Feeds:
Posts
Comments

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংখ্যালঘু / এরশাদ মজুমদার

সংখ্যালঘু বিষয়টি জানতে হলে অখন্ড ভারতের রাজনীতি সম্পর্কে জানতে হবে। কেন ভারত ভাগ হলো? ইংরেজদের আগমনের পুর্বে ভারত ছিল বিভিন্ন রাজা মহারাজাদের শাসিত। এসব রাজা মহারাজারা প্রায়ই স্বাধীন ছিলেন। ভারতে মুসলমানরা আসতে শুরু করেন সপ্তম শতাব্দী থেকে। এদের বেশীর ভাগই ছিলেন সওদাগর ও ধর্ম প্রচারক। মুসলমান রাজনৈতিক ক্ষমতা খন্ডিত ভারতে পা রাখে ৭১১ সালে মুহম্মদ বিন কাশেমের মাধ্যমে। তখনও অখন্ড ভারত বলে কোথাও কিছু ছিলনা। ভারত বলেও কোন শব্দ ছিলনা। বিদেশীরা বিশেষ করে আরব বণিকরা এদেশকে হিন্দুস্তান বলতো। বর্তমান হিন্দু ধর্ম বলেও তেমন কোন ধর্ম হিন্দুস্তানে ছিলনা। বেদ বা উপনিষদে নিরাকার ঈশ্বরের কথা বলা হয়েছে আর জীবন যাপনের জন্যে কিছু নিয়ম কানুনের কথা বলা হয়েছে। এখনও ভারতের দক্ষিণে যে ধর্ম পালিত হয় তা উত্তরে হয়না। দক্ষিণের রাজা ছিলেন রাবণ। তাকে ভাই বিভীষনের ষড়যন্ত্র করে উত্তরের আর্য রাজা রাম পরিজিত করেন। রাবণের পরে বিভীষণই দক্ষিণকে শাসণ করেন। বাংলায় দুর্গারশিবের পুজা হ পুজা হয়,কিন্তু বাংলার বাইরে তা হয়না। কোথাও গণপতির পুজা হয়, আবার শিবের পুজাও হয়। অতি সংক্ষেপে ভারতের ধর্মীয় ইতিহাসের কথা বললাম।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে মুসলমানদের আগমনের পর। ভারতীয়রা ইতিহাস লিখতে জানতোনা। ভারত সম্পর্কে বহির্বিশ্ব জানতে পারে এক হাজার বছর আগে আরবী ভাষায় লিখিত আলবিরুণীর ভারতত্ব পড়ে। এটাই প্রথম আকরগ্রন্থ। ভারতীয়রা ভারতকেই বিশ্ব বলে জানতো। রাজারা নিজ শাসিত এলাকাকেই দেশ মনে করতো। এক রাজার সাথে অন্য রাজার তেমন কোন সম্পর্ক ছিলনা। ১২শ’সালের পর ভারতে মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। পুরো ভারতকে একটি দেশ বা ভৌগলিক ইউনিট হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন মোগল শাসকগণ। বাবরের মাধ্যমে ১৫২৬ ভারতে সালে দিল্লীর ক্ষমতা দখল করেন মোগলরা। এ সময় থেকেই ভারত অখন্ড ভৌগলিক এলাকায় পরিণত হতে থাকে। মোগলরাই ভারতে ফেডারেল সরকার প্রতিষ্ঠা করে। কেন্দ্রীয় সরকার মানে মোগলদের আনুগত্য স্বীকার করেই রাজা মহারাজারা নিজ নিজ এলাকা শাসণ করতেন। মোগল আমলেই মহারাজাদের সাথে বিভিন্ন রাজ্যে নবাবীর পত্তন হয়। রাজ্য রাজা ও নবাবদের কাজ ছিল কেন্দ্রের আনুগত্য স্বীকার করে নির্ধারিত কর দেয়া। ভারতের রাজ্যগুলো এখনও সেই ভাবেই চলছে তথাকথিত গণতন্ত্রের লেবাস পরে। কেন্দ্রের কথা না শুনলেই রাজ্য সরকার বাতিল করে দিয়ে কেন্দ্রের শাসন চালু করা হয়। প্রত্যেক রাজ্যেই একজন গভর্ণর নামের একজন কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি থাকেন। মোগল আমলে মহারাজা বা নবাবদের নিজস্ব সেনাবাহিনী ছিল। এখন গণতান্রিক যুগে সেই সুযোগ নেই। ভারতের বহু রাজ্যে স্বাধীনতা আন্দোলন চলছে কয়েক যুগ ধরে। কেন্দ্রীয় সরকার সেনাবাহিনী দিয়ে রাজ্যের স্বাধীনতা আন্দোলন গুলোকে দমণ করছেন।
ইতিহাসের এ বিষয় গুলো আপনারা অনেকেই কমবেশী জানেন। হিন্দু মুসলমানের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা খুবই বেশী এবং দৃশ্যমান হয়েছে ইংরেজ আমলে। এবং আজও চলছে এবং বছরে ছোট খাট এক হাজার দাংগা হয়। তথাকথিত প্রগতিশীল ভারত আজও দাংগা দমাতে পারেনি। তারা শুধু মুসলমানদের সাথে দাংগা করেনা। সকল জাতি ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর সাথেই দাংগা করে। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মোদীজীকে লোকে দাংগার গুরু মনে করেন। ভারতে মুসলমান রাজনৈতিক উপস্থিতির এক হাজার বছরেও দাংগা বা সাম্প্রদায়িকতার তেমন কোন ইতিহাস নেই। দাংগা ও সাম্প্রদায়িকতা শুরু হয়েছে ইংরেজদের ডিভাইড এ্যান্ড রুল পলিসির কারণে। ইংরেজরা সদ্য ক্ষমতাচ্যুত মুসলমান শাসক ও সম্প্রদায়কে আস্থায় নেয়নি কখনও। বরং মুসলমানদের শত্রু মনে করতো। সরকারী চাকুরী,এজেন্সী ও ব্যবসা বাণিজ্যের সুযোগ পেত হিন্দুরা।বৌদ্ধদের ভারত থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। এখন খৃষ্টানদের হিন্দু বানাবার চেষ্টা চলছে। হিন্দুরা শিখদের উপরও অত্যাচার চালায়। ৩০ কোটি অচ্যুতদের ধর্মীয়ভাবেই মানুষ মনে করা হয়না।


ব্লগার ধর্ম ও রাষ্ট্রের অবস্থান / এরশাদ মজুমদার

এমন এক সময় এই কলামটি লিখছি যে সময়ে ক্ষমতাসীন জোট অন্তর কলহে জড়িয়ে পড়েছে। জোটকে ঐক্যবদ্ধ রাখার আহবান জানিয়েছেন দলের সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ। তিনি আরও বলেছেন দলের প্রধান শেখ হাসিনার নিরাপত্তা হুমকির মুখে। তাঁর মতে বিএনপি নাকি খুনীর দল। খালেদা জিয়া শেখ হাসিনাকে হত্যার চেস্টা করছেন। ক্ষমতায় থেকেও তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় আছেন। এ সময়ে জোট ভেংগে যায় এমন বিতর্কে জড়িয়ে পড়া ঠিক হবেনা। বিতর্ক হচ্ছে, বংগবন্ধু হত্যার সাথে জাসদের জড়িত থাকার অভিযোগ। মেনন বলেছেন, সব জেনেই জোট তৈরি হয়েছে। এখন এসব কথা বলে লাভ নেই। লেখক মহিউদ্দিন সাহেব বই ও কলাম জাসদের রাজনীতি ব্যাখ্যা করেছেন। প্রথম আলোতে কদিন আগে জাসদের ঘরে ফিরা নিয়ে একটি কলাম লিখেছেন। ইনু ও মেনন সাহেব নিজেদের কোমরের জোরে ভোটে দাঁড়িয়ে জামানত রক্ষা করতে পারেননি। ফলে নৌকায় চড়ে ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করছেন। ইনু সাহেবের মনে সব সময় অতীতের নানা কথা উঁকি মারে। তাই তিনি শেখ হাসিনার চেয়ে দশ ভাগ এগিয়ে খালেদার বিরুদ্ধে আজে বাজে কথা বলেন। আওয়ামী রাজনীতিতে নাকি এ ধরনের ভাষা নাকি খুব জনপ্রিয়।

এমনিতেই আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরীন কোন্দল চরমে উঠেছে। প্রায় প্রতিদিনই দলীয় খুনাখুনির খবর কাগজে ছাপা হচ্ছে। তার সাথে যোগ হয়েছে রেব ও পুলিশের বন্দুক যুদ্ধ। সে নিয়ে চলছে বাক বিতন্ডা। ছাত্রলীগ বলছে তারা মন্ত্রীদের চোখ রাঙানিকে ভয় পায়না। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ছাত্রলীগের উপরতলার নেতারা মুজিব নগর সরকারকে পাত্তা দিতেন না। তাঁরা দিল্লীর কথা অনুযায়ী চলতেন। একে খোন্দকার সাহেবের বইতে এসব নিয়ে কিছু আলোকপাত করা হয়েছে। এজন্যে খোন্দকার সাহেবকে বেশ অপমানিত হতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের তিন বাহিনী প্রধান আজ অপমানিত। জিয়া সাহেবকে পাকিস্তানের দালাল বলা হয়। খোন্দকারের অবস্থা ভাল নয়। সফিউল্লাহ সাহেবেরও একই অবস্থা। সেদিন এক বন্ধু বললেন,ভারতের অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে বাংলাদেশে কেউই ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। অনেকেই বলেন ইসলামিক সম্মেলনে গিয়ে বংগবন্ধুকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হয়েছে মর্মান্তিক ভাবে। জেনারেল জিয়াকেও নাকি একই কারণে প্রাণ দিতে হয়েছে। বিষয়টি শেখ হাসিনা গভীর ভাবে অনুধাবন করেছেন। তাই তাঁর রাজনীতি এখন একশ’ভাগ দিল্লী ভিত্তিক বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। দিল্লী এবার জন জরীপে ধর্ম বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে নিয়ে এসেছে। বিভিন্ন রাজ্যে মুসলমান ভোটারদের নিয়ে ব্যাপক বিশ্লেষণ চলছে। মুসলমানরা ভারতীয় রাজনীতিতে নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিজেপি একটি ধর্মপন্থী রাজনৈতিক দল। সারা ভারতে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা আছে বলেই বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সেক্যুলারিজমের(ধর্মহীন) রাজনীতি করেন। এতে তিনি মাইনরিটিদের অবারিত ভাবে তোষণ ও পোষণ করে যাচ্ছেন। অপরদিকে হিন্দুনেতারা অভিযোগ করেছে, আওয়ামী লীগের মন্ত্রী সাংসদ ও শক্তিশালী লোকেরা হিন্দুদের সম্পত্তি দখল করে নিচ্ছেন। রাণা দাশগুপ্ত ইতোমধ্যেই দাবী তুলেছেন পৃথক নির্বাচনের। আমি দাশগুপ্তের দাবীকে সমর্থন করি।

