Feeds:
Posts
Comments

Archive for October, 2011


‘সৈনিক জনতা ভাই ভাই’ শ্লোগানটি এখন আমরা শুনতে পাইনা। শ্লোগানটি আমরা প্রথম শুনেছি ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর। দিনটি বহু বচর সরকারী ছুটি ছিল। এখন আর সরকারী ছুটি নেই। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ওই শ্লোগানে বিশ্বাস করেনা। তাই জাতীয় দিবস পালন এবং সরকারী ছুটি বাতিল করে দিয়েছে। সেদিনটি যারা দেখেননি তারা বুঝতে বা অনুভব করতে পারবেন না সেদিন রাজধানী ঢাকার মানুষের ভিতর কি আনন্দ, কি উল্লাস, কি আবেগ  ছিল। সত্যিই সেদিনের সেই আবেগ না দেখলে কেউ আজ তা আর বর্ণনা করতে পারবেনা। এতো আবেগের কথা। কিন্তু রাজনীতির বিষয়টা আলাদা। রাজনীতি কি ছিল তা ব্যাখ্যা করতে হলে একটু পেছনের দিকে যেতে হবে। ৭৫ সালের ১৬ই জুন সরকার চারটি কাগজ ছাড়া বাকী সব কাগজ বন্ধ করে দেয়। এর আগে বংগবন্ধুর সরকার  সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় রাজনীতি চালু করেন। ওই সময়ে আমি দৈনিক জনপদে কাজ করি। গাফফার ভাই ছিলেন জনপদের সম্পাদক। দৈনিকটির মালিক ছিলেন মরহুম কামারুজ্জামান হেনা সাহেব। তিনি তখন শিল্পমন্ত্রী ছিলেন। গাফফার ভাই তাঁর অসুস্থতার কারণে তখন লন্ডনে ছিলেন।

সাতই নভেম্বর ঢাকার রাস্তায় সেনাবাহিনীর ট্যান্ক নেমেছিল বিজয় মিছিল করার জন্য। ওই ট্যান্কের উপর ছিল আবেগাপ্লুত সৈনিক ও সাধারন মানুষ। সেই মূহুর্তে আমি ছিলাম জাতীয় প্রেসক্লাবে। তোপখানা রোড দিয়ে ট্যান্কের মিছিল গিয়েছিল বংগভবনের দিকে।ট্যান্কের উপর সৈনিক জনতা শ্লোগান দিচ্ছিল “সৈনিক জনতা ভাই ভাই”। আমরা অনেকেই এখনও মনে করি সৈনিক জনতা সত্যিই ভাই ভাই। একটি স্বাধীন জাতির সেণিকদের সাথে জনগণের আপন ভাই বেরাদরের মতো। আমাদের সৈনিকরা আমাদের গৌরব। তারা কোন ভাঁড়াটে সৈনিক নয়। তারা আমাদেরই সন্তান। প্রত্যেক নাগরিকের মতো তারাও দেশকে ভালবাসি। চলমান আওয়ামী সরকার রাজনৈতিক কারণে সাতই নভেম্বর পালন বন্ধ করে দিয়েছে। এই দিনের ছুটিও বাতিল করে দিয়েছে। আমাদের চিত্র সাংবাদিক ভাইয়েরা অনেকেই ট্যান্ক মিছিলের ছবি তুলেছেন। বংগভবনে তখন রাস্ট্রপতি হিসাবে ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা খোন্দকার মোশতাক। তিনি ছিলেন মুজিব নগর সরকারের বিদেশ মন্ত্রী।বংগবন্ধুর একজন ঘনিস্ট বন্ধু ছিলেন। আশা করেছিলেন দেশ স্বাধীন হলে তিনি বিদেশ মন্ত্রীই হবেন। না, খোন্দকার সাহেবের সেই আশা পূরণ হয়নি। বংবন্ধু বিদেশ মন্ত্রী করেছিলেন তরুণ ব্যারিস্টার ড. কামাল হোসেন। কেন করেছিলেন তা একমাত্র বংগবন্ধুই জানতেন। অনেকেই মনে করেন পাকিস্তানের হারুণ পরিবারের অনুরোধেই তাঁকে বিদেশ মন্ত্রী করা হয়েছিল। পারিবারিক ভাবেই কামাল হোসেনের সাথে পাকিস্তানের অভিজাত বা এলিট শ্রেণীর সাথে সু সম্পর্ক ছিল এবং এখনও আছে।

৭৫ এর পনরই আগস্টের বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক ঘটনার পর খোন্দকার মোশতাক সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি যে মন্ত্রীসভা গঠণ করেছিলেন তার সকল সদস্যই ছিলেন আওয়ামী লীগের। রাস্ট্রপতি একদলীয় শাসন ব্যবস্থা অনুযায়ী খোন্দকার মোশতাক সরকার এবং দেশের প্রধান নির্বাহী ছিলেন। তিনি সংসদ বাতিল করেননি। আশা করেছিলেন আওয়ামী লীগের সংসদীয় দল তাঁকে সমর্থন করবেন। না , তিনি সেই সমর্থন পাননি।  খোন্দকার মোশতাক ডেপুটি সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনা প্রধান নিযুক্ত করেছিলেন। সেনা প্রধান জেনারেল সফিউল্লাহকে অবসর প্রদান করা হয়েছিল। এই সময়ে বংগবন্ধুর দুই কন্যা হাসিনা ও রেহানা বিদেশে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁরা ভারতে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। ভারত সরকার তাঁদেরকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছিলেন। ভারত  রাশিয়া ও সমাজতান্ত্রিক ব্লকের কু পরামর্শে বংবন্ধু তাঁ সারা জীবনের স্বপ্ন একটি গণতান্ত্রিক রাস্ট্র ব্যবস্থার আদর্শ ত্যাগ করে এক দলীয় রাস্ট্র ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। তিনি সরকারী কর্মচারীদেরও বাধ্য করেছিলেন  তাঁর এক দলীয় ব্যবস্থার রাজনৈতিক দল বাকশালে যোগ দিতে। বংবন্ধুর হঠাত্‍ এই পরিবর্তনকে দেশবাসী সমর্থন করেনি। কিন্তু মতামত প্রকাশের কোন উপায় জনগণের হাতে ছিলনা। এমনি সময়েই ১৫ ই আগস্ট ভোর বেলার দু:খজনক ঘটনা ঘটে। ফলে বংগবন্ধু প্রবর্তিত এক দলীয় ব্যবস্থার রাজনীতি  রাতারাতি বন্ধ হয়ে যায়। খোন্দকার মোশতাক সংবাদপত্র বন্ধের নির্দেশটি বাতিল করে দেন। ফলে বহু মতের প্রকাশ ব্যবস্থায়  অন্যন্য কাগজ প্রকাশিত হতে থাকে।

১৫ই আগস্টের পরবর্তী ব্যবস্থাকে পাল্টে দিয়ে এক দলীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাবার জন্যে ৩রা নভেম্বর সেনা বাহিনীতে  জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ক্যু বা অভ্যুত্থান  সংঘটিত হয়। এই সময়ে জেনারেল জিয়াকে সেনা প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় এবং তাকে বন্দী করে রাখা হয়। তখন সেনা বাহিনী এবং বংগভবনে কি হচ্ছে কেউ জানতে পারছেনা। ৪ঠা নভেম্বর  রাশেদ মোশাররফের নেতৃত্বে রাজনৈতিক মিছিল বের হলে দেশবাসী জানতে পারলো আওয়ামী শক্তি আবার ক্ষমতায় আসতে শুরু করেছে। খালেদ মোশাররফকে প্রতিহত করার জন্যে সেনা বাহিনীর জওয়ানরা সবাই জেগে উঠে এবং ৬ই নভেম্বর জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে। ইতোমধ্যে জওয়ানরা খালেদ মোশাররফ সহ তার সহযোগীদের হত্যা করে। ৭ই নভেম্বর সৈনিক জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাস্তায় মিছিল করে। ‘সৈনিক জনতা ভাই ভাই’ শ্লোগানে ঢাকার আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠে। এর আগেই খোন্দকার মোশতাককে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে জেনারেল খালেদের বা্হিনী। কোন্দকার সাহেব বিচারপতি সায়েমের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজী হন এবং বিচারপতি সায়েমের কাছে ক্ষমতা  হস্তান্তর করে বংগভবন ত্যাগ করেন।

৭ই নভেম্বর দেশবাসী রেডিও ও টেলিভিশন মারফত আবার জিয়া সাহেবের ভাষন শুনতে পায়। সেনা বাহিনীর জওয়ানদের ব্যারাকে ফিরে গিয়ে দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনতে আহবান জানান। জিয়া সাহেবের উদাত্ত আহবানে জওয়ানরা ব্যারাকে ফিরে যায়। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে জিয়া সাহেবের গলার আওয়াজ শুনে দেশবাসী স্বস্তির নিশ্বাস কেলেন। একই ভাবে দেশবাসী জিয়া সাহেবের আহবান বাণী শুনতে পেয়েছিল ৭১ সালের ২৬ ও ২৭শে মার্চ। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বংবন্ধুর পক্ষ থেকে মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ওই ডাক  শুনেই দেশবাসী উজ্জীবীত হয়েছেলেন। বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ জিয়া সাহেবের আহবান শুনতে পেয়েছিলেন। জাতির দূর্ভাগ্য, আওয়ামী লীগ এবং তার অন্ধ চাটুকাররা ইচ্ছে করেই প্রচার করেন যে, বংগবন্ধুই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। একই ভাবে আওয়ামী লীগ ৭ই নভেম্বরের পরিবর্তনকে রাজনৈতিক কারণে মেনে নিতে পারেনি। আওয়ামী লীগ মনে করে ৭ই নভেম্বরের পরিবর্তন ছিল দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী শক্তির বিজয়। তাই আওয়ামী লীগ ৭ই নভেম্বরও মানেনা, আবার ২৬/২৭ মার্চের জিয়া সাহেবের স্বাধীনতার ঘোষণাও মানেনা বা অস্বীকার করে। যদিও আওয়ামী লীগের কাছে বংগবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার কোন প্রকার অডিও বা ভিডিও রেকর্ড নেই। সম্প্রতি কিছু  আওয়ামী বুদ্ধিজীবী বলতে শুরু করেছেন যে, ৭ই মার্চই হচ্ছে স্বাধীনতার ঘোষণা। সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন কাগজে প্রকাশিত হয়েছে যে, বংগবন্ধু পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন চেয়েছিলেন। তিনি শেষ অবধি পাকিস্তানের সাথে একটা সমঝোতা চেয়েছিলেন। সিরাজুর রহমানের লেখা প্রমান করে যে, বংগবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে লন্ডনে এসেও জানতেন না বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। ১০ ই জানুয়ারী লন্ডন  দিল্লী হয়ে ঢাকার জনসভায় ভুট্টোকে উদ্দেশ্য করে যা বলেছিলেন, তাতেও মনে হয় তিনি ভুট্টোকে কোন ধরণের একটা ওয়াদা করে এসেছিলেন। কিন্তু দেশে ফিরে তিনি দেখলেন, তিনি এখন একটি স্বাধী সার্বভৌম দেশের রাস্ট্রপতি তখন তিনি ওয়াদা থেকে পিছে সরে এসেছেন। ড. কামাল এ বিষয়ে সবার চেয়ে বেশী জানেন।

আওয়ামী লীগের কাছে ১৬ই ডিসেম্বরের গুরুত্ব বেশী , কারণ ওইদিন ভারত তাদের বিজয় দিবস পালন করে। তাদের বিজয় হলো ওইদিন তারা পাকিস্তানকে পরাজিত করেছে এবং সারেন্ডার দলিলে স্বাক্ষর করতে পাকিস্তানকে বাধ্য করেছে। ওই সারেন্ডার দলিলে বাংলাদেশ সাক্ষী ও নয় পার্টিও নয়। এমন কি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সারেন্ডার অনুস্ঠানে কেউই উপস্থিত ছিলনা। ( নয়া দিগন্ত, ৩রা নভেম্বর, ২০১১ )

Advertisements

Read Full Post »


আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের সন্তানদের তেমন পরিস্কার ধারনা আছে বলে আমার মনে হয়না। তাদের চলমান জীবনযাত্রায় মা বাবা ও দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য হয়ত তেমন কাজে লাগেনা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে যারা ভাল বেতনে চাকুরী পেয়ে যায় তাদের  অনেকের কাছেই  ইতিহাস ঐতিহ্যের তেমন কোন দাম নেই। যারা যে কোন ভাবেই ধনী হয়ে গেছেন তাঁরাতো মনে করেন বিদ্যারই কোন প্রয়োজন নেই। সরকারের কাছেও এসবের কোন দাম নেই। আমরা বাংগালী বলে জিকির তুলে ৭১ সালে ভৌগলিক স্বাধীনতা পেয়েছি। যা পূর্ব পাকিস্তান ছিল তা এখন বাংলাদেশ। পাকিস্তান যে সীমানা বা  ম্যাপ দিয়ে গেছে তাই এখন আমাদের সীমানা বা ভুগোল। যদি কাউকে প্রশ্ন করেন যে, ৪৭ সালে আমরা যদি পাকিস্তানের সাথে না থাকতাম তাহলে কোথায় থাকতাম। সোজা উত্তর ভারতের সাথে থাকতাম একটি প্রদেশ বা রাজ্য হিসাবে। তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশের  প্রশ্ন আর উঠতোনা। অনেকেই বলেন, পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতোনা। এ ব্যাপারে অনেকেই আবার দ্বিমত পোষণ করেন। পশ্চিম বাংলার মানুষ সুযোগ পেয়েও স্বাধীন না হয়ে দিল্লীর অধীনে গেল কেন? তারা আমাদের বাংগালী বানাতে চায় বা বাংগালী হিসাবে দেখতে চায়, কিন্তু নিজেরা দিল্লীর অধীনে আছে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুবই সোজা। পশ্চিম বাংলার মানুষ প্রথমত নিজেদের হিন্দু মনে করে, তারপরে বাংগালী।

