Feeds:
Posts
Comments

Archive for January, 2011


বায়া দলিল শব্দটি ফার্সী। আমাদের জীবনে বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। জমি জমার ব্যাপারে নিয়মিত ব্যবহার করা হয়। জমি কিনতে গেলেও লাগবে, বেচতে গেলেও লাগবে। বাংলায় এর কোন বিকল্প শব্দ এখনও তৈরি হয়নি। হয়ত আর তৈরি হবেনা। তবে বলা যেতে পারে জমির ইতিহাস। ইংরেজীতে বলা হয়ে থাকে চেইন অব টাইটেলস। জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা। মানুষের ইতিহাসকেও আমরা মানুষের বায়া দলিল বলতে পারি। যেমন ধরুন, আমি আমার বাবা দাদা পীরদাদা। এতো গেল পেছনের দিকে। ভবিষ্যতের দিকে আমার সন্তান নাতি পুতি ইত্যাদি। সোজা ভাষায় বলতে পারেন বংশ লতিকা। ইংরেজীতে ফ্যামিলি ট্রি।আরবী ফার্সী বা উর্দুতে শাজারা বলা হয়। রাজা মহারাজা বাদশা নবাবদের এ রকম বংশ লতিকা থাকে। কারন তারা ইতিহাসের অংশ। অতি সাধারন মানুষ থেকে এলিট অভিজাত রাজা বাদশাহ হওয়ার ইতিহাসও আছে। সমাজের নামী দামী মানুষের জন্যে ইংরেজী ভাষায় নোবেল বা এ্যারিস্টোক্রেট শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বাংলায় বলতে পারি অভিজাত। প্রাচীন গ্রীসে অভিজাতদের সরকার ছিল। আরবী ফার্সী ও উর্দুতে আশরাফ বা আতরাফ শব্দ ব্যবহার করা হয়।

আমার এক মুরুব্বী বলেছিলেন, অভিজাত হতে হলে অর্থ সম্পদ ও শক্তি থাকতে হবে। এসব বিষয় সমাজে একজনের প্রভাব তৈরি করে। প্রাচীন জমানায় এমনি করেই সমাজে অভিজাত তৈরি হতো। মসজিদের ইমাম সাহেব, স্কুল কলেজের প্রিন্সিপাল বা হেড মাস্টার কখনই অভিজাত হতে পারেন না। কারন তাদের হাতে শক্তি বা অর্থ কিছুই নাই। খবরের কাগজের সম্পাদকও অভিজাত নন। কিন্তু কাগজের মালিক একজন অভিজাত ব্যক্তি। কারন তাঁর কাছে প্রচুর অর্থ সম্পদ ও শক্তি আছে। যেমন ধরুন মসজিদের ইমামের পেছনে নামাজ পড়েন রাস্ট্রপতি,প্রধান মন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি ও প্রধান সেনাপতি। তাই বলে ইমাম সাহেব ক্ষমতাবান ব্যক্তি নন। সক্রেটিস ও অভিজাত ছিলেন না। তিনি অতিশয় গরীব একজন দার্শনিক ছিলেন। সমাজের যুকেরা তাঁর কথা শুনতো। তাই রাস্ট্র বা সমাজের অভিজাতরা তাঁকে হত্যা করেছে। ইমামে আজম হজরত আবু হানিফা একজন জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন। খলিফার সাথে তাঁর বনিবনা হয়নি বলে তাঁকে হত্যা করা হয়। মনসুর হাল্লাজ একজন সুফী কবি ছিলেন। তাঁর ভাবধারা ও বক্তব্যকে শাসক গোস্ঠি সুনজরে দেখেনি। তাই তাঁকেও হত্যা করা হয়। আমাদের দেশে ধনী ও রাজনীতিকরা ভিতরে একই গোস্ঠি। সরকারের বিশাল শক্তিকে ধনীরা ব্যবহার করে থাকে। এক সময় নাকি সাত খুন করার আইন গত অধিকার ছিল সমাজের ক্ষমতাবান মানুষদের।

লেখাটি শুরু করেছি আমাদের জাতির বায়া দলিল নিয়ে কিছু কথা বলার জন্যে। প্রত্যেক জাতিরই বায়া দলিল আছে। যেমন ধরুন, ইউরোপে বহু জাতি আছে যারা এক সময় জলদস্যু ডাকাত লুটেরা বা হারমাদ ছিল। ধন ও শক্তি জোগাড় করে তারা নিজ মানুষদের করতল গত করে। কালক্রমে তারাই রাজা বা রাজ পরিবারে পরিণত হয়। তারা এখন নিজেদের ব্লু ব্লাড বলে দাবী করে। ইংল্যান্ডের রাজ পরিবার এক সময় জলদস্যু ছিল। সে হয়ত ৮শ’ হাজার বছর আগে। পুরাণো ভারতবর্ষে বহু নবাব রাজা মহারাজা ছিলেন যারা রাজশক্তির সহযোগী। এরা সৈনিক থেকে বাদশ হয়েছে। আবার অনেকেই বণিক থেকে রাজ দরবারে স্থান পেয়েছে। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরাণে বলা হয়েছে, আল্লাহর আইনে আশরাফ আতরাফ বলে কিছু নেই। আরব আজমী বলে কিছু নেই। বংশ কারো পরিচয় নেই। সবার পরিচয় আদমের বংশ। সবার পরিচয় হবে ন্যায় নীতির ভিত্তিতে। সমাজ বা রাস্ট্র পরিচালনায় আরবদের কোন বিশেষ প্রাধান্য নাই। যোগ্য ব্যক্তি অনারব আজমী বা বিদেশী হলেও নেতা হতে পারবে। এখন যোগ্য অযোগ্যের মাফকাঠি বা চিন্তার পরিবর্তন হয়ে গেছে। এ প্রসংগে হজরত আলীর (রা) একটা বাণী উল্লেখ করতে চাই। তিনি বলেছিলেন, একটা সমাজ দেশ বা রাস্ট্র নস্ট বা পঁচে গেছে কিভাবে বুঝবে। সেই পঁচা সমাজের চিহ্ন হলো, ১। গরীবেরা ধৈর্য হারা হয়ে যাবে, ২। ধনিরা কৃপন হবে,৩। মুর্খরা মঞ্চে বসে থাকবে,৪। জ্ঞানীরা পালিয়ে যাবে,৫। রাজা মিথ্যা কথা বলবে। পঁচে যাওয়া বা ধ্বংস হয়ে যাওয়া বহু জাতি বা রাজ্যের কথা ইতিহাস ও আল কোরাণে উল্লেখ করা হয়েছে। ফোরাউনের(  রামসিস টু ) লাশ এখনও মিশরের মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। প্রায় চার হাজার বছর আগের একজন মহা অত্যাচারীর দেহ মমি করে রাখা হয়েছে জনগনের জন্যে। এই সেই ফেরাউন যে মুসা(আ)  এবং তাঁর জাতির উপর অত্যা্চার করেছিল। আল্লাহ বলেছেন, আমি তোমাকে মানব জাতির জন্যে নিদর্শন করে রাখবো। লোহিত সাগরে ডুবে মারা যাওয়ার পরেও ফেরাউনের লাশ ভেসে উঠেছিল। সেই লাশই হাজার হাজার বছর ধরে জাদুঘরে রক্ষিত রয়েছে। সেই মিশরের মানুষ লড়াই করছে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে।

আমরা বাংলাদেশের সাধারন মানুষ সুপ্রাচীন কাল থেকেই অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছি। আর এসব লড়াইয়ে প্রথম কাতারের সৈনিক ছিল কৃষক শ্রমিক আর কামার কুমোর। খুব পেছনের দিকে নাইবা গেলাম। বৃটিশদের বিরুদ্ধে ১৯০ বছর সবচেয়ে বেশী লড়াই করেছে সাধারন মানুষ। ইংরেজরা হচ্ছে একটা ধুর্ত জাতি। ষড়যন্ত্র ওদের চরিত্রের প্রধান বৈশিস্ট। শক্তি ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাবত পৃথিবীকে দখল করে রেখেছিল এক সময়। ওরাই আমাদের এই দেশে সাম্প্রদায়িকতা চালু করেছে। হিন্দু মুসলমানের বিভেদ তৈরি করেছে। সেই বিভেদের কারনেই ৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়েছে। এখন আমরা সেই ইংরেজদেরই ভক্ত এখন। এই ইংরেজরাই ১৯০ বছরে সোনার বাংলাকে শ্মশান বাংলায় পরিণত করেছে। দাদাভাই নওরোজী লিখিত বই ‘পোভারটি ইন ইন্ডিয়াতে’ বলেছেন তখনকার হিসাবে কোম্পানী প্রতি বছর এদেশ থেকে ২১ লাখ স্টার্লিং পাউন্ড নিয়ে গেছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাংলা দখলের বছর কয়েক পরেই বাংলায় দুর্ভিক্ষ হয়। আমাদের লোকেরা এখনও বিলেত থেকে স্যার নাইট লর্ড উপাধি পেলে আনন্দের সীমা থাকেনা।২০১১ সালে এসেও স্যার নাইটদের সন্তানেরা বড় গলায় উঁচু করে বলে আমরা বিলেতী নাইট বা স্যারের ছেলে। আমাদের বাপদাদারাও ছিলেন ইংরেজ আমলের স্যার নাইট খান বাহাদুর খান সাহেব। গনতন্ত্র সমাজতন্ত্র ও মানুষের মর্যাদা প্রতিস্ঠার যুগে এসব খেতাব পদক টাইটেল সত্যিই হাস্যকর। রাস্ট্র বা সরকার কেন কিছু মানুষকে নানা ধরনের পদক বা সম্মানী দেয়। সব সরকার সব সময়েই কিছু মানুষকে বিনা কারনে সম্মানিত করে নিজেদের পক্ষে অনুগত রাখতে চায়। সরকারের বিরুদ্ধে গণ বিদ্রোহ দেখা দিলে তখন সম্মানিতরা পালিয়ে থাকে।

