Feeds:
Posts
Comments

Archive for December, 2011


ফেণী প্রেসক্লাব প্রতিস্ঠিত হয়েছে ১৯৬৬ সালে। তার কিছুদিন আগে আমরা প্রেসক্লাব কমিটি গঠণ করেছি। প্রথম কমিটির সভাপতি ছিলেন তত্‍কালীন মহকুমা হাকিম বা সাবডিভিশনাল অফিসার সাইফ উদ্দিন আহমদ। তিনি ছিলেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস(সিএসপি) ক্যাডার ভুক্ত একজন প্রথম শ্রেণীর সরকারী কর্মকর্ত। সাধারন সম্পাদক ছিলেন মহকুমা জনসংযোগ কর্মকর্তা আবদুর রশীদ খান। আমি ছিলাম সহ সাধারন সম্পাদক। নুরুল ইসলাম উকিল সাহেব ছিলেন সহ সভাপতি। কৌশলগত কারণে আমরা এভাবে কমিটি গঠণ করেছি। উদ্দেশ্য ছিল অনায়াসে ক্লাবের জন্যে একটি অফিস ঘর জোগাড় করা। মূলত: পরামর্শটি ছিল রশীদ খান সাহেবের। এছাড়া তখন আমি বামপন্থি রাজনীতির জড়িত ছিলাম। ফলে সমাজের মুরুব্বীরাও রাজনৈতিক কারণে আমাকে পছন্দ করতেন না। আমি পাকিস্তান অবজারভার ও সংবাদে পাঁচ বছতর কাজ করে ফেণী চলে আসি। তখন আমার বাবা ক্যন্সারে আক্রান্ত। ৬৪ সালের আগস্টে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ৬৮ সালের মার্চ মাসে তিনি পরলোক গমণ করেন। ফেণীতে আমি সাপ্তাহিক ফসল প্রকাশ করি ৬৫ সালের ১৭ই মার্চ। রাজনৈতিক কারণে আমার নামে ডিক্লারেশন পাইনি। আমার জেঠাত ভাই নুরুল ইসলাম সাহেবের নামে ডিক্লারেশন নিতে হয়েছে। এ ব্যাপারে তখনকার গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা আমাকে সহযোগিতা করেছিলেন। তারাই বলেছিলেন, আমার নামে আসবেদন না করতে। সরকারী খাতায় আমার নাম মন্দ তালিকা ভুক্ত ছিল। আমি তখন মাওলানা ভাসানী সাহেবের কৃষক সমিতির সাথে জড়িত ছিলাম।

প্রেসক্লাবের কমিটি গঠণের পর আমরা আনুস্ঠানিক ভাবে সাইফ উদ্দিন সাহেবের সাথে দেখা করি এবং প্রেসক্লাবের অফিসের জন্যে একটি ঘর চাইলাম। সভার কার্য বিবরনী লিপিবদ্ধ করলেন রশীদ খান সাহেব। এসডিও সাহেব সংগে সংগে রাজী হয়ে গেলেন এবং রশীদ সাহেবকে জায়গা দেখতে বললেন। আমি আর রশীদ সাহেব আগেই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম ডাক্তার দ্বারিকা  বাবুর পরিত্যাক্ত ভবনটি লীজ নেয়ার জন্যে। আমরা দাগ ও খতিয়ান নম্বর জোগাড় করে আনুস্ঠানিক ভাবে দরখাস্ত জমা দিলাম। এসডিও সাহেব সাথে সাথে নির্দেশ দিলেন। সাপ্তাহিক ফসলের ৬৬ সালের ফাইল খুঁজলেই ক্লাবনের বিস্তারিত ইতিহাস পাওয়া যাবে। রশীদ খান সাহেব জীবিত থাকলে তাঁর কাছ থেকেও বহু তথ্য পাওয়া যাবে। আমি ৬৯ সালের শেষের দিকে ঢাকায় এসে পূর্বদেশে যোগ দিই। সেই থেকে ঢাকাতেই আছি। ডাক্তার দ্বারিকা নাথ সবার কাছে পরিচিত ছিলেন দ্বারিকা এমবি হিসাবে। সে সময়ে তিনি ছাড়া আর কেউ এমবি বা এমবিবিএস ডাক্তার ছিলেন না। তিনি ধুতি সু ও কোট পরতেন। সাইকেল চালাতেন। সাইকেল চালিয়ে মাস্টার পাড়া থেকে চেম্বারে আসতেন। চেম্বারে গেলে ফি নিতেন কিনা এখন আমার মনে নেই। তবে বাসায় বা বাড়িতে ডাক দিলে দুই টাকা ফি নিতেন সে কথা আমার মনে আছে। দ্বারিকা বাবুর ভবনটি লীজ নেয়ার জন্যে ফেণীর গণ্যমান্য অনেকেই চেস্টা করেছেন। আমার কাছেও অনেক মুরুব্বী প্রাস্তাব দিয়েছিলেন। ভবনটি তাঁদের নামে লীজ করিয়ে দিলে তাঁরা ক্লাবকে বিনা টাকায় উপরতলা ছেড়ে দিবেন। এমন কি রাজস্ব বিভাগের কিছু কর্মচারীও ষড়যন্ত্র করেছিলেন। এসডিও সাহেব শক্ত না থাকলে আমরা এ বাড়িটা  পেতাম না। সাইফ উদ্দিন আসহমদ সাহেব বলেছিলেন, লীজের টাকাটা এক সাথে দিতে হবে। টাকার অংকটা ছিল তিন হাজার টাকার একটু উপরে। কত টাকা সঠিক ভাবে এখন আমার মনে নেই। কিন্তু আমি রাজী হয়ে গিয়েছিলাম। তারপরে চিন্তা হলো টাকাটা কোত্থেকে জোগাড় করবো। তখন ওই ভবনের নী্চে কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের একটি শাখা ছিল। হয়ত এখনও আছে। শাখা ম্যানেজারের সাথে কথা বলে এবং তাঁর সুপারিশ নিয়ে আমি চট্টগ্রাম গেলাম কোম্পানীর ম্যানেজিং ডিরেক্টর সত্য সিংয়ের সাথে দেখা করতে গেলাম। তিনি তখন তাঁর গ্রামের বাড়ি গহিরা  ছিলেন। সত্যবাবুর সাথে আমার আগে থেকেই জানাশোনা ছিল। তিনি খুবই উদার প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। আমাকে দেখেই আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন কাজের কথা পরে হবে। অনেক দূর পথ পেরিয়ে এসেছেন। কিছু খেয়ে নিন। তিনি মেহমানদারী সারলেন। জানতে চাইলেন,তিনি আমার জন্যে কি করতে পারেন। আমি শাখা ম্যানেজারের চিঠিটা তাঁর হাতে দিলাম। তারপর বললেন, আমি বিষয়টা জানি। খুশী হয়েছি যে আপনারা প্রেসক্লাবের জন্যে ভবনটি পেয়েছেন। তারপরেই সত্যবাবু প্রয়োজনীয় টাকাটা আমার হাতে  দিলেন। আরও বললেন, যখনি কোন সহযোগিতার প্রয়োজন হবে তখনি জানাবেন। কুন্ডেশ্বরী আপনাদের সহযোগিতায় সব সময় প্রস্তুত থাকবে। সত্যবাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। প্রায় মধ্যরাতে ফেনী এসে পৌঁছালাম। পরেরদিন সকালেই রশীদ খান সাহেবের বাসায় গেলাম। তাঁর অফিস ও বাসা ছিল ডাক্তার পাড়া। টাকার খবর পেয়ে তিনি খুব খুশী হলেন। আমাকে সাথে নিয়ে রিকসা করে সাব ডিভিশনাল ম্যানেজারের অফিসে গেলাম। রাজবাড়িতে ম্যানেজার সাহেবের অফিস ছিল। এখন সম্ভবত এটা এসি ল্যান্ডের অফিস। কিছুদিন সিও রেভিনিওর অফিস হিসাবেও পরিচিত ছিল। ট্রেজারী চালান দিয়ে সরকারী টাকা জমা দিলাম। একসনা বন্দোবস্ত বা লীজের কাগজ হাতে পেয়ে গেলাম। এবার ভবনের পজেশন বুঝে নিতে হবে। পজেশন বুঝিয়ে দিবেন তহশীলদার। পজেশন বুঝিয়ে দিবেন বলে তহশীলদার সাহেব পালিয়ে গেলেন। খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারলাম তিনি তাঁর গ্রামের বাড়ি ছাগলনাইয়া চলে গেছেন। আমি আর রশীদ সাহেব ছাগলনাইয়া যেয়ে তাঁকে খুঁজে বের করলাম। রশীদ সাহেব সাথে না থাকলে তহশীলদার সাহেব আসতেন না। পরের দিন ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সন্ধ্যার দিকে তহশীলদার সাহেবকে ফেণী নিয়ে এসে কাগজে কলমে পজেশন বুঝে নিলাম। সেদিন থেকে ভবনটি ফেণী প্রেসক্লাবের অস্থায়ী সম্পত্তিতে পরিণত হলো। এসব হলো ৪৫ বছর আগের কথা। আমার স্মৃতি আমাকে যতটুকু সাহায্য করেছে তা থেকেই পেছনের কথাগুলো বললাম।

 

Advertisements

Read Full Post »


একজন খাঁটি মানুষের কাহিনী   /     এরশাদ মজুমদার

 

আমি যে সময়ের কথা বলছি, সে সময়ে রাজনীতি ছিল ত্যাগী মানুষের কাজ। যাদের দেশপ্রেম ছিল শুধু তারাই রাজনীতি করতেন এবং দেশের জন্যে নিজের সবকিছুই ত্যাগ করতেন। বৃটিশ বেনিয়াদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে এদেশের লাখ লাখ মানু প্রাণ দিয়েছে। এক শ্রেণীর ধনী হিন্দু রাজা মহারাজাদের  ষড়যন্ত্রের ফলে ১৭৫৭ সালে  সুবেহ বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ দৌলার পতন হয় এবং বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। সেই থেকে লড়াই শুরু হয়। ষড়যন্ত্রকারী ও বেঈমানদের সহযোগিতায় ইংরেজরা ১৯০ বছর পুরো ভারতকে শাসন করে ও লুন্ঠন করে।সুজলা সুফলা বাংলা ও ভারতকে শোষণ করে ইংরেজরা বিশ্বের শক্তিশালী কলোনিয়াল পাওয়ারে পরিণত হয়। ভারতের প্রখ্যাত রাজনীতিক দাদাভাই নওরোজী তাঁর পোভার্টি ইন ইন্ডিয়া বইতে লিখেছেন, ইংরেজরা ভারতকে শোষণ করে লন্ডনকে গড়ে তুলেছে। পেছনের কথা গুলো বললাম নতুন প্রজন্মের পাঠকদের জন্যে। আমাদের তরুণ সমাজ ইতিহাস সচেতন নয়। তারা লোকমুখে শুনে মৌখিক ইতিহাস তৈরী করে। তাদের কথা শুনলে মনে হয়, ৭১এর আগে আমাদের কোন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস নেই। হাবভাব দেখে মনে হয় বংগবন্ধু দিয়েই আমাদের ইতিহাস শুরু হয়েছে এবং বংগবন্ধুকে দিয়েই এর শেষ হয়েছে।

আমাদের রাজনীতিতে এক সময় মেধার গুরুত্ব ছিল। কোয়ালিটির গুরুত্ব ছিল। এখন গুরুত্ব হচ্ছে অর্থ, শক্তি ও সংখ্যার।তখন যাঁরা রাজনীতি করতেন তাঁদের আয়ের প্রকাশ্য উত্‍স ছিল। এখন জাতীয় সংসদের সদস্যরা  রাজনীতিকে নিজেদের পেশা হিসাবে উল্লেখ করেন। আগের জামানায় আমাদের মুরুব্বীদের পেশা কখনই রাজনীতি ছিলনা। তাঁরা সকলেই ছিলেন নামকরা উকিল ডাক্তার ও বড় ব্যবসায়ী। এখন কোন রাজনীতিকেরই পেশা নেই। আইউব খানের আমলে তিনি বড় বড় ঠিকাদারদের রাজনীতিতে ডেকে আনেন। আইউব খানের ওই ধারা এখনও রাজনীতিতে এখনও জারী রয়েছে। বাংলাদেশদের সংসদ গুলোতে ব্যবসায়ী  শিল্পপতি কমিশন এজেন্টদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এরাই এখন রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রন করেন। রাজনৈতিক দলগুলো এদের কাছ শত শত কোটি টাকার চাঁদা গ্রহণ করে। সরকার ও রাজনৈতিক দল গুলোকে নিয়ন্ত্রন করে ব্যবসায়ীরা নানা ধরনের অনৈতিক ও বেআইনী উপায়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। ৮৩ সালে একটি ব্যান্ক প্রতিস্ঠার জন্যে তিন কোটি টাকার মূলধন জোগাড় করাটা ছিল মহা কস্টের। ২৫ থেকে ২৬ জন উদ্যোক্তার কাছে থেকে টাকা নিতে হয়েছে। এখন একটি স্থাপন করার জন্যে একজন উদ্যোক্তা একাই এক হাসজার কোটি দিতে পারেন। পাকিস্তান আমলে ছিল ধনী ২২ পরিবার। এখন ধনী ২২ হাজার পরিবারের সৃস্টি হয়েছে। সারাদেশে এক কোটি টাকার মালিক রয়েছে এক কোটি লোক। সোজা ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় এসব ব্যবসায়ী আর রাজনীতিকরা দেশটাকে লুটেপুটে খাচ্ছে।

এ মাটির বয়স কত জানতে পারলেই জানা যাবে এরই ভূমিতে মানব বসতির বয়স কত। হাজার হাজার বছর অতীতে এখানে কাদের বসতি ছিল। সেই ইতিহাসের সূত্র ও ধারাবাহিকতায় আজ আমরা বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছি। এখন আমরা যে অঞ্চলে বাস করি তা বাংলাদেশ নামে পরিচিত। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। আমাদের স্বাধীন পতাকা, জাতীয় সংগীত আছে। আমরা জাতি সংঘের সদস্য। পশ্চিম বাংলা আমাদের মতো স্বাধীন নয়। তারা ভারতের একটি অংগ রাজ্য। অথচ তারাও বাংলা ভাষায় কথা বলে, আমরাও বলি। ভাষার একত্ব তবুও আমাদের এক করতে পারেনি। এর প্রধান কারণ আমরা মুসলমান, আর  পশ্চিম বাংলার নাগরিকরা হিন্দু।  বাংলাকে অখন্ড রাখতে মুসলমান নেতারা আপ্রান চেস্টা করেছে। কিন্তু  হিন্দু নেতারা রাজী হননি। এর কারণ ছিল অখন্ড বাংলাদেশে মুসলমানেরা মেজরিটি ছিল। ৩৭ থেকে ৪৭ পর্যন্ত  অখন্ড বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, স্যার খাজা নাজিমুদ্দিন ও  হোসেন শহীদ  সোহরাওয়ার্দী। এই তিনজন নেতার পারিবারিক ঐতিহ্য ও শিক্ষার কথা ভাবলেই বুঝা যাবে তাঁরা কোন মর্যাদার লোক ছিলেন।  এঁরা মানুষের কল্যাণে নিজেদের সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছেন। এখন যাঁরা রাজনীতি করেন তাঁরা  দেশ ও মানুষের সম্পদ লুন্ঠন করে নিজেদের সম্পদশালী করে। চাঁদা তুলে জীবিকা নির্বাহ করে। চলমান রাজনীতিতে খুব অল্প সংখ্যক রাজনীতিক আছেন যাঁরা নিজেদের পেশগত আয় দিয়ে রাজনীতি করেন। অথচ এঁদের সবার  গাড়ি বাড়ি আছে রাজধানীতে।