একটু পিছনের দিকে গিয়ে যাত্রা শুরু করতে চাই। কট্টর হিন্দুরা মনে করেন মুসলমানেরা ভারতীয় নয়, তারা বিদেশী মুসলমান বা যবন বা ম্লেচ্ছ। এমন কি ভারতের বিজেপি, আরএসএস, হিন্দূ মহাসভা, শিবসেনা নেতারা মনে করেন মুসলমানেরা বিদেশী। হিন্দু মহাসভা নতুন থিউরী দিয়েছে। তাহলো, সকল ভারতীয়ই  হিন্দু। হিন্দুস্তানে বাস করলেই হিন্দু হতে হবে। পরিচয় হবে হিন্দু মুসলিম, হিন্দু শিখ , হিন্দু বৌদ্ধ, হিন্দু খৃস্টান ইত্যাদি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা আশা করেছিল আমরা আর মুসলমান থাকবোনা,  শুধুই বাংগালী হবো। পশ্চিম বংগের বন্ধুদের সে আশা পূরণ হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিস্ঠার পরেও এদেশের মানুষ মুসলমান রয়ে গেছে। যদিও  বাংলাদেশে কিছু আরবী নামধারী মুসলমান নামে পরিচিত কিছু বুদ্ধিজীবী নিজেদেরকে শুধুই বাংগালী বানাতে চান। এরা হীনমন্যতায় ভোগে এবং মানসিকভাবে অসুস্থ। এরা এদের বাপ দাদার কথা ভুলে গেছে। আমাদের তরুণ সমাজ , বিশেষ করে তরুণ কবি শিল্পী সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের শুধুই বাংগালী ভাবতে পছন্দ করেন। এরা বিভ্রান্ত। এরা এখন ভাবাবেগে চলছে। এদের  ভুল পথে পরিচালিত করছে এক শ্রেণীর স্বার্থবাদী বুদ্ধিজীবী। এরা এক ধরণের সংস্কৃতি সওদাগর। কারো কাছ থেকে সুযোগ সুবিধা নিয়ে এরা সমাজেকে ভুলপথে পরিচালিত করার কাজে নেমে পড়েছে।

পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ হিসাবে শত শত বছর ধারে পালিত হয়ে আসছে এইদেশে। এমন কি পাকিস্তান বাংলা নববর্ষ পালনে কোন বাধা ছিলনা। বিশেষ করে গ্রামবাংলায় হালখাতা অনুস্ঠান পালিত হয়ে আসছে। এখনও পালিত হচ্ছে। এই হালখাতা অনুস্ঠানের সাথে অর্থনীতি জড়িত। হিসাবের খাতা জড়িত। স্কুল কলেজ সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিস্ঠান এ সময়ে বন্ধ থাকতো এবং এখনও থাকে। কিন্তু অতি সম্প্রতি ঢাকা চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে নতুন ঢংয়ে পালিত হচ্ছে পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ। লাখ লাখ টাকা  খরচ করে ছাত্ররা পহেলা বৈশাখের মিছিল বের করে। যে মিছিলের সাথে গ্রামবাংলার কোন সম্পর্ক নেই। নানা ধরনের জন্তু জানোয়ারের ছবি বানিয়ে মিছিলে তা দেখানো হয়। যার সাথে বাংলাদেশের মানুষের কোন সম্পর্ক নেই। তবুও এ মিছিল হচ্ছে বিগত কয়েক বছর ধরে। কারা এ মিছিলের জন্যে অর্থ সরবরাহ করছে তা আমাদের  জানা নেই। কেউ এ ব্যাপারে এ পর্যন্ত কোন প্রশ্ন তোলেনি। নতুন বিষয়ে বা  জিনিষে গা ভাসিয়ে দেয়া তরুণদের অভ্যাস। কিন্তু তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব মা বাপের এবং শিক্ষকদের। মোবাইল কোম্পানী ও বহুজাতিক কোম্পানী গুলো এ ধরনের অনুস্ঠানে অর্থ যোগান দেয় তাও আমরা জানিনা। আমাদের মিডিয়াও এ ব্যাপারে নীরব। বাংলার সকল উত্‍সবের সাথেই দেশের অর্থনীতি জড়িত। এটা  শুধুমাত্র হৈ হুল্লোড় করার কোন বিষয় নয়। পহেলা বৈশাখে গ্রামীন  পণ্যের মেলা  দেশের অর্থনীতির জন্যে অনেক কল্যাণকর। আমাদের নতুন প্রজন্ম বা তরুণ সমাজ এ ব্যাপারে সজাগ নয়, অথবা বিভ্রান্ত। হয়তবা কোন অদৃশ্য শক্তি তাদের বিভ্রান্ত করছে।

বাংলাদেশে এখন তিনটি নববর্ষ পালিত হয়। প্রথমন ও প্রধান নববর্ষ হলো  বাংলা সন অনুযায়ী পহেলা বৈশাখ। দ্বিতীয় নববর্ষ হলো ইশায়ী সন অনুযায়ী পহেলা জানুয়ারী। এই পহেলা জানুয়ারী চালু হয়েছে ইংরেজ শাসন আমলে। আমাদের সরকারী নিয়ম কানুন, হিসাব নিকাশ চলে ইংরেজী সন মোতাবেক। শহুরে লোকেরা ইংরেজী সন পালন করে। নতুন ডায়েরী ও ক্যালেন্ডার প্রকাশ ও প্রচার করে। এর জন্যে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে। সরকারী পর্যায়ে হিসাব নিকাশ ও বাজেট ইংরেজী মাস ও বছরের হিসাবেই করা হয়।এছাড়াও  ইংরেজী বছর বা সন বিদায় লগ্নে ৩১শে ডিসেম্বর রাতে বা থার্টি ফার্স্ট নাইটে  তরুণ সমাজ মাতাল হয়ে উঠে। পুলিশকে নানা রকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হয়। ইদানিং মেয়েরাও থার্টি ফার্স্ট নাইটে অংশ নিতে শুরু করেছে। অনেক কেলেংকারির খবরও পত্রিকায় ছাপা হয়।আমাদের দেশের সংস্কৃতি ও উত্‍পাদন ব্যবস্থা অনুযায়ী বাজেট বর্ষের শুরু বৈশাখ থেকে হওয়াই উচিত। কিন্তু এখনও তা হয়নি। সরকারী অফিসের লেখালেখিও ইংরেজীতে করা হয়। অনেকেই আবার অভিযোগ করছেন, আমাদের আমলারা ইংরেজী না জানার ফলে দেশের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। শুক্রবারের ছুটি নিয়ে এখনও এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী শুক্রবারের ছুটি বাতিলের দাবী জানিয়ে আসছেন। তাদের নাকি ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। খৃস্ট ধর্মাবলম্বীরা রোববার ছুটি পালন করে। ইহুদীরা শনিবার ছুটি পালন করে। মুসলমানদের শুক্রবার ছুটি পালনের কথা। বাংলাদেশে ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান। তারা শুক্রবার ছুটির দিন পালন করতে চায়। অপরদিকে মুসলমান হিসাবে অনেকেই আরবী ক্যালেন্ডার অনুসরন করেন। আমাদের খবরের কাগজগুলোতে নিয়মিত তিনটি তারিখ উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে আরবী ক্যালেন্ডারও রয়েছে।সলমানদের ধর্মীয় জীবনে আরবী বা হিজরী  ক্যালেন্ডারের গুরুত্ব রয়েছে। ১৪৩৩ হিজরী সন শুরু হয়েছে ক’দিন হলো। মহররম মাস মুসলমানদের জন্যে খুবই পবিত্র মাস। বলা হয়ে থাকে এই দিন আল্লাহপাক পৃথিবী সৃস্টি করেছেন। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা  ঘটেছে মহররম মাসে। ইসলামের ইতিহাসের আরও বহু ঘটনা ঘটেছে পবিত্র মহররম মাসেই।

সম্প্রতি মানে গত কয়েক বছর ধরে ঢাকায় ‘ভেলেন্টাইন ডে’ বা ভালবাসা দিবস পালন হতে শুরু করেছে। এর আগে এ ধরণের কোন দিবস ঢাকায় বা বাংলাদেশে পালন হতোনা। শ্রদ্ধেয় শেফিক রহমান সাহেব বাংলাদেশে ভালবাসা দিবস পালনের  ব্যাপারে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছেন। শ্রদ্ধেয় শেফিক সাহেব আবার একজন জাতীয়তাবাদী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। ইদানিং তিনি নেড়ীকুত্তার সাক্ষাত্‍কার লিখে বেশ নাম করেছেন। টিভি চ্যালেনগুলো ভালবাসা দিবস উপলক্ষ্যে বিশেষ প্রোগ্রাম প্রচার করে। ছেলে মেয়েরা খুব  খোলা মেলা মাঠে ময়দানে বসে ভালবাসার সাক্ষাত্‍কার দেয়।গ্রীটিংস কার্ড কোম্পানী গুলো নানা ধরণের কার্ডের ব্যবসা করে। এই ‘ভেলেন্টাইন ডে’ আমাদের এখানে পশ্চিমা কৃস্ট দুনিয়া থেকে। এটা একটা ব্যবসার ফাঁদ। ভ্যালেন্টাইন হচ্ছেন একজন খৃস্ট সন্যাসী। তিনি প্রেম করে নিহত হয়েছেন। হঠাত্‍ করে  এই দিবসটি চালু করেছে কিছু স্বার্থানেষী মহল। কিছু কাল আগেও আমাদের দেশে এপ্রিল ফুল পালন করতো আমাদের তরুণ সমাজ মসকরা জন্যে। এখন করেনা, কারণ তারা এই এপ্রিল ফুলের মূল ইতিহাস জানতে পেরেছে। একই ভাবে খৃস্ট জগত ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ পালন করে। সারা পশ্চিমা জগত , বিশেষ করে ব্যবসায়ী জগত মাতোয়ারা হয়ে উঠে ব্যবসার জন্যে। শুক্রবার মুসলমানদের পবিত্র দিন। এই দিনকে ঈদের দিনের সাথে তূলনা করা হয়েছে। আর এইদিনকেই  তারা ‘ ব্ল্যাক ফ্রাইডে’, অশুভ শুক্রবার, আনলাকী শুক্রবার হিসাবে পালন করে। কিন্তু মুসলমানেরা কখনও বলেনা ব্ল্যাক সানডে বা ব্ল্যাক সাটারডে। আমি ভয় পাচ্ছি, কিছু না জেনেই আমাদের তরুণ সমাজ বা জ্ঞানপাপী বুদ্ধিজীবীরা  ব্ল্যাক ফ্রাইডে পালন করা শুরু করে দেয়। এমনিতেই আমাদের তরুণ সমাজ ইতিহাস সচেতন নয়। কারণ, তারা যে, মুসলমান সে বিষয়টাই তাদের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। তাদের তেমন দোষ দেয়া যায়না। আমাদের ইতিহাস কি হবে তা আজও আমরা নির্ধারন করতে পারিনি। হাল ইতিহাস নিয়েও আমরা বিতর্কে জড়িত হয়ে পড়েছি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসই এখনও সুস্পস্ট নয়। মুক্তিযুদ্ধ কেন করেছি, ঠিক সে সময়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষিত কি ছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও নেই। পুরো জাতির ইতিহাস নিয়ে আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী পন্থীদের  চিন্তা ভাবনা এক রকম, অন্য সবার ভাবনা আরেক রকম। চিন্তার ক্ষেত্রে জাতি আজ দুদি ভাগে বিভক্ত। আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী পন্থীরা মনে করেন তারা  শুধুই  বাংগালী, অন্যরা মনে করেন তারা প্রথমে মুসলমান, তারপরে বাংগালী। সোজা কথায় তারা বাংগালী মুসলমান। আওয়ামী লীগ চায় তারা যেভাবে চায় সমগ্র জাতি সেভাবেই ভাববে। কেউ যদি আওয়ামী চিন্তাধারা বিপরীতে থাকে তাহলে তাকে বলা হয় মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী, সেকুলারিজম বিরোধী। কেউ যদি ধর্মকে গুরুত্ব দেয় আওয়ামী লীগ তাদেরকে জংগী সাজিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চায়।

আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান উপাদান হচ্ছে আমাদের ধর্ম। আমাদের ধর্মের একটা সংস্কৃতি আছে। যার সাথে মিশে আছে আমাদের ভৌগলিক ও আঞ্চলিক সংস্কৃতি। আমরা যদি নিজেদের মুসলমান ভাবি তাহলে পোষাক, খাদ্য, সাহিত্য, কবিতা ও জীবনধারা এক রকম, আর যদি শুধুই বাংগালী ভাবি তাহলে সবকিছুই অন্যরকম হবে। এর আগে বহুবার লিখেছি যে, আমরা মুসলমান বলেই আজ স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। আমি আরেকটি কথা প্রায়ই নিয়মিত বলে থাকি যে, সব জাতিরই একটা বায়া দলিল আছে। সে দলিল হারিয়ে গেলে বা ভুলে গেলে আমাদের স্বাধীনতা বিপন্ন হয়ে পড়বে। কেন স্বাধীন হয়েছি এটা না জানলে স্বাধীনতা থাকবে কেন? বাংগালী মুসলমানের মূল ইতিহাস আমাদের অবশ্যই জানতে হবে। দেশের প্রধান ও প্রাচীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ৮০ ভাগই জানেনা কেন এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল। এ বিষয়ে আমি গত রোববার একই কলাম লিখেছি। অনেকেই আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে মেইল ও ফোন করেছেন। হিন্দু নেতারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার বিরোধিতা করেছেন। আর মুসলমান নেতারা এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার জন্যে লড়াই করেছেন। উভয় পক্ষই নিজেদের স্বার্থ রক্ষার কাজ করেছেন। ব্যথিত হই যখন দেখি আমাদের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও তরুণ সমাজ  সেই ইতিহাস ভুলে যাচ্ছেন।

কিছুদিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংজী বাংলাদেশে সফরে এলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গিয়েছিলেন  এবং সেখানে রাজধানীর গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তিনি বলেছিলেন, ইতিহাসের বড় ভুল গুলো শোধরাবার সময় এসেছে। কি ভুল তিনি শোধরাবার প্রস্তাব দিয়েছেন তা খোলাসা করে বলেননি। এদিকে ভারতের গবেষনা প্রতিস্ঠান হেরিটেজ ফাউন্ডেশন অখন্ড ভারত পূণরায় প্রতিস্ঠার জন্যে কাজ করে যাচ্ছে। তারা বলছেন, ভারত বিভক্তির জন্যে হিন্দু নেতারা দায়ী। মুসলমানরা ভারত বিভক্তি চায়নি। এই গবেষনার উদ্দেশ্য অখন্ড ভারত প্রতিস্ঠা করা। মনমোহনজী  সেদিকেই ইংগিত দিয়েছেন। এখন ইতিহাস পূণর্নিমান ও ভারত পূণর্নিমান করার কথা উঠেছে। এসব চিন্তার সাথে বাংলাদেশের বহু বুদ্ধিজীবী জড়িত আছেন বলে শোনা যায়। অখন্ড ভারতে মুসলমানরা সংখ্যার দিক থেকে মাইনরিটি। হিন্দু নেতারা যদি মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি যদি স্পস্ট করতে পারতেন তাহলে ভারত ভাগ হতোনা। এখনতো আমরা ভারতের মুসলমানদের অবস্থা দেখতে পাচ্ছি। ভারতের সকল নেতাই নিজেদের হিন্দু মনে করেন। মনু সংহিতাই তাদের জীবনের প্রথম ও প্রধান নিয়ামক ও প্রভাবক শক্তি। মনু সংহিতার আলোক ও আদলেই তারা ভারতকে দেখতে চান। যার সাথে মুসলমানদের কোন মিল নেই। ভারতীয় কংগ্রেস প্রতিস্ঠিত হয়েছে ১৮৮৫ সালে। তার ২০ বছর পরে মুসলীম লীগ প্রতিস্ঠিত হয়েছে ঢাকায়। ২০ বছরে মুসলমানেরা দেখেছে কংগ্রেস শুধুই হিন্দু স্বার্থের কথা বলছে। তারা মুসলমানদের কথা শুনতেই চায়না। এমন কি তারা মুসলীম লীগ প্রতিস্ঠারও বিরোধিতা করেছেন।

আমরাতো পাকিস্তান থেকে মুক্তি লাভ করেছি ৪০ বছর আগে। ইংরেজ আর হিন্দু জমিদারগণ আমাদের শোষণ করেছে ১৯০ বছর। উইলিয়াম হান্টারের বই পড়ুন। পাকিস্তান শোষণ করেছে ২৩ বছর। আশাতো ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হলে আমরা একটা উন্নত জাতিতে পরিণত হবো। কিন্তু তা হয়নি। কিন্তু কেন? এ প্রশ্নের উত্তর কার কাছে পাওয়া যাবে? রাজনীতিবিদদের কথা বাদ দিলাম। তারা তাদের গদি নিয়ে ব্যস্ত আছেন। সেটাই রাজনীতির নিয়ম। কিন্তু দেশের আশা আকাংখার প্রতীক তরুণ সমাজ কি করছে? তারা কি কখনও নিজেদের প্রশ্ন করেছে ৪০ বছরেও বাংলাদেশের আকাংখিত উন্নতি হচ্ছেনা কেন? উন্নতি একেবারে হয়নি তা বলবোনা। শুনেছি, পাকিস্তানে ২২ পরিবার ছিল যারা দেশের মানুষকে শোষণ করেছে। এখনতো শুনি ২২ হাজার ধনী পরিবারের কথা যারা দেশকে শোষণ করে ধনী হয়েছে। আমাদের চোখের সামনেই সিংগাপুর, মালয়েশিয়া, কোরিয়া, তাইওয়ান নিজেদের আর্থিক ও রাজনৈতিক ভাগ্যের পরিবর্থন করেছে। কিন্তু আমরা পারিনি। কেন পারিনি এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই তরুণ সমাজকে এখনি খুঁজে বের করতে হবে। যে উদ্দেশ্যে দেশ স্বাধীন হয়েছে তা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। ভাবতে হবে পাকিস্তান থেকে কেন মুক্তি লাভ করেছি। কেন ভারতের সাথে মিশে যাইনি। ভাবতে হবে কি কি উপাদান নিয়ে আমরা একটি আলাদা জাতিতে পরিণত হয়েছি। সেই উপাদান নির্ধারনে ভুল হলে আমাদের আলাদা অস্তিত্ব ও স্বাধীনতা থাকবেনা। অখন্ড ভারতে আমরা বাংগালী মুসলমান ছিলাম, পাকিস্তানেও ছিলাম, স্বাধীন বাংলাদেশেও আমরা বাংগালী মুসলমান। আমরা কখনই শুধু বাংগালী ছিলাম না। এখনও নই। আগামীতেও না। আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রধান উপাদান  আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্ম। পশ্চিম বাংলার বাংগালীরা আমাদের সাথে থাকেনি কারন তারা হিন্দু। তাই তারা অবাংগালী হিন্দু দিল্লীর অধীনে থাকাটাকে যুক্তি যুক্ত মনে করেছে।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »


স্কুলে থাকতেই আমরা আমেরিকার বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়েছি, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক। তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলছে। প্রতিদিনই ভিয়েতনামী মুক্তিযোদ্ধাদের  শহীদ হওয়ার খবর  পেতাম। মাঝে মাঝে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরাট বিজয়ের খবরও আসতো। তখন বিশ্বটা তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথম বিশ্ব আমেরিকার তাবেদার পুঁজিবাদী বা ধনবাদী বিশ্ব। দ্বিতীয়টি সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব যার নেতৃত্ব দিতো সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া। চীন সমাজতান্ত্রিক দেশ হলেও তার তেমন কোন ক্ষমতা ছিলনা অন্যদেশের উপর প্রভাব বিস্তার করার মতো। তাই স্নায়ুযুদ্ধ চলছিলো রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে। আর তৃতীয় বিশ্ব ছিল গরীব দেশ গুলো। আমদের দেশ তখনও গরীব ছিল, এখনও আছে। পাকিস্তান শুরু থেকেই আমেরিকার সাথে জোট বেঁধেছিল। কারণ তখন ভারত রাশিয়ার প্রভাবে ছিল। পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শুরু থেকেই দূর্বল ছিল। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানে গণতন্ত্র টিকেনি। ৫৮ সালে আমেরিকার সাপোর্ট নিয়ে জেনারেল আইউব সামরিক শাসন জারী করে  পাকিস্তানের গণতন্ত্রের কবর দেয়। মহা গণ আন্দোলনের মুখে জেনারেল আইউব ক্ষমতা ত্যাগ করে জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। জেনারেল ইয়াহিয়া এবং সেনা বাহিনী নিজেদের এক গুয়েমীর জন্যে পাকিস্তান রক্ষা করতে পারেনি। আমেরিকা বন্ধু হিসাবে পাকিস্তানের জন্যে তখন কিছুই করেনি। বরং চুপচাপ থেকে ভারত ও রাশিয়াকে  সমর্থন জানিয়েছে। এ রকম ডজন ডজন প্রমাণ পেশ করা যাবে যেখানে আমেরিকা বন্ধুদের সাথে বেইমানী করেছে। লোকে বলে যে দেশ বা ব্যক্তির বন্ধু আমেরিকা তার কোন শত্রুর প্রয়োজন নেই। এক সময় আমেরিকা  সমাজতন্ত্রকে ধ্বংস করে  বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র ও ধনতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্যে  নানা দেশ নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করেছে। এমন কি দেশে দেশে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। সিভিল ডিক্টেটরদের সমর্থন দিয়েছে। রাশিয়ার পতনের পর আমেরিকা এখন ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড ঘোষণা করেছে। এক সময় সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে মুসলমানদের ব্যবহার করেছে।

৯/১১র ঘটনা ঘটিয়ে আমেরিকা সারা দুনিয়ার মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। কোন কিছুই প্রমান না করে আমেরিকা টুইন টাওয়ারের পতনের জন্যে মুসলমানদের দায়ী করেছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত প্রমানিত হয়নি টুইন টাওয়ারের ঘটনা কে বা কারা ঘটিয়েছে। এ ব্যাপারে বিশ্ব জনমত দুই ভাগে বিভক্ত। খোদ আমেরিকার বেশ কিছু বুদ্ধিজীবী মনে করেন সিআইএ এ ঘটনা ঘটিয়েছে বিশ্বব্যাপী নতুন যুদ্ধ শুরু করার জন্যে। সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের নামে আমেরিকা মুসলমান দেশগুলোতে বিশৃংখলা, মারামারি হানাহানি শুরু করেছে। আমেরিকার এই তথাকথিত  সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধে বাংলাদেশও আমেরিকাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমা দেশের মিডিয়াগুলো আমেরিকার মিথ্যা অভিযানের শরীক হয়েছে। মিথ্যা অভিযোগ এনে আমেরিকা ও তার বন্ধুরা ইরাক আক্রমণ করেছে। সে দেশের লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। সাদ্দামের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনে তাকে হত্যা  করা হয়েছে তা কখনও প্রমানিত হয়নি। অথচ একদিন সাদ্দাম আমেরিকার হয়ে ইরাণের বিরুদ্ধে দশ বছর যুদ্ধ করেছে। আমেরিকার উসকানীতে কুয়েত দখল করেছিল। সাদ্দাম পরবর্তী ইরাকে আজও শান্তি প্রতিস্ঠিত হয়নি। এখনও সেখানে আমেরিকান সৈন্যরা নিরীহ নাগরিকদের হত্যা করে চলেছে। আমেরিকা ৬০ এর দশকের ন্যায় এখন আবার পৃথিবীটাকে অস্থির করে তুলেছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমাদের শুনতে হচ্ছে ‘ জার যার মুল্লুক তার’। এ যাবত মানুষ ভাল যা কিছু অর্জন করেছিল তা আমেরিকার কারণেই ধ্বংস হতে চলেছে

অকারণে অশান্তিতে বাস করতে করতে আমেরিকা এখন দেউলিয়া হতে চলেছে।তার অর্থনীতি ভংগুর হয়ে পড়েছে। খোদ আমেরিকায় ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছে। মাত্র এক পারসেন্ট লোক আমেরিকার অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রন করে। এই এক পারসেন্ট লোকই দেশের জনগনকে শোষণ করছে। বিশ্বের মানুষ যেদিন ডলার বর্জন করবে সেদিনই আমেরিকার অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো উড়ে যাবে। তাই সন্ত্রাস দমন বা উচ্ছেদের নামে আমেরিকা  ভিন দেশ  দখল করে সে দেশের সম্পদ লুন্ঠণের কাজে নেমেছে। ইরাক দখল করে, সাদ্দামকে হত্যা করে আমেরিকা সে দেশের সম্পদ লুন্ঠণ করেও ক্ষান্ত হয়নি। হাত বাড়িয়েছে আফগানিস্তানে। প্রতিদিন সেখানে মানুষ মারা যাচ্ছে। পাকিস্তানে জোর করে ঢুকে লাদেনকে হত্যা করেছে। কিন্তু কোথাও শান্তি ফিরে আসেনি। সম্প্রতি আমেরিকা হত্যা করেছে  আধুনিক লিবিয়ার জনক গাদ্দাফীকে।কারণ, গাদ্দাফী আমেরিকার চাহিদা মোতাবেক গণতান্ত্রিক নন। কিছু ভাঁড়াটে লোককে ক্ষ্যাপিয়ে  তাদের হাতে অস্ত্র দিয়ে আমেরিকা ন্যাটো বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়েছে। তারপর যা হবার তাই হয়েছে। লিবিয়া ছিল একটি কল্যাণধর্মী রাস্ট্র। অনেকেই বলেন, গাদ্দাফী ইসলামী সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চালু করার চেস্টা করেছিলেন। তিনি তাঁবুতে থাকতেন, আর দেশের মানুষ থাকতো প্রাসাদে। তিনি বিশ্বের অস্টম আর্শ্চর্য ভুতলে নদী তৈরী করেছিলেন দেশের কৃষিকাজের জন্য। গাদ্দাফী শুরু থেকেই আমেরিকা বিরোধী ছিলেন। তাই আমেরিকা প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। আজ গাদ্দাফী নেই। তাঁর লাশটাও আত্মীয় স্বজনকে দেয়া হয়নি। গোপনে অজানা স্থানে এই দেশপ্রেমিকের লাশ দাফন করা হয়েছে। কি কারণে আমেরিকা গোপনে লাশ দাফন করেছে তা পাঠক সমাজ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। এ ক’দিনেই লিবিয়ার অর্থনীতি ভেংগে পড়েছে। তথকথিত বিদ্রোহী সরকার এখন অভাব অনটনের কথা বলতে শুরু করেছেন। এটাও সস্তায় তেল বেচার একটা চক্রান্ত।

