Feeds:
Posts
Comments

Archive for March, 2011


বাজার শব্দটার সাথে দেশের পড়ালেখা জানা বা না জানা সবাই পরিচিত। গ্রামে হাটবাজার বলে। এই হাটবাজার গুলোতে কৃষকরা তাঁদের উত্‍পাদিত পণ্য বেচাকেনা করে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ও মোবাইল ফোনের কল্যানে কৃষিপণ্য এখন ট্রাক বোঝাই হয়ে খুব কম সময়ে বড় বড় শহর বা নগরে চলে আসে।যেমন, তরি তরকারী মাছ মুরগী সবই এখন গ্রাম থেকে প্রথমে শহরের আড়তে আসে। অনেক রকম আড়ত আছে। চালের আড়ত, ডালের আড়ত, মাছের আড়ত, তরকারীর আড়ত। আড়ত থেকেই খুচরা বাজারে যায় খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা এসব পণ্য সরাসরি ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করে।বাজার সম্পর্কে ভোক্তাদের পরিস্কার ধারণা আছে কোথায় গেলে কি পাওয়া যায়। সকালে গেলে কি পাওয়া যায় বা বিকালে গেলে কি পাওয়া যায় সে ধারণাও ভোক্তাদের আছে। মাছ তরি তরকারী কেনার আগে সবাই ভাল করে দেখে শুনে নেয়। পঁচা মাছ বা বাসি তরকারী/শব্জী কেউ কিনেনা। ভাল কি মন্দ তা দেখে শুনে কিনার আইনগত অধিকার ক্রেতার বা ভোক্তর আছে। বাজারের ভিতরে বাজার আছে। যেমন সোনার বাজার, ফলের বাজার সহ আরও অনেক বাজার।

সাধারন পাঠকের সুবিধার্থে উপরের কথাগুলো বলেছি। এখন কিছু কথা বলবো শেয়ার বাজার নিয়ে। এই বাজারটি অন্যান্য বাজারের মতো নয়। এখানে পণ্য হলো কোম্পানীর শেয়ার, বোনাস শেয়ার, রাইট শেয়ার। এ বাজারে মিউচুয়েল ফান্ডও বেচাকেনা হয়। যেমন আইসিবি মিউচুয়েল ফান্ড। এখানে বেচাকেনা করেন স্টক এক্সচেন্জের সদস্য কোম্পানীরা। এদের ব্রোকার কোম্পানীও বলা হয়। কিছুদিন আগেও ব্যক্তি সদস্যরা নিজ নামে এ ব্যবসা করতে পারতো। এখন তা পারেনা। এখন এজন্যে লিমিটেড কোম্পানী হতে হয়। অনলাইন ব্যবস্থার ফলে এখন বিনিয়োগকারীরা ঘরে বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেখেশুনে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এজন্যে বাজারে বা স্টক এক্সচেন্জে যেতে হয়না। শেয়ার বাজারকে মূলত: মূলধন বাজার বা ক্যাপিটেল মার্কেট বলা হয়। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানী গুলো তাদের প্রয়োজনীয় পুঁজি বা মূলধন সংগ্রহের জন্যে এই বাজারে আসে। এজন্যে তাদের কিছু নিয়ম কানুন মানতে হয়। মূলধন বাজারকে তদারকী করে সিকিউরিটি এক্সচেন্জ কমিশন(এসইসি)। বাজার থেকে শেয়ার বা কাগজ  বিক্রি করে পুঁজি সংগ্রহ করতে হলে এসইসি’র নিয়ম কানুন ও তদারকী মেনে চলতে হবে। না মানলে কমিশন জরিমানা করতে পারে, বাজারের তালিকাভুক্তি বাতিল করে দিতে পারে। সোজা কথায় বলা যেতে পারে বাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করা বন্ধ করে দিতে পারে। এসইসি’র অনুমোদনক্রমে সরকারী বেসরকারী যেকোন পাবলিক লিমিটেড বাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে।

দেশে এখন দুটি অনুমোদিত বাজার আছে। একটি ঢাকা স্টক এক্সচেন্জ,যেটা মতিঝিলে অবস্থিত। অপরটি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেন্জ,যা আগ্রবাদে অবস্থিত। পুঁজি বা মূলধন সংগ্রহের জন্যে কোম্পানীগুলোকে এ বাজারে আসতে হয়। এ বাজারে আসতে হলে কোম্পানীকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানী হিসাবে নিবন্ধিত হতে হয়। নিবন্ধনের জন্যে সরকারের নিবন্ধন দফতর আছে। এই দফতরে যেকোন ধরনের কোম্পানী বা সমিতি নিবন্ধিত হয়। যেমন জমি নিবন্ধনের আলাদা নিবন্ধন ব্যবস্থা আছে।সমবায় সমিতিগুলোকেও সমবায় অধিদপ্তরে নিবন্ধিত হতে হয়। প্রাইভেট লিমিটেড বা ব্যক্তি/পারিবারিক  মালিকানায় নিবন্ধিত কোম্পানীগুলো পুঁজি বাজারে আসতে পারেনা। তারা ব্যবসায় নিজেদের পুঁজি বা ব্যান্ক থেকে পুঁজি সংগ্রহ করতে পারে। পুঁজি বাজারে আসতে হলো কোম্পানীকে কিছু মালিকানা শেয়ারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করতে হবে। শেয়ার বাজারে ছাড়ার জন্যে খবরের কাগজে বিজ্ঞপ্তি দিতে হয়। বলতে হবে অমুক অমুক ব্যান্কের অমুক শাখার মাধ্যমে অমুক তারিখ থেকে শেয়ারের আবেদনপত্র পাওয়া যাবে। তখনি ক্ষুদ্র ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা আবেদন করতে পারেন। এটা হচ্ছে সরাসরি কোম্পনীর শেয়ার কেনার আবেদনপত্র। আবেদনকারী কয়েকগুণ বেশী হওয়ার কারণে কোম্পানীরা প্রকাশ্যে লটারী করে শেয়ার বরাদ্দ করে। ফলে সবাই পায়না। এর পরে এসব শেয়ার খোলা বাজারে মানে শেয়ার বাজারে পাওয়া যায় বাজার দরে। সেখানে একশ’টাকার শেয়ার এক হাজার টাকাও হতে পারে। আবার একশ’টাকার শেয়ার পঞ্চাশ টাকাও হতে পারে।এই বাজারে বিনিয়োগকারী ফটকা বাজারী বা সুযোগ সন্ধানী থাকতে পারে এবং আছে।বিনিয়োগ করতে হলে যেকোন ব্যক্তি বা গ্রুপকে স্টক এক্সচেন্জের সদস্য কোম্পানীতে বিও একাউন্ট খুলে নিবন্ধিত হতে হয়। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদেরও এ বাজারের জ্ঞান থাকতে হবে। অথবা ব্রোকার হাউজ / সদস্য কোম্পানী গুলোর পরামর্শ নিতে হবে। যারা প্রতিদিন শেয়ার বেচাকেনা করতে চান তারা ফটকা বাজারী সওদাগর। বাজার না বুঝেই তাঁরা এ কাজটা করেন। কোন কোম্পানীর শেয়ার কিনবেন এবং কেন কিনবেন তা বিনিয়োগকারীকে অবশই জানতে হবে। সবাই কিনছে তাই কিনবো আর সবাই বিক্রি করছে তাই বিক্রি করবো- এমনটা কোন বিনিয়োগকারীর চরিত্র হতে পারেনা। যারা সত্যিকারের বিনিয়োগকারী তাঁরা বছরের শেষে মুনাফার অংশ হিসাবে ডিভিডেন্ডের জন্যে অপেক্ষা করেন। আর যাঁরা শেয়ার বাজারে ব্যবসা করতে চান তাঁরা বিনা কারণেই শুধু লাভ চান। এমন কি তারা কয়েকশ’ ভাগ বেশী লাভ চান। অদৃশ্য কিছু খেলোয়াড় আছেন যারা বাজারকে সুকৌশলে বাজারকে নিয়ন্ত্রন করে হাজার হাজার কোটি টাকার মুনাফা লুটে নিতে চায়। ক্ষুদ্র শেয়ার ব্যবসায়ীরা ওই অদৃশ্য খোলোয়াড়দের খপ্পরে পড়া সবকিছু খোয়ায়। তখন রাস্তায় হাংগামা করে।

সেকেন্ডারী মার্কেট থেকে শেয়ার কিনে ব্যবসা করা খুবই কঠিন কাজ। শেয়ার কেনার আগে একশ’বার ভাবতে হবে। কেনার আগে ভাবতে ওই কোম্পানীর সত্যিকার অবস্থা কি। দেখা যাবে কোন একটি কোম্পানীর শেয়ার বাজারে এক হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আসলে সে শেয়ারের দাম একশ’ টাকার বেশী হওয়া উচিত্‍ নয়। যেমন মাছ বা শব্জী বাজারে পঁচা জিনিষও পাওয়া যায়। বিক্রেতা যেকোন ভাবেই তার জিনিষ বেচতে চাইবে। ক্রেতার দায়িত্ব হলো ভাল জিনিষ বুঝে শুনে কেনা। পঁচা জিনিষ কিনলে ঠকতে হবে এটা পাগলেও জানে। শেয়ার বাজারেও পঁচা জিনিষ বিক্রী হয়। পঁচা শেয়ার যেন বিক্রী না হয় তা দেখার দায়িত্ব এসইসি’র ও সরকারের। স্টক মার্কেটের সদস্যদেরও দায়িত্ব ভাল ও মন্দ কোম্পানী সম্পর্কে ক্ষুদ্র শেয়ার ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা। সাধারন মানুসের বিনিয়োগের জায়গা হলো ব্যান্ক সঞ্চয়পত্র ও শেয়ার বাজার। ব্যান্কের এফডিআর আর সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে নিশ্চিত হারে মুনাফা পাওয়া যায়। এমন কি যারা বাত্‍সরিক ডিভিডেন্ড পাওয়ার জন্যে শেয়ারে বিনিয়োগ করে তারাও নিশ্চিত হারে মুনাফা পায়।

যারা বাজার থেকে মানে সেকেন্ডারী মার্কেট থেকে শোয়ার কিনে বেচাকেনা করে বা করতে চায় তাদের লাভ ক্ষতি অনিশ্চিত। বিশেষ করে ক্ষুদ্র শেয়ার ব্যবসায়ীদের জন্যে এ ধরনের ব্যবসা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের লোকসানের ঝুঁকি খুব বেশী থাকে। এমন কি বাজার থেকে দশ টাকার শেয়ার একশ’টাকায় কিনলেও তাদের তেমন মুনাফা হয়না। কারন ডিভিডেন্ড হিসাব করা হয় শেয়ারের ফেসভ্যালু বা মূল দামের উপর। যেমন দশ টাকার শেয়ারে কুড়ি পারসেন্ট ডিভিডেন্ড মানে দশ টাকার শেয়ারে দুই টাকা মুনাফা। যেহেতু শেয়ারটা কেনা হয়েছে একশ’ টাকায় সেহেতু মুনাফার হার পড়েছে প্রতি শেয়ারে কুড়ি পয়সা। এ বিষয়টার প্রতি  বিনিয়োগকারীকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। একশ’ টাকার শেয়ারে দুই পয়সা লাভে কেউ বিনিয়োগ করতে চাইবেনা।ইদানিং ব্যান্কগুলো এফডিআর এর সুদ নিয়ে নানা টালবাহানা করছে। গত এক বছরে এফডিআর এর সুদের হার কখনও সাত পারসেন্ট আর কখনও তের পারসেন্টের মধ্যে উঠানামা করছে। যারা এফডিআর এর সুদ বা লাভ নিয়ে সংসার চালান তাদের পক্ষে সাত বা আট পারসেন্ট লাভে সংসার চলানো সম্ভব নয়। পেনশন হোল্ডারদের জন্যে  বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সোজা কথায় বলা যেতে পারে মধ্যবিত্তদের জন্যে গ্রহনযোগ্য একটা মুনাফার হার থাকা অবশ্যই দরকার। বাজারে জিনিষ পত্রের দাম যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ও পেনশনহোল্ডাররা। পেনশনের টাকার মুনাফার উপরও সরকার আয়করের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন।