ঢল কোম্পানী হিসাবে বহুল পরিচিত সিরাজুল হক মজুমদার সাহেব ফেণী জেলার খাঁটি মানুষদের একজন। আমার অন্তর আমাকে এভাবেই জানিয়েছে। তিনি আমার আত্মীয়। সেই সুবাদে বাল্যকালেই তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয়। তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। মজুমদার সাহেব সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন সদস্য। সেই জামানার একজন শিক্ষিত মানুষ। তাঁর বাপদাদারাও শিক্ষিত এবং আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল ছিলেন। সম্পর্কে আমি তাঁর নাতি। তাঁকে আমি দাদু বলে ডাকতাম। স্কুল জীবনেই আমি বামধারার  রাজনীতির সাথে পরিচিত হই। মজুমদার সাহেব মাওলানা ভাসানীর রাজনীতির  সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তাঁর  যুক্তফ্রন্টের নমিনেশন পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা ধরনের রাজনৈতিক ইকোয়েশনের কারণে তিনি নমিনেশন পাননি। নমিনেশন পেয়েছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক পাকিস্তান অবজারভারের সম্পাদক আবদুস সালাম। সালাম সাহেব ছিলেন একজন দার্শনিক প্রকৃতির মানুষ। সরাসরি রাজণিতি তিনি কখনও করেননি। উপ মহাদেশের প্রখ্যাত আইনজীবী ও রাজনীতিক হামিদুল হক চৌধুরী সাহেব ছিলেন শেরে বাংলার কৃষক শ্রমিক পার্টির একজন নেতা। তাঁরই প্রভাবে সালাম সাহেব নমিনেশন পেয়েছিলেন। আবেগ ও অভিমানের কারণে সিরাজুল হক মজুমদার সাহেব নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। মুসলীম লীগ বিরোধী নির্বাচনী ঢেউয়ের কারণে মজুমদার সাহেব নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেননি। ওই নির্বাচনে মাহবুবুল হক সাহেবের মতো ডাক সাইটে নেতাও জিততে পারেননি। উল্লেখ্য যে, ৫৪র নির্বাচন ছিল মুসলীম লীগের রাজনীতি খতম করার নির্বাচন । আর ৭০ এর নির্বাচন ছিল অবাংগালী বিরোধী  নির্বাচন।

মজুমদার সাহেব  তত্‍কালীন ফেণী মহকুমার কৃষক নেতা ছিলেন। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার জন্যে তিনি ছিলেন সর্বদা নিবেদিত। কতটুকে নিবেদিত ছিলেন তা আপনারা বুঝতে পারবেন যখন জানবেন কেন তিনি ঢল কোম্পানী হিসাবে পরিচিত হয়েছিলেন। ফেণী ও মুহুরী নদী ছিল তখন ফেণীর দু:খ। হোয়াংহো নদী যেমন চীনের দু:খ ছিল। চীনের একটি বিখ্যাত গল্প আছে। গল্পটির নাম ‘ দি ওল্ডম্যান এ্যান্ড দি মাউন্টেন’। এই বৃদ্ধই পাহাড়ে সুড়ংগ কেটে অপর পাড় থেকে পানি আনার উদ্যোগ নিয়েছিল। প্রথমে একাই শুরু করেছিল। পরে গ্রামবাসী তার সাথে যোগ দিয়েছিল। চীনের মরু এলাকা পাণি পেয়ে সুজলা সুফলা হয়ে উঠেছিল। মজুমদার সাহেবও মুহুরী নদীতে নিজের অর্থে বাঁধ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। শুনেছি, তিনি নিজের জমিজমা সব বিক্রি করে দিয়েছিলেন মুহুরী নদীতে বাঁধ দেয়ার জন্যের। এ ব্যাপারে তাঁর কোন কারিগরী জ্ঞান ছিলনা। তিনি জানতেন না ওই বাঁধ নির্মানে কত কোটি লাগতে পারে। শুধু মাত্র মানুষের জন্যে ভালবাসার কারণেই তিনি বুকে সাহস নিয়ে মুহুরীতে বাঁধ নির্মানের কাজে নেমেছিলেন। পরে তাঁরই দেখানে পথে সরকার ৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে মুহুরী বাঁধের নির্মান কাজ সম্পন্ন করে।

আমার দাদু সিরাজুল হক মজুমদার ছিলেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে সত্‍ ও নিবেদিত রাজনীতিক। জীবনে কখনও কারো কাছে থেকে চাঁদা গ্রহণ করেননি। চাঁদা নেয়া তাঁর জন্যে শোভাও পেতোনা। কারণ তিনি ছিলেন সচ্ছল শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন রাজনীতি হচ্ছে মানুষের জন্যে ত্যাগ করা। তাঁর স্বপ্নই ছিল এদেশের কৃষক শ্রমিকের মুক্তি। ৪৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৬৪ বছর পার হতে চলেছে। কৃষক শ্রমিকের ভাগ্যের তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। দেশ এখন এক মহা সংকটে পতিত। এই সময়ে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় সিরাজুল হক মজুমদার সাহেবের মতো ত্যাগী সমাজ সেবক ও রাজনীতিকের প্রয়োজন।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »


রাস্ট্রের সাথে রাস্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক রীতি নীতি ও রেওয়াজ ভিত্তিক। এই সম্পর্ক কখনও গভীর বন্ধুত্ব বা আত্মার সম্পর্কে পরিণত হয়না। রাস্ট্রীয় সম্পর্কের সাথে  উভয়ের স্বার্থ জড়িত। ভারতের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব বা কূনৈতিক সম্পর্ক একটি ঐতিহাসিক পট ভূমিকায় তৈরী হয়েছে। ৭১ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা  পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে দমনের জন্যে সামরিক অভিযান চালালে ভারত পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি সমর্থন জানায় এবং পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ভারত বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের নতুন বিন্যাস করতে উঠে পড়ে লেগে যায়। কূটনৈতিক সম্পর্কের চেয়েও বেশী কিছু আশা করতে থাকে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে ভারত মনে করে তাদের বন্ধুরাই ক্ষমতায় আছে। সুতরাং বন্ধুর কাছে সব ধরণের আবদার করা যায়। যেকোন কারণেই হোক আওয়ামী লীগও মনে করে ভারত তাদের পরম বন্ধু এবং বিপদে আপদে ভারত আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়ে যাবে। এবারে ২৬৩ সিট নিয়ে আওয়ামী লীগক্ষমতায় আসার পর ভারত ষোলয়ানা সুযোগ ব্যবহারের জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে। হেন কিছু নেই ভারত বাংলাদেশের কাছে চাইছেনা। আর আওয়ামী লীগও বাংলাদেশটা তাদের নিজস্ব সম্পত্তি মনে করে বন্ধু চাওয়ার আগেই দেয়ার জন্যে উদগ্রীব হয়ে থাকে। আওয়ামী লীগ, বিশেষ করে শেখ হাসিনা ব্যক্তিগত ভাবে মনে করেন তিনি কোন বড় বিপদে পড়লে ভারত তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসবে। ৭৫ সালে হাসিনার বিপদের সময় ভারত তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিল বেশ কয়েক বছরের জন্যে। রাস্ট্রীয় জীবনে যে কোন ধরনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকতে পারেনা তা আওয়ামী লীগ বা হাসিনা বুঝতে চায়না। বংগবন্ধুর সরকারের পতন হওয়ার পর ভারত খোন্দকার মোশতাকের সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশের  সকল সরকারের সাথেই ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। এটাই রাস্ট্রের নিয়ম ও সংস্কৃতি। এখানে ব্যক্তি বা দল কখনই কোন বিষয় নয়।

তিব্বতের দালাই লামাকে ভারত ভরণ পোষণ, বিভিন্ন ধরনের সাহায্য সহানুভুতি দিয়ে থাকে। এটা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণে। চীনের সাথে ভারতের উষ্ণ বন্ধুত্ব নেই বলে। ভারত দালাই লামাকে ভারত চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। যেমন পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের তেমন ইষ্ণ সম্পর্ক নেই বলে ভারত বাংলাদেশকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চায়। ভারতের সাথে প্রতিবেশী কোন দেশেরই উষ্ণ সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশের সীমান্তে ভারত প্রতিদিনই মানুষ মারছে। বাংলাদেশ তেমন কিছু বলতে পারেনা। আওয়ামী লীগ সরকারতো নিজে থেকেই কিছু বলতে চায়না। কারণ, ভারত এখন আওয়ামী লীগের পরম বন্ধু। হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, ভারত মনে করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে অনেক চুক্তি করা যাবেনা বা অনেক স্বার্থ ও সুবিধা আদায় করা যাবেনা। তাই ভারত আওয়ামী লীগের আমলে সবকিছু আদায় করে নিতে চায়। দুই শক্তিশালী প্রতিবেশী চীন ও পাকিস্তানের সাথে ভারতের স্বাভাবিক সম্পর্ক বিগত ৬০ বছরেও হয়নি। নিকট ভবিষ্যতে সুসম্পর্ক গড়ে উঠার তেমন কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছেনা। চীনকে মাকাবিলা করার জন্যে ভারত এখন রাশিয়াকে ত্যাগ করে আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেস্টা করে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। অপরদিকে চীনের বহুযুগের অকৃত্রিম বন্ধু মায়ানমারের সাথে সন্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।

ভারতের সাথে পাকিস্তানের বৈরিতা পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকে। সে সময়ের ভারতীয় নেতাদের বক্তৃতা বিবৃতি পড়লেই বুঝা যায় তাঁরা পাকিস্তানের প্রতিস্ঠা মেনে নেননি। ৪৮ সালে জিন্নাহর মৃত্যুর সাথে সাথেই ভারত দেশীয় স্বাধীন রাজ্য বা দেশ গুলো দখল করে নেয়।কাশ্মীরের অর্ধেক দখল করে নেয়। প্রশ্ন উঠতে পারে ভারত পাকিস্তান সৃস্টি কেন মেনে নেয়নি বা মেনে নিচ্ছেনা। এটা একটি বিরাট ইতিহাসের ব্যাপার। এই কলামে অত বিরাট বা লম্বা ইতিহাসে কথা বলা যাবেনা। তবে ছোট্ট একটি বাক্য দিয়ে এই লম্বা ইতিহাসটি বুঝাবার চেস্টা করছি। একাত্তুর সালে ভারতের কাছে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘হাজার সাল কা বদলা লিয়া’। এই বাক্যটার সাথে হাজার বছরের ইতিহাস জড়িত। ৭১১ সালে মুহম্মদ বিন কাশেম সিন্ধু দেশ জয় করে নিজ দখলে আনয়ন করেন। ভারতে এটাই ছিল মুসলমানদের প্রথম বিজয়। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী সেই ইতিহাসের দিকে ইংগিত করেছেন। ভারতে মুসলমানদের অবস্থান ও বসতি চলছে এক হাজার বছরেরও উপরে। এই এক হাজার বছরের মধ্যে কোন মুসলমান জেনারেল বা নবাব বাদশাহ কোথাও পরাজিত হননি। ইন্দিরা গান্ধীর বিবৃতি থেকে আমরা জানতে পারলাম ৭১ সালে ভারত যুদ্ধ করেছে পাকিস্তানকে পরাজিত করে  বদলা বা প্রতিশোধ  নেয়ার জন্যে। আমরা ভেবেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা। আমরা খুবই আনন্দিত হয়েছি পাকিস্তানের কাছ থেকে মুক্তি লাভ করে। কিন্তু ভারতের জন্যে এটা ছিল প্রতিশোধ নেয়া।

সম্প্রতি বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের আদর্শ উদ্দেশ্য কি তা বেশ ভাল করেই প্রকাশিত হয়েছে। ভারতীয় জেনারেল ও কূটনীতিক বলেছেন, শেখ হাসিনা আরেক দফা ক্ষমতায় এলে ভারতের চাওয়া পাওয়া ষোলয়ানা আদায় হবে। একজন জেনারেল বলেছেন, পাকিস্তানকে ভাগ করেও ভারতের লাভ হয়নি। ভারত আশা করেছিল পূর্ব পাকিস্তান আলাদা বা স্বাধীন হয়ে গেলে ভারত লাভবান হবে। কিন্তু তা হয়নি। বাংলাদেশ সীমান্ত এখনও ভারতের জন্যে নিরাপদ হয়নি। পাকিস্তান সীমান্তে ভারতকে আগের চেয়ে অনেক বেশী সৈন্য মোতায়েন রাখতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে এরকজন ভারতীয় কূটনীতিক বলেছেন, বাংলাদেশ সীমান্তে সকল প্রকার নিরাপত্তা প্রহরী তুলে নিতে হবে। তাহলে দুই দেশের মধ্যে এত ঝামেলা থাকবেনা। হার্ভাডের শিক্ষক সুব্রামোনিয়াম বলেছেন, বাংলাদেশটা দখল করে নিতে। তাহলে উপ মহাদেশে শান্তি আসবে। ভারতের বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক কবি সাহিত্যিকরা মনে করেন ৭১ সালে বাংলাদেশ সৃস্টি করে ভারত ঠিক করেনি। ভারতের বিভিন্ন থিংকট্যান্কের সদস্যরা মনে করেন বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের প্রয়োজন নেই। এ ধরণের চিন্তার অধিকারী কিছু মানুষ বাংলাদেশেও আছেন। তাঁরা সমাজের গণ্যমান্য। দশজন তাঁদের কথা শোনেন। ভারতের নানা সংগঠণ বাংলাদেশের এই সব বুদ্ধিজীবীদের বেশ চড়াদামে কিনে যত্ন আত্তির করেন। তাঁরাও মনে করেন দুটো কথা বলে বা দুটো কথা লিখে যদি একটু সুখে থাকা যায় অসুবিধা কোথায়।