সম্প্রতি আমেরিকা নিরস্ত্র বিপ্লবীনেতা লাদেনকে হত্যা করে তাঁর লাশ সমুদ্রে ফেলে দিয়েছে। কারণ, আমেরিকা শহীদ লাদেনকেও ভয় পায়। একই কাজ সিআইএ করেছিল বলিভিয়ার চ্যে গুয়েভারার ব্যাপারে। চ্যেকে হত্যা করে তাঁর লাশ লুকিয়ে রেখেছিল বহু বছর। এই দুইজন শহীদ ছিলেন মানুষের মুক্তির দূত। একজন ছিলেন কমিউনিস্ট বিপ্লবী, আর অপরজন ছিলেন ইসলামী বিপ্লবী। দুজনই বিদেশের মাটিতে সেই দেশের মানুষের মুক্তির জন্যে জীবন দান করেছেন। একজন বলিভিয়াতে, আরেকজন আফগানিস্তানে। একজন ছিলেন ডাক্তার, আরেকজন ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। লাদেন ছিলেন সউদী আরবের এক ধনীর সন্তান। তবুও তিনি দীক্ষা নিয়েছিলেন বিপ্লবের। তিনি জীবনের সকল সুখ ত্যাগ করেছিলেন মানুষের মুক্তির জন্যে। আজ কমিউনিস্টদের সাথে আমেরিকার মিত্রতা চলছে। একদিন কমিউনিস্টদের পরাজিত করার জন্যে আমেরিকা ধর্মের ধুয়া তুলে মুসলমান বা ইসলামী বিপ্লবীদের সাথে সখ্যতা স্থাপন করেছিলো। আফগানিস্তানের তালেবান বা আল কায়েদা তৈরী হয়েছিল রাশিয়াকে পরাজিত করার জন্যে। সেই আফগানিস্তানেই আমেরিকা এখন মরণপণ যুদ্ধ করছে তালেবান আর আলকায়েদাকে ধ্বংস করার জন্যে।

আমেরিকার অর্থনীতি এখন ভেংগে পড়ার উপক্রম। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে  আমেরিকা ও ইউরোপে এখন আন্দোলন চলছে। আমেরিকা তার অর্থনীতিকে চাংগা করার জন্যে আরও যুদ্ধের পায়তারা করছে। যুদ্ধ না হলে নাকি আমেরিকার অর্থনীতি আর টিকবেনা। তাই আমেরিকা ইরাণ বা সিরিয়া আক্রমনের পায়তারা করছে।আন্তর্জাতিক  অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, সন্ত্রাস দমনের নামে আমেরিক বিশ্ব শান্তিকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে। আমেরিকার বিদেশ নীতির কারণে তার ভিতর বাইরের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছে। কয়েকটি তাবেদার দেশ ছাড়া বিশ্বের বেশীর ভাগ দেশ আমেরিকার সন্ত্রাস দমনের নামে যুদ্ধবাজ নীতির বিরোধিতা করছে। আমেরিকা বিশ্বব্যাপী শত্রু তৈরী করেছে। এ কারণেই আমেরিকাকে নিরাপত্তা খাতে ব্যয় কয়েক গুন বাড়াতে হয়েছে। সারা পৃথিবীতে শুধু দূতাবাস গুলোর নিরাপত্তা খাতেও তার ব্যয় অকল্পনীয় ভাবে বেড়ে গেছে। আমেরিকা মনে করে যে কোন সময় তার দূতাবাস গুলোতে হামলা হতে পারে। এইতো ক’দিন আগে হোয়াইট হাউজের সামনে গোলাগুলি হওয়ার কারণে সারা দেশ রেড এলার্ট জারী করেছে। সাথে সাথে হোয়াইট হাউজকেও নিরাপত্তার চাদরে জড়িয়ে নিয়া হয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, আমেরিকা তার যদ্ধবাজ নীতি ছেড়ে দিয়ে নিজ দেশের মানুষের কল্যাণে অধিকতর বিনিয়োগ করতে পারবে কিনা। অনেকেই বলছেন বিষয়টা অত সহজ নয়। চট করে আমেরিকা তার বর্তমান বিদেশনীতি ও অস্ত্রবাজী ছাড়তে পারবেনা। আগেই বলেছি বিগত ৬০ বছর ধরে  আমেরিকা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হামলা চালিয়ে আসছে। ওই প্রক্ষিতেই তার অর্থনীতি ও প্রশাসন গড়ে উঠছে। তাই চট করে আমেরিকার পক্ষে চলমান যুদ্ধবাদী নীতি ত্যাগ করা সম্ভব হবেনা। তবুও আমেরিকাকে অবিলম্বে অর্থনৈতিক সংস্কারে পথে এগিয়ে যেতে হবে। চলমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাতে আমেরিকার জনগণ আর খুশী নয়। আমেরিকার ভোগ্যপণ্যের বাজার চীনের দখলে চলে গেছে। চীনের কাছে আমেরিকার দেনা দিন দিন বেড়ে চলেছে। এছাড়াও আমেরিকা চীনের কাছে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার দেনা রয়েছে। আমেরিকার অন্ধ তাবেদার ইউরোপীয় দেশ গুলোর আর্থিক অবস্থাও এখন আর ভাল নেই। ইরাক লুট করে যে অর্থ পেয়েছিল তা দিয়ে যুদ্ধের খরচ চালাতে হচ্ছে। জনকল্যাণে কোন অর্থ ব্যয় করতে পারছেনা।এখন আমেরিকা আল কায়েদা বা তালেবানদের সাথে সমস্যা সমাধানে আলোচনা করতে চায়। আমেরিকার এই প্রস্তাবকে তালেবান বা আল কায়েদা নেতারা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

বিশ্বের বহুদেশের দূর্বল চিত্তের নেতারা  আমেরিকার আগ্রাসী নীতিকে সমর্থন করে নানা ধরনের লোভ লালসার বশবর্তী হয়ে। বাংলাদেশও তেমন একটি দেশ। দেখানকার নেতাদের কাছে ক্ষমতা আর গদীই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এরা ক্ষমতায় থাকলে বা গেলে দেশের মানুষের তেমন কোন উপকার হয়না। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তিলাভের জন্যে আমরা ২৩ বছরেই তাদের কাছ থেকে নিজেদের রক্ষার করার জন্যে দেশ স্বাধী করেছি। এখনতো ৪০ বছর পার হয়ে গেছে। বাংগালী বাংগালী বলে আমরা মুখের ফেনা বের করছি প্রতি নিয়ত। কিন্তু দেশের এবং দেশের মানুষের ভাগ্যের কোন উন্নতি হয়নি।একটা কথা আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে দেশ বা রাস্ট্রের নেতারা নিজেদের পদ পদবী আর ক্ষমতার জন্যে  জন্যে ক্ষমতাধর দেশের নেতাদের কাছে হাত পাতে সে দেশের কোন উন্নতি হয়না। বাংলাদেশ তেমন একটি দেশ। ভারত এই দেশের কাঁধে উঠে বসেছে ১৯৭১ সালে। আর ভারতপন্থী দালালদের সাথে ভারতের বন্ধুত্ব ৪৭ সাল থেকেই। কথায় কথায় ভারতপন্থীরা বলতে থাকে  ‘ ভারত আমাদের স্বাধীন করে দিয়েছে’। তা না হলে আমরা স্বাধীন হতামনা। এই মানসিকতার দালাল বা তাবেদাররা বাংলাদেশকে কখনই স্বাধীন সার্বভৌম দেখতে চায়না। বিগত ৪০ বছর ধরে আমরা  ভারতের নানা আবদারকে সহ্য করে আসছি। ভারত জোর জবরদস্তি করে বাংলাদেশের বন্ধু হতে চায় এবং বন্ধুত্ব পেতে চায়। বিগত ৪০ বছরে তার কোন ওয়াদাই রক্ষা করেনি। এই অঞ্চলে ভারত চীন ছাড়া আর কাউকে মর্যাদা দেয়না। ছীনের সাথে ভারতের বহু বিরোধ রয়েছে। প্রধান বিরোধ হলো অমীমাংসিত সীমান্ত। ভারতের বন্ধু এখন আমেরিকা, তাই নিজেকে আঞ্চলিক শক্তি ভাবতে শুরু করেছে। এশিয়াতে আমেরিকার টার্গেট হলো চীন। ভারতকে দিয়ে সে চীনকে মোকাবিলা করতে চায়। ভারত আফগানিস্তানে আমেরিকার যাবতীয় কর্মকান্ডকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। আফগানিস্তানে এর আগে ভারত রাশিয়াকে সমর্থন করেছিল। এখন আমেরিকাকে সমর্থন করছে। অবাক ও বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে চলমান আওয়ামী লীগ সরকার আফগানিস্তানের প্রশ্নে ভারত ও আমেরিকার ভুমিকাকে সমর্থন করে যাচ্ছে।বাংলাদেশের বিদেশনীতি নিয়ে বন্ধুরা বা বন্ধু দেশ গুলো খুবই কনফিউজড। এমন কি সার্কভুক্ত দেশগুলোও বুঝতে পারেনা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সত্যিকারের বন্ধু কে? অতি নিকট প্রতিবেশী মায়ানমারের সাথে আমরা গভীর বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারিনি। চীনের সাথেও আমাদের সম্পর্ক উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ বা ঠান্ডা বা অন্যকিছু তা বুঝার উপায় নেই। প্রসংগতই বাংলাদেশের বিদেশনীতি নিয়ে কথাগুলো বললাম। আমেরিকা এখন ভারতের সাথে দহরম বহরম করছে। ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্যেই এই প্রেম প্রীতির নাটক চলছে। আমেরিকা শক্তিশালী এ কথা সত্য। কিন্তু কারো সুহৃদ বা বন্ধু কিনা তা আজও প্রমানিত হয়নি। সন্ত্রাস দমনের নামে আমেরিকা বিশ্বব্যাপী ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছে তার সাথে বাংলাদেশ সরকারও জড়িত হয়েছে। বাংলাদেশে এখন ইসলাম নির্মূলের সরকারী অভিযান চলছে। সরকার এ কাজটা করছে শুধু ভারত ও আমেরিকাকে তুস্ট করার জন্যে। ( নয়া দিগন্ত, ১৮ নভেম্বর,২০১১ )

Read Full Post »


বাংগালী বলি আর বাংলাদেশী বলি, আমাদের ভাগ্য তেমন ভাল নেই। পাকিস্তানের ২৩ বছর আমরা ভাষা অর্থনীতি ও অধিকার নিয়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে লড়াই করেছি। ৪৭ সাল থেকে ৫৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সকল বাধা বিপত্তির মাঝেও রাজনীতিকরা দেশ পরিচলানা করেছেন। তবুও কেন্দ্রীয় আমলারা সব সময় রাজনীতিতে নাক গলিয়েছেন। ফলে পাকিস্তানের গণতন্ত্র শুরু থেকেই নিরাপদ ছিলোনা। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারী হয় এবং সেনাপতি আইউব খান ক্ষমতা দখল করে নানা ধরনের তেলেসমাতি করেছেন।তিনি দশ বছর ক্ষমতা দখল করে রেখেছিলেন। রাজনীতিকদের নানা ভাবে হেনস্থা করেছেন। দীর্ঘ চার বছর রাজনীতি বন্ধ করে রেখে ৬২ সালে ঘরোয়া রাজনীতি চালু করেন। জেনারেল আইউবের আমলেই পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলায় অর্থনৈতিক বৈষম্য বা শোষণের বিরুদ্ধে  সবচেয়ে বেশী আন্দোলন হয়। পূর্ব পশ্চিম উভয় অঞ্চলে আইউব বিরোধী আন্দোলন শুরু হলে জেনারেল আইউব ৬৯ সালে ক্ষমতা ছেড়ে দিলে জেনারেল ইয়াহিয়া সামরিক শাসন জারী করে ক্ষমতা দখল করেন। জেনারেল ইয়াহিয়া ছিলেন একজন চরিত্রহীন মদ্যপ ব্যক্তি। তাঁর কারণেই ৭১ সালের মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটে। ৭০ এর নির্বাচনে বাংগালীরা একাট্টা বা একজোট হয়ে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। ফলে আওয়ামী লীগ সারা পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। জেনারেল ইয়াহিয়া ঘোষণা করেছিলেন বংগবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন। পশ্চিম পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টি লীডার জুলফিকার আলী ভুট্টো এতে বাধ সাধেন। ফলে জটিলতা সৃস্টি হয়। ভূট্টো বলেই বসলেন, পাকিস্তানে দুই প্রধানমন্ত্রী পদ্ধতি চালু করতে হবে। তিনি পরোক্ষ ভাবে জানালেন যে, পাকিস্তান একটি কনফেডারেশন হবে। সমস্যার সমাধানের জন্যে জেনারেল ইয়াহিয়া  ঢাকায় আসলেন এবং বংবন্ধুর সাথে আলোচনায় বসলেন। কিন্তু সেই আলোচনার ফলাফল দীর্ঘ ৪০ বছর পরেও দেশবাসী জানতে পারেনি। বংগবন্ধু নিজেও জাতির কাছে বিষয়টা পরিস্কার করেননি। পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তিনি কি কি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। ভূট্টো ও পাকিস্তানের সেনা বাহিনী কি ষড়যন্ত্র করেছিল? শেখ সাহেব কেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে ধরা দিলেন? পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী থাকার সময় বংবন্ধুর বিরুদ্ধে  রাস্ট্রদ্রোহীতার যে মামলা হয়েছিল সেই মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে তিনি কি জবাব দিয়েছিলেন সে বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষ কিছুই জানেনা।