চলমান রাজনীতিতে ব্লগাররা খুবই আলোচিত একটি বিষয়। সরকারের সাথে ব্লগারদের হয়ত এক ধরণের আদর্শিক সমঝোতা থাকতে পারে। ব্লগারদের ব্যাপারে সরকারের একটা দুর্বলতা আছে বলে মনে করা হয়।সম্প্রতি নিহত নীলাদ্রী চক্রবর্তী নামের একজন ব্লগার নিহত হওয়ার পর বিশ্ব মিডিয়ায় বাংলাদেশের নাম শিরোনামে উঠে এসেছে। তাঁর নামের সাথে ব্লগার শব্দটি যোগ না হলে তিনি শুধুই একজন নাম না জানা সাধারন ব্যক্তি। বাংলাদেশের একজন অজানা ব্যক্তির মৃত্যুতে জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল বান কি মুন বিবৃতি দিয়েছে। আমেরিকা ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য বিবৃতি দিয়েছেন। মৃত ব্যক্তির গুণ হলো তিনি একজন ব্লগার। তিনি তাঁর ব্লগের মাধ্যমে ইসলাম, আল্লাহ, রাসুল(সা) ও মসজিদের বিরুদ্ধে লিখতেন। তাঁর ব্লগের নাম ইস্টিশন। অপরদিকে বাংলাদেশের ইসলামিক স্কলার মারা গেলেও জাতিসংঘের কোন প্রতিক্রিয়া থাকেনা।
নীলাদ্রির মৃত্যুতে মনে হয় সরকারের টনক নড়েছে। তাই, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর প্রশাসন মেশিনের লোকজন বলতে শুরু করেছেন ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু বলা ও লেখা যাবেনা। এ কথা সরকার এক বছর আগেও বলেনি। এবার বলছেন কেন? যারা ব্লগারদের হত্যা করছে তারা কারা? তারা কি কোন ধর্মীয় গ্রুপের লোক? চলমান সরকার নিজেদের সেক্যুলার বা ধর্মমুক্ত মনে করেন। সংবিধানকেও ধর্মমুক্ত রাখা হয়েছে। শুধু নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা মাথায় টুপি পরেন বা ঘোমটা দেন। কারণ, ভোটারদের ৯০ ভাগ মুসলমান। নির্বাচিত হওয়ার পরেই নির্বাচিত নেতারা নিজেদের সেক্যুলার বলে দাবী করেন। তখনি তাঁরা ইসলাম, মাদ্রাসা ও আলেম সমাজকে নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করতে থাকেন। এদেশে বহু ইসলামিক স্কলার আছেন যাঁরা কোরআন ও হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেন। সরকার নিজেকে স্কলারদের কাছে থেকে দূরে রাখতে চান। সরকার নিজেদের অনুগত তথাগত আলেমদের দিয়ে পছন্দমতো ফতোয়া জারী করেন। ধর্মের সাথে রাজা খলিফা বা রাষ্ট্রের বৈরীতা অনেক পুরাণো। চোর যেমন ধর্মের কথা শুনেনা, তেমনি রাষ্ট্রও ধর্মকে নিজের অধীনে রেখে ধর্মের ব্যাখ্যা দিতে চায়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম নিয়ে মোনাফেকি বহু পুরাতন। আওয়ামী লীগ তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের কাছে নিজেকে ধর্মমুক্ত দল হিসাবে উপস্থাপিত করতে চায়। আবার সাধারন ভোটারদের কাছে নিজেকে মুসলমান হিসাবে পরিচিত করতে চায়। অপরদিকে বিএনপিকে মৌলবাদী দল হিসাবে প্রচার করতে চায়। পশ্চিমারা মুক্তমনা ধর্ম বিরোধীদের পছন্দ করে। আওয়ামী লীগ নিজেদের মুক্তমনাদের পক্ষের শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। গণজাগরণ মঞ্চ বা শাহবাগীদের সরকার নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। আদালতের রায়কে প্রভাবিত করার জন্যে গণজাগরণ মঞ্চ খুবই কার্যকর ভুমিকা পালন করেছে জনসাধারন মনে করে।
জগতে সব মানুষ আল্লাহর নির্দেশ ও কিতাব মতো চলবে এমন কথা নেই। বেশ কিছু মানুষ শয়তানের অনুগামী হয়ে গেছে। কেউ যদি আল্লাহ ও রাসুলের(সা) নির্দেশ অমান্য করে তারা তা করবে নিজেদের দায়িত্বে। সুপথ আর কুপথ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা তাঁর কিতাবে স্পস্ট করে বলে দিয়েছেন। কিন্তু কেউ কারো ধর্মকে হেয় বা নিন্দা করতে পারবেনা। জগতের সকল দেশ ও রাষ্ট্র এ নীতি লিখিত ভাবে মানে। সংবিধানে অনেক কথাই আছে যা বাস্তবে সরকার গুলো তা মানেনা। ধর্মের নিন্দা করা আমাদের সংবিধান অনুমোদন দেয়না। বাংলাদেশে ইসলাম হচ্ছে রাস্ট্রীয় ধর্ম। ব্লগাররা বেশ কিছু বছর ধরে ইসলাম, আল্লাহ ও রাসুল(সা) সম্পর্কে আজেবাজে কথা লিখে যাচ্ছে। সরকার কখনই এ ব্যাপারে কোন প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। ফলে ব্লগাররা উত্‍সাহিত বোধ করেছে। আমাদের দেশে বহু ব্লগার আছেন,তাঁরা ধর্মের বিরুদ্ধে কোন বক্তব্য দেননা। তথাকথিত মুক্তমনা,বিজ্ঞানমনস্ক লেখকগণ বিনা কারণে ইসলামের বিরুদ্ধে লেখালেখি করেন। এসব ব্লগারের ইসলাম বা কোন ধর্ম সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই। কোরআন নিজেই নির্দেশ দিয়েছে, তোমরা কখনই ওদের দেবদেবীদের গালাগাল করোনা। ওরা যব্দ হয়ে তোমার আল্লাহকে গালাগাল দিতে থাকবে।আল্লাহর কিতাব ও ধর্ম বিশ্বাস করেই গ্রহণ করতে হবে। গ্রহণ করার ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই। যারা জবরদস্তি করতে চায় তারা ধর্মহীন বা মুসলমান নন। ইসলাম কি ও কেন তা অবিরাম গবেষণা ও প্রচারের দায়িত্ব ইসলামী পন্ডিত ও স্কলারদের। বাংলাদেশে ইসলাম নিয়ে তেমন কোন শক্তিশালী গবেষণা নেই। বাংলাদেশ একটি মুসলীম প্রধান দেশ। তবুও ইসলাম নিয়ে তেমন কোন গবেষণা নেই। কারণ সরকার নিজেকে ধর্মহীন বা ধর্মমুক্ত মনে করে। কয়েকদিন আগে একজন আওয়ামী নেতা হানিফ বলেছেন, বংগবন্ধু রাসুলের(সা) কাছ থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা শিখেছেন। রাজনীতিতে ফালতু কথা বলার রেওয়াজ আমাদের দেশে আছে। হানিফ সাহেব হয়ত কথার কথা হিসাবে এমন মন্তব্য করেছেন। আওয়ামী লীগের ধর্ম বিশ্বাস হচ্ছে সেক্যুলারিজম বা ধর্মহীনতা বা ধর্মমুক্ততা। সেক্যুলারিজম নিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের কোন ধারণা নেই। জেনারেল মইনের সরকারের আমলে একজন সাংবাদিক ধর্মমন্ত্রী ছিলেন, যিনি ধর্মের কিছুই জানতেন না। কারণ ধর্মমন্ত্রী হতে হলে ধর্ম জানতে হয়না বাংলাদেশে। ধর্মনিরপেক্ষতা ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্যে বহু সরকারী আলেম আছেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন তিনি মদিনা সনদ মেনে চলবেন। তখনও আমি লিখেছিলাম প্রধানমন্ত্রী মদিনা সনদ কি তা ভাল করে জানেন না। তাঁর সরলতাকে ব্যবহার করে কেউ হয়ত তাঁকে ভুল বুঝিয়েছেন। তখন দেখেছি বেশ কিছু বুদ্ধিজীবী মদিনা সনদ নিয়ে নানা কথা বলেছেন। আমাদের দেশে বহু তথাকথিত সেক্যুলার শিক্ষিত আছেন যাঁরা ইসলাম, কোরআন ও হাদিস সম্পর্কে কিছুই জানেন না, তবুও তাঁরা এ ব্যাপারে মন্তব্য করেন এবং আরবী শিক্ষিত আলেমদের গালাগাল করেন। বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত বেশ কয়েক জন মানুষ আছেন যাঁদের কোন বিদ্যা বা জ্ঞান নেই। তাঁরা নাকি স্বশিক্ষিত। এরাই হয়ত বংগবন্ধুর কন্যাকে ভুল পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আশি বছর পুর্তি হয়েছে এমন একজন বুদ্ধিজীবী( তিনি অভিনয় করেন বলেই বুদ্ধিজীবী) যাঁর বাপ দাদারা ৪৭ ভারত ত্যাগ করেছেন মুসলমান হিসাবে। পাকিস্তানের ২৩ বছরে হালুয়া রুটি খেয়েছেন। ৭১ এ ছিলেন ভারতে ছিলেন। এ ভদ্রলোক এক সময়ে ব্যাংকের কেরাণী ছিলেন। এখন একেবারেই জাতীয় ব্যক্তিত্ব। এঁরা কথায় কথায় ভারতে পালিয়ে যান। নিজেদের মুসলমান মনে করেন না। এখন শুধুই ১০০ভাগ বাংগালী। ধর্ম পরিচয়ে লজ্জিত বোধ করেন। তবে আরবী নামটি ত্যাগ করতে চান না। সময় সুযোগে কাজে লাগতে পারেন। এদের বেশীর ভাগই বাংলাদেশে থেকে ভারতের কল্যাণে কাজ করেন। এঁরা ভারত থেকে নানা বিষয়ে সনদ এনে ঢাকায় ফুলের মালা গ্রহণ করেন। এঁরা বাংলাদেশে ভারতীয় দর্শণ প্রচার করেন। দেশের মানুষ মনে করেন এসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবী প্রধানমন্ত্রীর অদৃশ্য উপদেষ্টা। প্রধানমন্ত্রীকে হাজার বছর ক্ষমতায় রাখার জন্যে দিল্লী দরবারের পায়রবি করে। প্রধানমন্ত্রীও তাঁদের কাজে লাগাতে চান।
ক’দিন আগে আমাদের প্রধানমন্ত্রী দিল্লী গিয়েছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব বাবুর স্ত্রী শুভ্রা মুখার্জীর মৃত্যুতে শোক জানাবের জন্যে। প্রধানমন্ত্রী নাকি ব্যক্তি জীবনে প্রণব বাবুকে কাকাবাবু হিসাবে ডাকতেন। সে হিসাবে শুভ্রাদেবী তাঁর কাকিমা। শুনেছি, এরশাদ সাহেব শ্রীমতি গান্ধীকে মা বলে ডাকতেন। এসব ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের কারণে ভারত আমাদের দেশ থেকে বিগত ৪৪ বছরে বহু সুবিধা নিয়েছে। বিনিময়ে আমরা পেয়েছি সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা। শত আলোচনার পরেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। বর্তমান সরকার ভারতকে বাংলাদেশের সকল দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই শোকাবহ সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ভারত যদি বেশী বেশী দেয় তাহলে বাংলাদেশ আর অন্যকোন দেশের দিকে তাকাবেনা।
উত্তরে মোদীজী বলেছেন, শুধু ব্যবসা বাণিজ্য নয় আমরা সকল ক্ষেত্রেই এক হয়ে কাজ করতে চাই। ইতোমধ্যেই ভারতের হিন্দী ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছে। সনাতন সকল পূজা নাকি বাংগালী মুসলমানদের সামাজিক সংস্কৃতি বলে একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীরা প্রচার শুরু করেছেন। ব্লগাররা, যারা নিজেদের মুক্তমনা ধর্মদ্রোহী হিসাবে প্রচার করছেন আর আগেই বলেছি সরকার ধর্মদ্রোহী ব্লগারদের ব্যাপারে উদার মনোভাব নিয়েছিলেনন। জগতের কোন মুসলমানই খোদা, আলকোরাণ ও রাসুলের(সা) সমালোচনা নিন্দা সহ্য করবেনা। সেক্যুলারিজমের নামে সরকার নীরব থাকতে পারেনা। ১৯৩০ বা ৩২এর দিকে রংগিলা রাসুল বই প্রকাশ করে কোলকাতার এক প্রকাশক নিহত হয়েছেন।সরকার যদি এ ব্যাপারে সরকার কঠোর অবস্থান নিতেন তাহলে তাহলে চলমান অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি হতোনা। সরকার আজও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেননি।
বাংলাদেশে সরকার নিজেকে ধর্মমুক্ত বা ধর্ম নিরপেক্ষ বলে কথায় কথায় প্রচার করে থাকেন। ফলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এখানে যাঁরা নিজেদের মুসলমান হিসাবে পরিচয় দিয়ে বাঁচতে চান তাঁদের জন্যে পরিস্থিতি একটু জটিল। দেশের নাগরিকদের ৯০ ভাগ মুসলমান হলেও দেশ চলে ধর্মহীন
সংবিধান মোতাবেক।শ্লোগান হলো ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। মুসলমানদের জন্যে আইনের কিতাব হচ্ছে দ্বীন( আইন, নিয়মনীতি) ইসলাম। তাহলে আপনারা বুঝতে পারছেন এদেশের মুসলমানকে দুটি আইন মানতে হয়। একটি কোরআনের আইন ও অপরটি সংবিধানের আইন। জগতে আমরা যে ভুগোলে বাস করি সেখানে সেই দেশের আইন মানতে বাধ্য। দেশের আইন যদি কোরআন বা ঈমান বিরোধী হয় তবু ও মানতে হবে। জগত হচ্ছে দেহের জগত, আর এই দেহের উপর জগতের সরকারের আইনী অধিকার আছে। অতীতের সকল রাজা বাদশাহ আইনের কথা বলে মানুষের উপর অত্যাচার করতো। ফেরাউনতো নিজেকে খোদা বলে ঘোষণা দিয়েছিলো। সে বলেছিল জীবন ও মরণের মালিক সে নিজেই। সেই ফেরাউনকে আল্লাহতায়ালা দলবল সহ ধ্বংশ করে দিয়েছেন। এখন জগতের সরকার গুলো কথায় কথায় নানা বাহানায় মানুষ হত্যা করে। এর মানে সরকারগুলো মনে করে মানুষের প্রাণ রাখা না রাখা সরকারের ইচ্ছা। দেহের ভিতর যে রূহ আছে আমানত হিসাবে তার মালিক আল্লাহপাক স্বয়ং। আমরাতো রুহের খবর রাখিনা। রূহের উপর জগতের কোন সরকার বা শাসকের রূ্হের উপর কোন ক্ষমতা নেই। রূহ চলে গেলে রাজা বাদশাহ, প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেন্ট, ধনী গরীব সবাইকে মাটির নীচে যেতে হবে। যারা জগতে মানুষের জন্যে ভাল কাজ করেছেন তাঁদেরকে মানুষ স্মরণ করবে আর আল্লাহতায়ালাও তাঁদের ক্ষমা করবেন।
আমিতো বাংলাদেশের নাগরিক। আমাকে বাধ্য হয়ে এদেশের সংবিধান মানতে হবে। সংবিধান তৈরি করেন ক্ষমতাসীন রাজনীতিকরা। তাঁরা নিজেদের ধ্যান ধারনা মোতাবেক সংবিধান তৈরি করেন। চলমান সরকার ওয়াদা করেছিলেন ৭২এর সংবিধান চালু করবেন। ওই সংবিধান নাকি সেক্যুলার বা ধর্মমুক্ত ছিল। আওয়ামী লীগ নিজেদের সেক্যুলার বলে দাবী করলেও ভোটের কারণে অন্তরের কথা মন খুলে বলতে পারেন না। আওয়ামী পন্থী বুদ্ধিজীবীরা ধর্ম বিরোধী। তাঁরা ভারত ও পশ্চিমা দেশ গুলোকে খুশী রাখতে নিজেদের ধর্মমুক্ত প্রচার করতে চান। ইসলামের কথা জোর দিয়ে বলতে চাইলেই জংগীবাদ ও সন্ত্রাসের কথা উঠে। সংবিধান, আদালত, প্রশাসন ও বাহিনী এখন কোন কথা বলা যাবেনা। এতে নাকি চলমান আইন ভংগ হয়। ইতোমধ্যেই দেশের সংবিধান ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের দাবী উঠেছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল কোন ধরণের সংস্কারের পক্ষে নন। তাঁরা মনে চলমান সংবিধান, যা নির্বাচনী সংস্কারের জন্যে মোটেও যথেষ্ট নয়। সংবিধান মোতাবেক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এখন রাজা বাদশাহদর মতো ফেরাউনী ক্ষমতার অধিকারী । আমি এর আগে গণতন্ত্রের নানা রূপ নিয়ে কলাম লিখেছি। স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার দ্বারা মানুষকে দমন করে দেশ পরিচালনা করাও এক ধরণের গণতন্ত্র। রাজা বাদশাহদের দেশেও এক ধরণের গণতন্ত্র আছে, যাকে তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশগুলো সমর্থন জানায়। যেমন সউদী আরব। এদেশের বাদশাহকে আমেরিকা ও ইউরোপ সমর্থন করে।
চারজন তথাকথিত ব্লগার বা ধর্মবিরোধীকে জংগী নামের অভিযুক্তরা হত্যা করেছে। এদেরকে ইসলামপন্থী চিহ্নিত করে ইসলামকে অপমানিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে কিছু বিপথগামী ধর্মপন্থী যুবকের কারণে ইসলামকে কাঠগড়ায় হাজির করা হয়েছে। কিন্তু ধর্মবিরোধী ব্লগারদের শুরু থেকে আসকারা দেয়া হয়েছে। কারণ ভারত ও পশ্চিমারা ধর্মবিরাধী ব্লগারদের জাতিসংঘ ভালবাসে।
লেখক: কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
ershadmz@gmail.com