আমি বার বার অনেক বার বলেছি, বাংলাদেশ যদি হিন্দু প্রধান এলাকা হতো তাহলে একটা আলাদা রাস্ট্রের কোন প্রয়োজন ছিলনা। পশ্চিম বাংলার মতো দিল্লীর অধীনে সুখে শান্তিতে থাকতে পারতো। শুধুমাত্র মুসলমান প্রধান এলাকা হওয়ায় ৪৭ সালে এলাকাটি পাকিস্তানের সাথে একীভূত হয়েছে।তখন অখন্ড বংগদেশ নিয়ে একটি স্বাধীন দেশ গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু কংগ্রেস নেতারা একটি অখন্ড বংগদেশ চাননি। ৭১ সালে স্বাধীন হওয়ার পরেও আলাদা একটি রাস্ট্রে পরিণত হয়েছে। ভারতের সাথে এক হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। একমাত্র কারণ এ অঞ্চলের মানুষের ধর্ম বিশ্বাস। স্যেকুলারিজমের শ্লোগানটি দিন দিন ভন্ডামীতে পরিণত হতে চলেছে। তথাকথিত স্যেকুলারিজমের পিতারা নিজেরাই বলতে শুরু করেছেন, তাঁরা খৃস্টান এবং তাঁদের দেশ বৃটেন একটি খৃস্টদেশ। সম্প্রতি বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী ডভিড ক্যামেরুন বলেছেন, রাখঢাক করার কিছুই নেই। বৃটেন একটি খৃস্টদেশ। তাঁদের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে খৃস্ট ধর্ম থেকেই। আমরিকা ও ইউরোপের সব দেশই খৃস্ট দেশ হিসাবে পরিচিত। এই ইউরোপ থেকেই এক সময় মুসলমানদের বিতাড়িত করা হয়েছে। বহু মুসলমানকে গণহারে হত্যা করা হয়েছে। এখনও বিশ্বের কোন কোন নেতা মুসলমানদের একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীর ক্রুসেডের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ৪৮ সালে ফিলিস্তিনীদের বের করে দিয়ে ফিলিস্তিন ভূখন্ডে ইজরায়েল রাস্ট্র প্রতিস্ঠিত হয়েছে একেবারেই ধর্মের ভিত্তিতে। এই রাস্ট্রটির জন্ম লগ্নেই বলা হয়েছে এটা একটি ইহুদী রাস্ট্র। সারা বিশ্বের ইহুদীরা ইজরায়েল নাগরিক বলে বিবেচিত হবে। এই রাস্ট্রটি প্রতিস্ঠা করেছেন আমেরিকা ও ইউরোপের নেতারা। ভারত নতুন ধর্মীয় রাস্ট্র ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে ভারত তার রাজনৈতিক চরিত্রের পরিচয় দিয়েছে। ফিলিস্তিনী ভূখন্ড থেকে মুসলমানদের জোর করে অস্ত্রের মুখে বের করে দেয়াটাকেও ভারত সমর্থন করেছে। এর সোজা সরল ব্যাখ্যা হলো ভারত, আমেরিকা ও ইউরোপের দেশ গুলোর সাথে ইজরায়েলের সুসম্পর্কের কারণ ধর্ম।

সত্যিকারের  তৌরাত পন্থী ও বাইবেল পন্থীদের সাথে কোরাণ পন্থীদের সাথে মুসলমানদের সুসম্পর্ক থাকার কথা ছিল। এই তিনটি ধর্মের মূল হচ্ছেন ইব্রাহিম(আ)। এরা সবাই হচ্ছেন মিল্লাতে ইব্রাহিম। কিন্তু বড়ই বেদনা ও দু:খের বিষয় হচ্ছে  ইসা(আ) ও মুসা(আ) এর অনুসারীরা মুসলমানদের সাথে বেরাদরী ত্যাগ করে প্যাগান বা মুর্তি পূজকদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছে। এদের সবার লক্ষ্য হচ্ছে ইসলাম ও মুসলমানদের ধ্বংস করা যা কখনই সম্ভব নয়। মুর্তি ধ্বংস করার জন্যেই পৃথিবীতে নবী রাসুলরা এসেছেন। মানুষ কখনই নিজের হাতের তৈরী মুর্তির কাছে মাথা নত করতে পারেনা। এ জগতে মানুষ স্বাধীন ও সার্বভৌম। মানুষের একমাত্র প্রভু ও উপাস্য হচ্ছে আল্লাহপাক স্বয়ং।প্যাগানরা  হচ্ছে মুর্তি পূজক। তাদের বহু উপাস্য আছে। তাদের ভিতর বর্ণবাদ আছে। তারা সমাজকে বিভক্ত করে শূদ্রদের শোষণ ও শাসন করে। তারা শূদ্রদের মানুষ হিসাবে গণ্য করেনা। মনু রচিত আইন গ্রন্থ মনুসংহিতায় বলা হয়েছে শূদ্রদের কোন মানবিক অধিকার নেই। ভগবান তাদের সৃস্টি করেছেন  ব্রাহ্মণ ও তার দোসরদের সেবা করার জন্যে। ভারতে প্রায় ২৫ কোটি শূদ্র,অচ্যুত বা হরিজন আছে যাদের কোন মানবিক মর্যাদা নেই। ভারতের সকল শ্রেণীর নেতারা মনুর বিধান এখনও অন্ধ ভাবে অনুসরন করেন। আধুনিক ভারতের সংবিধানও শূদ্রদের মানবিক মর্যাদা প্রতিস্ঠা করতে পারেনি। মহামতি অম্বেদকার ছিলেন ভারতের সংবিধানের একজন প্রণেতা। শূদ্রদের অধিকার প্রতিস্ঠার লড়াইয়ে ব্যর্থ হয়ে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে এক লক্ষ অনুসারী সহ বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। গান্ধীজী শূদ্রদের আদর করে নাম দিয়েছিলেন হরিজন। মানে শূদ্ররা ঈশ্বরের লোক। কিন্তু ভারতের সংবিধানে শূদ্রদের অধিকার প্রতিস্ঠা করতে পারেননি।

২০১২ সালে এসেও ভারতের সামাজিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করার জন্যেই উপরের কথা গুলো বললাম। ভারত নানা ধর্ম নানা জাতির আবাস স্থল। হিন্দুস্তান বা ভারতে বাস করে বলেই তারা হিন্দু বা ইন্ডিয়ান। হিন্দু ধর্ম বলে জগতে কোন ধর্ম নেই। মনু সংহিতা, গীতা, বেদ, উপনিষদ, রামায়ন মহাভারত কোথাও হিন্দু ধর্মের কথা উল্লেখ নেই।  যেমন বাংলাদেশে বাস করে আমরা হয়েছি বাংলাদেশী, বৃটনে বাস করে হয়েছে বৃটন বা বৃটিশ, আমেরিকায় বাস করে হয়েছে আমেরিকান, ইরাণে বাস করে হয়েছে ইরাণী। ভারতে ২৫ কোটি মুসলমান আছে যাঁরা নিজেদের ভারতীয় মুসলমান বা হিন্দুস্তানী মুসলমান মনে করেন। ৩০ কোটি হরিজন আছেন যাঁরা নিজেদের সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী হিন্দুস্তানী মনে করেন। কিন্তু ভারত শাসন করেন আর্যধর্মে বিশ্বাসী ব্রাহ্মণরা। এই ব্রাহ্মণরাই রামায়ন মহাভারত, বেদ উপনিষদ ও মনুসংহিতার স্রস্টা। রাজা , ধর্মযাজক ও পুরোহিতদের স্বার্থ রক্ষার জন্যেই আর্যধর্ম তৈরি হয়েছে। এই ধর্মে ব্রাত্যজনের কোন স্থান নেই।

কোরান হাদিস ও শরীয়া আইনে জগতের সব মানুষ এক ও অভিন্ন। ইসলাম জগতের সব মানুষের জন্যে শিক্ষাকে বাধ্যতামুলক করেছে। ইসলাম দারিদ্রকে ঘৃণা করে  এবং ঘোষণা করেছে ধনীর সম্পদে গরীবের অধিকার বা হক রয়েছে। ব্যক্তি সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা ইসলাম অনুমোদন করেনা। নির্যাতিত মানুষকে মুক্তি দেয়ার জন্যেই ইসলাম জগতে এসেছেন আল্লাহর রাসুল(সা), কোরাণ ও হাদিস। আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন মজলুমের আহাজারি ও কান্নায় আল্লাহতায়ালার আরশ কেঁপে উঠে। এর আগে আমি অনেকবার বলেছি, মহামতি কার্ল মার্কস যদি আল কোরাণ পড়তেন তাহলে তাঁকে নির্যাতিতের বিপ্লবে বা বিদ্রোহের কথা বলতে হতোনা। বলতে হতোনা কমিউনিস্ট রাস্ট্রের কথা। ইসলামের আগমন এ জগতের সবচেয়ে বড় বিপ্লব। ইসলামী রাস্ট্র হচ্ছে জগতের সবচেয়ে বড় কমিউনিস্ট রাস্ট্র। কিন্তু জগতে সে রকম কোন রাস্ট্র আজও প্রতিস্ঠিত হয়নি। এর মূল কারণ হচ্ছে মুসলমানরা কোরাণ সুন্নাহ বা ইসলামী শরীয়া্হ মোতাবেক জীবন যাপন করেনা। খোদ মক্কা মদীনাতেই ইসলামী প্রতিস্ঠিত হয়নি। প্রকৃত ইসলামি রাস্ট্রের কথা বললে সউদী আরবে মানুষের মৃত্যুদন্ড হয়। মক্কা মদীনায় আজ রাজতন্ত্র চলছে। এক সময়ে মক্কা মদীনার মসজিদ গুলোতে খলিফাদের জবাবদিহি করতে হতো। খলিফা ওমর(রা) কথা জগতবাসী আজও ভুলতে পারনি। তাই বিশ্বব্যাপী আজ মুসলমানরা নির্যাতিত ও অপমানিত।

আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ একটি মুসলমান প্রধান রাস্ট্র। এদেশের ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান। কিন্তু দেশটি ইসলামী নয়। দেশের আইন কানুন কিছুই ইসলামী নয়। দেশের অর্থ ও সামাজিক ব্যবস্থাও ইসলামিক নয়। ফলে নাগরিক জীবনের সাথে রাস্ট্র জীবনের অনেক ফারাক আছে। রাস্ট্র ও কিছু রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবী ইসলামের পক্ষে নয়। ইসলামের পক্ষে কথা বললে প্রতিক্রিয়াশীল ও জংগী মনে করা হয়। আমেরিকার মুসলমান ও ইসলাম বিরোধী ভুমিকার কারণে বিশ্বব্যাপী আমেরিকার তাবেদার মুসলিম প্রধান দেশ গুলোও ইসলামের বিরুদ্ধে লেগে গেছে। বাংলাদেশও এখন আমেরিকার চলমান নীতির খপ্পরে পড়ে গেছে। এখানে ইসলাম বা মুসলমানদের পক্ষে কথা বললেই সন্ত্রাসী আখ্যা দেওয়া হয়। হাতে ইসলামী বই থাকলেই পুলিশ হামলা করে। আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, ‘ আমি হিন্দুও নই , মুসলমানও নই’। এই ভদ্রলোকের নামের দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখুন। তিনি সৈয়দ পদবী ব্যবহার করেন। তিনি আবার শ্রেষ্ঠ ইসলাম। সৈয়দ আশরাফ বাংলাদেশের প্রথম ভারপ্রাপ্ত রাস্ট্রপতির ছেলে। আর এই ভদ্রলোক বলছেন, তিনি মুসলমানও নন হিন্দুও নন। ভদ্রলোক এই রাস্ট্রের একজন মন্ত্রীও। এর চাইতে দু:খ ও বেদনার আর কি হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিব ওয়াজেদ শুনেছি নিয়মিত ধর্মকর্ম করেন। আমি ব্যক্তিগত ভাবেও বিশ্বাস করি শেখ হাসিনা নিয়মিত ধর্মকর্ম করেন। কিন্তু তাঁ সরকারের ধর্ম বিরোধী ভুমিকা দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করে ফেলেছে। সরকার নিজেকে স্যেকুলার বা ধর্ম নিরপেক্ষ বলে প্রচার করে। জগতে ধর্ম নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই। পশ্চিমারা নিজেদের স্বার্থে এই শব্দটা চালু করেছে। তারা নিজেরা এতে বিশ্বাস করেনা। এটা এক ধরনের ভন্ডামী। সম্প্রতি বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন বলেছেন, বৃটেন একটি খৃস্টদেশ। এইদেশের ধর্ম হচ্ছে খৃস্টধর্ম। বহুযুগ পরে হলেও বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী সত্যি কথাটা বলেছেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতার খোলস খুলে বাইরে এসেছেন। এর আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জুনিয়ার বুশ ক্রুসেড ওয়ারের কথা বলেছেন। ক্রুসেড মানে হচ্ছে ধর্মযুদ্ধ। মুসলমানদের বিরুদ্ধে  খৃস্টানরা এই যুদ্ধ শুরু করেছিল। প্রায় দুইশ’ বছর ধরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে।

বাংলাদেশের সাথে ভারতের আত্মিক বা অকৃত্রিম বন্ধুত্ব কখনই হবেনা। কারন রাস্ট্রে রাস্ট্রে তেমন বন্ধুত্ব কখনই সম্ভব নয়। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই আমেরিকার সাথে তার বন্ধুত্ব।সেই বন্ধুত্বে এখন চিড় ধরেছে। আফগানিস্তানে অভিযান চালানোকে কেন্দ্র করে এই বন্ধুত্ব নস্ট হতে চলেছে। বাংলাদেশের সকল সরকারকেই অবশ্যই মনে রাখতে হবে ভারতের সাথে স্বার্থ বিহীন কখনই কোন বন্ধুত্ব হবেনা।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »


স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তি উত্‍সব পালনের জন্যে এখন খবরের কাগজ, রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক উপদল, নানা ধরনের সংগঠণ মহা ব্যস্ত। সেমিনার সিম্পোজিয়ামে রাজধানীর  বিভিন্ন হল অডিটোরিয়াম জমজমাট। সেমিনারে সরকার ও সরকারের চামচারা এক ধরনের কথা বলছে। বিরোধী দল ও তার  সমর্থকেরা ভিন্ন কথা বলছে। এখন যাঁরা বিরোধী দলে আছেন তারা ক্ষমতায় গেলে সরাকারী দল যেভাবে কথা বলে সে ভাবেই বলবেন। আর এখন যারা সরকারী দলে তারা বিরোধী দলের মতোই কথা বলবেন। এতা বাংলাদেশের রাজনীতি সংস্কৃতি। দু:খের বিষয় হলো জ্ঞানী গুণী বুদ্ধিজীবীরাও রাজনৈতিক দল ও কর্মীদের মতো কথা বলেন। তাহলে দেশের মানুষ আসল কথা কোথায় গেলে কার কাছে শুনতে বা জানতে পারবে? সীমাহীন বেদনার কথা  হলো আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যও  দলীয় দৃস্টিকোন থেকেই দেখা হচ্ছে। সেভাবেই দেশের ইতিহাস তৈরী হচ্ছে। এইতো সেদিনের কথা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চলমান ইতিহাস। সেটাও আমরা সঠিক ভাবে তৈরী করতে পারছিনা। আওয়ামী লীগ ও তার দোসররা পুরো বিষয়টাকে নিজেদের দৃস্টিতে দেখছেন। আওয়ামী বিরোধী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিগুলো আরেক ভাবে দেখছেন।

