Feeds:
Posts
Comments

Archive for November, 2013


চীন কেন স্বাধীন বাংলাদেশ দেখতে চায় ? এরশাদ মজুমদার

চীন এখন বাংলাদেশের পরম বন্ধু। আমি ব্যক্তিগত ভাবে চীনের বন্ধুত্বকে গুরুত্ব দেই। এবং সেটা আমার প্রাণপ্রিয় জন্মভুমি বাংলাদেশের স্বার্থেই। ১৯৭১ সালে চীন ও আমেরিকা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধকে সরাসরি সমর্থন দেয়নি। তখন ভারত আর রাশিয়া ছিল একজোট। বাংলাদেশের ব্যাপারে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার আগে ভারত রাশিয়ার সাথে ২৫ বছরের মৈত্রীচুক্তি করে। যার মূল বিষয় ছিল ভারত আক্রান্ত হলে রাশিয়া সে আক্রমণকে রাশিয়ার উপর আক্রমণ বলে বিবেচনা করবে। ভারত তখন সামরিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে চীনের মোকাবিলা করার জন্যে রাশিয়ার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। ১৯৬২ সালে ভারত চীনের সাথে সীমান্ত বিরোধের সমাধার জন্যে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তারপরেই চীন-ভারত সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সে সম্পর্ক এখনও পুরোদমে উষ্ণ হয়নি। সীমান্ত সমস্যাও রয়ে গেছে। ওই সময়েই পাকিস্তানের সাথে চীনের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্যে জেনারেল আইউব উদ্যোগ গ্রহন করেন এবং মাওলানা ভাসানী এ ব্যাপারে আইউবকে সমর্থন করেন। ইতিহাসের এ প্রেক্ষিতে জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশ ভারত ও রাশিয়া নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। ৭২-৭৫ সালে দেখেছি রাশিয়াপন্থী রাজনীতির কী দৌর্দন্ড প্রতাপ। দেশে রাশিয়াপন্থী লোকের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার, কিন্তু তাদের প্রতাপ ছিল সীমাহীন। বংগবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের ন’মাস ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে। ২৫শ মার্চ রাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কাছে ধরা দিয়েছিলেন স্বেচ্ছায়। কারণ তিনি কখনও পালিয়ে থাকা পছন্দ করতেন না। এ কারণেই তিনি ভারত যাননি। বংগবন্ধু মনোজগতে কখনই অন্ধভাবে ভারতভক্ত ছিলেন না। ভারতের রাজনীতি কি তাও তিনি জানতেন। তিনি কোলকাতায় লেখাপড়া করেছেন এবং জীবনের শুরুর প্রাথমিক রাজনীতি সেখানেই করেছেন। বমগবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে সেসব রাজনীতি কথা উল্লেখ করেছেন। হিন্দুরা মুসলমানদের উপরে কি অত্যাচার করতো তার বিবরন ওই আত্মজীবনীতে আছে। তিনি ছিলেন মুসলীম লীগের একজন কট্টর কর্মী। মুসলীম লীগ থেকে বেরিয়ে গিয়েও তিনি মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলীম লীগ প্রতিষ্ঠা করেন।
৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় যে ভারতীয় সৈন্যরা অবস্থান নিয়েছিল তারা দীর্ঘকাল অবস্থানের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু সে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি চীনের কারণে। ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে থাকতেই বংগবন্ধু জাতিসংঘের সদস্যপদ দরখাস্ত করেন ভারত ও রাশিয়ার উসকানীতে। তখন চীন অনুরোধ করেছিল দরখাস্ত না করার জন্যে। চীনকে বাংলাদেশের শত্রু প্রমাণ করার জন্যে ভারত রাশিয়া সদস্যপদের জন্যে বাংলাদেশকে দিয়ে দরখাস্ত করিয়েছিল। চীন বাধ্য হয়েই সে দরখাস্তের বিরোধিতা করতে হয়েছিল। চীন তখন বলেছিল বাংলাদেশ সার্বভৌম দেশ নয়,কারণ সেখানে বিদেশী সৈন্য অবস্থান করছে। এর পরেই ভারত বিদেশী চাপের কারণে সৈন্য সরিয়ে নিয়েছিল। আর আমরা জানি বংগবন্ধুর অংগুলী হেলনে সৈন্যরা চলে গিয়েছিল। এমন কি অনেকেই বিশ্বাস করেন বংগবন্ধু না হলে ভারতীয় সৈন্যরা কখনই বাংলাদেশ ছেড়ে যেতোনা। বাংলাদেশের রাজনীতির দর্শন পরিবর্তন হয় বংগবন্ধুর সরকারের পতনের পর। খোন্দকার মোশতাকই চীন ও সউদী আরব সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তখন মোশতাক সাহেব চীনপন্থী সাংবাদিক ফয়েজ আহমদকে চীনে পাঠান। এর পরেই চীন ও সউদী আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। বংগবন্ধুর আমলে ভারত রাশিয়ার চাপে বাংলাদেশে ইসলামী ও ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো নিষিদ্ধ ছিল। উল্লেখ্য যে, পাকিস্তান আমলের একটা সময় পর্যন্ত কমিউনিষ্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। খোন্দকার মোশতাক তিন মাসের মতো ক্ষমতায় ছিলেন। এরপরে ক্ষমতায় আসেন জেনারেল জিয়া। জিয়া সাহেবের আমলেই বাংলাদেশের রাজনীতি ও পররাস্ট্র নীতিতে পরিবর্তন শুরু করে। জিয়ার আমলেই মুসলমান দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সত্যিকারের ভাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের উন্নতি হয়। এ সময়েই চীন বাংলাদেশে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে প্রথম কাতারে চলে আসে। এর আগে ভারত ও রাশিয়া এ ব্যবসাটা করতো।
খোন্দকার মোশতাক চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্যে উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং চীনপন্থী প্রখ্যাত সাংবাদিক ফয়েজ আহমদকে চীন পাঠিয়েছিলেন। চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন উষ্ণ। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাত্তারকে উত্‍খাত করে সেন্যপ্রধান এরশাদ সামরিক আইন জারী করে ক্ষমতা দখল করেন। ক্ষমতা দখলের পর এরশাদ নিজেই বলেছেন যে, তিনি দিল্লীর সাথে আলোচনা করেই পদক্ষেপ নিয়েছেন। ওই সময়ে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা শান্তই ছিল। তবুও এরশাদ ক্ষমতা দখল করেছিলেন। এরশাদ সাহেবও চীনের সাথে মোটামুটি দৃশ্যমান সম্পর্ক ভাল রেখে চলেছেন। এরশাদ সাহেবকে পুরোপুরি সময় শেখ হাসিনা সমর্থন দিয়েছেন। এরশাদ সাহেবের শাসনকে দীর্ঘায়িত করেছেন। ওই সময়ে জামাত আওয়ামী লীগের সাথে সুসম্পর্ক বজায় চলেছে। কিন্তু খালেদা জিয়ার কঠের আন্দোলনের ফলে সবাই এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে মাঠে নামতে বাধ্য হয়। ফলে ৯০ সালে এরশাদের পতন হয়। এরপরেই তথকথিত বুর্জোয়া গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। ৯১ সালের নির্বাচন হয়েছিল বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের অধীনে। তাতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি জয়লাভ করে। শেখ হাসিনার আশা ও বিশ্বাস ছিল তাঁর দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতা আসবে। এরপর থেকেই শেখ হাসিনা ও দিল্লী যৌথভাবে একটি লক্ষ্য স্থির করে বাংলাদেশের রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে তোলার গোপন কর্মসূচী হাতে নেয়। ৯০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত ২৩ বছর হাসিনার রাজনীতি দিল্লীতুষ্ট নীতিতে পরিণত হয়। দিল্লীর শাসকগোষ্ঠি ও তল্পীবাহক বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকরা এখানে ও সেখানে তত্‍পর হয়ে উঠে বাংলাদেশকে দিল্লীর কঠের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে। যেকোন বাহানায় বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল রাখাই এখন শেখ হাসিনার প্রধান লক্ষ্য। ৯৬ সাল ও ২০০৬ সালে নারকীয় ঘটনা গুলো ঘটিয়েছে শেখ হাসিনা দিল্লীর উসকানীতে। তত্বাবধায়ক সরকারের দাবী ছিল শেখ হাসিনা ও জামাতের। খালেদাকে বাধ্য করেছে এ ব্যবস্থা মেনে নিতে। ২০০৮ সালের ভয় ভীতিকর নির্বাচনে জেনারেল মইন শেখ হাসিনকে ক্ষমতায় বসায় দিল্লীর সার্বিক সহযোগিতায়। খালেদা জিয়ার দুই ছেলেকে দেশছাড়া করেছে দুর্ণীতির অভিযোগে। ওই অবস্থায় ভয়ভীতি দেখিয়ে খালেদাকে বাধ্য করে নির্বাচনে অংশ নিতে। অবৈধ জেনারেল মইন সরকারের সকল কাজকে হাসিনা স্বীকৃতি দিয়েছে। কারণ,এর আগে হাসিনা বলেছিলেন,তাঁরই আন্দোলনের ফসল হচ্ছে জেনারেল মইনের সরকার। সে সময় মইন দিল্লী সফরে গেলে তাঁকে লাল গালিচা সম্বর্ধনা ও দামী ছয় ঘোড়া দেয়া হয়।
শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে খালেদা ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে জেনারেল মইনের দায়ের করা সকল মামলা অব্যাহত রাখেন আর বেহায়ার মতো নিজেদের সকল মামলা প্রত্যাহার করে নেন। সাংবাদিকরা জানতে চাইলে এক মন্ত্রী বলেন, আমরা ক্ষমতায় এসেছি কি খালেদার মামলা প্রত্যাহার করার জন্যে? বরং খালেদা ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে নতুন নতুন মামলা দায়ের করা হয়। এখন দেশে যে গোলযোগ চলছে তার স্রষ্টাও শেখ হাসিনা। তিনি জনমতকে উপেক্ষা করে সংসদের শক্তির জোরে ও আদালতের দোহাই দিয়ে মীমাংসিত তত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দেন। শুরু হলো নতুন রাজনৈতিক দ্বন্ধ ও সংঘাত। প্রত্যেক বারই আমরা দেখেছি দিল্লীর প্রতিনিধি বীণা সিক্রি, পিণাক রঞ্জন ও শরণ খুবই ব্যস্ত এবং প্রকাশ্যে বাংলাদেশকে যেকোন প্রকারে ব্ল্যাকমেইল করে দিল্লীর অনুগত রাখার চেষ্টা করেছে। জেনারেল মইনের শাসনকালে পিণাক বাংলাদেশে দিল্লীর অদৃশ্য রাজ্যপাল ছিলেন। তিনি তখন সচীবদের বদলী ও পোষ্টিং দেখতেন বলে একজন সাবেক সচীব জানিয়েছেন।
এবারের গোলযোগে দিল্লী প্রকাশ্যে অংশ গ্রহণ করছে এবং দেশবাসী শরণের পদচারণা দেখতে পাচ্ছেন। এবার দিল্লী মরণ কামড় দিয়েছে। এবারে বাংলাদেশের বিষয়টি স্থায়ীভাবে সমাধা করতে চায়। আর সমাধান হলো ঢাকায় দিল্লীর অনুগত সরকারকে স্থায়ীবাবে ক্ষমতায় রাখা।আর এজন্যে শেখ হাসিনা,তাঁর দল আওয়ামী লীগ ও একই ঘরাণার রাজনীতিকদের ক্ষমতায় রাখা জরুরী। স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার জন্যেই তত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশের মিডিয়া গুলোকে ভারত আগেই কিনে নিয়েছে অর্থাত্‍ নিজেদের অনুগত করে ফেলেছে। তাই ৯০ ভাগ মিডিয়া দৃশ্য বা অদৃশ্য ভাবে ভারতের হয়ে কাজ করে। যদি আপনি প্রশ্ন করেন ভারত আসলে কি চায়? উত্তর হলো ভারত বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী ভাবে একটা অনুগত সরকার চায়। যাকে মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা সমর্থন দিবে। লক্ষ্য হলো,বাংলাদেশ ভারতের সকল নীতি অনুসরণ করবে। বিনিময়ে বাংলাদেশের নিজস্ব পতাকা থাকবে, জাতীয় সংগীত থাকবে ও জাতিসংঘের সদস্যপদ থাকবে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীও থাকবে, তবে একটা অনুগত প্যারা মিলিটারীও থাকতে পারে। সেজন্যেই বিজিবিকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। বাংলাদেশের বাণিজ্যের ৯০ ভাগ ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে ভু-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের অবস্থান ভারত চীন আমেরিকা এখানে নিজেদের উপস্থিতি জোরালো ভাবে রাখতে চায়। চীনের ব্যাপারে আমেরিক ও ভারতের লক্ষ্য ও দৃষ্টিভংগী এক। আমেরিকা চীনকে রাজনৈতিক ও সামরিক ভাবে প্রতিহত করতে চায়। এ ব্যাপারে ভারত আমেরিকার প্রক্সি হয়ে কাজ করবে। বাংলাদেশকে কিছুতেই চীনের প্রভাবে যেতে দেয়া যাবেনা। এ কারণেই আমরা ভারত ও আমেরিকার দৌড়ঝাপ প্রকাশ্যে দেখতে পাচ্ছি। দুই পক্ষই সাংবাদিকদের বলছেন, বাংলাদেশকে জংগীবাদের হাত থেকে রক্ষা করা আমাদের লক্ষ্য। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে জংগীবাদ কোথায়? ভারত মনে করে বিএনপি ও জামাত ক্ষমতায় থাকলে জংগীবাদের উত্থান হবে। কিন্তু আমেরিকা মনে করে জামাত একটি মডারেট বা উদার ইসলামিক দল। আমেরিকা বিএনপিকে জংগীবাদের পৃষ্ঠপোষক মনে করেনা। আর আমি মনে করি দুই দেশের অদৃশ্য এজেন্ডা হচ্ছে ইসলাম। যেকোন মূল্যেই হোক বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থানকে সকল শক্তি দিয়ে মুলোত্‍পাটন করতে হবে। ভারত ও আমেরিকা বাংলাদেশে ইসলাম মুক্ত রাজনীতি চায়। এ ব্যাপারে ভারত একাই বাংলাদেশের রাজনীতি দেখভাল করতে চায়, আমেরিকা যেন সরাসরি জড়িত না হয়।
এবারই গণচীন সরাসরি বাংলাদেশের চলমান রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। এ পর্যন্ত এ ব্যাপারে বেশ কয়েকটি বিবৃতি দিয়েছে এবং সরকারের সাথে কথা বলেছে। চীন মনে করে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ভারত আমেরিকা জোট চীনের জন্যে কল্যাণকর নয়। বরং একটা অদৃশ হুমকি। বাংলাদেশে যদি ইসলামী রাজনীতির বিকাশ ঘটে তাতে চীন শংকিত নয়। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতের তাবেদার রাস্ট্রে পরিণত হোক তা চীন চায়না। এ জন্যেই এবারের সর্বশেষ বিবৃতিতে চীন বলেছে তারা একটি উন্নত স্বাধীন বাংলাদেশ দেখতে চায়। স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ সবাই চায়। এটা একটা কূটনৈতিক ভাষাও। ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ শব্দ দুটোর সাথে একটা গভীর অর্থ নিহিত রয়েছে। চীন যেহেতু কয়েক যুগ ধরে ভারত বাংলাদেশ ও দিল্লী-শেখ হাসিনা সম্পর্ককে গভীর ভাবে পাঠ করছে সেহেতু আমরা নিশ্চয়ই ওই শব্দ দুটোর ব্যাপারে শংকিত। এর মানে কি তা হাসিনা ও দিল্লী ভাল করে জানে। মীরজাফর যখন লর্ড ক্লাইভকে গোপন চক্রান্ত করছে ক্ষমতার জন্যে তখন তিনি নাকি বুঝতে পারেন নি সুবেহ বাংলার স্বাধীনতা চলে যাবে। বাংলাদেশের ভাগ্যে কি আছে হয়ত হাসিনা জানেন না। তিনি হয়ত শুধুই তাঁর ক্ষমতায় টিকে থাকা নিয়ে ভাবছেন। সিকিমের লেনদুপ দর্জিও হয়ত শুরুতে শুধু নিজের ক্ষমতা নিয়ে ভেবেছিলেন। নেপালেও তথাকথিত মাওবাদী নেতা প্রচন্ডকে ভারত সমর্থন দিয়ে রাজার পতন ঘটিয়েছে। ভুটানের রাজা আছে কিন্তু রাজ্য নেই। মালদ্বীপেও ভারতপন্থী নাসিদকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার জন্যে ভারত আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। শ্রীলংকায় কয়েক যুগ ধরে তামিল বিদ্রোহীদের উসকিয়ে দেশটির অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেংগে দিয়েছে। শ্রীলংকা শান্তিপূর্ণ ভাবে সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিল। কিন্তু ভারত তা দেয়নি। শেষ পর্যন্ত সামরিক অভিযান চালিয়ে তামিলদের দমন করতে হয়েছে। এটা হচ্ছে শ্রীলংকার জাতীয়তাবাদী প্রেসিডেন্ট রাজা পাকশের ভারত বিরোধী শক্ত অবস্থান। এখন সবাই তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবাদ বিরোধী অভিযোগ আনার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও ভারত কয়েকযুগ ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দিয়ে এসেছে। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে দিয়ে একটা সার্বভৌমত্ব বিরোধী চুক্তি করিয়েছে। শেক হাসিনা একবারের জন্যেই চিন্তা করেননি ওই চুক্তি একদিন বাংলাদেশের অংগহানি ঘটাবে। এইতো ক’দিন আগে সোনিয়াপুত্র কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন,তাঁর পরিবারই পাকিস্তান ভেংগে বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছে ভারতেরই স্বার্থে।
যারা ভারতের রাজনীতি ও কূটনীতি নিয়ে ভাবেন বা চিন্তা করেন তাঁরা জানেন যে, নেহেরুজী অখন্ড মহাভারতের স্বপ্ন দেখেছেন। ভারতের হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের গবেষকরা মনে করেন অখন্ড ভারত প্রতিষ্ঠা সম্ভব। চলমান সময়ে ভারত ও তার গোয়েন্দা বাহিনী সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ নিয়ে কাজ করছে। যার ফলে, বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম বা তরুণরা ধর্মমুক্ত বাংলাদেশের জন্যে কাজ করছে। এজন্যে অর্থের কোন অভাব নেই। বাংলাদেশে বহু মিডিয়া ও সংস্থা এজন্যে কাজ করছে। ভারত এমন একটা পরিস্থিতি ও পরিবেশ তৈরি করতে চায় যখন সবাই বলবে স্থায়ী শান্তির জন্যে ভারতের সাথে চিরস্থায়ী অধীনতামূলক মিত্রতা দরকার। এতদিন ভারত বাংলাদেশের ঘাঁড়ে হাত দিয়ে রাখতো। এবার গলায় বা দাঁত বসিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। সিংহ বা বাঘ যেমন প্রথমেই টুঁটি চেপে রক্ত চুষে নেয়। চীন বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। তাই আমাদের স্বাধীনতা নিয়ে সতর্ক বাণী উচ্ছারণ করেছে। যাঁরা বাংলাদেশের স্বাধিনতা চান তাদের আজ ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জাতীয়তাবাদী ইসলামী শক্তির আজ প্রধান কাজ হচ্ছে ভারতপন্থি রাজনীতি ও সংস্কৃতির হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা। আওয়ামী লীগ বলছে এবার নাকি তাদের জন্যে এটা মুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশকে ইসলাম মুক্ত করে ভারতের তাবেদারে পরিণত করা। আর স্বাধিনতা ও সার্বভৌমপন্থী জাতীয়তাবাদী ইসলামী শক্তিকে জীবন দিয়ে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে। এ সময়ে আমাদের প্রধান মিত্র হবে চীন,মায়ানমার ও মুসলীম বিশ্বের সরকার ও জনগণ। সবাইকে মনে রাখতে হবে জেনে হোক ,অথবা না জেনে হোক শেখ হাসিনা নিজেকে লেনদুপ দর্জিতে পরিণত করতে যাচ্ছে। ভারতের উদ্ধেশ্য হাসিল হয়ে গেলে তারা হাসিনাকেও বাঁচতে দিবেনা।
লেখক: কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
http://www.humannewspaper.wordpress.com