সকালবেলা ৯৭

তোমরা কেমন আছো জানিনা। আমার দোয়া ও সালাম নিও। অনেকদিন তোমাদের দেখিনি। মাঝে মাঝে স্কাইপে দেখি ও কথা হয়। বিজ্ঞানের অবদানে আমি এ সুযোগটি পেয়েছি। আলকোরআনের নির্দেশ মোতাবেক তোমরা মা বাবার খোঁজ খবর নিতে বাধ্য। এটা একটি কোরানিক আইন। এ আইন তোমরা অনেক আগেই অমান্য করেছো। তবুও খোদার কাছে আবেদন করবো,তিনি যেন তোমাদের ক্ষমা করে দেন। কোন বাপ মা’ই চায়না তাদের সন্তান খোদার রোষে পড়ুক। বাদশা বাবর নাকি খোদার কাছে প্রার্থনা করেছিলেন তাঁর জীবনের বিনিময়ে হুমায়ুনকে রক্ষা করতে। খোদা নাকি বাবরের সে আবেদন অনুমোদন করেছিলেন ।
পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যসাগর মায়ের অসুস্থতার খবর শুনে অন্ধকার রাত্রিতে মহা খরস্রোতা দামোদর নদী পাড়ি দিয়েছিলেন। বায়েজিদ বোস্তামী অসুস্থ মায়ের শিয়রে দাঁড়িয়েছিলেন সারারাত দুধ হাতে। ওয়ায়েজ কার্ণি শুধুমাত্র মায়ের খেদমত করেই অলি আল্লাহ হয়েছিলেন। এ রকম আরও বহু মেছাল আছে। জগতে আল্লাহর পরেই মায়ের স্থান। জান্নাত পেতে হলে মা বাপের খেদমত করা বাধ্যতামূলক। মাঝে মাঝে ভাবি তোমাদের জন্ম দিতে আমার কষ্টের কথা। সে কষ্ট নাকি এক ধরনের হাশর। তোমাদেরকে আমি দশ মাস দশ দিন পেটে রেখে দুনিয়াতে এনেছি। সে সময়টাও এক ধরনের হাশর। এর পর তোমাদের পালন করা। আমার জীবনে এ মূহুর্ত গুলো তোমাদের মনে নাই। তিন চার বছর পর তোমাদের নিয়ে গেছি স্কুলে। সেদিন থেকে তোমাদের হয়ত কিছু কিছু কথা মনে হতে পারে।


মজলুমের কান্না শুনতে কি পাও

বেশ কিছুদিন হয়ে গেল নয়া দিগন্তে লেখা পাঠাইনি। বেশ কিছুদিন কম্পিউটারের কাছে আসিনি। এক সময় আমি দুই বেলাই কম্পিউটার ব্যবহার করেছি। এখন ইচ্ছা হয়না। কারন জানিনা। ফেসবুকটা ফালতু হয়ে গেছে। বাজে কথার কারখানা হয়ে গেছে। সবাই বেশী বেশী লাইক ও কমেন্ট চায়। ‘শুদ্ধ আত্মা চর্চা কেন্দ্র’ নামে একটি পাতা তৈরি করেছিলাম। সে পাতায় কয়েকজন মাত্র লাইক দিয়েছিলেন। আমি ধরেই নিয়েছি ফেসবুক ব্যবহার কারীরা(ফেবু) শুদ্ধ আত্মায় আগ্রহী নন, অথবা তারা শুদ্ধ আত্মা কি তা জানেনা। নয়া দিগন্তে কলাম প্রকাশিত হলে দেশ বিদেশ থেকে ৫০/৬০টি মেইল বা ফোন আসে। অনেকেই অনুরোধ করেছেন কলাম গুলোকে বই আকারে প্রকাশ করার জন্যে। আমি প্রস্তুতিও নিয়েছি। জানিনা কখন প্রকাশ করতে পারবো।আমার অনেক লেখাই পড়ে আছে যা আমি প্রকাশ করতে পারিনি। আমি পাঠক প্রিয় লেখক নই। তাই প্রকাশকরা আগ্রহ নিয়ে আমার লেখা প্রকাশ করতে চায়না। সাহিত্য জগতে খায় একটি শব্দ চালু হয়েছে। মানে লেখা খায়না। হুমায়ুন আহমদের লেখা খায়। শিশুরা যেমন বার্গার বা কোক খায়। চলমান বাংলা সাহিত্যে হুমায়ুন আহমদ বার্গারের মতোই। যা লিখলে পাঠক খায়না তা হুমায়ুন লেখেন না। কারণ তিনি জানেন পাঠক কি কি খায়। আমার বড়ছেলে নওশাদ সত্যজিত রায় ও হুমায়ুনের পাগল ছিল। আমি দুজনেরই বিরোধী । সত্যজিতকে বিদেশী সমালোচকরা মার্চেন্ট অব পোভার্টি বলতো। গোয়েন্দা কাহিনী ও স্যাটায়ার লিখেও তিনি জনপ্রিয় হয়েছেন। তাঁর সিরিয়াস সব লেখাই ছিল বাংলার দারিদ্র নিয়ে। সেটা তিনি নিখুত ও নিপুণ ভাবে লিখেছেন ও চিত্রায়িত করেছেন। দারিদ্র বিক্রি করেই তিনি বিখ্যাত হয়েছেন। দারিদ্র বিমোচনের জন্যে কাজ করে নোবেল পেয়েছেন ড.ইউনুস। ইউনুসের মডেল এখন বিশ্বব্যাপী গৃহীত হচ্ছে। হুমায়ুন একেবারেই মার্চেন্ট। তিনি তরুণদের হিরো বা হিমু ছিলেন। ক’দিন পর দেখা যাবে হিমু নামে সিরিজ প্রকাশিত হচ্ছে, অথবা হুমায়ুনের অপ্রকাশিত লেখার বিশ খন্ডের লিখিনিয়মিত যে কলাম বই বের হচ্ছে।
আমি নিয়মিত যা লিখি বেশীর তার বেশীরভাগই রাজনীতি বিষয়ক। আমাদের রাজনীতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও চিন্তার জগত এখন ১০০ ভাগ দ্বিধা বিভক্ত। ৭১ সালে সমস্ত মানুষই একাট্টা ছিলো বাংগালী বা পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থে। রাজনীতির মূল বিষয় ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিরা জিত সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য। বৈষম্য না থাকলে পাকিস্তান অত সহজে ভেংগে যেতনা। যদিও ভারত ৪৭ সালেই বলেছে পাকিস্তান টিকবেনা। পাকিস্তান যাতে ভেংগে যায় সেজন্যে ভারত ৪৭ সাল থেকেই কাজ করে যাচ্ছিল। ৭০এর নির্বাচনী ফলাফল ভারতকে সে সুযোগ এনে দেয়। শেখ সাহেব আলোচনার মাধ্যমে উভয় অঞ্চলের বৈষম্য দূর করার জন্যে ছয় দফার ভিত্তিতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পাকিস্তানের সামরিক নেতাদের একাংশ,ভারত ও ভুট্টো পাকিস্তান ভাগ করার জন্যে কাজ করে যাচ্ছিল। ফলে শেখ সাহেবের আলোচনা সফল হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্যে যে তরুণ সমাজ ভারতের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে শেখ সাহেবের উপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছিল, তারাই সফল হয়েছে।পূর্ব পাকিস্তানের বোধশক্তি সম্পন্ন নেতারা পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষার জন্যে আলোচনার পক্ষে ছিলেন। তরুণরা প্রবীন নেতাদের পাকিস্তানপন্থী বলে জনগণের কাছে হেয় করেছে। এখন দেশে গণতন্ত্র ,মানবিকতা,অর্থনৈতিক ন্যায্যতা নেই। এমন একটি সমাজ ব্যবস্থাকে আল্লাতায়ালা জুলুমাত, জাহেলিয়াত বা অন্ধকার সমাজ বলে অভিহিত করেছেন। সমাজ বা দেশের শক্তিমান লোকেরা জনগণকে দাসে পরিণত করে। ক্ষমতাবানরা জনগণের সম্পদ লুট করে,তাদের কথা বলার অধিকার থাকেনা। মিশরের বাদশাহ ফেরাউন নিজেকে খোদা দাবী করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, জীবন দিতেও পারেন ও নিতেও পারেন।এক সেই ফেরাউনের পতন হয়েছে। অত্যাচারী ফেরাউনের মৃতদেহ চার হাজার পরেও মিশরের মিউজিয়ামে আছে অত্যাচারীর প্রতীক হিসাবে। জগতে এখনও বহু ফেরাউন ও নমরুদ আছে। তারা জগতকে অশান্ত করে রেখেছে। তারা এক সময় সমাজতন্ত্রকে মানবতার শত্রু আখ্যায়িত করে এর ধ্বংসের জন্যে হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে। এখন তারা ইসলাম ও মুসলমানদের টার্গেট করেছে। তথাকথিত মুসলমান দেশ বলে পরিচিত কিছু রাষ্ট্র ও শাসক কিছু মুসলমানকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যায়িত করেছে। এক সময় কমিউনিষ্ট বা সমাজতন্ত্রীরা সন্ত্রাসী ও মানবতা বিরোধী বলে তাদের ধ্বংস করার জন্যে আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করা হতো। এখন মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্যে আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। ওআইসি নাম সংগঠণটি নামমাত্র। এর তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা নেই। জাতিসংঘও তার চলমান ভুমিকার জন্যে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে। সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের কথা বলে মুসলমানের বিরুদ্ধে মুসলমানকে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে প্রধান এবং প্রধান নেতা হচ্ছে আমেরিকা। এই যুদ্ধের একজন সৈনিক হচ্ছে বাংলাদেশ। ফলে বাংলাদেশের ইমেজ ইসলাম হয়ে গেছে অনেকেই মনে করেন। আলকোরআন জেহাদী বই কিনা এ নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে। রেডিকেল বলেও প্রচার চলছে। এক সময় কমিউনিষ্টদের সন্ত্রাসী বা গণতন্ত্র বিরোধী বলা হতো। লাল বই কারো কাছে পাওয়া গেলেই পুলিশ তাকে ধরতো। কমিউনিষ্ট দেশ গুলোতে নেতাদের বিরুদ্ধে কিছু বলা সাংবিধানিক ভাবেই বলা যায়না। যেমন আমাদের দেশেও বংগবন্ধুর বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবেনা। এর মানে তিনি আইনের উর্ধে চলে গেছেন। জগতে বিতর্কের উর্ধে রাখা যায় কিনা আমি জানিনা। আখেরাতে বংগবন্ধুর অবস্থা কি হবে তা আমরা জানিনা। তবে আমরা হাজার মাগফেরাত চাইবো।