স্বাধীনতার ঘোষণা কে দিয়েছেন তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। বংগবন্ধু কোথাও কোন ঘোষণা দেননি। তিনি নিজ বাসভবনে থেকেই পাকিস্তান সেনা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার বরণ করেন। তার আগে তিনি যে ঘোষণা দিয়েছেন বলে প্রচার করা হচ্ছে তা কেবল আওয়ামী লীগ  কয়েকজন নেতা জানতে পেরেছেন বলে দাবী করছেন। সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলো’র মালিকাধীন প্রকাশনা সংস্থা মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর নামে একটি বই প্রকাশ করেছে। এই বইতে বর্তমান প্লানিং মিনিস্টার এ কে খন্দকার, সাবেক সাংবাদিক ও বিশিস্ট বুদ্ধিজীবী মঈদুল হাসান ও সাবেক বিমান বাহিনীর অফিসার এস আর মির্জা সাহেবের কথোপকথন প্রকাশ করা হয়েছে। প্রথমা আওয়ামীপন্থী একটি প্রকাশনা সমস্থা। যাঁদের কথোপকথন প্রকাশ করা হয়েছে তাঁরাও সবাই আওয়ামীপন্থী। তাই নি:সন্দেহে বলা যেতে পারে তাঁরা সত্য বয়ান দিয়েছেন।মঈদুল হাসান জানান যে, ২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় তাজউদ্দিন সাহেব একটি টেপ রেকর্ডার এবং ছোট্ট একটা খসড়া ঘোষণা শেখ সাহেবকে দিয়ে পড়তে বলেন। স্বাধীনতার ঘোষণাটি লিখেছিলেন তাজ উদ্দিন সাহেব নিজে। তাজউদ্দিন সাহেব শেখ সাহেবকে বলেছিলেন, ‘ মুজিব ভাই, এটা আপনাকে বলে যেতেই হবে, কেননা কাল কি হবে, আমাদের সবাইকে যদি গ্রেফতার করে নিয়ে যায়, তাহলে কেউ জানবেনা তাদের কি করতে হবে। এই ঘোষণা কোন না কোন জায়গা থেকে আমরা জানিয়ে দেব। যদি বেতার মারফত কিছু করা যায় তাহলে সেটাই করবো।’ ‘শেখ সাহেব তখন বলেছিলেন, এই ঘোষণা আমার বিরুদ্ধে একটা দলিল হয়ে থাকবে। এ দলিল পাকিস্তনীরা আমার বিরুদ্ধে রাস্ট্রদ্রোহের মামলায় ব্যবহার করতে পারবে।’ বংগবন্ধুর কথাই সত্য প্রমানিত হয়েছে। পাকিস্তানীরা তাঁর বিরুদ্ধে সত্যিই রাস্ট্রদ্রোহের মামলা করেছিল। কিন্তু তা প্রমান করতে পারেনি। মামলায় আনীত অভিযোগের বিরুদ্ধে বংগবন্ধু সাফ জবাব দিয়েছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানে কি হচ্ছে তার কিছুই তিনি জানেন না। তিনি দেশের বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধ ঘোষণা করেননি। তিনি মেজরিটি পার্টির লীডার , তিনিই  সাংবিধানিক ভাবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।

বিবিসির প্রবীণ সাংবাদিক সিরাজুর রহমান সাহেবের লেখাতেও এ কথা প্রমানিত হয়েছে। পাকিস্তানের কারগার থেকে মুক্তি লাভ করে লন্ডন পৌঁছে হোটেলে বংগবন্ধু বলেছিলেন, সিরাজ, ওরা আমাকে ইওর এক্সিলেন্সি বলছে কেনরে? সিরাজ সাহেব বলেছিলেন, ওরা ঠিকই বলছেন। আপনি এখন স্বাধীন বাংলাদেশের রাস্ট্রপতি বা প্রেসিডেন্ট। বংগবন্ধু অবাক ও বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, বলিস কিরে! আমরা না চেয়েছিলাম অটোনমি? সিরাজ সাহেব বলেছিলেন, মুজিব ভাই, দেশের মানুষ বাংলাদেশ স্বাধীন করে ফেলেছেন। আপনি  এখন স্বাধিন বাংলাদেশের রাস্ট্রপতি। আপনার জন্যে দেশের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। সিরাজ সাহেব আর বংগবন্ধুর আলাপচারিতা থেকে এটা সুস্পস্ট যে বংগবন্ধু স্বাধীনতা চাননি, চেয়েছিলেন ৬ দফার ভিত্তিতে কনফেডারেশন। ইতোমধ্যে কনফেডারেশনের বিষয়ে বেশ কিছু খবর বেরিয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের কাগজে। বংগবন্ধুর ঘোষণার কথা কেউ কোথাও শুনেনি, শুনেছে মেজর জিয়ার ঘোষণার কথা। সারা পৃথিবীর মানুষ শুনেছে মেজর জিয়ার ঘোষণা কথা। কিন্তু আওয়ামী লীগের কিছু চাটুকার বংগবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন বলে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। যার কোন প্রয়োজন ছিলনা। বংগবন্ধু বাংলাদেশের মহান নেতা। তাঁর নামেই ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। তিনিই ছিলেন সারা পাকিস্তানের নির্বাচিত নেতা। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে এমন মিথ্যা প্রচারণার কোন প্রয়োজন ছিলনা। তবুও আওয়ামী লীগ এমন অন্যায় কাজটি করে যাচ্ছে। এতে আওয়ামী লীগের কোন লাভ হচ্ছেনা, আগামীদিনেও হবেনা। একদিন সত্য অবশ্যই প্রতিস্ঠিত হবে। সেদিন ইতিহাস আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করবে না। স্বাধীনতার ৪০ বছর পালন করতে গিয়ে স্বাধীনতার ঘোষনা নিয়ে বিতর্ক মনে বড়ই বেদনার সৃস্টি করে।

রাজনীতি ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ আজ দ্বিধা বিভক্ত। আওয়ামী লীগের রাজনীতি  হলো দলটি দেশের মানুষকে শুধুই বাংগালী বানাতে চায়। আওয়ামী লীগ মনে করে বিশ্বের সব বাংগালী এক। কারণ তাঁরা মনে করেন আমাদের জাতিসত্তার মূল উপাদান হচ্ছে ভাষা ও সংস্কৃতি। কিন্তু আওয়ামী চিন্তাধারার বিরোধী শক্তি মনে করে আমরা বাংলাদেশী। আমাদের জাতিসত্তার প্রধান উপাদান হচ্ছে ধর্ম ভাষা ও সংস্কৃতি। পশ্চিম বাংলা বা ভারতীয় হিন্দুরা মনে করেন তাঁদের জাতিসত্তার প্রধান উপাদান আহরিত হয়েছে বেদ উপনিষদ রামায়ন মহাভারত ও মনু সংহিতা। সারা বিশ্বের বাংগালীরা এক ভাষায় কথা বললেও তাঁদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এক নয়। পশ্চিম বাংলার হিন্দুদের মাতৃভাষা বাংলা হলেও তাদের রাস্ট্রভাষা হিন্দী। বাংলাদেশে মুসলমান হিন্দু ও অন্যান্য উপজাতির মাতৃভাষা বাংলা  এবং রাস্ট্রভাষাও বাংলা। ভাষা বাংলা হলেও বাংলাদেশের সাহিত্যের উপাদান এখানকার মাটি থেকে বিকশিত হয়েছে। যেমন কোলকাতার মানুষ জল বলে আর দিল্লীর মানুষ পানি বলে। কোলকাতার হিন্দুরা নমস্কার বলে আর দিল্লীর হিন্দুরা আদাব বলে। বাংলাদেশের মানুষ সালাম বলে। বাংলাদেশের সাহিত্যে ৯৫ ভাগ চরিত্র মুসলমান। পশ্চিমবাংলা বা কোলকাতায় ৩০ ভাগ মানুষ মুসলমান হলেও সেখানকার সাহিত্যে মুসলমানের উপস্থিতি ৫ ভাগও নেই। আওয়ামী লীগের নেতারা নিজেদের স্যেকুলার বা ধর্ম নিরপেক্ষ মনে করে। তাঁরা মনে করেন রাস্ট্রের সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই। তাঁরা ধর্মকে মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় মনে করে। কিন্তু দেশের মানুষ তা মনে করেনা। এইতো দেখুন না, ক’দিন আগে বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, বৃটেন একটি খৃস্টান দেশ। বৃটেনের অধিবাসীরা মেজরিটি  খৃস্ট ধর্মে বিশ্বাসী। ক্যামেরন জোর গলায় বলেছেন, বৃটেন একটি খৃস্ট ধর্মে বিশ্বাসী দেশ, এ কথা বলতে আমরা ভীত নই। একই ভাবে ইউরোপ আমেরিকাও খৃস্ট দেশ। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের সমস্যা হলো, তাঁরা মনে করেন ইউরোপ ও আমেরিকা স্যেকুলার দেশ। আসলে স্যেকুলারিজম একটা ভন্ডামী। ধর্ম জীবন থেকে কখনই বিচ্ছিন্ন নয়। ধর্ম এক ধরনের শিক্ষা। যা মানুষকে মানুষ হতে শিখিয়েছে। মানুষকে মানবতার শিক্ষা দিয়েছে। ইসলাম এ বিশ্বের সর্বশেষ ধর্ম। মানুষের সকল অধিকার প্রতিস্ঠা করেছে ইসলাম। ইউরোপীয়রাই স্বীকার করে ইসলাম ও মুসলমানেরা সারা বিশ্ব জ্ঞানের আলো জ্বালিয়েছে। মানূসকে সভ্যতার জ্ঞান দিয়েছে। আওয়ামী লীগের স্যাকুলারিজম ভারতীয় ভন্ডামীরই একটি রূপ। ভারতকে বিশ্বর কেউ স্যেকুলার দেশ মনে করেনা। আমাদের দুর্ভাগ্য, ভারতের স্যেকুলারিজমের ভন্ডামী আওয়ামী লীগের কাঁধে চেপে বসেছে।

স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আত্মজিজ্ঞাসার জন্যে একটু পেছনের দিকে ফিরে যেতে চাই। অখন্ড বংগদেশের পূর্বাঞ্চল ছিল কৃষি প্রধান এলাকা। এক সময়ে পরো বংগদেশের রাজধানী ছিল ঢাকা। এক সময় তা চলে যায় মুর্শিদাবাদ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী  কিছু হিন্দু নেতার সাথে ষড়যন্ত্র করে বংগদেশ দখল করলে রাজধানী কোলকাতায় চলে যায়। ১৭৯৩ সালের  সূর্যাস্ত আইনের বলে বংগদেশের জমিদারী গুলো চলে যায় হিন্দু জমিদারদের কাছে। উইলিয়াম হান্টারের মতে ওই আইনের ফলে মুসলমান জমিদারেরা ফকিরে রূপান্তরিত হয়। বাংলাদেশে বড় দুর্ভিক্ষ হয়। জবরদস্তি নীল চাষের কারণে চাষীরা নিজ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। এক কথায় বলা যায় বংগদেশের পূর্বাঞ্চল বা পূর্ববাংলা যা এখন বাংলাদেশ তা ইংরেজ ও হিন্দু জমিদারদের শোষণের ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এ অঞ্চলে বাস করতো গরীব মুসলমান কৃষক সমাজ। কেউ কেউ হয়ত প্রশ্ন তুলবেন সে সময় কি মুসলমান জমিদার ছিলনা? নিশ্চয়ই ছিল, গুটি কতক মুসলমান জমিদার ও নবাব ছিলেন ইংরেজদের তোষামোদী করতেন।  ১৯০৫ সালে প্রশাসনিক সুবিধার্থে ইংরেজরা পূর্ববংগ ও  আসামকে নিয়ে একটি আলাদা প্রদেশ  গঠন করে। অবহেলিত মুসলমানরা ইংরেজদের এই উদ্যোগকে সমর্থন করে। কিন্তু কোলকাতার  হিন্দু  জমিদার, রাজা, মহারাজা ও বাবুরা ইংরেজদের এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেন। এমন কি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও আলাদা প্রদেশ গঠণের উদ্যোগের বিরোধিতা করেন। পরবর্তী পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার সময়ে বাবুরা এর বিরোধিতা করেন। মুসলমানেরা যতই সজাগ হতে লাগলো ততই বাবুদের সাথে বিরোধ চরমে উঠতে লাগলো। ৪৭ সালে পুরো বংগদেশ নিয়ে একটি আলাদা রাস্ট্র গঠণের উদ্যোগ নিলে  নেহেরুর নেতৃত্বে কংগ্রেস স্বাধীন অখন্ড বংগদেশ প্রতিস্ঠার বিরোধিতা করে। এর ফলেই পূর্ববাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। শোষিত ও নির্যাতিত পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের প্রদেশ হওয়ার মূল কারণ ছিল এখানকার জন সাধারনের ৮০ ভাগই ছিলেন মুসলমান। যদি তাঁরা মুসলমান না হতেন তাহলে ভারতের সাথেই থেকে যেতেন। ভারতের মুসলমানদের অধিকার আন্দোলনে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের অবদান সবচেয়ে বেশী। ১৯০৬ সালে নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে ঢাকায় নিখিল ভারত মুসলীম লীগ গঠিত হয়। সেই মুসলিম লীগই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিস্ঠিা করে।

বাংলাদেশের মানুষ যার ৯০ ভাগই মুসলমান তারা বড়ই ভাগ্য বিড়ম্বিত। ১৯০ বছর ছিল ইংরেজ ও  হিন্দুদের শোষণে। পাকিস্তানের মুসলমানদের ভাই মনে করেই তাঁরা পাকিস্তান প্রতিস্ঠা করেছিল। কিন্তু শোষণের অবসান হয়নি। নতুন ভাবে শুরু হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণ। পুরো পাকিস্তানটাই চলে গেলো পাঞ্জাবীদের শোষণের অধীনে। শুরু হলো বাংলাদেশের মুসলমানদের নতুন আন্দোলন ও শোষন বিরোধী লড়াই। মূলত: লড়াইটা শুরু হয় ভাষার অধিকার প্রতিস্ঠার।পাকিস্তানীরা চেয়েছিল উর্দুকে সারা দেশের জন্যে লিংগুয়া ফ্রাংকা করতে চেয়েছিল। যেমন ভারতের লিংগুয়া ফ্রাংকা হচ্ছে হিন্দী। বাংলাদেশের মুসলমানেরা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের এই উদ্যোগের বিরোধীতা করে রাস্ট্র ভাষা বাংলার দাবীতে আন্দোলন শুরু করে।তারপরে শুরু হলো অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন। তারই ফলাফল হলো ৫২র ভাষা আন্দোলন, ৫৪র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২র শিক্ষা কমিশন আন্দোলন , ৬৯র গণ আন্দোলন ও ৭০র নির্বাচন। ৫৪র নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলায় মুসলীম লীগের চির বিদায় সংগঠিত হয়। এরপরে মুসলীম লীগ সত্যিকার অর্থে পূর্ব বাংলায় আর সংগঠিত হতে পারেনি।৭০র  নির্বাচনও  সত্যি কথা বলতে কি কোন দলীয় নির্বাচন ছিলনা। এটা ছিল বাংগালী অবাংগালীর নির্বাচন।পাকিস্তানী শাসকদের ভুলেই নির্বাচনের ফলাফল এমন হয়েছিল। তারা পূর্বাঞ্চলের মুসলমানদের ন্যায্য দাবী মানতে রাজী হয়নি।জামাত ছাড়া অন্য সকল দল নির্বাচন বর্জন করেছিল। মজলুম জননেতা মাওলানা সাহেবের দল নির্বাচন করলে  ৩০টির মতো সিট পেতো। মাওলানা সাহেব নিজেই আমাকে বলেছিলেন, মজিবরকে এগিয়ে যেতে দাও। আরও এগিয়ে গেলে সে দেখবে তার সামনে দেয়াল আর পেছনেও দেয়াল। সরে যাওয়ার কোন পথ পাবেনা। শেখ সাহেব আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলেন। তিনি ৬দফার মাধ্যমেই কনফেডারেশন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভূট্টো ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যড়যন্ত্র করে পাকিস্তান ভেংগে দেবার জন্যে ২৫শে মার্চ রাতে সামরিক অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিল। সামরিক অভিযান চালালে কি হতে পারে এবং ভারত কি পদক্ষেপ নিতে পারে  তা না ভেবেই সামরিক বা্হিনী ভুল পদক্ষেপ নেয়।। বাংলাদেশের সাধারন মানুষ তখন মানসিক ভাবে স্বাধীনতার জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেছে। পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের পর দেশের মানুষ কি করবে কূল কিনারা পাচ্ছিলনা। এমনি এক সময়ে ২৬ ও ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার কন্ঠ ভেসে। ওই ঘোষণা সারা দেশের সর্বস্তরের মানুষ তাদের দিশ ফিরে পেল। ছাত্র শিক্ষক, বাংগালী সেনা অফিসার, পুলিশ আনসার ও ইপিআর সবাই উজ্জীবিত হলো এবং প্রতিরোধ গড়ে তুললো। মুজিব নগর সরকার গঠিত হয়েছে এপ্রিল মাসে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সরকার গঠণ করলেন ভারতের নির্দেশে। কথা ছিল জাতীয় সরকার গঠণের। কিন্তু ভারত রাজী হয়নি। সর্বদলীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন মাওলানা ভাসানী। কিন্তু তাঁকে গৃহবন্দী করে রেখেছিল ভারত সরকার। ১৬ই ডিসেম্বরের পর তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়।

স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তিতে নিশ্চয়ই আমরা আমাদের আত্মাকে জিজ্ঞাসা করবো  দেশের উন্নতি কতটুকু  হয়েছে। এক সময়ের সুজলা সুফলা আমাদের এই দেশকে ১৯০ বছর শোষণ করেছে  বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ও বৃটিশ সরকার। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল বাংলার এই অঞ্চল থেকে। তারপরে ২৩ বছর শোষন করেছে পাকিস্তান। কিন্তু বিগত ৪০ বচরে বাংলাদেশকে সবচেয়ে শোষণ করেছে ভারত। এই শোষণ পাকিস্তানীদের শোষণকেও ছাড়িয়ে গেছে। ভাতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, এ দেশের বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ চোখ বন্ধ রেখে ভারতের তাবেদারী করে বাংলাদেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে। বাংলাদেশের মিডিয়ার একটি বড় অংশ ভারতের পক্ষে কথা বলে। শোনা যায় বাংলাদেশের মিডিয়াতে ভারতের  বিরাট পরোক্ষ বিনিয়োগ রয়েছে। ভারতের পক্ষে প্রকাশ্যে দালালী করে এক গ্রুপ বুদ্ধিজীবী।

আমি এ কথা বলবোনা যে বাংলাদেশের কোন উন্নতি হয়নি। কিন্তু তা জনগনের চাহিদার তূলনায় অনেক কম। চলতি সময়ে আমাদের মাথা পিছু আয় হওয়ার কথা  বারোশ’ ডলার। যদি আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার  দশ এর ঘর ছাড়িয়ে যেতো। তা হয়নি, কারণ আমাদের রাজনীতিকরা এ নিয়ে তেমন ভাবেন না বলেই আমার মনে হয়। বাংলাদেশকে শোষণ করে এক শ্রেণীর দুর্ণীতিবাজ হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে। অফিসের কেরাণী হওয়ার যোগ্য নয় এমন লোক হয়ে গেছে ব্যান্কের চেয়ারম্যান। এদের প্রবৃদ্ধি হয়েছে বছরে ২০/৩০ পারসেন্ট করে। দেশে বেসরকারী খাতের উন্নতি হোক এটা আমরা সবাই চাই। কিন্তু সেটা কি লুট করে। বাংলাদেশের অসত্ ধনীরা সরকারী রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আর সাধারন মানুষকে শোষণ করেই ধনী হয়েছে। আর রাজনৈতিক দল গুলো ধনীদের পকেটে ঢুকে পড়েছে। এসব অসত্‍ ধনীরাই আজ মিডিয়ার মালিক। এরাই জনমতকে আড়াল করছে ও সাধারন মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। দেশের মানুষের স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ সিংগাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও গণচীনের মতো দ্রুত উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। শুধুমাত্র সঠিক রাজনৈতিক রাস্ট্র ব্যবস্থাপনার কারনে আমাদের প্রিয় দেশ তার অভিস্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু রাজনৈতিক নেতারা কেউ গরীব নেই। তারাতো একবার এমপি হলেই গাড়ি বাড়ি সব পেয়ে যান।

Read Full Post »


হাসপাতাল গুলোতে গেলেই বুঝা যাবে দেশে  রুগীর সংখ্যা বাড়ছে না কমছে। আমি থাকি রাজধানীতে তাই এখানকার কথাই বলতে পারবো ভাল করে। জেলা শহরগুলোতে যাওয়া হয়না অনেকদিন। তাই সেখানকার বিস্তারিত খবর আমার জানা নেই। তবে খবরের কাগজের পাতায় দেখা যায় হাসপাতালের করুণ অবস্থা। হ্যারিকেন জ্বালিয়ে অপারেশন করার খবর প্রায়ই দেখা যায়। বহু হাসপাতালে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অষুধ নাই। তারপরে রয়েছে রুগীদের প্রতি ডাক্তার, নার্স ও কর্মচারীদের অবজ্ঞা।বহু সরকারী হাসপাতাল আছে যেখানে প্রয়োজনীয় ডাক্তার নেই। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মফস্বলে পোস্টি হলে কেউ যেতে না চাইলে তাদের চাকুরী  চলে যাবে। আসলে ধমক দিয়ে বা চাকুরীর ভয় দেখিয়ে স্বাস্থ্য প্রশাসন চালানো যাবেনা। ছেলেরা ডাক্তারী পড়ে কোন নীতি বা আদর্শ নিয়ে নয়। এটা তাদের কাছে টাকা কামাবার একটি পদ। ডাক্তাররা  কেউ জিলা বা উপজেলা শহরে যেতে চায়না। তার কারণ তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হয়। স্বামী স্ত্রী ডাক্তার হলে তাদের যদি ভিন্ন জায়গায় পোস্টিং দেয়া হয় তখন তাদের পক্ষে চাকুরী করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমি এসব ক্ষেত্রে স্ত্রীরা চাকুরী ছেড়ে দিয়ে রাজধানী বাবড় বড় শহর গুলোর ফাইভ স্টার হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে চাকুরী নেয়। মফস্বল শহর গুলোতে ডাক্তারদের থাকার তেমন কোন সুব্যবস্থা নেই।নিজ গ্রাম বা উপজিলা বা জিলায় ডাক্তারদের পোস্টিং দেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এর ফলে ডাক্তারেরা নিজ এলাকার মানুষদের সেবা করার সুযোগ পাবে।

রাজধানী ঢাকায় এখন বেশ কয়েকটি ফাইভ স্টার হোটেল মানের হাসপাতাল চালু হয়েছে,যা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চলে। এসব  হাসপাতালে অনেক সময় ধনীরা রেস্ট নেয়ার জন্যে ভর্তি হন। তবে তাঁরা বেশীর ভাগই বিদেশে চলে যান রেস্ট নেয়ার জন্যে। গত কয়েক বছরে ঢাকায় বিদেশী হাসপাতালের অনেক গুলো লিয়াজোঁ অফিস খোলা হয়েছে। ঢাকায় বসেই বিদেশী হাসপাতালের বুকিং দেয়া যায়। চিকিত্‍সা ব্যবস্থায় নতুন টার্ম যোগ হয়েছে। তা হলো মেডিকেল টুরিজম। এই ব্যবস্থায় ধনীরা বা যাঁরা ব্যয় বহনে সক্ষম তাঁরা বিদেশ ভ্রমণও করে,সাথে সাথে চিকিত্‍সার সুযোগও পায়। আমরা যারা ঢাকায় চিকিত্‍সা নিতে চাই তারা ফাইভ স্টার  হাসপাতাল গুলোর দ্বারস্থ হই। এসব হাসপাতালের রেজিস্টার্ড রুগী হিসাবে নাম রেকর্ড করে একটা আইডি কার্ড গ্রহণ করি। আমি ও আমার স্ত্রী পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালের  রেজিস্টার্ড রুগী। এখানে আমাদের প্রায়ই যেতে হয়। এই হাসপাতালের  নামজাদা বেশ কয়েকজন ডাক্তারের সাথে আমার  সুসম্পর্ক রয়েছে। শুনেছি, এই হাসপাতালটি প্রথমে হোটেল হিসাবে চালু করার পরিকল্পনা ছিল।  আমেরিকার  ৯/১১র ঘটনার পর স্কয়ার গ্রুপের মালিকরা চিন্তা করলেন টুইন টাওয়ারের ঘটনার পর হোটেল ও পর্যটন ব্যবসায় ধস নামতে পারে। তড়িঘড়ি করে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন হোটেলের জন্যে তৈরী ভবনটাকে হাসপাতালে রূপান্তরিত করবেন। কিন্তু হোটলের স্ট্রাকচারটা রয়ে গেল। লোকমুখে শুনি, স্কয়ার গ্রুপের মালিকরা সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন। এ ক’বছরেই নাকি তাঁদের পুঁজি উঠে গেছে। এই গ্রুপের নিজস্ব অষুধ কোম্পানী আছে। ওই কোম্পানীর অষুধ কেনা এখানে বাধ্যতামূলক। ডাক্তার সাহেবরা প্রেসক্রিপশন রুগীর হাতে না দিয়ে সরাসরি কম্পিউটারের মাধ্যমে হাসপাতালের ভিতরে তাঁদের নিজস্ব অষুধের দোকানে পাঠিয়ে দেন। ডাক্তার সাহেব বলেন, অষুদের দোকানে গেলে প্রেসক্রিপশন পেয়ে যাবেন। ওই দোকান থেকে ওষুধ না কিনে বাইরে গেলেও রুগীকে স্কয়ারের অষুধই কিনতে হবে।

স্কয়ার হাসপাতালে যদি আপনি কখনও যান তাহলে প্রথমে ধাক্কা খাবেন যেখানে গাড়ি থাকে সেখানে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্যে বেশ লোকবল আছে। যা নেই তা হলো নিয়ম শৃংখলা। পাশাপাশি দুটো গাড়িকে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা আছে। কিন্তু দরজা খোলার কোন স্পেস নেই। যারা ডিউটিতে আছেন তাঁরা গাড়ির দরজা খুলে দেন না। দরজা কোলার স্পেস নিয়ে যে কোন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ ব্যাপারে কথা বলতে যেয়ে আমি কোন ধরনের সহযোগিতা পাইনি। বিভিন্ন ফ্লোরে বহু কর্মী আছেন যাঁরা আপনাকে সহযোগিতা করার জন্যে দাঁড়িয়ে আছেন। কিছু বললে, তাঁরা বলেন অভিযোগ খাতায় লিপিবদ্ধ করুন। শুনেছি  হাসপাতালের নাকি একজন গণ সংযোগ কর্তা আছেন। তাঁর সাথে মিডিয়ার কোন যোগাযোগ নেই। তিনি এর প্রয়োজনও মনে করেন না। আমি একটি ইমেইল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। এই হাসপাতালের আরেকটি নিয়ম হলো আপনাকে বার বার অসুস্থ হয়ে তাদের কাছে যেতে হবে। যতবার যাবেন ততবার  আটশ’টাকা ফি দিতে হবে। সাতদিনের ভিতর গেলে আপনাকে চারশ’ টাকা দিলে চলবে। এমন কি রিপোর্ট দেখাতে গেলেও আপনাকে ফি দিতে হবে। এসব হাসপাতালে সময়ের কোন মূল্য নেই। ডাক্তার সাহেব বা তাঁর সহকর্মী আপনাকে যে সময় দিবেন তা তাঁরা কখনও মানেন না বা রক্ষা করেন না। ধরূন, আপনাকে এপয়েন্টমেন্ট দেয়া হলো বিকেল তিনটা, আপনি নানা কারণে বিকেল সাড়ে তিনটায় গিয়ে পৌঁছালেন। আপনাকে বলা হবে আপনার সময় পার হয়ে গেছে। আর যদি তিনটার স্থলে বেলা দুইটায় গেলেন, বলা হবে, অপেক্ষা করুন। এর আগের অনেক রুগী আছে। আপনাকে দেড় ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে। যে ক’জন ডাক্তারের সাথে আমার সুসম্পর্ক রয়েছে তাঁরা সবাই খুবই ভাল মানুষ। কিন্তু হাসপাতাল অব্যবস্থাপনার কারণে ডাক্তারদেরও বদনাম হচ্ছে।

ল্যাবএইডে আমার ডাক্তার হলেন প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও লেখক বরেন চক্রবর্তী। তিনি বহুদিন যাবত আমার ডাক্তার। তাঁর সাথে দেখা করা বা এপয়েন্টমেন্টের জন্যে আমার যেতে হয়না। ইমেইল করলে তিনি এপয়েন্টমেন্ট বা সময় দিয়ে দেন। তাতে আমি খুবই খুশী হই। মানে অতি অল্পতেই খুশী। বিদেশের ডাক্তার বা হাসপাতালের সাথে এপয়েন্টমেন্টের জন্যে এটাই নিয়ম। কিন্তু আপনার মন খারাপ হয়ে যাবে যখন আপনি ডাক্তারের সহকারীর সম্মুখে গিয়ে হাজির হবেন। দেখবেন তিনি মলিন বদনে বা গোমরা মুখো হয়ে বসে আছেন। আমার আবার সমস্যা হলো মলিন বদন লোক দেখলে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। এই সহকারী সাহেব হয়ত নিজেই অসুস্থ, অথবা তাঁর বাড়িতে কোন সমস্যা আছে। অথচ বরেন বাবু নিজে খুবই হাসিখুশী মানুষ। আমি তাঁর সাথে দেখা করতে গেলে তিনি বেশীর ভাগ সময় সাহিত্য নিয়ে আলাপ করেন। আমিও জানতে চাই এবারের একুশে মেলায় তাঁর কোন নতুন বই আসছে কিনা। তিনি তখন কম্পিউটারে  নতুন বইয়ের কাভার দেখছিলেন। বাইরে এসে ফিস জমা দিতে গিয়ে দেখি ফিস বেড়ে গেছে। পুরাণো রুগী পাঁচশ’টাকা আর নতুন রুগী সাতশ’টাকা। আগেছিল নতুন রুগী পাঁচশ’টাকা আর পুরাণো রুগী চারশ’টাকা। এ নিয়ম বহুদিন চালু ছিল।

ক’দিন আগে ল্যাবএইডে মেডিসিন ও ডায়াবেটিসের ডাক্তার খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিনি বিদেশে থাকতেই এপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিলাম। একদম সঠিক সময়ে গিয়ে হাজির হলাম। সহকারী বললেন, পাশের রুমে আগে রিপোর্ট লিখিয়ে নিন। দেখলাম সেখানে বেশ বড় একটা লাইন। আমি লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। রিপোর্ট লিখিয়ে আবার সহকারীর কাছে ফিরে এলাম। তখন তিনি বললেন, আপনাকে কয়েকবার ডেকেছি। এখন আপনাকে আরও কিছুক্ষণ বসতে হবে। সোজা ভাষায় বলতে গেলে বলতে হবে যে সময় দেয়া হয় তার কোন দাম নেই। সাতটায় এপয়েন্টমেন্ট থাকলে ডাক্তার সাহেব আপনাকে দশটায়ও দেখতে পারেন। স্কয়ারে আমার ডাক্তার হলেন খালেদ মহসিন সাহেব। তিনিও খুবই ভাল মানুষ। বেশ হাসি খুশী। এ গুণটা ছিল সাবেক রাস্ট্রপতি ডাক্তার বি চৌধুরীর। তিনি সব সময় রুগীদের সাথে হাসি খুশী ভাবে কথা বলতেন। খুব কম অষুধ দিতেন। অনেক সময় ফিসও নিতেন না। তাঁর সাথে দেখা করে রুগী এমনিতেই ভাল হয়ে যেতেন। খালেদ মহসিন সাহেবের সাথেও আমি ইমেইলে এপয়েন্টমেন্ট করি। কিন্তু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের কারণে অনেক সময় ইমেইল এপয়েন্টমেন্ট কার্যকরী হতে চায়না। ওখানে যখনি যান না কেন হাসপাতালের সহকারীরা আপনাকে বসিয়ে রাখবেন কয়েক ঘন্টা। সহকারীকে বার বার মনে করিয়ে  দিতে হয়।একজন সহকারীকেও আমি হাসি মুখ দেখি নাই। এতা তাদের ট্রেনিংয়ের অংশ কিনা জানিনা। একবার আমি প্রায় একঘন্টা অপেক্ষা করে ব্যর্থ মনোরথে ফিরে আসার সময়  খালেদ সাহেবকে ফোন করেছিলাম। তিনি বললেন, আপনি এখনি আসুন, আমি সহকারীকে বলে দিচ্ছি। আমি ফিরে গিয়ে সহকারীকে বললাম। তিনি বললেন স্যার আমাকে কিছু বলেন নি। আমি বললাম আপনি স্যারের সাথে কথা বলুন। সহকারী বললেন, আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। সেদিন আমি গিয়েছিলাম রিপোর্ট দেখাতে। একদিন পরে ডাক্তার খালেদের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। তবে এ কথা সত্যি যে, রুগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকায় ডাক্তাররা কোথাও সময় সূচী রক্ষা করতে পারছেন না।

ল্যাব এইডের বদনাম একটু বেশী। লোকে বলে ল্যাব এইডে কোন রুগী ভর্তি হলে তিনি নাকি জীবিত বেরিয়ে আসতে পারেন না। ইতোমধ্যে ল্যাব এইড কর্তৃপক্ষ কয়েক দফা জরিমানা দিয়ে রেহাই পেয়েছেন। বেশ কয়েক বছর আগের কথা, আমাদের বন্ধু শফিকুল আজিজ মুকুল অসুস্থ হয়ে ল্যাব এইডে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর কার্ডিয়াক সমস্যা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, তিনি মারা যাওয়ার পরেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যন্ত্রপাতি লাগিয়ে  দুই তিন দিন হাসপাতালে রেখে দিয়েছিল শুধু বিল আদায়ের জন্যে। ঢাকা ও অন্যান্য শহরের ছোট খাট হাসপাতলের বিরুদ্ধে অমানবিকতার বহু অভিযোগ রয়েছে। এইতো ক’দিন আগে সিলেটের একটি হাসপাতালের মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকার বিল শোধ করতে না পেরে এক গরীব মা নিজের শিশু সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছে। এর আগেও শুনেছি ঢাকার একটি ক্লিনিকের মালিক বিল পরিশোধ করতে পারেনি বলে এক কিশোরকে প্রায় এক মাসের মতো ক্লিনিকে আটক করে রেখেছিল। এসব ঘটনা সারা দেশের চিকিত্‍সা ব্যবস্থায় অহরহ ঘটে চলেছে। বহু বছর আগে ফেণীর এক ডাক্তার আমার বিরুদ্ধে ডাক্তারের কর্তব্য কর্মে বাধা দানের অভিযোগ এনে মামলা করেছিল। সেই মামলায় আমি গ্রেফতার হয়েছিলাম। সেই মামলা অনেকদিন চলেছিল। এক সময় ওই ডাক্তারের চাকুরী চলে গিয়েছিল। তিনি কিছুদিন জেল খেটেছিলেন। পরে ডাক্তার সাহেবের ছেলে প্রতিমন্ত্রী হয়ে তাঁর পিতার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ তুলে নিয়েছিলেন।

গোমরা মুখ নিয়ে একটা ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। আমার ডাক্তার আমাকে সিটি এনজিওগ্রাম করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এর আগে আমি দুবার এনজিওগ্রাম করিয়েছিলাম। একবার করেছি কোলকাতার বিড়লা হাসপাতালে। দ্বিতীয়বার করিয়েছি ঢাকার শিকদার হাসপাতালে। তৃতীয়বার ডাক্তারদের পরামর্শ ছিল সিটি এনজিওগ্রাম করার। কোথায় করবো তা নিয়ে আমি বন্ধুদের সাথে পরামর্শ করছিলাম। বেশ কয়েকজন বন্ধু বললেন, ইবনে সিনা হাসপাতালে করার জন্যে। আমারও মন চেয়েছিল সেখানে করার জন্যে। একদিন সেখানে গিয়েছিলাম। পরামর্শ মোতাবেক একটি রুমে গেলাম। সেখানে বসার জায়গা ছিলনা। স্টাফরাই সোফা ও চেয়ারে বসে ছিলেন। একজনের কাছে বিষয়টা জানতে চাইলাম। ভদ্রলোক মুখ গোমরা করে বসেছিলেন। আমার মনে হয়েছিল তিনি খুবই অসুস্থ বোধ করছেন। আমি তাই জানতে চেয়েছিলাম তিনি অসুস্থা বোধ করছেন কিনা। মলিন বদনেই তিনি জানালেন তিনি অসুস্থ নন। আমার মনে হয়েছে তিনি রাজনৈতিক বা আত্মীয়তার কারণে তিনি চাকুরী পেয়েছেন। আমাদের দেশে সর্বত্রই হাসি মুখে থাকার সংস্কৃতি বা কালচারটা গড়ে উঠেনি। এমন কি সালাম বিনিময়ের সময়েও লোকজন হাসিমুখে থাকেনা।আগেই বলেছি এ দেশে সদা হাস্য ডাক্তারের মধ্যে এক নম্বর নাম হচ্ছে বি চৌধুরী সাহেবের। আরেকজন ডাক্তারের নাম উল্লেখ করার লোভ আমি সামলাতে পারছিনা। তিনি কোন নামকরা ডাক্তার নন। তাঁর নাম ডাক্তার দাউদ। থাকেন ফেণীতে। তাঁর চেম্বার হলো বন্ধুদের আড্ডাখানা। রুগীও আছে বন্ধুরাও আছে। সকাল বিকাল দুই বেলাই আড্ডা চলে। চেম্বারটিও খোলামেলা। রুগীরা ঢুকেই ডাক্তারের চেহারা দেখতে পায়। আর মফস্বল শহর বলে সব রুগীই ডাক্তারের পরিচিত। এই ডাক্তার দাউদকে দেখেছি সদা হাস্য। এখনও নাকি সেই আড্ডা চলছে। রুগীও দিনদিন বেড়ে চলেছে। আরেকজন পিতৃ স্থানীয় ডাক্তারের নাম  ুল্লেখ না করে পারছিনা। ইনি হচ্ছেন নরেন কাকা। আমার বাবার ঘনিস্ট বন্ধু। থাকতেন ফেনীর মাস্টার পাড়ায়। সাইকেলে করে বাসা থেকে চেম্বারে আসতেন। ট্রান্করোড আর পাঁছগাছিয়া রোডের সংযোগ স্থলে তাঁর চেম্বার ছিল। যতদূর মনে পড়ে নরেন কাকা ফিস নিতেন না। তখনকার দিনেও দেখেছি তাঁর চেম্বারে ১৫/২০ জন রুগী সব সময় থাকতো। তিনি রুগীদের রংগীন মিক্সার দিতেন দাগের চিহ্ন দিয়ে। তখন পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যবস্থা ছিলনা। এত ডায়োগনস্টিক সেন্টারও ছিলনা। নরেন কাকা  ছিলেন স্বদেশী এলএমএফ ডাক্তার। স্বদেশী আন্দোলন করার কারণে বৃটিশদের কলেজ থেকে ডাক্তারী পাশ করতে পারেননি। পরে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ থেকে এলএমএফ পাশ করেছেন বলে শুনেছি। ছু ফুট লম্বা এই মানুষটি ছিলেন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের একজন ত্যাগী সৈনিক। নরেন কাকার রুগীদের মধ্যে বেশীর ভাগই ছিলেন গ্রামের কৃষক ও সাধারন মানুষ। অনেকেই অষুধের দাম দিতে পারতেনা। বলতেন, যা যা  বাধি যা, ভাল করে খাওয়া দাওয়া কর। তোর বউ কেমন আছে? আবার এমনও দেখেছি, অনেক রুগীই নিজের চাষ করা  তরি তরকারি, ফলমূল নিয়ে আসতো। অনেকে ঝুনা নারকেল, মুরগীর ডিম, গরূর দুধ নিয়ে আসতো। আর কাকা বলতেন , এ গুলো নিয়ে যা, বিক্রি করে ছেলে মেয়েদের জন্যে কিছু কিনে নিয়ে যা। রুগীরা বলতো, ডাক্তার বাবু, এসব ফিরিয়ে নিয়ে গেলে আমার গুনাহ হবে।

স্বাধীনতার ৪০ বছরে মনে পড়ছে, কিভাবে কিছুলোক হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে আদম ব্যবসা, গার্মেন্টসের ব্যবসা, জমির ব্যবসা, ফ্ল্যাটের ব্যবসা ও ডায়াগনস্টিক আর হাসপাতাল ব্যবসা করে। এসব ব্যবসায় ন্যায়নীতির কোন বালাই নেই। মানুষ মারা যাক তাতে তাদের কিছু আসে যায়না। তাদের টাকা হলেই হলো। সবচেয়ে অমানবিক হচ্ছে রুগী শোষণ করে ধনী হওয়া। আমি একজন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিককে যিনি এ ব্যবসা শুরু করেছিলেন ফকিরাপুলের একটি অপরিচ্ছন্ন কামরায়। চাকুরি বা কোন ধরনের কাজ না পেয়ে সে এ কাজ শুরু করেছিল। এখন সে বড় হাসপাতাল, কলেজ ওঅনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক। বিগত ২০ বছরে সব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন এখন ডাক্তার বন্ধুরা ফিস নেন আটশ’ বা হাজার টাকা। পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে লাগে আরও চার পাঁচ হাজার টাকা। রিপোর্ট দেখাতে আবার চার পাঁচশ’ টাকা। রাজধানীতে বাস করছি পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় ধরে। তেমন একজন ডাক্তার পেলাম না যাঁকে নরেন কাকা বা দাউদ ডাক্তারের মতো মনে হয়।( নয়া দিগন্ত, ২রা জানুয়ারী,২০১২ )

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »

আবেগের ১২৫ বছর


যে কোন স্মৃতির কথা মনে করা বা লেখা সব সময়ই খুব আবেগের বিষয়। আপনি শুধু একবার আপনার মায়ের কথা ভাবুন। অথবা পূর্ব পুরুষের কথা ভাবুন বা তাদের কবর জিয়ারত করুন। দেখবেন আপনার অনুভূতি কেমন হয়, যা চট করে ভাষায় বর্ণনা করা যাবেনা। আমার প্রথম গদ্য গ্রন্থের নাম মায়ের চিঠি। এই বইয়ের কথা এখনও অনেকে বলেন এবং আমিও আবেগকে লুকিয়ে রাখতে পারিনা। ক’দিন আগে ফেণী সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২৫ বছর পূর্তি অনুস্ঠানে গিয়েছিলাম ওই মহা আবেগের কারণে। বহুদিন পর স্কুলের মাঠ ভবন ও চারিদিকের পরিবেশ দেখলাম। ৫২ সালে আমি প্রথম এই স্কুলে প্রবেশ করেছি। আমাদের প্রিয়তম হেডমাস্টার জালাল সাহেব তখন মাত্র এই স্কুলে যোগ দিয়েছেন। পুরাণো সব স্মৃতি মনে ও মাথায় এখন গিজ গিজ করছে। বহু বছর পর স্কুলের মাঠে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়েছি পুরাণো বন্ধুদের পেয়ে। এছাড়াও আমাদের সময়ের অনেক ছাত্রকে দেখেছি, যাদের অন্য সময় দেখা যায়না। অনেকেই ঢাকায় থাকে, তবুও দেখা হয়না। অতি বাস্তবতাই মানুষকে ভালবাসা থেকে ঠেলে ফেলে দিয়েছে বহু দূরে। কঠোর শহুরে জীবনের কষাঘাতে ভুলে গেছি সবুজ জীবনের কথা।

একশ’ বছর পুর্তি পালনের জন্যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, কিন্তু কোন ব্যক্তি বা রাজনৈতিক কারণে অনুস্ঠান করা যায়নি। এবার সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে বিরাট আওয়াজ দিয়ে। উদ্যোক্তা কমিটিকে আমি আমার হৃদয় থেকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। বিশেষ করে আবদুস সাত্তারকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারছিনা। সাত্তারই আমাকে উত্‍সাহিত করেছে এই ঐতিহাসিক অনুস্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্যে। মনটা সবুজ থাকলেও শরীরটা আগের মতো আর হা ডুডু খেলতে চায়না। তবুও জমা দিয়েছি নিবন্ধনের জন্যে আঠারশ’ টাকা। শারীরিক কারণে যাননি আমার স্ত্রী। ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে আমার ড্রাইভারও ভিতরে যেতে পারেনি খাদ্য সংগ্রহের জন্যে। আমি নিজেও পারিনি এই বয়সে প্রচন্ড ভিড় ঠেলে খাদ্য সংগ্রহ করতে। জুমার দিন থাকায় তাড়াতাড়ি নামাজ শেষ করে ঢাকায় ফিরার কথা স্থির করলাম। আমার সাথে ছিল আমার মামাতো ভাই হারুণ। তাকে বললাম, আমার শরীর কাঁপছে। তাড়াতাড়ি খাবার দোকানে চলো। সে আমাকে মিজান রোডে নিয়ে গেলো। সেখানে হোটেলটি বন্ধ ছিল। আমি বললাম চলো ফুড গার্ডেনে যাই। হারুণ বললো ওটা চাইনিজ খাবারের হোটেল। আমি বললাম আগে চলো, তারপর দেখা যাবে। সেখানে গিয়ে দেখি বিরাট ভোজের আয়োজন। আমার পরিচিত সব বন্ধু বান্ধব। সবাই ডেকে তাদের সাথেই বসালো। হারুণকে বললাম, দেখো আল্লাহর হুকুম কি। হোটেল সহকারীকে ডেকে বললাম সাদা ভাত ও ডাল দিতে। ভদ্রলোক প্রথমে রাজী হননি। কিন্তু সবাই বলাতে রাজী হয়ে গেলেন। এই মধ্যান্ন ভোজের আয়োজন করেছিলেন বিসিকের এক রি রোলিং মিলের মালিক জাফর সাহেব। ঢাকা স্টক এক্সচেন্জের সাবেক সভাপতি রাকিবের পরিচিত। ভোজটা আয়োজন করা হয়েছিল এটিএন এর চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান সাহেবের সম্মানে। এটিএন ১২৫ বছর পূর্তি অনুস্ঠানের মিডিয়া পার্টনার।তিনি ছিলেন বিকের অনুস্ঠানের প্রধান অতিথি। অনুস্ঠানের মিডিয়া পার্টনার করার জন্যে আমি সাত্তার ও শাহজাহান গিয়েছিলাম মাহফুজুর রহমান সাহেবের কাছে। তিনি এক কথায় রাজী হয়ে গিয়েছিলেন। মাহফুজ সাহেব শাহজাহান চৌধুরীর বন্ধু। শাহজাহানই তাঁর কাছে আমাকে ও সাত্তারকে নিয়ে গিয়েছিল। ফেণী হাইস্কুলের ১২৫ বছর উদযাপন উত্‍সবকে বিশেষ কভারেজ দেয়ার জন্যে এটিএনকে ধন্যবাদ । যাঁরা পুরো অনুস্ঠানটি অর্গেনাইজ করেছেন তাঁদেরকেও আন্তরিক ধন্যবাদ। আফটার অল, যা আমরা পারিনি তা তাঁরা করে দেখিয়েছেন।

তবে যত ভাল আশা করেছিলাম তত ভাল হয়নি, এটা আমি অকপটে স্বীকার করতে চাই। ঢাকা থেকে ভোর পাঁচটায় রওয়ানা দিয়ে সকাল ন’টায় স্কুলের মাঠের কাছে গিয়ে পৌঁছাই। পথে পুলিশ আটকে দিল। বললো, গাড়ী আর যাবেনা। জিগ্যেস করলাম, গাড়ী কোথায় পার্ক করবো। পুলিশ বললো, পার্কিং সম্পর্কে তারা কিছু জানেন না। বেশ দূরে নেমে মাঠে এলাম। ইতোমধ্যেই আমি অসুস্থ বোধ করতে লাগলাম। ডায়াবেটিজের রুগী, ঠিক খাবার না খেলে শরীর কাঁপতে থাকে। স্থানীয় এক সাংবাদিকের জানতে চাইলাম, কোথায় নাস্তা করা যায়। ভদ্রলোক আমাকে স্টেশন রোডে নিয়ে গেলেন। পছন্দ না হলেও সামান্য কিছু  মুখে দিয়ে পানি খেলাম। একটু জিরিয়ে  অষুধ খেলাম। তখন দশটা বেজে গেছে। মাঠে গিয়ে আইডি কার্ড খুঁজতে লাগলাম। স্বেচ্ছা সেবকরা জানতে চাইলেন, আমার কাছে কোন রিসিট বা কাগজ আছে কিনা। আমি বললাম না, আমার কাছে কোন কাগজ নেই। আমি ৫৬ ব্যাচের ছাত্র। আপনারা ব্যাচ ওয়ারী খুঁজুন, পেয়ে যাবেন। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আমার আইডিটি বের করতে পারলাম না। আগেই বলেছি, জার্ণি করে আমি খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই আর দাঁড়াতে পারছিলাম না। মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলাম একটু বসে বিশ্রাম নেয়ার জন্যে। এমন সময় আমার ব্যাচের একবন্ধু জানালো সে আমার কার্ড দেখেছে। ক্লান্তির কারণে উঠতে ইচ্ছে হচ্ছিলনা। তবুও আইডি কার্ড আনার জন্যে আবার গেটের দিকে গেলাম। কিন্তু ব্যাগ, খাবার কুপন আর সংগ্রহ করতে পারলাম না। আবার মঞ্চের সামনে গিয়ে সামনের কাতারের একটি চেয়ারে বসলাম। পরে একজন ভলান্টিয়ার একটি ব্যাগ হাতে তুলে দিয়েছিলেন। অনুস্ঠান শুরু হয়েছে বেলা এগারটার দিকে। তখনও মঞ্চ সাজানোর কাজ চলছিলো। মঞ্চে তেমন কোন চেয়ার ছিলনা। সভাপতি ও অন্যান্যরা দাঁড়িয়ে ছিলেন। কবুতর ও বেলুন উড়িয়ে অনুস্ঠানের উদ্বোধন করা হলো। এর পরে শুরু হলো শুভেচ্ছা বক্তব্য। আমার ধারণা ছিল ব্যাচ ওয়ারী বক্তব্য রাখার জন্যে আহবান করা হবে। না , অনুস্ঠান সে ভাবে সাজানো হয়নি।নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বক্তব্য দিতে শুরু করলেন। আর কয়েক জন বিত্তবান ও পদবী ওয়ালা মানুষ বক্তব্য রাখলেন। বেলা সাড়ে বারটার দিকে বলা হলো জুমার নামাজ ও মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতি দেয়া হচ্ছে। আড়াইটার দিকে আবার অনুস্ঠান শুরু হবে। দ্বিতীয় পর্বে  প্রথমেই শুরু হবে শুভেচ্ছা বক্তব্য।আগেই বলেছি, খাবারের কুপন না থাকায় আমি খাবার সংগ্রহ করতে পারিনি।

দ্বিতীয় পর্বেও এটিএনের চেয়ারম্যান মাহফুজ সাহেব এবং ধনবান ব্যক্তিরা ভাষণ দিয়েছেন বলে শুনেছি। কিছুটা টিভিতেও দেখেছি। বিকেলের অধীবেশনে থাকতে পারলে আমি খুবই খুশী হতাম। কিন্তু শারীরিক কারণে তা হয়ে উঠেনি। উত্‍সব উপলক্ষে যে ম্যাগাজিনটি ছাপা হয়েছে তাতে আরও অনেক বেশী তথ্য উপাত্ত আশা করেছিলাম। স্কুলের ইতিহাস নেই বললেই চলে। বলা হচ্ছে ১৮৮৬ সালে স্কুল প্রতিস্ঠিত হয়েছে। কে বা কারা স্কুল প্রতিস্ঠা করেছেন তার কোন ইতিহাস ম্যাগাজিনে নেই। কবি নবীন সেন ফেণী মহকুমার প্রথম এসডিও বা মহকুমা হাকিম ছিলেন। কিন্তু স্কুলের প্রতিস্ঠাতা ছিলেন একথা সত্য নয়। শুনে শুনে কোন তথ্য প্রকাশ করা আমাদের বদ অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। জাতির ইতিহাসও একই কারণে বিকৃতির পথে ধেয়ে চলেছে। রাজর্নতিক কারণে ইতিহাস, তথ্য, উপাত্ত, ব্যাখ্যা তৈরী হচ্ছে। সাবেক সিএসপি ও রামপুর সওদাগর বাড়ির সুযোগ্য সন্তান মফিজুর রহমান সাহেবের একটি সাক্ষাতকার ছাপা হলে অনেক তথ্য পাওয়া যেতো। তিনি এখন ভীষণ অসুস্থ। আর ক’দিন পর ওই তথ্যও পাওয়া যাবেনা।৫১ ব্যাচের ছাত্র বিচারপতি কাজী এবাদুল হক সাহেবেরও একটি সাক্ষাতকার ছাপা হতে পারতো। ৫৩ ব্যাচের কাজী মাইনুদ্দিন সাহেব অনুস্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। মনে হয় তিনিই সবচেয়ে প্রবীন ছাত্র উপস্থিত ছিলেন। নামজাদা একজন প্রবীন শিক্ষাবিদ উদ্বোধনী অনুস্ঠানের প্রধান অতিথি হতে পারতেন। যাদের কাছ থেকে অর্থ সাহায্য পাওয়া গেছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিস্ঠাকালে যারা জড়িত ছিলেন তাদের বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। ফেণীর পৌর মেয়র নিজাম হাজারী সাহেব বলেছেন, তাঁর পূর্ব পুরুষ স্কুল ও কলেজের জন্যে ৭৮০ শতাংশ জমি দান করেছেন। তাঁর উচিত ছিল তথ্যটি দলিল সহ ম্যাগাজিনে প্রকাশ করা। এটি একটি মুল্যবান তথ্য। এ তথ্য হারিয়ে যাও ঠিক হবেনা। আমি কলেজের অধ্যক্ষ সা্হেবকে অনুরোধ করেছি  কলেজের ইতিহাস সংক্রান্ত একটি নিবন্ধ তৈরী করার জন্যে। একই ভাবে স্কুলের হেড মাস্টার বা হেড মিস্ট্রেস স্কুলের একটি ইতিহাস তৈরীর কাজ শুরু করতে পারেন।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »


দূর্নীতি কি তা নিয়ে সাধারন মানুষের ভিতর একটা ধারনা আছে। নীতিহীন মানুষকেও সাধারন মানুষ দূর্নীতিবাজ মনে করে। আমাদের চলমান আইন নৈতিক দূর্নীতি সম্পর্কে নীরব। সমাজে যে লোকটির ব্যবহার খারাপ, মন্দ কাজ করে,  শক্তি প্রয়োগ করে লক্ষ্য হাসিল করে  সাধারন মানুষ মনে মনে তাকেও ঘৃণা করে। দূর্বল বলে সোচ্চার হয়ে প্রতিবাদ করতে চায়না। এক সময় সমাজে মন্দ লোকের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। এখন মন্দ লোকেরাই সমাজ চালায়, দেশ চালায় ও আইন চালায়। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নীতিবান শিক্ষকের অবস্থা খুবই করুণ। প্রতিবাদী শিক্ষকের জীবন যায়। বখাটে ছেলে ও ইভটিজারদের প্রতিহত করতে গিয়ে ইতোমধ্যে অনেক মা বাপ ও সমাজের মুরুব্বী প্রাণ হারিয়েছে। সমাজ থেকে যখন প্রতিবাদ উঠে যায় তখন ন্যায় অন্যায়ের ফারাক আর থাকেনা। কারণ ন্যায়ের পক্ষে লোক পাওয়া যায়না, অন্যায়ের প্রতিবাদ আর কেউ করেনা। দলবদ্ধ ভাবে প্রতিবাদী সমাজে সহজে অন্যায় অবিচার বাসা বাঁধতে পারেনা। একই ভাবে রাস্ট্র বা সরকার জুলুমবাজ হয়ে উঠতে পারেনা। অন্যায় জুলুম অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলা, প্রতিবাদ করা, প্রয়োজনে লড়াই করা মানুষের অবশ্য কর্তব্য। নৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে এতা ফরজ।

সকল প্রকার জুলুমের বিরুদ্ধে  প্রতিবাদ করতে ইসলাম মানুষকে আহবান জানিয়েছে, উত্‍সাহিত করেছে। আল্লাহপাক ন্যায়ের প্রতীক, তিনি তাঁর খলিফা মানুষকে ন্যায় প্রতিস্ঠা করতে তাগিদ দিয়েছেন। অন্যায় অবিচার জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা কোন অপশানাল বিষয় নয়। মানুষের প্রধানতম কর্তব্য হচ্ছে সমাজ থেকে অন্যায় অবিচার ও জুলুমকে চিরতরে বিদায় করে দেয়া। সে জন্যেই মানুষকে অবশ্যই ন্যায় অন্যায়ের ফারাক বুঝতে হবে। মানুষকে শয়তানের পথ পরিহার করতে হবে। প্রশ্ন উঠতে পারে দূর্ণীতি কি আর জুলুম কি? আমাদের রাস্ট্র ও সমাজের কাছে বিষয়টা পরিস্কার নয়। যে জুলুম করে সেই জালেম। আর যে জুলুম বা নির্যাতনের শিকার হয় সে মজলুম। মজলুমের আর্তনাদে আল্লা্র আরশ কম্পিত হয়। যতক্ষন পর্যন্ত আল্লাহপাকের গজব না পড়ে ততক্ষণ জালেম তার অপরাধের কথা বুঝতে পারেনা। যেমন ফেরাউন  নমরুদ ও সাদ্দাদ বুঝতে পারেনি। হাল জামানার বহু জালেম জগত থেকে বিদায় নিয়েছে, ইতিহাসে ধিকৃত হয়ে আছে। জীবিত ব্যক্তি জালেম ও  রাস্ট্র জালেম গুলো সম্পর্কে আমরা সকলেই জানি।

আমাদের দূর্ণীতি দমন কমিশন( দুদক) ইতোমধ্যেই ব্যাপক আলোচনায় এসে গেছে। ১/১১র সরকার দূর্ণীতি দমনের কথা বলে দেশ সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। নামী দামী মানুষকে ধরে নিয়ে কোটি কোটি টাকা আদায় করেছে।কেয়ার টেকার আমলে জেনারেল হাসান মাহমুদ দুদকের চেয়ারম্যান হিসাবে আলোড়ন সৃস্টি করেছিলেন। তিনি হেলিকপ্টারে চড়ে দুর্ণীতি দমনের জন্যে জেলায় জেলায় ঘুরে বেড়াতেন। তখন থেকেই দুদক আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে। এখন দুদকের তেমন কোন সুনাম বা পজিটিভ ইমেজ নেই। কেয়ার টেকার সরকারের নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্বাচিত আওয়ামী সরকারের আমলে দুদক সরকারী নির্দেশে মামলা করে , আর মামলা তুলে নেয়। এ বিষয়ে আমি এর আগেও অনেকবার লিখেছি। বাংলাদেশে এখন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক , চুরি ডাকাতি, খুন খারাবী, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ইত্যাদি নানা ধরনের দুর্ণীতি রয়েছে। নৈতিক বা মরাল দুর্ণীতির কথা বাদই দিলাম। এক সময় রাজনীতিকরা রাজনৈতিক কারণে জেলে যেতেন, এখন দূর্ণীতির কারণেও জেলে যান। শুধু আমাদের দেশে নয় , সারা পৃথিবীতে এসব ঘটছে।

বাংলাদেশ এখন একটি ব্যাপক দুর্ণীতির দেশ। সমাজ বা রাস্ট্রের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে দুর্ণীতি নেই। এমন কি শ্রমজীবী মানুষও দুর্ণীতি করে। সুযোগ পেলেই কাজে ফাঁকি দেয়। কারখানার শ্রমিকরা মনে তারা  যদি জোট বদ্ধ থাকে তাহলে মালিকের কাছ থেকে জবরদস্তি দাবী আদায় করা যাবে। ছাত্ররাও মনে করে, যে ভাবেই হোক একটা সার্টিফিকেট জোগাড় করতে পারলেই হলো। তারপর দলীয় আনুগত্যের কারণে বিসিএস পাশ করে সরকারী চাকুরী করা যাবে। সহকারী সচিব হতে পারলেইতো সচীবের বা মন্ত্রীর ছেলে বা মেয়েকে বিয়ে করা যাবে। নকল করে পাশ করে দলীয় কারণে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া যাবে। তারপরেতো ভাইস চ্যান্সেলর হওয়া আর ঠেকায় কে? এসব দুর্ণীতি কিন্তু দুদক বা পুলিশী আইনের আওতায় পড়েনা। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন সাহেব একবার বলেছিলেন, ছেলেরা লেখাপড়া করবে কেন? তারা জানে দলের সাথে বা নেতার সাথে থাকলে একদিন নিশ্চিত মন্ত্রী বা এমপি হওয়া যাবে। বিশ্বব্যাপী দুর্ণীতিবাজ দেশ গুলোর ভিতর বাংলাদেশের অবস্থান খুবই করূন ও লজ্জাজনক।  সম্প্রতি টিআইবি ( ট্রান্সপারেন্সী ইন্টার ন্যাশনাল ) বাংলাদেশের দূর্ণীতি সম্পর্ক একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। টিআইবি একটি আন্তর্জতিক সংস্থা। এই সংস্থা বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশের দুর্ণীতির সূচক প্রকাশ করা হয়। তবে তারা পশ্চিমা দেশে তেমন শক্তিশালী ভাবে কাজ করে বলে মনে হয়না। কয়েকদিন আগে আমি টিআইবি অফিসে ফোন করেছিলাম তাদের সম্প্রতি প্রকাশিত রিপোর্ট নিয়ে কথা বলার জন্যে। টিআইবির একজন কর্তা ব্যক্তি জানালেন তারা মূলত দুর্ণীতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার  কাজে নিয়োজিত। আমি জানতে চেয়েছিলাম টিআইবি কখনও তার কাজের মূল্যায়ন করে কিনা। ভদ্রলোক কোন উত্তর দিলেন না। প্রায় এক যুগের মতো টিআইবি বাংলাদেশে কাজ করছে, কিন্তু দুর্ণীতি এক বিন্দুও কমেনি, বরং দিন দিন বেড়ে চলেছে। অথচ দূর্ণীতি কমানোর নামে টিআইবি প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করছে। সুশীল সমাজের লোকজনকে টাকা পয়সা দিয়ে নিজেদের পক্ষে রাখার চেস্টা করছে। শুরুতেই বলেছি সমাজের মুরুব্বী ও নেতাদের নৈতিকতা ও মুল্যবোধ শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে। বাংলাদেশে এখন সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, ধর্মীয় আলেম সমাজ, উকিল ব্যারিস্টার সবাই নৈতিক ও আর্থিক দুর্ণীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। পুলিশ, কাস্টমস, আয়কর বিভাগের কথা নাইবা বললাম। জনপ্রতিনিধিদের প্রতিও জনগনের তেমন কোন আস্থা নেই। কারণ, তারা সবাই কোটি কোটি টাকা খরচ করে নির্বাচিত হন। তাদের প্রধান লক্ষ্য সমাজে প্রভাব বিস্তার করে  অবৈধ ও অনৈতিক পথে সম্পদ অর্জন করা। একবার কেউ নির্বাচিত হলে তিনি ধনী হয়ে যান। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা প্রায় নিজ নিজ এলাকায় প্রভাব প্রতিপত্তি বজায় রাখার জন্যে  অস্ত্রধারী মাস্তানদের লালন পালন করেন। সমাজের নিরীহ মানুষদের শোষণ করার জন্যে নেতা  মাস্তানদের পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করেন। সমাজের এসব অপরাধ দুদকের  আওতায় পড়েনা। তাই দুদক এ নিয়ে ভাবেনা।

আমাদের সমাজে ইভ টিজার বা নারী উত্বক্তকারীর সংখ্যা দিন দিন  বেড়ে চলেছে নৈতিক অবনতির কারণে। যারা প্রতিবাদ করছেন ইভ টিজাররা তাদের হত্যা করছে বা নির্যাতন করছে। আবার ইভরা মানে তরুণীরাও টি শার্ট বা গেঞ্জী, জিন্সের প্যান্ট পরে বুক চেতিয়ে হাটছে। তাদের শরমের বালাই নেই। মেয়েদের পোষাক আশাক , চলাফেরা ও ভাষা সম্পর্কে মা বাপ সজাগ নন বলেই মনে হয়। মেয়েদের এ ধরণের হাব ভাব প্রত্যক্ষ ভাবেই  ছেলেদের উসকানী দেয়। আমরা বখাটে ছেলেদের কথা বলছি, কিন্তু বখাটে মেয়েদের কথা বলিনা। অনেক সময় পুলিশও  বখাটে ছেলে মেয়েদের আশ্রয় দেয় পারিবারিক প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে।কোন কোন ক্ষেত্রে নেতারাও ইভ ইজারদের নিরাপত্তা দিয়ে থাকেন। দলীয় নেতা  এমপি বা মন্ত্রীরা যদি কখনও অপরাধ করেন তখন সরকার তাদের রক্ষা করেন। বলা হয় সরকারের ইমেজ বা ভাবমুর্তি রক্ষার জন্যেই তাদের অপরাধের বিচার করা হয়না। দুর্ণীতির সূচক উপরে উঠছে না  নামছে তা টিআইবি বা দুদকের ব্যাপার। টাকার জন্যে সন্তান মা বাপকে হত্যা করছে। স্বামী যৌতুকের জন্যে স্ত্রীকে আগুন লাগিয়ে মারছে। বিয়ের প্রস্তাবে  রাজী না হলে মেয়েদের প্রতি এসিড নিক্ষেপ করা হচ্ছে। কিছুদিন আগে এক সাংবাদিকের পুত্রবধু ও নাতিরা নিজেদের ঘরেই বেদনার কথা জানিয়ে আত্মহত্যা করেছে। এসব অপরাধের বিচার কে করবে? জানি, এসব মামলা পুলিশ দেখছে। নব্বই ভাগ ক্ষেত্রেই এ ধরণের মামলার বিচার হয়না। শোনা যায়, উপর থেকে নিচের সব আদালতেই টাকা দিয়ে বিচার কেনা  যায়। সত্য লিখলে বা বললে নাকি আদালত অবমাননা হয়। তাই সত্য কথা বলাও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা) বলেছেন, একটি সমাজ নস্ট হয়ে গেছে কিনা তা জানা বা বুঝার জন্যে একটি মাত্র উপায়। তাহলো, যে সমাজে ধনীরা কৃপণ হয় আর দরিদ্ররা ধৈর্যহারা হয়, জ্ঞানীরা পালিয়ে থাকে আর মুর্খরা মঞ্চে বসে থাকে, রাজা বা শাসক মিথ্যা কথা বলে। এবার আপনারাই বলুন বাংলাদেশের অবস্থা কি? আমিতো দেখছি আর্থিক ও পুলিশী দূর্ণীতির চেয়ে নৈতিক দূর্ণীতি হাজার গুণ বেড়ে গেছে। যে সমাজে নৈতিকতা নেই সেই সমাজে অন্যসব দূর্ণীতি বাড়তেই থাকে। সমাজে অশান্তি বাড়তেই থাকে। সংসারে অশান্তি বাড়তে থাকে। দূর্ণীতিবাজ সমাজে সবকিছুই স্থিতি হারিয়ে ফেলে। প্রতিটি গৃহই এখন দূর্ণীতির প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ছেলে কি করে কাড়ি কাড়ি টাকা আয় করে তার খোঁজ মা বাপ রাখেনা। মেয়ে কিভাবে হাজার টাকা খরচ করছে, দামী পোষাক পরছে, দামী মোবাইল ব্যবহার করছে সেদিকেও মা বাপের নজর নেই। খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে মেয়েরা ৮০ ভাগ তালাকনামা জমা দিচ্ছে। কথায় কথায় তালাক দিচ্ছে। কথায় কথায় সংসার ভেংগে দিচ্ছে। মধ্য ও উচ্চবিত্তের মেয়েরা বিয়ের সময় বড় অংকের মোহর লিখিয়ে নেয়, লাখ লাখ টাকার অলংকার নেয়। একটি তালাকনামার মাধ্যমেই একটি মেয়ে কয়েক মিলিয়ন টাকার মালিক হয়ে যায়। সাম্প্রতিক ঘটিত রুমানার ঘটনা কিন্তু কোন গরীব পরিবারের ঘটনা নয়। এই ঘটনা সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতীক। নামীদামী পরিবারের মেয়েরা এখন আর বিয়ে নামক প্রতিস্ঠানটি রাখতে চাইছেনা। বেশ কিছু সমাজ বিজ্ঞানী বলছেন, আগামীদিনে পরিবার আর থাকবেনা। ড. কামালের প্রতিস্ঠান ব্লাস্টে গিয়েছিলাম কিছুদিন আগে তালাক বিষয়ে জানার জন্যে। একজন মহিলা পরিচালক জানালেন, তাঁরা গরীব মেয়েদের পারিবারিক ও তালাক সমস্যা নিয়ে কাজ করেন। তাঁদের মূল কাজ হলো  গরীব মেয়েদের অধিকার প্রতিস্ঠা করা। ব্লাস্টের পরিচালক মহিলা  আরও জানালেন, মেয়েরা এখন তাদের অধিকার বেশী পরিমানে প্রয়োগ করছে। এটা একটা ক্রান্তিকাল। এ সময়ে কিছু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বড় কিছু আদায় করতে হলে বা বড় কিছু অর্জন করতে হলে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। একজন আইনজীবী বললেন, নারী অধিকার আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে। নারী নির্যাতনের ৮০ ভাগ মামলা ভুয়া। নারীদের অধিকার প্রতিস্ঠার জন্যে সমাজ ও সরকার অতি প্রতিক্রিয়া থেকে অনেক আইন তৈরী করেছে যার কুফল এখন হাতেনাতে পাওয়া যাচ্ছে। শুনেছি এক ব্যান্কারের ডাক্তার কন্যা এ পর্যন্ত তিনবার বিয়ে করেছেন। কোন বিয়েই কয়েক মাসের বেশী টিকেনি। কন্যাটি নানা ছুতানাতায় বিয়ে ভেংগে দেয় বা তালাক দেয়। এর মাধ্যমে সে প্রচুর সোনাদানা ও নগদ অর্থের মালিক হয়।এভাবে সম্পদ অর্জনে মেয়েটির মা তাকে উত্‍সাহিত করে। এটি নারী অধিকারের অপব্যবহারের একটি নৈতিক ও ফৌজদারী ঘটনা। সমাজের এসব  অবক্ষয় ও মূল্যবোধহীনতার কোন ঘটনাই দুদকের আওতায় পড়েনা। তবে দুদকের উচিত হবে শুধুমাত্র আর্থিক দূর্ণীতি নিয়ে কাজ করা। এর নাম  বদলে দিয়ে ফিনান্সিয়াল ক্রাইম কমিশন (এফসিসি ) করা উচিত হবে। বিভিন্ন দেশে আর্থিক অপরাধের তদন্ত করে এফসিসি ধরনের সংগঠণ।

টিআইবি’র বিষয়ে আমাদের সাধারন মানুষ এখনও ভাল করে কিছু জানেনা। ইদানিং রাজধানীতে দেখতে পাচ্ছি টিআইবি পবিত্র কালামে পাকের আয়াত উল্লেখ করে বিলবোর্ডের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। প্রথমে আমি একটু অবাকই হয়েছি। যারা টিআইবি পরিচালনা করেন তাঁরা নিজেরা ব্যক্তিগত জীবনে নিজেদের স্যেকুলার বা ধর্ম নিরপেক্ষ বলে প্রচার করেন। জনগণের ধর্মীয় চেতনা ও মূল্যবোধকে এক্সপ্লয়েট বা  ঠকিয়ে টিআইবি কাজ হাসিলের চেস্টা করছে। এটা এক ধরণের নৈতিক অপরাধ। এটাকে বলা হয় ডবল স্ট্যান্ডার্ড। মানে যা নিজে  বিশ্বাস করিনা তা বলে সাধারন মানুষের মূল্যবোধকে পরিহাস করা। টিআইবি একটি পশ্চিমী প্রতিস্ঠান যা প্রয়োজনে  নিজেদের স্বার্থে বিভি্ন্ন দেশ ও সেই দেশের নেতাদের বিরুদ্ধে  দূর্ণীতির অভিযোগ এনে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়। এসব ক্ষেত্রে তারা দেশের সুশীল সমাজকে ব্যবহার করে থাকে। টিআইবির সাথে দেশের বড় বড় এনজিও গুলোর নানা ধরণের গোপন সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের দেশে হাজার হাজার এনজিও রয়েছে বিদেশ থেকে টাকা এনে দারিদ্র বিমোচনের নামে বিগত কয়েক যুগ ধরে কাজ করছে। কিন্তু দারিদ্র কমেনি। কোন কোন ক্ষেত্রে দারিদ্র বেড়ে গেছে। কিন্তু এনজিও নেতাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে। জনগণকে ঠকিয়ে অনেকে আবার স্যার টাইটেল পেয়েছে। এনজিও গুলো এখন হরেক রকম ব্যবসা শুরু করেছে। তাদের নিজস্ব ব্যান্ক , ব্যবসা ও বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এসব এনজিও নেতাদের প্রভু হচ্ছে বিদেশীরা, যেসব বিদেশী প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে। এসব এনজিও নানা উছিলায় নিয়মিত কর ফাঁকি দেয়। এনবিআর এদের কিছুই করতে পারেনা। সরকারের উপর এদের প্রচন্ড প্রভাব থাকে। রাজনৈতিক নেতারা বড় বড় এনজিওর বেনিফিসিয়ারী। নেতাদের অনেকের ছেলেমেয়েরা  এনজিও গুলোতে বড় বড় চাকুরী করে। এরাই সুশীল সমাজ নামে এক ধরনের পরগাছা তৈরী করেছে। টিআইবি নিজেই এক ধরণের এনজিও এবং বড় এনজিওদের সাথী দোসর ও বন্ধু। এদের কথা টিআইবি কখনও বলেনা। হয়ত এনজিওদের দূর্ণীতি টিআবির আওতায় পড়েনা।

আমাদের কর এমন ভাবে তৈরী করা হয়েছে যাতে কর  কর্মচারীরা করদাতাদের  আর্থিক অপরাধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করে। আমার ধারণা, অনেক মানুষই কর দিতে চায়। কিন্তু কর ব্যবস্থার কারণে সরাসরি কেউ কর দিতে পারেনা। জেলা  শহর গুলোতে কর কর্মকর্তারা করদাতাদের আতংকে পরিণত হয়েছে। ফলে শুরু হয় নানা ধরণের লুকোচুরি। সবচেয়ে বেশী হয়রানীর শিকার হয় ব্যক্তি করদাতা। কর ব্যবস্থাটা সহজ সরল নয় বলে করদাতাকে উকিল বা কোন কর কর্মচারীর সহযোগিতা নিতে হয় অর্থের বিনিময়ে। সে অর্থের পরিমাণ করের চেয়ে বেশী। উকিল বা কর কর্মচারীর কথা হলো আমাকে বেশী করে দেন, সরকারকে কম দেন। সারাদেশে দুদকের লোক বা কর্মচারী রয়েছে। এরাও দূর্ণীতির অন্যতম আখড়া। এরা এক ধরণের দালালের দ্বারা ভয় ভীতি দেখিয়ে সাধারন মানুষের কাছে থেকে টাকা আদায় করে।

আর্থিক বা পুলিশী দূর্ণীতি সমাজে সব সময় ছিল। সুদুর অতীতে সমাজে এমন ব্যাপক দূর্ণীতি ছিলনা। তখন হাজারে একজন দূর্ণীতি করতো।তাকে সমাজ ঘৃণা করতো। এক ধরণের বয়কট চলতো তার সাথে। এখন একশ’তে ৯০ জন দূর্ণীতির সাথে জড়িত। মানুষের মন মানসিকতা এমন হয়েছে যে,  সুযোগ পেলেই দূর্ণীতির আশ্রয় গ্রহণ করে। এর একমাত্র কারণ, নৈতিক অবনতি। মানুষ অপরাধকে আর অপরাধ মনে করেনা। সমাজের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দূর্ণীতির কারণেই সর্ব নিম্নে দূর্ণীতি নেমে এসেছে। এখন আমাদের একদল নৈতিক সৈনিকের প্রয়োজন। যারা অনৈতিকতা ও অধর্মের বিরুদ্ধ নৈতিকতা ও ধর্মের যুদ্ধ করবে। যারা গভীর ভাবে ধর্মে বিশ্বাস করেন, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন যে হারাম অর্জন করে হারাম খাদ্যের শরীর দ্বারা কোন এবাদতই গৃহিত হবেনা।( ১৬ই নবেম্বর, ২০১১। নয়া দিগন্ত )

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »

Older Posts »