Advertisements

Read Full Post »


বাংলাদেশকে বাঁচাতে সারা দেশবাসী সমঝোতা চায় / এরশাদ মজুমদার

বাংলাদেশ এখন চরম অশান্তির ভিতর দিয়ে অতিবাহিত করছে। সারা দেশে আগুন জ্বলছে। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেংগে পড়েছে। রাজধানী ঢাকা আর কোথাও সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই।প্রখ্যাত প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মুসা বলেছেন,শেখ হাসিনা এখন রিপাবলিক অব ঢাকার প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর তাবেদারেরা বলছেন,সবকিছু স্বাভাবিক এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে। সরকারেথাকলে নাকি নাকের ডগার উপর মাছি বসলেও বুঝা যায় না বা বুঝা যায়না। দেশ আগুনে জ্বলুক, মানুষ মরুক প্রধানমন্ত্রী ঠিক থাকলেই চলে।
দেশ ঠিকভাবে চলছেনা সারা দেশের মানুষ জানেনা। শুধু জানেন না প্রধানমন্ত্রী, রাস্ট্রপতি ও মন্ত্রীসভা। ৭১ সালে গভর্ণর মালেক ও জেনারেল টিক্কা খানও এ রকম বলেছিলেন। গত কয়েক মাস ধরে নির্বাচন কালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আলাপ আলোচনা ও সমঝোতার জন্যে বন্ধুরাস্ট্র গুলো কম চেষ্টা করেন নি। কিছুতেই কিছু হয়নি। কারণ,প্রধানমন্ত্রী বলে দিয়েছেন তিনি সংবিধানের বাইরে এক চুলও নড়বেন না। অথচ সংবিধানটি সংশোধন করেছে তাঁর দল একা। কারো মতামত না নিয়ে। তিনি একাই নাকি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সারা দেশর মানুষ বলছে এ সংশোধনী আনা ঠক হয়নি। কিন্তু গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে মুখের ফেনা তুলে ফেলেছেন।জাতিসংঘের মহাসচীবের বিশেষ দূত তারানকে এর আগেও এসেছেন সমঝোতার পথ খুঁজে বের করতে। কিন্তু কোন সমঝোতা হয়নি। মার্কিন সহকারী পররাস্ট্রমন্ত্রী নাভি পিল্লাই এসেও চেষ্টা করেছেন। লোকে বলে তিনি নাকি মার্কিন রাস্ট্রদূত ডেন মজিনাকে দেখা করার অনুমতি দেননি ছ’মাস ধরে। আমিতো সমঝোতার কোন পথ দেখছিনা। মুসা সাহেব বলেছিলেন, সমস্যার সমাধান রাস্তাতেই হবে। আলোচনায় কিছু হবেনা।
আওয়ামী ঘরাণার বুদ্ধিজীবী, লেখক, কবি, সাংবাদিক শিক্ষকরা মনে করেন বিষয়টা নির্বাচন নয়।বিষয়টা হচ্ছে আদর্শগত। তাঁরা মনে করেন,আওয়ামী লীগ ও তার ঘরাণার লোকেরা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের লোক আর বাকিরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধের লোক। যদি ধরে নিই যে, আওয়ামী জোট ৪০ শতাংশ ভোট পায় তাহলে ৬০ শতাংশ ভোট কারা পায়? ৬০ শতাংশ ভোটার সবাই কি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী? শুনেছি,ভারতও মনে করে আওয়ামী লীগ ছাড়া বাকিরা ভারতের বন্ধু নয়। তাই ভারত চায় যে কোন ভাবেই হোক আওয়ামী লীগ ভোটে জিতুক। কাদের সিদ্দিকী বলেছেন দিল্লী শেখ হাসিনাকে ভালবাসলেও ক্ষমতায় বসাতে পারবেনা। ক’দিন আগে সুজাতা সিং এসেছিলেন হাসিনার অধীনেই সব দলকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করাবার জন্যে। তিনি জেনারেল এরশাদকে বলেছেন,নির্বাচনে অংশ না নিলে জামাত ক্ষমতায় চলে আসবে। কিন্তু তিনি কোন দলকেই রাজী করাতে পারেননি।
নির্বাচন কালীন সরকারের ধরন ও প্রকৃতি নিয়ে বাংলাদেশ এখন মহা টাল মাটাল অবস্থায় নিপতিত। দেশের প্রধান বিরোধী দল ও তার জোট নির্দলীয় নির্বাচনী সরকার না হলে নির্বাচনে যাবেনা বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। তরিকত ফেডারেশন নামের একটি ক্ষুদ্র ধর্মীয় গ্রুপ(ভারতপন্থী) নির্বাচনে অংশ নিবে বলে জানিয়েছে। এদের একটি ম্যগাজিন আছে যার সম্পাদক একজন বিদেশী মহিলা,যাঁর নাম মাসুদা ভাট্টি। ইনি ভারতের সাথে তরিকতের যোগাযোগ রক্ষা করেন। অপরদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার জোট( হাজার খানেক ভোট) তথাকথিত গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখা ও সংবিধানের দোহাই দিয়ে এক তরফা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাহ্যত দলের বা জোটের সিদ্ধান্ত বলে মনে হলেও শেখ হাসিনাই নাকি একাই কারো কথা বা পরামর্শ না শুনে একাই নির্বাচন করার জন্যে গোঁ ধরেছেন। তাই তিনি একজন স্বেচ্ছাচারী সিভিল ডিক্টেটরের মতো একাই এক তরফা নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। টিভি টকশোতে দেখলাম আওয়ামী ঘরাণার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক যিনি আওয়ামী লীগের পক্ষে সাফাই গাইবার জন্যে নিয়মিত টকশোতে আসেন,তিনি একটি সত্যকথা বলে ফেলেছেন। কৌশলগত কারণে তাঁর এমন কথা বলা উচিত হয়নি। শিক্ষক মহোদয়( সাহেব বললাম না) বলেছেন,প্রধানমন্ত্রী এখন বিরোধী দলের দাবী মেনে নেন তাহলে নির্বাচনের আগেই তাঁর দলের পরাজয় হয়ে যাবে। তাই এই সময়ে এই দাবী মানা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। তাই প্রধানমন্ত্রী তাঁর অবস্থান থেকে একচুল ও নড়বেন না। প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানের সমর্থনে নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি করে নির্বাচনী তফশলী ঘোষণা করে দিলেন। যদিও বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোট বলেছিল বিনা সমঝোতায় তফশীল করলে তাঁর কঠের আন্দোলনে যাবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন,তিনি সমঝোতার জন্যে অপেক্ষা করবেন, কারণ তিনি একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দেখতে চান। তিনি চান সবদল নির্বাচনে অংশ গ্রহন করুক। কিন্তু দেখা গেল তিনি তাঁর কথা রাখতে পারেননি। তফশীল ঘোষণার পর জ্বালাও পোড়াও শুরু হয়ে গেলে তিনি বললেন, বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নিলে তিনি তফশীল পরিবর্তন করবেন। যদিও ইতোমধ্যে সহিংস আন্দোলনের ফলে বহু জীবন ঝরে গেছে, বহু সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু শেখ হাসিনার টনক নড়েনি। তিনি বিগত ৮/৯ মাসে কয়েকশ’ অন্দোলনরত মানুষকে হত্যা করে বিরোধী দলের নেতৃকে গণহত্যাকারী হিসাবে অভিযুক্ত করেছেন।
প্রশ্ন হলো শেখ হাসিনা এমন ধ্বংসাত্মক রাজনীতির পথে এগিয়ে গেলেন কেন? তিনি বার বার বলছেন, আমি শান্তি চাই ,ক্ষমতা চাইনা। এত প্রাণ হানি আর সহ্য করতে পারছেন না। এ কথা বলে তিনি পবিত্র ওমরা পালনের জন্যে মক্কাশরীফ গেলেন আত্মীয় স্বজন নিয়ে। অনেকেই ধারণা করেছিলেন তিনি ফিরে এসে ক্ষমতা ত্যাগ করবেন অথবা বিরোধী দলের সাথে ফলপ্রসু আলোচনা শুরু করবেন। না তিনি কিছুই করলেন না। তাঁর আচার আচরনে তেমন কোন পরিবর্তন ও দেখলাম না। শুধু দেখলাম,ওমরার নমুনা হিসাবে মাথায় কালো আর সাদা রংয়ের ওমরা টুপি পরতে শুরু করেছেন। এর আগেও তিনি নির্বাচনের আগে ওমরা বা হজ্ব করে হিজাব পরেছেন। তাঁর দলের লোকেরা প্রচার করেছেন, শেখ হাসিনা নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন ও কোরআন তেলাওয়াত করেন। এমন কি তিনি তাহাজ্জুদের নামাজও পড়েন। যদিও আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা ভোটের জন্যে শেখ হাসিনার এমন আচরন পছন্দ করেন না। তবে অনেকেই ভোটের কৌশল হিসাবে এমন আচরন সমর্থন করেন।
টকশোতে দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল প্রচারিত অধ্যাপক মুনতাসির মামুন বলছেন,চলমান রাজনীতিতে সমঝোতার কোন সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশর চলমান রাজনৈতিক সংকটকে ছোট ক্যানভাসে বা ছোট গন্ডিতে দেখলে সমঝোতার কোন প্রয়োজন নেই। দেশে বিদেশে সবাই বলছেন, দেশের স্বার্থেই সমঝোতা দরকার ও অপরিহার্য। কিন্তু অধ্যাপক মুনতাসির মামুন তা মনে করেন না। তিনি বিষয়টাকে দেখছেন তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আদর্শের দিক থেকে। তিনি বলছেন,এ সংকট নির্বাচনী সংকট নয় বা কোন দলীয় সংকট নয়। আদর্শগত কারণেই নাকি এ সংকট দেখা দিয়েছে। সে আদর্শ হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ। তিনি মনে করছেন, আওয়ামী লীগ ও তার ঘরাণার লোকেরা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি আর বিএনপি ও ১৮দলীয় জোট মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি বা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি। সুলতানা কামাল সহ এ জাতীয় আরও যাঁরা আছেন তাঁরা কিছুতেই সমঝোতা চান না। একজন মন্ত্রীতো বলেই দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। সুতরাং তিনি মনে করেন এই দুই বিপরীত চিন্তাধারার মাঝে সমঝোতার কোন প্রশ্ন উঠেনা। মনে হলো সমঝাতা তিনি চান না বা সমঝোতা না হলেই তিনি খুশী। মুনতাসির মামুন একটি বিখ্যাত শিক্ষিত পরিবারের সদস্য। আমার যতদূর মনে পড়ে তাঁর বাবা চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাষ্টের সচীব ছিলেন। সময়টা মনে হয় ৬২-৬৫ সালের দিকে। তিনি খুবই বিনয়ী মানুষ ছিলেন। এ কারণে তাঁর সাথে আমার খুবই ভাল সম্পর্ক ছিল। তাঁর চাচা প্রেসিডেন্ট জিয়া অনুগত সাবেক আমলা ও মন্ত্রী মহিউদ্দিন আলমগীর সাহেবও ফেণীর বিখ্যাত রাজনীতিক ও সমাজ সেবক খাজা আহমদ সাহেবের ভাতিজী জামাই। খাজা সাহেবেরাও ফেণীর বিখ্যাত পরিবারের সদস্য। মুনতাসির মামুন নাকি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পারেন নি। ওই সময়ে তিনি রাজধানী ঢাকাতেই ছিলেন। কিন্তু তাতে কি আসে যায়,এখন তাঁর ভিতর মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে কয়েক হাজার গুন বেশী চেতনা আছে। এখনতো চারিদিকে শুনি,মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করাটা বড় বিষয় নয়, চেতনা থাকাটা জরুরী। মুনতাসির সেই চেতনায় সমৃদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে এসব অমুক্তিযোদ্ধা মুলত ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলেন। আমরা যখন বলে বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মুসলমান এবং সেজন্যেই দেশটি স্বাধীন হতে পেরেছে। পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসেছে ধর্মত্যাগ করার জন্যে নয়। কিন্তু চেতনাওয়ালারা প্রচার করেন বাংলাদেশ বাংগালীদের দেশ। ইসলাম বা মুসলমানিত্ব এখানে মূল বিষয় নয়। এর পিছনে ভারতের একটা গভীর ষড়যন্ত্র আছে। ভারত চায় বাংলাদেশের জনগণের ধর্মীয় চেতনাটা ধীরে ধীরে লোপ পাক এবং কালক্রমের তরুণ প্রজন্ম ধর্মহীন হয়ে পড়বে। তখন বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। এ বিষয়ে আমি বহুবার লিখেছি। দিল্লীর একটি সুদূর প্রসারী দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে। ভারতের নিকট প্রতিবেশীরা সবাই হিন্দু।এ ব্যাপারে ভারত খুব বেশী উদ্বিঘ্ন নয়। ভারত মনে করে বাংলাদেশে ইসলাম যদি আদর্শ হিসবে শক্তিশালী হয় তাহলে একে পোষ মানানো কঠিণ হবে। এমন কি ভারত আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে পশ্চিমাদের সহযোগিতায় একটি খৃষ্টান রাস্ট্রে পরিণত করতে চায়। যেমন পশ্চিমারা ইন্দোনেশিয়ার একটি দ্বীপে গোলযোগ লাগিয়ে সে দ্বীপটাকে স্বাধীন করেছে। কারণ দ্বীপটি খৃষ্টান প্রধান ছিল। আওয়ামী লীগ ও তার বুদ্ধিদাতাগণ এখন যা করছেন তাতে আগামী ৫০ বছরে এদেশের স্বাধীনতা থাকবেনা। আসলে বেকুব কোন জাতির স্বাধীনতা থাকেনা। এ ব্যাপারে ভারতেরও একটা অবস্থান আছে,যা ভারত স্পষ্ট করতে চায় না । হয়ত কালক্রমে করবে। ভারত মনে করে তারা সমর্থন না করলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতোনা ন’মাসে। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে পরিণত হতো। যেমন কাশ্মীর ও ফিলিস্তিনে চলছে। এমন কি ভারতের পুর্বাঞ্চলেও স্বাধীনতা আন্দোলন চলছে। শেখ হাসিনা আজ না বুঝেই ভারতের খপ্পরে পড়ে গেছে। মীরজাফরও না বুঝেই ক্লাইভের পাল্লায় পড়ায় অখন্ড বংগদেশের স্বাধীনতা চলে গিয়েছিল। গওহর রিজভী নামক একটি লোকের নাম আমরা হঠাত্‍ শুনতে পাচ্ছি। এ লোকটি সম্পর্কে এর আগে বিস্তারিত লিখেছিলাম।ইনি উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন। ভদ্রলোককে আমদানী করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পুত্র জয়। ইনি একজন আন্তর্জাতিক এনজিও আমলা। ভাড়া খাটা তাঁর কাজ।
আমি বিশ্বাস করি ভারতীয় লবীর কিছু কবি সাহিত্যিক শিক্ষক বুদ্ধিজীবী ছাড়া বাংলাদেশের ১০০ ভাগ মানুষই দেশের স্বাধীনতার জন্যে জীবন দিতে প্রস্তুত এবং তাঁরা ওই লবীর বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধ আমি দেখেছি এবং এর ভিতরেই ছিলাম। এর আগে অনেকবার বলেছি, ৭১ সালে কিছু অবুঝ হিংস্র ও রাজনৈতিক জ্ঞান ও বিবেক বর্জিত পাকিস্তান সেনা বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাত থেকে বাঁচার জন্যে অনেকেই পালিয়ে বেড়িয়েছে। আবার অনেক বন্ধু পাকিস্তানীদের সহযোগিতা করেছে পালাতে না পেরে। যেমন জামাতের তত্‍কালীন নেতা খুররম মুরাদ সাহায্য করেছেন শ্রদ্ধেয় আবুল মনসুর সাহেবের ছেলে মাহফুজ আনামকে। মাঝফুজ খুররম মুরাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সে সময়ে মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন বহু মানুষ একে অপরকে সাহায্য করেছেন। এ রকম বহু ঘটনা আছে। আবার অনেকেই নিষ্ঠুরতার স্বীকার হয়েছেন। অনেক গবেষক বলেছেন সে নিষ্ঠুরতা উভয় দিক থেকে হয়েছে। একদল জিতেছে,আরেকদল হেরে গেছে। যেমন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৩ জন যুদ্ধাপরাধী ছিলেন যাদের বংগবন্ধু ছেড়ে দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক চাপের কারণে। তেমনি বাংলাদেশে স্থায়ী বাসিন্দা কিছু বাংগালী যুদ্ধাপরাধী ছিলেন যাদের কোন বিচার বংগবন্ধু করেন নি জাতীয় ঐক্য ও সংহতির জন্যে। জিয়াউর রহমান সাহেবও জাতীয় ঐক্য ও সংহতির রাজনীতি করেছেন। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত তাঁর রাজনৈতিক দল বিএনপি আজ জাতীয়তাবাদী ইসলামী শক্তির প্রতীক। দেশের কোটি কোটি মানুষ এই দলটিকে সমর্থন করে। নির্বাচনে এই বক্তব্য বার বার প্রমানিত হয়েছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৯০ ভাগ মুসলমান। কিছু আরবী নামধারী মানুষ ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে গোপনে অবস্থান নিয়েছে। এদের বেশীর ভাগই শিক্ষিত ও নিজেদের তথাকথিত সেক্যুলার(ধর্মহীন) বলে উচ্চ কন্ঠে প্রচার করে। এদের বেশ কিছু ভাল মানুষও আছেন,কিন্তু তারা বিভ্রান্ত। এদের অনেকেই বলে থাকেন আমরা মুসলমান,আল্লাহ রাসুলে বিশ্বাস করি। কিন্তু ধর্ম চর্চা করিনা বা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করিনা। তবে একেবারেই ইসলামে বিশ্বাস করেনা এমন লোকও কয়েকশ’ থাকতে পারেন। এরা কখনই প্রকাশ্যে ইসলামের বিরোধিতা করেনা।
আমি নিজেও পুরো যৌবনকাল বাম চিন্তাধারার সাথে জড়িত ছিলাম। আমার কিছু শিক্ষকের প্রভাবে পড়ে মনে করতাম সমাজতন্ত্র কায়েম হলে মানুষের দু:খ দুর্দশা দূর হবে। তবে আমি কখনই খোদা বিরোধী ছিলাম না। আমি মাওলানা ভাসানীর ইসলামী সমাজতন্ত্র ও হক্কুল এবাদে বিশ্বাস করতাম। আমি এখনও ইসলামী সমাতন্ত্রে বিশ্বাস করি। আমি হজরত আবু জর গিফারীর(রা) একজন ভক্ত। আমি বিশ্বাস করি ইসলাম একটি বিপ্লবী ধর্ম। কার্ল মার্কস ও এম এন রয় ও বলেছেন ইসলাম একটি রেডিক্যাল ধর্ম।
আমার আজকের বিষয় হলো চলমান সংকটের সমাধানের জন্যে একটা সমঝোতা। সারা দেশবাসী সমঝোতা চায়। এর সমাধান শেখ হাসিনার হাতে। কিন্তু তিনি ৭১ সালের টিক্কা খানের মতো ব্যবহার করছেন যা দেশকে বর্তমান সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। জাতিসংঘ ও বিশ্বের সকল মিত্রদেশ নির্বাচন কালীন সরকার নিয়ে একটা উইন উইন সিচুয়েশন চান। সে পথ অবশ্যই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। নির্বাচন হতেই হবে। জরুরী অবস্থাও নয় সামরিক হস্তক্ষেপও নয়। নিশ্চয়ই সমাধান আছে। তবে এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে বেশী ছাড় দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো শিকড়বিহীন তথাকথিত ভারতীয় দালাল বুদ্ধিজীবীদের খপ্পরে পড়ে নিজের পারিবারিক ঐতিহ্য ধ্বংস করবেননা। দেশের অন্যতম বৃহত্তম জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলের নেত্রী খালেদা জিয়াও অনুরোধ করবো কিছুটা হলেও নমনীয় হোন এবং নির্বাচন করুন। যদি আপনারা সমঝোতার পথ খুঁজে না পান সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ। আমরা বিশ্ববাসী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বো।
লেখক: কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
http://www.humannewspaper.wordpress.com

