Feeds:
Posts
Comments

Archive for November, 2011


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রাক ইতিহাস / এরশাদ মজুমদার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার ইতিহাস বিষয়ক বইয়ের সন্ধানে গিয়েছিলাম আজিজ সুপার মার্কেটে। না, সেখানে কোন বই পাইনি। দুয়েকজন বলেছেন, পরে সংগ্রহ করে দিবেন। এক তরুণ বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বইয়ের দোকানে পাওয়া যাবে। তরুণটি জানতে চাইলেন, আমি কোন  বিষয়ে  জানতে চাই। তখন বললাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠা লগ্নের পক্ষ বিপক্ষ নিয়ে কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে চাই। আমি বললাম, যেমন  ধরুণ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। তরুণটি বললেন, প্রেক্ষিত না জানলে শুধু বিরোধিতার কথা বললে ইতিহাস বিকৃতি হবে। তরুণটি নিজেই আগ বাড়িয়ে বললেন, কবিগুরু শুধু মুসলমানদের জন্যে বিশ্ববিদ্যালয় চাননি বলেই এর বিরোধিতা করেছেন। আমি তখন বললাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু মুসলমানদের জন্যে প্রতিস্ঠা হয়েছে  কথাটি সত্য নয়, সঠিকও নয়। এটি প্রতিস্ঠিত হয়েছে পূর্ববংগের সকল মানুষের জন্যে। ক‘দিন আগে এক ভদ্রলোক ফোন করে  বললেন, তিনি আমার লেখায় পড়েছেন কবিগুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু কোন রেফারেন্স নেই। তিনি জানতে চেয়েছেন, এই তথ্যটি আমি কোথায় পেয়েছি। আমি উত্তরে বলেছিলাম, বহু রেফারেন্স আছে। তবে ফোনে বলা যাবেনা। ভদ্রলোক পরে যোগাযোগ করবেন বলেছেন।

আজকের এই লেখাটি ওই কারণেই লিখতে হচ্ছে। পূর্ববংগ ও আসাম প্রদেশ গঠণ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার  বিরোধিতা করেছেন কোলকাতার হিন্দু ভদ্রলোক ও বুদ্ধিজীবীরা। তাঁদের নেতৃত্ব দিয়েছেন কবিগুরু। কারণ অনেক থাকতে পারে। নানা জনে নানা ভাবে এর ব্যাখ্যা করেছেন। সে ব্যাখ্যায় আমি যাচ্ছিনা। ইতিহাস হলো কবিগুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার বিরোধিতা করেছেন এবং পরে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মননা গ্রহণ করেছেন। কবিগুরু দুবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন। আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা কবিগুরু একজন জমিদার ও ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি পারিবারিক সূত্রে এই জমিদারী ও ব্যবসা পেয়েছেন। এর আগেও আমি আমার লেখায় বলেছি তিনি বাংলা ভাষার প্রধান কবি। এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত থাকা উচিত নয়। কিন্তু জমিদার ও ব্যবসায়ী হিসাবে তাঁর ভুমিকা ছিল গণবিরোধী। তাঁকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে হয়েছে। সেখানে তিনি নিরপেক্ষ থাকতে পারেননি। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে গিয়েছে। আমরা যদি তাঁকে একজন হিন্দু ভাবি তাহলে তাঁর বক্তব্যে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং আমি মনে করি তা খুবই স্বাভাবিক। তিনি হিন্দু স্বার্থের পক্ষে কথা বলেছেন। সমস্যা হচ্ছে  আমরা অনেকেই তাঁর কবিগুরু মর্যাদার সাথে জমিদারী ও ব্যবসায়ী মর্যাদা এক করে ফেলি। আমি নিজেও তাঁর গাণ ও কবিতার ভক্ত। তিনি বাংলা ভাষাকে বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করেছেন। কবি হিসাবে বিশ্ববাসী তাঁকে সম্মান করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠা লগ্নের ইতিহাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশ করা হয়নি। আমি এ বিষয়ে প্রকাশিত বেশ কিছু বই সংগ্রহ করেছি। নামীদামী ব্যক্তিত্বরা যে সব বই লিখেছেন তাঁরা কেউ  প্রতিস্ঠা লগ্নের ঘটনা গুলো উল্লেখ করেননি। ১৯২১ সালে আনুস্ঠানিক  ভাবে যাত্রা শুরু করেছে। সেই থেকেই সবাই নিজেদের পুস্তক রচনা করেছেন। তাতে আসল ইতিহাস সামনে উঠে আসেনি। কেন তাঁরা আসল ইতিহাস  লেখেননি তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। সরদার ফজলুল করিম সম্পাদিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববংগীয় সমাজ বইটিতে কিছু তথ্য পাওয়ার আশা আমার ছিল। বইটি ছিল অধ্যাপক রাজ্জাকের সাথে সরদার করিমের আলাপচারিতার ফসল। এ রকম একটি বই আমাদের খুবই প্রয়োজন ছিল। অধ্যাপক রাজ্জাকের বাসায় প্রচুর আড্ডা হতো। তিনি  নিজের ভাষায় খুব সুন্দর করে কথা বলতেন। অধ্যাপক রাজ্জাক নিজে কোন বই লিখে যাননি। তাঁর  লেখার কোন অভ্যাস ছিলনা বলে শুনেছি। তিনি লিখতেন বলে প্রচার করতেন তাঁর ভক্তরা। আমার কাছে অবাক লাগছে যে, আলাপচারিতায় অধ্যাপক রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠা লগ্নের প্রাক কথাগুলো একেবারেই উল্লেখ করেননি। হয়ত সরদার করিম তাঁর কাছে এ বিষয় কিছু জানতে চাননি। রাজ্জাক সাহেবও নিজে থেকে  বিষয়টি  আলোচনায় আনেননি। এছাড়াও বইটাকে ইতিহাস বলা যাবেনা। কারণ, অধ্যাপক রাজ্জাক স্মৃতি থেকে গল্পের মতো করে অনেক কথা বলেছেন একেবারেই নিজের মতো করে। তাঁর গল্পের ভিতর নানা  কন্ট্রাডিকশন রয়েছে।