সরবরাহ ও চা্হিদা অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের শেয়ার বাজার গুলোতো এখন  প্রয়োজনীয় শেয়ারের সরবরা্হ নেই। বিনিয়োগের জন্যে বাজারে যে পরিমান অর্থের সরবরাহ আছে সেই পরিমাণ শেয়ার নেই। ফলে বাজারকে ম্যানিপুলেট করার জন্যে একদল প্রভাবশালী লোক সব সময় লেগে থাকে। ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে ওই শক্তিশালী গ্রুপ ৯৬ সালে এবং ২০১১ সালে বাজার থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়ে গেছে। ১১ সালের ঘটনা নিয়ে সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটি কিছুদিনের মধ্যেই তাদের রিপোর্ট সরকারের কাছে পেশ করবে। যারা সাধারন ক্ষুদ্র শেয়ার ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে তারাতো সরকারেরই প্রিয়ভাজন। যদিও প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী বলেছে তারা শেয়ার বাজার বুঝেন না। ৯৬ সালেও অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া সাহেব এমন কথা বলেছেন। এসব হচ্ছে সরকারের দায়িত্বহীনতার পরিচয়। এ অবস্থা চলতে থাকলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বাজারের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলবে। এর প্রতিক্রিয়া পড়বে দেশের অর্থনীতিতে।

বাজারে প্রয়োজনীয় শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানো খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে। আর এর জন্যে প্রধান উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। সরকারের মালিকানায় বহু কোম্পানী আছে যা এখনও শেয়ার বাজারে আসেনি। কারণ এতে সরকারী আমলাদের মাতবরী কমে যাবে। সরকারী ব্যান্ক গুলো এখনও শোয়ার বাজারে আসেনি। অনেক কর্পোরেশন আছে ্যা এখনি শেয়ার বাজারে আসতে পারে। এছাড়া বিদেশ থেকে টাকা ধার না করে বড় বড় প্রজেক্টগুলোকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানীতে রূপান্তরিত করে প্রয়োজনীয় অর্থ শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে বাজার থেকে সংগ্রহ করা যায়। যেমন পদ্মাসেতু প্রকল্প। এই প্রকল্প অর্থায়নের জন্যে খুব সহজেই বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু কেন যে সরকার বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ না করে বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহের ব্যাপারে আগ্রহী তা সহজেই বোধগম্য। পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশে প্রাইভেট সেক্টর সরকারী সেক্টর বা পাবলিক সেক্টরের চেয়ে অনেক বড়। ওই সব সরকারই এই নীতি গ্রহণ করেছে। এতে উন্নয়নের গতি দ্রুত করা যায়। মালয়েশিয়া আমাদের সামনে একটি বড় দৃস্টান্ত। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সরকারকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। প্রসংগত উল্লেখ করতে চাই যে, বাজারে জমির দাম দ্রুত বাড়ার প্রধান কারণ, কয়েকশ’ গুণ মুনাফার লাভের জন্যে মানুষ জমিতে বিনিয়োগ করছে। বিগত দশ বছরে সারাদেশ জমির দাম কয়েকশ’ গুণ বেড়েছে। জমিতে মুনাফা বেশী, তাই জমির দিকে ঝুঁকছে। জমি একটি অনুত্‍পাদনশীল খাত। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়া মানে হচ্ছে উন্নয়ন ও উত্‍পাদনশীল খাত স্থবির হয়ে পড়া।( মাসিক শিক্ষা দর্পন , মে )

লেখক: কবি সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিক

ershadmz40@yahoo.com

Advertisements

Read Full Post »


সাম্প্রতিক কালে যে সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে তাতে বলা হচ্ছে বংবন্ধু শেষ পর্যন্ত মানে ২৫শে মার্চ সকাল বেলাতেও জেনারেল ইয়াহিয়ার আলোচক টীমকে জানিয়েছিলেন তিনি পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার জন্যে কনফেডারেশন করতে রাজী আছেন। জেনারেল আলোচক টীম জানাবেন বলে সেদিন সন্ধ্যা নাগাদ কিছুই জানাননি। পাকিস্তান সামরিক জান্তা সে রাতেই বাংলাদেশের জনগণের উপর আক্রমন চালায়। ড: কামাল পুরো বিষয়টা জানতেন। এমন কি পাকিস্তানী সামরিক জান্তা বংগবন্ধুকে বন্দী করে কারাগারে রেখে রাস্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে যে মামলা করেছিল সে বিষয়েও ড: কামাল বিশদভাবে আছেন। বংগবন্ধু বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান স্থপতি, এ ব্যাপারে কোথাও কারো দ্বিমত নেই। যারা দ্বিমত করতে চায় তাদের ইগনোর বা অবহেলা করুন। এ নিয়ে ঝগড়া ফাসাদ করার কোন প্রয়োজন নেই। বংগবন্ধু আমাদের জাতীয় নেতা। তিনি চিরদিন সম্মানের মর্যাদায় থাকবেন। তিনি জীবনেও সম্মানিত মরনেও সম্মানিত। তিনি অলৌকিক কোন ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না। খুবই সাধারন পরিবার থেকে এসে মানুষের সেবা করে, মানুষের অধিকার প্রতিস্ঠার আন্দোলন করে মহান নেতায় পরিণত হয়েছেন। ৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি এ দেশের সর্বজনবিদিত নেতায় পরিণত হয়েছেন।

একজন মানুষ হিসাবে তাঁর অনেক ব্যর্থতাও রয়েছে। ব্যর্থতা থাকাটা কোন অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং খুবই স্বাভাবিক। আল্লাহপাক স্বয়ং ঘোষণা করেছেন ‘ মানুষ জাতি যদি গুনাহ না করতো তাহলে তিনি জাতি সৃস্টি করতেন। ভুল করা , অপরাধ করা , পাপ করা মানুষের ফিতরাত। আল্লাহতায়ালা শয়তান সৃস্টি করেছেন মানুষের সততা সত্যতা ও ঈমান পরীক্ষা করার জন্যে। শয়তানের প্রর্থনা অনুযায়ী আল্লাহপাক তাকে শয়তানী কাজে লিপ্ত থাকার জন্যে কেয়ামত পর্যন্ত লাইসেন্স প্রদান করেছেন। শয়তানের সেই লাইসেন্স এখনও জারী আছে। কিন্তু আল্লাহপাক বলেছেন, যারা আমার বান্দাহ হয়ে গেছে শয়তান তাদের কিছুই করতে পারবেনা। তার উপরেও তিনি মানুষের জন্য তওবা বা অনুতাপের দরজা খোলা রেখেছেন। মানুষের জন্যে  তওবা বা অনুতাপের সুযোগ আল্লাহপাকের মহান দয়া। আমরা সবাই আল্লাহপাকের এই দয়া ভোগ করছি। কথাগুলো উল্লেখ করলাম  মানুষ হিসাবে বংগবন্ধুর জীবন বিশ্লেষণের জন্যে। যারা বংবন্ধুকে অতিমানব অবতার বা দেবতার আসনে বসিয়ে পুজা করতে চান তারা কেউই তাঁর ভক্ত নন। আমার মতে তাঁরা সকলেই বংগবন্ধুর শত্রু। এই শত্রুরা বংগবন্ধুকে মহামানব দেবতা বা অবতার বানাবার জন্যে রামায়নের মতো মুজিবায়ন রচনা করতে চলেছে। রামায়ন বা রাম সম্পর্কে ইতিহাসবিদগন এখনও একমত নন। অনেকেই বলেছেন রামের জন্ম হয়েছে কবির মনোভূমিতে। রামায়নের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেছেন, রামায়ন বিজয়ীর ইতিহাস। রামায়নের প্রধান চরিত্র হচ্ছে রাবণ। তিনি ভূমিপুত্র ও স্থানীয় জমিদার বা রাজা। আর্যপুত্র রাম বিজয় লাভ করায় কবি সাহিত্যিক ঐতিহাসিকগণ দলবেধে রামের গুণ গাণ করে রামায়ন রচনা করেছেন। রাজা রাবণকে তারা তৈরি করেছেন বা অংকিত করেছেন অসুর বা রাক্ষস হিসাবে মানুষ হিসাবে নয়।

বংগবন্ধুর পরিস্থিতি ও অবস্থান সম্পুর্ণ আলাদা। তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেননি। তিনি ছিলেন আক্রমনকারীর জেলখানায়। আক্রমনকারী যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর তিনি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে বীরের বেশে ফিরে আসেন ১০ই জানুয়ারী। মুক্তিযুদ্ধে কি হয়েছে তিনি এর কিছুই জানেন না। সিরাজুর রহমান সাহেব তাঁর এক লেখায় বলেছেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে এ কথা তিনি ভাল করে জানতেন। সিরাজুর রহমান সাহেব লিখেছেন,  বংগবন্ধু তাঁকে বললেন , ‘সিরাজ ওরা আমাকে হিজ এক্সিলেন্সি বলছে কেন?’ উত্তরে সিরাজ সাহেব বলেছেন, আপনিতো এখন বাংলাদেশের রাস্ট্রপতি বা প্রেসিডেন্ট। পাকিস্তানীরা তাঁর বিরুদ্ধে রাস্ট্রদ্রোহিতার মামলা রুজু করলে, বংগবন্ধু তাঁর আর্জিতে বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানে কি হচ্ছে তা তিনি জানেন না। তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোন ধরণের যুদ্ধ ঘোষণা করেননি। তিনি মেজরিটি পার্টির নেতা,তিনি কেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন। মামলার আর্জির পুরো বিবরন সম্পর্কে পাকিস্তানের একে ব্রোহী সাহেব ও ড: কামাল জানেন। ১০ই মার্চের ভাষণেও বংগবন্ধু ভুট্টোকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, আপনারা সুখে থাকুন। আমাদের ভিতর আর ধরনের সম্পর্ক সম্ভব নয়। শুনা যায়, ভুট্টো নাকি বংবন্ধুকে মুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, আমাদের মাঝে কোন ধরণের সম্পর্ক রাখা যায় কিনা ভেবে দেখবেন।

জেনারেল ইয়াহিয়ার টীম ও বংবন্ধুর টীমের ভিতর শেষ অবধি কনফেডারেশন নিয়ে আলোচন এগিয়ে যাচ্ছিল। বংগবন্ধু জেনারেল ইয়াহিয়াকে প্রেসিডেন্ট করতে রাজী হয়েছিলেন। ভুট্টো এই পদটি চেয়েছিলেন। ভুট্টোর সাথে সমঝোতার জন্যে তাঁকে বংগবন্ধু পররাস্ট্র মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব দিয়ে উপ প্রধানমন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন। পুরো সমঝোতার প্রস্তাবটি জেনারেল ইয়াহিয়ার মুখপাত্র ঘোষণা করবেন এই আশায় বংগবন্ধু ২৫শে মার্চ সারাদিন ও সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন। সন্ধ্যার দিকে বংগবন্ধু বুঝতে পারলেন যে পাকিস্তানীরা তাঁকে ধোকা দিয়েছে। তিনি দলীয় নেতাদের ডেকে বিষয়টা জানালেন এবং নিরাপদ অবস্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। পাকিস্তানী সেনারা ইতোমধ্যেই সারাদেশে তাদের অবস্থান গ্রহণ করে। বিশেষ করে ঢাকাকে ধ্বংশ করার জন্যে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। তাজ উদ্দিন সাহেব সহ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা সবাই বংগবন্ধুকে বাড়ি ছেড়ে দেয়ার জন্যে অনুরোধ করেছিলেন। বংগবন্ধু  সবার  অনুরোধকে প্রত্যাখ্যান করে নিজের ৩২ নাম্বার বাড়িতে অবস্থান করেন। পাকিস্তান সেনা বাহিনী তাঁকে রাত একটার দিকে গ্রেফতার করে নিয়ে যান।সাংবাদিক এন্থনী ম্যাসকারানাস লিখেছেন, শেখ মুজিব ও তাঁর সহকর্মীদের কাছে অসংখ্য প্রমান থাকা সত্তেও তাঁরা জেনারেল ইয়াহিয়ার ফাঁদে ধরা দিয়েছিলেন। শাসনতন্ত্র সংস্কারের নামে ইয়াহিয়া মুজিবের টীমকে ব্যাস্ত রেখেছিল। অপরদিকে ইয়াহিয়া গণহত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।অপরদিকে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানের কাঠামো তৈরী করার প্রস্তাবও সামনে এগিয়ে আসে। বংবন্ধু এ প্রস্তাবের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছিলেন। এতে ভূট্টোও রাজী ছিল। দুই দেশ একটি দূর্বল কেন্দ্র। কেন্দ্রে একটি কেবিনেট থাকবে। একজন প্রধানমন্ত্রী ও দশজন মন্ত্রী থাকবেন ওই কেবিনেটে। শেখ সাহেব থাকবেন প্রধানমন্ত্রী। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী থাকবে পাঁচজন। ভুট্টোর মন্ত্রী থাকবে পাঁচজন।প্রেসিডেন্টের কাছে থাকবে প্রতিরক্ষা ও পররাস্ট্র বিষয়। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক জান্তা এ প্রস্তাবে রাজী হয়নি।