Read Full Post »


এক সময় রাজনীতিতে আদব লেহাজ ছিল। শুধু রাজনীতি নয় সামাজিক আচার আচরনেও একটা মুল্যবোধ ছিল। আমাদের ছাত্র জীবনে আমরা সব সময় রাজনীতিবিদদের সম্মান করতাম তিনি যেই দল বা মতেরই হোন না কেন। এটা ছিল সামাজিক আদবের অংশ। এটাই ছিল আমাদের দেশের কালচার। সমাজ শিক্ষিত ও মানী লোকদের সম্মান করতে। হয়ত ৫০ বছর আগেও ট্রেনে ছাত্রদের বিশেষ সম্মান দেখানো হতো। রাজধানীতে রিকশাওয়ালা বা ঘোড়ার গাড়ী ওয়ালা ছাত্রদের সম্মান করতো। আমাদের সময়েও ছাত্রলীগ বা ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে আমরা ছিলাম পরম বন্ধু। নাটক সাহিত্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সকল ছাত্র প্রতিষ্ঠানের সদস্যরাই অংশ নিতো। বন্ধুতে বন্ধুতে হাতাহাতি,খেলা নিয়ে বা নাটক বা অভিনয় নিয়ে বচসা বা ছোটখাট ধাক্কা ধাক্কি হতোনা যে তা নয়।
আমার স্কুল জীবনে প্রথম যে রাজনীতিবিদের সাথে পরিচয় হয় তিনি ছিলেন ‘ফেণীর রাজা’ খাজা আহমদ সাহেব। শুনেছি,লবণ আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে তিনি স্কুল থেকে বহিস্কৃত হয়েছিলেন। তিনি প্রথম জীবনে বামপন্থী রাজনীতি করতেন। ৫৪ সালে গণতন্ত্রী দলের সদস্য হিসাবে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন। পরে ১৯৬২ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তিনি যে দলই করুন না কেন তিনি ছিলেন সকলের নেতা। আমার প্রথম কবিতা তাঁর কাগজেই ছাপা হয়। ও রকম নেতা এখন আওয়ামী লীগে একজনও নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন দলমত নির্বিশষে সকলের ঠিকানা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হকিষ্টিক, সাইকেল চেইন ও সাপ এসেছে গভর্ণর মোনায়েম খান সাহেবের আমলে। তখন এনএসএফ নামে একটি ছাত্র সংগঠন ছিল যা সরকারকে সমর্থন করতো। তবে এনএসএফে ভাল ভাল ছাত্ররাও ছিলেন। এই অবস্থা ছিল ৭০ সাল নাগাদ। ৬৯এর দিকে উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের সময় ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা আবদুল মালেক পিটিয়ে হত্যা করেছে ছাত্রলীগ ও মস্কোপন্থি ছাত্রনেতারা। সামরিক আইন জারী হয়ে গেলে মালেক হত্যা মামলাটি বিচারের জন্যে সামনে চলে আসে। মালেক হত্যা মামলার একজন আসামী ছিলেন মাহফুজ আনাম। ইনি বিখ্যাত সাহিত্যিক ও রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদ সাহেবের ছেলে। বিষয়টি জানতে পারলাম উর্দুতে লেখা খুররম মুরাদ সাহেবের স্মৃতিকথা মূলক বই ‘লমহাত’থেকে। ইংরেজীতে মোমেন্টস আর বাংলায় বলা যেতে পারে মূহুর্তগুলো। খুররম মুরাদ সাহেব ছিলেন ওই সময়ে ঢাকা মহানগর জামাতে ইসলামীর সভাপতি। আর তিনি যে কোম্পানীতে চাকুরী করতেন সেখানে আবুল মনসুর সাহেবের বড়ছেলে মঞ্জুর আনামও চাকুরী করতেন। খুররমের সাথে মঞ্জুর আনামের খাতির ছিল। এই সুবাদে মাহফুজ আনামের বিষয়টি নিয়ে মঞ্জুর আনাম খুররমের সাথে আলাপ করেন এবং সহযোগিতা কামনা করেন। খুররম সাহেব বিষয়টি তদন্ত করেন এবং জানতে পারেন যে, মাহফুজ ওই ঘটনায় জড়িত ছিলেন না। এর মাধ্যমে খুররম সাহেবের সাথে আবুল মনসুর সাহেবের পরিবারের একটি ঘনিষ্ট সম্পর্ক তৈরি হয়। ৭১ সালে পাকিস্তানের পতন ও পরাজয়ের পর খররম সাহেব আবুল মনসুর সাহেবের ধানমন্ডীর বাসায় আশ্রয় গ্রহন করেন। আবুল মনসুর সাহেব খুবই আপনজনের মতো খুররমকে সাহায্য ও সহযোগিতা করেন। এক পর্যায়ে তাঁকে ক্যান্টনমেন্টে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হেফাজতে পৌঁছে দিলে তিনি পাকিস্তান যেতে সক্ষম হন।আবুল মনসুর আহমদ সাহেব যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন খুররমের সাথে তাঁর যোগাযোগও সুসম্পর্ক ছিল। খুররম মাঝে মাঝে বাংলাদেশে আসেন তাঁর নিকট আত্মীয়দের দেখার জন্যে। এই তথ্যটি উল্লেখ করার কোন বদ উদ্দেশ্য নেই । শুধুমাত্র সে সময়ের রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্কে মুল্যবোধ, শিষ্টাচার কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বুঝাবার জন্যেই উল্লেখ করেছি। শুধু একবার ভাবুন,সে সময়ে আবুল মনসুর আহমদের পুত্র মাহফুজ আনামের নাম যদি আসামী তালিকা থেকে বাদ না দেয়া হতো তাহলে পুরো ঘটনা পরবর্তী পর্যায়ে কিভাবে ঘটতো।
এখন কি এ রকম ঘটনা ঘটা সম্ভব? আমারতো মনে হয় সম্ভব নয়। এখন রাজনীতিতে হিংসা বিদ্বেষ, হানাহানি মারামারি সীমাহীন ভাবে বেড়ে গেছে। খালেদা জিয়া আর হাসিনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক দেখেই আপনারা ভাবুন। তাঁদের ভিতর কিসের বিরোধ? আমরাতো মনে করি তাঁর দুজনই দেশের কল্যাণে নিবেদিত। দুজনের লক্ষ্যই বাংলাদেশের কল্যাণ। তাহলে দুজনের মাঝে এত দূরত্ব কেন? তবে ব্যক্তিগত জীবনে দুজনের ভিতর অনেক ফারাক। একজন খুবই কম কথা বলেন। আরেকজন বেশী কথা বলতে ভালবাসেন। একজন পিতার ঐতিহ্যে রাজনীতিতে এসেছেন। কিন্তু স্বামী ছিলেন একজন বিজ্ঞান গবেষক। তোমন কথা বলতেন না। কখনও সখনও বললেও কথার ভিতর পরিমিতি বোধ ও পরিশীলন ছিল। ইনি হচ্ছেন ড.ওয়াজেদ। অপরদিকে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একজন সামরিক অফিসারের স্ত্রী। কঠোর নিয়মানুবর্তিতার ভিতর জীবন যাপন করেছেন। ইনি রাজনীতিতে এসেছেন সময়ের প্রয়োজনে বাধ্যতামূলকভাবে। তাঁর স্মামী জিয়া সাহেবের প্রতিষ্ঠিত দল রক্ষার জন্যে। শেখ হাসিনা ছাত্র বয়সে রাজনীতি করেছেন। কিন্তু তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা ও অবিসংবাদিত নেতা বংগবন্ধু শেখ মুজিবের ওই রকম মর্মান্তিক মৃত্যু না হলে তিনি রাজনীতিতে আসতেন কিনা সন্দেহ ছিল। বেগম খালেদা জিয়া ও প্রেসিডেন্ট জিয়া দুজনই রাজনীতিতে এসেছেন অবাক এক মূহুর্তে। দেশবাসী প্রথম জিয়া সাহেবের নাম শুনে ১৯৭১ সালের ২৬/২৭শে মার্চ। অচেনা এক মেজর হঠাত্‍ করে রেডিওতে ঘোষণা দিলেন, আমি মেজর জিয়া বলছি। আমি স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা দিচ্ছি। বিশ্ববাসীকে আহবান জানাচ্ছি আমাদের সমর্থন জানাবার জন্যে। সে সময়ে বহু নামী দামী রাজনীতিক নেতা ও উচ্চ মর্যাদা সামরিক অফিসার ছিলেন। কিন্তু ভাগ্য জিয়া সাহেবকেই টেনে এনে সামনে দাঁড় করিয়েছে। শুরু হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ। দীর্ঘ বিরতির পর আবার জিয়া সাহেবের নাম শুনলাম ১৯৭৫ সালের ৭ই নবেম্বর। তিনি আবার রেডিওতে আসলেন এবং শৃংখলা বিহীন সৈনিকদের আহবান জানালেন ব্যারাকে ফিরে যেতে। ভাগ্যই জিয়াকে বার বার ঠেলে পর্দার পেছন থেকে সামনে নিয়ে এসেছে। জিয়া সাহেবের সাথে আমার বহুবার দেখা হয়েছে,খুব ঘনিষ্টভাবে কথা হয়েছে। বংগবন্ধুর সাথেও আমার বহু ঘনিষ্ট মূহুর্ত আছে।
জিয়া সাহেবের চরিত্রে সম্রাট আওরংজেবের বেশ কিছু গুন আছে বলে আমার মনে হয়েছে। জানিনা আমি ভুল কিনা। মওদুদ সাহেব ও জিয়া সাহেব সম্পর্কে তাঁর ‘চলমান ইতিহাস’বইতে একটি বিশ্লেষণ দিয়েছেন। জিয়াকে জাতির নেতায় পরিণত করেছে তাঁর সততা ও চরিত্রের দৃঢতা। তাঁর সততার বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোন মহলই কোন অভিযোগ আনতে পারেনি। জিয়া সাহেব তাঁর প্রথম উপদেষ্টা কমিটিতে যাঁদের নিয়েছিলেন তাঁরা সবাই ছিলেন দেশের জ্ঞানী গুণী। শুনেছি তিনি নাকি তাঁদের সবাইকে স্যার বলে সম্বোধন করতেন এবং সেভাবেই সম্মান দেখাতেন। রাস্ট্রপতি বা দেশের প্রধান নির্বাহী হিসাবে তিনি কখনওই তেমন ভাব দেখাতেন না। আজকের এ লেখার প্রধান লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক শিষ্টাচার। যা কমতে এখন প্রায় শূণ্যের কোঠায় এসে গেছে। সেটা জাতি অনুধাবন করেছে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেত্রীর ফোনালাপ থেকে। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের নেত্রীকে নৈশভোজের দাওয়াত দিতে গিয়ে যেসব কথা উত্থাপন করেছেন তা একেবারেই সৌজন্য বর্জিত। ক’দিন আগে ‘নিউ এজ’সম্পাদক নুরুল কবীর টকশোতে বলেছেন,ওই আমন্ত্রণে কোন মর্যাদাবান মানুষ অংশ গ্রহন করতে পারেনা। দাওয়াত দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী যেসব বিষয়ের অবতারনা করেছেন তা নিম্ন রুচির পরিচায়ক বলেই ভদ্র সমাজ মনে করেছেন। অবশ্য আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী মনে করছেন প্রধানমন্ত্রীকে অসম্মান করেছেন। সারাদেশে আওয়ামী জাতি এক সাথে হুক্কা হুয়া করতে লাগলো। এটা অবশ্য আওয়ামী সংস্কৃতির একটা মহান গুন। আমি নিজে চোখে দেখেছি বংগবন্ধু মাওলানা ভাসানীকে কিভাবে সম্মান করতেন। যেকোন অবস্থায় ও পরিস্থিতিতে তিনি মাওলানা সাহেবকে স্মরণ করতেন। এমনও শুনেছি ও দেখেছি তিনি পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের খোঁজ খবর নিয়েছেন। তখন পুরাণো নেতাদের বেশীর ভাগই জেলখানায় ছিলেন। তিনি তাঁদের পরিবার পরিজনের খবর নিয়েছেন। অনেককে নানাভাবে সাহায্য করেছেন। জাতীয় ঐক্য ও বৃহত্তর শান্তির জন্যে তিনি কোন ধরণের রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেননি। বাংগবন্ধুর পরে যাদুমিয়া, মিজান চৌধুরী, মালেক উকিল,শাহ আজিজ,সবুর খান, আতাউর রহমান খান,আসাদুজ্জমান সাহেব পর্যন্ত সৌহার্দের সংস্কৃতি বজায় ছিল। জিয়া সাহেব নিজেও পুরাণো সকল রাজনীতিককে সম্মান দেখিয়েছেন। ৭৯ সালের সংসদে বহু পুরাণো নেতার উপস্থিতি ছিল। আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতারা মনে করেন জিয়া সাহেব রাজাকার ও স্বাধীনতা বিরোধীদের পুণর্বাসন করেছেন। বংগবন্ধু যে কারণে এদের বিরুদ্ধে কোন ধরণের অপমান জনক ব্যবস্থা গ্রহন করেননি,ঠিক একই কারণে জিয়া সাহেব সবাইকে সম্মানিত করেছেন।
বংবন্ধুর পরের আওয়ামী জেনারেশনের কাছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মানে শত্রু। এই মানসিকতাই ধরা পড়েছে খালেদা জিয়ার সাথে শেখ হাসিনার ব্যবহার ও সৌজন্যতা। আমাদের বন্ধু মরহুম মুজাফফর যখন নিউ নেশনে কাজ করতেন তখন একবার শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করেছিলেন তাঁর ভাষা , সংস্কৃতি ও ভাব ভংগী সম্পর্কে। উত্তরে হাসিনা বলেছেলেন, এটাই আমার পরিবারের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। বংবন্ধু মাঠের বক্তৃতায় প্রতিপক্ষকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করতেন, কিন্তু কোন ধরণের অশালীন কথা বলতেন না। ব্যক্তিগত পর্যায়ে দেখা হলে তিনি সবাইকে সম্মান দেখাতেন। সত্যি কথা বলতে কি এখন আওয়ামী লীগের কোন নেতাই সুন্দর ও পরিশীলিত ভাষায় কথা বলতে পারেন না। মুখ খুললেই মনে হয় তাঁরা ঝগড়া ফাসাদ করছেন। তোফায়েল সাহেবেরতো গলা ফুলে যায়, চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায়। এরা সকলেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের ভাষা ও শব্দ প্রয়োগ করেন। আমার ধারণা তাঁরা সাধারন মানুষকে তুষ্ট করার জন্যেই হয়ত এ ধরণের ভাষা ও শব্দ ব্যবহার করেন। গালাগাল করে কথা বলা বহু তথাকথিত সামাজিক ভদ্রলোকের পারিবারিক ঐতিহ্য। যেমন খুব ভাল মানুষের সন্তান নাসিম সাহেব কথায় কথায় বলেন,আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা এনেছে,গণতন্ত্র এনছে, স্বাধিনতা ও গণতন্ত্র আওয়ামী লীগই রক্ষা করবে। ভদ্র ও পরিশীলীত ভাষার লোকেরা সবাও আোয়ামী লীগ ছেড়ে চলে গেছে। বিনীত পরিশীলীত জনেরা নাকি এদলে থাকতে পারেন না। আমার একথা গুলো খুবই কটু শুনা যাচ্ছে। অনেকেই বলবেন, এমন লোক কি বিএনপি বা অন্যদলে নেই? আমি বলবো হয়ত আছে, কিন্তু তারা দৃশ্যমান নয়। আগেই বলেছি শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়ার কথাবার্তায় আকাশ পাতাল ফারাক। সেজন্যেই আওয়ামী লীগের অনেকেই বলেন,আমাদের নেত্রী কথা বললেই আমাদের ভোট কমে যায়। দুই নেত্রীর ফোনোসংলাপেও বিষয়টি উঠে এসেছে।
আমাদের চলমান রাজনীতির অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক উপাদান হলেন হোমো এরশাদ। তাঁর ভাষা বা কথাবার্তা সহনীয়। কিন্তু মানুষটাই একেবারে পঁচা দুর্গন্ধময়। এমন একটি মানুষ এদেশের সেনাপ্রধান ছিলেন, জোর করে দেশের রাস্ট্র প্রধান হয়েছেন। স্বৈরাচার হিসাবে তাঁর বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন হয়েছে। দেশের মানুষ তাঁকে টেনে হিচড়ে ক্ষমতা থেকে নামিয়েছে। এই নিন্দিত মানুষটির সাথে কেন যেন শেখ হাসিনার একটি গোপন সম্পর্ক আছে যে সম্পর্কটি দিল্লী নির্ধারন করে দিয়েছে। জোর করে ক্ষমতা দখলের পরে শেখ হাসিনা বলেছিলেন,তিনি অখুশী নন। কোলকাতার পত্রিকায় লিখেছে বন্দুকের নলে প্রজাপতি। এরশাদ নিজেও বলেছেন,তিনি দিল্লীর সাথে কথা বলেই ক্ষমতা দখল করেছেন। দেশের মানুষ বুঝতে পারে এরশাদ সাহেবের সাথে দিল্লীর একটা গোপন সম্পর্ক আছে। কেন যে এই মানুষটাকে প্রেসিডেন্ট জিয়া সেনাপ্রধান করেছিলেন তা বোধগম্য নয়। পাকিস্তান ফেরত ও ভারতে গোপন ট্রেনিং প্রাপ্ত লোকটাকে হয়ত জিয়া অনুগত হিসাবে পাবেন আশা করেছিলেন। অনেকেরই ধারণা এই লোকটাই জিয়া সাহেবকে হত্যা করেছে।রাজনীতির বিশ্লেষকরা অনেকেই বলে থাকেন, শেখ হাসিনা ও এরশাদ দুজনেই দীর্ঘকাল ভারতে অবস্থান করেছে। ভারতীয় গোয়েন্দাদের সাথে দুজনেরই গভীর সম্পর্ক।
আমরা বাল্যকাল থেকেই শুনে আসছি রাজনীতিকরা ব্যক্তিগত জীবনে একে অপরের বন্ধু। পুরাণো রাজনীতিকরা প্রায় সবাই শেখ সাহেবের বন্ধু ছিলেন অথবা মুরুব্বী ছিলেন। শুনেছি, কমিউনিষ্ট নেতা তোয়াহা সাহেবের হুলিয়া জারী হলে তিনি তাজউদ্দিন সাহেবের বাসায় ছিলেন কিছুদিন। শেখ সাহেব বিষয়টা জানতেন। শখ সাহেব নিয়মিত মাওলানা ভাসানীর খবর নিতেন। রাজনৈতিক বক্তৃতায় মাওলানা সাহেব পুত্রসম শেখ সাহেবকে বহু বকাঝকা করতেন, কিন্তু কখনই বাজে কথা বলতেন না। শেখ সাহেব নিজেও কখনই বলতেন না। দেশের মানুষ সবাই জানেন, মাওলানা সাহেব আর শেখ সাহেবের ভিতর পিতাপুত্রের মতো সম্পর্ক ছিল। ভারতের প্রভাব মুক্ত থাকার জন্যে শেখ সাহেব সব সময় মাওলানা সাহেবের সহযোগিতা নিয়েছেন। এখন রাজনীতিতে সেই সুদিন আর নেই। এর একমাত্র কারণ ভারত। অখন্ড বংগদেশের এসেম্বলীর স্পীকার ও পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিন সাহেবের স্থাবর সম্পদ সরকার অধিগ্রহন করার তাঁর পরিবারের সদস্যরা শেখ সাহেবের সাথে দেখা করলে শেখ সাহেব তা মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও ভাষার ব্যবহার নিয়ে ক’দিন আগে আমার বন্ধু সৈয়দ আবুল মাকসুদ একটি কলাম লিখেছেন। আমি তাঁর বক্তব্যের সাথে একমত। সৈয়দ আবুল মকসুদ মাওলানা ভাসানী সাহেবের উপর একটি গবেষণাধর্মী বই লিখেছেন। আমি নিজে মাওলানা সাহেবের একজন পরম ভক্ত। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের মহাসচীবই ভাষাগত দিক থেকে বেশ কিছুটা পরিশীলিত। তবে সৈয়দ আশরাফ সাহেব দলীয় সংস্কৃতির কারণে মাঝে মাঝে পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষা করতে পারেন। তাঁর মরহুম পিতা সেয়দ নজরুল সাহেব খুবই বিনীত মানুষ ছিলেন। তিনি কখনই উচ্ছ কন্ঠে কথা বলতেন না। সৈয়দ আশরাফ দলীয় রাজনীতির কারণে একবার বলেই ফেললেন তিনি কোন ধর্মেই বিশ্বাস করেন না। সৈয়দ আশরাফ সাহেবর ধর্মহীনতাই নাকি তাঁকে দলের মহাসচীব হওয়ার সাহায্য করেছে। অপরদিকে মির্জা ফখরুল আওয়ামী নেতাদের বোলচাল,দেহভংগী ও ভাষার সাথে কিছুতেই ম্যাচ করতে পারছেন না। মির্জার মতো ভদ্রলোকদের দিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতি হবেনা। তবে সাবেক রাস্ট্রপতি মরহুম জিল্লুর রহমান সাহেব একজন খাঁটি ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি উচ্চ কণ্ঠে কথা বলতে জানতেন না। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াও ভাষাগত দিক থেকে শেখা হাসিনার চেয়ে হাজার মাইল দূরে আছেন।
লেখক: কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
http://www.humannewspaper.wordpress.com

Read Full Post »


সাংবাদিকতায় দলবাজি ও গণতন্ত্র / এরশাদ মজুমদার

অর্ধ শতাব্দীরও বেশী কাল ধরে সরাসরি সাংবাদিকতায় আছে। এখন আর চাকুরী করিনা। করতে চাইলেও পাইনা। ১৯৬১ সালে অবজারভারে চাকুরী নেয়ার মাধ্যমে আমার কর্ময় জীবন শুরু হয়। তখন শ্রদ্ধেয় মুসা ভাই ছিলেন আমার বার্তা সম্পাদক। আর সম্পাদক ছিলেন দার্শনিক আবদুস সালাম। ও রকম একজন সাংবাদিক এদেশে আর জন্ম নিবে কিনা জানিনা। যারা সালাম সাহেবকে দেখেননি তারা বুঝতে পারবেন না সালাম সাহেব কি ধরনের জ্ঞানী ছিলেন। অবজারভারের মালিক ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আইনজীবী হামিদুল হক চৌধুরী। চৌধুরী সাহেবের মালিকানায় অনেক গুলো কাগজ ছিল। তন্মধ্যে অবজারভার ও পূর্বদেশ ছিল বিখ্যাত। এছাড়াও ছিল উর্দু দৈনিক ওয়াতান, উর্দূ ও বাংলা চিত্রালী। সব ক’টি কাগজই ছিলো পূর্ব পাকিস্তানের মুখপাত্র। কাগজ গুলোতে রাজনীতির চেয়ে অর্থনীতির গুরুত্ব ছিল অনেক বেশী। চৌধুরী সাহেব একজন নামজাদা মানুষ ছিলেন। ৪৭ সালের পরপরই তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী। পরে পাকিস্তানের পররাস্ট্র মন্ত্রী হন। তিনি সারা জীবনই পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বিকাশের পক্ষে ছিলেন। পূর্ব ও পশ্চিমের বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর প্রকাশনা গুলো ছিলো সবচেয়ে বেশী সোচ্চার। চৌধুরী সাহেব একজন উদার ডানপন্থী গণতন্ত্রী ছিলেন। তাঁর প্রকাশনার মূলনীতি ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা। কাগজের দৈনন্দিন পলিসিতে তিনি কখনও হস্তক্ষেপ করতেন না। কাগজের মূল চালিকা শক্তি ছিলেন সালাম সাহেব, মাহবুব ভাই ও মুসা ভাই। চৌধুরী সাহেব ডানপন্থি হলেও তাঁর কাগজে নির্বিঘ্নে কাজ করতেন বাম ও আওয়ামী পন্থিরা। এ নিয়ে তিনি কখনই মাথা ঘামাতেন না। সাংবাদিক নিয়োগের সময় শুধু যোগ্যতাই ছিল মাপকাঠি। কার রাজনীতি বা মতবাদ কি তা কখনই দেখা হতোনা। ফলে একদল মেধাবী সাংবাদিক সাংবাদিক সেখানে কাজ করতেন। যাদের অনেকেই দেশ বিখ্যাত হয়েছিলেন পরবর্তীকালে। এখন কাগজ বা টিভির মালিক হন বড় বড় ব্যবসায়ীরা। বিগত ২০/২৫ বছরে এরা আংগুল ফুলে বটগাছ হয়ে গেছেন। এদের অনেকেই এক সময় ছোটখাট চাকুরী করতেন। এখন তাঁদের সম্পদের পরিমান ২০/২৫ হাজার কোটি টাকা। রাস্ট্রের পাওনা টাকা না দিয়ে বা ফাঁকি দিয়ে এরা ধনী হয়েছেন। এরা কাগজ বের করেছেন নিজেদের অবৈধ অর্থকে রক্ষা করতে।
ষাট দশকে পূর্ব পাকিস্তানের খবরের কাগজ গুলোর প্রধান ভুমিকা ছিল পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণের ইতিহাস তুলে ধরা। অবজারভার ছেড়ে রাজনৈতিক কারণে আমি সংবাদে যোগ দিয়েছিলাম চট্টগ্রাম প্রতিনিধি হিসাবে। তখন আমার চিন্তাধারা ছিল বাম ঘরাণার। তাছাড়া সংবাদ সম্পাদক শ্রদ্ধেয় জহুর হোসেন চৌধুরী আমাকে সংবাদে কাজ করার ব্যাপারে উত্‍সাহিত করেছিলেন। চট্টগ্রাম ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাণিজ্যিক রাজধানী যা এখনও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসাবে বহাল আছে। বলতে গেলে তখন প্রায় সব কাগজই অর্থনৈতিক বৈষম্যের উপর লেখালেখিটাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতো। এ ব্যাপারে অবজারভার,পূর্বদেশ,সংবাদ ও ইত্তেফাক সবচেয়ে বেশী ভুমিকা পালন করেছে। সংবাদ তখন পুরোপুরি বাম ঘরাণার একটি রাজনৈতিক কাগজ ছিলো। আমি যোগদানের পর প্রচুর অর্থনৈতিক খবর প্রকাশিত হতো। ৬৪ সালের শেষ নাগাদ আমি সংবাদে ছিলাম। ইতোমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের বাম রাজনীতি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। এক ভাগ চীনের চিন্তাধারার পক্ষে,আরেক ভাগ রাশিয়ার পক্ষে। মাওলানা ভাসানী ছিলেন চীনের রাজনীতির পক্ষে। ফলে সংবাদ মাওলানা সাহেবের বিরুদ্ধে লিখতে শুরু করে। আমি আরও বেশী করে বাম রাজনীতির সাথে জড়িত হওয়ার জন্যে ফেণী চলে গেলাম এবং ফসল নামে একটি সাপ্তাহিক কৃষক আন্দোলনের কাগজের সম্পাদনা শুরু করি ১৯৬৫ সালের ১৭ই মার্চ। লক্ষ্য ছিল মানুষকে শোষন থেকে মুক্তি দেয়ার জন্যে সমাজতন্ত্র কায়েম করা।
এরপর আমি ৬৯ সালে আবার ঢাকায় ফিরে সদ্য প্রকাশিত দৈনিক পূর্বদেশে সিনিয়ার রিপোর্টার হিসাবে যোগ দিই। সেই থেকে ঢাকায় আছি। তখন পূর্ব পাকিস্তানে অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রধানতম মুখপত্র ছিল দৈনিক পূর্বদেশ। এ কাগজেও কাজ করতেন বাম ঘরাণার বহু সাংবাদিক। কাগজের সম্পাদক ছিলেন ভাষা সৈনিক ও ডাক সাইটে পার্লামেন্টারিয়ান ও শ্রমিকনেতা মাহবুবুল হক। পাকিস্তান জাতীয় সংসদে পূর্ব ও পশ্চিমের বৈষম্য নিয়ে প্রধান মুখপাত্র ছিলেন মাহবুবুল হক। একবার মাহবুব ভাইয়ের সংসদ ভাষণে মুগ্ধ হয়ে বংগবন্ধু তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে বিমানবন্দরে সম্বর্ধনা জানিয়েছিলেন। মাহবুব ভাইয়ের সংসদ ভাষন ইত্তেফাকে দুই পৃষ্ঠা ব্যাপী ছাপা হয়েছিল। আমি ব্যক্তিগত ভাবে আদর্শগত কারণে সাংবাদিকতায় এসেছিলাম। এই পেশা কষ্ট দায়ক জেনেও এসেছিলাম। তখন আর্থিক কারণে সাংবাদিকদের কাছে কেউ বাড়ি ভাড়া দিতোনা। বিয়ের প্রস্তাব দিলে কন্যাপক্ষ জানতে চাইতো ছেলে আর কি করে। সাংবাদিকতা করে বললে কন্যাপক্ষ বলতো এটাতো কোন পেশা হতে পারেনা। এটা এক ধরণের সমাজ সেবা। এ ধরণের ছেলের কাছে কে মেয়ের বিয়ে দিবে।
সাংবাদিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন শুরু হয় জেনারেল আইউব ৬০ সালে ওয়েজবোর্ড চালু করলে। জুনিয়ার রিপোর্টার মুজুরী নির্ধারিত হয়েছিল যাতায়াত ভাতা সহ ৪২৩টাকা। আইউব খানের আমলেই সাংবাদিকদের জমি বরাদ্দ শুরু হয়। ওই সময়েই সাংবাদিকরা ধানমন্ডী, মোহাম্মদপুর, বনানীতে প্লট পান। এখন সাংবাদিকরা হাউজিং এরিয়া পান। জমি পান বারিধারা, গুলশান, বনানী,উত্তরা, নিকুঞ্জ সহ আরও বহু এলাকায় তারা জমি পায়। অবজারভার ছাড়া বাকি কাগজ গুলোতে নিয়মিত বেতন হতোনা। সংবাদে ছিলেন বড় বড় আদর্শবান বামপন্থী ত্যাগী পরুষরা। প্রায় সব কাগজেই বামপন্থী সাংবাদিকরা কাজ করতেন। তবে সাংবাদিকদের প্রধান আদর্শ ছিল পূর্ব ও পশ্চিমের সীমাহীন বৈষম্যের কথা তুলে ধরা। এ ব্যাপারে ডান বাম সকল সাংবাদিকই একমত ছিলেন। ৬০ সাল থেকে ৭০ সাল নাগাদ অনেক সাংবাদিক সরকারী বরাদ্দকৃত জমি পেয়েছেন বাড়ি করার জন্যে। অনেকেই বিদেশ ভ্রমনের সুযোগও পেয়েছেন । কিন্তু এতেও তেমন কোন সরকারী বা দলীয় তাবেদার সাংবাদিকের জন্ম হয়নি। কারণ ৯৫ ভাগ সাংবাদিকই বৈষম্যের ব্যাপারে একমত ছিলেন।তখনও সরকারী দল বা বিরোধী দল ছিল।
একটি সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধিন হওয়ার পর পরিবেশ পরিস্থিতি ও সাংবাদিকতার ক্যানভাসের খোল নলছে বদলে গেলো। স্বাধীন বাংলাদেশে শ্লোগান উঠলো,এক নেতা ,এক দেশ। বংগবন্ধু বাংলাদেশ। কোন বিরোধী দল নেই, কোন বিরোধী মত নেই, বিরোধী কাগজও নেই। রাতারাতি এমনি এক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। আওয়ামী বিরোধী রাজনৈতিক চিন্তার ধারক যাঁরা ছিলেন তাঁরা হঠাত্‍ করে সরকারের বিরাধীতা বা সমালোচনা থেকে বিরত থাকলেন। দেশের অবনতিশীল অর্থনীতি ও রাজনীতির রাশ টেনে ধরার জন্যে বংগবন্ধু একদলীয় শাসন ব্যবস্থা পক্ষে চলে গেলে কমিউনিষ্ট শাসিত দেশ গুলোর ন্যায়। যদিও বংগবন্ধু ও তাঁর দলে কেউই কমিউনিষ্ট ছিলেন না। তিনি হয়ত মনে করেছিলেন বা তাঁকে কেউ বুঝিয়েছিল একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চলু করলেই দেশের শনৈ শনৈ উন্নতি করতে থাকবে। কিন্তু নতুন ব্যবস্থা বা সংসদে মেজরিটি বংগবন্ধুকে রক্ষা করতে পারেনি। সে সময় সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন ইত্তেফাকের মইনুল হুসেন ও জেনারেল ওসমানী। সাংবাদিকদের ভিতর মাত্র কয়েকজন বাকশালে যোগ দেননি। তন্মধ্যে আমিও ছিলাম। উল্লেখ করতে চাই যে জুন মাসে চারটি কাগজ ছাড়া বাকি সব কাগজ বন্ধ হয়ে গেলে সাংবাদিকরা বেকার ভাতা পেতে শুরু করে। কিন্তু আমি পেয়েছি ১৫ই আগষ্টের পর। জানিনা কি কারণে আমার বেকার ভাতা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল।
এসব পুরাণো দিনের কথা। এখন সাংবাদিকদের জীবন যাত্রার মান অনেক বেড়েছে। সাংবাদিকরা এখন গাড়ি বাড়ির মালিক। এক সময় তাঁরা বাড়ি ভাড়া দিতে পারতোনা। এখন নিজেরা বাড়ি মালিক হয়ে ভাড়ার টাকা দিয়ে জীবন যাপন করে। সব সরকারের আমলেই সাংবাদিকরা দেশে বিদেশে ভাল ভাল চাকুরী করে। যোগ্যতা না থাকলেও দলবাজির কারণে চাকুরী পায়। এখন সাংবাদিকদের পরিচয় আওয়ামী লীগের সাংবাদিক আর বিএনপির সাংবাদিক। সারা দেশে সাংবাদিক ইউনিয়নও দুইটা।
শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে বহু সাংবাদিক বছরের পর বছর চাকুরী পায়না। দেশের বেশীর ভাগ কাগজ ও রেডিও টিভি আওয়ামী মালিকদের দখলে। সেখানে চাকুরী পায় দলীয় সাংবাদিকরা। আপনি যদি শ্রেষ্ঠ সাংবাদিকও হন তাহলেও চাকুরী পাবেনা। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কাগজ ও রেডিও টিভির সংখ্যা নেই বললেই চলে। খালেদা জিয়া যাদের অনুমতি দিয়েছিলেন তাঁরা অনুমতিপত্র বিক্রি করে ধনী হয়ে গেছেন। এমন অবস্থা অতীতে কখনই ছিলনা।দেণিক আমার দেশ ,দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি বন্ধ করে দেয়ার ফলে শত শত সাংবাদিক বেকার হয়ে গেছে। আমারদেশ সম্পাদক বছরের বছর জেলে থাকলেও দলবাজ সাংবাদিকদের কিছু আসে যায়না। পাকিস্তান আমলে গভর্ণর মোনেম খাঁর কাগজে বামপন্থীরাও কাজ করতেন। এতা মালিকের কোন অসুবিধা হতানা। আর সাংবাদিকরাও নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা ত্যাগ করতেন না। এমন কি স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধেও সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিল। এখন সাগর-রুনি হত্যার ব্যাপারেও ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন না। ঐক্য হলেও তা বার বার ভেংগে যায়। দলবাজির কারণেই দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আজ হুমকির সামনে।
লেখক: কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
http://www.humannewspaper.wordpress.com

Read Full Post »


ভৌগলিক কারণে বাংলাদেশ এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। নিকট প্রতিবেশী হিসাবে বাংলাদেশে মায়ানমার, গণচীন, ভারত, নেপাল শ্রীলংকার স্বার্থ রয়েছে। সীমান্তের কথা চিন্তা করলে বাংলাদেশের তিনদিকেই ভারতের সীমান্ত রয়েছে। সীমান্তে নানা ছুতায় ভারতের সীমান্ত রক্ষীরা বাংলাদেশীদের হত্যা করে চলেছে। শত আলোচনাতেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। সীমান্তের কারণে ভারতের সাথে বাংলাদেশের খিটমিট লেগেই থাকে। বাংলাদেশের সাথে ভারতের অনানুষ্ঠানিক বা ইনফরমাল সীমান্ত ব্যবসা অন্য সকল দেশের চেয়ে অনেক বেশী। এতে ভারতের লাভ বেশী । ভারত বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়াই বাংলাদেশের পণ্য নিয়ে যেতে পারছে।
প্রশ্ন হচ্ছে ভারত বাংলাদেশের সাথে কি ধরনের সম্পর্ক চায়? ৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাধ্যমে এই ভৌগলিক রাজনীতির প্রেক্ষিত ও হিসাব নিকাশ পরিবর্তন হয়ে গেছে। ৭১ সালের ঘটনার একজন বড় স্টেকহোল্ডার হচ্ছে ভারত। পাকিস্তান সৃষ্টি মেনে না নেওয়া ছিল ভারতের রাজনৈতিক ইচ্ছা ও দর্শন। সে ইচ্ছা ও দর্শনের কিছুটা বাস্তবায়িত হয়েছে ৭১ সালে। পাকিস্তান ভেংগে গেছে। কিন্তু পাকিস্তান এখনও টিকে আছে তাকে ম্যাপ থেকে মুছে দেয়ার জন্যে ভারত কাজ করে যাচ্ছে। পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে স্থায়ী গোলযোগ বাধিয়ে রেখেছে ভারত। স্বাধীন হওয়ার জন্যে বেলুচীদের নিয়মিত উসকানী দিচ্ছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা। বাংলাদেশেও ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার উপস্থিতি দৃশ্যমান। এছাড়া চিন্তা চেতনায় বেশকিছু বুদ্ধিজীবী আছেন যারা অখন্ড ভারত বা মহাভারত আন্দোলন সমর্থন করেন। এরা নিজেদের সেক্যুলার,প্রগতিশীল ও ধর্মচেতনা নাশক বলে প্রচার করেন। বিগত ৪৩ বছরে বাংগালী সংস্কৃতির নামে বা খাঁটি শুদ্ধ বাংগালীয়ানার নামে হিন্দুয়ানী সনাতনী ধর্মীয় সংস্কৃতি বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংগালী শব্দটার সাথে সনাতন ধর্মের এক যোগ সাজোশ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মুসলমান তরুণের একাংশ এখন মনে করে দুর্গাপূজা, ভাইফোঁটা,দীপাবলী ইত্যাদি নাকি বাংগালীদের সংস্কৃতি। পহেলা বৈশাখের নামে বাঘ ভাল্লুকের মিছিল নাকি বাংগালী মুসলমানে সংস্কৃতি। ক’দিন পরে বলবে সিঁথিতে সিঁদুর দেয়া বাংগালী মুসলমানের কালচার বা সংস্কৃতি। ফেসবুকে বেশ কিছু তরুণ তরুণীর দেখা পাই যারা বলে ,আমরা শুধুই বাংগালী। এটা আমাদের জাতীয় পরিচয়। মুসলমানিত্ব আমাদের জাতীয় পরিচয় নয়। ৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বাংগালীদের দেশ হিসাবে। মুসলমানের দেশ হিসাবে নয়। এই তরুণদের অভিভাবকরাও মনে করেন পাকিস্তান ভেংগে যাওয়ার কারণে দ্বিজাতি তত্ব বাতিল হয়ে গেছে। ইসলাম বা মুসলমানিত্ব বিষয়টি বাংলাদেশের জন্যে গৌন বিষয়।
আমি বলবো বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতে ভারতের আগ্রাসন বা বিজয় সীমাহীন বা অকল্পনীয়। এ ধারা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে হয়ত আগামী ৫০ বছরে ধর্মমুক্ত বাংগালীরা বলবে ভারতের বাংগালী আর আমাদের ভিতর আর কোন ফারাক নেই। সুতরাং আমরা সংসদে আইন পাশ করেই ভারতের অংশ হয়ে যেতে পারি। বাংলাদেশের ৪৩ বছরে কোন সরকারই নিজেদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার দর্শন বা লক্ষ্য নির্ধান করতে পারেনি। কোন সরকারের কাছে ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য গুরুত্পূর্ন ছিলনা। একমাত্র প্রেসিডেন্ট জিয়া এ ব্যাপারে সজাগ ছিলেন। তিনিই বুঝতে পেরেছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় কি হবে। তিনি রাস্ট্রীয় জাতীয়তার পরিচয় নির্ধারণ করেছিলেন বাংলাদেশী। এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা করে তিনি বহু সেমিনারও করেছিলেন। জিয়া সাহেবের উপদেষ্টা পরিষদে দেশের বিখ্যাত জ্ঞাণী গুণীরা ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তার জোট বা ঘরাণার লোকেরা বাংলাদেশী শব্দটি গ্রহণ করেন নি। এই শব্দের সাথে নাকি পাকিস্তানী এবং মুসলমানিত্বের গন্ধ আছে। এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী,শিক্ষক, সংস্কৃতিসেবী যারা কখনই ধর্মের তোয়াক্কা করেনা বা ধর্মহীন জীবন যাপনে অভ্যস্ত তারাই আওয়ামী লীগকে বিভ্রান্ত করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের বহু নেতা বা কর্মী আছেন যারা ধর্ম চর্চা করেন। দলটি রাজনৈতিক কারণে মুখে মুখে ইসলাম ও মুসলমানিত্বের কথা বলে। এমন কি দলের নেত্রী বলে থাকেন তিনি তাহাজ্জুদ সহ ছয় ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। তিনি মাঝে মাঝে হিজাবও পরেন। তিনি হজ্ব ও ওমরা করেন। কিন্তু দিল্লী এসব চায়না। দিল্লীর তাবেদার ও অনুচরেরা সিন্দাবাদের দৈত্যর মতো আওয়ামী লীগে কাঁধে বসে রয়েছে। বংগবন্ধু থাকলে হয়ত ভারতীয় চাপকে মোকাবিলা করতে পারতেন। তিনি দিল্লী বা ইন্দিরা গান্ধীর অনুরোধ উপেক্ষা করে ওআইসি সম্মেলনে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। দিল্লী বংগবন্ধু এই সিদ্ধান্তকে একেবারেই পছন্দ করেনি। তাই অনেকে মনে করে বংগবন্ধুর পতনের সাথে ভারত জড়িত ছিল।
পরবর্তী পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট জিয়া দিল্লীর প্রভাবমুক্ত বিদেশনীতি ও বাণিজ্যনীতি অনুসরণের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি মুসলীম বিশ্বের একজন অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে ইমেজ তৈরী করতে পেরেছিলেন। তিনিই বিশ্ববাসীকে জানাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে বাংলাদেশ একটি উদার মুসলীম দেশ।
কিন্তু দিল্লী জিয়া সাহেবের এই নীতিকে একেবারেই পছন্দ করেনি। তাই তিনিও বেশীদিন বেঁচে থাকতে পারেননি।

Read Full Post »