আমরা এখনও বিভক্ত। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও আমাদের জাতীয় ঐক্যমত প্রতিস্ঠিত হয়নি। আমাদের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের জনগন নয়। আমাদের লক্ষ্য নিজের দল, নিজের মত, নিজের গোস্ঠি। ফলে বাংলাদেশের মানুষ ও দেশটা এতিমের মতো অন্ধকারে পড়ে থাকে। হিন্দু মুসলমান, শিয়া সুন্নী আহমদীয়া, পাহাড়ি বাংগালী ইত্যাদি নানা ভাগে আমরা বিভক্ত। আমাদের রাস্ট্রীয় নীতিও বিভক্ত। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে এক রকম আর বিএনপি আসলে আরেক রকম। একেবারে মূলনীতিতেই পরিবর্তন হয়ে যায়।যা কখনও দেশবাসীর কাম্য নয়। সীমান্তে কাঁটাতারের সাথে অভাগা ফেলানীর  ঝুলে থাকা গুলিবিদ্ধ ছবি বাংলাদেশের সার্বভৌনত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সরকার এ ব্যাপারে তেমন কোন শক্ত পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে সাধারন মানুষের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী প্রধান দল আওয়ামী(জনগণ) লীগ সত্যিকারেরই জনগণের দল হিসাবে গড়ে উঠা উচিত ছিল। আওয়ামী লীগের ভুল নীতি ও গোস্ঠি প্রীতির কারনেই অন্যান্য রাজনৈতিক দল বিকাশের সূযোগ এসেছে। আওয়ামী লীগ যদি প্রগতিবাদী বামপন্থী দল হয়ে থাকে তাহলে ডান বা দক্ষিণপন্থিদের একটি দল গড়ে উঠা একেবারেই স্বাভাবিক। দেশে রক্ষণশীল বা ডানপন্থি দল থাকবেনা এমন ভাবনা সুস্থ ভাবনা নয়। ভারতের মতো দেশেও কঠোর রক্ষণশীল দল আছে। পশ্চিমেতো বহু ডানপন্থি দল আছে। আওয়ামী ঘরানার সমর্থক ভক্ত ও তাদের চারিদিকে ঘুরে বেড়ানো দলগুলো মনে করে বিএনপি ধর্মপন্থি ডানমুখো দল। অথচ বিএনপি এখন দেশের অন্যতম বৃহত্‍ দল। এই দলটি না থাকলে ওই চিন্তাধারার মানুষগুলো কোথায় যেতো? বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেউ আওয়ামী চিন্তাধারার বিরোধিতা করলেই তাকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। অথবা তাদেরকে রাজাকার বলা হয়।ফলে এসব কথার কথায় পরিনত হয়েছে। ৭২ সালেই ইংরেজী সাপ্তাহিক হলিডেতে এনায়েতউল্লাহ খান লিখেছিলেন ‘ সিক্সটিফাইভ মিলিয়ন কোলাবোরেটর ’।মানে যারা ভারতে গিয়েছিলেন তারা ছাড়া বাকি সবাই কোলাবোরেটর। বিষয়টা নিয়ে লিখে তখন এনায়েতউল্লাহ খান সবার প্রশংসা পেয়েছিলেন। তখন দেশে লোক সংখ্যা ছিল সাতকোট বা সাড়ে সাতকোটি। এখন ১৫ কোটি। তাহলে কত কোটি মানুষ কোলাবোরেটর বা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ? হয়ত শুধু রাজনীতির স্বার্থে আওয়ামী লীগ এবং তার বন্ধুরা এই শ্লোগান দিয়ে থাকে।

যেমন ধরুন, বাংগালী আর বাংলাদেশী। এ আরেক বিতর্ক। কেন জানিনা। শুধু রাজনীতির জন্যে এই বিতর্কের জন্ম দেয়া হয়েছে। পৃথিবীতে ৩০ কোটি বাংগালী আছে। কিন্তু বাংলাদেশী মাত্র ১৫ কোটি। ভারতের বাংগালীরা ভারতীয় বা ইন্ডিয়ান। আমাদের পাসপোর্টে লিখা রয়েছে জাতীয়তা বাংলাদেশী। এমন কি প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার পাসপোর্টেও। প্রখ্যাত বাংগালী কবি সাহিত্যিক সুনীল গংগোপাধ্যায়ের পাসপোর্টে লিখা রয়েছে ইন্ডিয়ান। কারন তিনি ভারতীয়। আমরা একই ভাষাভাষী হলেও দুই স্বাধীন দেশের বাসিন্দা। মধ্যপ্রাচ্যে বহু দেশে আরবী ভাষা প্রচলিত। কিন্তু দেশ আলাদা। ইংরেজী ইউরোপের বহুদেশের ভাষা। কিন্তু দেশ আলাদা, জাতীয়তা আলাদা। ইংরেজী ভাষী সবাইকে ইংরেজ বলা হয়না। আবার আরবী ভাষী সবাইকে আরব বলা হয়না। বিদেশে আপনি যদি বলুন আমি বাংগালী। তখন প্রশ্ন উঠবে আপনি কোন দেশের বাংগালী। আপনি বলবেন আমি বাংলাদেশী বাংগালী। সোজা কথায় বলতে গেলে বলতে হবে আমি বাংলাদেশী। তাতে ভাষাও বুঝা যাবে, দেশও বুঝা যাবে। নবাব সিরাজ উদ দৌলার আমলে বাংলা বিহার উড়িষ্যা নিয়ে ছিল সুবেহ বাংলা। সুবেহ মানে প্রদেশ বা রাজ্য। পুরো সুবেহ বাংলার আড়াই ভাগ এখন ভারতে। তিন ভাগের একভাগ বাংলাদেশ। পাকিস্তান আমলে মুসলমানের দেশ বলে এই অঞ্চল ছিল পূর্ব পাকিস্তান। এখন বাংগালী বলে বাংলাদেশ। পশ্চিম বাংলায় ৬০/৭০ ভাগ অধিবাসী ধর্মীয় ভাবে সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী বলে ভারতে রয়ে গেছে। এই বাংলায় মানে বাংলাদেশে ৮৫ ভাগ অধিবাসী বাংলাভাষী মুসলমান বলে আলাদা একটা দেশ গঠণ করেছে। ভাষাগত ভাবে বাংগালী হলেও এই ধর্মীয় কারনে এই অঞ্চলে একটা আলাদা একটা  জাতিসত্তা  গড়ে উঠেছিল। একই পুকুরে গোসল/স্নান করেও একজন বলছে জল,আরেক জন বলছে পানি। একজন সূর্যকে প্রণাম করছে, আরেকজন আজানের ধ্বনি শুনে মসজিদের দিকে যাচ্ছে। অর্থনেতিক কারনে পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম বাংলার অনেক পেছনে পড়ে গিয়েছিল। পূর্ব বাংলা ছিল মূলত:  গরীব মুসলমান কৃষক প্রজার দেশ। কোলকাতা ছিল ইংরেজ কোম্পানীর রাজধানী। সেখানেই বাস করতো সাহেব আর বাবুরা। এই অঞ্চল ছিল কোলকাতার বাবু আর সাহেবদের শোষনের জায়গা। ফলে পূর্ব বাংলা দারিদ্র পীড়িত অঞ্চলে পরিণত হয়। ১৯০৫ সালে পেছনে পড়ে থাকা অঞ্চল হিসাবে পূর্ব বাংলা ও আসামকে নিয়ে একটি আলাদা প্রদেশ গঠন করা হয়। ঢাকা ছিল সেই প্রদেশের রাজধানী। প্রদেশের প্রথম গভর্ণরের বাসস্থান ছিল পুরাণো হাইকোর্ট বিল্ডিং। পরে এক সময় তা চলে যায় বর্তমান বংগভবন এলাকায়। কিন্তু নতুন প্রদেশ গঠনকে কোলকাতার বাবুরা সমর্থন করেননি। এমন কি আমার প্রিয় কবিগুরুও সমর্থন করেন নি। ১৯১১ সালে নতুন প্রদেশ গঠন বাতিল হয়ে যায়। পূর্ব বাংলার মানুষের ক্ষোভকে প্রশমিত করার সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার ওয়াদা করে।কোলকাতার বাবুরা প্রায় সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার বিরোধিতা করে এবং মক্কা বিশ্ববিদ্যালয় বলে তামাশা করতে থাকে। সব বাধা বিপত্তিকে অতিক্রম করে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাশ শুরু হয়।

১৯৪৭ সালে স্বাধীন বংগদেশ( পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলা ) প্রতিস্ঠার জন্যে হিন্দু-মুসলমান বাংগালীরা যৌথভাবে চেস্টা করলেও কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতা নেহেরুজী ও গান্ধীজী রাজি হননি। কারণ বৃহত্‍ বংগদেশে মুসলমানরা ছিল মেজরিটি। কংগ্রেস চায়নি ভারতের দুই দিকে দুটি মুসলমান প্রধান দেশ থাকুক। তাছাড়া, ১৯৩৫ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বংগদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনজন মুসলমান নেতা। তাঁরা হলেন, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, স্যার খাজা নাজিম উদ্দিন ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এ কারনেও হিন্দু নেতারা ভেবেছেন বাংলা অবিভক্ত থাকলে পুরো নেতৃত্ব চলে যাবে মুসলমানদের কাছে। এসব খুবই পুরাণো কথা। অনেকেই জানেন। কোথাও আমার স্মৃতি ব্যর্থ হতে পারে।ভুল থাকলে শুধরে দিলে বাধিত হবো। নবিন ও যুবক বন্ধুদের জন্যে বিষয়টি উপস্থাপন করলাম। ( নয়া দিগন্ত, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১১ )

লেখক: কবি সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিক

ershadmz40@yahoo.com

Advertisements

Read Full Post »