২৫শে মার্চ রাতে জেনারেল ইয়াহিয়া কেনইবা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালালো? কোন বিষয় নিয়ে শেষ পর্যন্ত আলোচনা ভেংগে গেল? এ ব্যাপারে প্রখ্যাত আইনজীবী ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাস্ট্র মন্ত্রী ড. কামাল সকল কিছু জানলেও আজ পর্যন্ত মুখ খোলেননি। কেনইবা তিনি ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি জাতির কাছে গোপন রাখলেন? আরেকটি বিষয় আজও পরিস্কার হয়নি। তা হলো , ৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তান কি সত্যিই ভারত আক্রমন করেছিল? ভারততো বিশ্ববাসীকে জানিয়েছে, সে পাকিস্তানের আগ্রাসনের জবাব দিয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে তৃতীয় বারের মতো যুদ্ধ বেধে যায়। যখন রাশিয়া ভারতকে সমর্থন করলো তখন আমেরিকা চুপ থাকলো কেন? পূর্ব পাকিস্তানের সাধারন নিরীহ নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করলে ভারত কি পদক্ষেপ নিতে পারে পাকিস্তানের শাসক গোস্ঠী কি জানতোনা? ইতিহাসের অজানা এ কথাগুলো ইতিহাসের প্রয়োজনেই আমাদের জানা দরকার। বাংলাদেশের চলমান রাজনীতির প্রেক্ষিত বর্ণনা করার জন্যেই আমি পেছনের কথা দিয়েই লেখাটি শুরু করেছি। শুরুতেই বলেছি, পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীরা  ৪৭ সাল থেকেই শোষিত হয়েছে  পাকিস্তানের শাসক গোস্ঠী দ্বারা। ফলে শুরু থেকেই পাকিস্তান প্রতিস্ঠার ভিত্তিমূল দূর্বল হয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বুঝতে শুরু করে এক সাথে থেকে সমস্যার সমাধান করা যাবেনা। ৭০ এর নির্বাচনের ফলাফল ছিল তারই বহি:প্রকাশ। ভারত ৪৭ সাল থেকেই পাকিস্তান ভাংগার গোপন অভিযান চালিয়ে আসছিলো। ভূট্টো ও পাকিস্তানের সেনা বাহিনী ভারতকে তার খায়েশ পূরণের সুযোগ করে দেয়। ৭০ এর নির্বাচনের ফলাফল না মেনে  এবং ২৫শে রাতে সামরিক অভিযান চালিয়ে পাকিস্তানের শাসক গোস্ঠী নিজেরাই পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের ভাগ্য ভারতের হাতে তুলে দেয়। সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বাধ্য হয়েই অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশের জনগণকে সকল প্রকার সহযোগিতা প্রদান করে। নির্বাচিত রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগকে ভারত সরকার আওয়ামী লীগকেই মুজিব নগর সরকার গঠণে সহযোগিতা দিয়েছে যদিও  প্রায় সকল রাজনৈতিক দলই মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে। জাতীয় সরকার গঠণে মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর দাবীকে ভারত সরকার অগ্রাহ্য করে। এমন কি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মাওলানা সাহেবকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ভারত সরকার জানতো মাওলানা সাহেবকে আটক না রাখলে ভারতের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত হবেনা। ভারত বাংলাদেশের জনগণের সাথে কখনই সু সম্পর্ক বা বন্ধুত্ব চায়নি। বরং শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন তিনি বাংলাদেশে একটি বন্ধু সরকার চান। বিগত ৪০ বছর ধরে ভারত চোখ বন্ধ করে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়ে আসছে। তবে ৭২-৭৫  সময়ে বংগবন্ধুর সরকারের আমলে দিল্লী সরকার তেমন সুবিধা করতে পারেনি। আমরা যারা সে সময়ে সাংবাদিকতার পেশায় ছিলাম দেখেছি, মাওলানা ভাসানী দিল্লীর বিরুদ্ধে দূর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। অনেকেই বলেন, এ ব্যাপারে মাওলানা সাহেবের সাথে বংবন্ধুর একটা সমঝোতা ছিল। সেই সময়ে মাওলানা সাহেবের ‘হককথা’ পত্রিকা ভারতের ভূমিকা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন রাখার ব্যাপারে বিরাট ভুমিকা পালন করে। ভারত সব সময়ই আওয়ামী লীগকে ভারতের স্বার্থের পক্ষের শক্তি মনে করে এসেছে। আওয়ামী লীগকে সব সময় ক্ষমতায় রাখার চেস্টা করেছে। আওয়ামী লীগ একটি ভারতপন্থী রাজনৈতিক দল হিসাবে বহুল প্রচারিত। এবার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার জন্যে ভারত ও তার সহযোগী শক্তি ১/১১র ঘটনা ঘটিয়েছে। ভারতই জেনারেল মইন ইউ আহমদের আধা সমরিক সরকার প্রতিস্ঠা করে। জেনারেল মইনের সরকার বিএনপি এবং শহীদ জিয়ার পরিবারকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া শুরু করে।সেই সরকারের অধীনেই এক বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনা হয়। জেনারেল মইনের সরকার বিএনপি ও জাতীয়তাবাদী ইসলামিক শক্তিকে চিরতরে ধ্বংস করার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিল আওয়ামী লীগ তা অব্যাহত রেখেছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও দেখা গেছে দেশের ৬০ ভাগ ভোটার  জাতীয়তাবাদী ইসলামী চেতনার পক্ষে। আওয়ামী লীগ মোট ভোটের ৪০ ভাগ পেয়েছে, যদিও জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের ২৬৩ সিট রয়েছে। আওয়ামী লীগের ভারতপন্থী চেহারা এখন একেবারেই স্পস্ট। এবার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ ৪০ বছরের দেনা শোধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এখন বাংলাদেশ ভারতের চারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। দেশের মানুষ মানসিক ভাবে কস্টে আছে। কারণ দেশবাসী কখনই দেশের এমন অবস্থা দেখতে চায়নি।

পাকিস্তান ২৩ বছরে পূর্ব পাকিস্তানকে যে শোষণ করেছে তার চেয়ে অনেক বেশী শোষণ করছে এখন ভারত। পাকিস্তানকে আমরা বৈরী শক্তি হিসাবে চিহ্নিত করেছিলাম। কিন্তু ভারতকে তাও করতে পারছিনা। আমরা স্বাধীন দেশ হিসাবে পরিচিত। আমাদের জাতীয় পতাকা আছে, জাতীয় সংগীত আছে, জাতিসংঘের সদস্যপদ আছে, কিন্তু সার্বভৌমত্ব আছে কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে একটি তাবেদার রাস্ট্রে পরিণত করেছে। ভারতের পক্ষে প্রকাশ্যে দালালী করার জন্যে লোকের অভাব হয়না। জাতি হিসাবে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য এখন হুমকির মুখে। ভারত যেভাবে চাইছে সেভাবেই ইতিহাস রচিত হচ্ছে। ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা প্রথমে দেশের ভিতরে দালাল তৈরী করেছে, নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে, তারপরে নবাবকে পরাজিত করে অখন্ড বংগদেশ দখল করে নেয়। সেই ইংরেজ দখলদারিত্ব থেকে ভারতকে মুক্ত করতে ১৯০ বছর লেগেছে। দেশের স্বাধীনতার জন্যে  এই ১৯০ বছরে কোটি কোটি মানুষ প্রাণ দিয়েছে। ওই সময়ে পূর্ববাংলার মানুষ সবচেয়ে বেশী শোষিত হয়েছে। পূর্ববাংলার সম্পদ লুণ্ঠন করে কোলকাতা তৈরী করা হয়েছে। ১৬০৮ সালে কোলকাতা ছিল একটি গ্রাম, আর ঢাকা ছিল অখন্ড বংগদেশের রাজধানী। পূর্ববাংলাকে ইংরেজরা যেমন শোষণ করেছে তেমনি শোষন করেছে হিন্দু জমিদাররা। ফলে পূর্ববাংলা একটি দরিদ্র অঞ্চলে পরিণত হয়। দরিদ্র মুসলমান কৃষকদের মুক্তির জন্যেই শেরে বাংলা ঋণ সালিশী বোর্ড গঠণ করেছিলেন।১৯০৫ সালে পূর্ববাংলার আলাদা প্রদেশ হওয়া হিন্দুরা মেনে নেয়নি, শুধুমাত্র তাদের শোষণ অব্যাহত রাখার জন্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠারও বিরোধিতা করেছে কোলকাতার হিন্দুরা। ৪৭ সালে অখন্ড বংগদেশের স্বাধীনতা চেয়েছিল মুসলমানরা। কিন্তু হিন্দুরা তা চায়নি। কারণ বংগদেশ ছিল মুসলিম মেজরিটি এলাকা। ইংরেজ ও হিন্দুদের তৈরী কোলকাতাকে তাই তারা আলাদা করে ভারতের সাথে যুক্ত করেছে। কোলকাতার  হিন্দুরা নিজেদের বাংগালী দাবী করলেও অবাংগালী শাসিত দিল্লীর অধীনতা মেনে নিয়েছে।

পূর্ববাংলার মানুষ চিরদিন শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে রয়েছে  সুদীর্ঘ সংগ্রাম ও লড়াইয়ের ইতিহাস। ৪৭ সালে অবাংগালী মুসলমানদের সাথে  এক হয়ে পাকিস্তান প্রতিস্ঠা করলেও শেষ পর্যন্ত এক থাকতে পারেনি শোষণ ও বৈষম্যের কারণে। এখানে মূল বিষয়টা বাংগালী বা মুসলমান নয়। বিষয়টা হচ্ছে শোষণ ও বৈষম্য। সেই শোষক যেই হোকনা কেন। আওয়ামী লীগ নিজেদের বাংগালী মনে করে । তারা মনে করে জগতের সব বাংগালী এক। পশ্চিম বাংলার হিন্দু বাংগালী আর স্বাধীন বাংলাদেশের মুসলমান বাংগালীর মধ্যে কোন ফারাক আছে বলে আওয়ামী লীগ মনে করেনা। আওয়ামী লীগ ৪৭ সালের স্বাধীনতাকে মানেনা। আমাদের জাতিসত্তার উপাদান নিয়েই আওয়ামী লীগ বিভ্রান্তিতে রয়েছে। আওয়ামী লীগ নিজেদের ভাষা ভিত্তিক সাংস্কৃতিক জাতি মনে করে। যা ভারত চায়। আওয়ামী লীগ মানতে চায়না বাংলাদেশের মানুষের আলাদা জাতিসত্তার আকাংখা বহু শতাব্দীর ঐতিহ্যে লালিত। এই  ঐতিহ্য ও জাতিসত্তার প্রধান উপাদান তার ধর্ম ও সংস্কৃতি যা হিন্দু বাংগালী বা হিন্দু অবাংগালীদের চেয়ে আলাদা। এমন কি বাংলাদেশের বাংগালী মুসলমানরা  অবাংগালী মুসলমানদের চেয়েও আলাদা।  এই আলাদা অস্তিত্বই  এদেশের মানুষকে একটি আলাদা জাতিতে পরিণত করেছে। জেনে হোক বা না জেনে হোক আওয়ামী লীগ এই আলাদা জাতিসত্তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আর আওয়ামী লীগের এই অবস্থানকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে ভারত।