মুহম্মদ জাহাংগীর সম্পাদিত ও অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ভুমিকা সম্বলিত ‘স্মৃতিকথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বইতেও ১৯২১ সালের আগের কথাগুলো আসেনি। যত গুলো লেখা এই বইতে সংকলিত হয়েছে সবগুলোই ২১ সালের পরের কথা দিয়ে শুরু হয়েছে। রমেশ মজুমদারের লেখাতে উল্লেখ রয়েছে যে, হিন্দুরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধিতা করেছে। ওই হিন্দুরা পূর্ববংগ আসাম প্রদেশ গঠণেরও বিরোধিতা করেছিলেন। মুহম্মদ জাহাংগীর প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বৃটিশ সরকারের একটি উপহার।১৯১১ সালে নতুন প্রদেশ পূর্ববংগ আসাম প্রতিষ্ঠা রদ করা হলে নতুন প্রদেশের ৯০ ভাগ অধিবাসী মুসলমানেরা ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।  নবাব সলিমুল্লাহ ক্ষুব্দ মুসলমান সমাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বংগভংগ রদের খেসারত হিসাবে বড়লাট ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন। তারই ফল হিসাবে ১৯১২ সালের ২৭শে মে মিস্টার নাথানকে সভাপতি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  কমিট গঠণ করা হয়। এই সময়ে যারা বংগভংগ রদের আন্দোলন করেছিলেন তারাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার বিরোধিতা শুরু করেন।

ভারতের প্রথম প্রধান মন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু তাঁর বিশ্ব ইতিহাস প্রসংগ বইতে বলেছেন, ‘ ভারতের অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় বংগদেশে মুসলমানের সংখ্যায় বেশী। এরা গরীব প্রজা। সাধারনত হিন্দুরাই ছিল জমিদার।গ্রামের বানিয়াও ছিল হিন্দুরা। কাজেই জমিদার ও বানিয়ারা যৌথভাবে  মুসলমানদের শেষণ করতো। মনে রাখতে হবে হিন্দু মুসলমান বিবাদের মুলই হচ্ছে এই শোষণ। পেশাগত দিক থেকে  কবিগুরু ছিলেন একজন জমিদার ও বানিয়া। তাই তিনি পূর্ববংগ প্রদেশ গঠণ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গঠণের বিরোধিতা করেছেন। নতুন প্রদেশ গঠণের দিন ১৬ই অক্টোবরকে তিনি শোক দিবস পালনের আহবান জানিয়েছিলেন। একই ভাবে ১৯১২ সালের ২৮শে মার্চ কোলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার বিরুদ্ধে  হিন্দুরা যে সভা করে তাতে সভাপতিত্ব করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ। নীরদ চৌধুরী তাঁর আত্বজীবনীতে লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ জমিদার হিসাবে পূর্ববংগের মুসলমান প্রজাদের লাভস্টক বা গৃহপালিত পশু মনে করতেন।