বেশ কিছু পিছনের দিকে যেয়ে লেখাটা শুরু করি। ১৬ ডিসেম্বর রমনার মাঠে পাকিস্তানের আনুস্ঠানিক পরাজয়ের দলিল স্বাক্ষরিত হলো। সেদিন সেখানে ঢাকার সাংবাদিক আর কেউ উপস্থিত ছিল কিনা মনে পড়েনা। গিয়েছিলাম তত্‍কালীন হোটেন কন্টিনেন্টলে সব কিছু বিস্তারিত জানার জন্যে। তখন বেলা দুটোর কাছাকছি। শুনলাম, রেডক্রসের নেতৃত্বে রমনায় চেয়ার টেবিল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সারেন্ডার দলিল বা ইনস্ট্রুমেন্ট কোলকাতা থেকে তৈরী হয়ে ঢাকায় রেডক্রসের কাছে এসে গেছে। তার আগে ওই দলিলের ড্রাফট নিয়ে কাজ করেছেন জাতিসংঘের নেতারা। পাকিস্তান পরাজয় মেনে নেবে এই ধরনের একটি  ইংগিত বন্ধু রাস্ট্রের মাধ্যমে জাতিসংঘকে জানানো হয়েছে। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী দলিল তৈরী হবে। পরাজয় মেনে নেয়ার বিষয়টি জেনারেল নিয়াজী জানতোনা। তাই সে সারেন্ডার দলিলে স্বাক্ষর করতে রাজী হচ্ছিলোনা। সদর দফতর থেকে তাকে বার বার তাগিদ দেয়া হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত খুব সম্ভব বেলা চারটার দিকে দলিল স্বক্ষরিত হলো। সময় সুযোগ হলে পরাজয়ের সেই দৃশ্য মূহুর্ত আরেক সময় লিখার চেস্টা করবো। পাকিস্তানের  নিয়াজী পরাজিত জেনারেল

ও  ভারতের অরোরা বিজয়ী জেনারেল। আর আমরা পেলাম আমাদের স্বাধীনতা। লাল সবুজ রংয়ের পতাকা আকাশে উড়লো। বেজে উঠলো জাতীয় সংগীত ‘ আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’।

তখন আমি পূর্বদেশে  কাজ করি। আমাদের কাগজ বেরিয়েছিল ১৮ ডিসেম্বর। আমাদের সম্পাদক জনাব মাহবুবুল হক অফিসে আসছেন না। নিউজ এডিটর  এহতেশাম হায়দার চৌধুরী সাহেব সম্পদকের দায়িত্ব পালন শুরু করলেন। আমি চীফ রিপোর্টার হিসাবে কাজ শুরু করলাম। ১৭ই ডিসেম্বর আমি আর মানু মুন্সী গিয়েছিলাম বাংলাদেশ ব্যান্কের সামনে। সেখানে এলো মেলো পড়ে থাকা টাকার বাক্স গুলোতে আগুন জ্বলছে। এখানে সেখানে বেশ কিছু টাকা খোলা পড়েছিল। পাকিস্তানীরা বাংলাদেশ সরকারের জন্যে সমস্যা সৃস্টি করতে টাকায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। বেশ কিছু লোক টাকা কুড়াচ্ছিল। আমার নিজের ধারনা বাংলাদেশ সরকার নোট গুলো বাতিল ঘোষণা করবে। কিন্তু করেনি। কারণ তখনও বাংলাদেশ সরকারের নতুন নোট ছাপা হয়নি। ফলে বাংলাদেশ সরকার সীল দিয়ে পাকিস্তানী নোট গুলো চালাতে হয়েছে। যারা টাকা কুড়িয়ে নিয়েছিল তারা ভাগ্যবান। কারন তারা কোটিপতি হয়ে গিয়েছিল।

আনুস্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশ সরকারের যাত্রা শুরুর আগে কয়েকদিন সরকার চালিয়েছেন জেনারেল অরোরা। তিনিই বাংলাদেশের সিভিল ও মিলিটারী প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন। শান্তি শৃংখলা ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্যে বাংলাদেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়ে তিনি প্রথম যে সভাটি করেছিলেন আমি তাতে উপস্থিত ছিলাম সাংবাদিক হিসাবে। আমরা দেশবাসী তখন উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিলাম আমাদের সরকারের জন্যে। প্রতিদিন শুনছি তাঁরা আসছেন। সবার মনে প্রশ্ন তাঁরা কখন আসবেন? আবার মনে নানা ধরনের সন্দেহ। কোথাও কিছু হয়ে যাচ্ছে কিনা। যাক শেষ পর্যন্ত মুজিব নগর সরকার ঢাকায় এসে বসলেন। কিন্তু আসতে দেরী হলো কেন তা আমরা এখনও জানিনা। শুনেছি নিরাপত্তার কারণে। তখন  স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের একমাত্র সম্পদ জনগনের ভালবাসা আর আনুগত্য। ট্রেজারীতে টাকা নেই। বিদেশী মুদ্রার কোন রিজার্ভ নেই। যতদূর মনে পড়ে ইরাক আমাদের এক মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল। সঠিক অংক কত এখন মনে নেই। কিছুদিন পর ভারত নোট ছাপিয়ে দিয়েছিল।

১৯০৬ সালে ঢাকায় যখন মুসলীম লীগ  গঠণ হয় তখন এটি মুসলমানদের অধিকার ও সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্যে একটি প্ল্যাটফরম ছিল। কারণ কংগ্রেস ১৮৮৫ সালে প্রতিস্ঠিত হয়েছিল ভারতীয়দের পক্ষে কথা বলার জন্যে। কিন্তু কালক্রমে এটি হিন্দুদের সংগঠণে পরিণত হয়েছিল। তাই বাধ্য হয়ে মুসলমানরা নিজেদের কথা ও দাবী দাওয়া নিয়ে ইংরেজদের সাথে দরকষাকষি করার জন্যে মুসলীম লীগ প্রতিস্ঠা করেছিল। শুরুতে জিন্নাহ সাহেব মুসলীম লীগের সাথে ছিলেন না। তিনি হিন্দু- মুসলমানের মিলিত আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। তিনি এক সময় কংগ্রেসের সভাপতিও হয়েছিলেন। কালক্রমে জিন্নাহ বুঝতে পারলেন হিন্দুরা মুসলমানদের সাথে নিয়ে মিলিত সংগ্রাম করতে চায়না। এর পরেই তিনি মুসলীম লীগে যোগ দিলেন এবং ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে পাকিস্তান প্রতিস্ঠার কথা ঘোষনা দিলেন। লাহোর প্রস্তাব আনুস্ঠানিক ভাবে পেশ করেছিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক। দীর্ঘ আলাপ আলোচনা ও কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিস্ঠিত হয়।পাকিস্তান প্রতিস্ঠা বা দ্বিজাতি ত্বত্ত নিয়ে এখন নানাজনের নানা মত আছে। ওই ত্বত্তকে এখন অনেকেই সাম্প্রদায়িক ত্বত্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ বিষয়টা নিয়ে এখন এখানে আলোচনা করা যাবেনা।

মুসলমানদের দেশ পাকিস্তান হয়ে যাবার পর অর্থনৈতিক উন্নতি, ভাষা,সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে কথা উঠতে শুরু করলো। যদিও পাকিস্তান গণ পরিষদের প্রথম অধিবেশনেই জিন্নাহ সাহেব বলছিলেন, এখন থেকে কেউ আর হিন্দু নয়, মুসলমান নয়, সিন্ধী নয়, পাঞ্জাবী বা বাংগালী নয়, আমরা সবাই পাকিস্তানী। কিন্তু পাকিস্তানের জনগণের ঐক্য মনোজগতে কখনই প্রতিস্ঠা করা যায়নি। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে জিন্নাহ সাহেব যখন পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন তখনি ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্ররা ভাষার দাবীতে আন্দোলন শুরু করে। ওই রকম দাবী পশ্চিম পাকিস্তানেও উঠতে শুরু করে। জিন্নাহ সাহেব মারা যান ৪৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর। ফলে আঞ্চলিক বড় বড় সমস্যা গুলোকে রাজনৈতিক ভাবে মোকাবিলা করার পথ বন্ধ হয়ে গেল।পাকিস্তানের পরবর্তী নেতারা ছিলেন একেবারেই জন বিচ্ছিন্ন। তারা জনগনের চাহিদা বা মনোভাব নিয়ে তেমন চিন্তা ভাবনা করতেন বলে মনে হয়নি। তারা নানা ধরনের আইন করে জনগনকে দমনের চেস্টা করতেন। মুসলীম লীগের জন বিচ্ছিন্ন নেতাদের মোকাবিলা করার জন্যে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৪৯ সালের ২৩ মার্চ আওয়ামী মুসলীম লীগ প্রতিস্ঠা করলেন। ৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলীম লীগের কবর রচিত হলো। তারপরেও কেন্দ্রীয় মুসলীম লীগ নেতাদের হুঁশ হয়নি। তারা নিজেদের ভুল কখনই বুহবার চেস্টা করেনি।ফলে পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানের ভিতর অর্থনৈতিক বৈষম্য হিমালয় সমান হয়ে উঠে। জনগন নিজেদের শোষিত ও নির্যাতিত ভাবতে লাগলো। কেন্দ্রীয় সরকার ডিসপ্যারিটির কথা স্বীকার করলেও তা সমাধানের জন্যে ২৩ বছরেও  তেমন সময় তাদের হাতে আসেনি। এমনি একটি সময়ে জেনারেল ইয়াহিয়ার সামরিক শাসনের অধীনে সারা পাকিস্তানে সাধারন নির্বাচন অনুস্ঠিত হলো। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, মুসলীম লীগ ও জামাত অংশ গ্রহন করেছিল। ১৬৯ সিটের মধ্যে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৬৭ সিট। জেনারেল ইয়াহিয়া বংগবন্ধু শেখ মুজিবকে প্রধান মন্ত্রী হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু মানলেন না। তিনি এক নতুন ত্বত্ত দিলেন। সেটা হলো এক দেশ দুই প্রধান মন্ত্রী। ৭১ সালের ২১ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত আলোচনা করেও সব দল সমস্যা সমাধানে একমত হতে পারেনি। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনা বাহিনী ও ভুট্টো আলোচনা ভেঙে দিয়ে পূর্র পাকিস্তানের নিরী্ নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করলো। বংগবন্ধুকে গ্রেফতার করলো পাকিস্তান সেনা বাহিনী। অনেকেই বলেন তিনি পাকিস্তান সেনা বাহিনীর কাছে ধরা দিলেন। আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতারা তখন সবাই ভারতে চলে যেতে শুরু করলেন। অনেকেই বলেন, বংগবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার আগে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেছেন। যা আওয়ামী লীগের নেতারা ছাড়া অন্য কেউ শুনতে বা জানতে পারেনি। ২৬/২৭ মার্চ দেশবাসী হঠাত্‍ আচম্বিতে শুনতে পেল স্বাধীনতার ঘোষণা মেজর জিয়ার কন্ঠে। কালুরঘাট রেডিও স্টেশন থেকে শোনা গেল, আমি মেজর জিয়া বলছি। মেজর জিয়ার সেই ঘোষনা এখন ইন্টারনেটে ইউটিউব এর মাধ্যমে শুনতে পাবেন।