আল কোরআনের সুরা ইবরাহিমের ৪৮ আয়াতে বলা হয়েছে,যেদিন এই পৃথিবী অন্য একটি পৃথিবী ও মহাকাশে রূপান্তরিত হবে সেদিন সমস্ত মানুষ আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে। ৪৯ আয়াতে বলা হয়েছে, জালেমরা( অত্যাচারী শাসক ও ক্ষমতাবানরা) শৃংখলিত থাকবে। কারণ, জালেমরা নিরীহ মানুষদের উপর জুলুম চালিয়েছে। যারা জুলুম চালায় নিজ দেশের মানুষর বিরুদ্ধে তারাই জালেম। অপরদিকে যে সব জাতি অতীতেও আল্লাহ, রাসুল ও তাঁর নবী কিতাবের বিরুদ্ধাচরন করেছে যারা তাদের ধ্বংস করে দিয়েছে আল্লাহতায়ালা নিজেই। সে সব জাতি বা জনপদের নিশানা এখনও দেখা যায়। সমকামিতার দায়ে আল্লাপাক লুতের কওম ও দেশকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আলকোরআনে ধ্বংসপ্রাপ্ত বহু জাতির উল্লেখ আছে। কোন জাতি কেন ধ্বংস হয়েছে তার কারণও বিশদ বর্ণনা করা হয়েছে। কোথাও শাসক জালেম ছিল, আবার কোথাও মানুষগুলো ছিল শয়তানের ওয়ারিশ। ব্যক্তিগত ভাবেও মানুষ জালেম হয়ে যায়। ধনী মানুষের কৃপণতা সমাজকে জুলুমাতে(অন্ধকার) ঢেকে দেয়। অজ্ঞতা ও জ্ঞানহীনতা সমাজকে অন্ধকারে ঢেকে দেয়।
এখন আপনি ভাবুন, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়? জানিনা, এ প্রশ্নের জবাবে আপনি কি বলবেন। আমি মনে করি, বাংলাদেশে কঠোর ভাবে অন্ধকার নেমে এসেছে। জাতি একেবারেই দ্বিধা বিভক্ত। তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ দলদাসে পরিণত হয়েছে। চিন্তাধারা অন্ধ হয়ে গেছে। নির্বাচন বা গণতন্ত্র স্বেচ্ছারিতায় পরিণত হয়ে গেছে। শাসকরা দলের সরকারে পরিণত হয়েছে। দলের নীতিই হলো রাষ্ট্রের নীতি। দল যে ভাবে চায় সে ভাবেই সংবিধান তৈরি হয়। বিচার বিভাগের উপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলছে। ভিন্ন মতের মানুষ শাসক দলের শত্রুতে পরিণত হয়েছে। জেনারেল মইনের মাধ্যমেই দেশে অপশাসন চালু হয়েছে। তখন ছিল বাহিনী আর আমলাদের শাসন। এখন আমলা আর দলদাসদের শাসন। আকরো।ইউব খান বলতেন, আগে খাদ্য,পরে গণতন্ত্র। উন্নয়নের জন্যে গণতন্ত্র ত্যাগ করো। আইউব ও ইয়াহিয়ার কুশাসনে পাকিস্তান ভেংগে গেছে। বংগবন্ধু শেখ মুজিব ভেবেছিলেন একদলীয় একমতের শাসন জারী করলে দেশের উন্নতি হবে। তিনি একদলীয় গণতন্ত্র চালু করেছিলেন। কিন্তু সে ব্যবস্থা কয়েকদিন পরেই ভেংগে পড়েছে। চলমান সরকার ঘোষণা না দিয়েই এক মত ও পথের বাহিনী সমর্থিত সরকার চালুর পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সেদিক থেকে শেখ হাসিনা বংগবন্ধুর চেয়ে বুদ্ধিমতি ও কৌশলী। দীর্ঘকাল ক্ষমতা থাকার জন্যে তিনি সকল জ্ঞান ও বুদ্ধি অর্জন করেছেন। এর ফলে তাঁর রাজনৈতিক কলা কৌশল বিজয়ী ও দীর্ঘ মেয়াদী হতে পারে বলে প্রচার করা হচ্ছে। এমন রাজনৈতিক কৌশল একনায়কদের স্বেচ্ছাচারী দেশ গুলো অনুকরণ করতে পারে। গণতন্ত্রের এ নমুনা জনগণের নামে চললেও দিল্লী ও অদৃশ্য বাহিনীর সমর্থনে চলে বলে রাজনৈতিক সমালোচকরা মনে করেন।
দিল্লী, নেপাল ,সিংহল ও মালদ্বীপ অনুকরণ করতে পারে। সবদেশের গণতন্ত্রের রূপ একই রকম হতে হবে এমন দর্শন কোথাও নেই। ভারততো বাংলাদেশের এমন গণতন্ত্রের প্রধান সমর্থক ও গণতন্ত্রের এ রূপকে বাংলাদেশে টিকিয়ে রাখার জন্যে ভারত ঢাকায় একটি ডেমোক্রেসি ইন্সটিটিউট খুলতে পারে। নেহেরু পরিবারের গণতন্ত্র বংশ পরম্পরায় টিকে আছে। বাংলাদেশের প্রশ্নে বিজেপির নীতিও নেহেরু পরিবারের মতো। উত্তর কোরিয়ার কমিউনিজম ও দল টিকে আছে একটি পরিবারের উপর। কিউবার গণতন্ত্রও একদলীয় এবং পরিবার ভিত্তিক। তাহলে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের কাছে থাকলে অসুবিধা কোথায়? ভারতীয় কাশ্মীরে গণতন্ত্র নেই ,তবুও সে দেশে ভোট হয়। সাত লাখ সৈন্য কাশ্মীরের ভোট পাহারা দেয়। নির্বাচনে জয়ী হয় আরবী নামধারী তাবেদার কিছুলোক। আমরা ৫৪ সাল থেকে দেখে আসছি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কোন কখনই দর্শণ ছিলনা। স্বায়ত্ব শাসনের বিরোধিতা করে পরে স্বায়ত্বশাসনের প্রধান প্রবক্তা হয়ে গেছে। ছয় দফা দাবী পেশ করে পরে প্রচার করতে থাকে। পাকিস্তানীদের মাথা ছিল খারাপ। তাই তারা ২৫শে মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণ করে পরিস্থিতি ভারতের পক্ষে নিয়ে যায়। শেখ সাহেব স্বাধীনতাকামীদের খপ্পর এড়াবার জন্যে পাকিস্তানের কারাগারে চলে যান। আমেরিকা ও ভারত যৌথভাবে দাবী করে শেখ সাহেবকে জীবিত বাংলাদেশে পাঠবার জন্যে।পাকিস্তানের সামরিক শাসকগণ ছয় দফা মানলে এবং পাকিস্তানে সরকারের দায়িত্ব শেখ সাহেবের তুলে দিলে ইতিহাস ভিন্ন ভাবে লেখা হতো। কিন্তু তা হয়নি দিল্লী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী তরুণ নেতাদের কারণে। তাজউদ্দিন সাহেবকে দিল্লী সরকার ও গোয়েন্দারা ১০০ভাগ বিশ্বাস করতোনা।
এসব কথা এর আগে আমি নানা ভাবে নানা রূপে বলার চেষ্টা করেছি। এর কারণ, আপনাদের মনে করিয়ে দেয়া। আলকোরআনের মতে এ ধরনের শাসণ ব্যবস্থা দেশের মানুষকে মজলুমের জাতি হিসাবে পরিণত করে। হাজার বছর আগে শাসকগণ ছিলেন জালেম। তাঁরা আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেশ শাসণ করতেন। মজলুমের ফরিয়াদে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠে। নিরীহ নিরপরাধ মজলুম জনগণের আহাজারিতে গজব নেমে আসে। বিশ্বব্যাপী ছোট খাট গজব প্রতিনিয়তই নেমে আসছে। নেপালে যে গজব নেমে এসেছে তা বাংলাদেশে নেমে আসতে আর কতক্ষণ? শাসকগণ দুনিয়ার নিরাপত্তা কিছুকাল রক্ষা করে। খোদায়ী গজব নেমে এলে একরাতেই সব শেষ। জালেম শাসকগণের অন্তরচক্ষু অন্ধ থেকে। তাই তারা বুঝতে
পারেনা। যে দেশে শাসক ও জনগণ জালেম হয়ে সেখানে খোদার গজব অপরিহার্য হয়ে পড়ে। আলকোরআনে বহু জালেম জাতি ও শাসকের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। যারা এক রাতেই ধ্বংস হয়েছে।
বাংলাদেশে হয়ত এখনও কিছু আল্লাহর খাঁটি বান্দাহ আছেন যাদের কারণে গজব নেমে আসেনি। আল্লাহপাক হয়ত তাঁদের আহ্বান বা মুনাজাতকে রক্ষা করেছে। তাই এ জাতিকে এখনও রক্ষা করছেন গণনায় ১৬বা ১৭ কোটি লোক হলেও ঈমানদার লোকের সংখ্যা হয়ত এক কোটিও হবেনা। শুক্রবারে বা জুমারদিন দুই তিন কোটি নামাজ আদায় করেন। কিন্তু তাঁদের ঈমানী জোর নেই। লুত(আ) এর জাতিকে আল্লাহ মাটি ওলট পালট করে ধ্বংশ করে দিয়েছেন শুধু তাঁর পরিবার ছাড়া। কারণ,পুরো জাতিই সদোমী বা সমকামীতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। মহাপ্লাবনের সময় নুহ(আ) তাঁর সন্তানকে আল্লাহর রোষ থেকে রক্ষা করতে পারেননি। ইব্রাহিম(আ) সত্য ও ন্যায়ের পথ রক্ষার জন্যে পিতার পথ ত্যাগ করেছিলেন। মহানবী(সা) তাঁর নিজের আত্মীয় স্বজন ও কওমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। কাফের ও মোনাফিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ঈমানদার ও মুমিনদের জন্যে ফরজ। সে ফরজ তাঁরা পালন করেননা। আরেক ধরণের মুসলমান আছেন যাঁরা এখন সন্ত্রাসী হিসাবে চিহ্নিত। বিশ্বব্যাপী এখন সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ চলছে। মুসলমানদের ভিতর কিছু দল বা গ্রুপ বিপথে চলে গেছে।
আরবে আইয়ামে জাহেলিয়াতের সময় কন্যাদের জীবন্ত কবর দেয়া হতো। এটা ছিল সামাজিক কুসংষ্কার। ইসলাম এসব কুসংস্কারকে দূরীভুত করেছে। রাসুল(সা) বলেছেন, একটি কন্যাকে বিয়ে দিলে এক হজ্বের সওয়াব পাওয়া যাবে। বাংলাদেশে নারী ও শিশু ধর্ষণ ও হত্যা কয়েকশ’গুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ গত কয়েক মাস ধরে শিশু হত্যা সীমাহীন ভাবে বেড়ে। হিন্দুদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ দখলের উত্‍সব শুরু হয়েছে। দখলদারগণ শাসকদের সাথে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। বাবু সুরণ্জিত বলেছেন প্রধানমন্ত্রী যেন নিজেই দেখাশুনা করেন। প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই সাহেবের বিরুদ্ধে হিন্দু বাড়ি দখলের অভিযোগ উঠেছে এবং এ নিয়ে মিটিং মিছিল চলছে। এক দলীয় শাসনে দেশ এভাবে বেশীদিন চলতে পারেনা। বিশ্বের কোন শাসকই এভাবে দীর্ঘদিন দেশ চালাতে পারেনা।
লেখক: কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
ershadmz@gmail.com


কোরাণ রাসূল(সা) এর বিরোধিতা ও রাষ্ট্রের ভূমিকা / এরশাদ মজুমদার

কোরাণ রাসুল(সা) ও ইসলাম নিয়ে রাজনীতি বা সমালোচনা পাকিস্তান আমলেও ছিল এখন স্বাধীন বাংলাদেশেও আছে। পাকিস্তান আমলে বিদ্যাবুদ্ধির দাবীদারগণ ইসলাম ও দ্বিজাতি তত্বের বিরোধিতা করতেন। পাকিস্তান আমলে কোরাণ ও পতাকা অবমাননা নিয়ে বহু মামলা হয়েছে। এখন বাংলাদেশেও বিষয়টা রয়ে গেছে। সুযোগ পেলেই ক্ষমতাসীন দল ও সরকার ধর্ম নিয়ে রাজনীতি শুরু করেন। হেফাজতের আন্দোলন ও ৫ই মে’র অবস্থান কালে নাকি হেফাজতের কর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে কোরাণ ও ধর্মীয় পুস্তকে আগুণ দিয়েছে। বাপ্পা জাতীয় লোকেরা নাকি কোরাণ ও ধর্মীয় পুস্তকে আগুন দিয়েছে বলে গুজব রয়েছে। পোড়া বইয়ের ছবি খবরের কাগজ ও টিভিতে প্রকাশিত হয়েছে। তবে সেসব বই কোরাণ কিংবা ধর্মীয় পুস্তক কিনা আজও আমরা জানিনা। সরকার নাকি বইয়ের হকারদের ক্ষতিপূরণ হিসাবে ৫০হাজার টাকা দিয়েছে।
বাংলাদেশে বহু ইসলামী দল আছে। এদের অনেক ফেরকা আছে। তাই তাঁরা সিয়াসত বা রাজনীতি নিয়ে এক মোর্চা,প্ল্যাটফর্ম বা মঞ্চে একত্রিত হতে পারছেন। ৪৭ সালের আগে মুসলমানেরা শক্তিশালী মুসলীম লীগের প্ল্যাটফর্মে একত্রি হয়। বৃটিশ আমলে বাংগালী মুসলমান সবচেয়ে বেশী শোষিত হয়। বৃটিশেরা চলে গেলে মুসলমানদের শোষণ অব্যাহত থাকবে এ ভয়ে তাঁরা আলাদা দেশ বা রাষ্ট্রের দাবী তোলে। ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয় ৪৭ সালে। পাকিস্তানের পূর্বাংশ নিয়ে আজকের বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে ইসলাম বিরোধী দেশে পরিণত করার জন্যে একশ্রেণীর আরবী নামধারী লোক উঠেপড়ে লেগেছে। আমরা বলি, বাংলাদেশ ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ। আরেক গ্রুপ বলেন বাংলাদেশ ১০০ ভাগ বাংগালীর দেশ। এরদ্বারা বাংলাদেশের মুসলমানদের ক্ষমতা ও অধিকার অস্বীকার করতে চায়।
একই অবস্থা বামদল গুলোর ভিতরেও বিরাজ করছে। বাংলাদেশে বহু বাম দল আছে,কিন্তু সবাই এক মঞ্চে একত্রিত হতে পারেননি।কিন্তু ইসলাম ও মুসলমান বিরোধিতায় তাঁরা একমত। তাঁরা মনে করেন, আওয়ামী লীগ আদর্শগত ভাবে বামের কাছাকাছি। তাই বেশ কয়েকটি বাম দল আওয়ামী লীগে আশ্রয় নিয়েছে। এসব বাম নেতা নৌকার বাসিন্দা হয়ে নিজের দলের কর্মীদের চাংগা করতে চেষ্টা করছেন। মেনন ও ইনু নাকি দলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নৌকায় চড়েছেন, ফলে হায়দার আকবর খান রণো সিপিবিতে যোগ দিয়েছেন। এক সময় তাঁরা পিকিং ও মস্কোপন্থী হিসাবে শক্ত অবস্থানে ছিলেন। ৭২ থেকে ৭৫ সালের দিকে মস্কোপন্থী দল গুলো বংগবন্ধুকে একদলীয় রাজনীতি চালু করার জন্যে বাকশাল গঠণে উত্‍সাহিত করেন। বংগবন্ধুর পতনের পর এঁরা বংগবন্ধুকে গালাগাল করেছে। ইসলামপন্থী ও বামপন্থীদের এত বিভক্তি কেন তা জনগণ আজও বুঝতে পারেনি। ইসলামে এখন অনেক কাতার। হুজুরে পাক মোহাম্মদ(সা)নাকি বলে গেছেন, কিয়ামতের আগে তাঁর উম্মতগণ ৭৩ ভাগ হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ জন্ম লগ্নে ছিল সমাজতান্ত্রিক দেশ। তাঁর প্রধানতম বন্ধু ছিল ভারত ও রাশিয়া। ফলে সমাজতান্ত্রিক দেশ গুলোর প্রভাব ছিল বেশী। কালক্রমে বাংলাদেশ পুঁজিবাদের দিকে ধাবিত হতে শুরু করে। ৪৪ বছরে বাংলাদেশে দশ হাজার কোটি টাকার মালিক বহু পরিবারের জন্ম হয়েছে। এদের কাছে রাষ্ট্রের কয়েকশ’হাজার কোটি টাকা পাওনা। রাজনৈতিক দলের সাথে হাত মিলিয়ে এসব ধনী ঠিক মতো রাজস্ব দেয়না। অপরদিকে সরকারী ও বেসরকারী ব্যান্ক থেকে নেয়া টাকাও শোধ করেনা। পাকিস্তান আমলে ২৩ বছরে ২২ পরিবারের জন্ম হয়েছিল, যাঁরা সকল পুঁজির মালিক ছিলেন। পশ্চিমা পুঁজির কোন সীমা বা নৈতিকতা নেই। ফলে পুঁজিপতিরা জগতকে গিলে খেতে পারে। আমাদের বাংলাদেশ কোন আদর্শিক ও নৈতিকতাপূর্ণ দেশ নয়। সাংবিধানিক ভাবেই দেশ জাতির কোন ধরণের নৈতিক ওয়াদা করেনি। এখন এখানে বিলনিয়ারের কোন অভাব নেই। তাদের জন্যে কোন আদর্শও নেই। এখানে কেউ বাংলাদেশী বা বাংগালী। কেউ বিএনপি বা আওয়ামী লীগ। পুঁজির ধারণা দুই দলেরই এক রকম। দুই দলি পুঁজিপতিদের টাকায় চলে। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের পাল্লা ভারী। বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জগত এখন ৯০ ভাগ ভারতের দখলে। সেদিন বাম মোর্চার এক মতামত সভায় প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের ঘরে ভারতীয় টিভি চ্যানেল দেখে বাংলাদেশের শিশুরা। সরকার এ ব্যাপারে নীরব দর্শক। মনে হয় এ ব্যাপারে সরকারের কোন ভুমিকা নেই। এমন কি বিএনপিও এ ব্যাপারে কিছুই করেনি। আপাত: দৃষ্টিতে মনে হয় বিএনপির আদর্শ(যা এখনও স্পষ্ট নয়)আছে এবং তা আওয়ামী লীগ থেকা আলাদা। বিএনপিতে জ্ঞানী গুণীর অভাব নেই। তাঁরা নিবেদিত নন। তাঁদের অনেকেই সওদাগর বুদ্ধিজীবী বা সাংবাদিক। সবাই অপেক্ষা করে আছেন কখন বিএনপি কখন ক্ষমতায় আসবে এবং সবাই কিছুনা কিছু সুবিধা পাবেন। অনেকেই অপেক্ষা করতে না পেরে আওয়ামী ঘরাণায় চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। মুক্তিযুদ্ধে যেমন সাধারন সৈনিক, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও যুবকরা প্রাণ দিয়েছেন তেমনি চলতি সরকার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে বিএনপির সাধারন কর্মীরা প্রাণ দিয়েছেন।
আমার আজকের প্রধান প্রসংগ হচ্ছে ইসলাম। কোরাণ ও রাসুলকে(সা) নিয়ে। কয়েকদিন আগে আমার প্রিয় মানুষ গাফফার ভাই ইসলাম ও আল্লাহর নাম নিয়ে কিছু কথা বলেছেন যার ফলে তাঁর মুসলমানিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি নিজে দাবী করছেন যে তিনি একজন ইমানদার মুসলমান। রোজার মাসে বাংলাদেশ সরকার কেনইবা ওই রকম একটি আলোচনার ব্যবস্থা করেছেন তা বোধগম্য নয়। আর গাফফার ভাই বা কেন অপ্রাসংগিক আল্লাহ ও কোরাণ নিয়ে ওই কথাগুলো বলতে গেলেন। গাফফার ভাই আমার খুবই প্রিয় মানুষ। আমি তাঁর সাথে দৈনিক পূর্বদেশ ও দৈনিক জনপদে কাজ করেছি। তাঁর কলাম খুবই ক্ষুরধার ও জনপ্রিয়। তিনি দৈনিক আজাদেও কাজ করেছেন। কাগজের বা মালিকের নীতি মোতাবেক লেখার অভ্যাস গাফফার ভাইয়ের আছে। বাংলাদেশ হওয়ার পর তিনি দৈনিক জনপদে বংগবন্ধুর সমালো্চনা করে বেশ কয়েকটি কলাম লিখেছেন।কাগজটির মালিক ছিলেন শিল্পমন্ত্রী হেনা সাহেব। তিনি সত্যিই একজন ভাল মানুষ ছিলেন। এখন সে রকম নেতা আওয়ামী লীগে নেই। তখন আওয়ামী লীগ কোন ধর্ম ছিলনা।
গাফফার ভাই এক সময় তাঁর অসুস্থ স্ত্রীর চিকিত্‍সার জন্যে লন্ডন চলে যান এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে থেকে যান। যাওয়ার সময় বংগবন্ধু তাঁকে আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। এখন তিনি লন্ডনে বসেই বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে জনপ্রিয় কলাম লেখেন। তাঁর বন্ধুরা বলে থাকেন গাফফার জীবিত লোকদের নিয়ে লেখেন না। তাঁর সমালোচনা করে কেউ লিখতে চায়না। কারণ,প্রত্যুত্তরে তিনি বিশ্বাসযোগ্য মিথ্যা লিখে ওই লেখককে হেনস্থা করেন।অথবা বানোয়াট গল্প লেখেন। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তিনি লন্ডনে আছেন। স্থায়ী কোন আয়ের ব্যবস্থা নেই। লীকে কিছু টাকা পান। বাকিটা হয়ত ভক্ত এবং সরকারের কাছ থেকে পান। ঢাকা এলে ভক্তরা তাঁর দেখাশুনা করেন।
আমি আগেই বলেছি, তিনি আমার খুব প্রিয় মানুষ। জনপদে তিনি আমার সম্পাদক ছিলেন। পূর্বদেশে সহকারী সম্পাদক ছিলেন। ওই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন প্রখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান মাহবুবুল হক। আওয়ামী রাজনীতির সমর্থক হিসাবে তাঁর বিরুদ্ধে আমার কোন মত নেই। তিনি হয়ত আদর্শগত ভাবেই আওয়ামী লীগের পক্ষে লিখে থাকেন। তাঁর এ নীতিকে আমি সম্মান করি। কিন্তু হঠাত্‍ তিনি কেন আল্লাহ ও কোরাণ নিয়ে কথা বলতে গেলেন তা বুঝতে পারছিনা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এসব কথা বলার কি প্রয়োজন ছিল? এমন একটি বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন,যে বিষয়ে তাঁর তেমন কোন জ্ঞান নেই। এর আগে সালমান রূশদী রাসুল(সা) এর বিরুদ্ধে লিখে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। বৃটিশ সরকার এখনও তাঁকে নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের আরেক নারী যিনি ইসলাম বিরোধী লেখিকা হিসাবে নাম বা বদনাম কুড়িয়েছেন।তিনি তাঁর যৌন জীবন সম্পর্কেও নানা তথ্য প্রকাশ করেছে। পশ্চিমা দেশগুলি তাঁর ইসলাম বিরোধী ভুমিকা নিয়ে বেশ কিছুদিন হৈ চৈ করেছে। এখন তাঁরা বুঝতে পেরেছেন এই মহিলার মৌলিক কোন লেখা নেই। ইসলামের বিরোধিতা করাই তাঁর ব্যবসা। ভারতে তাঁর লজ্জা বইটি বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ৭২বা ৭৩ সালে এক কবি বা সাংবাদিক রাসুল(সা) সম্পর্কে বাজে কবিতা লিখে দেশ ত্যাগী হয়েছেন। এর আগে একটি বাংলা দৈনিক রাসুল(সা)এর কার্টুন ছেপে বিপদে পড়েছেন। পরে বায়তুল মোকাররমের খতিব সাহেবের কাছে তওবা করে তিনি মুক্তিলাভ করেন। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও সাংসদ লতিফ সিদ্দিকী রাসুল(সা) ও ক্বাবা সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করে মন্ত্রিত্ব হারিয়ে জেলখানায় গিয়েছে। সম্প্রতি আদালত তাঁকে মুক্তি দিয়েছেন। এখন সরকার তাঁর সংসদ সদস্যপদ বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। লোকে বলে লতিফ সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের বিরুদ্ধে কথা বলে বিপদে পড়েছেন।
আল্লাহপাকের নিরানব্বই নাম কালামেপাকেই উল্লিখিত রয়েছে। আল্লাহপাকের গুণবাচক নাম গুলোর সাথে তত্‍কালীন আরব দেবতা বা মুর্তির কোন সম্পর্ক কখনই ছিলনা। আল্লাহ কোন দেবতার নামও ধারণ করেননি। এটা গাফফার চৌধুরী সাহেবের অজ্ঞতা। নিশ্চয়ই তিনি অজ্ঞতা বশতই কথা গুলো বলেছেন। না হয় কোন বিতর্ক তৈরি করার চেষ্টা করছেন। এখন ভারতীয় কোন প্রকাশক যদি গাফফার সাহেবের নাম উল্লেখ করে প্রকাশ করেন যে , মুসলমানদের আল্লাহর গুণবাচক নামগুলো হিন্দু দেবতাদের নাম। আর আনন্দবাজার গাফফার চৌধুরী সাহেবের নামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন তাহলে বলার কিছু থাকবেনা। ৭১ সালে চৌধুরী সাহেবের সাথে আনন্দ বাজারের আত্মীয়তা তৈরি হয়।
আলকোরাণের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহপাকের গূণ বর্ণণা করতে গিয়ে নিরানব্বই নামের কথা এসেছে। আল্লাহপাকের গুণের কোন সীমা নেই। তা বর্ণনা করার ক্ষমতাও মানুষের নেই। আল্লাহপাকের মূল জাতি নাম হচ্ছে আল্লাহ। তাঁকে ইলাহা বা ইলাহু বলেও ডাকা হয়। যেমন ধরুন আমরা যখন আবৃতি করি ‘ লা ইলাহা ইল্লা আল্লাহ’তখন বলি আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নাই। ইলাহা মানে উপাস্য। আল্লাহ ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। সনাতন ধর্মে বহু ইলাহ বা উপাস্যের নাম আছে। আবার যখন বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম পড়ি তখন আল্লাহপাকের গুণাবলীর কথা বলি। বিসমিল্লাহ(বা ইসম আল্লাহ) মানে আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করছি যিনি রহমান ও রহীম। রহমান ও রহীম আল্লাহর গুণাবলী। আরবে এ নামে কোন দেবতা কখনই ছিলনা। যেমন, আবদুল গাফফার মানে পরম ক্ষমাশীলের আবদুল(দাস)। গাফফার ভাই ইচ্ছা করলে নিজের নাম অনুবাদ করে বলতে পারেন ভগবান দাস চৌধুরী। সুরাহ ফাতেহাকে উম্মুল কোরাণ বলা হয়। সুরাহ ফাতেহায় আল্লাহপাকের গুনাবলীর বর্ণণা ও ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। আল্লাহকে রাব্বুল আলামীন বলা হয়েছে। মানে তিনি সকল জগতের প্রতিপালক। তিনি নিজেকে সকল সৃষ্টির প্রতিপালক হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন। সুরাহ ফাতেহার তাফসির করার জন্যে মাওলানা আজাদ ৩৫০ পৃষ্ঠার একটি বই লিখেছেন। সেটা চৌধুরী সাহেব পড়তে পারেন।আল্লাহপাকের একটি মহা গুরুত্বপূর্ণ নাম হলো আদলু। মানে তিনই শ্রেষ্ঠ বিচারক। আদলু শব্দ থেকেই আদালত। তাই আমরা বলে থাকি আল্লাহ বা খোদার আদালত। বাংলাদেশে আল্লাহর কোন আদালত নেই বা আল্লাহর আইনেরও তেমন চর্চা নেই। মাঝে মাঝে অজ্ঞতার কারণে কোরাণ ও সুন্নাহ বিরোধী রায়ও দেয়া হয় এসব আদালতের বিচারকগণ। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ধর্মমুক্ত রাষ্ট্র। এটা নাকি ভদ্রলোকের রাষ্ট্র হওয়ার জন্যে একটি অপরিহার্য গুণ। ফলে এদেশে যে কোন কবি লেখক, বুদ্ধিজীবী, আইনজ্ঞ সেক্যুলারিজমের নামে বা ধর্মহীনতার নামাবলী পরে ইসলামের বিরুদ্ধে যখন তখন যা ইচ্ছা তাই বলতে পারেন। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা করেছেন ৯০ ভাগ মুসলমান ও একভাগ ভিন্ন ধর্মের নাগরিকেরা। মুক্তিযোদ্ধাদের ভিতর ৯০ ভাগ ছিলেন মুসলমান। কিন্তু চলমান সরকার এ বিষয়টা স্বীকার করতে চাননা। তাঁরা বলেন, ১০০ ভাগ ধর্মমুক্ত শুধু বাংগালীরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। বংবন্ধু নিজেই মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন।
মক্কা বিজয়ের পর পবিত্র ক্বাবা ঘর বা বায়তুল্লাহ শরীফে ৩৬০ মুর্তি পাওয়া গেছে। এসব মুর্তির নাম আল্লাহপাকের গুণাবলীর নাম ছিলনা। গাফফার ভাই কোন কিতাব বা বই থেকে তথ্য বা ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা উল্লেখ করলে তাহলে বিষয়টি পরিষ্কার হতো। হিন্দু ধর্মে নানা ধরণের দেবতা আছে তাদের কারো নামই আল্লাহপাকের গুণাবলীর মতো নয়। হিন্দু ধর্মে নাকি ৩৩কোটি দেবতা আছে। এর ভিতর ইঁদুর, সাফ,হনুমান,সহ আর বহু দেবতা আছে। আমরা এসব দেবতাকে অসম্মান করিনা। ইসলামে এর কোন অনুমতি নেই। ইসলাম এবং কোরাণ জগতের শেষ ধর্ম ও কিতাব। কেউ এটা মানলে ভাল, না মানলে আল্লাহপাকই তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবেন। অতীতের সকল নবী রাসুল ও তাদের কিতাব ও সহীফা কোরাণে উল্লিখিত আছে।
ইমরাণ সরকার গাফফার ভাইয়ের বক্তব্য নাকি বহুবার পড়েছেন। শুধু ইমরান সরকার বললাম, কারণ তিনি এখন দেশখ্যাত। তাঁর ঠিকানা নাকি শাহবাগ। তাঁকে অনেকেই সম্মান করে শাহবাগী বলে থাকেন। শাহবাগী সাহেব নাকি গাফফার ভাইয়ের বক্তব্যে ইসলাম বিরোধী কিছু পাননি। এটা ইমরান সাহেবের এ ধরণের ফতোয়া। ইমরান সাহেব আরও বলেছেন যে, গাফফার ভাইয়ের বক্তব্য নাকি মওদীদী পন্থী বা ওহাবী ইসলামের বিরুদ্ধে। এটা হতে পারে। ইমরান সাহেবের উচিত ছিল মওদুদী পন্থি ইসলামের একটু ব্যাখ্যা দেয়া উচিত ছিল। ইমরাণ সাহেবের আন্দোলন ও এখন বহু ভাগে বিভক্ত বলে শুনেছি। ইমরাণ সাহেবকে এখন নাকি সরকার সমর্থন করেনা। ইসলাম ও কোরাণ ব্যাখ্যা করার জন্যে মাঝে মাঝে মাওলানা হাবিবুল্লাহ সাহেবের ভাতিজা শাহরিয়ার কবীরকেও টিভিতে হাজির হতে দেখি। গাফফার ভাই কি বলেছেন তা পুরোটাই প্রকাশিত হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। গাফফার ভাইকে আমি একজন ধর্ম বিরোধী লোক মনে করিনা। এর আগে মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ বলেছিলেন তিনি হিন্দু মুসলমান কোনটাই না। কেউ এটা নিয়ে তেমন কিছু বলেননি। তিনি যদি ধর্মহীন বা ধর্মমুক্ত থাকেন তাহলে কার কি বলার আছে? কিন্তু তিনি যদি আল্লাহ ,কোরাণ ও রাসুল(সা)এর বিরুদ্ধে কিছু বলেন তাহলে মুসলমানদের আপত্তিি বা প্রতিবাদ করতে পারে। প্রতিবাদ করাটা তাঁদের জন্যে বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। কারণ পরধর্মের নিন্দা বা সমালোচনা করার অধিকার কারোই নেই। শুধু ইসলাম নয়, কোন ধর্মেরই সমালোচনা করা যাবেনা।
সমস্যাটা হলো,সরকার এ ব্যাপারে কোন ভুমিকা পালন করেনা। কারণ বাংলাদেশ রাষ্ট্রটা ধর্মমুক্ত। ভোটের সময় রাষ্ট্র ও রাজনীতিকরা ধার্মিক হয়ে যান। তখন হিজাব ও টুপি পরতে থাকেন। মসজিদ মাদ্রাসায় দান করেন।
লেখক: কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
ershadmz@gmail.com


আওয়ামী লীগের নানা রংয়ের ইতিহাস / এরশাদ মজুমদার

মোহাম্মদ জাকারিয়া( যাকারিয়াও হতে পারে) নবাব সিরাজ উদ দৌলার উপর পাঁচশ’পৃষ্ঠার একটি বই লিখেছেন। সিরাজ উদ দৌলার উপর সারা বিশ্বে অনেক বই বেরিয়েছে। ১৯৮৫ সালে আমি পলাশী দিবস পালনের জন্যে রাজধানীতে পোষ্টারিং করেছিলাম। একটি সেমিনারেরও ব্যবস্থা করেছিলাম। সে সময়ে সিরাজ সম্পর্কে অনেক গুলো বইও সংগ্রহ করেছিলাম। কিছু বই হয়ত এখনও আছে। তবে অনেক গুলো বই জাতীয় প্রেসক্লাব ও রিপোর্টার্স ইউনিটিকে দিয়েছি। দান কথাটা বললামনা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার খাতিরে। এখন যদি বলি বই গুলো দেখতে চাই তাহলে জবাব আসবে সদস্যরা নিয়ে আর ফেরত দেননি। আমাদের দেশে বইয়ের ক্ষেত্রে এ রকম হয়ে থাকে। সারাদেশের বড় বড় সব লাইব্রেরী বা পাঠাগারে এ কান্ড চলছে এবং চলে এসেছে।
বিদেশী ঐতিহাসিকরা বলেছেন পলাশী যুদ্ধ নয়, বলতে হবে পলাশীর ষড়যন্ত্র। পলাশীর প্রভাব হলো ইংরেজরা সুবেহ বাংলা( বাংলা বিহার উড়িষ্যা) দখল করে কালক্রমে পুরো ভারত দখল করে। ভারতের সম্পদ দখল করে বিলেতে পাচার করে এবং ঐ ক্ষমতা বলে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা দখল করে নেয়। ইংরেজরা ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতা দখল করে সিরাজের বিরুদ্ধে নানা ধরণের মিথ্যা ইতিহাস রচনা করতে থাকে। সেই মিথ্যা ইতিহাসকে ছাপিয়ে সত্য প্রকাশ হতে অনেক সময় লেগে যায়। সত্যকে এভাবেই পথ অতিক্রম করতে হয়। সিরাজের ক্ষেত্রে ইংরেজরা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ তিনি সত্যিই একজন দেশ প্রেমিক ছিলেন। এই যুবক নবাব ইচ্ছে করলে ইংরেজদের ক্রীড়নক হয়ে সুখে থাকতে পারতেন। না তিনি তা করেননি। বিনিময়ে তাঁকে জীবন দিতে হয়েছে।
২৩শে জুন ছিল পলাশী দিবস। এদিন সুবেহ বাংলা পরাধীন হয়েছে। আওয়ামী লীগের দাবী, এই দিনেই নাকি এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পূর্ববংগ থেকে পূর্ব পাকিস্তান হওয়ার পর মুসলীম লীগ সরকারের নেতারা যে কারণে দেশটি স্বাধীন হয়েছে সে কারণ গুলোর প্রতি নজর না দিয়ে গোষ্ঠি প্রীতি শুরু করেছিলেন। প্রথমেই সমস্যা দেখা দিয়েছিল ভাষা নিয়ে ১৯৪৭ সালেই। মুসলীম লীগ এ ব্যাপারে বিভ্রান্ত হয়ে কেন্দ্র নির্ভর হয়ে পড়েছিল। ফলে জনপ্রিয় বিষয় গুলোর সমাধান না করে দমন নীতির আশ্রয় নেয়। মুসলীম লীগের রক্ষণশীল দক্ষিনপন্থি গ্রুপ তখন ক্ষমতায়। ফলে প্রগতিশীল বা গণমুখি গ্রুপ বাধ্য হয়ে নতুন দল গঠণের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। তারই প্রকাশ ঘঠেছে ১৯৪৯ সালে ২৩শে জুন আওয়ামী মুসলীম লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। পুরাণো ঢাকার রোজ গার্ডেনে বিরোধী গ্রুপের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। দলের সভাপতি হলেন মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান আর সাধারন সম্পাদক হলেন টাংগাইলের শামসুল হক। খোন্দকার মোশতাক আর শেখ সাহেব হলেন যুগ্ম সম্পাদক। ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন পর্যন্ত দলটির নাম ছিল আওয়ামী মুসলীম লীগ। আমি নিজের কানে শুনেছি, মাওলানা সাহেব জনসভায় বলতেন, আমরাও মুসলীম লীগ। নুরুল আমিনের দল হচ্ছে সরকারী মুসলীম লীগ,আর আমরা হচ্ছি জনগণের(আওয়ামী) মুসলীম লীগ। আমরা কৃষক শ্রমিকের কথা বলার জন্যে আলাদা মঞ্চ গঠণ করেছি। মাওলানা সাহেব আসাম মুসলীম লীগের সভাপতি ছিলেন। তখন আসামে মুসলীম লীগ ক্ষমতায় ছিলো। ৫৫ সালে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পর দলটির নাম পরিবর্তন করে শুধু আওয়ামী লীগ করা হয়। দলের উপর কংগ্রেস ও অদৃশ্য বাম দল ও ব্যক্তির প্রভাব বাড়তে থাকে। এটি সম্পুর্ণ নতুন দল ও নীতি হিসাবে যাত্রা শুরু করে। সে হিসাবে বর্তমান আওয়ামী লীগের জন্মদিন ২৩শে জুন নয়। মাওলানা সাহেব ৫৭ সাল পর্যন্ত দলের সভাপতি ছিলেন এবং মৌলিক ইস্যু গুলোতে দ্বিমত হওয়ায় তাঁকে দল থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। তখন আওয়ামী লীগ কেন্দ্র ও প্রদেশে ক্ষমতাসীন। ইতোমধ্য শেখ সাহেবকে দলের সাধারণ সম্পাদক বানানো হয়। দলে শেখ সাহেবের একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। সোহরাওয়ার্দী সাহেব ও শেখ সাহেব ছিলেন সাম্রাজ্যবাদের একনিষ্ঠ তাবেদার। ৭০ সাল নাগাদ আওয়ামী লীগ বা শেখ সাহেব ছিলেন বাংগালী পুঁজির মুখপাত্র। তিনি মুখে সাধারন মানুষের কথা বলতেন। বাংগালীদের স্বার্থের কথা বলে বাংগালী পুঁজির বিকাশের জন্যে কাজ করেছন। তখন তাঁকে সমর্থন দিয়েছেন রেহমান সোবহান গ্রুপ। রেহমান সোবহান সাহেবদের উপর অবাংগালী পুঁজিপতিদের বিরাট প্রভাব ছিল। এরা মুখে সমাজতন্ত্রের কথা বলতেন,আসলে ছিলেন পুঁজিপতিদের সেবক।
মাওলানা সাহেব ন্যাপ প্রতিষ্ঠা করলেন। আওয়ামী লীগের সাথে তাঁর সকল সম্পর্ক ছিন্ন হলো। শেখ সাহেব তাঁর আওয়ামী লীগ নিয়ে নিজের মতো করে চলতে লাগলেন। কালক্রমে আওয়ামী লীগ থেকে প্রতিষ্ঠা লগ্নের প্রায় সকল নেতাই বেরিয়ে গেলেন। ৭০ সাল নাগাদ শেখ সাহেব পূর্ববংগ বা পূর্ব পাকিস্তানের একচ্ছত্র নেতায় পরিণত হলেন। রাজনীতিতে তিনি নতুন ধারা চালু করলেন। ৭০ সালের নির্বাচনটি হলো বাংগালী আর অবাংগালীর মাঝে। এর মাধ্যমেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিকাশ লাভ করে। ফলে পূর্ববংগে বাংগালী অবাংগালীর মাঝে বহু দাংগা হয়। সে সময়ে দলের ক্ষমতাবান শক্তি হয়ে দাঁড়ালো তরুণ বিপ্লবী ও বিদ্রোহী ধারা। যাদের উপর শেখ সাহেবের কোন প্রভাব ছিলনা। তরুণরা গোপনে স্বাধীনতার দাবী তোলে। ৭০ সালের নির্বাচনে দেশের বেশীর ভাগ দল অংশ গ্রহণ করেনি। ফলে শেখ সাহেব ১৬৭ সিট লাভ করে সারা পাকিস্তানের একমাত্র নেতায় পরিণত হন। অপরদিকে জুলফিকার আলী ভুট্টো আর সেনাবাহিনী ক্ষমতা হস্তান্তর না করার জন্যে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। পাকিস্তানের এই মহা জটিল অবস্থার সুযোগ নেয়ার জন্যে ভারত অপেক্ষা করছিলো। ফলে পরিস্থিতি শেখ সাহেবের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এমন অবস্থায় ২৫ শে মার্চ মধ্যরাত্রে পাকিস্তানী সেনাশাসকরা আক্রমণ চালিয়ে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। মধ্যরাত্রেই শেখ সাহেব পাকিস্তানের কারাগারে চলে গেলেন। অপরদিকে লাখ লাখ মানুষ জন্মস্থান ত্যাগ করে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে অবস্থান নেয়। এ সময় ভারত সীমান্ত খুলে দিয়েছিল। ভারত সরকার আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোন দলের নেতা ও কর্মীদের তেমন কোন সহযোগিতা করেনি। বরং ভারত সরকারের লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের সাথে অন্যকোন দল যেন যুক্ত না হয়। এজন্যে ভারত সরকার মাওলানা সাহেবকে গৃহবন্দী করে রাখেন। ন্যাপের মহাসচিব যাদু মিয়াকে হত্যার চেষ্টা করা হয়।
কোলকাতায় যে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় তার বিরুদ্ধ শক্তি হিসাবে দাঁড়ালো ছাত্রলীগের বিপ্লবী অংশ। একে খোন্দকারের বইতে এর কিছু বক্তব্য পাওয়া যাবে। বিপ্লবী ছাত্র নেতারা মুজিব বাহিনী গঠণ করে আলাদা ট্রেনিং নিতে থাকেন। ছাত্রনেতারা ভবানীপুরে অফিস করে র’য়ের মাধ্যমে ভারত সরকারের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে থাকে। এ বিষয়ে বিশদ জানার জন্যে মহিউদ্দিন আহমদের জাসদের রাজনীতি বিষয়ক বইটিও পড়তে পারেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় শেখ সাহেব পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন। এ সময়ে খন্ডিত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন ভুট্টো। তিনি জানিয়ারী মাসের ৮ তারিখে শেখ সাহেবকে মুক্তি দিয়ে ঢাকায় পাঠান। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বা ঘটনাবলী শেখ সাহেবের জানা ছিলনা। ফলে শেখ মণি ও তাজউদ্দিনের সাহেবের দন্ধে তিনি বিভ্রান্ত ছিলেন। অবশেষে শেখ মনির জয় হলো এবং শেখ সাহেব তাজউদ্দিনকে ক্ষমতা থেকে বের করে দিলেন। অথচ তিনি ছিলেন প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী। এর মানে হলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ পরিবারের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হলো। অপরদিকে ভারত জাসদকে শক্তিশালী করতে থাকে।
শেখ সাহেবের বেদনাদায়ক পতনের পর শেখ হাসিনা দিল্লীতে এসে সরকারী নিরাপত্তা ও আতিথিয়তায় বসবাস করতে থাকেন। দিল্লী অবস্থান কালে শেখ হাসিনার দেখাশুনা করতেন একজন সরকারী কর্মকর্তা। শেখ সাহেব পুরোপুরি ভারতীয় নীতির সমর্থক ছিলেন না। ফলে দিল্লীর সাথে তাঁর বনিবনা হচ্ছিলনা। পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি(অর্গেনাইজেশন ফর ইসলামিক কনফারেন্স) সম্মেলনে যেতে রাজী হলেন। কিন্তু ভারত এতে বাধা দিতে লাগলো। ভারতের এ ধরনের ব্যবহার শেখ সাহেবের আত্ম সম্মানে লাগলো। তিনি জিদ ধরলেন সম্মেলনে যাবেন। ভারতের অনাকাংখিত আপত্তি তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন। শুরু হলো শেখ সাহেবের সাথে দিল্লীর মানসিক যুদ্ধ। চীনের সাথে সম্পর্ক তৈরি করার জন্যে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন। এটা ভারত একেবারেই পছন্দ করেনি। তাই অনেকের বিশ্লেষণ শেখ সাহেবের মর্মান্তিক পতনের জন্যে ভারত দায়ী। মোশতাকের সময়েই চীন ও সউদী আরব বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব কমতে থাকে। বাংলাদেশ বাংগালী মুসলমানের দেশ হিসাবে বিকশিত হতে থাকে। জিয়াউর রহমান সাহেব ক্ষমতা এলে ভারত সমঝোতার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। জিয়া সাহেবের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের শ্লোগাণ ভারত সমর্থন করেনি। ভারত চায় বাংলাদেশ হবে শুধু বাংগালীদের দেশ, বাংগালী মুসলমানের দেশ নয়। বাংলাদেশে বহু ধর্ম ও গোত্রের মানুষ বাস করে। তাঁরা অনেকেই বাংগালী নয়, চাকমা, মারমা, রাখাইন, গারো,মং সাহ বহু উপজাতি আছেন। তাঁরা বাংলাদেশী চাকমা। জাতীয় সংসদে শেখ যখন বলেছিলেন,‘তোরা সব বাংগালী হয়ে যা’। তখন সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র লারমা এর প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন আমরা বাংগালী নই। আমরা বাংলাদেশের চাকমা। বাংলাদেশ হওয়ার পর পরই পাসপোর্টে লেখা হতো সিটিজেন অব বাংলাদেশ। এখন লেখা হয় বাংলাদেশী। ভারত চায় পাসপোর্টে বাংগালী বা সিটিজেন অব বাংলাদেশ লেখা হোক।
জিয়াউর রহমান সাহেব যে পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ করেছিলেন তা ভারত একেবারেই সমর্থন করেনি। ফলে ,ভারত শুরু থেকেই জিয়া সাহেবকে ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। জিয়া সাহেব দেশের ভিতরে যে রাজনীতি শুরু করেছিলেন তা ছিল বাংগালী মুসলমানের রাজনীতি। যা ভারত একেবারেই সমর্থন করেনি। ভারত মনে করে ৭১ সালে পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে রাষ্ট্রীয় ভাবে ইসলাম বা মুসলমানিত্ব ত্যাগ করেছে বাংলাদেশ। ভারত একটি নানা ধর্ম, ভাষা ও জাতির দেশ। হিন্দী কোন জাতিরই ভাষা নয়। ভারতের দক্ষিণ ও উত্তর আজও বিভক্ত। ভারত নামমাত্র একটি সেক্যুলার(ধর্মহীন) দেশ। এখন সেখানে কট্টর ধর্মীয় রাজনৈতিক দল ক্ষমতায়। গুজরাটে হাজার হাজার মুসলমান হত্যার পর মোদী সাহেব বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন। এর মানে কংগ্রেসের তথাকথিত সেক্যুলার রাজনীতি ছিল একটি ভন্ডামী। বাংলাদেশেও সেক্যুলার রাজনীতি একটি ভন্ডামী। কয়েকদিন আগে আইন মন্ত্রী বলেছেন, সরকার কোরাণ ও সুন্নাহ বিরোধী কোন আইন পাশ করবেনা। কিন্তু বাংলাদেশ কোরাণ ও সুন্নাহ ভিত্তিক দেশ নয়। দেশের ৯০ ভাগ মানুষ বা ভোটার মুসলমান হওয়ার কারণে সরকার মাঝে মাঝে ধর্মীয় শ্লোগাণ দিয়ে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাঝে হিজাব পরেন ও নিয়মিত নামাজ পড়ার কথা প্রচার করেন। আমি নিজেও বিশ্বাস করি তিনি একজন নামাজী ও নিয়মিত কোরাণ পাঠ করেন। কিন্তু তাঁর দল ও সরকারের আচার আচরণ ধর্মীয় নয়। আওয়ামী লীগের ইমেজ হচ্ছে একশ’ভাগ সেক্যুলার বা ধর্মহীন। আওয়ামী লীগ বিরোধী সকল রাজনৈতিক শক্তিকে আওয়ামী লীগ মৌলবাদী, সন্ত্রাসী, জংগী ও জেহাদী বলে প্রচার করে। ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বার্থের কারণে সকল সরকারই ব্যক্তিগত ভাবে শেখ হাসিনাকে সমর্থন করে। হিন্দুত্ববাদী কট্টর ধর্মবাদী মোদীজী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় দেখতে চান। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যদি নির্বাচন বিরোধী সরকারও থাকে তাহলেও দিল্লী তাকে সমর্থন করবে। জেনারেল মঈনকে দিল্লী ক্ষমতায় এনেছিল হাসিনাকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেওয়ার জন্যে। ৪৭ সাল থেকে ভৌগলিক কারণে ভারত পূর্ব পাকিস্তানে তার যে স্বার্থ ছিল তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে আসছিলে হাসিনার আমলে তার ষোলয়ানা সুযোগ এসে গেছে। আর এ সুযোগ এসেছে শেখ হাসিনার কারণে।কারণ শেখ হাসিনাই একমাত্র ভারতের স্বার্থ গুলোকে নিরাপদের বাস্তবায়ন করতে পারেন।
সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার একটি মতামত সভা অনুষ্ঠিত হয় মোদীর ২২ দফা চুক্তি নিয়ে। মোর্চার সমন্বয়ক মোশরেফা মিশু একটি লিখিত বক্তব্য পেশ করেন। আমি ব্যক্তিগত ভাবে ওই বক্তব্য সমর্থন করি। বিদ্যুত, সীমান্তচুক্তি, কানেকটিভিটি বা করিডর নিয়ে অভিজ্ঞ আলোচক গণ নিজেদের মতামত প্রকাশ করেন। মিশু বলেছেন, বর্তমান সরকার অনির্বাচিত অবৈধ। ২২ দফা চুক্তি আজও জনগণের কাছে পেশ করা হয়নি। দেশের মানুষ জানেনা ওই চুক্তিতে কি আছে।
বিখ্যাত চিন্তাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে বাংলাদেশ আজ পরাজিত। সর্বত্রই হিন্দীর চর্চা। চৌধুরী সাহেব একজন সেক্যুলার বা ধর্মমুক্ত মানুষ। তাই তিনি ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশকেও ভয় পাচ্ছেন। বাম মোর্চা মনে করে সকল মত ও পথের দেশপ্রেমিক জ্ঞানীগুণী, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকদের এক মঞ্চে সমবেত হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্যে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়তে হবে।
৫৪ সালে মুসলীম লীগের পতনের জন্যে সকল মত ও পথের দল ও ব্যক্তি যুক্তফ্রণ্ট গঠণ করেছিলেন। এই ফ্রণ্টের নেতা ছিলেন মাওলানা ভাসানী , শেরে বাংলা ও সোহরাওয়ার্দী। এই ফ্রণ্টে ইসলামীদল, কংগ্রেস, কমিউনিষ্ট ও আওয়ামী লীগ। বড় শরীক ছিল আওয়ামী লীগ। ফলে মুসলীম লীগের পতন হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল গণবিরোধী মুসলীম লীগের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা। তখন পাকিস্তানের কেন্দ্র থেকে সমর্থন দেয়া হয়েছিল। এখন আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে ভারত। ফলে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ বিরোধী একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। আমাদের সবাইকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে ভারত এ দক্ষিন এশিয়ার একচ্ছত্র নেতায় পরিণত হতে চায়। এ ব্যাপারে আমেরিকা ভারতকে সমর্থন দিতে চায় বলে বহুল প্রচারিত। আমেরিকার উদ্দেশ্য চীনকে ঠেকানো। ভারতও চায় শেখ হাসিনা চীন বিরোধী বলয়ে থাকুক। চীন এখন আদর্শগত বিরোধে না গিয়ে মাড়োয়ারীদের মত বড় বড় ব্যবসা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চায়। শেখ হাসিনাও চীনকে বড় বড় ব্যবসা দিয়ে হাতে রাখতে চায়। শেখ হাসিনার হাতে বাংলাদেশ এখন ব্যক্তিগত স্বার্থের ঝুলি এবং ভিন্ন পতাকাবাহী স্বাধীন ও সার্বভৌমত্বের নামাবলী পরা ভারতের একটি বোবা রাজ্য। ভারতের পশ্চিম বংগ রাজ্য নদীর পানি হিস্যা নিয়ে কথা বলতে পারে। বাংলাদেশ আজ দিল্লীর হাতে অসহায় হয়ে পড়েছে।
লেখক: কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
ershadmz@gmail.com


একটি বাড়ি একটি ইতিহাস / এরশাদ মজুমদার

এ বাড়িটি ফেণী জেলার দক্ষিণে সোনাগাজী উপজেলার আহমদপুর গ্রামের মুন্সীবাড়ি। এলাকায় আমিরউদ্দিন মুন্সীবাড়ি হিসাবে পরিচিত। দুশো বছরের পুরাণো শিক্ষিত বাড়ি। মুন্সী একটি ফার্সী শব্দ, মানে শিক্ষিত বা আলেম বা এজুকেটেড। কেরি সাহেবের মুন্সীর কথা আপনারা শুনেছেন। কবিগুরুর ঠাকুরদা বা দাদা মশায় দ্বারকানাথ প্রথম জীবনে ইংরেজ সাহেবদের মুন্সী ছিলেন। দ্বারকানাথ ফার্সী ভাষা জানতেন। তাই তিনি সাহেবদের দোভাষী হিসাবে কাজ করতেন। আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর শহরে বিখ্যাত দোভাষ পরিবার রয়েছে। অফিস আদালতে তখন ফার্সী ভাষা চালু ছিল ১৮৩৭ সাল নাগাদ। এরপরে ইংরেজী সরকারী ভাষা হিসাবে জারী হয়।
মুন্সী বাড়ীর মুরুব্বীরা বা পরিবারের প্রতিষ্ঠাতারা জমি জমা,সহায় সম্পদ থেকে বিদ্যাকে বেশী গুরুত্ব দিতেন। ফলে আরবী ,ফার্সী ও ইংরেজী ভাষায় এ বাড়ীর লোকজনের দখল ছিল।
দলিল দস্তাবেজ ও অন্যান্য কাগজপত্র দেখে যতটুকু জানতে পেরেছি তাতে দেখা যায় এ পরিবার বা বাড়ীর প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন মুন্সী বোরহান উদ্দিন ভুঁইয়া। লোকমুখে জানা যায় এঁদের পূর্ব পুরুষ ছিলেন সোনাগাজী। ফেণী এবং কুমিল্লার ব্যাপক এলাকায় গাজীদের নাম পাওয়া যায়। যেমন সোনাগাজী, ফুলগাজী, কদলগাজী, সুয়াগাজী ।এর আগের তেমন কোন ইতিহাস দলিলে পাওয়া যায়নি। মুন্সী বোরহানউদ্দিনের তিন ছেলে হলেন মুন্সী আমির উদ্দিন,মুন্সী এলাহী বক্স ও মুন্সী আমজাদ হোসেন। এঁরা সবাই ছিলেন আদালতের উকিল বা ভকিল। মুন্সী আমির উদ্দিন ছিলেন বোরহান উদ্দিনের বড় ছেলে। তাঁরই বড় ছেলে আবদুল মজিদ ও আবদুল আজিজ। মজিদ সাহেব ফেণীতে ওকালতি করতেন আর আজিজ সাহেব সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি প্রথম বিয়ে করেন এলাকার সম্ভ্রান্ত পরিবার দেওয়ানজী বাড়িতে। তাঁর প্রথম স্ত্রীর সন্তান হলেন সুলতান আহমদ ও আমিন আহমদ। দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন কুমিল্লা সৈয়দ বাড়িতে। বিচারপতি একেএম বাকের হলেন দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান। আজিজ সাহেবের এক মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন চট্টগ্রামের খান বাহাদুর আবদুস সাত্তার সাহেবের কাছে। প্রখ্যাত লেখক ও সংসদ সদস্য মোহায়মেন সাহেবের নানার বাড়িও সোনাগাজীর মুন্সীবাড়ি।
মুন্সী বোরহান উদ্দিনের দ্বিতীয় ছেলে মুন্সী এলাহী বক্স। এলাহী সাহেবের দুই ছেলে মুন্সী আবদুল গণি ও মুন্সী সিরাজুল হক। বৈবাহিক সুত্রে হক সাহেব নোয়াখালীর সোনাপুরে বসতি স্থাপন করেন। তাঁরই সন্তান হলেন প্রখ্যাত ইকনমিস্ট ড.মজাহারুল হক।। এটর্ণি জেনারেল আমিনুল হক ও শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক এ বাড়িরই সন্তান। মজাহারুল হক সাহেব ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমিতির সমিতির সভাপতি ছিলেন।
আমির উদ্দিন মুন্সী বাড়ি পুরো ফেণী জিলার একটি বিখ্যাত বাড়ি। এ বাড়িকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি হাট, মাদ্রাসা, মক্তব, মসজিদ, স্কুল ও বিশাল কবরস্থান। একটি কলেজ হলে যোলকলা পূর্ণ হয়। বাড়িতে তিন হিস্যা। দক্ষিণের হিস্যা হলো মুন্সী আবদুল গণির।মাঝের হিস্যা হলো মুন্সী আমির উদ্দিনের এবং উত্তরের হিস্যা হলো মুন্সী আমজাদ হোসেনের। আমির উদ্দিন সাহেব মুন্সী বোরহানের বড় ছেলে বলেই বাড়িটি তাঁর নামেই পরিচিত। এমন কি পুরো এলাকাটাই তাঁর নামে পরিচিত। বিচারপতি আমিন আহমদ ও বিচারপতি বাকের আহমদ তাঁরই নাতি ও ডেপুটি আবদুল আজিজের ছেলে। আজিজ কুমিল্লার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন এবং এখান থেকেই তিনি অবসর গ্রহণ করে এখানেই শায়িত আছেন। আজিজ সাহেব একজন আল্লাহওয়ালা মানুষ ছিলেন। তিনি শুক্রবারের জামাতে ইমামতি করতেন। বাকের সাহেবের একটি ক্ষুদ্র জীবনী পুস্তক আছে, যা আমি চেষ্টা করেও জোগাড় করতে পারিনি।শুনেছি, কেনাডায় তাঁর সন্তানদের কাছে বইয়ের একটি কপি আছে। সে বাড়ির একজন প্রবীণ মানুষ এখনও জীবিত আছেন। তিনি আবদুল গণি সাহেবের ছেলে আবদুল কাদির। অবসরপ্রাপ্ত সরকারী বড় কর্মকর্তা। তাঁর সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি সময়ের কারণে।
সময়ের পরিবর্তনে মুন্সী বাড়ির পুরাণো প্রভাব প্রতিপত্তি ও জৌলুস নেই। আমিন আহমদের মা তিনি শিশু থাকতেই মারা। ইনি ছিলেন দেওয়ানজী বাড়ির মেয়ে। আমিন আহমদ তাঁর মা সম্পর্কে তেমন কিছুই বলেননি তাঁর স্মৃতি কথায়। আবদুল আজিজ সাহেবের দ্বিতীয় স্ত্রী শামসুন্নাহারের নাম খচিত পাকা ভবনটি এখন ভুতড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। একদিন কেউ দখল করে ভবনটি ভেংগে ফেলবে। আজিজ সাহেবের বা আমিন আহমদের বংশধরেররা সবাই রাজধানীতে বেশ নামকরা। গ্রামের বাড়ি বা ঐতিহ্যের প্রতি কারো তেমন আগ্রহ নেই। মাঝের হিস্যায় এখন মুন্সী হাফেজ মাহমুদের বংশধরেরা আছেন। উত্তর হিস্যাতে আছেন সাবেক সংসদ সদস্য মেশাররফ হোসেন ও হোসাফ গ্রুপের মালিক মোয়াজ্জেম সাহেব। তাঁরা বাড়িকে স্কুলে রূপান্তরিত করেছেন। দক্ষিণ হিস্যার গণি সাহেবের বংশধরের তেমন নাম করতে পারেননি। যাঁরা বাড়িতে আছেন তাঁরা সবাই জমি বেচা কেনায় ব্যস্ত আছেন। এঁদের সকলেরই ফেণী শহরে বাড়ি আছে বা ছিল। মেশাররফ সাহেবদের ডাক্তার পাড়ার বাড়িটি খালি পড়ে আছে। দারোয়ান বাড়ি পাহারা দেয়। গণি সাহেবের বড় ছেলে শামসুল হুদা সাহেবের মাষ্টার পাড়ার বাড়িটি বংশধরেররা বিক্রি করে ফেলেছেন বা বিক্রি করার চেষ্টায় আছেন। মুন্সী আবদুল মজিদ ফেণীতে আইন ব্যবসা করতেন বলে উকিল পাড়ার রাজবাড়ির পূর্ব পার্শে একটি বাড়ি করেছিলেন। ফেণীতে মুন্সী বাড়ির এটাই প্রথম বাড়ি। এ বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে বাস করতেন মুন্সী হাফেজ মাহমুদের বড়ছেলে কাজী নুরুল হুদা সাহেব। পুরাণো ভবনটি কোন রকমে টিকে আছে। বাড়ির বেশীর ভাগই বিক্রি হয়ে গেছে। মূলত এ বাড়িটিই ছিল বিচারপতি সাহেবেদের শহরের বাড়ি।
বিচারপতি আমিন আহমদ সাহেবের ইংরেজীতে লেখা একটি স্মৃতিকথা আমার হাতে এসেছে। বইটির টাইটেল হলো ‘A Peep into The Past'( অতীতের জানালায় উঁকি)। আমি আশা করেছিলাম বইটিতে তাঁর পরিবারের বা পূর্ব পুরুষদের বিস্তারিত জানা যাবে। না,এতে তেমন কিছুই নেই। বাবার নাম একবার বলা হয়েছে। তাঁর বাবা মাওলানা আবদুল আজিজকে তিনি খুবই ভালবাসতেন। আমি আগেই বলেছি আজিজ সাহেব শুক্রবারে মসজিদে জুম্মাহর নামাজ পড়াতেন। আরবী, ফার্সী ও ইংরেজী জানা শিক্ষিত আল্লাহওয়ালা মানুষ ছিলেন। আমিন আহমদ সাহেবও আরবী জানতেন। তিনি কোরাণের তরজমা ও তাফসীর করতে পারতেন। খোদার উপর তাঁর অগাধ বিশ্বাস ও আস্থা ছিল। সকল সুখদু:খে তিনি আল্লাহপাকের উপর ভরসা রাখতেন। একথা তিনি তাঁর স্মৃতি কথায় উল্লেখ করেছেন।
তাঁর স্মৃতিকথাটি খুবই মূল্যবান ঐতিহাসিক কারণে। নেতাজী সুভাষ বসু তাঁর ক্লাসমেট ও বন্ধু ছিলেন। লন্ডনে দুজনেই একসাথে পড়েছেন। একবার দার্জিলিংয়ে ছুটি কাটাবার সময় গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা তাঁর কাছে গিয়েছিলেন সুভাষ বাবু সম্পর্কে জানার জন্যে। সুভাষ বাবু যে মারা গেছেন একথাটি আমিন আহমদ সাহেব বিশ্বাস করতে পারেননি। ১৯২৪ সালে আমিন আহমদ সাহেব ব্যারিষ্টার হয়ে কোলকাতা ফিরে ডা: টি আহমদ সাহেবের বাসায় উঠেন। টি আহমদ ছিলেন একজন বিখ্যাত চক্ষু চিকত্‍সক। এবং পরে আমিন আহমদ সাহেবের ভায়রা ভাই হয়েছিলেন। দুজনেই বিয়ে করেছিলেন নওয়াব বদরুদ্দিন সাহেবের কন্যা। ১৯২৪ সালেই তিনি কোলকাতা হাইকোর্টে যোগ দেন একজন জুনিয়র আইনজীবী হিসাবে। সে  সময়ের কোলকাতার বিখ্যাত আইনজীবীদের  সাথে তাঁর পরিচয় হয়। পাকিস্তান হওয়ার পরও এই যোগাযোগ ছিল।

তিনি যখন চীফ জাষ্টিস বা প্রধান বিচারপতি তখন জমিদারী উচ্ছেদের বিরুদ্ধে  জীবেন্দ্র কিশোের আচার্য চৌধুরীর করা মামলাটি উত্থাপিত হয় ১৯৫৬ সালে। এই মালমলায় ৮৩ জন দরখাস্তকারী জমিদার ছিলেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৯৫০ সালে মুসলীম লীগ সরকার জমিদারী ব্যবস্থা উচ্ছেন করে। এর আগে ১৯৩৭ সালে ঋণ সালিশী বোর্ড গঠণ করে মুসলমান কৃষকদের ঋণ থেকে মুক্ত করেছিলেন স্যার খাজা নাজিমুদ্দিন ও শেরে বাংলা। ওই সময়েই তাঁরা বিনা বেতনে প্রথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। কার্ল মার্কস জমিদারী প্রথা উচ্ছেদকে একটি রেডিকেল স্টেপ ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই মামলায় জগত বিখ্যাত আইনজীবী ডিএন প্রিট  ও পিআর দাস এসেছিলেন জমিদারদের পক্ষে। একে ব্রোহী সাহেব ছিলেন সরকারের পক্ষে। ১৯৭১ সালে একে ব্রাহী সাহেব বংগবন্ধুর আইনজীবী ছিলেন। জমিদাররা বলেছিলেন আইনের চোখে সব নাগরিকই সমান এবং সরকার সবারই স্বার্থ সমান ভাবে রক্ষা করবেন। আইনের এ ব্যাখ্যা নিয়েই আদালতে যুক্তি তর্ক হয়েছে। এ মামলায় একদল হচ্ছে জমিদার আর আরেকদল ছিলেন গরীব প্রজা। একদলের হাতে পুঁজি আছে আরেক দল নি:স্ব। এখানে দুই জমিদারের ভিতর সমতা বা ইকোয়ালিটি প্রতিষ্ঠা করা যায়। মানুষ হিসাবে জমিদার ও প্রজা সমান। এ প্রশ্নে আমিন আহমদ সাহেব ইসলামিক আইনের উদ্ধৃতি দেন। প্রজা আর জমিদার কখনই সমান হতে পারেনা। জমিদারীটা ছিল এক ধরণের খাজনা আদায়ের ব্যবসা। মূল জমিদার বা শাসক ছিলেন ইংরেজরা। স্থানীয় জমিদারগণ(বেশীর ভাগ হিব্দু) ছিলেন ইংরেজ সরকারের এজেন্ট। মনে করুন, জমিদার বাবু সরকারকে দিবেন বার্ষিক তিন হাজার টাকা। তিনি আদায় করতেন বিশ হাজার টাকা। জমিদারের অত্যাচার নিয়ে আপনারা বহু গল্প আছে। কবিগুরুর জমিদারীর লাঠিয়ালদের কৃষকনেতা ইসমাইলের যুদ্ধ হয়েছিল। নদীয়ার জমিদার মুসলমানদের দাঁড়ির উপর খাজনা বসানের প্রতিবাদ  করেছিলেন কৃষকনেতা তীতুমীর।

আমিন আহমদ বিচারক হিসাবে নাম করেছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি হিসাবে। তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা মাওলানা আবদুল আজিজ পুত্রকে উপদেশ দিয়েছিলেন সকল অবস্থায় আল্লাহ ও কোরআনকে স্মরণ করার জন্যে। এর আগে বলেছি, আবদুল আজিজ সাহেবের আরেক ভাই আবদুল মজিদও ছিলেন একজন উকিল। সুলতান মোহাম্মদ ছিলেন একজন বড় সরকারী কর্মচারী। তিনি আমিন আহমদ সাহেবের বড়ভাই। আমিন আহমদ কি কারণে নানার বাড়ি, মা ও নানার নাম উল্লেখ করেননি তা আমার বোধগম্য হচ্ছেনা।

বইটির প্রকাশনা খুবই দূর্বল। ৭৫ সালে ঢাকায় প্রকাশিত অন্যান্য বইয়ের সাথে তুলনা করলে তা বুঝা। বইটি যাঁরা প্রকাশ ও মুদ্রণ করেছেন তাঁরাও  আমিন আহমদ সাহেবের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। আত্মীয় বলেই তাঁরা আগ্রহ করে বইটির প্রকাশনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে তিনি কোন কথা বইতে লিখেননি। এমন কি আপন বোন বা এক মায়ের বোনের কথাও বলেননি। দক্ষিণ হিস্যার মুন্সী গণি সাহেবের বড় ছেলে শামসুল হুদা সাহেব আমাকে বলেছিলেন, তিনি জেঠাত বোনের বাসায় থেকে চট্টগ্রাম কলেজে পড়ালেখা করেছিলেন।
লেখক: কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
ershadmz@gmail.com

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 606 other followers