১৯১২ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠা না করার জন্যে  স্যার রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বড়লাটের সাথে দেখা করেন। প্রতিনিধি দলের যুক্তি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিঠিত হলে বংগদেশ অভ্যন্তরীন ভাবে বিভক্ত হয়ে পড়বে। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাবু গিরিশ বানার্জী, ড: স্যার রাসবিহারী ঘোষ এবং কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখার্জীর নেতৃত্বে একদল হিন্দু বুদ্ধিজীবী  বড়লাট লর্ড হার্ডিন্জের সাথে দেখা করে ১৮ বার স্মারকলিপি দিয়েছিলেন। আমাদের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী হীনমন্যতায় ভোগে। এদের  পারিবারিক ও রাজনৈতিক কোন বায়াদলিল নেই। এর প্রমান হলো সরদার ফজলুল করিম তাঁর একটি লেখায় তিনি বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের মাটিতে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করার সাধনা, রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে বেঁচে থাকার, বিকশিত হওয়ার কিংবা রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করার বর্বর অহংকার হচ্ছে পায়ের তলায় জমিশূন্য, শেকড় শূন্য, নির্বোধের অহংকার।’ এই লেখাটি দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে ১৩৯৬ সালের ২৪শে ফাল্গুন। ১৯১১ সাল থেকে ১৯২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ্যাক্ট পাশ হওয়া পর্যন্ত পর্যন্ত  কবিগুরু সহ হিন্দুনেতারা অবিরাম এর বিরোধিতা করেছেন। আর মুসলমান নেতারা এর প্রতিস্ঠার জন্যে অবিরাম লড়াই করেছেন। কিন্তু অধ্যাপক রাজ্জাক ও সরদার করিম এই ইতিহাসকে ইচ্ছা করে এড়িয়ে গেছেন। আমি জানতাম সরদার করিম একজন বামপন্থী চিন্তাধারার মানুষ। তিনি নিপীড়িত মানুষের পক্ষে থাকবেন বলেই আশা ছিল। আগেই বলেছি, এ যাবত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার বিষয় নিয়ে যত বই প্রকাশ হয়েছে তাতে প্রাক ইতিহাস নিয়ে কিছুই বলা হয়নি। এর চেয়ে বড় হীনমন্যতা আর কি হতে পারে।

অধ্যাপক রাজ্জাকতো সোজা সাফটা বলে দিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠায় ঢাকার নবাবদের কোন অবদান নেই। আমিতো ভেবেই অবাক যে, অধ্যাপক রাজ্জাকের মতো একজন মানুষ এমন কথা বলতে পারলেন কেমন করে। নিজের মা বাপের অবদান যারা অস্বীকার করেন তাঁদের কোন ভাষায় আপনি অভিহিত করবেন। ঢাকা বিদ্যালয় প্রতিস্ঠা না হলে এসব জ্ঞানী গুণীদের অবস্থা  কি হতো তা একবার ভেবে দেখার সময় এসেছে। তাঁরা সমাজের মাথা হয়ে ইতিহাস আর তথ্য পরিহার করে নিজেদের মনের মাধুরী মিশিয়ে কথা বলে গেছেন এবং এখনও বলে যাচ্ছেন। কবিগুরু বাংলা ভাষার প্রধান কবি, এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত আছে বলে আমার মনে হয়না। এত বড় একজন মানুষের রাজনৈতিক সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনকে আমরা অস্বীকার করতে পারিনা। কেন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন তা স্পস্ট করতে আমাদের অবশ্যই তাঁর রাজনৈতিক সমাজিক ও ধর্মীয় জীবন জানতে হবে। আগেই বলেছি তিনি একজন জমিদার ও ব্যবসায়ী ছিলেন। সর্বোপরী তিনি ছিলেন একজন খাঁটি হিন্দু। তিনি তাঁর ধর্মীয় বিশ্বসকে কখনই ত্যাগ করেননি। এ ব্যাপারে তাঁর কোন লুকোচুরি ছিলনা। কবিগুরু নিজেই স্পস্ট করে বলেছেন, ‘ আমি ভারতীয় ব্রহ্মাচর্যের প্রাচীন আদর্শে আমার ছাত্রদিগকে নির্জনে নিরুদ্বেগে পবিত্র নির্মলভাবে মানুষ করিয়া তুলিতে চাই। বিদেশী ম্লেচ্ছতাকে বরণ করা অপেক্ষা মৃত্যু শ্রেয়, ইহা হৃদয়ে গাঁথিয়া রাখিও।’ কবিগুরু সম্পর্কে রমেশ মজুমদার লিখেছেন, ‘ হিন্দু জাতীয়তা জ্ঞান বহু হিন্দু লেখকের চিত্তে বাসা বেঁধেছিল, যদিও স্বজ্ঞানে তাঁদের অনেকেই কখনই এর উপস্থিতি স্বীকার করেননা। এর প্রকৃষ্ট দৃস্টান্ত হচ্ছে , ভারতের শ্রেস্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ, যাঁর পৃথিবী খ্যাত আন্তর্জাতিক মানবিকতাকে সাম্প্রদায়িক দৃস্টিভঁগীর সংগে কিছুতেই সুসংহত করা যায়না। তাঁর কবিতা সমূহ শুধুমাত্র শিখ রাজপুত ও মারাঠা কীর্তনে অনুপ্রাণিত হয়েছে। কোন মুসলিম বীরের কীর্তনে তিনি কখনও এক ছত্রও লিখেননি। এ থেকেই প্রমানিত হয় উনিশ শতকী বাংলার জাতীয়তাবাদী চেতনার উত্‍সমূল কোথায় ছিল।’ নীরদ চৌধুরী লিখেছেন, রামমোহন  থেকে রবীন্দ্রনাথ সকলেই জীবনব্যাপী সাধনা করেছেন হিন্দু ও ইউরোপীয় চিন্তাধারার সমন্বয় সাধনের জন্যে। মুসলমানদের চিন্তা চেতনা , ভাবধারা , ঐতিহ্য কখনই তাদের স্পর্শ করেনি।

কবিগুরু হিন্দু শক্তির উত্থান হিসাবে শিবাজীর গুণ কীর্তন করেছেন। এর একমাত্র কারণ তিনি একজন হিন্দু ছিলেন। শিবাজী সম্পর্কে ইতিহাসবিদ স্যুলিভান বলেছেন, শিবাজী ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লুন্ঠক ও হান্তরক দস্যু। শিবাজীর লুন্ঠণ থেকে হিন্দু মুসলমান কেহই রেহাই পায়নি। মারাঠারা বহু মন্দির ধ্বংস করেছে, বহু হিন্দু ব্রাহ্মণকে হত্যা করেছে। মারাঠারা যেখানে গিয়েছে সেখানেই ধ্বংস ও মৃত্যু রেখে এসেছে। ‘বাংগালী জীবনে রমণী’ গ্রন্থে  নীরদ চৌধুরী বলেছেন, ‘একটা একেবারে বাজে কথা সর্বত্র শুনিতে পাই। তাহা এই রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তি হিসাবে বিশ্ব মানব ও লেখক হিসাবে বিশ্ব মানবতারই প্রচারক।কথাটির অর্থ ইংরেজী বাংলা কোন ভাষাতেই বুঝিতে পারিনা। তবে অস্পস্ট ভাবে ধোঁয়া ধোঁয়া যেটুকু বুঝি , তাহাকে অর্থহীন প্রলাপ বলিয়া মনে হয়। রবিন্দ্রনাথ অপেক্ষা বিশিষ্ট বাংগালী হিন্দু  আর কেহ জন্মায়নি।’ দৃষ্টিদান গল্পের কথা উল্লেখ করে নীরদ চৌধুরী বলেছেন, ‘ আসলে রবীন্দ্রনাথ মনে প্রাণে বাংগালী হিন্দু ছিলেন, বাংগালী হিন্দু হিসাবেই নিজের কথা পৃথিবীর লোকের কাছে বলেছেন। তাঁর রচনার ইংরেজী অনুবাদে তাঁর এই প্রকৃত রূপ প্রকাশ পায়নি।’