‘২৫শে মার্চ চরম আদেশ দিয়ে যখন করাচি   ফিরে যাচ্ছিলেন এবং পাকিস্তান সেনা বাহিনী চরম আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো ঠিক তখনি আওয়ামী লীগের একজন গণসংযোগ কর্মকর্তা দেশী ও বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে শেখ মুজিবের স্বাক্ষরিত একটি গণবিজ্ঞপ্তি বিতরন করছিলেন। ওই বিজ্ঞপ্তিতে শেখ মুজিব বলেছিলেন, প্রেসিডেন্টের সাথে আমাদের আলাপ আলোচনা শেষ হয়েছে। ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে আমরা মতৈক্যে পৌঁছেছি। এখন আমি আশা করছি তিনি তা বাস্তবায়ন করবেন। ম্যাসকারানাস বলছেন, আমার দু:খ হচ্ছে। এই নির্বুদ্ধিতা সম্পর্কে আমি আর কিছু বলবোনা। শেক সাহেব জেনারেল ইয়াহিয়ার সাথে কি ধরনের সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন তা খোলামেলাভাবে দেশবাসীকে জানানো হয়নি। সেই সমঝোতা সম্পর্কে এখন জানেন একমাত্র ড: কামাল হোসেন। কোন এক অজ্ঞাত কারণে ড: কামাল হোসেন জাতির কাছে সমঝোতার দলিল গোপন রেখেছেন। সমঝোতার দলিল দস্তাবেজ নিশচয়ই পাকিস্তানের মহাফেজখানায় রক্ষিত আছে। পাকিস্তান নিশ্চয়ই ওইসব দলিল জনসাধারনের জ্ঞাতার্থে প্রকাশ করবে। ভারতীয় মহাপেজখানায়ও পাক-ভারত যুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার গোপন দলিলগুলো রক্ষিত আছে। আমাদের স্বাধীনতা ও পাক-ভারত যুদ্ধের  ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে অনেক দলিল রিলিজ করে দেয়ার কথা। সম্প্রতি একটি খবর বেরিয়েছে যে, আমাদের স্বাধীনতার অনেক মূল্যবান দলিল পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। কেন পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে সে ব্যাপারে ভারত সরকার এখনও কিছু বলেনি। পাকিস্তানও কি এক গোপন কারনে মুখ খুলছেনা। ভারত ও পাকিস্তানের সেনা বাহিনীর দলিলে রয়েছে মেজর জিয়াই ২৬শে মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। স্বাধীনতার ঘোষনা সম্পর্কিত সকল ঘোষনা বিবিসির আর্কাইভেও রয়েছে।

পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন পৌঁছালে বিবিসির সিরাজুর রহমানকে কি বলেছিলেন তা পরবর্তী পর্যায়ে সিরাজুর রহমান তাঁর বইতে লিখেছেন। শেখ সাহেব নাকি জানতেনইনা পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন বাংলাদেশ হয়ে গেছে। ভূট্টো নাকি শেখ সাহেবকে বলেছিলেন, মুজিব ভাই দেশে ফিরে দেখবেন আমাদের ভিতর কোন ধরনের সম্পর্ক প্রতিস্ঠা করা যায় কিনা। শেখ সাহেবের ১০ই জানুয়ারীর ভাষনে এর কিছুটা আভাস পাওয়া যায়। শেখ সাহেব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেননি তা তিনি জেলে থাকতেই পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে জানিয়েছিলেন। শেখ সাহেবের নামে এবং তাঁরই নেতৃত্বে ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। এই ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু ইতিহাস আর দলিল দস্তাবেজ বলে শেখ সাহেব কখনই নিজে এ ব্যাপারে কোন ঘোষনা দেননি। বড়ই দু:খের বিষয় হলো আওয়ামী লীগ শেখ সাহেবকে স্বাধিনতার ঘোষক বানাবার জন্যে হাজারও রকমের মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে এবং সেই মিথ্যাকে প্রতিস্ঠিত করার জন্যে নানা ধরনের কূট কৌশলের আশ্রয় নিয়ে চলেছে। এ জন্যে আওয়ামী লীগ নানা ধরনের মানুষকে সাক্ষী বানাবার চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শেখ ঘোষক না হলে তাঁর মর্যাদার কোন ব্যতিক্রম হবেনা তা আওয়ামী লীগ বুঝতে পারেনা। মিথ্যা সাক্ষী বানিয়ে আওয়ামী লীগ বংবন্ধুকে হেয় করে চলেছে। মেজর জিয়ার ঘোষণার কথা জগতবাসী জানে। তাজউদ্দিন সাহেব সহ আওয়ামী লীগের বহু নেতা বলেছেন মেজর জিয়ার ঘোষনা শুনে তাঁরা উজ্জীবীত হয়েছেন। জিয়া সাহেবের ঘোষনার কথা মুজিবনগর সরকারও স্বীকার করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বংগবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা এইতো ক’দিন আগেই বললেন, স্বাধীনতার ঘোষনা দেয়ার কোন ম্যান্ডেট মেজর জিয়ার ছিলনা। কথাটা মহাসত্য। জিয়াতো ছিলেন পাক বাহিনীর একজন বাংগালী অফিসার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তিনি বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর একজন অফিসার ছিলেন। কিন্তু বংগবন্ধুর কি সেই ম্যান্ডেট ছিল? না ছিলনা। তিনি এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়েছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের প্রতিনিধি হিসাবে। তাঁর ম্যান্ডেট ছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া। তিনি মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে সরকার গঠণের চেস্টাও করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বংগবন্ধুকে পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সম্বোধনও করেছিলেন। সামরিক শাসনের আওতায় এলএফওর( লিগ্যাল ফ্রেম ওয়ার্ক ) অধীনে নির্বাচনের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল পাকিস্তানের জন্যে একটি নতুন সংবিধান তৈরী করা। সেই সংবিধানের বিষয় নিয়েই তিনি এবং তাঁর টীম ইয়াহিয়া ও তাঁর টীমের সাথে আলোচনা করেছেন। মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে বংগবন্ধু ছয় দফার ভিত্তিতে সংবিধান রচনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। আলোচনা কালে বংগবন্ধু সব সময় বলে এসেছেন আলোচনা সাফল্যের পথে এগিয়ে চলেছে। এমন কি ২৫শে মার্চেও তিনি একথা বলেছেন। তিনি শেষ পর্যন্ত একটা সমঝোতা চেয়েছিলেন। তিনি কনফেডারেশনেও রাজী ছিলেন। কিন্তু বাধ সাধলো পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও ভূট্টো। তারাই শক্তি প্রয়োগ করে পাকিস্তানকে রক্ষা করতে চেয়েছিল। ফলাফল কি হবে তা জেনেও সামরিক জান্তা ২৫গসে মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের উপর আক্রমণ চালিয়েছে। এর আগে ৭ই মার্চের ভাষণ দেয়ার আগে প্রসিডেন্ট ইয়াহিয়া বংগবন্ধুকে ফোন করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন কঠোর কোন বক্তব্য না দেয়ার জন্যে। আলোচনা ও সমঝোতার স্বার্থে বংগবন্ধু সেদিন কঠোর কোন বক্তব্য দেননি। তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘ এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ভাষণের শেষ তিনি বলেছিলেন, জয় বাংলা ও জয় পাকিস্তান। তিনি জয় পাকিস্তান বলে তিনি আলোচনার পথ খোলা রেখেছিলেন। সে আলোচনা ২৫শে মার্চ পর্যন্ত চলেছিল। এমন কি সবার অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি নিজের বারি ছেড়ে কোথাও যাননি। সবাইকে বলেছিলেন,নিরাপদে চলে যেতে। আলো্চনার দুয়ার ও সমঝোতার পথ খোলা রাখার জন্যেই তিনি সেই বিভিষিকাময় রাতে নিজের বাড়িতে ছিলেন। সোজা কথায় বলা যেতে পারে শেক সাহেবের সাথে ভুট্টো ইয়াহিয়া ও সামরিক জান্তা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সামরিক হস্তক্ষেপে পাকিস্তান ভেংগে যাবে তারা জানতো। এ বিষয়ে ভূট্টো ও সামরিক জান্তার ভিতর ব্যাপক গোপন আলোচনা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে পাকিস্তানকে রক্ষা করা যায়নি।

২৬শে মার্চ মেজর জিয়ার ঘোষনার পূর্ব পর্যন্ত দেশের মানুষ হতাশা ও দিশেহারা অবস্থায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতাদেরও কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিলনা।শেখ সাহেব গোপনে কি নির্দেশ বা হুকুম দিয়ে গেছেন তা দেশ জানেনি বা জানতে পারেনি। হতাশা ও অন্ধকারে নিমজ্জিত জাতি আশার আলো দেখতে পেলো মেজর জিয়ার ঘোষণা শুনে। দেশবাসীর কাছে সেটাই ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। সেটাই ছিল এগিয়ে যাবার আহবান। সেটাই ছিল হানাদেরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের আহবান। মেজর জিয়ার ঘোযণা দেশে বিদেশে সবাই শুনেছে। সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। মেজর জিয়াই প্রথম কমান্ডিং ফোর্স গঠণ করেন মুক্তিযুদ্ধের জন্যে। জিয়ার আহবানের ভিত্তিতেই সারাদেশে বাংগালী সেনা অফিসার, সৈনিক, ইপিআর, পুলিশ, আনসার বাহিনী এক্যবদ্ধ হন। জিয়ার ঘোষণার দলিল দেশে বিদেশে সব আর্কাইভে আছে। পাকিস্তান ভারত আমেরিকা বৃটেন সবার কাছেই আছে। এতদিন পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ঘোষনা করলেই কেউ প্রধানমন্ত্রী হয়না। কথাটা মহাসত্য, ঘোষনা করলেই কেউ প্রধানমন্ত্রী হয়না। কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণা আর সংবাদ লিখন পঠন ঘোষণ আর স্বাধীনতার ঘোষণা বা ডিক্লারেশন যে এক নয় তা বিঝতে প্রধানমন্ত্রী ভুল করেছেন। বংগবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁর পরিবারের সকল সদস্য ধানমন্ডিতে পাক সেনাবাহিনীর হোফাজতে তাদেরই ভরন পোষনে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই সে ঘোষণা শুনেছেন। মেজর জিয়াতো প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্যে স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। পরিবেশ পরিস্থিতি তাঁর দেশপ্রেমকে উদ্বু্দ্ধ করেছে ওই মহামূল্যবান ঘোষণাটি দিতে। এখন সেই ঘোষনাকে যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোকনা কেন। শেখ সাহেবেরতো প্রকাশ্যেই ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল। তিনি কাউকে নির্দেশ দিয়ে থাকলে তাঁরই সেই ঘোষণা দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের কোন নেতা ঘোষণা দেননি। বরং তাঁরা প্রাণ বাঁচাবার জন্যে পরিবার পরিজন নিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন। মেজর জিয়া ঘোষণা দিয়ে এখন অপরাধী হয়ে গেলেন। এখন আওয়ামী লীগের সব সমালোচনা জিয়ার বিরুদ্ধে। জানিনা, জিয়া নামটার প্রতি  আওয়ামী লীগের এত রাগ কেন। ৭১ সালে কিছুই করেনি এমন লোকও জিয়াকে গালাগাল করতে ছাড়েনা। কিন্তু জিয়ার নাম কি ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে?