১৬ ডিসেম্বরের পর কাগজ গুলোর সম্পাদকদের প্রায় সকলেই অফিসে অনুপস্থিত। অবজাভার পূর্বদেশ সংবাদ আজাদ সহ আরও কয়েকটি কাগজ সম্পাদক ছাড়া বের হতে লাগলো। বেশ কয়েকজন নিউজ এডিটর যারা নিজেদের বংগবন্ধুর কাছের লোক মনে করতেন বা আওয়ামী লীগের লোক হিসাবে পরিচিত তারা সাহস করে নিজেরাই নিজেদের সম্পাদক হিসাবে ঘোষণা দিলেন। যারা সীমান্তের ওপারে ভারতে যায়নি তারা সবাই ভয়ে ভয়ে দিন কাটছে। অনেকেই আবার সাহস করে ঘোষণা করে দিলেন তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেছেন। সাক্ষী সাবুদও জোগাড় করেছিলেন। আবার অনেকেই যারা ৭১ সালের মে জুন জুলাইতে কাগজের খালি পোস্ট গুলোতে কাজে যোগ দিয়েছিলেন তারা অনেকেই এখন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে পরিচিত। আমার কাগজ পূর্বদেশের সম্পাদক হয়ে গেলেন জনাব এহতেশাম হায়দার চৌধুরী। তিনি ছিলে নিউজ এডিটর। আমার ঘনিস্ঠ ছিলেন। আমিও চীফ রিপোর্টার হিসাবে কাজ করছি। কয়েক মাস পর সম্পাদক সাহেব আমাকে চীফ রিপোর্টারের পদ থেকে সরিয়ে দিলেন। তাঁর ধারনা হয়েছিল  সম্পাদক হিসাবে আমি তাঁর বিরোধিতা করছি। তিনি মনে করতেন আমি গাফফার চৌধুরী সাহেবকে সম্পাদক হিসাবে দেখতে চাই। আসলে আমি এমন কিছুই করিনি। ফলে এক সময় আমি পূর্বদেশ ছেড়ে দিয়ে আমি শেখ মনি সাহেবের কাগজ বাংলার বাণীর অর্থনেতিক সম্পাদক হিসাবে যোগ দিই। এর আগে বাংলার বাণীতে যোগ দিয়েছিলেন সংবাদ পত্র ব্যবস্থাপনার গুরু আনওয়ারুল ইসলাম ববি। তিনি ছিলেন অবজারভারের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক। এক সময় মাত্র ২২ বছরে ববি সাহেব অল পাকিস্তান নিউজ পেপারস এসোসিয়েশনের(এপিএনএস) সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন হামিদুল হক চৌধুরী সাহেবের নাতি। ববি সাহেবই আমাকে বাংলার বাণীতে যোগ দেয়ার জন্যে উত্‍সাহিত করেছিলেন। পরিস্থিতি পরিবেশের কারনে আমরা দুজনই অবজারভার হাউজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। বাংলার বাণীতে আমি মাত্র কয়েক মাস ছিলাম। এ ক’মাস মনি সাহেব আমার সাথে খুবই ভাল ব্যবহার করেছেন। ৭৩ সালের জানুয়ারীতে আমি দৈনিক জনপদে যোগ দিই চীফ রিপোর্টার হিসাবে। সম্পাদক ছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী ও বার্তা সম্পাদক ছিলেন কামাল লোহানী। কাগজের অদৃশ্য মালিক ছিলেন তত্‍কালীন শিল্পমন্ত্রী  এএইচএম কামারুজ্জামান( হেনা সাহেব )। ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন সাবেক কাস্টমস কালেক্টর হাবিব উদ্দিন সাহেব। হাবিব সাহেব হেনা সাহেবের বন্ধু ছিলেন।তিনিই কাগজের জন্যে টাকা পয়সা জোগাড় করতেন। গাফফার ভাই ছিলেন বংগবন্ধুর একজন ভক্ত। তবুও মাঝে মাঝে খুব কড়া ভাষায় তাঁর সমালোচনা করতেন। কামাল লোহানী সাহেব আর আমি ছিলাম ভাসানী হুজুরের ভক্ত। লোহানী ভাইয়ের সাথে বংগবন্ধুরও সুসম্পর্ক ছিল। লোহানী ভাই জনপদে বেশীদিন ছিলেন না। চলে গিয়েছিলেন বংগবার্তায়। বংগবার্তার সম্পাদক ছিলেন ফয়েজ আহমদ। কাগজের উদ্বোধন করেছিলেন মাওলানা ভাসানী। কাগজের মালিক ছিলেন গোলাম কবীর। বংগবার্তা ছিল সরকারের তেতো সমালোচক। ফলে এক সময় গোলাম কবীর সাহেব গ্রেফতার হয়েছিলেন। কাগজের লীড হেডিং ছিল নব্য কোটপতি গ্রেফতার। নোয়াখালীর মানুষ মনে করেছিল নব্বই কোটপতি। গোলাম কবীর সাহেবের চাটগাঁয়ের বাড়ির ছবিও ছাপা হয়েছিল। বলা হয়েছিল বালাখানা। ওই ধরনের বাড়ি এখন ঢাকায় রাম শ্যাম যদু মধুর আছে। রাজধানীতে এখন ১০০/১৫০ কোটি টাকার বাড়িও আছে। ধনীরা অনেকেই দুবাই মালয়েশিয়ায় ভিলা কিনছেন।তবে সময়ের বেশ ফারাক আছে। তখন ছিল ৭৪ সাল, দুর্ভিক্ষের বছর। এখন ২০১১ সাল, ২২ পরিবারের জায়গায় ২২ হাজার পরিবার কোটি কোটপতি পরিবার। এখন এক কাঠা জমির দাম ৩/৪ কোটি টাকা। যাহোক অতি অল্প দিনের মধ্যেই বংগবার্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

স্ত্রীর অসুখের কারনে গাফফার ভাই লন্ডন চলে গিয়েছিলেন। আমাদের জন্যে একজন উপদেস্টা রেখে গিয়েছিলেন। তাঁর নাম মাহবুবুল হক। তিনি ছিলেন বিখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান ও শ্রমিকনেতা।পূর্বদেশের সম্পাদক  ও অবজারভার গ্রুপের ম্যানেজিং এডিটর ছিলেন। নিউজ পেপার ম্যানেজমেন্টে তাঁর মত একজন মানুষের আর জন্ম হবেনা। মাহবুবুল হক সাহেবের সাথে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁরা কোনদিনও তাঁকে ভুলতে পারবেন না। তিনি হেনা সাহেব ও হাবিব সাহেবের বন্ধু ছিলেন। জেলখানা থেকে বের হবার পর তাঁকে জনপদ চালাবার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। জেলখানায় তাঁর শরীর ভেংগে গিয়েছিল। তিনি বলতেন,সারা জীবন গনমানুষের মুক্তির জন্যে কাজ করেছেন। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশী লড়াই করেছেন তিনি। বাংলাদেশ হওয়ার পর সেই মানুষটাকে জেলে যেতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মাহবুবুল হক ৭৪ সালের জুন মাসে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন।গাফফার ভাই লন্ডনে থেকে গেলেন। তিনি এখন স্থায়ীভাবে লন্ডনেই থাকেন।৭৫ সালের জুন মাসে সব কাগজ বন্ধ হয়ে গেলে জনপদ ও বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যাবার আগের সময়টাতে আমি ছিলাম ডেপুটি এডিটর। ব্যবস্থাপনার কাজটা আমিই দেখা শুনা করতাম। আজ সবকথা বলতে পারলামনা। সময় সুযোগ মতো অন্য কোন সময়ে জনপদ সময়ের আরও কিছু কথা বলবো।( নয়া দিগন্ত, ১৩ফেব্রুয়ারী- ২০১১ )

লেখক: কবি সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিক

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »


বাংলাদেশে বর্তমানে মানবাধিকারের হাল হকিকত কেমন তা জানার জন্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অফিসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তরুন সাংবাদিক বন্ধুদের কাছে কমিশনের ঠিকানা বা ফোন নাম্বার জানতে চাইলাম। যে ক’জনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম তাঁরা কেউ বলতে পারলেননা। এমন কি যাঁরা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করার দাবী করেন তারাও পারেননি। দুয়েকজন ঠিকানার ইংগিত দিয়ে বলেছেন ইস্কাটনে জনকন্ঠ অফিসের কাছে হবে। সেখানে গিয়ে জনকন্ঠের আশে পাশে খোঁজ নিলাম। কিন্তু কেউ বলতে পারেননি। নাম শুনে অনেকেই অবাক হয়েছেন। একটি মটর সাইকেলের দোকানের মালিক বললেন, দেখুন আমরা কমিশন এজেন্টস। শুধু মাত্র কমিশন নিয়ে কাজ করি। লোক প্রশাসনের সিকিউরিটি গার্ড বললেন, অফিসটা বেইলী রোডে। সেখানে যাইনি। পরে এনটিভির বন্ধু শহীদ কমিশনের ল্যান্ড ফোনটা জোগাড় করে দিয়েছিলেন। সেদিনই বিকেলের দিকে নিউ ন্যাশন সম্পাদক মজুমদার সাহেব কমিশনের চেয়ারম্যান ড: মিজানের সেলফোন জোগাড় করে দিয়েছিলেন। এসব করতে আমার দুদিন সময় লেগেছিল। ল্যান্ডফোনে কথা বলেছি চেয়ারম্যান সাহেবের পিএসের সাথে। তাঁকে অনুরোধ করলাম চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে আমার সাক্ষাতের সময় নির্ধারন করে আমাকে জানাবার জন্যে। বুধবার সকালে পিএস সাহেবকে অফিসের ঠিকানা জানতে চাইলাম। তিনি জানালেন, চেয়ারম্যানের সাথে তিনি তখনও কথা বলতে পারেননি। আমি বললাম, ড: মিজানের সাথে আমার কথা হয়েছে। তিনি আসতে বলেছেন। পিএস সাহেব ঠিকানা বললেন, ধানমন্ডী ২৭ নম্বর রোডের মীনা বাজারের পিছনে লালমাটিয়া  ডি ব্লকে মাঠের পাশে। বুধবার,মানে ১৪ জানুয়ারী বেলা বারটার দিকে আমি মীনা বাজারের পিছনে গেলাম এবং পিএস সাহেব ফোন করলাম। তিনি বললেন, ডি ব্লকের মাঠের পাশে। কমিশনের অফিস খুঁজে বের করতে আমার আরও এক ঘন্টা লেগে গেল। অফিসটা একটা ফ্ল্যাট বাড়িতে।

আবার একটু পিছনের কথায় ফিরে যাই। প্রেসক্লাবে যখন কমিশনের অফিসের কথা জানতে চাইলাম তখন বন্ধুরা হাসতে হাসতে বললো, ওখানে যেতে হলে মানব হতে হবে। আগে ভেবে দেখুন কমিশন কাদের মানব বলে গণ্য করে বা রাস্ট্র মানব বলতে কি বুঝায়। আমাদের রাস্ট্রের নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। মানে প্রজাদের দেশ। প্রজা শব্দের ইংরেজী মানে সাবজেক্ট। যেমন এক সময় আমরা বৃটিশ সাবজেক্ট ছিলাম। আমরা সাবডিউড ছিলাম। কারণ আমরা বৃটিশ কলোনীর প্রজা ছিলাম। অবাক ব্যাপার হলো রাস্ট্র এখনও আমাদের গণপ্রজা মনে করে। অথচ আমরা  নিজেদের  বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাস্ট্রের নাগরিক মনে করি। কারো প্রজা নই। রাজা থাকলে প্রজা থাকে। আবার রাস্ট্র যদি নিজেকে রাজার উত্তরাধিকার মনে করে তাহলেও প্রজা থাকতে পারে। সারা পৃথিবীতে স্বাধীন দেশের অধিবাসীদের সেই দেশের  নাগরিক বলা হয়। ইংরেজী সিটিজেন শব্দের অর্থ ফ্রি ম্যান। মানে মুক্ত মানব। মানব হচ্ছে তারাই যাদের রাস্ট্র সম্মান করে, মানুষ হিসাবে তাদের সকল মৌলিক অধিকারকে মান্য করে ও সেই অধিকারকে সংরক্ষন করে।বাংলা একাডেমী প্রকাশিত ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে প্রজার অর্থ করা হয়েছে জমিদারের রায়ত, ভাড়াটে বা রাস্ট্রের অধিবাসী। রিপাবলিক মানে একটি রাস্ট্র বা সমাজ যেখানে সকল সদস্য সমান অধিকার ভোগ করে। ওই সদস্যরাই রাস্ট্র চালাবার জন্যে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে। সেদিক থেকে চিন্তা করলে আমাদের রাস্ট্রের নাম হওয়া উচিত ছিল ‘ জনগনতান্ত্রিক বাংলাদেশ’। চলমান নামটি এসেছে তাড়াহুড়ো করে অথবা কলোনিয়াল হ্যাংওভার থেকে। আজ থেকে ৯০/১০০ বছর আগেও বড় বড় মহাজনদের গদির ম্যনেজারকে সরকার বলতো। মানে সরকার মহাজনের ব্যবসাটা দেখাশুনা করে। চট্টগ্রামে সওদাগরের ম্যানেজারকে মুন্সী বলা হতো। মুন্সী মানে শিক্ষিত লোক। শব্দটি ফারসী। যেমন কেরী সাহেবের মুন্সী। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের দাদার নামেও এক সময় মুন্সী লেখা হতো।পরে তিনি জমিদারী কিনে নিয়েছিলেন। বন্ধুরা তাঁকে আদর করে প্রিন্স বলে ডাকতেন। মোগল আমলে কাজীর আদালতের উকিলদের মুন্সী বলা হতো। তাই আধুনিক রাস্ট্রের মালিক যদি জনগণ হয় তাহলে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের সরকার মুন্সী বা ম্যানেজার। জনগণ যদি রাস্ট্রের জমিদার হয়ে থাকে তাহলে সরকার তাদের নায়েব। বৃটিশ আমলে পূর্ব বাংলার জমিদারেরা বেশীর ভাগই থাকতেন কোলকাতা শহরে। নায়েব এবং তার কাচারী জমিদারী দেখাশুনা করতো। এক সময়ে তারা খুবই অত্যাচারী হয়ে উঠেছিল। পাইক পেয়াদা বরকন্দাজ নিয়ে প্রজাদের উপর অত্যাচার চালাতো খাজনা আদায়ের জন্যে। তাদের জেলে দিতো। ভিটে বাড়ি ছাড়া করতো। তাদের যুবতী মেয়েদের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যেতে।তখন রাজা মহারাজা নবাব বাদশাহদের সাত খুন মাফ ছিল খাজনা আদায়র জন্যে তারা যা ইচ্ছা তা করতে পারতেন। দুয়েক জন মানব দরদী জমিদার/শাসক ছিলেন না যে  তা নয়। তবে দরদী হওয়ার ব্যাপারে তাদের কোন আইনী বাধ্য বাধ্যকতা ছিলনা। আধুনিক বাংলাদেশ রাস্ট্রের নায়েব হলেন সরকার। আধুনিক রাস্ট্রেরও পাইক পেয়াদা বরকন্দাজ আছে। যেমন সেনা বাহিনী, পুলিশ, আনসার রেব। ৪৭ সাল থেকে আমরা সেনা বাহিনীর আপন দেশ দখল করা বেশ কয়েক বার দেখেছি। অতি সাম্প্রতিক দেখেছি ১/১১র সরকার। তারা কেন এসেছিলেন আর কেনই বা চলে গেলেন তা আজও দেশবাসী জানেনা। মাঝে দেশের অর্থনীতি প্রচন্ড ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা সারাদেশে হাজার  হাজার গ্রামীন হাট বাজার ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা দেশকে রাজনীতি মুক্ত করতে চেয়েছিল। দূর্ণীতির অভি্যোগে ধনীদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা আদায় করেছে। অনেক জেনারেল এখন ধণীদের কোম্পানীতে উপদেস্টা হিসাবে কাজ করছেন। এতো গেল সেনাবাহিনীর কথা। পুলিশ আনসার আর রেবের কথা বলে শেষ করা যাবেনা।

মানবাধিকার অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ভুমিকা একটু লম্বা হয়ে গেছে বলে আমার মনে হচ্ছে। যা হোক, কমিশনের চেয়ার ম্যান ড: মিজানের সাথে দেখা হয়েছে। বেশ অন্তরংগ পরিবেশে অনেক্ষন কথা হয়েছে। অনেক বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। তিনি নিজেই বললেন, কমিশনের অনেক আইনগত সীমাবদ্ধতা আছে। কোন বিষয়ে মামলা হয়ে গেলে কমিশন কিছু করতে পারবেনা। মামলা হয়নি এমন বিষয়ে কমিশন সমঝোতা করিয়ে দিতে পারে। যেমন মনে করুন, ৫৪ ধারায় পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করে আদালতে চালান দিলো সেক্ষেত্রে কমিশন কিছু করতে পারেনা। কমিশন যদি কোন বিষয় আমলে নিয়ে সংশ্লিস্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি লেখেন তখন ওই কর্তৃপক্ষ উত্তর দেয়, তদন্ত করে প্রতীমান হয়েছে যে এক্ষেত্রে মানবাধিকার ক্ষুন্ন হয়নি। এমতাবস্থায় কমিশনের অবস্থান ও মর্যাদা থানার ওসির নীচে নেমে যায়। ড: মিজান বললেন, রাস্ট্র যদি তার নাগরিক/প্রজাকে মানবের মর্যাদা দেয় অথবা রাস্ট্রের চেয়ে নাগরিকের মর্যাদা বেশী মনে করে তাহলেই মানবাধিকার রক্ষিত হবে। তখন পুলিশ রেব আনসার নাগরিককে মানবের মর্যাদা দিতে বাধ্য হবে। আপনারা নিশ্চয়ই হরহামেশা রাস্তায় দেখে থাকেন ট্রাফিক পুলিশ রিকসাওয়ালাকে লাঠিপেটা করছে। কান ধরে উঠতে বসতে বাধ্য করছে। অথবা কিছু সেলামী নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে। আপনি নাগরিক হিসাবে কিছুই করতে পারবেননা। কিছু বললে, পুলিশ ট্রাফিক আইন ভংগের মিথ্যা মামলা করবে। অথবা পুলিশের দায়িত্ব পালনে বাধা দেবার মামলা করবে। পুলিশকে যদি ধমক দিয়ে কথা বলেন তাহলে তা  রাস্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়বে। কারন মামলা সাজাবার জন্যে পুলিশ বলবে গায়ে হাত তুলেছে। এমতাবস্থায় পুলিশের গায়ে হাত তোলা মানে রাস্ট্রের গায়ে হাত তোলা। বৃটিশ আমলে গ্রামের লাল পাগড়ীওয়ালা হাফপ্যান্ট পরা  চৌকিদার যেকোন লোকের কোমরে দড়ি দিয়ে ধরে থানায় নিয়ে আসতে পারতো।কেউ এর প্রতিবাদ করতে পারতেনা।করলেই জেল জুলুম। কারন গ্রামে চৌকিদার রাস্ট্রের প্রতীক।   এখন সে কাজটা করে পুলিশ সরাসরি। যেকোন সময় একজন সাব ইন্সপেক্টর ৫৪ ধারায় অথবা সন্দেহজনক ভাবে ঘোরাফিরা করার  অভিযোগে যেকোন নাগরিক/প্রজাকে ধরে থানায় নিয়ে পিটাতে পারে। কারন পুলিশ রাস্ট্রের সেবক। তার মর্যাদা নাগরিকের অনেক উপরে। নাগরিকতো এখনও প্রজা। সম্প্রতি উত্তরা এলাকার একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করতে চাই। উনেছি এক ভদ্রলোক গাড়ি পার্ক করে খাবার দেকানে গিয়েছন কিছু কিনতে। এমন সময় একটি মাইক্রোবাস এসে গাড়িতে ধাক্কা দিয়ে গাড়ির ক্ষতি করে। ড্রাইভার এসে প্রতিবাদ করায় তাকে মারধর করে জানায় পার্কিংয়ের জায়গাটা রেবের। গাড়ির মালিক দোকান থেকে বেরিয়ে জটলা দেখে জানতে চাইলেন কি হয়েছে। তখন সাদা পোষাক পরা এক ভদ্রলোক ক্ষিপ্ত অবস্থায় বললেন, তোর কি প্রয়োজন। গাড়ির মালিক ভদ্রলোক, যিনি একজন সফ্টওয়ার ইন্জিনিয়ার বা প্রোগ্রামার বললেন, আপনি এমন অভদ্র ভাষায় কথা বলছেন কেন? সাদা পোষাক এবার ইন্জিনিয়ার সাহেবের জামা ধরে ধস্তাধস্তি করতে লাগলেন এবং বললেন, আমি কে এখনি তোকে দেখাচ্ছি। সাদা পোষাকধারী ভদ্রলোক ফোন করে পোষাক পরিহিত রেবের কয়েকজন সদস্যকে ডেকে আনলেন। তাঁরা এসে ইন্জিনিয়ার এবং তাঁর ড্রাইভারকে তুলে নিয়ে রেব  একের  ক্যাম্পে নিয়ে রেবের ক্ষমতা দেখালেন। ইন্জিনিয়ার সাহেব এবং তাঁর ড্রাইভারের মোবাইল ফোন আটক করলেন যাতে তাঁরা কোন যোগাযোগ করতে না পারেন। বিলম্ব দেখে এবং ফোনে যোগাযোগ করতে না পেরে তাঁর পরিবার থানায় ডায়েরী করেছেন। চারিদিকে খোঁ খবর নিয়ে জানা গেল ইন্জিনিয়ার সাহেব এবং তাঁ ড্রাইভার উত্তরা রেবের  এক নম্বর ক্যাম্পে আছেন। কিন্তু রাত আটটা পর্যন্ত তাঁর আত্মীয় স্বজন কেউ তাঁর সাথে যোগাযোগ করতে পারেননি। রাত ন’টার দিকে তাঁদেরকে অসুস্থ ও রক্তাক্ত অবস্থায় উত্তরা থানায় হাজির করা হয়। অভিযোগ ছিল অভিযুক্তরা রেবের গায়ে হাত তুলেছে। ব্যাজ ছিঁড়ে ফেলেছে। আইনের দৃস্টিতে এটা মারাত্মক অপরাধ। কারন এটা রাস্ট্রের গায়ে হাত দেয়ার সামিল। অভিযোগ পত্রে সাক্ষরকারী একজন হাবিলদার স্বীকার করেছেন যে তাঁরা ইন্জিনিয়ার ভদ্রলোকের গাড়িতে ধাক্কা লাগিয়ে গাড়ির ক্ষতি করেছেন এবং ক্ষতিপুরণ দিতে চেয়েছেন। গাড়ির মালিক তাতে রাজী না হয়ে রেবের চড়াও হয়ে মারধর করেছেন। থানায় নেয়ার পর তাদের চিকিত্‍সার জন্যে রাত বারটায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। আপনারা বুঝতে পারছেন যে, ইউনিফর্ম মানে মানে রাস্ট্র এবং সার্বভৌম ক্ষমতা। ঘটনাটি উল্লেখ করলাম শুধু আপনাদের বুঝাবার জন্যে নাগরিকের মর্যাদা কতটুকু। গাড়িতে ধাক্কা দিয়ে,গাড়ির ক্ষতি করে, গাড়ির মালিক ও ড্রাইভারকে নির্যাতন করে তাঁদের বিরুদ্ধেই থানায় অভিযোগ দায়ের করে রেব। ইন্জিনিয়ার সাহেব ও তাঁর ড্রাইভারকে অসুস্থ অবস্থায় সারা রাত থানায় রাখার পর  পুলিশ পরের দিন তাঁদের কোর্টে চালান দেয়। মামলা দূর্বল হওয়ায় তাদের জামিন পান। কিন্তু মামলা চলবে। এই ঘটনা থেকে আপনারা সবাই শিক্ষা নিতে পারেন। নাগরিক হিসাবে আপনার কোন ক্ষমতা নেই। কারন রাস্ট্রের আইনী দৃস্টিতে আপনি মানব নন।  কমিশন গঠিত হয়েছে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপে। ইউএনডিপি প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিবে। এর মানে হচ্ছে রাস্ট্র জাতিসংঘ ও ইউএনডিপির কথা মতো চলবে। তাহলেই নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষা পাবে। 

‘বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে রাস্ট্রের মৌলিক উদ্দেশ্য হলো একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিস্ঠা করা যেখানে সকল নাগরিকের জন্য সমতা সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিস্ঠার নিশ্চয়তা থাকবে।কমিশন মনে করে যে, বাংলাদেশ এমন একটি গনতান্ত্রিক রাস্ট্র হবে যেখানে সকল মানুষের মৌলিক মানবাধিকার এবং মর্যাদা সুনিশ্চিত হবে। এই উদ্দেশ্যসমূ্হ  বাস্তবায়নের জন্য মানবাধিকার কমিশন প্রতিস্ঠিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রীতি নীতি  সনদের বাংলাদেশ একটি স্বাক্ষরকারী দেশ।’ এই কথা শুনে আপনারা কি ভাবছেন জানিনা। আমি ভাবছি, রাস্ট্র জাতির কাছে কথাগুলো ওয়াদা করেছে কাগজে কলমে। যেমন আপনি কোথাও একটি চুক্তি করলেন।পরে তা মানলেন না। চুক্তির অন্যপক্ষ শক্তিশালী হলে আপনার বিরুদ্ধে মামলা করবে। মামলা চলতে থাকবে। যাঁর টাকা বেশী তিনি মামলা চালিয়ে যাবেন। যিনি দূর্বল তিনি কিছুদিন পর আর মামলা চালাতে পারবেনা। যেমন একজন ভাড়াটিয়াকে বাড়ির মালিক জোর করে উচ্ছেদ করলো। ভাড়াটয়া কি করবে? মামলা করবে। মামলা চলতে থাকবে। একজন সাংবাদিককে পত্রিকার মালিক বকেয়া না দিয়ে বা ন্যায্য পাওনা পরিশোধ না করে চাকুরীচ্যুত করলো। সাংবাদিক বন্ধু কি করবেন? তিনি শ্রম আদালতে যাবেন। মামলা চলতে থাকবে। ততদিন সাংবাদিক বন্ধু কি বেকার থাকবেন?

যদি কেউ আপনাকে প্রশ্ন করেন রাস্ট্র বড় না নাগরিক বড়? আপনি নিশ্চয়ই অবাক হবেন এই ভেবে যে, এ আবার কি ধরনের প্রশ্ন?  আমি মনে করি নাগরিক বড়। মানুষ বড়। মানুষ থাকলেইতো রাস্ট্র থাকবে। ইতিহাসের নজর দিলে দেখবেন মানব জাতির বিকাশ কিভাবে হয়েছে। এক সময় রাস্ট্র রাজ্য বা দেশ কিছুই ছিলনা। জোর যার মুল্লুক তার। সবল দূর্বলকে শাসন করতো। আস্তে আস্তে সাধারন মানুষ মানুষ বুঝতে পেরেছে, সংগঠিত হয়েছে। তখন থেকেই রিপাবলিকের ধারনা এসেছে। রাস্ট্র কিভাবে চলবে তা নিয়ে সাধারন মানুষ চিন্তা করলো। তারই ফসল হলো আজকের গণতন্ত্র ও নির্বাচন। কিন্তু গনতন্ত্র এখনও নিরাপদ নয়। যার কাছে শক্তি আছে সেই গনতন্ত্রকে দখল করে রাখে। যেমন ফিলিপাইনের সিভিল ডিক্টেটর মার্কোস। ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো। মিশরের বর্তমান ডিক্টেটর মোবারকী। চলমান বিশ্বে ফ্যাসিস্ট রাস্ট্রও আছে। এইসব মানুষকে ভয়ের মধ্যে রেখে, ভীতি সৃস্টি করে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে চায়।বাংলাদেশের চলমান গনতন্ত্র ও শাসন ব্যবস্থা কোন অবস্থায় আছে তা আশা করি পাঠক সমাজই বলবেন।( নয়া দিগন্ত, ৩০ জানুয়ারী,২০১১ ) বিডিনিউজ২৪.কম , ৩১শে জানুয়ারী ২০১১

লেখক: কবি সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিক

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »


স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছে একটি সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার রাস্ট্র হিসাবে। শুরুতে আমাদের প্রিয় বন্ধু ছিল সোভিয়েত রাশিয়া আর ভারত। এই বন্ধুত্ব প্রতিস্ঠিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে। তখন এই দুটি দেশই আমাদের সমর্থন জানিয়েছে। ফলে স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশকে ভারত ও রাশিয়াকে খুশী করার জন্যে সমাজতান্ত্রিক নীতি অনুসরন করতে হয়েছে। ভারত নিজে কিন্তু তখন আধা সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসাবে চলছিল। বংগবন্ধু নিজে এবং তাঁর দল কখনই সমাজতান্ত্রিক ছিলনা। সমাজতন্ত্র ছিল আওয়ামী লীগের জন্যে একটা ফ্যাশান। ৭০ সালে আওয়ামী লীগ ছিল একটি বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল। মাওলানা ভাসানীর ন্যাপ বা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ছিল একটি সমাজতান্ত্রিক দল। আদর্শের কারণেই ৫৭ সালে আওয়ামী লীগ ভাগ হয়ে যায়। তখন আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের কেন্দ্রে ও পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন। কেন্দ্রে সোহরাওয়ার্দী সাহেব প্রধানমন্ত্রী ও পূর্ব পাকিস্তানে আতাউর রহমান সাহেব চীফ মিনিস্টার। পররাস্ট্র নীতির প্রশ্নে দ্বিমত হয়ে মাওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ন্যাপ গঠন করেন। তখন থেকেই আমরা আওয়ামী লীগকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আমেরিকার দালাল হিসাবে চিনি। সেই আওয়ামী লীগ হঠাত্‍ করে ৭২ সালে সমাজতান্ত্রিক দলে পরিণত হলো। ফলে ব্যান্ক বীমা পাট বস্ত্র সহ বড় বড় সব শিল্প কারখানা জাতীয়করন করা হলো। ছোট পুঁজি ছাড়া বাকী সব পুঁজির মালিকানা চলে গেল সরকারের হাতে। ধরতে গেলে বেসরকারী পুঁজির বিকাশ বন্ধ হয়ে গেল। ভারতে কিন্তু তখনও সরকারী ও বেসরকারী সব পুঁজির বিকাশের পথ খোলা ছিল। রাশিয়া ও ভারতের ভুল পরামর্শে শেষ পর্যন্ত বংগবন্ধু বহু দলীয় গনতান্ত্রিক পথ পরিহার করে একদলীয় সরকার পদ্ধতিতে ফিরে গেলেন। যা দেশের মানুষ কখনই আশা করেনি। জিয়া সাহেব ক্ষমতায় এসে আবার বহুদলীয় গনতন্ত্র চালু করেন। ফলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের কার্যক্রম শুরু করে।

মিক্সড ইকনমি চালু হলে সরকারী বেসরকারী বিনিয়োগের পথ মুক্ত হয়ে গেল। বাংলাদেশের বন্দী অর্থনীতি মুক্তি লাভ করে বিকাশের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। বেসরকারী বিনিয়োগের সিলিং বা সীমা বাড়তে শুরু করলো। বাংলাদেশী কল কারখানার মালিকদের প্রতিস্ঠান গুলো ফেরত দেয়া হলো। শেয়ার বাজার খুলে দেয়া হলো। জিয়া সাহেব বেসরকারী খাতে ব্যান্ক ও বীমা প্রতিস্ঠার উদ্যোগ নিলেন। প্রাচীন পন্থি রক্ষ্মণশীল আমলা ও বামপন্থি দলগুলো বেসরকারী পুঁজির বিকাশের বিরোধিতা করলেন। এরশাদ সাহেব ক্ষমতায় এসে ৮৩ সালে বেসরকারী খাতে ব্যান্ক ও বীমা প্রতিস্ঠা করার পথ খুলে দিলেন।সরকারের উচ্চ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যান্ক ব্যান্ক প্রতিস্ঠার জন্যে উদ্যোক্তদের কাছ থেকে দরখাস্ত আহবান করলো। যতদূর মনে পড়ে তখন বাংলাদেশ ব্যান্কের গভর্ণর ছিলেন সাবেক সচীব নুরুল ইসলাম সাহেব। তিনি অত্যন্ত বিনীত মানুষ ছিলেন।জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের(এনবিআর) চেয়ারম্যান ছিলেন সাগুফতা বখত চৌধুরী( এস বি চৌধুরী নামে বহুল পরিচিত)। প্রশ্ন উঠলো উদ্যোক্তাদের পুঁজির সুত্র বা আয়কর নিয়ে নিয়ে। নুরুল ইসলাম জানালেন,ওই অবস্থায় সূত্র বা আয়করের কথা উঠলে ব্যান্ক প্রতিস্ঠা বিঘ্নিত হবে। তাই এনবিআর আর কোন বাধা দিলনা। প্রচন্ড উদ্বোধনী শক্তির অধিকারী বিশিস্ট ব্যান্কার মুজিবুল হায়দার চৌধুরী তখন পুবালী ব্যান্কের জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন। তিনি চিন্তা করলেন সরকারী ব্যান্কের চাকুরী ছেড়ে বেসরকারী ব্যান্ক প্রতিস্ঠার উদ্যোগ নিবেন।তাঁর বন্ধুরা তাঁকে পরামরশ দিয়েছিলেন ব্যান্কের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হওয়ার জন্যে। কিন্তু তিনি ভাবলেন প্রথম বেসরকারী ব্যান্কের প্রতিস্ঠাতা হওয়ার জন্যে। যেমন ভাবলেন তেমন করলেন। সম্ভবত: ৮২ সালের শেষের দিক। তিনি চাকুরী ছাড়লেন। ব্যান্ক প্রতিস্ঠার জন্যে প্রথমেই বসার জায়গা বা অফিসের জন্যে চেয়ার টেবিল নিয়ে বসলেন উত্তরা মটর্সের  কর্ণধার মোখলেস সাহেবের দিলখুসার অফিসে। তিনি একা। বিকেলের দিকে তাঁর কিছু ভক্ত আসতো টুকটাক কাজ করে দেয়ার জন্যে। প্রধানতম কাজ ছিল উদ্যোক্তা জোগাড় করা। বাংলাদেশ ব্যান্কের নিয়ম অনুযায়ী ব্যান্কের জন্যে মোট মূলধন লাগবে ছয় কোটি টাকা। তন্মধ্যে তিন কোটি টাকা নগদ বা পরিশোধিত। তখন দেশে পুঁজির বিকাশ মাত্র শুরু হয়েছে। বাংগালিদের ভিতর যারা পাকিস্তান আমলেই কল কারখানা ও ব্যান্ক বীমার মালিক ছিলেন তাঁরা তখন নানা ধরনের কস্টে ছিলেন। তাঁরা তাদের কল কারাখানা, ব্যান্ক বীমা ফেরত পাওয়ার জন্যে তদবীরে নামলেন। ইন্ডেন্টিং, ক্লিয়ারিং ফরওয়ার্ডিং, পুরাণো কাপড় আমদানী, ওভার ইনভয়েসিং বা আন্ডার ইনভয়েসিং, ফলস ডিক্লারেশন দিয়ে যারা কিছু টাকা কামিয়েছিলেন তাঁরা ভয় ভয়ে এগিয়ে এলেন ব্যান্কের উদ্যোক্তা হওয়ার জন্যে। কিন্তু সাদা টাকা কই? সরকার বললেন, ঠিক আছে এখন সাদা টাকা লাগবেনা। আগে ব্যান্ক হোক, তারপর দেখা যাবে। কিন্তু তাতেও তিন কোটি টাকা পাওয়া যাচ্ছেনা। উদ্যোক্তা বা পরিচালক হওয়ার জন্যে প্রথম দিকে ২৫ লাখ টাকা করে চাওয়া হয়েছিল। মাত্র কয়েকজন ২৫ লাখ টাকা সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু কিছুতেই তিন কোটি টাকা জোগাড় হচ্ছিলনা। বাধ্য হয়ে বলা হলো ১০ লাখ টাকা হলেও চলবে। চৌধুরী সাহেব ছিলেন খুবই আবেগী মানুষ। তাই আমাদের যাকেই কাছে পেতেন বকাবকি করতেন। এমন কি উদ্যোক্তাদেরও ধমক ধামক দিতেন। সবাই তাঁ সামনে কাঁচুমাচু করতো। আমার উপরও দায়িত্ব ছিল উদ্যোক্তা জোগাড় করার। শেষ পর্যন্ত ২৬ জনের কাছ থেকে তিন কেটি টাকার ব্যবস্থা করা হলো। শুনেছি এমন অনেকেই ছিলেন যারা চেক দিয়েছিলেন,কিন্তু একাউন্টে টাকা ছিলনা।যা হোক শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারী ব্যান্কের জন্ম হলো। নাম হলো ন্যাশনাল ব্যান্ক লিমিটেড(এনবিএল)। দরখাস্তে নাম দেয়া হয়েছিল ন্যাশনাল ব্যান্ক অব বাংলাদেশ লিমিটেড। এই নামের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যান্ক আপত্তি জানায়। এনবিএল এর প্রথম শাখা খোলার জন্যে বাড়ী ভাড়ার জন্যে দায়িত্ব পড়েছিল আমি আর আমার প্রিয় বন্ধু মরহুম মোহাম্মদ আলীর উপর। বাড়ীটা ছিল ৪৮ দিলখুশা। এখনও সেখানে প্রধান শাখাটি আছে। শুরুতে এখানে ছিল হেড অফিস। ব্যান্কের প্রতিস্ঠাতা ম্যানেজিং ডিরেক্টর মুজিবুল হায়দার চৌধুরী এখানেই বসতেন। ইতোমধ্যে উত্তরা মোটর্সের অফিস থেকে এনবিএল এর অস্থায়ী অফিস মতিঝিলের হক ম্যানশন বা হক চেম্বারে স্থানান্তরিত হয়েছে। চৌধুরী সাহেব সেখানেই বসতে শুরু করলেন। এখানে ছিল বর্তমানে আইসিসি’র সভাপতি মাহবুবুর রহমান সাহেবের অফিস। ৪৮ দিলখুশার বাড়ীর মালিকের সাথে কথা বলার জন্যে যাওয়ার সময় চৌধুরী সাহেব বললেন, ভাড়া যা চাইবে রাজী হয়ে যাবে। ক’দিন পর এখানে আর জায়গা পাবেনা। ৪৮ দিলখুশার শাখার সাজানোর কাজ করেছিলেন ইন্জিনিয়ার মিলন সাহেব। ব্যান্কের বর্তমান লোগোটা করেছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী পাশা ভাই। রাজধানী ঢাকায় পাশা ভাইয়ের আরও অনেক স্কাল্ফচারের কাজ আছে। ব্যান্কের শ্লোগানটাও ছিল চৌধুরী সাহেবের দেয়া।

ইতোমধ্যে সিটি ব্যান্কের অনুমিতি পেয়ে গেছে আনোয়ার গ্রুপের আনোয়ার সাহেব তাঁর বন্ধুরা। অনুমতি নেয়ার ব্যাপারে আনোয়ার ভাই সাহায্য নিয়েছিলেন খায়রুল কবীর সাহেবের। তিনি ছিলেন বিখ্যাত সাংবাদিক। তিনিই ছিলেন ব্যান্কের প্রধান উপদেস্টা। আমরা জানতে পারলাম সিটি ব্যান্ক যে কোন সময় শাখা খোলার ঘোষণা দিতে পারে। আমি তখন ক’দিনের জন্যে সিংগাপুর গিয়েছিলাম। চৌধুরী সাহেব জরুরী বার্তা পাঠালেন ঢাকায় ফিরে আসার জন্যে। বললেন, এক ঘন্টা বিলম্ব করা যাবেনা। আমি ফিরে এলাম। তিনি বললেন, সবার আগে ৪৮ দিলখুশার শাখাটি খুলে ফেলতে চান। সিদ্ধান্ত হলো মিলাদ পড়িয়ে শাখা খোলা হবে। সাথে সাথে সব কাগজে বিজ্ঞাপন চলে গেল। এই অন্য একটা বিষয়ে কিছু কথা বলি। চৌধুরী সাহেব বললেন তিনি প্রথমেই একজন পিআরও নিয়োগ করবেন। আমার কাছে নাম জানতে চাইলেন। আমি আমার পরম বন্ধু মোহাম্মদ আলীর নাম বললাম। তিনি সংগে সংগে রাজী হয়ে গেলেন। পজিশন ও বেতন ঠিক হলো। আমি বললাম একটি গাড়ি ফুলটাইম দিতে হবে। তাতেও তিনি রাজী হয়ে গেলেন। কারণ তিনি পিআরএর গুরুত্ব বুঝতেন। আমি মোহাম্মদ আলীকে খবর দিলাম । সে তখন উত্তরা ব্যান্কে চাকুরী করতো। সেও রাজী হয়ে গেল। মোহাম্মদ আলীই ছিল এনবিএল এর প্রথম নিয়োগ প্রাপ্ত অফিসার। আমার বন্ধু মোহাম্মদ আলী পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ পিআর ম্যান হিসাবে নাম করেছিল। এনবিএল এর বর্তমান প্রশাসন ব্যান্কের ইতিহাস কতটুকু জানেন তা আমি জানিনা। চাকুরীর ইন্টারভিউতে যদি প্রশ্ন করা হয় এনবিএল এর লোগো আর শ্লোগান কে তৈরী করেছেন তাহলে ১০০ ভাগ চাকুরী প্রার্থী বলতে পারবেনা। এমন কি সিনিয়ার পজিশনের লোকেরাও হয়ত জানেনা। ব্যান্কের মালিক বা উদ্যোক্তারাও হয়ত চান না এনবিএল এর ইতিহাস জানতে। যতদূর মনে পড়ে ৮৩ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারী এনবিএল এর প্রথম শাখা খোলা হয় এবং এই দিনকেই প্রতিস্ঠা দিবস হিসাবে গননা করা হয়। তবে আমার ভুলও হতে পারে।

ব্যান্ক প্রতিস্ঠার এক বছর পার না হতেই চৌধুরী সাহেবের সাথে নানা বিষয়ে উদ্যোক্তদের দ্বিমত দেখা দেয় ও মন কষাকষি শুরু হয়। চৌধুরী সাহেবের সমস্যা হলো তিনি খুবই ইমোশনাল মানুষ। নিজের ইমোশনকে সব কিছুর উপরে গুরুত্ব দেন। মনে এবং হৃদয়ে যা ভাবেন তাই করতে চান। আর উদ্যোক্তারা হলেন ব্যবসায়ী মানুষ। তাঁদের লক্ষ্য হলো লাভ এবং লাভের উদ্দেশ্যে নানা কাজ করা। অনেকেই দশ বিশ লাখ টাকা দিয়ে পরিচালক হয়েছেন ভিজিটিং কার্ডে নিজের পরিচিতি ব্যবহার করার জন্যে। তখন দেখেছি অনেক পরিচালক গন ঢাকা চট্টগ্রামে নিজের কাজে আসা যাওয়া করলেও ব্যান্কের সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করতেন। তবে ব্যতিক্রম ছিল খুবই কম। শুরুতে বহু পরিচালক ব্যান্ক থেকে কোটি কোটি টাকা ধার নিয়ে তা আর শোধ করতে পারেননি।ফলে তাদের পরিচালক পদ চলে গেছে। চৌধুরি সাহেবের কিছু দোষও আছে বা ছিল।তিনি সবাইকে বিশ্বাস করতেন। ফলে অনেকেই তাঁর বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েছেন। তিনি নিজেকে ব্যান্কের কর্মচারী ভাবতেননা। ভাবতেন তিনি সবার মুরুব্বী। সবাই তাঁর কথামত চলবে। আরেকটি দোষ হলো,যারা তাঁর কথা শুনবে বলে মনে করতেন বা মনে করেছেন শুধু তাঁদেরকেই পরিচলক হিসাবে বাছাই করেছেন। এরা ছিল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ব্যান্কের পরিচালক হওয়াটা ছিল তাঁদের জন্যে আকাশের চাঁদ পাওয়া। ৮৩ সালের শেষের দিকেই চৌধুরী সাহেবকে এনবিএল ছেড়ে দিতে হয়েছিল। কারন, পরিচালক পরিষদে তাঁর সমর্থক সংখ্যা কম ছিল।শেরাটন/কন্টিনেন্টালে অনুস্ঠিত এনবিএল এর সেই রাতের পরিচালনা পর্ষদের কথা আমি আজও ভুলতে পারিনা। কেমন করে তাঁরা চৌধুরী সাহেবকে এনবিএল থেকে বিদায় দিতে পারলো তা ভেবে আমার মন এখনও শিউরে উঠে। কিন্তু চৌধুরী সাহেব একটুও দমে যাননি। এরপরেও তিনি সরকারী ব্যান্কের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হওয়ার প্রস্তাব পেয়েছিলেন। কিন্তু গ্রহন করেননি।

এরপরে আমি তাঁকে ইনভেস্টমেন্ট ব্যান্ক বা পাইকারী ব্যান্ক প্রতিস্ঠার পরামর্শ দিলাম। ভারতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যান্কে গিয়ে ইনভেস্টমেন্ট সংক্রান্ত যাবতীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে নিয়ে এলাম। বাংলাদেশ ব্যান্কও তখন পাইকারী ব্যান্ক সম্পর্কে তেমন ওয়াকিবহাল ছিলনা। বিদেশ থেকে আরও অনেক কাগজ জোগাড় করা হয়েছিল। চৌধুরী সাহেব উদ্যোগ নিলেন ন্যাশনাল ক্রেডিট কমার্স এ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানীর জন্যে। আবার তিনি উদ্যোক্ত সংগ্রহের কাজে নামলেন। উদ্যোক্তাদেরও এই ধরনের আর্থিক কোম্পানী সম্পর্কে কোন ধারনা ছিলনা। ধারনা রাখার মতো জ্ঞানও তাদের ছিলনা। তাঁরা সবাই অন্ধ ভাবেই চৌধুরী সাহেবের আহবানে সাড়া দিয়েছিল। ন্যশনাল ব্যান্কের কিছু পরিচালক যাদের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল তাঁরা এই কোম্পানীতেও বিনিয়োগ করলেন। এনসিসিআই প্রতিস্ঠিত হলেও কেন্দ্রীয় ব্যান্কের সীমাহীন হস্তক্ষেপের কারনে আর্থিক কোম্পানী চালানো কস্টকর হয়ে পড়লো। প্রতিদিন নানা ধরনের বাধা বিপত্তির মাঝে আর্থিক কোম্পানী মুখ থুবড়ে পড়তে লাগলো। তখন আর্থিক কোম্পানি ছিল মাত্র দুটি। অপরটির নাম বিসিআই। এই কোম্পনীর উদ্যোক্ত ছিলেন মরহুম মোস্তাফিজুর রহমান ও তাঁর বন্ধুরা। আমি তখন মর্ণিং সানে কাজ করি। বিসিআই দেউলিয়া হয়ে যাবে এরকম একটি খবর ছাপা হলে প্রতিস্ঠানটি চালানো কঠিন হয়ে গেল এবং সরকার দুর্ণীতির অভিযোগ এনে বিসিআই বন্ধ করে দিলেন। এনসিসিআইও বন্ধ করে দেয়া হবে এই মর্মে ঘোষণা দিলেন মরহুম সাইফুর রহমান সাহেব। ফলে আমানতকারীরা টাকা তুলতে প্রতিস্ঠানে ভিড় জমাতে লাগলো। এমতাবস্থায় চৌধুরী সাহেব তাঁর কয়েকজন বন্ধু বান্ধবকে নিয়ে তত্‍কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা এনসিসিআইকে বন্ধ হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচালেন এবং শেষ পর্যন্ত সরকার এনসিসিআইকে বাণিজ্যিক ব্যান্কে কনভার্ট করার অনুমতি দিলেন। ব্যান্ক প্রতিস্ঠিত হওয়ার কিছুদিন পরেই পরিচালকরা তাঁর বিরুদ্ধে লেগে গেলেন। ফলে তিনি এনসিএল ছেড়ে দিলেন।( নয়া দিগন্ত, ১৫ জানুয়ারী,২০১১ )

কবি সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক ( ershadmz40@yahoo.com)

Read Full Post »