কবিগুরু কখনই মুসলমান স্বার্থের পক্ষে ছিলেন না। তিনি একজন খাঁটি হিন্দু হিসাবে আজীবন হিন্দুদের খেদমত করেছেন। জমিদার হিসাবেও তিনি মুসলমান প্রজাদের উপর অত্যাচার করেছেন। তিনি তাঁর জমিদারীর স্বার্থে ইংরেজদের বন্দনা করেছেন। এতে আমি দোষের কিছু দেখিনা। দোষের হলো যখন দেখি, আমাদের নামীদামী মানুষেরা তাঁকে দেবতার আসনে বসাতে চান। আসল ইতিহাসকে লুকিয়ে রেখে নকল ইতিহাস প্রচার করে আমাদের তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করতে চান। কবিগুরু  আপন জাতির স্বার্থেই মুসলমানদের স্বার্থের বিরুদ্ধে ছিলেন। তাই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন। তিনি তাঁর ধর্ম পালন করেছেন। কিন্তু আমরা কি করছি। কবিগুরুর আত্মজীবনী থেকেও আমরা জানতে পেরেছি তিনি হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাস করতেন। হিন্দু ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে তিনি লালন পালন করেছেন। বাংলাদেশের রবীন্দ্র ভক্তরা তাঁর গাণ ও কাব্য প্রতিভাকে সম্মান জানতে গিয়ে নিজ ধর্ম,সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ত্যাগ করতে চলেছেন। এমনকি অনেকেই মুক্ত বুদ্ধি আর স্যেকুলারিজমের নামে নিজেদের ইতিহাসকে মুছে ফেলতে চেষ্টা করছেন। কবিগুরুর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জীবন নিয়ে কিছু বলতে গেলেই এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী তেড়ে আসেন এবং নিজেকে প্রগতিশীল বলে দাবী করে বলেন, আমরা অসাম্প্রদায়িক। এর মানে হচ্ছে, কবিগুরুর রাজনৈতিক , ব্যবসায়িক ও জমিদারী জীবন নিয়ে কথা বলতে গেলেই সাম্প্রদায়িক বলে আখ্যা পেতে হবে। এমন কি কেউ যদি শক্তভাবে বলতে চায় যে, আমি একজন মুসলমান এবং মুসলমানের স্বার্থ রক্ষায় কথা বলতে চাই তাহলেও আত্ম মর্যাদাহীন বুদ্ধিজীবীরা  সেইজনকে সাম্প্রদায়িক বলে গালাগাল দিবে।

আমাদের তরুণ সমাজকে অবশ্যই জানতে হবে , বুঝতে হবে আমরা কেন বাংলাদেশ অর্জন করেছি। শুধুমাত্র পাকিস্তান থেকে আলাদা বা স্বাধীন হয়ে ধর্মহীন বাংগালী হওয়ার জন্যে আমরা বাংলাদেশ প্রতিস্ঠা করিনি। এমন কি ভারতের আধিপত্য মেনে নেওয়ার জন্যেও আমরা স্বাধীন হইনি। আমরা বাংগালী মুসলমান এ কথা কিছুতেই ভুলে যাওয়া যাবেনা। আমাদের ভাষা ছাড়া বাকী সবকিছুই হিন্দু বাংগালীর চেয়ে একেবারেই আলাদা। যেমন করে আমাদের কবিগুরু ছিলেন একজন বিরাট মাপের বাংগালী হিন্দু। তিনি কখনই দাবী করেননি যে, তিনি একজন ধর্মমুক্ত মানুষ। বাংলা ভাষার প্রধানতম কবি হিসাবে তিনি আমাদের সম্মানীয়, অশেষ শ্রদ্ধার পাত্র। কিন্তু তিনি কোন দেবতা নন। তিনি দেবতা হতে চাননি। তিনি সন্যাসী বা ঋষিও নন। তিনি একজন বড় কবি ও একজন  জমিদার, ব্যবসায়ী ও হিন্দু ধর্মের রক্ষক।

লেখক: কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
http://www.humannrespaper.wordpress

Advertisements

Read Full Post »