Read Full Post »


সাপ্তাহিক হাকার্স ও আমাদের নুরুল করিম / এরশাদ মজুমদার

ফেণী জেলার সদর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক হকার্স এর প্রকাশনার ৩৬ বছরে পড়েছে বলে সম্পাদক নুরুল করিম মজুমদার জানিয়েছেন। এটা নি:সন্দেহে একটা বড় সুখবর। খুবই আনন্দের খবর। কাগজটা কেমন, ভাল কি মন্দ এ আলোচনায় আমি যাবোনা। জেলা সদরে কাগজ সম্পাদনা বা প্রকাশ করা খুবই কষ্টের বিষয় বলে আমি জানি। এক সময় আমি ফেণী থেকে সাপ্তাহিক ফসল প্রকাশ করেছিলাম। সুযোগ পেয়ে সে বিষয়েও আজ কিছু বলে নিতে চাই। ১৯৬১ সালে আমি পাকিস্তান অবজারভারে নবীশ অর্থনৈতিক রিপোর্টার হিসাবে যোগ দিই। তখন উপ মহাদেশের বিখ্যাত দার্শনিক সাংবাদিক আবদুস সালাম ছিলেন অবজারভারের সম্পাদক। মুসা সাহেব ছিলেন ডাকসাইটে বার্তা সম্পাদক। পরে অবজারভার ছেড়ে আমি সংবাদে যোগ দিই। তখন সংবাদের সম্পাদক ছিলেন জহুর হোসেন চৌধুরী সাহেব আর নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন শহীদুল্লাহ কায়সার সাহেব। আমার পোস্টিং ছিল চট্টগ্রামে। ৬৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত আমি চট্টগ্রামে ছিলাম। এ সময়ে আমার বাবা অস্থি ক্যানসারে ছিলেন। চাকুরী ছেড়ে ফেণী চলে এলাম রাজনীতি করবো বলে। সিদ্ধান্তটা ছিল এক ধরনের আবেগ তাড়িত। আমি তখন মাওলানা ভাসানীর রাজনীতিতে বিশ্বাস করতাম। সংবাদের চাকুরি করার সুবাদে মাওলানা সাহে্রের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল। এমন কি এক পর্যায়ে মাওলানা সাহেবের ব্যক্তিগত সহকারী হওয়ার কথাও হয়েছিল।

ফেণীতে ফিরে গিয়ে প্রথমে বাবার চিকিত্‍সা কাজে মনোনিবেশ করি। নরেন কাকা ছিলেন বাবার প্রধান চিকিত্‍সক। তিনিই অন্য ডাক্তারদের পরামর্শের জন্যে ডাকতেন। এক পর্যায়ে জানা গেল বাবার ‘সারকোমা’ হয়েছ। সারকোমা এক ধরনের ক্যান্সার। যা হাড়ের মজ্জাতে হয়। তখন এ রাগের চিকিত্‍সা ছিলনা বললেই চলে। চার বছর ক্যান্সারে ভুগে ১৯৬৮ সালের ৫ই মার্চ বাবা মারা যান। এর আগে ১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসে আমার মা মারা যান। ফেণীতে এসে আমি একটি সাপ্তাহিক কাগজের ডিক্লারেশনের জন্যে দরখাস্ত করি। প্রথম নাম দিয়েছিলাম ‘স্বদেশ’। সরকার থেকে জানানো হলো ওই নামে কাগজের ডিক্লারেশন আছে। বাধ্য হয়ে নতুন নাম দিতে হলো। নতুন নাম দিলাম ফসল। ভাবলাম আ কার ই কার বিহীন নাম দিলে সবাই উচ্চারন করতে পারবে। তাছাড়া কৃষক আন্দোলনের কাগজের নাম ফসল হওয়াই ভাল। দরখাস্ত করার আগে ফেণীর গোয়েন্দা বিভাগের একজন কর্মকর্তার সাথে আলাপ করে নিলাম। তিনি বললেন, আমি যেন নিজের নামে দরখাস্ত না করি। এমন কি মজুমদার বাড়ীর ঠিকানা না দিতে পরামর্শ দিলেন। গোয়েন্দা বিভাগের খাতায় আমার সুনাম ছিলনা। দরখাস্ত করেছিলাম আমার জেঠাত ভাই নুরুল ইসলাম মজুমদারের নামে। তবে মজুমদার পদবীটা বাদ দিয়েছিলাম গোয়েন্দা বন্ধুদের পরামর্শে।তখন আমাদের বাড়ীর ছাত্ররা সবাই ছাত্র ইউনিয়নের সাথে জড়িত ছিল। এটা ছিল বামপন্থী চিন্তাধারার একটি ছাত্র সংগঠন। সরকার এই সংগঠণটিকে সুনজরে দেখতোনা। তখন কারো হাতে সোভিয়েত দেশ বা পিকিং রিভিউ দেখলেই গোয়েন্দারা তাড়া করতো। তারা মনে করতো যারা এসব ম্যাগাজিন বা কাগজ পড়ে তারা কমিউনিস্ট। আসলে এটা ছিল তাদের একটা ভুল ধারনা।

সাপ্তাহিক ফসল প্রথম প্রকাশিত হলো ১৯৬৫ সালের ১৭ই মার্চ। দিনটি ছিল বুধবার। প্রথম মাস্টহেডটি কাঠের তৈরী। তৈরী করেছিল পঞ্চানন নামের এক ভদ্রলোক। তিনি পোস্টারের জন্যে কাঠের অক্ষর তৈরী করতেন। ফসলের প্রথম সংখ্যাটি ছাপা হয় দাওয়াখানা প্রেস থেকে। কিছুদিন পর আমি একটি ছাপাখানাও করেছিলাম। নাম ছিল সোনালী মুদ্রণ। একটি ট্রেডল মেশিন ও কিছু টাইপ ছিল। মাখন নামের এক ভদ্রলোক ফোরম্যান ছিলেন। কাগজ প্রকাশের ব্যাপারে আমাকে ফেণীর ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরা অকাতরে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছে। নাম উল্লেখ করতে হলে বহু নাম স্মরণ আনতে হবে। সুযোগ পেয়ে আজ আমি সবার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। ৬৪ সালের আগস্ট থেকে ৬৯ সালের মাঝ নাগাদ আমি ফেণীতে ছিলাম। তখন ফেণী থেকে বেশ কয়েকটা সাপ্তাহিক কাগজ প্রকাশিত হতো। এর মধ্যে শ্রদ্ধেয় খাজা সাহেবের আমার দেশ সবচেয়ে বেশী উল্লেখযোগ্য ছিল। ফসল আর আমার দেশ ছিল সরকার বিরোধী কাগজ। বাকি কাগজগুলো ছিল সুবিধাবাদী।

নুরুল করিম আমাদের বৃহত্‍ মজুমদার পরিবারের একজন নামকরা সদস্য। ছাত্র জীবনে সে প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। সাংবাদিকতার মাধ্যমে সে এখন এলাকা ও দেশের মানুষের সেবা করছে দেখে আমি খুবই আনন্দিত। দোয়া করি সে যেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত দেশবাসী ও এলাকার মানুষের সেবা করে যেতে পারে। করিমের বাবা মমতাজ উদ্দিন ছিলেন আমার জেঠাত ভাই। দাদার নাতিদের ভিতর তিনি ছিলেন সবার বড় এবং  প্রথম ম্যাট্রিকুলেট। আমার মেজ জ্যাঠা রজব আলী মজুমদার ছিলেন তাঁর বাবা। মেট্টিক পাশ করে তিনি বৃটিশ সেনাবাহিনীর সিভিল সেকশনে যোগ দিয়েছিলেন।বার্মা ফ্রন্টে কাজ করতেন। আমার আশা ছিল করিম আমাদের বাড়ির নেতৃত্ব দিবে। আমার সে আশা পুরণ হয়নি।
আমি ফেণীর সাংবাদিকতা জীবনের ইতি টেনে ঢাকা চলে এসেছি ১৯৬৯ সালে। লেখাপড়া করার জন্যে ঢাকা এসেছিলাম ১৯৫৮ সালে। তখন আইউবের সামরিক আইন জারী হয়েছে মাত্র। মাওলানা ভাসানী সহ রাজনৈতিক নেতারা প্রায় সবাই জেলখানায়। চারিদিকে ভয় ভয় পরিবেশ। ছাত্র আন্দোলন নেই। লেখালেখি নেই। ৫৮ থেকে ৬৪ পর্যন্ত ফেণীর বাইরে ছিলাম। আগেই বলেছি রাজনীতি করার জন্যে ৬৪ সালের শেষের দিকে ফেণী ফিরে গিয়েছিলাম। পাঁচ বছর ন্যাপ ও কৃষক সমিতির সাথে জড়িত ছিলাম। সে সময় সবচেয়ে বেশী সহযোগিতা পেয়েছি পথ পত্রিকার ওয়াদুদ ভাইয়ের কাছ থেকে।

১৯৬৬ সালে ফেণীতে মহকুমা হাকিম বা সাবডিভিশনাল অফিসার ছিলেন সাইফ উদ্দিন সাহেব। আর মহকুমা জন সংযোগ অফিসার ছিলেন রশীদ খান সাহেব। এই দুইজন অফিসারের আন্তরিক সহযোগিতায় ফেণী প্রেসক্লাব প্রতিস্ঠিত হয়। মূল ভূমিকা পালন করেছেন রশীদ খান সাহেব। তাঁরই পরামর্শে আমরা একটি কমিটি গঠন করি। সভাপতি মহকুমা হাকিম সাইফ উদ্দিন সাহেব। সাধারন সম্পাদক এসডিপিআরও রশীদ খান সাহেব। অবজারভার এর সংবাদদাতা নুরুল ইসলাম সাহেব ছিলেন সহ সভাপতি। আমি ছিলাম সহকারী সম্পাদক। আমিই সব কাজ করতাম। বলতে গেলে একাই সব কাজ করেছি। ক্লাবের অফিসের জন্যে ট্রান্ক রোডের ডা: দ্বারিকা এমবি’র পতিত্যক্ত দোতলা ভবনটি লীজ নেয়ার জন্যে দরখাস্ত করি। এই ভবনটি লীজ নেয়ার জন্যে তখন ফেণীর গণ্যমান্য অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু প্রেসক্লাবের নাম আসায় প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেননি কেউ। এ সময়ে সাইফ উদ্দিন সাহেবের শক্ত সহযোগিতা না হলে প্রেসক্লাব ভবনটি পেতামনা। রশীদ সাহেব ভিতরের ও বাইরের খবর আমাকে জানাতেন। আমি যেন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারি। সাইফ উদ্দিন সাহেব আমাকে জানালেন লীজের টাকার ব্যবস্থা করে রাখতে। চাইলেই যেন জমা দেয়া যায়। টাকার ব্যবস্থা করার জন্যে আমি কুন্ডেশ্বরীর সত্যবাবুর দ্বারস্থ হলাম। তিনি এক কথায় রাজী হয়ে গেলেন এবং তিন হাজার টাকা দান করেছিলেন যতদূর মনে পড়ে। যেদিন ভবনের দখল আমাদের বুঝিয়ে দেয়ার কথা সেদিন তহশীলদার ইচ্ছা করেই উপস্থিত হননি। একদিনও বিলম্ব করার মতো আইনী সুযোগ আমাদের হাতে ছিলনা। এটা ছিল তহশীলদারের একটা যড়যন্ত্র। আমি ও রশীদ খান সাহেব তহশীলদারের ছাগলনাইয়ার বাড়িতে যাই। আমি একা গেলে তহশীলদার আসতেন না। সেদিনই বিকেলের দিকে কাগজে কলমে আমরা ভবনের দখল বুঝে পাই। ফেণী প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় রশীদ খান সাহেবের অবদান আমি কোনদিনও ভুলবোনা। ফেনী প্রেসক্লাবের বর্তমান কর্মকর্তারা এসব জানেন কিনা জানিনা। জানার চেস্টাও কোনদিন করেছেন বলে হয়না। প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা লগ্নের অনেক খবর সাপ্তাহিক ফসলে ছাপা হয়েছে।তথ্যগুলো আমার স্মৃতি থেকে উল্লেখ করলাম। একদিন আমি থাকবোনা। তখন বর্ণিত তথ্যগুলোও থাকবেনা।ফেণী প্রেসক্লাবের বয়স ৪৯ বছর হতে চলেছে। রশীদ সাহেবের খবর কেউ নিয়েছেন কিনা জানিনা। আমাদের দেশের ইতিহাস গুলো এভাবেই হারিয়ে যায়। এক সময় ভুল মানুষ ভুল ইতিহাস তৈরী করে নিজেদের স্বার্থ কাজে লাগাবার চেস্টা করে। ক্লাবের প্রথম কমিটির নাম বর্তমান ক্লাব নেতাদের কাছে আছে কিনা জানিনা। আমার নাম কোথাও নাই তা জানতে পেরেছি। এতে আমার মনে কোন কষ্ট নেই।

এখনতো স্বাধীনতার মাস। এ মাসের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাংগালীদের উপর ঝাপিয়ে পড়েছিল। সে রাতে আমি অবজারভার হাউজে ছিলাম ৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনের ফলে বংগবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের একচ্ছত্র নেতা হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ২৬/২৭শে মার্চ আমরা কালুঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে অজানা মেজর জিয়ার কন্ঠ থেকে ইংরেজী ভাষায় স্বাধীনতার ঘোষণা শুনতে পাই। আমি নিজেও এ ঘোষণা শুনতে পেয়েছি। বহু বিখ্যাত মানুষ এ ঘোষণা শুনতে পেয়েছেন বলে লিখিত ভাবে বলে গেছেন। অথচ এ বিষয়টা নিয়ে আমাদের জাতি আজ বিভক্ত। এমন আরও বহু বিষয় আছে যা নিয়ে আমরা নিয়মিত অসত্য ও মিথ্যা বলে চলেছি। ফেণী প্রেসক্লাবের ইতিহাসও তেমনি এক টুকরো ঘটনা। সাপ্তাহিক হকার্সের ৩৪ বছরে পদার্পন উপলক্ষে আমি কাগজের প্রতিস্ঠাতা নুরুল করিম মজুমদার ও তার সহকর্মীদের অভিনন্দন জানাচ্ছি। কাগজটি টিকে থাকুক। নুরুল করিমের উচিত্‍ হবে হকার্সের ৩৪ বছরের ইতিহাস রক্ষা করা। প্রথম সংখ্যা থেকে  সবগুলো সংখ্যা সংরক্ষণ করা হয়েছে কিনা জানি। ন্যাশনাল আর্কাইভ ও জাতীয় পাঠাগারে  কিছু সংখ্যা সংরক্ষন করা যেতে পারে। কারণ এসব সংখ্যা এক সময় ইতিহাস ও গবেষণার উপাদান হিসাবে কাজে লাগবে।

ফেণীর অনেক গুলো কাগজ আমি ডাক মারফত পেয়ে থাকি। তাই আমি ফেণীর খবর মোটামুটি নিয়মিত পেয়ে থাকি। কাগজ পড়ে মনে হলো স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কাগজগুলোর সম্পর্ক খুবই ভাল। প্রায়ই দেখি ডিসি এসপি সাহেবরা বিভিন্ন অনুস্ঠানে প্রধান অতিথি হচ্ছেন। প্রশাসন ও সংবাদপত্র মিলে মিশে একসাথে সহ অবস্থান করছে। আমাদের সময় এমন অবস্থা ছিলা। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন  আমাদের প্রতিপক্ষ মনে করতো। যেন আমরা দেশকে ভালবাসিনা। সুযোগ পেয়ে আমি আমার নিজের কথা অনেক বলে ফেলেছি। আরও অনেক কথা স্মৃতিতে জমা হয়ে রইলো। কখনও সময় সুযোগ হলে সে সব কথা অন্য সময়ে অন্য কোথাও বলবো। শুনেছি, আমার ভাতিজা একজন নামকরা সত্‍ মানুষ। সাংবাদিকতা পেশায় আসাতে আমি বিশেষ ভাবে খুশী। আমার আরেক ভাতিজা সাহাবুদ্দিন ও সাংবাদিকতায় ছিল। তাঁর অকাল মৃত্যুতে আমি গভীর ভাবে শোক প্রকাশ করছি।
লেখক: কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
ershadmz@gmail.com

Read Full Post »


কয়েকদিন থেকেই ভাবছি পুলিশ নিয়ে কিছু লিখবো। কেন এই ভাবনা মাথায় এলো তা খোলাসা করে বলতে পারবোনা। আধুনিক রাস্ট্র ব্যবস্থায় পুলিশের চাহিদা ও প্রয়োজনীতা কতটুকু তা নিয়ে লম্বা আলোচনা হতে পারে। রাস্ট্র কি পুলিশ ব্যবস্থা ছাড়া  চলতে পারবে ? এ প্রশ্নের উত্তর আমি নিজেই দিচ্ছি। হাজার বছর আগে রাজা বাদশার আমল থেকেই পুলিশ বা কোতোয়াল ব্যবস্থা চালু রয়েছে।  এখানে সেখানে জগতের সবখানে কিছু মানুষ সব সময়  অপরাধ প্রবন থাকে। আর কিছু মানুষ সুযোগ পেলে  অপরাধ করতে চায় বা করে থাকে। সমাজকে একটা শৃংখলার ভিতর রাখার জন্যে বা সিভিল প্রশাসনকে দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করার জন্যে পুলিশ প্রশাসন তৈরী করা হয়েছে। বাংলাদেশে আমরা সেই ধারাবাহিকতা থেকেই পুলিশ ব্যবস্থা পেয়েছি। সবচেয়ে নামী দামী আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশ বা রাস্ট্রে পুলিশ ব্যবস্থা আছে। আবার গরীব দেশেও পুলিশী ব্যবস্থা আছে। বাংলাদেশে বেশীর ভাগ মানুষ নিরক্ষর ও গরীব। জীবিকার বিষয় ছাড়া অন্য বিষয়ে তেমন কিচুই জানেনা।

এইতো ১৬ ই আগস্ট বেলা তিনটার দিকে আমার গাড়ি পান্থপথ দিয়ে সোনারগাঁর দিকে এগোচ্ছিলো। হঠাত মনে হলো এস এস স্টীল ভবনে আমার এক আত্মীয়ের অফিস ঘুরে যাই। রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম। প্রচুর ট্রাফিক সার্জেন্ট নিস্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আমি গাড়ি থেকে নেমে ববনের দিকে চলে গেলাম। কিছুক্ষনের মধ্যেই আমার ড্রাইভার ফোন করলো গাড়ি আটক করেছে পুলিশ। আমি নীচে দেখলাম ট্রাফিক জ্যাম আরও বেড়ে গেছে। প্রায় নিয়ন্ত্রনের বাইরে। এ ধরনের জ্যাম বেশ কয়েকদিন যাবত চলছিলো। জ্যামের খবর নিয়মিত মিডিয়াতে প্রকাশ করা হচ্ছে। দেখলাম কয়েকজন ট্রাফিক সার্জেন্ট  রাস্তার পাশে প্রায় থেমে থাকা গাড়িগুলোকে  ট্রাফিক আইন ভংগ করার অভিযোগে ও অপরাধে ফাইন করছে। দেখলাম সার্জেন্ট সাহেবরা রেকার নিয়ে এসেছেন এবং বলছেন রেকার খরচ বাবত ১২০০টাকা জরিমানা দিতে হবে প্রতি গাড়িতে। রাস্টার পাশে স্থবির  গাড়িগুলো থেকে  ১২০০ টাকা করে আদায় করে রিসিট দিচ্ছেন। অনেকে এসেছেন স্কয়ার হাসপাতালে। আমি আমার পরিচয় দিয়ে বললাম, গাড়িটা এখানে দাঁড়িয়ে পড়েছে জ্যামের কারনে এবং রাস্তার ওপারে পার অপেক্ষায়। সার্জেন্ট সাহেবরা শুনলেন না। সবার বিচার করলেন এবং দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানা করলেন। একজন সুদর্শন  সার্জেন্ট জানালেন স্যার আমাদের কিছু করার নেই উপরের হুকুম। আমি বললাম আপনাদের এই কাজের ফলে ট্রাফিক জ্যামতো আরও বেড়ে গেল। রাজার মাসে ঈদের আগে এ কাজটা না করলেও পারতেন। তাঁরা আমার ছবি তুললেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বললেন, ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই, জরিমানা দিয়ে চলে যান। দিনকাল ভাল না। ওরা আপনার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে দিবে।  আমি জরিমানা দিলাম। কিন্তু অরিজিনাল রিসিট চাইলাম। তাঁরা আমাকে একটা কার্বন কপি দিতে চাইলেন। আমি রাজী হলাম না। বললাম অরিজিনালের ফটোকপি দিন। এক পর্যায়ে তাঁরা আমার গাড়িতে রেকারের চেইনটা লাগিয়ে ছবি তুললেন। জানিনা ওই চেইন লাগানের মর্মটা কি। তখন পান্থপথে প্রচন্ড ট্রাফিক জ্যাম। অপরদিকে সার্জেন্ট সাহেবরা সরকারের জন্যে রাজস্ব আদায়ে ব্যস্ত ছিলেন। রেকারের ড্রাইভার বলে পরিচয়দানকারী লোটার ব্যবহার তেমন ভাল ছিলনা। তাঁর কোন পোষাক ছিলনা। এক পর্যায়ে ড্রাইভার সাহেব বললেন, স্যার জিডি করে দিন। তার মানে কি আমি বুঝতে পারিনি। প্রায় ঘন্টা খানেক ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হয়ে ও মনোকস্ট নিয়ে বাসায় ফিরলাম। বার বার মনে হচ্ছিল আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনা , ট্রাফিক আইন ও পুলিশ সার্জেন্টদের আচার আচরনের কথা। মনে পড়লো আমার নাগরিক অধিকারের কথা। সাথে সাথে মনে পড়লো মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড, মিজান সাহেবের কথা। মিজান সাহেব এখন স্পস্ট কথাবার্তার জন্যে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন, রাস্তায় একজন পুলিশ কনস্টেবলের যে ক্ষমতা তা একজন নাগরিকের নাই। পুলিশ যে কোন সময়ে একজন নাগরিকের পাছায় লাঠির বাড়ি মারতে পারবে। কিন্তু নাগরিক কখনই তাঁর গায়ে দিতে পারবেনা। যদি কেউ হাত দেয় তাহলে সে রাস্ট্রের গায়ে হাত দিবে। এই আইন মোঘল আমলে ছিল এখনও আছে। কোন সরকারই এই আইন বদলাতে চায়না। এ ধরনের আরও বহু নাগরিক নিবর্তনের আইন জারী রয়েছে।