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন সুস্পস্ট ভাবে দুই ধারায় বিভক্ত। একটি ধারা দেশের পক্ষে, আরেকটি ধারা ভারতের পক্ষে। আওয়ামী লীগ ভারতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দেশবাসীকে বুঝতে হবে, জানতে হবে আমরা কেন পাকিস্তান থেকে মুক্তিলাভ করেছি। কেন আমরা আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম আলাদা সত্তাকে সুউচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করতে চাই। কেন আমরা আমাদের অস্তিত্বকে ভারত এবং পাকিস্তানের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে চাই। আমাদের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে গভীর যড়যন্ত্র চলছে। সাংস্কৃতিক ভাবে আমরা ইতোমধ্যেই বিকলাংগ হয়ে পড়েছি। আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার  কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আমরা একটা পংগু জাতিতে পরিণত হবো।আমি মৌলিক বিষয় নিয়ে একটা আলোচনা উত্থাপন করেছি। আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করার চেস্টা করেছি। বাংলাদেশের প্রশ্নে  ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করার চেস্টা করেছি। আমি এর আগেও বলেছি ভারতের রাজনীতি ও দর্শন সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকলে  বাংলাদেশের রাজনীতির( কোন দলের নয় ) অবস্থান নির্ণয় করা যাবেনা। ভারতের দর্শণ হচ্ছে এই অঞ্চলের দেশগুলোকে নিজের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রনে রাখা। বাংলাদেশের দায়িত্ব হচ্ছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসাবে নিজের ভূমিকা পালন করা। আর এজন্যেই বাংলাদেশের  আভ্যন্তরীন রাজনীতি কিভাবে কোন পথে পরিচালিত হবে তা নির্ধারন করা। ভৌগলিক ভাবে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এই অবস্থানকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার জন্যে  সঠিক রাজনীতির প্রয়োজন । এখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত কোন প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন কোন দল বা কোন রাজনীতি বাংলাদেশকে রক্ষা করতে পারবে।

Read Full Post »


আমাদের ইতিহাসটা এখনও ভাল করে জানেনা আমাদের নতুন প্রজন্ম, আমাদের  অনুজ ও সন্তানেরা। এটা যে কোন জাতির জন্যে সত্যিই বড়ই দুর্ভাগ্যের বিষয়। আমাদের জাতির সব কিছুই

দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ছে। আমরা বাংগালী না বাংলাদেশী তা আজও সুস্পস্ট নয়। আমাদের জাতিসত্বা আজও সুস্পস্ট ভাবে নির্ধারিত হয়নি। বিষয়টি খুবই সহজ, কিন্তু এক শ্রেণীর রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও এনজিও নেতা আমাদের জাতিসত্ত্বা বিষয়টা বিভ্রান্তির বেড়াজালে আটকিয়ে রাখার ব্যাপারে সদা সচেস্ট। এরা বিদেশীদের এজেন্ট হিসাবে কাজ করে যাচ্ছে। এরা আমাদের স্বাধীনতার মূল ইরিহাসকে বিকৃত করার কাজে লিপ্ত। বংভংগের ইতিহাস নিয়ে কিছু বলতে গিয়ে হাল সময়ের কথা গুলো বলে নিলাম। ১৯০৫ সালে নিখিল বংগ বা অখন্ড বংগদেশ রাজ্য বা প্রদেশ থেকে আলাদা করে  পূর্ববংগ ও আসামকে নিয়ে একটি প্রদেশ গঠণ করা হয়। ইংরেজরা এ কাজটা করেছেন নিজেদের প্রশাসনিক স্বার্থে। পূর্ব বংগ বা পূর্ব বাংলার নিপীড়িত জন সাধারন ইংরেজদের এই উদ্যোগকে সমর্থন করে। আসাম পূর্ববংগের প্রদেশের রাজধানী স্থাপিত হয় ঢাকায়। উল্লেখ্য যে, ১৬০৮ বা ১০ সালে অখন্ড বংগদেশের রাজধানী স্থাপিত হয় ঢাকায়। জনপদ হিসাবে ঢাকা একটি বেশ প্রাচীন এলাকা। এখানে ঢাকেশ্বরী মন্দির স্থাপিত হয়  পাশেই বুড়িগংগা নদী থাকার ফলে ঢাকা বন্দর হিসাবে গড়ে উঠে। নারিন্দার বিনতে বিবির মসজিদ স্থাপিত হয় ১৪৫৭ সালে। মীরপুরে শাহ আলী বোগদাদীর মাজার প্রতিস্ঠিত হয় ১৪৮০ সালে। প্রসংগ কারণেই ঢাকার পুরাণো কথা কিছু বললাম। অনেক গবেষক বলেন, ১৭১২ সালে রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদ স্থানান্তরিত না হলে  ১৭৫৭ সালে পলাশীর মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতোনা।

সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বলতে পূর্ববংগকেই বুঝানো হতো। দিল্লী সরকার পূর্ববংগ থেকেই সবচেয়ে বেশী খাজনা আদায় করতো। কোলকাতা শহর এবং পরে মহানগর হিসাবে গড়ে উঠেছে  পূর্ববংগকে শোষণ করে। কোলকাতার শিল্প কারখানার কাঁচামাল সরবরাহ করতে পূর্ববংগ। জব চার্ণক সুতানুটি গোবিন্দপুর ও কলিকাতা এই তিনটি গ্রাম নিয়ে বাজারের পত্তন করেন ১৬০৮ সালে। যখন ঢাকা একটি পূর্ণংগ রাজধানী। তারও আগে ১৫৯০ বা ৯৫ সালে মোগল সেনাপতি মান সিংহ ঢাকায়  সেনা ছাউনী স্থাপন করেন। মগ হামলাকে প্রতিহত করার জন্যেই ওই ছাউনী স্থাপন করা হয়েছিল। ১৯০৬ সালে ঢাকাতেই মুসলীম লীগ গঠিত হয়। সারা ভারতের মুসলীম নেতারা ঢাকায় এসেছিলেন নবাব সলিমুল্লাহর আহবানে। পাকিস্তান প্রতিস্ঠার সময়ে বলা হয়েছিল পূর্ববংগ বা পূর্ববাংলাকে আলাদা স্বাধীন দেশ করা অপরিহার্য, কারণ , এই অঞ্চলটি  ইংরেজ এবং তাদের দোসর হিন্দু জমিদার ও আমলা দ্বারা সবচেয়ে বেশী শেষিত হয়েছে। ১৭৯৩ সালে সূর্যাস্ত আইন সবচেয়ে বেশী ক্ষতি করেছে পূর্ববংগের জনসাধারনকে।

এ কারণেই ১৯০৫ সালে নতুন প্রদেশ পূর্ববংগ ও আসাম গঠণের সময় সবচেয়ে বিরোধিতা করেছেন নিখিল বংগের নামজাদা  হিন্দু জমিদার , বুদ্ধিজীবী ও এলিটশ্রেণী। প্রসংগত: ইতিহাসের পাতা থেকে কিছু কথা উল্লেখ না করলে মনে হয় লেখাটি অসম্পুর্ণ থেকে যাবে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করেছিল এ দেশের মুসলমান সমাজ। বিশেষ করে আলেম সমাজ। ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ পর্যন্ত দীর্ঘ একশ’ বছর মুসলমানরা একাই এই স্বাধীনতা আন্দোলন চালিয়ে গেছে। ১৮৮৫ সালে ইংরেজের নেতৃত্বে ভারতীয় কংগ্রেস প্রতিস্ঠিত হয়। এটা ছিল ইংরেজদের সাথে কথা বলার জন্যে একটি সমিতি। হিন্দুরা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেয় ১৯০০ সালের পর। এর আগ পর্যন্ত হিন্দুরা ছিল ইংরেজ শোষণের সহযোগী ও বন্ধু। ১৯০৫ সালে আলাদা পূর্ববংগ  আসাম প্রদেশ গঠণের বিরোধিতা করেছে তাদের শোষণকে অব্যাহত রাখার জন্যে। অতীব বেদনার বিষয় হলো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর পরিবার নতুন পূর্ব বংগ প্রদেশ গঠণের বিরোধিতা করেছেন তাঁদের জমিদারী ও ব্যবসার স্বার্থে। আগেই বলেছি ইংরেজরা নতুন প্রদেশ গঠন করতে চেয়েছিল নিজেদের প্রশাসনিক স্বার্থে। কিন্তু হিন্দুরা যখন এর বিরোধিতা করলো, এমন কি সন্ত্রাসী আন্দোলন শুরু করলো তখন ১৯১১ সালে নতুন প্রদেশ গঠন বাতিল করে দিলো। সোজা ভাষায় বলতে গেলে  হিন্দু নেতা, জমিদার, বড় বড় ব্যবসায়ীরা সব সময় চেয়েছে পূর্ববংগের মুসলমানদের শোষন করতে। এটাই ছিল তাঁদের রুটি রোজগারের পথ। তাঁরা মনে করতো পূর্ববংগ আলাদা প্রদেশ হয়ে গেলে মুসলমান কৃষকদের আর শোষণ করা যাবেনা। এমন কি ১৯১২ সালে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব উঠলে কবিগুরু সহ কোলকাতার নামী দামী সব হিন্দু নেতারা এর বিরোধিতা করেছেন। কোথাও কোথাও কবিগুরু এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কবিগুরুর জমিদারীর বৃহত্‍ অংশ ছিল পূর্ববংগে। তিনি ভেবেছিলেন প্রজারা শিক্ষিত হয়ে গেলে আর শোষন করা যাবেনা। সেই কবিগুরু আজ  স্বাধীন বাংলাদেশে দেবতার মতো পূজনীয়। তাঁর লেখা গাণ আজ আমাদের জাতীয় সংগীত। তাঁর লেখা গাণ ভারতেরও জাতীয় সংগীত। আসলে আমাদের জাতীয় সংগীত নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিলো ৭১ সালে কোলকাতায় ভারত সরকারের নির্দেশেই। কবিগুরুকে নিয়ে আমাদের দেশে সরকারী ভাবে সপ্তাহব্যাপী উত্‍সব পালিত হয়। উত্‍সব পালনের জন্যে দেশী বিদেশী কোম্পানীর টাকার অভাব হয়না। উত্‍সব পালনের জন্যে উদ্যোক্তারও অভাব হয়না। অপরদিকে জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালনের জন্যে সরকারী বেসরকারী কোন মহল থেকেই প্রয়োজনীয় অর্থ পাওয়া যায়না। এসব হচ্ছে জাতি হিসাবে আমাদের হীনমন্যতা।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় মুসলমানেরা অখন্ড বাংলাদেশ চেয়েছিল। কিন্তু রহস্যের বিষয় হলো কংগ্রেস ও হিন্দু কমিউনিস্ট নেতারা মুসলীম মেজরিটি বা সংখ্যাগরিস্ঠ স্বাধীন বাংলাদেশ চাননি। ১৯০৫ সালে ওইসব নেতারা বংগদেশের অখন্ডতা রক্ষা করার জন্যে রক্ত দিতে রাজী ছিলেন। ৪৭ সালে তাঁরা কেন বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করতে রাজী হলেন তা আমাদের নতুন প্রজন্মকে অবশ্যই জানতে হবে। আবার ৭১ সালে সেই হিন্দু ভারত বা পশ্চিম বংগ কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন করেছে তাও জানতে হবে। অখন্ড বংগদেশে মুসলমানেরা ছিল মেজরিটি বা সংগরিস্ঠ। তাই সাম্প্রদায়িক হিন্দু নেতারা মনে করেছেন সংগরিস্ঠ গণতান্ত্রিক অখন্ড বাংগদেশে হিন্দুদের মাইনরিটি হিসাবে বাস করতে হবে। তাই তাঁরা বাংগালী মুসলমানদের  সাথে না থেকে দিল্লীর অধীনে অবাংগালী হিন্দুদের অধীনে থাকাটাকে মংগলময় মনে করেছে। অখন্ড ভারতে মুসলমানরা হিন্দুদের সাথে রাজী ছিল। কিন্তু হিন্দু নেতারা মুসলমানদের দাবী মানতে রাজী নয়। এখন ভারতীয় লেখক এবং রাজনীতিকরা স্বীকার করছেন যে, ভারত বিভক্ত হয়েছে  হিন্দু নেতাদের গোঁড়ামী ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণে। ৭১ বাংগালী মুসলমানরা স্বাধীনতা চেয়েছে পাকিস্তানীদের অত্যাচার ও শোষণের কারণে। ৭১ সালে বাংগালীরা পাকিস্তানী মুসলমানদের সাথে একসাথে পাকিস্তান আন্দোলন করেছিল সাম্প্রদায়িক হিন্দু শাসন থেকে মুক্তিলাভের জন্যে। ১৯০৫, ৪৭ ও ৭১ সাল একই সূত্রে গাঁথা। আজ হোক আর কাল হোক পূর্ববংগের বাংগালী মুসলমানরা স্বাধীন হতোই। তাঁরা অবাংগালী হিন্দু বা মুসলমান কোন শোষণই মেনে নিতোনা। যেমন ইংরেজদের বিরুদ্ধে বাংগালী মুসলমানরাই প্রথম বিদ্রোহ করেছে।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »


বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মানুষ ৯০ ভাগ মুসলমান। এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত আছে বলে আমার মনে হয়না। জানি তবুও কেউ কেউ বলবেন ৯০ নয় ৮০ বা ৮৫ হবে। যেমন ভারত সরকার মুসলমানদের সংখ্যা  ২৫ বা ৩০ কোটি বলতে চায়না। জানিনা সঠিক সংখ্যা বললে ভারত সরকারের কি ক্ষতি হয়। যেমন ভারতে ৩০ কোটি অচ্যুত, হরিজন বা আনটাচেবলস থাকলেও ভারত সরকার তা স্বীকার করতে চায়না। হরিজনরা ভারতের সনাতন ধর্ম অনুযায়ী মানুষ হিসাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নয়। বাংলাদেশেও আরবী নামধারী কিছু বিদ্বান নাগরিক আছেন যাঁরা নিজেদের মুসলমান ভাবতে পছন্দ করেন না। তাঁরা নিজেদের সেকুলার ও বাংগালী ভাবতে পছন্দ করেন। আমরা বাংগালী না বাংলাদেশী তা আজও সুস্পস্ট নয়। বিষয়টা নিয়ে আমি প্রায়ই লিখছি। আমি মনে করি শুধু বাংগালী হওয়ার জন্যে আমাদের আলাদা কোন দেশ বা রাস্ট্রের প্রয়োজন নেই। আমরাতো বাংগালী ছিলাম এবং আছি। বাংগালী সারা পৃথিবীতে আছে , কিন্তু সবার আলাদা রাস্ট্র নেই। রাস্ট্রের জন্যে কেউ কোথাও কোন লড়াই করছেনা। সাবেক পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলার মুসলমানেরা একটি স্বাধীন রাস্ট্র চেয়েছে এবং এজন্যে লড়াই করেছে ১৯০৫ সাল থেকে। ৭১ সালে এসে এই এলাকার মুসলমানদের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আজ আমরা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক। এটা আমার ব্যাখ্যা। যাঁরা নিজেদের শুধু বাংগালী মনে করেন তাঁদের ব্যাখ্যা অন্যরকম হতে পারে।আমি শুরুতেই বলেছি বাংলাদেশে যারা বাস করেন তাদের ৯০ ভাগ মুসলমান। ফলে এ দেশের মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাস্ট্রীয় জীবনে ইসলামের প্রভাব বিরাজ করছে। হাজার বছর আগে এ দেশের মানুষ হিন্দু বা সনাতন ধর্মে বিশ্বাস করতো। কেউ কেউ প্রকৃতি পুজা করতো। এমন কি পাহাড় পর্বত, নদী নালা, পশু পাখির পুজা করতো। ইসলামকে ধর্ম হিসাবে গ্রহন করার পর তারা এক আল্লা্হ , এক নবী ও পবিত্র কোরাণে বিশ্বাস করেন। পরম করুণাময় আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুতে বিশ্বাস বা আস্থা রাখা ইসলামের পরিপন্থী। এমন বিশ্বাস বা আস্থা শির্ক হিসাবে বিবেচিত হয়। এমন শির্ককারী কিছুতেই ইসলামে বিশ্বাসী হিসাবে পরিগণিত হতে পারেন না। সকল প্রকার মুর্তিপুজা থেকে এই জগতকে মুক্ত করার জন্যেই ইসলাম এসেছে মানব জাতির জন্যে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নাকি বলেছেন, ‘ মা দূর্গা হাতিতে চড়ে এসেছেন , তাই এবার ফসল ভাল হয়েছে’। জানিনা, খবরের কাগজ গুলো সঠিকভাবে রিপোর্ট করেছে কিনা। আমার মনে হয়, পত্রিকাগুলো প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বুঝতে পারেনি। বংগবন্ধুর কন্যা একজন আবেগী বা ইমোশনাল মানুষ বলে শুনেছি। আবেগের বশবর্তী হয়ে যদি অমন কথা বলে থাকেন তাহলে পত্রিকাগুলোর উচিত ছিল বিষয়টাকে ভাল করে যাচাই করে নেয়া। তারা নিশ্চয়ই তা করেন নি। তাছাড়া বংগবন্ধুর কন্যা হয়ত নিজেকে শুধুই একজন বাংগালী ভেবে এবং অমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে না ভেবেই বলে ফেলেছেন। পরবর্তী পর্যায়ে সরকার বা  আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একটা ব্যাখ্যা দেয়া উচিত ছিল। দেশের মানুষ তেমন একটি ব্যাখ্যার জন্যে এখনও অপেক্ষা করছে। কালিকা পুরাণে বলা হয়েছে, দুর্গাদেবী পরমাপ্রকৃতি, তিনি বিশ্বের আদি কারণ ও শিবপত্নী। রাজা মহিষাসুর দেবতাদের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করে স্বর্গরাজ্য দখল করে নেন। দেবতারা বিপন্ন হয়ে ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। ব্রহ্মা শিব ও অন্যান্য দেবতাদের নিয়ে বিষ্ণুর কাছে যেয়ে নিজেদের দুর্দশার কথা বর্ণনা করেন ও স্বর্গরাজ্য রক্ষার করার অনুরোধ জানান। রাজা মহিষাসুর ব্রহ্মার বর লাভ করে পুরুষের অবধ্য  হয়েছেন। বিষ্ণু দেবতাদের জানালেন নিজ নিজ স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়ে নারীশক্তির উপাসনা করতে। এরই ফলে নারী শক্তি হিসাবে দুর্গার আবির্ভাব হয়। দেবতারা দেবী দুর্গাকে নিজ নিজ অস্ত্র দান করেন। দেবী দুর্গা স্বর্গরাজ্যকে মুক্ত করার জন্যে মহিষাসুরকে বধ করেন। এসব হলো কালিকা পুরাণের কথা। যা ভারতীয় সনাতন ধর্মে রুপান্তর হয়েছে। ভারতের আধুনিক গবেষকরা মনে করেন, রাজা মহেশ একজন আদি ভারতীয় স্বাধীন নৃপতি। তাঁকে বহিরাগত আর্যরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুদ্ধে পরাজিত করে। আর্য কবি বুদ্ধিজীবী ও ধর্ম গুরুরা পরাজিত দেশপ্রেমিক রাজা মহেশকে অসুর হিসাবে বর্ণনা করেছেন। যেমন তাঁরা শ্রীলংকার দেশপ্রেমিক রাজা রাবণকে অসুর হিসাবে বর্ণনা করেছে। বহু দেব দেবীর পুজারী আর্যরা নিজ দেশের একেশ্বরবাদীদের কাছে পরাজিত হয়ে ভারতে আগমন করে স্থানীয় রাজাদের পরাজিত করে নিজেদের ধর্ম প্রচার করে ও রাজ্য দখল করে তা প্রতিস্ঠা করে। আর্যরাই মহেন্জোদারো ও হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংস করে। এখনও ভারতে আর্যধর্মের শাসন ও শোষণ অব্যাহত আছে।

রাজনৈতিক ভাবে বিবেচনা করলে দেবী দুর্গা একটি সম্মিলিত বিদেশী শক্তির প্রতীক। যেমন চলমান বিশ্বের ন্যাটো ও আমেরিকান বাহিনী। নিজেদের ইচ্ছা ও সুযোগ মতো  যেকোন দেশ দখল করে সেই দেশের মানুষকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যায়িত করে।  পশ্চিমা অসুর শক্তি, যাকে  আমরা সহ বিশ্বের বহু দেশের মানুষ এখনও পূজা করি। এটা এক ধরণের শক্তির পুজা। আমেরিকা সহ পশ্চিমারা এক সময় কমিনিউজম ধ্বংসের নামে বহু দেশ ও মানুষকে ধ্বংস করেছে। এখন সন্ত্রাসী নাম দিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে লেগেছে। বাংলাদেশ সহ বহু মুসলমান দেশ এ ব্যাপারে আমেরিকা ও তার বন্ধুদের সমর্থন করে। যেমন ভারত ইজরায়েলের বন্ধু। বাংলাদেশের সরকার গুলো  ভারতের বন্ধু। বাংলাদেশ ফিলিস্তিনি জনগণের দাবী সমর্থন করে। আবার বহু বিষয়ে আমেরিকা ও ইজরায়েলের অবস্থানকেও সমর্থন করে। দেশবাসীর জেনে রাখার দরকার, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা আরএডব্লিউ(র’) ও ইজরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশের প্রশ্নে নানা খাতে  এক সাথে কাজ করে। ভারতের নেতারা নিজ দেশের স্বার্থেই ইজরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করে। আমাদের সরকার গুলো আমেরিকা ও তার বন্ধুদের আনুকূল্য পাওয়ার জন্যে নিজেদের অজ্ঞাতেই ইজরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করে থাকে। আমি শুরুতেই বলেছি বংবন্ধুর কন্যা একজন আবেগী মানুষ। তাই তিনি নিজের ধর্মীয় রাজনৈতিক অবস্থান ভুলে গিয়ে দেবী দূর্গার প্রশংসা করেছেন। যা একজন মুসলমান হিসাবে তিনি কখনই করতে পারেননা। রাজনীতিতে হয়ত এ রকম হয়ে থাকে। আমাদের দেশে বহু রাজনীতিকের ধর্ম হচ্ছে রাজনীতি ও গদি দখল করা। তাদের কাছে ধর্ম ও নৈতিকতার কোন দাম নেই। এর আগেও সরকার গুলো ফসল ভাল হলেই বলতো, আমরা ক্ষমতা এলেই ফসল ভাল হয়। এটাও এক ধরনের শির্ক। আল্লাহপাক এ ধরণের ধৃস্টতা কখনই ক্ষমা করেননা। এ ধরণের ভুল অনেক সময় ইসলামিক দলগুলো করে ফেলে।

ক’দিন আগে চুরি ও খুনের দায়ে সউদী আরবে বাংলাদেশের আট নাগরিকের শিরচ্ছেদ করা হয়েছে প্রকাশ্যে। এটা সউদী আরবের আইন। পবিত্র কালামে পাক আলকোরাণই হচ্ছে সউদী আরবের সংবিধান ও আইন। যে সব দেশ কোরাণের আইন মানেনা তারা বলেছেন, এ আইন অমানবিক। বাংলাদেশেও ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার আই রয়েছে। এমন কি অনেক সময় প্রাণভিক্ষা চাইলেও রাস্ট্রপতি দয়া দেখান না। আবার সুযোগ পেলে রাজনৈতিক কারণে তিনি দন্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকেও ক্ষমা করে দেন। কোন এক সময়ে নাকি রাজা বাদশাহদের জন্যে ‘সাতখুন’ মাফ ছিল। বাংলাদেশীরা যে মিশরীয়কে খুন করেছে তার পরিবার খুনের বিনিময় নিয়ে দন্ডপ্রাপ্তদের ক্ষমা করতে রাজী হয়নি। শুধু চুরির জন্যেও সউদী আরবে হাত কেটে ফেলার আইন রয়েছে। আমাদের দেশে হাজার বার চুরি করলেও হাত কাটার ব্যবস্থা নেই। আমেরিকাতেও মৃত্যুদন্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে ইলেক্ট্রিক শক বা ইন্জেকশনের মাধ্যমে বিষ প্রয়োগ করে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। আমেরিকানরা বিনা বিচারেও মানুষ হত্যা করে।

সউদী আরবে আট বাংলাদেশীর শিরচ্ছেদ কার্যকর করার বিষয়টা বাংলাদেশের জনগণের ভিতর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃস্টি করেছে। কোরাণিক আইনে খুনের বদলে খুন মেনে নিলেও সবলোক খুনে জড়িত ছিল কিনা এ প্রশ্ন এসেছে অনেকের কাছ থেকে। চুরির দায়ে প্রাণ হরণের কোন ব্যবস্থা কোরাণ বা  হাদিসে বলা হয়নি। ইসলাম মূলত ক্ষমার ধর্ম। মানুষকে শুদ্ধ পথে আনাটাই হলো ইসলামের কাজ। মুয়াজ ইবনে জাবালের কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। আল্লাহর রাসুল(সা) এই বিচারটি কেমন করে করেছিলেন তা স্মরণ করার জন্যে অনুরোধ করছি। আমরা নি:সন্দেহে কোরাণিক মানি এবং একে সম্মান করি। বাংলাদেশে ইসলামিক প্রশাসন বা বিচার ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া এটা ইসলামিক দেশ নয়। বড় রাজনৈতিক দলগুলো শলামী আইনে চলেনা। তবে ইসলামকে ব্যবহার করে চলে। সউদী আরব ও এমন একটি দেশ যেখানে বাদশা্হী জারী রয়েছে। ইসলাম বাদশাহীকে অনুমোদন করেনা। ইসলামী রাস্ট্র মানে আল্লাহর রাস্ট্র। আল্লাহর পক্ষ থেকে আল্লাহর গোলাম বা খাদেম হিসাবে উপযুক্ত মানুষ দেশ পরিচালনা করবে। সউদী আরব তেমন কোন দেশ নয়। কোরাণিক আইনের দোহাই দিয়ে সেখানে পারিবারিক শাসন কায়েম করা হয়েছে। যদিও তাঁরা নিজেদের দু পবিত্র ঘরের খাদেম বলে দাবী করেন। অনেকেই মনে করছেন, সউদী সরকার বাংলাদেশের ইসলামিক ইমেজকে ধ্বংস করার জন্যে এই বিচারের প্রহসান করেছে। আমেরিকা ভারতও চায় বিদেশে বাংলাদেশের এমন একটি ইমেজ তৈরী হোক। সউদী সরকার বিশ্ব রাজনীতি আর ইসলামকে গুলিয়ে ফেলেছেন। বাদশাহ রাজনীতি করছেন ইহুদী শক্তির প্রভাব বলয় বা ছায়ায় থেকে। বাদশহ পরিবারের কোন যুবরাজ বিদেশে কোন জড়িত হলে বাদশাহ সংগে সংগে তারঁ মুক্তির জন্যে উঠে পড়ে লেগে যান। যেকোন উপায়ে হোক তাঁকে বা তাঁদেরকে মুক্ত জীবনে ফিরিয়ে আনেন। বাংলাদেশ সরকার নাকি আট বাংলাদেশীকে বাচাবার জন্যে অনেক চেস্টা করেছেন। যেটা দেশবাসীর বিশ্বাস হয়নি।

