Feeds:
Posts
Comments

Archive for October, 2012


১৬ই অক্টোবর থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর / এরশাদ মজুমদার

আমাদের প্রিয়তম কবি রবীন্দ্রনাথ ১৬ই অক্টোবরকে রাখী বন্ধন দিবস ঘোষণা করেছিলেন। কারণ,১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর বৃটিশ সরকার তার প্রশাসনিক সুবিধার জন্যে পূর্ববংগ ও আসামকে নিয়ে নতুন প্রদেশ পূর্ববংগ আসাম প্রদেশ ঘোষণা করেছিলেন। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক,যে কোন কারণেই হোক বৃটিশ সরকার নতুন প্রদেশ গঠণের কথা ঘোষণা করেছিলেন। এতে মুসলমানদের কোন চেস্টা তদবীর ছিলনা। নতুন প্রদেশের রাজধানী হয়েছিল ঢাকা। উল্লেখ্য যে,১৬০৮ সালে ঢাকাকে রাজধানী করে সুবেহ বাংলার( অখন্ড বংগদেশ, বিহার ও উড়িষ্যা) রাজধানী করেছিল দিল্লীর মোঘল সরকার। প্রথম সুবেদার ইসলাম খান। সুবেদার মুর্শিদ কুলী খান বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে মুর্শিদাবাদ নিয়ে যান। রাজধানী স্থানান্তরের বিষয়টাকে রাজনৈতিক, ভৌগলিক ও নিরাপত্তার দিক থেকে সমীচীন মনে করেননি। কিন্তু মুর্শিদ কুলী খান ঢাকার দেওয়ান বা নবাবের কাছ থেকে হুমকি অনুভব করছিলেন। তাই তিনি দিল্লীর দরবারকে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে রাজধানীকে মুর্শিদাবাদ নিয়ে যান। অনেকেই মনে করেন, রাজধানী যদি ঢাকায় থেকে যেতো তাহলে ১৭৫৭ সালে ইমরেজদের কাছে বাংলার পতন হতোনা।
কবিগুরু রাখী বন্ধন দিবসটি চালু করেছিলেন বংগভংগের প্রতিবাদে। হয়ত তাঁর জমিদারীর ৮০ ভাগই পূর্ববংগে থাকায় তিনি নতুন প্রদেশ গঠণের বিরোধিতা করেছিলেন। শুধু কবিগুরুর নাম উল্লেখ করছি এ কারণে যে , তিনি আমাদের কাছে বহুল পরিচিত একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। ১৭৫৭ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৪৮ বছরে পূর্ব বাংলার মুসলমানেরা নির্যাতিত ও শোষিত হতে হতে প্রায় সর্বহারায় পরিণত হয়েছিল। ইমরেজ শাসনে সরকারী ভাষা ফার্সীর পরিবর্তে ইংরেজী হওয়ার ফলে মুসলমানেরা সরকারী চাকুরি থেকে বহিষ্কৃত হয়। কিন্তু হিন্দু সমাজপতিরা ইমরেজদের সহযোগিতা করতে শুরু করে মুসলমানদের জমিদারী গুলো আস্তে দখল করে নেয়। এ প্রসংগে আমি উইলিয়াম হান্টারের ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস’বইটির কথা উল্লেখ করছি। এছাড়া বহু বৃটিশ লেখক ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন যে, ইংরেজ শাসনে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলার মুসলমানেরা। ইংরেজ আমলে মুসলমানেরা ইংরেজ ও হিন্দু জমিদার সমাজপতিদের দ্বিমুখী শোষণের কবলে পড়েছিল। ১৯৩৬ সালে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ববংগের মুসলমানদের অবস্থা দেখে বলেছিলেন, বাঁচার জন্যে, শোষণ মুক্তির জন্যে পুর্ববংগের মুসলমানদের জন্যে স্বাধীনতা অপরিহার্য। পূর্ববংগ ও আসাম প্রদেশ সৃষ্টি ছিল এ অঞ্চলের মুসলমানদের শোষণের অফিসিয়াল স্বীকৃতি। কিন্তু বড়ই দু:খ ও পরিতাপের বিষয় হিন্দু সমাজপতিরা মুসলমানদের এ নতুন অগ্রযাত্রাকে মেনে নিতে পারেনি এবং মুসলমানের স্বার্থ বিরোধী বংগভংগ আন্দোলন শুরু করলো। সকল হিন্দু জমিদার ও সমাজপতিরা এ আন্দোলনে অংস গ্রহণ করেছে। এ সময়ে তাঁরা সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন শুরু করেন, যে আন্দোলনকে তাঁরা স্বাধীনতা আন্দোলন বলে চালিয়ে দিয়েছে। ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনটি তখনও ছিল বংগভংগ বিরোধী আন্দোলন। কবিগুরু ঘোষণা দিয়েছিলেন, যতদিন বংগভংগ বাতিল না করা হবে ততদিন ১৬ই অক্টোবর রাখী বন্ধন দিবস হিসাবে পালিত হবে। বংগভংগ বিরোধী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন পরিচালনার জন্যে যাঁরা টাকা দিয়েছিলেন তাঁরা হলেন,মহারাজা সূর্যকান্ত, মহারাজা মণীন্দ্র নন্দী, মহারাজা টি পালিত, মহারাজা জানকী রায়, গজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সন্তোষ ব্রাদার্স, দিঘাপতিয়ার মহারাজা, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নাটোরের মহারাজা। ঠিক এই সময়ে জমিদারদের উসকানীতে পূর্ববংগের বিভিন্ন জেলায় হিন্দু মুসলমান দাংগা বাঁধানো হয় ঈস্বরগঞ্জ, কুমিল্লা, দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জে। অনুশীলন ও যুগান্তরের সন্ত্রাসীরা এই দাংগায় অংস গ্রহন করে। ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন,১৯০৭ সালের ময়মনসিংহের জামালপুরের দাংগার সময় যুগান্তর দলের ইন্দ্রনাথ নন্দী, শ্রীশ ঘোষ, বিপিন গাংগুলী, সুধীর সরকার যখন বন্দী হয় সেখানকার জেল সুপার আমাদের দলের লোক ছিলেন। আমি জামালপুর গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাত করি। তিনি বল্লেন, মশাই দেশের কাজ ও সরকারী চাকুরী একই সংগে রাখা যায়না। জেলখানায় সহযোগীদের সাথে দেখা করতে হলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে আসুন। আমি ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি এনে দিলাম এবং বন্ধুদের সাথে দেখা করলাম। এই সন্ত্রাসবাদী ও দাংগাবাদী আন্দোলনকে তখন ভারতীয় কংগ্রেস সমর্থন করেছিল।

১৬ই অক্টোবরের মাধ্যমেই পূর্ববংগের আলাদা অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলমানদের জন্যে বিশেষ করে পূর্ববংগের মুক্তির জন্যে একটি আলাদা ভৌগলিক এলাকার প্রয়োজন তা স্বীকৃতি লাভ করলো। তারই ফলশ্রুতি হলো ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট এবং ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর আর ৭১এর ১৬ই ডিসেম্বর একই সূত্রে গাঁথা। ইতিহাসের প্রয়োজনেই উল্লেখ করা দরকার যে, ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ পর্যন্ত এই একশ’ বছর ছিল ইংরেজের বিরুদ্ধে মুসলমানদের একক স্বাধীনতা যুদ্ধ। যা হিন্দু এবং ইংরেজরা যৌথভাবে মোকাবিলা করেছে। ভারতের একজন বড়লাটকে হত্যা করেছেন একজন মুসলমান শের আলী খান। এ তথ্য এবং সত্যটা এ দেশের বহু শিক্ষত লোক জানেননা। আমরা সবাই জানি বড়লাটকে হত্যা করতে গিয়ে ক্ষুদিরাম ফাঁসীতে গিয়েছেন। ইতিহাসের পাতায় এ রকম আরও বহু তথ্য আছে একেবারেই সত্য নয়। আমি নিজেই বাল্যকালে শুনেছি মুসলমানেরা ভারতের স্বাধীনতায় তেমন ভুমিকা পালন করেনি বরং অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজদের তাবেদারী করেছে। ১৮৫৮ সালের স্বাধীনতার যুদ্ধের প্রধান ভুমিকা পালন করেছে মুসলমানেরা। এ যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন শেষ মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর। ধরা পড়ে তিনি রেংগুনে নির্বাসনে যান এবং সেখানেই নি:সংগ বন্দী অবস্থায় মারা যান। সুভাষ বসুর সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাকে সবচেয়ে বেশী সাড়া দিয়েছে মুসলমানেরা। হিন্দুদের সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের কারণে ১৯১২ সালে বংগভংগের আদেশ রহিত হয়। ঢাকা আবার বিভাগীয় শহরে পরিণত হয়। ১৯০৫ সালের লাল বিল্ডিং গুলো এখনও প্রাদেশিক রাজধানীর স্মৃতি হয়ে পড়ে আছে। কার্জন হল তার প্রধান ফলক। আমাদের প্রিয় ঢাকা তিনবার রাজধানী হয়। প্রথমবার ১৬০৮ সাডে যখন কোলকাতা ছিল একটি গ্রাম। ১৯০৫ সালে দ্বিতীয় বার প্রদেশের রাজধানী হয়। ১৯৪৭ সালে তৃতীয়বার পাকিস্তানের প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হয়। ১৯৭১ সালে শেষবারের মতো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাস্ট্রের রাজধানী হয়।

পূর্ব বাংলার বাংগালী মুসলমানদের স্বাধীন জাতিসত্তা গড়ার বা বিকাশের বিরোধীতা হিন্দু সমাজপতিরা সব সময় করে এসেছেন। বংগভংগের পর ১৯১২ সালে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব এলে কবিগুরু আবারও এর বিরোধীতা করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। আমি নিজেও সত্যিই ভেবে পাইনা কবিগুরুর মতো একজন মানুষ কেমন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা করতে পারেন। তিনি বেঁচে থাকলে এর ব্যাখ্যা দিতেন জানিনা। যদি তাঁকে কবি হিসাবে না দেখে যদি একজন জমিদার হিসাবে দেখি তাহলে হয়ত একটা যুক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে। কারণ সকল জমিদারই চেয়েছিলেন পূর্ব বাংলার মানুষ লেখাপড়া না করে অশিক্ষিত থেকে যাক এবং শত শত বছর ধরে জমিদারদের খেদমত করুক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় সময় বলা হয়েছিল এতা মক্কা ইউনিভার্সিটি হবে। হিন্দু জমিদার ও প্রভাবশালীদের বিরোধীতা সত্তেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে জমিদার রবীন্দ্রনাথ সম্বর্ধনা গ্রহণ করেছেন। অখন্ড বংগদেশে মুসলমানরা ছিল মেজরিটি। কিন্তু ইংরেজদের ষহযোগিতায় হিন্দুরা ছিল ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী। এ যেন এক সাউথ আফ্রিকা। মাত্র ১৫ ভাগ সাদারা শাসন করতো ৮৫ ভাগ কালোদের। সেই স্বাধিকার আন্দোলনেই বিশ্ব মানব নেলসন ম্যান্ডেলা ২৬ বছর জেল খেটেছেন। শোষণ শাসনের আগ্রহ থেকেই বংগদেশের হিন্দু সমাজপতিরা মেজরিটি মুসলমানকে নিজেদের অধীনে দাস হিসাবে রাখতে চেয়েছিল। এক ধরনের ভোটাধিকার নির্বাচন শুরু হলে সংসদে মুসলমানরাই মেজরিটি ছিল এবং সরকার গঠন করে। প্রথম তিনজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দিন ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

অবাক বিস্ময়ের বিষয় হলো,১৯০৫ সালে যে হিন্দুরা বংগভংগ আদেশ বাতিলের জন্যে যে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন করেছিল তারাই ১৯৪৭ সালে বংগভংগ করার জন্যে উঠে পড়ে লাগলো। কারণ একই,অবিভক্ত বা অখন্ড বাংলাদেশে তারা মুসলমানদের অধীনে হয়ে যাবে। স্বাধীন সার্বভৌম অখন্ড বাংলাদেশের প্রস্তাবকে হিন্দুরা সমর্থন করেনি। বাংলা আর পাঞ্জাব ভাগ করার জন্যে হিন্দু নেতারা টু নেশন থিউরী বা দ্বিজাতি তত্বের সমর্থক হয়ে গেল। বাপুজী আর নেহেরুজী বলেই দিলেন কোলকাতা ছাড়া ভারতের স্বাধীনতা তাঁরা মেনে নিবেন না। ১৯৪৬ সালের ২৭শে এপ্রিল সোহরাওয়ার্দী সাহেব স্বাধীন বাংলাদেশের প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রস্তাব যৌথভাবে পেশ করেন শরত্‍ বসু,কিরণ শংকর রায় ও সোহরাওয়ার্দী। প্রস্তাবটি ছিল নিম্নরূপ:
১। বংগদেশ একটা স্বাধীন রাজ্য হবে যা ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্যের সংগে নিজের সম্পর্ক স্থির করবে। বিধান সভার ভোট গণনায় দুই তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা না পেলে তার ভারত বা পাকিস্তান কারো সংগে যোগ দেয়া উচিত হবেনা।
২। প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটের ভিত্তিতে বিধানসভায় নির্বাচন হবে। বিধান সভায় দুই সম্প্রদায়ের জন্য রক্ষিত আসনের সংখ্যা সম্প্রদায়ের জনসংখ্যার হিসাবে স্থিরিকৃত হবে,কিন্তু নির্বাচক মন্ডলী যুক্ত হবে। কিন্তু গান্ধীজী এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেন পরোক্ষ ভাবে। জিন্নাহ সাহেব বলেছিলেন,বাংলার হিন্দু মুসলমান যদি রাজী থাকে তাঁর কোন আপত্তি নেই। গান্ধীজী বললেন, বাংলার দুই তৃতীয়াংশ হিন্দু অখন্ড বংগদেশে রাজী থাকতে হবে।
তাই আজও সবার প্রশ্ন, ১৯০৫ সালে কবিগুরু সহ হিন্দু নেতারা কেন বংগভংগ বিরোধী ছিলেন? আবার ৪৭ সালে কেন বংগভংগ করতে রাজী হয়ে গেলেন? আমাদের বুদ্ধিজীবীরা কি এ বিষয়ে কখনও চিন্তা করেছেন? না, করেননি। কেমন করে করবেন? তাঁদের কাছেতো ৭১ এর আগের বাংগালী মুসলমানের কোন ইতিহাস নেই। আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পেছনে মুসলমানদের এক হাজার বছরের সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। এক হাজার বছরেই তিল তিল করে মুসলমানরা নিজেদের ইতিহাস ঈতিহ্য ও সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। এর আগে এই ভৌগলিক এলাকাটি ছিল অচ্যুত নির্যাতিত ও শোষিত মানব জাতির দেশ। মহাভারত, রামায়ন ও মনু সংহিতা পাঠ করলেই বুঝা যাবে এখানে কারা বাস করতো। এই অঞ্চলে বাংলা ভাষাকেও প্রতিষ্ঠিত করেছে মুসলমানেরা।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক
ershadmz40@yahoo.com

Advertisements

Read Full Post »


কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, টিভিতে মধ্যরাতে যে টকশো হয় হয় তাতে নাকি আওয়ামী লীগের গলাকাটা হয়। টিভিতেও দেখলাম,প্রধানমন্ত্রী হাত দিয়ে নিজের গলা দেখিয়ে গলাকাটার কথা বললেন। টকশো প্রসংগে কিছু বলার আগে তিনি খালেদা জিয়ার প্রসংগ নিয়েও দুটো কথা বলেছেন। খালেদা জিয়া আর বিএনপি সম্পর্কে কিছু বলতে না পারলে প্রধানমন্ত্রীর কথায় জোশ আসেনা। বিষয়টা এক ধরণের ভিটামিন বা এলিক্জারের মতো। এ প্রসংগে একটি কৌতুক বা জোকের কথা মনে পড়ে গেল। পাকিস্তানের এক সেনা শাসকের চুল কাটার সময় তাঁর নাপিত বা নরসুন্দর বিরোধীদলের প্রসংগ তুললেই ওই শাসকের মাথার চুল খাড়া হয়ে যেতো আর নাপিতের চুল কাটতে সুবিধা হতো। আমাদের প্রধানমন্ত্রীরও হয়ত মনো জগতে তেমন একটা অবস্থা তৈরি হয়েছে। তিনি হয়ত বিরোধী দলের কথা ভাবলেই ভালো ভাষণ দেয়ার জন্যে বেশ শক্তি পান। সেদিক থেকে ভাবলে আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর এই অধিকার বা স্বাধীনতা থাকা দরকার। আমি মধ্যরাতের টকশো দেখার বা শোনার কোন সুযোগ পাইনা। মধ্যরাত পর্যন্ত আমি এখন আর জেগে থাকতে পারিনা। প্রতিরাতে যথা সময়ে শুতে চলে যাই। কারণ, আমাকে খুব ভোরে উঠতে হয়। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য মসকরা করে বলেছেন, মধ্যরাতে ঘর থেকে কারা বের হয় তা দেশবাসী ভাল করেই জানেন। অনেকেই বলেন, প্রধানমন্ত্রী কথা কম বললে তাঁর নিজের এবং দলের জন্যে ভাল হতো। তাঁর উপদেস্টারা বলেন, আমরা নিয়মিতই তাঁকে কম কথা বলার জন্যে পরামর্শ দিয়ে থাকি। কিন্তু তিনি কথা না বলে থাকতে পারেননা। ছোট খাট অতি তুচ্ছ বিষয়েও তিনি কথা বলেন। মধ্যরাতের টকশো নিয়ে তিনি অনেক কথা বলে ফেলেছেন। মিডিয়ার মালিকরা এখন বড়ই ধনী। ব্যবসার স্বার্থে তাঁরা অনেক কিছু চাইতে আসেন, না দিলে গোস্বা হয়ে যান। হয়ত আমাদের প্রধানমন্ত্রী খুবই সরল,মনে কোন রাগ পুষে রাখেননা, তাই মনে খুলে সব কথা বলে ফেলেন। কোনটা তাঁর জন্যে ভাল,আর কোনটা মন্দ তা ভেবে হয়ত তিনি কথা বলেননা। হয়ত এসব কথার কথা, তিনি তেমন গুরুত্ব দেননা।
এখন মিডিয়ার মালিকদের ৮০ ভাগই প্রধানমন্ত্রীর দলের বা পছন্দের লোক। তাঁরা সকলেই আওয়ামী লীগের আনুকুল্যে বা ভালবাসা পেয়ে ধনী হয়েছেন। আর ধনী হয়েছেন বলেই তাঁরা বিভিন্ন ধরণের মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করেছেন, এবং আগামীতেও করবেন। রাজনীতিতে, সমাজনীতি, অর্থনীতিতে নাকি এখন মিডিয়ার গুরুত্ব খুবই বেশী। তাই এত পত্রিকা, এত টেলিভিশন,এত অনলাইন বা ইন্টারনেট পত্রিকা। এইতো দেখুন না, বাংলাদেশের অজানা অচেনা অনলাইন পত্রিকা ব্লিত্‍স পাকিস্তানের পররাস্ট্র মন্ত্রী হিনা রাব্বানী ও বিলাওয়াল ভুট্টোর জবরদস্ত প্রেম কাহিনী প্রকাশ ও প্রচার করে তুলকালাম কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছে। ভারত বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বড় বড় মিডিয়া গুলো হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের কোন মিডিয়া ব্লিত্‍সে বা এর মালিক সম্পাদকের কোন খোঁজ খবর নেয়নি। কে ব্লিত্‍সে এর মালিক? কই, কেউ এ ব্যাপারে মাথা ঘামায়নি। সাগর-রুনি হত্যার ব্যাপারে সরকার কেন এতো বিলম্ব করছে, কেনইবা এত নাটক? এতে সরকারের কি স্বার্থ থাকতে পারে? এটা যদি আর দশটা খুনের ঘটনা হয়ে থাকে তাহলেতো রাখ ঢাকের কোন কিছুই নেই। রাখ ঢাক করাতেই দেশের মানুষ মনে করছে এই খুনের সাথে রুই কাতলা রাঘব বোয়ালরা জড়িত আছেন। যাদের সাথে সরকারের ও মিল মহব্বত আছে। দেশের রাজনীতি নিয়েও কেউ কথা বললে প্রধানমন্ত্রী তাঁর চৌদ্দ গোষ্ঠি উদ্ধার করেন। তাঁকে ব্যাক্তিগত ভাবে আক্রমণ করেন। আমরা অতীতেও দেখেছি যখন কোন সরকার বা সরকার প্রধান স্বৈরাচারী হয়ে উঠেন তখন তিনি বা তাঁহারা মিডিয়া, কথা বলার অধিকারকে সহ্য করতে পারেন না। এইসব স্বৈরাচার কথায় কথায় গণতন্ত্রের কথা বলেন, নির্বাচনের কথা বলেন। সিভিল ডিক্টেটর গণ সামরিক ডিক্টেটরদের চেয়েও অনেক বেশী অত্যাচারী হয়ে উঠেন। ফিলিপাইনের মার্কোস, ভারতের নেহেরু এবং বাংলাদেশের বংগবন্ধু। নির্বাচনের নামে নেহেরুজী ২০ বছর ভারত শাসন করেছেন। মার্কোস তিরিশ বছরের মতো দেশ শাসন করেছেন। পরে অন্দোলনের মুখে মার্কোস দেশ ত্যাগ করেছিলেন। বংগবন্ধু মাত্র সাড়ে তিন বছর শাসন করেছেন। সেই সাড়ে তিন বছরে তিনি প্রমান করেছেন যে, তিনি সুশাসক নন। সত্যি কথা বলতে কি তিনি কখনই নিজেকে কখনই একজন সুশাসক হিসাবে গড়ে তুলেননি। এ কথা সত্যি যে, তিনি মানুষকে ভালবাসতেন এবং মানুষের সমস্যায়,বেদনায় ও দু:খে তাঁর মন কাঁদতো। কিন্তু সমস্যা সমাধানের পথ জানতেন না। ফলে আমলা ও দলের দুষ্ট লোকেরা তাঁকে ভুল পথে পরিচালিত করেছে। তিনি তাঁর আশে পাশের লোকজনকে অতি আপন জন মনে করতেন। ফলে তাঁর সাড়ে তিন বছরের শাসন আমল একেবারেই সুখের ছিলনা। তিনি সংবাদপত্রের সমালোচনা সহ্য করতে না পেরে তা বন্ধ করেছেন। তিনি শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের কবর রচনা করে এক দলীয় আসন জারী করেছিলেন। অথচ এই গণতন্ত্রের জন্যে সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন। তাঁর আমলেই দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। তাঁর আমলেই হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছে। সরকারী আইন শৃংখলা বাহিনীর উপর নির্ভর করতে না পেরে রক্ষী বাহিনী তৈরি করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক সচীব তোফায়েল সাহেবকে সেই বাহিনীর প্রধান করেছেন। এখন বংগবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা মিডিয়ার উপর চটে গেছেন। মিডিয়াকে তিনি আর ষহ্য করতে পারছেন না। সংসদের দুই তৃতিয়াংশ মেজরিটি থাকার কারণে তিনি অনেক গুলো ভুল পদক্ষেপ নিয়েছেন। বংগবন্ধুও এ কাজ করেছিলেন। আমরা যারা লিখি কেউই বংগবন্ধু বা তাঁর কন্যার শত্রু নই। আমরা শুধু ঘটনা বা পরিস্থিতি বা পরিবেশের বিশ্লেষণ করি। আমাদের দৃষ্টভংগী ভুলও হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলে থাকেন,তাঁর সরকার অনেক ভাল কাজ করেছেন। নিশ্চয়ই তাঁর সরকার অনেক ভাল কাজ করেছেন। ভাল কাজ করাইতো সরকারের কাজ। জনগণ ভোট দিয়েছেন ভাল কাজ করার জন্যে। জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালন করা সরকারের কর্তব্য। ভাল কাজ করার ওয়াদা করেই রাজনৈতিক দল গুলো ক্ষমতায় আসে। আসার পর কি সব কাজ করতে পারে? না পারেনা। আমাদের মতো দেশে নানা সমস্যা আছে। তাই ইচ্ছা থাকলেও অনেক কাজ করা যায়না। নিয়মিত কর্মচারীর বেতন দেয়া কোন ভাল কাজ নয়। সেজন্যেতো সরকার জনগণের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করছে। সরকার মানেতো জমিদারীর নায়েব। খাজনা আদায় করবে জনগণের কল্যাণে ব্যয় করবে। ষে সরকার এ কাজটা ভাল ভাবে করতে পারেনা সে সরকার ভাল সরকার নয়।
আমরাতো বলছি, মানবাধিকারের কথা, মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা, সুষ্ঠ নিরপেক্ষ ও স্বাধীন নির্বাচনের কথা। সর্বোপরি সীমাহীন দূর্ণীতির কথা। সারা বিশ্বই জানে বাংলাদেশে দূর্ণীতি হয়, কম আর বেশী। এদেশে পুলিশ, শুল্ক ও কর বিভাগ, শিক্ষা বিভাগ ঘুষ নেয়। এটা দেশের মানুষ প্রায়ই মেনে নিয়েছে। পুলিশ ঘুষ খায় এটা এখন আর কোন খবর নয়। বরং একজন পুলিশ খায়না সেটাই খবর। ইদানিং বাজারে জোর গুজব এক শ্রেণীর সাংবাদিক পুলিশের কাছ থেকে নানা ধরণের গিফট নেয়। তবে আমি এটা বিশ্বাস করিনি। হতে পারে সাংবাদিক ও পুলিশরা সামাজিক সুযোগ সুবিধা শেয়ার করে নিচ্ছে। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় ‘শেয়ারিং স্যোসাল অপরচুনিটিজ ইজ অলসো এ কনসেপ্ট’। ইদানিং ‘কর্পোরেট স্যোসাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর ) সরকারের বিরাট হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।পাঠক সমাজ নিশ্চয়ই খবরের কাগজে নিয়মিত পড়ে থাকেন অমুক ব্যান্ক বা অমুক গ্রুপ প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে জনসেবার জন্যে কোটি টাকা দান করছেন। কিন্তু কোন দরিদ্র মানুষ যদি কোন রকমে তাদের দুয়ারে যায় মেয়ে বিয়ে বা ছেলের পড়ার খরচের জন্যে তাদের ভাগ্যে তেমন কিছু জোটেনা। কারণ,ওসব ছোট খাট সাহায্যের ছবি কাগজে ছাপা বা টিভিতে দেখানো হয়না। এছাড়া ওই গরীব মানুষতো ধনী সাহায্যদাতার কোন উপকার করতে পারবেনা। যেমন ধরুণ,হলমার্ক গ্রুপের কেলেংকারীর ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার আগে এ রকম বহু সিএসআর এর কাজ করেছে প্রধানমন্ত্রী বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে। বিনিময়ে গ্রুপ বা কর্পোরেট হাউজ গুলো সরকারের কাছে থেকে সীমাহীন সাহাযা বা সমর্থন আদায় করে নেয়। ডেসটিনি বা যুবকের ঘটনাও একই রকম। সামান্য একটু পার্থক্য আছে। যুবকের চেয়ারম্যান সেনাবাহিনী প্রধান ও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। যুবকের সবচেয়ে বড় দোষ ছিল তারা নাকি ইসলামপন্থী ছিলো। তাই বাংলাদেশ ব্যান্কের বামপন্থী চিন্তাধারার অফিসারেরা যুবকের কল্লা কাটার কাজে নেম পড়েছিলেন। তাঁরা ভাবতে পারেননি যে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ডেসটিনির চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা সেনাপতিকে হাতে লোহার বেড়ি পরতে হবে। আমাদের দেশের সেনাপতিরা প্রায়ই বড় বড় গর্হিত কাজ করে ফেলেন। যেমন মুক্তিযোদ্ধা সেনাপতি নাসিম বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ক্যূ করতে গিয়ে চাকুরী হারিয়েছিলেন। অবসর প্রাপ্ত ক্যাপ্টেন তাজুল সাহেবও একই দোষে দোষী ছিলেন। তাই এখন তিনি মন্ত্রীর পদ লাভ করে পুরষ্কৃত হয়েছেন। কোন এক অদৃশ্য শক্তির পরামর্শে সেনাপতি মঈনও ক্ষমতা দখল করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাচিত করে দেশ ত্যাগ করেছেন। তিনি আজও দেশে ফিরে আসতে পারছেননা। একইভাবে আমেরিকার নাগরিক ফখরুদ্দিন সাহেবও প্রধান উপদেষ্টার চাকুরী করে বিদেশে পালিয়ে আছেন। সকল শাসকই যখন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তখন আর মিডিয়াকে সহ্য করতে পারেননা। এইতো ক’দিন আগে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী উপদেষ্টা চৌধুরী সা্হেব বলেছেন, মিডিয়া সরকারের ভাল কাজ গুলো নিয়ে লিখছেনা। পদ্মাসেতুর মতো একটি ভাল কাজও প্রধানমন্ত্রী শুরু করতে পারেননি। তার আগেই দেশে বিদেশে নানা কেলেংকারী। জনগণের দোর গোড়ায় বিদ্যুত পৌঁছে দেয়া একটি ভাল কাজ, কিন্তু কুইক রেন্টালের দূর্ণীতিতে সে কাজটাও মন্দ হয়ে গেছে। সারা দেশে গ্যাসের দূর্ভিক্ষ। শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় বসার পর থেকে মানুষ গ্যাস ও বিদ্যুত পাচ্ছেনা। এরকম গ্যাস-বিদ্যুত দুর্ভিক্ষ এর আগে কখনই ছিলনা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিনই বলছেন তাঁর সরকার গ্যাস ও বিদ্যুত সরবরাহ বাড়িয়েছেন। প্রতিদিন লোক বাড়ছে, সকল বিষয়েই চাহিদা বাড়ছে। সরকার ঢোল পিটাচ্ছেন বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে। সাথে সাথে কিন্তু মুদ্রা স্ফিতি, জনসংখ্যাও বেড়েছে। ফলে জিডিপি সাত পারসেন্ট হলেও তার সুফল পাওয়া যায়না।

Read Full Post »