বাংলাদেশে এমন অনেক বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা আছেন আছেন যারা বৃটিশ ও পাকিস্তান শাসন কাল দেখেছেন। বয়স্ক এই সব নাগরিকের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ছাড়া অন্যকোন অভিজ্ঞতা নেই। তাঁরা জানেন না রাস্ট্র দেশ বা শাসন ব্যবস্থা কি। নাগরিক অধিকার কি তাও তাঁরা জানেন না। বেশ কয়েকজন বললেন, রাজা বাদশারা দেশ চালাবেন, আমরা গরীব প্রজারা অতকিছু জেনে কি করবো। আমরা দুবেলা খেতে পেলেই খুশী। ইংরাজ আমলেতো আমাদের ভোটাধিকার ছিলনা। চৌকিদারী ট্যাক্স যারা দিতো তারাই ভোট দিতে পারতো। পাকিস্তান হওয়ার পর শুনলাম গরীবেরাও ভোট দিতে পারবে। সাহেব বাবুরা ভোট দাঁড়াতেন। আমরা ভোট দিতে পেরেই  খুশী থাকতাম। কাকে ভোট দিতে হবে তাও সমাজের মান্য গণ্যরা বলে দিতেন। শুনি এখন নাকি দেশ স্বাধীন হয়েছে। বৃটিশ আর পাকিস্তান নাই। আমাদের দেশের নেতারাই নাকি দেশ চালায়। চৌধুরী ভুঁইয়াদের নাম শুনতে পাইনা। এখন নাকি যে কোন লোক ভোটে দাঁড়াতে পারে ও ভোট দিতে পারে। তবে ভোটে দাঁড়াতে নাকি অনেক টাকার মালিক হতে হয়। টাকা না থাকলে গরীবেরা ভোটে দাঁড়াবে কি করে? আমদের বাপ দাদারা গরীব ছিলেন,আমরাও গরীব আছি। টাকার যভাবে ছেলে মেয়েদের লেখাপরা করাতে পারিনা। সামান্য লেখাপড়া করলেও চাকুরী পায়না। মেয়ে বিয়ে দিতে যৌতুক লাগে। আগে যৌতুক লাগতোনা। হিন্দুদের ভিতর যৌতুক চালু ছিল। এটা নাকি হিন্দু ধর্মের নিয়ম। মুসলমানদের ভিতর যৌতুক ছিলনা। এখন গ্রামে যোলআনা ঘরেই যৌতুক। যৌতুকের কারনে শত শত গরীবের মেয়ে আত্মহত্যা করে। স্বামীর অত্যাচার সহ্য করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এসব অত্যাচার বেড়ে গেছে। আমরাতো দলবেঁধে সবাই মিলে শেখ সাহেবকে ভোট দিয়েছি। দেশ স্বাধীন হয়ে ৪০ বছর পার হতে চলেছে। গরীবের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয় নাই। এসবতো হলো দেশের গরীব সাধারন মানুষের ভাবনা।

১৮৬১ সালে বৃটিশ সরকার পুলিশ প্রতিস্ঠা করে। যেই আইনে পুলিশ প্রতিস্ঠা হয়েছে সেই আইন কম বেশী এখনও জারী আছে। তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি।বৃটিশরা পুলিশ ব্যবস্থা চালু করেছিল সাধারন মানুষকে ভয় দেখিয়ে শাসন করার জন্যে। গ্রামে বা ইউনিয়ন বোর্ডে চৌকিদার পুলিশের ক্ষমতা করতে পারতো। চোর ধরার নামে চৌকিদার যেকোন লোককে কোমরে রশি বেঁধে থানায় নিয়ে আসতে পারতো। চৌকিদারের সে ক্ষমতা ছিল। গ্রামে এখনও চৌকিদার দফাদার জমাদার চাপরাশী বাড়ি দেখা যায়। ওই পদগুলো তখন গ্রামবাসীর কাছে প্রভাবশালী পদ ছিল। তখন নাগরিক অধিকার বলে কিছুই ছিলনা।নাগরিকরা ছিল প্রজা। এখনও নাগরিক অধিকার কাগজে কলমে সামান্য কিছু থাকলেো বাস্তবে কার্যত: তেমন কোন অধিকার নেই। কারন আমাদের রাস্ট্র সব সময় নাগরিক অধিকারকে ভয় করে। সে জন্যই নাগরিকদের ভয় দেখিয়ে আসন করতে চায়। সে জন্যে পুলিশ রেব আনসার গেয়েন্দা সহ নানা বাহিনী দিয়ে জনগণকে পাহারা দিতে হয়। রাস্ট্র মনেই করে জনগণের অধিকার বেশী থাকলে যেকোন সময় তারা বেঁকে বসতে পারে। এক সময়, মানে বৃটিশ আমলে সমাজের উপরতলার মানুষেরা ভাবতেন সাধারন মানুষ পড়ালেখা করে কি করবে। তারা চাষাবাদ করবে,ফায় ফরমায়েশ শুনবে। ফলে সে সময়ে ৯৯ ভাগ মানুষই নিরক্ষর ছিলেন। তারা সমাজের সাহেব বাবুদের কথামত চলতো। ভারতের শূদ্রদের অবস্থা এখনও এ রকম। ধর্মীয় কারণেই তাদের কোন অধিকার নেই। ভারতের সমবিধান কাগজে কলমে শূদ্র হরিজন অচ্যুতদের অধিকার স্বীকার করলেও বাস্তবে তাদের কোন অধিকার নেই।

আমেরিকার সংবিধান আমাদের মতো এত বড় নয়। রাস্ট্রের মূলকথা গুলো সেখানে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। রাস্ট্রের ক্ষমতা কি তা নিয়ে বিশদ বর্ণনা আছে। এই সংবিধান তৈরী করে তখনকার নেতারা ভাবলেন, জনগণের ক্ষমতা কি হবে? সব ক্ষমতাতো রাস্ট্রের কাছে চলে গেছে। এ রাস্ট্রতো কালক্রমে মানুষ খোকো দানবে পরিণত হবে। তাই রাস্ট্র থেকে নাগরিকদের রক্ষা করার ব্যবস্থা করলেন। আলাদা ভাবে তৈরী করলেন, চার্টার অব সিইজেনস রাইট। এই চার্টার ছিল জনগণের রক্ষা কবচ। আমাদের জনগণ বা নাগরিকদের রাস্ট্র থেকে রক্ষা করার জন্যে তেমন কোন রক্ষা কবচ নেই। বরং আছে নাগরিকদের কঠোরভাবে দমনের ব্যবস্থা। চলমান পুলিশ আইনে নাগরিকের চেয়ে পুলিশের ক্ষমতা অনেক বেশী। পুলিশ যে কোন সময় যে কোন নাগরিককে কোমরে রশি লাগিয়ে ধরে নিয়ে যেতে পারে। এর বিরুদ্ধে নাগরিকের কিছুই করার নেই। সোজা কথায় বলা যেতে পারে পুলিশ যে কোন নাগরিককে হেনস্থা করার আইনী করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু পুলিশের বিরুদ্ধে নাগরিকের কিছুই করার আইগত ক্ষমতা নেই। এ প্রশ্নে কেউ কেউ আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। বলুনতো পুলিশের বিরুদ্ধে আমাদের দেশে কয়টা মামলা হয়? আমিতো দেখিনা কোন মামলা হতে। পুলিশের আইজি সাহেব বা কমিশনার সাহেব বলবেন, প্রতি বছর কয়েক শত পুলিশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়।হয়ত তা করা হয়। কিন্তু জনগণ তা জানেনা। অথবা শাস্তিমূলক বাবস্থা নেয়া হলেও তাতে পুলিশের ইমেজ সংকট এখনও রয়ে গেছে। পুলিশ ঘুষ খায় এটা আর এখন কোন খবর নয়। পুলিশ নাগরিকদের উপর অত্যাচার করে তাও খবর নয়। জনগন মনে করে এটাই নিয়ম বা রেওয়াজ। বৃটিশ পাকিস্তান আমলেও নাগরিক হেনস্থা বলবত্‍ ছিল। তাই এটা কোন নতুন বিষয় নয়। সামাজিক জীবনে নিরাপত্তা বিধান বা শৃংখলা বজায় রাখার জন্যেই পুলিশ আইন মোতাবেক নাগরিকদের উপর হামলা করে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের বক্তব্য হচ্ছে তারা সরকারের নির্দেশে এসব নিবর্তন মূলক ব্যবস্থা গ্রহন করে থাকেন। আমরা দেখেছি, পুলিশ রাস্তায় হোম মিনিস্টারদের লাঠিপেটা করছে। মিথ্যা ও সাজানো মামলা দিয়ে মান্যগণ্য ব্যক্তিদের গ্রেফতার করে পুলিশ ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। বাসে আগুন দেয়ার অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী ও সচিবকে গ্রেফতার করে কোর্টে চালান দেয়া হয়। যেমন, সকল সমালোচনা ও বিরোধিতা সত্বেও পুলিশী আইন ৫৪ ধারা আর স্পেশাল পাওয়ার এ্যাক্ট জারী রয়েছে। পুলিশ সুযোগ মতো এই আইন গুলো যখন তখন ব্যবহার করে।

১/১১র সেনা সমর্থক কেয়ারটেকার সরকারের আমলে পুলিশের তত্‍কালীন আইজি প্রায় প্রতিদিনই বলতেন,পুলিশ আইনের সংস্কার চাই। পুলিশকে কোন সরকার যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে না পারে সেজন্যে আইনের সংস্কার প্রয়োজন। এখনও সেকথা শুনা যায়। পুলিশ নেতা বা বড় সাহেবরা মাঝে মধ্যে সংস্কারের কথা বলছেন। তাঁরা কি ধরনের সংস্কার চাচ্ছেন তা জনগণ এখনও ভাল করে জানেনা। কেউ কেউ বলছেন পুলিশকে রাস্ট্রের সেবক করতে হবে, সরকারের সেবক নয়।  জনতার মঞ্চ আন্দোলনের সময় মখা আলমগীর সহ বেশ কিছু বড় আমলা বা সচিবরা বলেছিলেন, তাঁরা রাস্ট্রের সেবক। কারো গৃহভৃত্য নন। আকবর আলী খান সাহেব সহ ১৯ জন সচিব রাস্ট্রপরির সাথে দেখা করেছিলেন স্বাধীন আমলাতন্ত্রের জন্যে। প্রেসক্লাবের সামনে স্থাপিত জনতার মঞ্চে অংশ নিয়েছিলেন বেশ কিছু আমলা। জনগণ কিন্তু আজও বুঝতে পারেনি রাস্ট্র সরকার ও জনগণের অবস্থান কোথায়? রাস্ট্র বা সরকার কার জন্যে। সবাই নাকি রাস্ট্রের সেবক/কর্মচারী। সরকারের কর্মচারী নয়। এতদিন  জেনে  এসেছি জনগণই সকল ক্ষমতার উত্‍স। জনগণই রাস্ট্রের মালিক। তাহলে সেবক আর মালিকের সম্পর্ক কেমন? আমার ৫০ বছরের সাংবাদিকতার জীবনে আমি দেখে এসেছি সেবকরা কথায় কথায় মালিকের কোমরে রশি লাগায়। থানায় নিয়ে ধোলাই দেয়। অশ্লীল ভাষায় মেহমানদারী করে। আমি নিজেও জীবনে বহুবার হাজতে গিয়েছি। জেলা বা মহকুমা পর্যায়ের আমলাদের সাথে বনিবনা হয়নি বলে আমাকে গরুচুরির আসামী করে কোর্টে চালান দেয়া হয়েছিল। আরেকবার জুমাতুল বিদা’র ছুটির দিন সকালবেলা গ্রেফতার করে কোর্টে চালান দেয়া হয়েছিল। খুবই ছিন্তিত ছিলাম। ছুটিরদিন জামিন পাবো কেমন করে। পুলিশ অফিসার জানালেন বিশেষ ব্যবস্থায় আদালত খোলা রাখা হয়েছে। সেদিন নামজাদা আরও কয়েকজন সাংবাদিককেও গ্রেফতার করা হয়েছিল। ইফতারের আধঘন্টা আগে জামিনে ছাড়া পেয়েছিলাম। বাসায় বাসায় পৌঁছাতে ইফতারের সময় হয়ে গিয়েছিল। আমার বেগম সাহেবা বিষয়টা জানতেন না। আমিও বলিনি। পরে খবরের কাগজ পড়ে জানতে পেরেছিলেন। প্রসংগক্রমে ব্যক্তিগত বিষয়টি উল্লেখ করলাম।

ক’দিন আগে প্রেসক্লাবের এক আড্ডায় এক বন্ধু জানালেন, রাস্ট্রের অসীম ক্ষমতা। জনগণের নেতারাই রাস্ট্র নামক অদৃশ্য বস্তুকে নাগরিক বা জনগণকে পীড়নের জন্যে অসীম ক্ষমতা দিয়েছে। নেতারা সবকিছুই ভেবেছেন রাজা মহারাজা বাদশাহদের ক্ষমতার আদলে। পুরোণো বুড়িয়ে যাওয়া গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ফিরে পাওয়ার জন্যে মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ লড়াই করছে, প্রাণ দিচ্ছে। ওসব দেশে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীরা বাদশাহর জীবন যাপন করেন। নির্বাচনের নাম করে একেক জন ৩০/৪০ বছর ক্ষমতায় আছেন। এরা থাকেন পুরোণো বাদশাহদের প্যালেস বা রাজপ্রাসাদে। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেও রাজা আছেন রাজার হালতে। দেশ চলে গণতন্রের নামে। ইউরোপেও রাজারা আছেন। আমাদের দেশেও প্রধানমন্ত্রী ও রাস্ট্রপতি রাজা বাদশাহদের সিলসিলাহ রেওয়াজ বা প্রটোকল অনুসরন করে জীবন যাপন করেন। নাগরিকরাও নিজেদের প্রজার মতো মনে করেন। বংগভবন,এখন যেখানে রাস্ট্রপতি থাকেন,সেখানে এক সময় ছোটলাট,গভর্ণর ও নবাব সাহেবরা থাকতেন। এখন জনগণের রাস্ট্রপতি থাকতেন। আমাদের মহিলা প্রধানমন্ত্রীরাও থাকেন মহারাণী বা রাণীর প্রটোকল মোতাবেক। রাস্ট্রের  এইসব ব্যবস্থা বা প্রথাকে জারী বা বহাল রাখার জন্যে সরকারকে বছরের খরচ মিটাবার জন্যে এক লক্ষ তিরিশ হাজার কোটি টাকার বাজেট বানাতে হয়। এই বাজেট থেকে সরকারী কর্মচারী বা রাস্ট্রের সেবকদের বেতনের জন্যে ব্যয় করতে হয় প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার মতো। বাকী টাকা থেকে উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের জন্যে রাখতে হয় ৩০/৩৫ হাজার কোটি টাকা। মানে হলো ৩০ হাজার কোটি টকার উন্নয়ন কর্ম দেখাশুনার জন্যে কর্মচারীদের বেতন দিতে হয় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এটা হচ্ছে এক পান দোকানদারের হিসাবের মতো। দেকানদার সারাদিন নিজের পান দোকান থেকে পান বিড়ি সিগারেট ও নাস্তার জন্যে একশ’টাকা খায়। দিনের শেষে তার লাভ হয় একশ’ টাকা। এবার আপনারাই বুঝে নিন ওই পান দোকানদারের অবস্থা কি? ৪০ বছরে একশ’টাকার মানুষ ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছে সরকার ও রাস্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করে। কিন্তু একজন কৃষক বা শ্রমিকের সামাজিক ও আর্থিক মর্যাদা তেমন বৃদ্ধি হয়নি। পাকিস্তানের ২৩ বছর আর বাংলাদেশের ৪০ বছর মিলিয়ে ৬৩ বছরে এই দেশ থেকে দারিদ্র ও অশিক্ষা বা নিরক্ষরতা দূর হয়নি। কিন্তু রাস্ট্রের সেবক বা কর্মচারীদের সুযোগ সুবিধা বছর বছর বেড়েই চলেছে। যে সময়ে এই কলাম লিখছি তখন নড়াইলে এক কৃষক সীমাহীন অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে নিজের জমিতেই মরে পড়েছিল। সারারাত কাঁদামাখা জমিতেই উপুড় হয়ে পড়েছিল।আর এই কৃষকরাই দেশের জন্যে তিন কোটি খাদ্য উত্‍পাদন করে।

প্রসংগ ছিল দেশের পুলিশি ব্যাবস্থা নিয়ে। আমরা শুনি পুলিশ নাকি জনগণের বন্ধু। মাঝে মাঝে রাস্তায় পোস্টার দেখি পুলিশ জনগণের বন্ধু। কিন্তু জনগণের মতামত নিয়ে দেখুন পুলিশ সম্পর্কে তাঁরা কি বলেন। পৃথিবীর সবদেশেই পুলিশ আছ। পশ্চিমা দেশগুলোতে পুলিশ রাস্তায় মানুষের গায়ে হাত তোলেনা। মিথ্যা মামলায় যেকোন সময়ে যেকোন নাগরিককে গ্রেফতার করেনা। অথচ আমাদের পুলিশ আরও বেশী ক্ষমতার জন্যে আন্দোলন করছে। সন্ত্রাসী মাস্তান সমাজ বিরোধীদের কাছে নাকি অত্যাধুনিক অস্ত্র আছে। তাদের মোকাবিলা করার জন্যে নাকি পুলিশেরও অত্যাধুনিক অস্ত্র দরকার। আমাদের পুলিশ বন্দী অবস্থায় মানুষ পিটায়। ফলে কেউ কেউ মারা যায়। কিন্তু বলা হয় হৃদরোগে মারা গেছে। আমাদের রেব ক্রসফায়ারে লোক মারে। বলা হয় গোত্র কোন্দলে মারা গেছে। অথবা রেবের উপর আক্রমন কালে ক্রসফায়ারে মারা গেছে। রেবের অত্যাচার সম্পর্কে ইতোমধ্যেই বিদেশী কাগজে ব্যাপক লেখালেখি হয়েছে। আমার বক্তব্য হলো রেব বা পুলিশ আমাদরই সন্তান। এরা হয়ত সবাই ভাল। প্রশ্ন হলো রাস্ট্র তাদের কিভাবে ব্যবহার করতে চায়।নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাইতো পুলিশ ও রেবকে ব্যবহার করছে। তাই মনে করি পুরোণো ঘুনেধরা মান্দাতা আমলের পুলিশ প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো দরকার। পুলিশ কিন্তু এখন দেশের নাগরিকদের চেয়ে অনেক বেশী ক্ষমতাবান।( নয়া দিগন্ত, ১লা মার্চ, ২০১১, আমার দেশ ৩রা সেপ্টেম্বর, ২০১১)

লেখক : কবি সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিক

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »


ক’দিন আগে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রয়োজনে উন্নয়ন কর্মসূচী বন্ধ রেখে খাদ্য আমদানী করা হবে। চালের বাজার টালমাটাল দেখে হয়ত প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেছেন। একজন রাজনীতিক হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য হয়ত সঠিক। কারন রাজনীতিকদের জনতার মন ও ভাব বুঝে কথা বলতে হয়। পপুলিস্ট বা জনপ্রিয়তা কাংগাল রাজনীতিকরা সাধারনত এ ধরনের কথা বলে কিচুক্ষণের জন্যে হলেও জন সাধারনকে শান্ত রাখতে চান। কিন্তু একজন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তাঁর এ কথা বলা ঠিক হয়নি। উন্নয়ন মানে বিনিয়োগ। বিনিয়োগ বন্ধ মানে কর্মহীনতা। কর্মহীন বা বেকার মানুষের হাতে কোন টাকা পয়সা থাকেনা। বাজারে চাল থাকলেও মানুষের কেনার ক্ষমতা থাকবেনা। আমাদের দেশে নিকট দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়েছে ১৯৭৪ সালে। বাজারে চাল ছিলনা এ কথা বলা যাবেনা। সে সময়ে সারা দেশেই দুর্ভিক্ষ অনুভুত হয়েছে। তবে যে এলাকায় মানুষ অর্থের অভাবে খাদ্য কিনতে পারেনি তা হলো বৃহত্তর রংপুর জেলা। সেখানে মানুষের হাতে কাজও ছিলনা টাকাও ছিলনা। যাতায়াত বা যোগাযোগ সমস্যার কারনে সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় খাদ্য পাঠানো যায়নি। অথবা স্থানীয় ভাবে সরকারী বা বেসরকারী গুদামে খাদ্য ছিলনা। সে সময়ে রাজধানীতেও আমরা এখানে সেখানে মানুষের লাশ দেখেছি। মৃত মানুষগুলো রাজধানী এসেছিল খাদ্যের আশায়। দুর্ভিক্ষের সময় মধ্যবিত্তরা সবচেয়ে বেশী ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। কারন তাদের আর্থিক টানাপোড়ন সব সময় থাকে। তাদের কাছে তেমন উদ্বৃত্ত জমা থাকেনা। যারা চাকুরীজীবী তাদেরও চিন্তার শেষ থাকেনা। সীমিত আয় দিয়ে উচ্চ মূল্যের বাজারে সংসার চালানো।

সোজা কথা হলো হাতে টাকা থাকলে চালের দাম যাই হোকনা কেন তাতে কিছু আসে যায়না। ৭৪ সালে সরকার গ্রাম বা পল্লী অঞ্চলে মানুষের জন্যে কোন কাজের ব্যবস্থা করতে পারেনি। অপরদিকে খাদ্যের দাম শ্রমিক কৃষক দিন মজুরের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছিল।অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অমর্ত সেন বলেছেন, গণতন্ত্র শুধু ভোটের বিষয় নয়। এটা দেখা ও অনুভব করার বিষয়। একজন গরীব লোক ভোট দেয়, কিন্তু এর ফল কি তা জানেনা। এর সাথে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও অপরিহার্য। সংবাদপত্র সবকিছু খোলাসা করে বলতে না পারলে সরকার কিভাবে জানবে দেশের কোথায় কি হচ্ছে। তার সাথে প্রয়োজন দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা। এসব না থাকলে গুদামে খাদ্য থাকলেও দুর্ভিক্ষ রোধ করা যায়না। সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনা বা নজরদারী কোন ধরনের সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। বাণিজ্যমন্ত্রী একজন সাবেক সেনাকর্তা। তাঁর হিসাব সোজা। হ্যান্ডস আপ,কথা শোন, না হলো গুলি করে দেবো। তিনি ইতোমধ্যে অনেক কথা বলেছেন। কিন্তু ফল কিছুই হয়নি। বরং বেশী বেশী অপ্রয়োজনীয় কথায় সরকারের ইমেজ নস্ট হয়েছে। লোকে ঠাট্টা করে বলে তিনি কথা বললেই জিনিষের দাম বেড়ে যায়। অর্থনীতির প্রথম কথাই হলো ডিমান্ড এন্ড সাপ্লাই( চাহিদা ও সরবরাহ)। মাঝখানে থাকে উত্‍পাদনকারী, পাইকার, দালাল, ফটকা বাজারী ও মজুতদার। সরবরাহ আর যোগাযোগ ব্যবস্থার মাঝখানে এসে ঢুকেছে মাস্তান চাঁদাবাজ পুলিশ। ধরুন, একটি চালের ট্রাক দিনাজপুর থেকে ঢাকা রওয়ানা হলো। ট্রাকটি যদি সোজা ঢাকার আড়ত বা গুদামে হাজির হতো তাহলে দশ থেকে পনর হাজার টাকা খরচ কমে যেতো। কিন্তু সোজাতো আর আসতে পারেনা। এছাড়া বাজারকে মন্দভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে এক ধরনের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী থাকে। গুদামজাত করে দাম বাড়িয়ে বাজারে মাল ছাড়ে। এতে তারা কোটি কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নেয়। শেয়ার বাজারের দিকে তাকিয়ে দেখুন,ওখানে কি ঘটছে। চালের বাজারে যেমন চাল পাওয়া যায়, তেমনি শেয়ার বাজারে শেয়ার পাওয়া যায়। বাড়তি দামের বাজারে আজ চাল কিনে কাল বিক্রি করলে লাভ থাকবেই। শেয়ার বাজারেও তাই ঘটছে। বাজারের উঠানামা নিয়ন্ত্রন করে বড় ভর ব্যবসায়ীরা। তারা কম দামে দলবেধে শেয়ার কিনে দাম বাড়ায়। দাম তুংগে তুলে একসাথে সব শেয়ার বাজারে ছাড়তে থাকে। তখন  ভাটার পানির মতো দাম পড়তে থাকে। মারা পড়ে ছোট ছোট শেয়ার সওদাগরেরা। ৭৪ সালের একটি কথা এখানে না বলে পারছিনা। হঠাত্‍ করে বাজারে লবনের দাম বেড়ে গেল। ২৫/৫০ পয়সার লবন ষোল টাকা হয়ে গেল কিছু বুঝতে না বুঝতেই। ঠিক ওই সময়ে একদিন সকাল বেলা  আমি গিয়েছিলাম সুগন্ধায়  বংগবন্ধুর সাথে দেখা করতে। চারিদিকে কথা উঠেছে বংগবন্ধু ওআইসি সম্মেলনে অংশ গ্রহণের জন্যে পাকিস্তান যাবেন। বংগবন্ধুকে নিয়ে যাবার জন্যে ওআইসির কয়েকজন নেতাও তখন ঢাকায়। কিন্তু ভারত বোধ হয় বিষয়টা পছন্দ করছিলনা। কিন্তু বংবন্ধু যাবেনই। ভারতের বিরোধিতা তাঁকে ক্ষুব্দ করেছে। আমি তখন জনপদের চীফ রিপোর্টার হিসাবে কাজ করছি। আমাকে দেখেই বংগবন্ধু বললেন, এখানে কোন খবর নেই। উনি বুঝতে পেরেছিলেন আমি কেন গিয়েছিলাম। আমাকে চা খেতে ডাকলেন। চা খেতে খেতেই বললাম বাজারে লবনের দাম বেড়েছে। তিনি তাঁর স্বভাব সুলভ ভাষা ও ভংগিতে বললেন, তোরা লিখেইতো সবকিছুর দাম বাড়িয়ে দিস। আমি আর কথা বাড়ালাম না। সুগন্ধা থেকে ফিরে ক্লাবে গেলাম। সেখান থেকে জনপদ অফিসে গেলাম। বেলা ১১টার দিকে তোয়াব ভাই ফোন করলেন। বললেন, আমি যেন খুব জলদি তাঁর ওখানে যাই। তাড়াহুড়ো করে গেলাম। ইতোমধ্যে লবনের দাম বাড়ার খবর অফিসিয়াল চ্যানেলে বংগবন্ধুর কানেও গিয়েছে। তিনি আমাকে জিগ্যেস করলেন, লবনের দাম খবরটা আমি কখন পেয়েছি বা জানলাম কি করে। পুরো বিষয়টা আমি তাঁকে বুঝিয়ে বলি। ঠিক একই সময়ে চালের দামও বাড়তে শুরু করেছিল। এর পরেই চাল ও লবনের মজুতদার আমানউল্লাহ গ্রেফতার হয়েছিলেন। এখন মজুতদাররা অনেক সজাগ এবং শক্তিশালী। তাদের সাথে সরকারের উপর মহলের সাথে সমঝোতা খুব শক্তিশালী। ফলে বাণিজ্য মন্ত্রী যত কথাই বলুন না কেন তাতে কিছুই আসে যায়না। সোজা কথায় বলা যায় সরকার বাজার ব্যবস্থাপনায় একেবারেই ব্যর্থ। টিসিবি বাজারে এসেও তেমন কোন ফল বয়ে আনতে পারেনি। আরও শুনতে পাচ্ছি ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানী বন্ধ করে দিয়েছে। সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনার উপর তারা আস্থা রাখতে পারছেনা। বংগবন্ধুর আমলেও বাজারে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। তখন ছিল সমাজতান্ত্রিক বাজার ব্যবস্থা। সকল আমদানীই ছিল সরকারের নিয়ন্ত্রনে। টিসিবি ছিল প্রধান আমদানীকারক।

রাজনৈতিক আদর্শ ও চিন্তাধারার টানাপোড়েন , সুস্পস্ট উত্‍পাদন ও বিনিয়োগ নীতি না থাকার ফলে অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে আসে সে সময়ে। সরকার আনন্দে ছিল সমাজতন্রের নামে। তখন সরকারের পরামর্শক ছিলেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান, নুরুল ইসলাম, আনিসুর রহমান, মোশাররফ হোসেন। আইউব ইয়াহিয়ার আমলারাই ছিলেন বংগবন্ধুর আদর্শের নিবেদিত আমলা। আমলারা বলতেন এবং এখনও বলেন, আমরা হচ্ছি প্রশাসন মেশিনারী। চালক যেমন চালায় তেমনি চলি। মেশিনের কোন আদর্শ থাকেনা। ভাল চালক বা ম্যানেজার থাকলে মেশিন ভাল চলে এবং উত্‍পাদন বেশী করে।কেউ কেউ আবার নিজেদের ৬ দফার সমর্থক দাবী করে বংগবন্ধুর খেদমতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এদের অনেকেই এখন বংগবন্ধুর কন্যা প্রধান মন্ত্রী শেক হাসিনার প্রত্যক্ষ বা  পরোক্ষ উপদেস্টা। রেহমান সোবহান সাহেবদের সিপিডি নানা ধরনের পরামর্শ দিয়ে সরকারকে প্রভাবান্বিত করে। সিপিডির সাথে সুসম্পর্ক রয়েছে ভারতের আই কে গুজরালের সেন্টার ফর পলিসি এনালাইসিস( সিপিএ)। এরা এক ধরনের থিন্কট্যান্ক। এদের সাথে আমেরিকান/ ইউরোপীয় থিন্কট্যান্কের যোগাযোগ আছে। বাংলাদেশের স্বার্থ কি এবং কোথায় তা বুঝার বা জানার চেস্টা এরা কোনদিনও করেননি। এরা অন্যের স্বার্থে কাজ করেন। বংগবন্ধু এদের সবাইকে সরলভাবে বিশ্বাস করেছিলেন।এসব বুদ্ধিজীবী ও অর্থনীতিবিদ সে সময়ে ভারত ও রাশিয়ার তাবেদার ছিলেন। এখন বিভিন্ন ধরনের এনজিও ও থিন্কট্যান্কের নামে আমেরিকার তাবেদারি করেন। এদের পোষাক হলো খদ্দরের ফতুয়া। খুবই সাদাসিধে। কিন্তু থাকেন বাংলোবাড়িতে পাইক পেয়াদা বরকন্দাজ পরিবেস্টিত হয়ে। চলেন খুবই দামী দামী গাড়িতে। এরা এখন বড় বড় শিল্পগোস্ঠির তাবেদারিও করেন।

কৃষি বাজারেও একই অবস্থা। এখানকার অবস্থা আরও করুন। কৃষি বাজার ও কৃষকের অবস্থা নিয়ে মিডিয়া হৈ চৈ করেনা। বাংলাদেশে এখন মিডিয়ার মালিকরা সবাই সওদাগর। এখন সব ব্যবসায়ী একখানা কাগজ বের করতে চান। কৃষক যখন কোন পণ্যের বাম্পার ফলন করে তখন সেই পণ্যের কৃষক পর্যায়ের দাম দাম একেবারেই পড়ে যায়। এমন কি উত্‍পাদন খরচটাও উঠে আসেনা। ফলে পরের মৌসুমে কৃষক আর সেই পণ্যের উত্‍পাদন করতে চায়না। সেই মৌসুমে বা বছরে সেই পণ্যের দামে আগুন লেগে যায়। তখন তড়ি ঘড়ি করে আমদানী শুরু হয়ে যায়। তখন চাল ডাল তেল নুনের দাম নিয়ে মিডিয়া চিত্‍কার শুরু করে। এসব হলো এক ধরনের নাটক। পাটচাষী , পাটের উপাদন ও পাটের দাম নিয়ে এক সময় বিরাট রাজনীতি হতো। তখন মিডিয়া ও পাটকল মালিকদের সুর ছিল এক রকম। মিলমালিকরা বলতেন, কৃষক পর্যায়ে পাটের দাম বেশী হলে পাটকল বন্ধ হয়ে যাবে। মিল বন্ধ হলে রফতানী বন্ধ হয়ে যাবে। সাথে সাথে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যাবে। এই চক্রান্তের ফলে বিশ্বে আমাদের পাটের বাজার অন্যদের হাতে চলে গেছে। অপরদিকে ভারত বিশ্ব বাজারে এক চেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছে। আমার মূলকথা হলো আমরা কৃষক ও কৃষিকে সব সময় অবহেলা করে এসেছি। ফলে আমাদের উন্নয়ন লক্ষ্য কোনদিনই অর্জন করতে পারিনি। কিন্তু এই কৃষি এবং কৃষকরাই বাংলাদেশকে বাঁচাতে পারে।

বংগবন্ধুর আমলেও কৃষি ব্যবস্থাপনা ও উত্‍পাদনে তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। অসমাজতান্ত্রিক আমলা ও রাজনৈতিক দল নিয়ে বংগবন্ধু সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করতে ব্যর্থ হয়ে বংগবন্ধু একটার পর একটা ভুল পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি পুঁজি বিকাশের পথ রুদ্ধ করেছেন, ফলে বিনিয়োগ হয়নি। কর্ম সৃস্টি হয়নি। বেকারত্ব ব্যাপক হারে বেড়েছে। অন্যদের পরামর্শে তিনি একদলীয় রাজনীতি চালু করে সকল সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তিনি সেনা বাহিনীর চেয়ে রক্ষী বাহিনীর গুরুত্ব দিয়েছিলেন বেশী। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। কিন্তু এতসব কিছু করার কোন প্রয়োজনই ছিলনা। তিনি যদি শুধু নিজ বিবেক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতেন। তিনি যদি শহুরে সুবিধাভোগীদের পাত্তা না দিয়ে কৃষি ও গ্রামে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দিতেন তাহলেই তাঁর বিপ্লব সাধিত হতো। ৭৪ এর দুর্ভিক্ষ হতোনা।

বংগবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ২০১১তে এসেও বলছেন, উন্নয়ন বন্ধ করে হলেও খাদ্য আমদানী করবো। এমন কথা তাঁকে কে শিখিয়ে দিয়েছে আমি ভেবে পাচ্ছিনা। এটা হলো একটা আত্মঘাতী চিন্তা। আমি জানি তিনি আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন কথা বলেছেন। তাঁর বলা উচিত ছিল তাঁর পুরো আমলটাই হবে কৃষি ও গ্রাম উন্নয়নের কাল। তাঁকে বলতে হবে উন্নয়নের পুরো টাকাই ব্যয় করা হবে কৃষিতে এবং গ্রামে। এ সময়ে শহুরে সুবিধাভোগরা হৈ হুল্লোড় করবো। মিডিয়া চিত্‍কার করবে। চেম্বারগুলো চিত্‍কার করবে। বিদেশী তথাকথিত উন্নয়ন সহযোগীরা অসহযোগিতার কথা বলবে। তবুও আপনি গ্রামে ও কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দিন। গ্রামের মানুষ ও কৃষকের আয় বাড়িয়ে দিন। (নয়া দিগন্ত, ২০ মার্চ, ২০১১)

লেখক: কবি সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিক

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »