতে এ রকম তদন্তের ফলাফল বহু দেখেছি। আমাদের দেশে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তাঁরা ধর্মঘটের ধমক দেন। মেডিকেল কলেজ গুলোতে এমন ঘটনা অহরহ হচ্ছে। এইতো দেখুন আমাদের দেশের পুলিশী ব্যবস্থা হলো, পুলিশ অভিযোগ আনবে, পুলিশই গ্রেফতার করবে, পুলিশই সাক্ষী দিবে। ফৌজদারী আইন ব্যবস্থা আমাদের দেশে এ রকমই। এখানে দারোগা সাহেব নিজেই বাদী নিজেই সাক্ষী। তিনিই রাস্ট্র পক্ষ। সুতরাং রাস্ট্রের বিরুদ্ধে কে লড়াই করবে। হাজারো চেস্টা করেও আমাদের দেশে পুলিশের ইমেজ বা ভাবমুর্তি প্রতিস্ঠা করা যায়নি। কোনদিন হবে কিনা তার কোন লক্ষণ দেখতে পাচ্ছিনা। ডাক্তারদের ইমেজও দিন দিন খারাপ বা অবনতির দিকে যাচ্ছে। উচ্চ আদালতের বিচার ব্যবস্থার ভাবমুর্তিও দ্রুত অবনতির দিকে ধেয়ে চলেছে। নিম্ন আদালতের উপর জনগণের আস্থা বহু আগেই নস্ট হয়ে গেছে। রাস্ট্রের কোন প্রতিস্ঠান নাই যার উপর জনগণের আস্থা আছে। ফলে সমস্যা সমাধানের পথ হিসাবে এখন রাস্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়েছে। বিরোধীদলএর সংসদ সদস্যরা সংসদে যায়না , কারণ তাঁদের নাকি কথা বলতে দেয়া হয়না। তাই তাঁরা কথা বলার জন্যে রাস্তাকে বেছে নিয়েছেন। সরকারী দলের জন্যে সংসদ আর বিরোধী দলের জন্যে রাস্তা এখন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। সংসদের এমন হাল হকিকত দেখে সবাই এখন রাস্তাকে গন্তব্য বলে নির্ধারিত করেছে।
তাই আমরা দেখতে পাই রুগী মারা গেলে রুগীর স্বজনরা হাসপাতালে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করেন। ছাত্র হলেতো আর কথাই নেই। মা বাবা সন্তানকে শাসন করলে বা বকা দিলে তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। পরমত সহিষ্ণুতা , যা গনতন্ত্র ও সভ্য সমাজের উপাদান তা এখন বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। সমাজের কোন স্তরেই এই সহিষ্ণুতা নেই। এই কারণেই আসিফ নজরুল সাহেবের উপর ছাত্ররা হামলা করে। বিপরীত মত কিছুতেই প্রকাশ করা যাবেনা। সরকারও বিপরীত মত সহ্য করতে চাননা। তাই নানা কৌশলে মুখ চেপে ধরতে চেস্টা করছে। টভি চ্যানেলে কারা কথা বলতে পারবেন আর কারা বলতে পারবেন তা নির্ধারন করে দিচ্ছেন সরকার।
ডাক্তারী পেশা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক পেশা। মানুষকে চিকিথসা দেয়াই তাঁর ধর্ম। রুগীদের সাথে সু ব্যবহার করাই ডাক্তারের ব্রত হওয়া উচিত। হয়ত তাঁরা তা করছেন। হয়ত রুগীর সংখ্যা দিনদিন বেড়ে চলেছে, সে হিসাবে ডাক্তার বাড়েনি। সব কথার উর্ধে হলো রুগীর চিকিত্সা। ভাল চিকিত্সা দিতে না পারলেও হাসিমুখে ভাল ব্যবহার করতে অসুবিধা কোথায়? সরাকারের প্রতিও দেশবাসীর আশা তাঁরা বেসরকারী ফাইভ স্টার হাসপাতাল গুলোর উপর নজরদারী আরও বাড়িয়ে দিবেন। প্রত্যেক হাসপাতালে ৩০ ভাগ গরীব রুগীকে কম মূল্যে বা বিনা পয়সায় চিকিত্সা দেয়ার বিধান জারী করা মানবিক কর্তব্য বলে আমরা মনে করি।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
Posted in Articles | Comments Off
এর আগে অনেকবার লিখেছি, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আমাদের বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠতম কবি। এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত আছে বলে আমার মনে হয়না।বেশ কিছুদিন ধরে কবির ১৫০তম জন্ম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে বাংলাদেশে। সম্প্রতি কবিগুরুকে নিয়ে সরকারী প্রতিস্ঠান বাংলা একাডেমী দুদিনের আন্তর্জাতিক অনুস্ঠানের আয়োজন করেছে। আন্তর্জাতিক মানে পশ্চিম বাংলার কিছু জ্ঞানী গুণীজনকে ঢাকায় এনে এর নাম দেয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক। পশ্চিম বাংলার গুণীজন দাওয়াত বা নিমন্ত্রন না পেলেও সোনার বাংলায় আসেন নিয়মিত। কারণ, তাঁরা এ বাংলাকে কখনও তাঁদের ভারতীয় বাংলাকে আলাদা মনে করেন না। প্রধান আকর্ষন ছিলেন অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অমর্ত সেন। আমাদের নোবেল বিজয়ী মোহাম্মদ ইউনুসের সাথে আওয়ামী লীগ সরকারের দিনকাল ভাল যাচ্ছেনা। দেশবাসী জানেনা , প্রধানমন্ত্রীর এত রাগ কেন ইউনুস সাহেবের উপর। আওয়ামী পন্থী কিছু লোক বলে নোবেলটা নাকি শেখ হাসিনার পাওয়ার কথা ছিল। ইউনুস সাহেব লবী করে নোবেলটা নিজের জন্যে নিয়ে নিয়েছেন। শুনেছি, প্রধানমন্ত্রীও লবিস্ট নিয়োগ করেছিলেন এ কাজের জন্যে। কিছু আমলা এ কাজে দুই পয়সা ব্যয়ও করেছেন। আমাদের কবিগুরু সম্পর্কেও এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে। তিনিও নাকি ইংরেজ সাহেবদের খুশী করে নোবেল জিতে নিয়েছেন। তাঁর দাদা মানে ঠাকুরদা দ্বারকানাথ ঠাকুর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সাহেবদের খেদমত করে বেসরকারী প্রিন্স টাইটেল পেয়েছিলেন। এটা কোন সরকারী তগমা নয়। বন্ধুরা আদর করে তাঁকে প্রিন্স ডাকতেন। সাহেবদের মনোরঞ্জনের জন্যে দ্বারকানাথ বাবু দুই হাতে টাকা খরচ করতেন। একই ভাবে রাম মো্ন বাবুর কোন রাজ্য রাজত্ব বা জমিদারী ছিলনা। খুব সম্ভব ১৮৩৩ সালে পতিত মোঘল বাদশাহ দ্বিতীয় আকবর শাহ রাম মোহন বাবুকে রাজা টাইটেল দিয়ে দূত হিসাবে বিলেত পাঠিয়েছিলেন তাঁর পক্ষে তদবীর করার জন্যে। বাদশাহর দূত হিসাবে তিনি রাজা টাইটেল পেতেই পারেন।
আমাদের কবিগুরু শুধুই একজন বিশ্বখ্যাত কবি ছিলেন না, তিনি একজন জমিদার ও ব্যবসায়ী ছিলেন। সবই তিনি পেয়েছিলেন ওয়ারিশয়ানা সূত্রে। সওদাগর ও জমিদার হিসাবে রবীন্দ্রনাথ নাকি হিসাব নিকাশ ভালই করতেন। সেদিক থেকে বিচার করলে অনায়াসে বলা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথ একজন দক্ষ ম্যানেজারও ছিলেন।রাজনীতির ব্যাপারেও তাঁর আগ্রহের কমতি ছিলনা। ভারতের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরও একজন উচ্চ মানের কবি ছিলেন। কবি হিসাবে তিনি অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন। তিনি ১৮৫৮ সালের ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান সিপাহসালার ছিলেন। কবিগুরুর বিরুদ্ধে তাঁর কাব্য জগত নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা সমালোচনা আছে। জগতে কবির সাহিত্য যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন আলোচনা সমালোচনাও থাকবে। আমি ব্যথিত হই যখন দেখি কবিগুরু তাঁর জমিদারী ও সওদাগরী স্বার্থে গণমানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁরই সময়ে তাঁরই স্নেহধন্য অনুজ কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইংরেজের বিরুদ্ধে কথা বলেও লিখে জেলে গিয়েছেন। আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের স্বাধীনতার কথা বলেছেন। এই প্রসংগে ইতিহাসের পাতা থেকে তুলে আনা দুটো কথা বলতে চাই। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বিহারের পাটনা দখল করে তখন বিপ্লবী কবি নজরুলের পূর্ব পুরুষ ছিলেন পাটনার প্রধান বিচারপতি। প্রাণের ভয়ে তাঁরা আত্ম গোপন করে পালিয়ে বর্ধমানের আসানসোলে আশ্রয় গ্রহন করেন। ওই একই সালে কবিগুরুর পূর্ব পুরুষ নীলমনি ঠাকুর উড়িষ্যার দেওয়ানীতে আমিনগিরির চাকুরী গ্রহণ করেন। দ্বারকা নাথও এক সময় ইংরেজ সাহেবদের মুন্সী ছিলেন। সেখান থেকেই সাহেবদের দালালী ও ফড়িয়াবাজী করে তিনি অর্থ কামিয়েছেন। তারপরে প্রিন্স ও জমিদার হয়েছেন। রাম মোহনও এক সময় মুর্শিদাবাদে পেশকার ছিলেন।
আমার আজকের আলোচনার বিষয় হচ্ছে রবীন্দ্র নাথ মানুষ হিসাবে কেমন ছিলেন। মানুষের যে সীমাবদ্ধতা আছে সেগুলো তাঁ ছিল কিনা । তিনি কি তাঁর কাব্যের কারনে দেবতার আসনে পৌঁছে গিয়েছিলেন কিনা। রবীন্দ্র নাথের প্রজারা তাঁর সম্পর্কে কি বলতেন। রবীন্দ্রনাথের কাব্য বা সাহিত্য থেকে তেমন আয় ছিলনা। তাঁর কাব্যের ইংরেজী অনুবাদের জন্যে তিনি নোবেল পেয়েছিলেন। নোবেল পাওয়ার পর তাঁর দিকে দেশে ও বিদেশে সবার নজর পড়ে। রবীন্দ্রনাথ কখনই সমালোচনার উর্ধে ছিলেন না। কবি হিসাবেও তিনি বহুল সমালোচিত। জমিদার ও বাবসায়ী হিসাবেও তিনি তাঁর অমানবিক কাজের জন্যে সমালোচিত। ভারতীয় গবেষকরা কবিগুরুকে নিয়ে ব্যাপক গবেষণা, আলোচনা সমালোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের বাংলাদেশে তেমন গবেষণা বা আলোচনা হয়না। এখানে যা হয় তা হলো বন্দনা। এখানে কবিগুরুর মানসদাস ও পূজারী আছে। মনে হয় তিনি অবতার বা দেবতায় পরিণত হয়েছেন। এ বিশ্ব যত বড় নামী দামী মানুষ আছেন বা ছিলেন তারা কেউই সমালোচনার উর্ধে নন। মানুষ ভুলের অধীনেই জীবন যাপন করে। যাঁরা শাসক তাঁরা তাঁদের আসন ব্যবস্থার জন্যে সমালোচিত হন ঐতিহাসিকদের কাছে। আমদের সমকালের ইতিহাসের দিকে একবার তাকান। এইতো দেখুন না, বংগবন্ধু একজন বিখ্যাত রাজনীতিক। বাংলাদেশের মানুষের জন্যে সারা জীবন সংগ্রাম করেছে। যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হিসাবে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও প্রথম রাস্ট্রপতি হিসাবে কম সমালোচিত নন। যদিও আওয়ামী লীগ ও বংগবন্ধুর অন্ধ ভক্তরা কোন ভাবেই বংগবন্ধুর সমালোচনা সহ্য করতে চায়না। জগতকে যাঁরা পরিবর্তন করেছেন সেই নবী রাসুলগণ তাঁদের প্রতিপক্ষের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন। আল্লাহর নির্দেশে জন্মভূমি ত্যাগ করেছেন আমাদের প্রিয় নবী আল্লা্পাকের শেষ রাসুল হজরত মোহাম্মদ(সা)কে মক্কাবাসী তাঁর আত্মীয় স্বজন সীমাহীন অত্যাচার করেছে।
সেখানে রবীন্দ্রনাথ বা বংগবন্ধু কিছুইনা। এঁরা দুজনই সাধারন মানুষ। একজন কাব্য জগতের বাদশাহ, অপরজন গণমানুষের নেতা। কিন্তু তাঁদের যে ভুল ভ্রান্তি নেই একথা আমরা কেউ কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি? বাংলাদেশে এক নতুন সংস্কৃতি চালু হয়েছে। যাঁদের ক্ষমতা বেশী বা দলভারী তাঁদের কোন সমালোচনা করা যাবেনা। আমাদের এখন যে অভ্যাস হয়েছে তাতে আমরা শান্ত হয়ে কোন বিষয় বুঝতে চাইনা, অথবা সত্য হলেও অন্যের ভিন্নমতকে সহ্য করতে চাইনা। চলমান বাংলাদেশের রাজনীতির ভাষা দেখেই আপনারা বুঝতে পারছেন আমরা কত অসহনীয় উঠেছি। মনে হয়, আমরা কোন অসভ্য জাতি হাজার বছর আগের কোন সমাজে বাস করছি। রাজনীতিবিদদের ভাষা দেখে মনে হয় তাঁরা আদব কায়দা, আচার ব্যবহার, ভদ্রতা নম্রতা, সত্যমিথ্যা একেবারেই ভুলে গেছেন। বংবন্ধুর জামানায়ও অবস্থা এত খারাপ ছিলনা। এইতো দেখুন না ড. ইউনুসকে ত্যাগ করে আমরা ভিনদেশী ড. অমর্ত্য সেনকে নিয়ে নাচতে শুরু করেছি। আমাদের হাবভাব দেখে সেন বাবু নিশ্চয়ই মনে মনে হাসছেন অথবা কস্ট পাচ্ছেন। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী খুবই আনন্দিত। বংগবন্ধুর কন্যা ও আমাদের একজন জাতীয় নেত্রী ইতোমধ্যে বিদেশ থেকে বহু ডক্টরেট সম্মাননা পেয়ে খুবই আলোচিত হয়েছেন। ক’দিন আগে বাংলা একাডেমীর ফেলোশীপ নিয়ে ক’দিন পরেই যাবেন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আরেকটি ডক্টরেট সম্মাননা সংগ্রহের জন্যে। যাক এসব হলো প্রাসংগিক বিষয়।
রবীন্দ্রনাথ যখন জন্ম গ্রহণ করেছেন ১৮৬০ সালে। তার কিছুদিন আগেই ১৮৫৮ সালে ইংরেজদের হাত থেকে ভারতকে স্বাধীন করার জন্যে সকল মত ও পথের সৈনিকরা শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে নেতা মেনে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। সেই বিদ্রোহে ভারতের হাজার হাজার ভারতীয় সৈনিক প্রাণ দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ যে ঠাকুর পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছেন ধনমানে তার বিকাশ ঘটেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ও ইংরেজদের আমলে তাদেরই আনুকুল্যে। তাই ঠাকুর পরিবার কখনই স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেনি। সুস্পস্ট ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাংলা দখল করার পর শুরুতেই ইংরেজদের দালালী ও মোসাহেবী যারা করেছিল তন্মধ্যে ঠাকুর পরিবার অন্যতম। ১৭৬৫ সালে নীলমনি ঠাকুরই প্রথম দেওয়ানীতে চাকুরী পান। প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় বলেছেন, আমিনগীরির চাকুরি থেকেই নীলমনি দু পয়সা কামিয়ে নিলেন। আমাদের দেশের আমিনরা এখনও জরীপের সময় ওই ভাবেই টাকা কামায়। একজনের জমি আরেকজনকে দিয়ে টাকা কামায়।
১৪০৬ সালে ২৮শে কার্তিক আনন্দবাজার পত্রিকায় রঞ্জন বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন, কোলকাতা শহরে দ্বারকানাথের ৪৩টি সাহেবপাড়া ছিল। এইসব পাড়া ছিল বিদেশী জাহাজে আগত সাহেব ও শ্রমিকদের মনোরঞ্জনের জন্যে। এছাড়াও তখন তাঁর মদ ও আফিমের ব্যবসা ছিল। প্রমোদ সেনগুপ্ত তাঁর বই ‘নীল বিদ্রোহ ও বাংগালী সমাজে লিখেছেন,১৮২৪ সালে অত্যাচারী নীলকরদের ২৭১টি নীল কারখানা ছিল। দ্বারকানাথ বাবু তাঁর বন্ধুদের ছিল ১৪০টি। দেশী এবং বিদেশী নীলকররা ধান চাষীদের নীল চাষ করতে বাধ্য করতো। নীল চাষ করতে রাজী না হলে জমি থেকে উচ্ছেদ করা হতো। দ্বারকানাথের পরে দেবেন্দ্রনাথ জমিদারীর দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন।জন্মসূত্রে পিতার চরিত্র, ব্যবসা বাণিজ্য, ইংরেজ দালালী ও জমিদারী পেয়ে তিনি হয়ে উঠলেন মহর্ষি। নির্ম হাতে প্রজা দমন করে দেবেন্দ্রনাথ সুখ্যাতি অর্জন করেন।আশোক চট্টোপাধ্যায় তাঁর ” প্রাক বৃটিশ ভারতীয় সমাজ’ বইতে উল্লেখ করেছেন, কাঙাল হরিনাথ লিখেছেন, ‘ধর্ম মন্দিরে ধর্মালোচনা আর বাহিরে আসিয়া মনুষ্য শরীরে পাদুকা প্রহার একথা আর গোপন করিতে পারিনা’। কাঙাল হরিনাথের অপ্রকাশিত ডায়েরীতে লিখেছেন, ” নানা প্রকার অত্যাচার দেখিয়া বোধ হইল পুষ্করিণী প্রভৃতি জলাশয়স্থ মত্স্যের যেমন মা বাপ নাই , পশুপক্ষী ও মানুষ , যে জন্তু যে প্রকারে পারে মত্স্য ধরিয়া ভক্ষণ করে ,তদ্রুপ প্রজার স্বত্ব হরণ করিতে সাধারণ মনুষ্য দূরে থাকুক , যাহারা যোগী ঋষি ও মহাবৈষ্ণব বলিয়া সংবাদপত্র ও সভা সমিতিতে প্রসিদ্ধ, তাহারাও ক্ষুত্ক্ষামোদর।”
”প্রজারা অতিষ্ঠ হয়ে ঠাকুর বাড়ির অত্যাচারের প্রতিশোধ নেবার বিক্ষিপত্ চেস্টা করিয়া ব্যর্থ হয়। ঠাকুর বাড়ি থেকে বৃটিশ সরকারকে জানানো হলো , একদল শিখ বা পাঞ্জাবী প্রহরী পাঠাবার ব্যবস্থা করা হোক। মঞ্জুর হলো সংগে সংগে। সশস্ত্র শিখ প্রহরী দিয়া ঠাকুরবাড়ি রক্ষা করা হলো আর কঠিন হাতে নির্মম পদ্ধতিতে বর্ধিত কর আদায় করাও সম্ভব হলো। অশোক চট্টোপাধ্যায় আরও লিখেছেন, ” অথচ এরাও কৃষকদের উপর চরম অত্যাচার করিতে পিছ পা হয় নাই। কৃষকদের উপর অতিরিক্ত কর ভার চাপানোর ব্যাপারে ঠাকুর পরিবার ছিল সবার উপরে। দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন একজন অত্যাচারী জমিদার। তাঁর জমিদারীর একটা বড় অংশ ছিল আমাদের আজকের বাংলাদেশে। তাঁর প্রজাদের ৮০ ভাগই ছিলেন হতভাগ্য মুসলমান কৃষক। দেবেন্দ্রনাথের পরে জমিদারীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ। গণ অসন্তোষ ও ঊনিশ শতকের বাঙালী সমাজ বইতে স্বপন বসু লিখেছেন, ” মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের এতগুলো ছেলেমেয়ের মধ্যে তিনি জমিদার হিসাবে নির্বাচন করলেন চৌদ্দ নম্বর সন্তান রবীন্দ্রনাথকে। এও এক বিস্ময়। অত্যাচার, শোষণ, শাসন, চাবুক, চাতুরী , প্রতারণা ও কলা কৌশলে রবীন্দ্রনাথই কি যোগ্যতম ছিলেন?
কবিগুরু মূলত প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্যুক ঈশ্বর গুপ্ত ও বন্কিম চন্দ্রের ভক্ত ও অনুসারী ছিলেন। ঈশ্বর গুপ্ত প্রকাশ্যেই ইংরেজদের বন্দনা করেছেন। মুসলমানদের তিনি শত্রু মনে করতেন। বন্কিম বাবু ইংরেজদের সহযোগিতায় হিন্দু ধর্মের সংস্কার করেছেন। কবিগুরুর পরিবার ছিল হিন্দুমেলার প্রতিস্ঠাতা। এই পরিবার ব্রাহ্ম ধর্মেরও প্রতিস্ঠাতা ছিল। যোগেশ চন্দ্র বাগল লিখেছেন হিন্দু মুসলমান ভেদনীতির জন্ম হয়েছে এই হিন্দু মেলা প্রতিস্ঠার মাধ্যমে। প্রভাত কুমার মুখপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, কবিগুরু বন্কিমকে অনুসরণ করেই লিখেছেন, ” ম্লেচ্ছ সেনাপতি এক মহম্মদ ঘোরী, তস্করের মতো আসে আক্রমিতে দেশ।” ব্রাহ্মদের পোষাক প্রসংগে কবিগুরু লিখেছেন, ‘‘ ধুতিটা কর্মক্ষেত্রে উপযোগী নহে অথচ পাজামাটা বিজাতীয়।” কবিগুরু নিজে কখনই বলেন নি যে, তিনি ধর্মের ব্যাপারে উদার ছিলেন বা স্যেকুলার ছিলেন। তিনি নিজ ধর্ম ও জাতির কল্যাণ ও রক্ষায় জীবন নিবেদন করেছেন। এতে তাঁর কোন ধরনের ভড়ং বা ভন্ডামী ছিলনা। জমিদারী ,ব্যবসা বাণিজ্য ও কমিশন এজেন্ট হিসাবেও তাঁর কোন ধরনের লুকোচুরি ছিলনা। একজন খাঁটি ব্রাহ্ম হিন্দু হিসাবে তিনি সব সময় স্বজাতির কল্যাণে কাজ করেছেন। স্বজাতির পক্ষে বলেছেন ও লিখেছেন। আমি এতে দোষের কিছু দেখিনা। বরং আমি এটাকে ন্যায় সংগত মনে করি। স্বজাতির স্বার্থ রক্ষা করতে যেয়েই তিনি নতুন প্রদেশ পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠণের বিরোধিতা করেছেন। সেই সময়েই তিনি ‘ আমার সোনার বাংলা’ গাণটি রচনা করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় প্রতিস্ঠার বিরোধিতা করেছেন। সে সময়ের হিন্দু নেতারা ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়কে মক্কা বিশ্ব বিদ্যালয় বলে গালাগাল দিয়েছেন।
কবিগুরুকে বাংলাদেশের কবি হিসাবে গ্রহণ করার জন্যে একদল মানুষ উঠে পড়ে লেগেছে। এদের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক। বংগবন্ধু বিষয়টা হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছেন। তাই তিনি বাংলা ভাষার একমাত্র বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। বংগবন্ধুর জীবনে এটা একটা মহা গুরুত্পূর্ণ কাজ। তাই নজরুল আজ আমাদের জাতীয় কবি। শুনেছি, তিনি নজরুলের একটি কবিতাকে জাতীয় সংগীত করতে চেয়েছিলেন। নজরুলের রাজনীতি ও কাব্য অবদানকে খাটো করে দেখার জন্যেই ভারতীয় কবি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাড়াবাড়ি। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রবীন্দ্র বিশ্ব বিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন। যে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে সারা জীবন কলম ধরেছেন এবং রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন সেই মানুষটাকে বাংলাদেশে দেবতার আসনে বসাবার জন্যে ষড়যন্ত্র করছে এক শ্রেণীর দাস মনোবৃত্তির এক শ্রেণীর ভারত ও হিন্দু ঘেঁসা বুদ্ধিজীবী। এরা বাড়াবাড়ি না করলে আমাদেরকে কলম ধরতে হতোনা। কবিগুরুর কাব্যগুণ যতই শ্রেষ্ঠ হোকনা কেন তিনি কখনও বাংলাদেশের সাধারন মানুষের কল্যাণ কামনা করেননি। তত্কালীন পূর্ববংগের প্রজাকুলের(হিন্দু হোক,মুসলমান হোক) কবিগুরু কোন কল্যাণমুলক কাজ করেছেন তার কোন প্রমান কারো কাছে নেই। সাহিত্যের ক্ষেত্রে কবিগুরুর অনেক চৌর্যবৃত্তির অনেক দলিল রয়েছে যা আজ আর উল্লেখ করতে চাইনা। সময় মতো অন্য কোন সময় বলা যাবে।
Posted in Articles | Comments Off
ফেণী প্রেসক্লাব প্রতিস্ঠিত হয়েছে ১৯৬৬ সালে। তার কিছুদিন আগে আমরা প্রেসক্লাব কমিটি গঠণ করেছি। প্রথম কমিটির সভাপতি ছিলেন তত্কালীন মহকুমা হাকিম বা সাবডিভিশনাল অফিসার সাইফ উদ্দিন আহমদ। তিনি ছিলেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস(সিএসপি) ক্যাডার ভুক্ত একজন প্রথম শ্রেণীর সরকারী কর্মকর্ত। সাধারন সম্পাদক ছিলেন মহকুমা জনসংযোগ কর্মকর্তা আবদুর রশীদ খান। আমি ছিলাম সহ সাধারন সম্পাদক। নুরুল ইসলাম উকিল সাহেব ছিলেন সহ সভাপতি। কৌশলগত কারণে আমরা এভাবে কমিটি গঠণ করেছি। উদ্দেশ্য ছিল অনায়াসে ক্লাবের জন্যে একটি অফিস ঘর জোগাড় করা। মূলত: পরামর্শটি ছিল রশীদ খান সাহেবের। এছাড়া তখন আমি বামপন্থি রাজনীতির জড়িত ছিলাম। ফলে সমাজের মুরুব্বীরাও রাজনৈতিক কারণে আমাকে পছন্দ করতেন না। আমি পাকিস্তান অবজারভার ও সংবাদে পাঁচ বছতর কাজ করে ফেণী চলে আসি। তখন আমার বাবা ক্যন্সারে আক্রান্ত। ৬৪ সালের আগস্টে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ৬৮ সালের মার্চ মাসে তিনি পরলোক গমণ করেন। ফেণীতে আমি সাপ্তাহিক ফসল প্রকাশ করি ৬৫ সালের ১৭ই মার্চ। রাজনৈতিক কারণে আমার নামে ডিক্লারেশন পাইনি। আমার জেঠাত ভাই নুরুল ইসলাম সাহেবের নামে ডিক্লারেশন নিতে হয়েছে। এ ব্যাপারে তখনকার গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা আমাকে সহযোগিতা করেছিলেন। তারাই বলেছিলেন, আমার নামে আসবেদন না করতে। সরকারী খাতায় আমার নাম মন্দ তালিকা ভুক্ত ছিল। আমি তখন মাওলানা ভাসানী সাহেবের কৃষক সমিতির সাথে জড়িত ছিলাম।
প্রেসক্লাবের কমিটি গঠণের পর আমরা আনুস্ঠানিক ভাবে সাইফ উদ্দিন সাহেবের সাথে দেখা করি এবং প্রেসক্লাবের অফিসের জন্যে একটি ঘর চাইলাম। সভার কার্য বিবরনী লিপিবদ্ধ করলেন রশীদ খান সাহেব। এসডিও সাহেব সংগে সংগে রাজী হয়ে গেলেন এবং রশীদ সাহেবকে জায়গা দেখতে বললেন। আমি আর রশীদ সাহেব আগেই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম ডাক্তার দ্বারিকা বাবুর পরিত্যাক্ত ভবনটি লীজ নেয়ার জন্যে। আমরা দাগ ও খতিয়ান নম্বর জোগাড় করে আনুস্ঠানিক ভাবে দরখাস্ত জমা দিলাম। এসডিও সাহেব সাথে সাথে নির্দেশ দিলেন। সাপ্তাহিক ফসলের ৬৬ সালের ফাইল খুঁজলেই ক্লাবনের বিস্তারিত ইতিহাস পাওয়া যাবে। রশীদ খান সাহেব জীবিত থাকলে তাঁর কাছ থেকেও বহু তথ্য পাওয়া যাবে। আমি ৬৯ সালের শেষের দিকে ঢাকায় এসে পূর্বদেশে যোগ দিই। সেই থেকে ঢাকাতেই আছি। ডাক্তার দ্বারিকা নাথ সবার কাছে পরিচিত ছিলেন দ্বারিকা এমবি হিসাবে। সে সময়ে তিনি ছাড়া আর কেউ এমবি বা এমবিবিএস ডাক্তার ছিলেন না। তিনি ধুতি সু ও কোট পরতেন। সাইকেল চালাতেন। সাইকেল চালিয়ে মাস্টার পাড়া থেকে চেম্বারে আসতেন। চেম্বারে গেলে ফি নিতেন কিনা এখন আমার মনে নেই। তবে বাসায় বা বাড়িতে ডাক দিলে দুই টাকা ফি নিতেন সে কথা আমার মনে আছে। দ্বারিকা বাবুর ভবনটি লীজ নেয়ার জন্যে ফেণীর গণ্যমান্য অনেকেই চেস্টা করেছেন। আমার কাছেও অনেক মুরুব্বী প্রাস্তাব দিয়েছিলেন। ভবনটি তাঁদের নামে লীজ করিয়ে দিলে তাঁরা ক্লাবকে বিনা টাকায় উপরতলা ছেড়ে দিবেন। এমন কি রাজস্ব বিভাগের কিছু কর্মচারীও ষড়যন্ত্র করেছিলেন। এসডিও সাহেব শক্ত না থাকলে আমরা এ বাড়িটা পেতাম না। সাইফ উদ্দিন আসহমদ সাহেব বলেছিলেন, লীজের টাকাটা এক সাথে দিতে হবে। টাকার অংকটা ছিল তিন হাজার টাকার একটু উপরে। কত টাকা সঠিক ভাবে এখন আমার মনে নেই। কিন্তু আমি রাজী হয়ে গিয়েছিলাম। তারপরে চিন্তা হলো টাকাটা কোত্থেকে জোগাড় করবো। তখন ওই ভবনের নী্চে কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের একটি শাখা ছিল। হয়ত এখনও আছে। শাখা ম্যানেজারের সাথে কথা বলে এবং তাঁর সুপারিশ নিয়ে আমি চট্টগ্রাম গেলাম কোম্পানীর ম্যানেজিং ডিরেক্টর সত্য সিংয়ের সাথে দেখা করতে গেলাম। তিনি তখন তাঁর গ্রামের বাড়ি গহিরা ছিলেন। সত্যবাবুর সাথে আমার আগে থেকেই জানাশোনা ছিল। তিনি খুবই উদার প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। আমাকে দেখেই আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন কাজের কথা পরে হবে। অনেক দূর পথ পেরিয়ে এসেছেন। কিছু খেয়ে নিন। তিনি মেহমানদারী সারলেন। জানতে চাইলেন,তিনি আমার জন্যে কি করতে পারেন। আমি শাখা ম্যানেজারের চিঠিটা তাঁর হাতে দিলাম। তারপর বললেন, আমি বিষয়টা জানি। খুশী হয়েছি যে আপনারা প্রেসক্লাবের জন্যে ভবনটি পেয়েছেন। তারপরেই সত্যবাবু প্রয়োজনীয় টাকাটা আমার হাতে দিলেন। আরও বললেন, যখনি কোন সহযোগিতার প্রয়োজন হবে তখনি জানাবেন। কুন্ডেশ্বরী আপনাদের সহযোগিতায় সব সময় প্রস্তুত থাকবে। সত্যবাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। প্রায় মধ্যরাতে ফেনী এসে পৌঁছালাম। পরেরদিন সকালেই রশীদ খান সাহেবের বাসায় গেলাম। তাঁর অফিস ও বাসা ছিল ডাক্তার পাড়া। টাকার খবর পেয়ে তিনি খুব খুশী হলেন। আমাকে সাথে নিয়ে রিকসা করে সাব ডিভিশনাল ম্যানেজারের অফিসে গেলাম। রাজবাড়িতে ম্যানেজার সাহেবের অফিস ছিল। এখন সম্ভবত এটা এসি ল্যান্ডের অফিস। কিছুদিন সিও রেভিনিওর অফিস হিসাবেও পরিচিত ছিল। ট্রেজারী চালান দিয়ে সরকারী টাকা জমা দিলাম। একসনা বন্দোবস্ত বা লীজের কাগজ হাতে পেয়ে গেলাম। এবার ভবনের পজেশন বুঝে নিতে হবে। পজেশন বুঝিয়ে দিবেন তহশীলদার। পজেশন বুঝিয়ে দিবেন বলে তহশীলদার সাহেব পালিয়ে গেলেন। খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারলাম তিনি তাঁর গ্রামের বাড়ি ছাগলনাইয়া চলে গেছেন। আমি আর রশীদ সাহেব ছাগলনাইয়া যেয়ে তাঁকে খুঁজে বের করলাম। রশীদ সাহেব সাথে না থাকলে তহশীলদার সাহেব আসতেন না। পরের দিন ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সন্ধ্যার দিকে তহশীলদার সাহেবকে ফেণী নিয়ে এসে কাগজে কলমে পজেশন বুঝে নিলাম। সেদিন থেকে ভবনটি ফেণী প্রেসক্লাবের অস্থায়ী সম্পত্তিতে পরিণত হলো। এসব হলো ৪৫ বছর আগের কথা। আমার স্মৃতি আমাকে যতটুকু সাহায্য করেছে তা থেকেই পেছনের কথাগুলো বললাম।
Posted in Articles | Comments Off
একজন খাঁটি মানুষের কাহিনী / এরশাদ মজুমদার
আমি যে সময়ের কথা বলছি, সে সময়ে রাজনীতি ছিল ত্যাগী মানুষের কাজ। যাদের দেশপ্রেম ছিল শুধু তারাই রাজনীতি করতেন এবং দেশের জন্যে নিজের সবকিছুই ত্যাগ করতেন। বৃটিশ বেনিয়াদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে এদেশের লাখ লাখ মানু প্রাণ দিয়েছে। এক শ্রেণীর ধনী হিন্দু রাজা মহারাজাদের ষড়যন্ত্রের ফলে ১৭৫৭ সালে সুবেহ বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ দৌলার পতন হয় এবং বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। সেই থেকে লড়াই শুরু হয়। ষড়যন্ত্রকারী ও বেঈমানদের সহযোগিতায় ইংরেজরা ১৯০ বছর পুরো ভারতকে শাসন করে ও লুন্ঠন করে।সুজলা সুফলা বাংলা ও ভারতকে শোষণ করে ইংরেজরা বিশ্বের শক্তিশালী কলোনিয়াল পাওয়ারে পরিণত হয়। ভারতের প্রখ্যাত রাজনীতিক দাদাভাই নওরোজী তাঁর পোভার্টি ইন ইন্ডিয়া বইতে লিখেছেন, ইংরেজরা ভারতকে শোষণ করে লন্ডনকে গড়ে তুলেছে। পেছনের কথা গুলো বললাম নতুন প্রজন্মের পাঠকদের জন্যে। আমাদের তরুণ সমাজ ইতিহাস সচেতন নয়। তারা লোকমুখে শুনে মৌখিক ইতিহাস তৈরী করে। তাদের কথা শুনলে মনে হয়, ৭১এর আগে আমাদের কোন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস নেই। হাবভাব দেখে মনে হয় বংগবন্ধু দিয়েই আমাদের ইতিহাস শুরু হয়েছে এবং বংগবন্ধুকে দিয়েই এর শেষ হয়েছে।
আমাদের রাজনীতিতে এক সময় মেধার গুরুত্ব ছিল। কোয়ালিটির গুরুত্ব ছিল। এখন গুরুত্ব হচ্ছে অর্থ, শক্তি ও সংখ্যার।তখন যাঁরা রাজনীতি করতেন তাঁদের আয়ের প্রকাশ্য উত্স ছিল। এখন জাতীয় সংসদের সদস্যরা রাজনীতিকে নিজেদের পেশা হিসাবে উল্লেখ করেন। আগের জামানায় আমাদের মুরুব্বীদের পেশা কখনই রাজনীতি ছিলনা। তাঁরা সকলেই ছিলেন নামকরা উকিল ডাক্তার ও বড় ব্যবসায়ী। এখন কোন রাজনীতিকেরই পেশা নেই। আইউব খানের আমলে তিনি বড় বড় ঠিকাদারদের রাজনীতিতে ডেকে আনেন। আইউব খানের ওই ধারা এখনও রাজনীতিতে এখনও জারী রয়েছে। বাংলাদেশদের সংসদ গুলোতে ব্যবসায়ী শিল্পপতি কমিশন এজেন্টদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এরাই এখন রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রন করেন। রাজনৈতিক দলগুলো এদের কাছ শত শত কোটি টাকার চাঁদা গ্রহণ করে। সরকার ও রাজনৈতিক দল গুলোকে নিয়ন্ত্রন করে ব্যবসায়ীরা নানা ধরনের অনৈতিক ও বেআইনী উপায়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। ৮৩ সালে একটি ব্যান্ক প্রতিস্ঠার জন্যে তিন কোটি টাকার মূলধন জোগাড় করাটা ছিল মহা কস্টের। ২৫ থেকে ২৬ জন উদ্যোক্তার কাছে থেকে টাকা নিতে হয়েছে। এখন একটি স্থাপন করার জন্যে একজন উদ্যোক্তা একাই এক হাসজার কোটি দিতে পারেন। পাকিস্তান আমলে ছিল ধনী ২২ পরিবার। এখন ধনী ২২ হাজার পরিবারের সৃস্টি হয়েছে। সারাদেশে এক কোটি টাকার মালিক রয়েছে এক কোটি লোক। সোজা ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় এসব ব্যবসায়ী আর রাজনীতিকরা দেশটাকে লুটেপুটে খাচ্ছে।
এ মাটির বয়স কত জানতে পারলেই জানা যাবে এরই ভূমিতে মানব বসতির বয়স কত। হাজার হাজার বছর অতীতে এখানে কাদের বসতি ছিল। সেই ইতিহাসের সূত্র ও ধারাবাহিকতায় আজ আমরা বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছি। এখন আমরা যে অঞ্চলে বাস করি তা বাংলাদেশ নামে পরিচিত। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। আমাদের স্বাধীন পতাকা, জাতীয় সংগীত আছে। আমরা জাতি সংঘের সদস্য। পশ্চিম বাংলা আমাদের মতো স্বাধীন নয়। তারা ভারতের একটি অংগ রাজ্য। অথচ তারাও বাংলা ভাষায় কথা বলে, আমরাও বলি। ভাষার একত্ব তবুও আমাদের এক করতে পারেনি। এর প্রধান কারণ আমরা মুসলমান, আর পশ্চিম বাংলার নাগরিকরা হিন্দু। বাংলাকে অখন্ড রাখতে মুসলমান নেতারা আপ্রান চেস্টা করেছে। কিন্তু হিন্দু নেতারা রাজী হননি। এর কারণ ছিল অখন্ড বাংলাদেশে মুসলমানেরা মেজরিটি ছিল। ৩৭ থেকে ৪৭ পর্যন্ত অখন্ড বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, স্যার খাজা নাজিমুদ্দিন ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এই তিনজন নেতার পারিবারিক ঐতিহ্য ও শিক্ষার কথা ভাবলেই বুঝা যাবে তাঁরা কোন মর্যাদার লোক ছিলেন। এঁরা মানুষের কল্যাণে নিজেদের সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছেন। এখন যাঁরা রাজনীতি করেন তাঁরা দেশ ও মানুষের সম্পদ লুন্ঠন করে নিজেদের সম্পদশালী করে। চাঁদা তুলে জীবিকা নির্বাহ করে। চলমান রাজনীতিতে খুব অল্প সংখ্যক রাজনীতিক আছেন যাঁরা নিজেদের পেশগত আয় দিয়ে রাজনীতি করেন। অথচ এঁদের সবার গাড়ি বাড়ি আছে রাজধানীতে।
ঢল কোম্পানী হিসাবে বহুল পরিচিত সিরাজুল হক মজুমদার সাহেব ফেণী জেলার খাঁটি মানুষদের একজন। আমার অন্তর আমাকে এভাবেই জানিয়েছে। তিনি আমার আত্মীয়। সেই সুবাদে বাল্যকালেই তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয়। তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। মজুমদার সাহেব সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন সদস্য। সেই জামানার একজন শিক্ষিত মানুষ। তাঁর বাপদাদারাও শিক্ষিত এবং আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল ছিলেন। সম্পর্কে আমি তাঁর নাতি। তাঁকে আমি দাদু বলে ডাকতাম। স্কুল জীবনেই আমি বামধারার রাজনীতির সাথে পরিচিত হই। মজুমদার সাহেব মাওলানা ভাসানীর রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তাঁর যুক্তফ্রন্টের নমিনেশন পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা ধরনের রাজনৈতিক ইকোয়েশনের কারণে তিনি নমিনেশন পাননি। নমিনেশন পেয়েছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক পাকিস্তান অবজারভারের সম্পাদক আবদুস সালাম। সালাম সাহেব ছিলেন একজন দার্শনিক প্রকৃতির মানুষ। সরাসরি রাজণিতি তিনি কখনও করেননি। উপ মহাদেশের প্রখ্যাত আইনজীবী ও রাজনীতিক হামিদুল হক চৌধুরী সাহেব ছিলেন শেরে বাংলার কৃষক শ্রমিক পার্টির একজন নেতা। তাঁরই প্রভাবে সালাম সাহেব নমিনেশন পেয়েছিলেন। আবেগ ও অভিমানের কারণে সিরাজুল হক মজুমদার সাহেব নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। মুসলীম লীগ বিরোধী নির্বাচনী ঢেউয়ের কারণে মজুমদার সাহেব নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেননি। ওই নির্বাচনে মাহবুবুল হক সাহেবের মতো ডাক সাইটে নেতাও জিততে পারেননি। উল্লেখ্য যে, ৫৪র নির্বাচন ছিল মুসলীম লীগের রাজনীতি খতম করার নির্বাচন । আর ৭০ এর নির্বাচন ছিল অবাংগালী বিরোধী নির্বাচন।
মজুমদার সাহেব তত্কালীন ফেণী মহকুমার কৃষক নেতা ছিলেন। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার জন্যে তিনি ছিলেন সর্বদা নিবেদিত। কতটুকে নিবেদিত ছিলেন তা আপনারা বুঝতে পারবেন যখন জানবেন কেন তিনি ঢল কোম্পানী হিসাবে পরিচিত হয়েছিলেন। ফেণী ও মুহুরী নদী ছিল তখন ফেণীর দু:খ। হোয়াংহো নদী যেমন চীনের দু:খ ছিল। চীনের একটি বিখ্যাত গল্প আছে। গল্পটির নাম ‘ দি ওল্ডম্যান এ্যান্ড দি মাউন্টেন’। এই বৃদ্ধই পাহাড়ে সুড়ংগ কেটে অপর পাড় থেকে পানি আনার উদ্যোগ নিয়েছিল। প্রথমে একাই শুরু করেছিল। পরে গ্রামবাসী তার সাথে যোগ দিয়েছিল। চীনের মরু এলাকা পাণি পেয়ে সুজলা সুফলা হয়ে উঠেছিল। মজুমদার সাহেবও মুহুরী নদীতে নিজের অর্থে বাঁধ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। শুনেছি, তিনি নিজের জমিজমা সব বিক্রি করে দিয়েছিলেন মুহুরী নদীতে বাঁধ দেয়ার জন্যের। এ ব্যাপারে তাঁর কোন কারিগরী জ্ঞান ছিলনা। তিনি জানতেন না ওই বাঁধ নির্মানে কত কোটি লাগতে পারে। শুধু মাত্র মানুষের জন্যে ভালবাসার কারণেই তিনি বুকে সাহস নিয়ে মুহুরীতে বাঁধ নির্মানের কাজে নেমেছিলেন। পরে তাঁরই দেখানে পথে সরকার ৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে মুহুরী বাঁধের নির্মান কাজ সম্পন্ন করে।
আমার দাদু সিরাজুল হক মজুমদার ছিলেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে সত্ ও নিবেদিত রাজনীতিক। জীবনে কখনও কারো কাছে থেকে চাঁদা গ্রহণ করেননি। চাঁদা নেয়া তাঁর জন্যে শোভাও পেতোনা। কারণ তিনি ছিলেন সচ্ছল শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন রাজনীতি হচ্ছে মানুষের জন্যে ত্যাগ করা। তাঁর স্বপ্নই ছিল এদেশের কৃষক শ্রমিকের মুক্তি। ৪৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৬৪ বছর পার হতে চলেছে। কৃষক শ্রমিকের ভাগ্যের তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। দেশ এখন এক মহা সংকটে পতিত। এই সময়ে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় সিরাজুল হক মজুমদার সাহেবের মতো ত্যাগী সমাজ সেবক ও রাজনীতিকের প্রয়োজন।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
Posted in Articles | Comments Off
রাস্ট্রের সাথে রাস্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক রীতি নীতি ও রেওয়াজ ভিত্তিক। এই সম্পর্ক কখনও গভীর বন্ধুত্ব বা আত্মার সম্পর্কে পরিণত হয়না। রাস্ট্রীয় সম্পর্কের সাথে উভয়ের স্বার্থ জড়িত। ভারতের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব বা কূনৈতিক সম্পর্ক একটি ঐতিহাসিক পট ভূমিকায় তৈরী হয়েছে। ৭১ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে দমনের জন্যে সামরিক অভিযান চালালে ভারত পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি সমর্থন জানায় এবং পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ভারত বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের নতুন বিন্যাস করতে উঠে পড়ে লেগে যায়। কূটনৈতিক সম্পর্কের চেয়েও বেশী কিছু আশা করতে থাকে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে ভারত মনে করে তাদের বন্ধুরাই ক্ষমতায় আছে। সুতরাং বন্ধুর কাছে সব ধরণের আবদার করা যায়। যেকোন কারণেই হোক আওয়ামী লীগও মনে করে ভারত তাদের পরম বন্ধু এবং বিপদে আপদে ভারত আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়ে যাবে। এবারে ২৬৩ সিট নিয়ে আওয়ামী লীগক্ষমতায় আসার পর ভারত ষোলয়ানা সুযোগ ব্যবহারের জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে। হেন কিছু নেই ভারত বাংলাদেশের কাছে চাইছেনা। আর আওয়ামী লীগও বাংলাদেশটা তাদের নিজস্ব সম্পত্তি মনে করে বন্ধু চাওয়ার আগেই দেয়ার জন্যে উদগ্রীব হয়ে থাকে। আওয়ামী লীগ, বিশেষ করে শেখ হাসিনা ব্যক্তিগত ভাবে মনে করেন তিনি কোন বড় বিপদে পড়লে ভারত তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসবে। ৭৫ সালে হাসিনার বিপদের সময় ভারত তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিল বেশ কয়েক বছরের জন্যে। রাস্ট্রীয় জীবনে যে কোন ধরনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকতে পারেনা তা আওয়ামী লীগ বা হাসিনা বুঝতে চায়না। বংগবন্ধুর সরকারের পতন হওয়ার পর ভারত খোন্দকার মোশতাকের সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশের সকল সরকারের সাথেই ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। এটাই রাস্ট্রের নিয়ম ও সংস্কৃতি। এখানে ব্যক্তি বা দল কখনই কোন বিষয় নয়।
তিব্বতের দালাই লামাকে ভারত ভরণ পোষণ, বিভিন্ন ধরনের সাহায্য সহানুভুতি দিয়ে থাকে। এটা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণে। চীনের সাথে ভারতের উষ্ণ বন্ধুত্ব নেই বলে। ভারত দালাই লামাকে ভারত চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। যেমন পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের তেমন ইষ্ণ সম্পর্ক নেই বলে ভারত বাংলাদেশকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চায়। ভারতের সাথে প্রতিবেশী কোন দেশেরই উষ্ণ সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশের সীমান্তে ভারত প্রতিদিনই মানুষ মারছে। বাংলাদেশ তেমন কিছু বলতে পারেনা। আওয়ামী লীগ সরকারতো নিজে থেকেই কিছু বলতে চায়না। কারণ, ভারত এখন আওয়ামী লীগের পরম বন্ধু। হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, ভারত মনে করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে অনেক চুক্তি করা যাবেনা বা অনেক স্বার্থ ও সুবিধা আদায় করা যাবেনা। তাই ভারত আওয়ামী লীগের আমলে সবকিছু আদায় করে নিতে চায়। দুই শক্তিশালী প্রতিবেশী চীন ও পাকিস্তানের সাথে ভারতের স্বাভাবিক সম্পর্ক বিগত ৬০ বছরেও হয়নি। নিকট ভবিষ্যতে সুসম্পর্ক গড়ে উঠার তেমন কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছেনা। চীনকে মাকাবিলা করার জন্যে ভারত এখন রাশিয়াকে ত্যাগ করে আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেস্টা করে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। অপরদিকে চীনের বহুযুগের অকৃত্রিম বন্ধু মায়ানমারের সাথে সন্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।
ভারতের সাথে পাকিস্তানের বৈরিতা পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকে। সে সময়ের ভারতীয় নেতাদের বক্তৃতা বিবৃতি পড়লেই বুঝা যায় তাঁরা পাকিস্তানের প্রতিস্ঠা মেনে নেননি। ৪৮ সালে জিন্নাহর মৃত্যুর সাথে সাথেই ভারত দেশীয় স্বাধীন রাজ্য বা দেশ গুলো দখল করে নেয়।কাশ্মীরের অর্ধেক দখল করে নেয়। প্রশ্ন উঠতে পারে ভারত পাকিস্তান সৃস্টি কেন মেনে নেয়নি বা মেনে নিচ্ছেনা। এটা একটি বিরাট ইতিহাসের ব্যাপার। এই কলামে অত বিরাট বা লম্বা ইতিহাসে কথা বলা যাবেনা। তবে ছোট্ট একটি বাক্য দিয়ে এই লম্বা ইতিহাসটি বুঝাবার চেস্টা করছি। একাত্তুর সালে ভারতের কাছে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘হাজার সাল কা বদলা লিয়া’। এই বাক্যটার সাথে হাজার বছরের ইতিহাস জড়িত। ৭১১ সালে মুহম্মদ বিন কাশেম সিন্ধু দেশ জয় করে নিজ দখলে আনয়ন করেন। ভারতে এটাই ছিল মুসলমানদের প্রথম বিজয়। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী সেই ইতিহাসের দিকে ইংগিত করেছেন। ভারতে মুসলমানদের অবস্থান ও বসতি চলছে এক হাজার বছরেরও উপরে। এই এক হাজার বছরের মধ্যে কোন মুসলমান জেনারেল বা নবাব বাদশাহ কোথাও পরাজিত হননি। ইন্দিরা গান্ধীর বিবৃতি থেকে আমরা জানতে পারলাম ৭১ সালে ভারত যুদ্ধ করেছে পাকিস্তানকে পরাজিত করে বদলা বা প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে। আমরা ভেবেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা। আমরা খুবই আনন্দিত হয়েছি পাকিস্তানের কাছ থেকে মুক্তি লাভ করে। কিন্তু ভারতের জন্যে এটা ছিল প্রতিশোধ নেয়া।
সম্প্রতি বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের আদর্শ উদ্দেশ্য কি তা বেশ ভাল করেই প্রকাশিত হয়েছে। ভারতীয় জেনারেল ও কূটনীতিক বলেছেন, শেখ হাসিনা আরেক দফা ক্ষমতায় এলে ভারতের চাওয়া পাওয়া ষোলয়ানা আদায় হবে। একজন জেনারেল বলেছেন, পাকিস্তানকে ভাগ করেও ভারতের লাভ হয়নি। ভারত আশা করেছিল পূর্ব পাকিস্তান আলাদা বা স্বাধীন হয়ে গেলে ভারত লাভবান হবে। কিন্তু তা হয়নি। বাংলাদেশ সীমান্ত এখনও ভারতের জন্যে নিরাপদ হয়নি। পাকিস্তান সীমান্তে ভারতকে আগের চেয়ে অনেক বেশী সৈন্য মোতায়েন রাখতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে এরকজন ভারতীয় কূটনীতিক বলেছেন, বাংলাদেশ সীমান্তে সকল প্রকার নিরাপত্তা প্রহরী তুলে নিতে হবে। তাহলে দুই দেশের মধ্যে এত ঝামেলা থাকবেনা। হার্ভাডের শিক্ষক সুব্রামোনিয়াম বলেছেন, বাংলাদেশটা দখল করে নিতে। তাহলে উপ মহাদেশে শান্তি আসবে। ভারতের বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক কবি সাহিত্যিকরা মনে করেন ৭১ সালে বাংলাদেশ সৃস্টি করে ভারত ঠিক করেনি। ভারতের বিভিন্ন থিংকট্যান্কের সদস্যরা মনে করেন বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের প্রয়োজন নেই। এ ধরণের চিন্তার অধিকারী কিছু মানুষ বাংলাদেশেও আছেন। তাঁরা সমাজের গণ্যমান্য। দশজন তাঁদের কথা শোনেন। ভারতের নানা সংগঠণ বাংলাদেশের এই সব বুদ্ধিজীবীদের বেশ চড়াদামে কিনে যত্ন আত্তির করেন। তাঁরাও মনে করেন দুটো কথা বলে বা দুটো কথা লিখে যদি একটু সুখে থাকা যায় অসুবিধা কোথায়।
আমি বার বার অনেক বার বলেছি, বাংলাদেশ যদি হিন্দু প্রধান এলাকা হতো তাহলে একটা আলাদা রাস্ট্রের কোন প্রয়োজন ছিলনা। পশ্চিম বাংলার মতো দিল্লীর অধীনে সুখে শান্তিতে থাকতে পারতো। শুধুমাত্র মুসলমান প্রধান এলাকা হওয়ায় ৪৭ সালে এলাকাটি পাকিস্তানের সাথে একীভূত হয়েছে।তখন অখন্ড বংগদেশ নিয়ে একটি স্বাধীন দেশ গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু কংগ্রেস নেতারা একটি অখন্ড বংগদেশ চাননি। ৭১ সালে স্বাধীন হওয়ার পরেও আলাদা একটি রাস্ট্রে পরিণত হয়েছে। ভারতের সাথে এক হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। একমাত্র কারণ এ অঞ্চলের মানুষের ধর্ম বিশ্বাস। স্যেকুলারিজমের শ্লোগানটি দিন দিন ভন্ডামীতে পরিণত হতে চলেছে। তথাকথিত স্যেকুলারিজমের পিতারা নিজেরাই বলতে শুরু করেছেন, তাঁরা খৃস্টান এবং তাঁদের দেশ বৃটেন একটি খৃস্টদেশ। সম্প্রতি বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী ডভিড ক্যামেরুন বলেছেন, রাখঢাক করার কিছুই নেই। বৃটেন একটি খৃস্টদেশ। তাঁদের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে খৃস্ট ধর্ম থেকেই। আমরিকা ও ইউরোপের সব দেশই খৃস্ট দেশ হিসাবে পরিচিত। এই ইউরোপ থেকেই এক সময় মুসলমানদের বিতাড়িত করা হয়েছে। বহু মুসলমানকে গণহারে হত্যা করা হয়েছে। এখনও বিশ্বের কোন কোন নেতা মুসলমানদের একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীর ক্রুসেডের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ৪৮ সালে ফিলিস্তিনীদের বের করে দিয়ে ফিলিস্তিন ভূখন্ডে ইজরায়েল রাস্ট্র প্রতিস্ঠিত হয়েছে একেবারেই ধর্মের ভিত্তিতে। এই রাস্ট্রটির জন্ম লগ্নেই বলা হয়েছে এটা একটি ইহুদী রাস্ট্র। সারা বিশ্বের ইহুদীরা ইজরায়েল নাগরিক বলে বিবেচিত হবে। এই রাস্ট্রটি প্রতিস্ঠা করেছেন আমেরিকা ও ইউরোপের নেতারা। ভারত নতুন ধর্মীয় রাস্ট্র ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে ভারত তার রাজনৈতিক চরিত্রের পরিচয় দিয়েছে। ফিলিস্তিনী ভূখন্ড থেকে মুসলমানদের জোর করে অস্ত্রের মুখে বের করে দেয়াটাকেও ভারত সমর্থন করেছে। এর সোজা সরল ব্যাখ্যা হলো ভারত, আমেরিকা ও ইউরোপের দেশ গুলোর সাথে ইজরায়েলের সুসম্পর্কের কারণ ধর্ম।
সত্যিকারের তৌরাত পন্থী ও বাইবেল পন্থীদের সাথে কোরাণ পন্থীদের সাথে মুসলমানদের সুসম্পর্ক থাকার কথা ছিল। এই তিনটি ধর্মের মূল হচ্ছেন ইব্রাহিম(আ)। এরা সবাই হচ্ছেন মিল্লাতে ইব্রাহিম। কিন্তু বড়ই বেদনা ও দু:খের বিষয় হচ্ছে ইসা(আ) ও মুসা(আ) এর অনুসারীরা মুসলমানদের সাথে বেরাদরী ত্যাগ করে প্যাগান বা মুর্তি পূজকদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছে। এদের সবার লক্ষ্য হচ্ছে ইসলাম ও মুসলমানদের ধ্বংস করা যা কখনই সম্ভব নয়। মুর্তি ধ্বংস করার জন্যেই পৃথিবীতে নবী রাসুলরা এসেছেন। মানুষ কখনই নিজের হাতের তৈরী মুর্তির কাছে মাথা নত করতে পারেনা। এ জগতে মানুষ স্বাধীন ও সার্বভৌম। মানুষের একমাত্র প্রভু ও উপাস্য হচ্ছে আল্লাহপাক স্বয়ং।প্যাগানরা হচ্ছে মুর্তি পূজক। তাদের বহু উপাস্য আছে। তাদের ভিতর বর্ণবাদ আছে। তারা সমাজকে বিভক্ত করে শূদ্রদের শোষণ ও শাসন করে। তারা শূদ্রদের মানুষ হিসাবে গণ্য করেনা। মনু রচিত আইন গ্রন্থ মনুসংহিতায় বলা হয়েছে শূদ্রদের কোন মানবিক অধিকার নেই। ভগবান তাদের সৃস্টি করেছেন ব্রাহ্মণ ও তার দোসরদের সেবা করার জন্যে। ভারতে প্রায় ২৫ কোটি শূদ্র,অচ্যুত বা হরিজন আছে যাদের কোন মানবিক মর্যাদা নেই। ভারতের সকল শ্রেণীর নেতারা মনুর বিধান এখনও অন্ধ ভাবে অনুসরন করেন। আধুনিক ভারতের সংবিধানও শূদ্রদের মানবিক মর্যাদা প্রতিস্ঠা করতে পারেনি। মহামতি অম্বেদকার ছিলেন ভারতের সংবিধানের একজন প্রণেতা। শূদ্রদের অধিকার প্রতিস্ঠার লড়াইয়ে ব্যর্থ হয়ে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে এক লক্ষ অনুসারী সহ বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। গান্ধীজী শূদ্রদের আদর করে নাম দিয়েছিলেন হরিজন। মানে শূদ্ররা ঈশ্বরের লোক। কিন্তু ভারতের সংবিধানে শূদ্রদের অধিকার প্রতিস্ঠা করতে পারেননি।
২০১২ সালে এসেও ভারতের সামাজিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করার জন্যেই উপরের কথা গুলো বললাম। ভারত নানা ধর্ম নানা জাতির আবাস স্থল। হিন্দুস্তান বা ভারতে বাস করে বলেই তারা হিন্দু বা ইন্ডিয়ান। হিন্দু ধর্ম বলে জগতে কোন ধর্ম নেই। মনু সংহিতা, গীতা, বেদ, উপনিষদ, রামায়ন মহাভারত কোথাও হিন্দু ধর্মের কথা উল্লেখ নেই। যেমন বাংলাদেশে বাস করে আমরা হয়েছি বাংলাদেশী, বৃটনে বাস করে হয়েছে বৃটন বা বৃটিশ, আমেরিকায় বাস করে হয়েছে আমেরিকান, ইরাণে বাস করে হয়েছে ইরাণী। ভারতে ২৫ কোটি মুসলমান আছে যাঁরা নিজেদের ভারতীয় মুসলমান বা হিন্দুস্তানী মুসলমান মনে করেন। ৩০ কোটি হরিজন আছেন যাঁরা নিজেদের সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী হিন্দুস্তানী মনে করেন। কিন্তু ভারত শাসন করেন আর্যধর্মে বিশ্বাসী ব্রাহ্মণরা। এই ব্রাহ্মণরাই রামায়ন মহাভারত, বেদ উপনিষদ ও মনুসংহিতার স্রস্টা। রাজা , ধর্মযাজক ও পুরোহিতদের স্বার্থ রক্ষার জন্যেই আর্যধর্ম তৈরি হয়েছে। এই ধর্মে ব্রাত্যজনের কোন স্থান নেই।
কোরান হাদিস ও শরীয়া আইনে জগতের সব মানুষ এক ও অভিন্ন। ইসলাম জগতের সব মানুষের জন্যে শিক্ষাকে বাধ্যতামুলক করেছে। ইসলাম দারিদ্রকে ঘৃণা করে এবং ঘোষণা করেছে ধনীর সম্পদে গরীবের অধিকার বা হক রয়েছে। ব্যক্তি সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা ইসলাম অনুমোদন করেনা। নির্যাতিত মানুষকে মুক্তি দেয়ার জন্যেই ইসলাম জগতে এসেছেন আল্লাহর রাসুল(সা), কোরাণ ও হাদিস। আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন মজলুমের আহাজারি ও কান্নায় আল্লাহতায়ালার আরশ কেঁপে উঠে। এর আগে আমি অনেকবার বলেছি, মহামতি কার্ল মার্কস যদি আল কোরাণ পড়তেন তাহলে তাঁকে নির্যাতিতের বিপ্লবে বা বিদ্রোহের কথা বলতে হতোনা। বলতে হতোনা কমিউনিস্ট রাস্ট্রের কথা। ইসলামের আগমন এ জগতের সবচেয়ে বড় বিপ্লব। ইসলামী রাস্ট্র হচ্ছে জগতের সবচেয়ে বড় কমিউনিস্ট রাস্ট্র। কিন্তু জগতে সে রকম কোন রাস্ট্র আজও প্রতিস্ঠিত হয়নি। এর মূল কারণ হচ্ছে মুসলমানরা কোরাণ সুন্নাহ বা ইসলামী শরীয়া্হ মোতাবেক জীবন যাপন করেনা। খোদ মক্কা মদীনাতেই ইসলামী প্রতিস্ঠিত হয়নি। প্রকৃত ইসলামি রাস্ট্রের কথা বললে সউদী আরবে মানুষের মৃত্যুদন্ড হয়। মক্কা মদীনায় আজ রাজতন্ত্র চলছে। এক সময়ে মক্কা মদীনার মসজিদ গুলোতে খলিফাদের জবাবদিহি করতে হতো। খলিফা ওমর(রা) কথা জগতবাসী আজও ভুলতে পারনি। তাই বিশ্বব্যাপী আজ মুসলমানরা নির্যাতিত ও অপমানিত।
আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ একটি মুসলমান প্রধান রাস্ট্র। এদেশের ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান। কিন্তু দেশটি ইসলামী নয়। দেশের আইন কানুন কিছুই ইসলামী নয়। দেশের অর্থ ও সামাজিক ব্যবস্থাও ইসলামিক নয়। ফলে নাগরিক জীবনের সাথে রাস্ট্র জীবনের অনেক ফারাক আছে। রাস্ট্র ও কিছু রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবী ইসলামের পক্ষে নয়। ইসলামের পক্ষে কথা বললে প্রতিক্রিয়াশীল ও জংগী মনে করা হয়। আমেরিকার মুসলমান ও ইসলাম বিরোধী ভুমিকার কারণে বিশ্বব্যাপী আমেরিকার তাবেদার মুসলিম প্রধান দেশ গুলোও ইসলামের বিরুদ্ধে লেগে গেছে। বাংলাদেশও এখন আমেরিকার চলমান নীতির খপ্পরে পড়ে গেছে। এখানে ইসলাম বা মুসলমানদের পক্ষে কথা বললেই সন্ত্রাসী আখ্যা দেওয়া হয়। হাতে ইসলামী বই থাকলেই পুলিশ হামলা করে। আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, ‘ আমি হিন্দুও নই , মুসলমানও নই’। এই ভদ্রলোকের নামের দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখুন। তিনি সৈয়দ পদবী ব্যবহার করেন। তিনি আবার শ্রেষ্ঠ ইসলাম। সৈয়দ আশরাফ বাংলাদেশের প্রথম ভারপ্রাপ্ত রাস্ট্রপতির ছেলে। আর এই ভদ্রলোক বলছেন, তিনি মুসলমানও নন হিন্দুও নন। ভদ্রলোক এই রাস্ট্রের একজন মন্ত্রীও। এর চাইতে দু:খ ও বেদনার আর কি হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিব ওয়াজেদ শুনেছি নিয়মিত ধর্মকর্ম করেন। আমি ব্যক্তিগত ভাবেও বিশ্বাস করি শেখ হাসিনা নিয়মিত ধর্মকর্ম করেন। কিন্তু তাঁ সরকারের ধর্ম বিরোধী ভুমিকা দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করে ফেলেছে। সরকার নিজেকে স্যেকুলার বা ধর্ম নিরপেক্ষ বলে প্রচার করে। জগতে ধর্ম নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই। পশ্চিমারা নিজেদের স্বার্থে এই শব্দটা চালু করেছে। তারা নিজেরা এতে বিশ্বাস করেনা। এটা এক ধরনের ভন্ডামী। সম্প্রতি বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন বলেছেন, বৃটেন একটি খৃস্টদেশ। এইদেশের ধর্ম হচ্ছে খৃস্টধর্ম। বহুযুগ পরে হলেও বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী সত্যি কথাটা বলেছেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতার খোলস খুলে বাইরে এসেছেন। এর আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জুনিয়ার বুশ ক্রুসেড ওয়ারের কথা বলেছেন। ক্রুসেড মানে হচ্ছে ধর্মযুদ্ধ। মুসলমানদের বিরুদ্ধে খৃস্টানরা এই যুদ্ধ শুরু করেছিল। প্রায় দুইশ’ বছর ধরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে।
বাংলাদেশের সাথে ভারতের আত্মিক বা অকৃত্রিম বন্ধুত্ব কখনই হবেনা। কারন রাস্ট্রে রাস্ট্রে তেমন বন্ধুত্ব কখনই সম্ভব নয়। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই আমেরিকার সাথে তার বন্ধুত্ব।সেই বন্ধুত্বে এখন চিড় ধরেছে। আফগানিস্তানে অভিযান চালানোকে কেন্দ্র করে এই বন্ধুত্ব নস্ট হতে চলেছে। বাংলাদেশের সকল সরকারকেই অবশ্যই মনে রাখতে হবে ভারতের সাথে স্বার্থ বিহীন কখনই কোন বন্ধুত্ব হবেনা।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
Posted in Articles | Comments Off