লেখাটি শুরু করেছিলাম দেবী দূর্গার আগমন ও ভাল ফসল সম্পর্কে প্রধান মন্ত্রীর মন্তব্য নিয়ে । প্রধানমন্ত্রীর এ মন্তব্য নিয়ে ইতোমধ্যে বিরোধীদলের নেতারা কথা বলেছেন। তথকথিত প্রগতিশীল লেখক বুদ্ধিজীবীরা এখনও কিছু বলেননা। বাংলাদেশ সত্যিই এক অবাক দেশ। এখানে ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বললে মানুষ সম্মানিত হয়। বহু নামী দামী মানুষ ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলেন। এটা একটা ফ্যাশানে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সমস্যা তিনি কোন দিকে থাকবেন, তা আজও ঠিক করতে পারেননি। মাঝে মাঝে তিনি হিজাবও পরেন। তাঁর দলের লোকেরা বলেন, তিনি নিয়মিত নামাজ পড়েন। মাঝে কাবার জিয়ারতেও যান। আবার তিনি সেকুলারিস্ট থাকতে চান। তাঁর দলে বেশ কিছু দামী মানুষ আছেন যাঁরা সেকুলার এবং ধর্ম বা ইসলামকে তেমন গুরুত্ব দেননা। তাঁর সাথে এমন কিছু লোক ও রয়েছেন যাঁদের দেশের প্রতি তেমন আনুগত্য নেই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থাকার জন্যে এমন কিছু দেশী বিদেশী শক্তির হাত মিলিয়েছেন যাঁরা বাংলাদেশের ক্ষতি চায়। প্রধানমন্ত্রী জেনে শুনে দূর্গার নাম স্মরণ করে থাকেন তাহলে তিনি প্রকাশ্য শির্ক করেছেন। শুধু রাজনৈতিক ফায়দা আদায় করার জন্যে বা পশ্চিম বাংলার হিন্দুদের খুশী করার জন্যে বলে থাকেন তাহলেও তিনি ভুল লরেছেন। একজন মুসলমান হিসাবে তিনি এ ধরনের কতা বলতে পারেননা।

ভারতের রাজনৈতিক গবেষকরা মনে করেন রামায়ন মহাভারত গীতা ইত্যাদিতে বর্ণিত চরিত্র গুলো সাধারন মানুষের চরিত্র। সব কাহিনীই মানুষের যুদ্ধ বিগ্রহের কাহিনী। করুক্ষেত্রের যুদ্ধ, রাম রাবনের যুদ্ধ ও সম্মিলিত বিদেশী শক্তির   প্রতীক দূর্গা ও তাঁর বাহিনীো মানুষের প্রতিনিধি। দেবতা বা অসুরের কোন স্থান এখানে নেই। যে হেরে গেছে সে অসুর। আর জিতেছে সেই দেবতা এবং শাসনের অধিকারী। বিশ্বব্যাপী এখন দূর্গা এবং তাঁর বাহিনী জগতটাকে দখল করে রেখেছে। জগতের সকল মুক্তিকামী মানুষ এখন অসুরে পারণত হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ  দূর্গারূপী ভারতের আগ্রাসী নীতির কবলে নিষ্পেষিত। আমাদের দেশের ১/১১র সরকারও এসেছিল দেশের মানুষকে মুক্তি দিবে এই ওয়াদা করে। শেষ পর্যন্ত  দেশটাকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে  ছারখার করে একটি ভুয়া নির্বাচন করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসিয়ে নিজেদের রক্ষা করার পরিস্কার করেছে। আজ মইনুদ্দিন ও ফখরুদ্দিন বিদেশে নির্বাসিত জীবন যাপন করছে। মইনুদ্দিন ও ফখরুদ্দিন ক্ষমতা দখল করেছিল দেশ প্রেমিক দল ও জনগণকে অসুর হিসাবে চিহ্নিত করেছে। দেশবাসী দূর্গারূপী ফখরুদ্দিন মইনুদ্দিনের দেশ বিরোধি সরকারের কথা কোনদিনও ভুলতে পারবেনা।

মইনুদ্দিঁ ও ফখরুদ্দিনের সরকারের লক্ষ্য কি ছিল তা আগে থেকেই আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা, বৃটেন, ফ্রান্স, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আমেরিকা জানতো। ২০০৮ সালের নির্বাচনের ফলাফল তাই কেউই গ্রহন করেনি। শেখ হাসিনা তখনই বলেছিলেন, তিনি ক্ষমতায় আসলে মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকারের সব কাজের বৈধতা দিবেন। বলতে গেলে তিনি ওই সরকারেরই বৈধতা দিয়ে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছেন। ১/১১ সরকার খালেদা জিয়া এবং তার পরিবারের উপর যে অত্যাচার শুরু করেছিল তা আজও অব্যাহত আছে। সংসদে  ২৬৩ সিট পাওয়ার ফলে আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী দলকে কোন রকম গুরুত্ব না দিয়ে সংবিধানের মৌলিক বিষয় গুলো পরিবর্তন করে চলেছে। আদালত আর সরকারের ভিতর কোন ফারাক বুঝা যায়না। সংবিধানের মূল বিষয় “আল্লাহর উপর আস্থা’ কথাটি বাদ দিয়েছে আওয়ামী লীগ। সংবিধান পরিবর্তনের জন্যে দায়িত্ব দিয়েছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও কয়েকজন বামপন্থী নেতার উপর। যাঁরা নিজেদের শুধুমাত্র বাংগালী ও ধর্মহীন মনে করেন। ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশকে তাঁরা সেকুলার বা ধর্মহীন করতে চান। এই ব্যাকগ্রাউন্ড ও পরি প্রেক্ষিতেই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মা দূর্গা গজে চড়ে এসেছেন বলেই ফসল ভাল হয়েছে। এ বছর দেশে পূজার জন্যে ২৮ হাজার প্যান্ডেল তৈরী হয়েছে। যা সারা ভারতেও তৈরী হয়নি।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ershadmz40@yahoo.com

 

Read Full Post »


আমাদের সময় ও ফেণী হাই স্কুল  /  এরশাদ মজুমদার

 

বিষয়টা এতই বড় যে এর জন্যে চার পাঁচশ’ শব্দ কিছুইনা। পুরো একটি বই লিখা সম্ভব। আমার অনুজ সাত্তার অনুরোধ করেছে আমাদের প্রিয়তম বিদ্যালয় ফেণী হাই স্কুলের ১২৫ বছর পুর্তি উত্‍সব উপলক্ষ্যে স্মরনীয় প্রকাশনার জন্যে একটি স্মৃতি বিষয়ক লেখা দেয়ার জন্যে। লেখাটি ম্যাগাজিনের এক পৃস্ঠার বেশী হতে পারবেনা। এর মানে চার পাঁচশ’ শব্দের মধ্যেই লেখাটি শেষ করতে হবে। কোথা থেকে শুরু করবো আর কোথায় শেষ করবো তা ভেবে কুল পাচ্ছিনা। আমি ফেণী হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছি ১৯৫২ সালে। সে বছরই ২১শে ফেব্রুয়ারীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন ছাত্র ও নাগরিক ভাষার দাবীতে মিছিল করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। তখন ফেণীও ছাত্র আন্দোলনের বিরাট ঘাটি ছিল। ৫০এর দাংগার ফলে ফেণী হাইস্কুলের অনেক হিন্দু শিক্ষক ভারত চলে গিয়েছিলেন। দাংগার সময় আমি ছিলাম ফেনী মডেল স্কুলের ছাত্র। স্কুলটি বারিক মিয়া সাহেবের স্কুল বলেই পরিচিত ছিল। বারিক মিয়া সাহেব ছিলেন একজন অনারারী ম্যাজিস্ট্রেট। মুলত স্কুলটি চালাতেন কাজী আবদুল গফুর সাহেব। ওই একই সময়ে ফেনী হাই স্কুলের হেড মাস্টার ছিলেন শ্রদ্ধেয় মণীন্দ্র মুখার্জী। তিনি চলে যাওয়ার পর কিছুদিন হেড মাস্টারের দায়িত্ব পালন করেছেন বজলুর রহমান সাহেব। এর পরে মানে ৫২ সালে হেড মাস্টার হয়ে আসেন তত্‍কালীন সারা পাকিস্তান খ্যাত জালাল সাহেব। তিনি বহুদিন ফেণী হাইস্কুলের হেড মাস্টার ছিলেন। জালাল স্যারের কথা বলতে হলে একটি বই  হয়ে যাবে। আমাদের সময় এবং পরবর্তী কালের কোন ছাত্রই জালাল স্যারের কথা ভুলতে পারবেনা। ছাত্র বয়সে আমি স্যারের খুব বড় এক সমালোচক ছিলাম। তখন কোন গভীর ভাবে বিবেচনা করার ক্ষমতা আমার ছিলনা। স্যারকে আমার খুব কঠোর ও কঠিন মনে হতো। কিন্তু বয়স বাড়তে বাড়তে আমি আমার ভুল বুঝতে পারি। স্যারের মতো ওই রকম হেড মাস্টার আমি আর দেখিনি। তাঁর  গুণের কথা সারা পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই সময়ের আরও ক’জন শিক্ষকের কথা উল্লেখ না করে পারছিনা। তাঁরা হলেন, মণীন্দ্র চক্রবর্তী, রোহিণী কর, অমৃত দত্ত, কাজী রউফ, আলম সাহেব, স্কাউট স্যার ও আরবী স্যার। এই দু’জনের নাম মনে পড়ছেনা বলে আমি খুনই দু:খিত। সাত্তার স্যারের কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে চাই। তিনি ছিলেন আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষক। ঠিক মনে নেই। নবম বা দশম শ্রেণীতে উঠার পর আমরা একটি দেয়াল পত্রিকা বের করেছিলাম। সাত্তার স্যার এই দেয়াল পত্রিকার দায়িত্বে ছিলেন। মুলত: সম্পাদনা দেখতাম আমি আর কবি শামসুল ইসলাম। এই দেয়াল পত্রিকার একটি সংখ্যা আমরা ছেপে প্রকাশ করেছিলাম। সেদিন আমার আনন্দের সীমা ছিলনা। আমরা স্কুল ছেড়ে  চলে আসার পর সেই দেয়াল পত্রিকা আর প্রকাশিত হয়েছে কিনা মনে নেই। সাত্তার স্যার এক সময়ে চট্টগ্রামের মুসলীম হাই স্কুলে চলে গিয়েছিলেন।

আমাদের আগের ও পরের সময়ের কোন ছাত্র নিশ্চয়ই অক্ষয়ের কথা ভুলে যায়নি। অক্ষয়দা ছিলেন হেডমাস্টার স্যারের খাস পিয়ন। কোন ছাত্রকে হেড স্যার তাঁর নিজের চেম্বারে বা অফিসে ডাকলে বুঝতে হবে তার অবস্থা ভাল নয়। কোন না কোন শাস্তি তার ভাগ্যে আছে। ছাত্রের ডাক পড়ার সাথে সাথে অক্ষয়দারও ডাক পড়তো। অক্ষয়দার ডাক মানে বেতের ডাক পড়া। হাতের উপর  বেতের এক ঘা মানে দু’দিন অসুস্থ থাকা। তেমন একটি বেতের ঘা আমি খেয়েছিলাম। আমার অপরাধ ছিল আমি  ক্লাসের ব্ল্যাকবার্ডে এক সারের বিরুদ্ধে একটি কবিতা লিখে রেখেছিলাম। কবিতাটা কিছুটা অশ্লীল ছিল বলা যায়। কবিতাটি আমি এক বন্ধুর অনুরোধে লিখেছিলাম। তার ও স্যারের নাম আজ এখানে উল্লেখ করলাম না। পরে বড় হয়ে দেখলাম বাংলা সাহিত্যের প্রথম দিকের কাব্য চর্যাপদ অনেক বেশী অশ্লীলতা রয়েছে। কাব্য বা সাহিত্যের অশ্লীলতা নিয়ে বহু বই লিখা হয়েছে। এখনও এর সুরাহা হয়নি।

মালেক ভাইকে নিয়ে কিছু কথা বলার লোভ সামলাতে পারছিনা। তিনি ছিলেন বাদাম বিক্রেতা। আমরা তাঁর কাছ থেকে এক বা  দুই পয়সার বাদাম কিনতাম। তাঁর বাড়ি বোধ হয় বারাহিপুরের দিকে। আমাকে বড়মিয়া বলে ডাকতেন। আপনি বলতেন।পয়সা না থাকলেও বাদাম দিতেন। আমি পরে পয়সা শোধ করতাম।

শেষ করার আগে জালাল স্যার সম্পর্কে আরও দুটো কথা বলতে চাই। না বলে সত্যিই পারছিনা। স্যার সাদা পাজামা, সাদা পাণ্জাবী ও সাদা টুপি পরতেন। বাটার রাবার সোলের অক্সফোর্ড স্যু পরতেন।হাটার সময় কোন আওয়াজ হতোনা। যে কোন সময় যে কোন ক্লাশের পিছনে এসে চুপ করে বসে পড়তেন। কেউ টের পেতনা। রাতেও বিভিন্ন ছাত্রের বাড়ি বা বাসায় গিয়ে দেখতেন ছাত্রটি লেখাপড়া করছে কিনা। বাইরে দেখতে স্যার খুব কড়া মনে হলেও ভিতরে নরম ছিলেন। স্যার ভুগোলের কাগজ দেখতেন। সব সময় বেশী নম্বর দিতেন। স্যারের বাংলা ইংরেজী হাতের লেখা ছিল খুবই সুন্দর।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »