Feeds:
Posts
Comments

Archive for February, 2013


প্রিয় পাঠক বন্ধুগণ, ঠিক এই মূহুর্তে, মানে এই লেখাটি তৈরি করার সময় আমি মানসিক ভাবে খুবই অসুস্থ। কলম দ্বারা আমার মনের অবস্থা বুঝানো একেবারেই অসম্ভব। মন বা হৃদয়ের অবস্থা শব্দ বিশ পঁচিশ ভাগ প্রকাশ করতে পারে। তাই আমার প্রাণপ্রিয় কবি মাওলানা রূমী বলেন, শব্দহীনতার শব্দ। সময়হীনতার মাঝে বসবাস করা। আমার মালিক মহান আল্লাহপাক বলেছেন,তোমরা সময়কে গালি দিওনা,আমিই সময়। চলমান সময়ের ঘটনাবলী আমাকে কাহিল করে ফেলেছে। বহুদিন থেকেই আমি আমার প্রিয়জনদের বলে যাচ্ছিলাম,আমার এখানে কোন কাজ নেই।আল্লাহপাকের কাছে থেকেও কোন নির্দেশ পাচ্ছিনা। এখানে থেকে যাওয়া মানে এই বয়সে আরও গুণাহর ভাগীদার হওয়া।
মুক্তিযুদ্ধ ও বংগবন্ধুকে আমি অনেক কাছে থেকে অনেক ঘনিষ্ট ভাবে দেখেছি। ৭১ সালে আমার বয়স ৩১। ২৫শে মার্চ রাতে অবজারভার হাউজে আটকা পড়েছিলাম। ২৭শে মার্চ সকালে কয়েক ঘন্টার জন্যে কারফিউ উঠে গেলে বাসার দিকে রওয়ানা হলাম দৌড়াতে দৌড়াতে। মনে হচ্ছিল রিকসায় গেলে দেরি হয়ে যাবে। রাস্তায় তেমন রিকসাও ছিলনা। সবাই আতংকেই দৌড়াচ্ছে। আমার বাসা ছিল শান্তি নগরে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কাছে। রাতেই জানতে পেরেছিলাম সেনাবাহিনী রাজারবাগ আক্রমন করেছে। সেখানে আগুন দিয়েছে। অবজারভারের ছাদ থেকে দেখা যাচ্ছিল সারা ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় আগুন জ্বলছে। বিশেষ করে সকল বস্তিতেই সেনাবাহিনী আগুন দিয়েছে। আমি ভাবছিলাম, বাসায় গিয়ে আমার স্ত্রী আর প্রিয় সন্তান রনিকে দেখতে পাবো কিনা। রাতের আগুনে পুড়ে গিয়েছে কিনা। বাসায় গিয়ে দেখলাম দুই বছরের রনি আর তার মা খাটের নীচে লুকিয়ে আছে। ২৫শে মার্চ রাত থেকেই ওরা ওই খাটের নীচে ছিল। আমার ডাকা ডাকিতে সাড়া দিচ্ছিলনা। ভয়ে হুঁশহারা হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বাস করতে পারছিলনা আমি ফিরে এসেছি। রনির জন্যে একটা ট্রাই সাইকেল কেনার কথা ছিল। কিন্তু সেটা আর কেনা হয়নি। বলেছিলাম , সবকিছু ঠান্ডা হলে তোমাকে সাইকেল কিনে দেবো। পুরো রনি জানতে চাইতো সবকিছু ঠান্না হয়েছে কিনা। ও ঠান্ডা শব্দটি উচ্চারন করতে পারতোনা।
অবজারভার অফিসে আর ফিরে যাইনি। কিন্তু ঢাকা ছেড়ে কিভাবে কোন পথে পালাবো ঠিক বুঝতে পারছিলামনা। রাস্তায় মিলিটারি টহল দিচ্ছে। রাস্তায় চেকপোস্ট বসেছে। জীবনতো আর থেমে থাকেনা। মানুষ বাঁচার তাগিদেই ঘরের বাইরে আসে বা যায়। যারা দিন মুজুর তাদেরতো বের হতেই হবে। এর আগে অবজারভার অফিসে থাকতেই ২৬শে মার্চ রাতে শুনেছিলাম চট্টগ্রাম থেকে কোন এক মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে। আমরা রেডিওতে টিউনিং করে অনেক চেষ্টা করেও ঘোষণা শুনতে পাইনি। ২৭শে মার্চ রাতে প্রথম নিজকানে শুনতে পেলাম মেজর জিয়ার ঘোষণা। তিনি সংসদের মেজরিটি দলের নেতা এবং তখনকার একচ্ছত্র নেতা বংগবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্ববাসীকে আহবান জানিয়েছেন,স্বাধীনতার যুদ্ধকে সমর্থন দেয়ার জন্যে।
জানুয়ারী থেকেই একজন সিনিয়র সাংবাদিক হিসাবে রাজধানী ঢাকার রাজনৈতিক ঘটনাবলী আমি দেখেছি। ৭০এর নির্বাচনে মাওলানা ভাসানী সাহেব নির্বাচন না করার ফলে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলার দুটি সীট বাদে বাকি সব সীট মানে ১৬৭টি জয়লাভ করে। ফলে সমস্যাটা খুবই প্রকট হয়ে উঠে। আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে কোন সীট পায়নি। একই ভাবে ভুট্টোর দল পূর্ব পাকিস্তানে কোন সীট পায়নি। ক্ষমতায় আছে সামরিক জান্তা। নির্বাচনে জয়লাভ করেছে দুটি রাজনৈতিক দল,যারা কোন ধরনের সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। সমঝোতার ব্যাপারে ভুট্টো ছিলেন খুবই অনমনীয়। ফলে পুরো বিষয়টার ভিতর তৃতীয় শক্তি ঢুকে পড়ে। তৃতীয় শক্তির খেলাতেই সমঝোতার সকল পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। শেখ সাহেব শেষক্ষণ পর্যন্ত সমঝোতার চেষ্টা করে গেছেন। শুনেছি , ২৫শে মার্চ দুপুর পর্যন্ত শেখ সাহেব সমঝোতার দলিলে স্বাক্ষর করার জন্যে অপেক্ষা করেছিলেন। বরং শেখ ২৬শে মার্চ হরতাল ডেকেছিলেন বলে শুনেছি। না, জেনারেল ইয়াহিয়া বংগবন্ধুর সারল্যের সাথে বেঈমানী করে পূর্ব বাংলার নিরী্হ জনগণের উপর আক্রমনের নির্দেশ দিয়ে ইসলামাবাদ চলে যান। ২৫শে মার্চ রাতেই ভুট্টো ঢাকা ত্যাগ করে চলে যান।
মেজর জিয়ার ঘোষণার পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত দেশবাসী জানতে পারেনি পূর্ব বাংলার ভাগ্যে কি ঘটেছে। শেখ সাহেব চলে গেলেন পশ্চিম পাকিস্তান। মানে সেনাবাহিনী তাঁকে ২৫শে মার্চ রাত বারোটার দিকে গ্রেফতার করে ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে যায়। আর আওয়ামী লীগ নেতারা দিশেহারা হয়ে ,কোন উপায় না দেখে ভারতের দিকে চলে যান। দেশে থেকে গেলে সেনাবাহিনী তাঁদের গ্রেফতার করবে, না হয় হত্যা করবে। তাই ভারতে না যেয়ে উপায় ছিলনা। পাকিস্তান সেনা বাহিনী ২৫শে মার্চ রাতে নির্বিচারে সারা ঢাকায় হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। ২৭শে মার্চ সকালে আমরা রাস্তায় বহু লাশ দেখেছি। জিয়ার ঘোষণার পর দেশবাসী বুকে সাহস পেলো। আস্থা ফিরে পেল। বুঝতে পারলো, পাকিস্তানী সেনা বাহিনীকে প্রতিহত করা হবে। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধের মানসিক প্রস্তুতি। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে অবশ্যই মোকাবিলা করতে হবে। পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা দিলো শেখ সাহেব তাদের হেফাজতে আছেন। এবং পাকিস্তানের ইংরেজী কাগজ দৈনিক ডনে শেখ সাহেবের ছবি ছাপা হলো সম্ভবত ৪ঠা এপ্রিল। মজিব নগর সরকার গঠিত হয়েছিল ১৭ই এপ্রিল। অপরদিকে মেজর জিয়া তাঁর অধিনস্ত সৈনিক ও অফিসারদের নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে মোকাবিলা করেই সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব ঘটনার সামান্য কিছু কথা লিখলাম আমাদের সন্তানদের জন্যে। এখন শুনতে পাচ্ছি মেজর জিয়া ছিলেন পাকিস্তান সেনা বাহিনীর এজেন্ট বা চর। তিনি গোয়েন্দা হিসাবেই কাজ করেছেন। বংগবীর বাঘা সিদ্দিকী নাকি ৭১এ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন,এখন নব্য রাজাকার। আর কাদের সিদ্দিকী সাহেব বলেছেন, তিনি যদি রাজাকার হয়ে থাকেন তাহলে বংগবন্ধু ছিলেন রাজাকারের কমান্ডার। নব্য রাজাকার কারা তার ঘোষণা দিচ্ছে প্রজন্ম চত্বর থেকে আমাদের সন্তানরা। ৫ই ফেব্রুয়ারী থেকে শাহবাগকে হেড কোয়ার্টার করে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ হয়ে গেছে। এ যুদ্ধে চেতনাই নাকি হাতিয়ার। তরুণরা বলছে তারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি,তাই চেতনা দেখার জন্যে চত্বরে যাচ্ছে। মাথা ব্যান্ড বেঁধে,শ্লোগান দিয়ে, গাণ গেয়ে নেচে নেচে তারা মুক্তিযুদ্ধ করছে। এখন নাম দিয়েছে গণ জাগরণের মঞ্চ। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসীর দাবীতেই নাকি তারা মঞ্চ সাজিয়েছে। শুরুতে তাদের দাবী ছিল শুধু একটি- কাদের মোল্লার ফাঁসী চাই। আদালতের রায় মানিনা। এখন তাদের অনেক দাবী। দিন দিন দাবীর তালিকা বাড়ছে। এমন কি একজন সম্পাদককে গ্রেফতার করার জন্যেও তারা দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। শাহবাগে নতুন প্রজন্মের দিনকাল ভালোই যাচ্ছিল। হঠাত্‍ শুনা গেল,দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের সিপাহ সালার বা জেনারেলদের কেউ কেউ নাস্তিক এবং আল্লাহপাক সুবহানুতায়ালা, তাঁর শ্রেষ্ঠতম রাসুল (সা),ইমামুল মুরসালীন ও কালামে পাক আল কোরআনের বিরুদ্ধে অশ্লীল ও অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করে ইন্টানেটের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছে। এ খবরতি নাকি প্রথম ফাঁস করে দেয় ভারতের ইংরেজী কাগজ টাইমস অব ইন্ডিয়া। হেডিং ছিল ‘এ্যান্টি ইসলামিক ব্লগার কিল্ড’। ব্লগার রাজীব নিহত হওয়ার পর ওই খবরটি ছাপা হয়। এর পরে তা ছাপা হয় সরকারপন্থী কাগজ দৈনিক ইনকিলাবে। তারপরে ছাপা হয়েছে আমার দেশ, নয়া দিগন্ত ও সংগ্রামে। প্রজন্ম চত্বরের নেতা ব্লগাররা অনেকদিন থেকেই ধর্মহীনতার পক্ষে লিখে যাচ্ছে। তাদের কাছে ধর্ম মুক্তমনের বিরোধী। তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে ধর্মহীনতা। ৭১এ নাকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল সেক্যুলার বা ধর্মহীন। যাদের চেতনা এখন সেক্যুলার বা ধর্মহীন নয় তারা নাকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারন করতে পারবেনা। আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে তাহলে আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি বা করেছি তারা কি ভুল জেনেছে। আমিতো দেখেছি বহু মুক্তিযোদ্ধা নামাজের সময় হলে বা আজান শুনলে সাথে সাথে অজু করে নামাজ আদায় করেছে। যারা নামাজ পড়েনি তারাও কখনই বলেনি নামাজ পড়া যাবেনা। সেক্টর কমান্ডাররাও বলেননি মুক্তিযুদ্ধ সেক্যুলার বা ধর্মহীন। বহু মাদ্রাসার ছাত্রও মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে। তবে একথা সত্যি যে, যারা সেক্যুলার বা ধর্মহীন বা ধর্ম নিরপেক্ষ তারা হয়ত মুক্তিযুদ্ধকে সেভাবে দেখেন বা ব্যাখ্যা করেন। মুক্তিযুদ্ধ কখনই বাংলাদেশের মানুষকে সেক্যুলার বানাবার যুদ্ধ ছিলনা। বাংলাদেশের মানুষ কখনই ধর্মহীন বা ধর্ম বিরোধী ছিলনা। বরং আমি ৭১এ দেখেছি পাকিস্তানী সৈনিকরা কারফিউর সময়ে মসজিদে ঢুকে মুসল্লীদের গুলি করেছে। তখন আমি সমাজে এবং বন্ধুদের কাছে বামপন্থী হিসাবে পরিচিত ছিলাম। ছাত্রাবস্থায় ছাত্র ইউনিয়ন করেছি। পরে মাওলানা ভাসানীর ন্যাপকে সমর্থন করতাম। সংবাদে চাকুরী করেছি অবজারভারের চাকুরী ছেড়ে দিয়ে। এখন আমাদের সন্তানরা জানতে চায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আছে কিনা? আমরা সেক্যুলার কিনা? প্রজন্ম চত্বরের সাথে একাত্মতা ঘোষণা না করলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থাকবেনা। তাই শুরুতেই নিজের আবেগের কথা প্রকাশ করেছি। ১৫/১৬ বছরের ছেলে মেয়েরা বাবা মাকে প্রশ্ন করে মুক্িযুদ্ধের চেতনা আছে কিনা। চেতনা না থাকলে কাদের সিদ্দিকীর মতো নব্য রাজাকার হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি শাহবাগ যাও, মাথায় ব্যান্ড বা পট্টি বাঁধো। লাল সবুজের জামা গায়ে দাও। আমি আমার সন্তানদের সারল্য ও নিষ্পাপ অবুঝ আবেগকে ভালবাসি। কিন্তু তাদেরকে কে বা কারা অমন পথে পরিচালিত করছে হেমিলনের বংশীবাদকের মতো। কারা আজ বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা তুলেছে। নাস্তিক আস্তিকের কথা তুলেছে। কারা নতুন প্রজন্মকে ধর্মহীনতার মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে।
আবার সামান্য একটু পেছনের দিকে যেতে চাই। ৬৯ এর গণ আন্দোলনের সময় ১১দফা ও ৮দফার কথা মনে পড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা দিয়েছিল ১১ দফা দাবী। ছাত্র সংগ দিয়েছিল ৮দফা। ফলে ধর্মবাদীরা বা ধর্মপন্থীরা ৮দফার পক্ষে চলে গেল। আমি ছিলাম ১১ দফার পক্ষে। সারা জিলায় ঘুরে ঘুরে ১১দফার পক্ষে জনসভা করেছি। মাওলানা ভাসানী ও শেখ সাহেব সহ অনেক রাজনৈতিক দল ১১দফাকে সমর্থন দিয়েছিল। প্রতিদিনই এ নিয়ে সারাদেশে চলছিল প্রচন্ড টেনশন। কোথাও কোথাও মারামারি। সে সময়ে শুনেছি পতাকা অবমাননার কথা, কোরআন পোড়ানোর কথা। তখন ১১ দফার সমর্থকদের বিরুদ্ধে সরকার ও ইসলামপন্থি দল গুলো এসব অভিযোগ এনেছিল।
এবারও শুনতে পাচ্ছি সেসব পুরাণো কথা। পুলিশ মসজিদে ঢুকে মুসল্লীদের হামলা চালিয়েছে। গোলাগুলি করেছে। শুনতে পাচ্ছি , পুলিশ এ পর্যন্ত ১৯ জন আলেম ও সাধারন মানুষকে গুলি করে হত্যা করেছে। আসামী করে গ্রেফতার করছে জামাত আখ্যা দিয়ে ইসলামী নেতাদের গ্রেফতার করছে সরকার। ব্লগার বলে পরিচিত ইসলাম বিরোধী নাস্তিক প্রজন্ম নেতাদের পক্ষ নিয়েছে সরকার। সংসদে নাস্তিককে শহীদ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। পাকিস্তান আমলে সরকার সব সময় ইসলামের নামে জিগির তুলতো। তখন আমেরিকানরাও ইসলামী দলগুলোকে সমর্থন করতে প্রগতিশীলদের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পর সরকার কৌশলে প্রজন্ম চত্বর বানিয়েছে, নাস্তিকদের পক্ষ নিয়েছে, ধর্মের পক্ষের মিডিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আমরা কখনই শুনিনি কোন গণ জাগরণ সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে হতে পারে।
আজ আমি সরকার সহ সকল রাজনৈতিক দলকে জাতীয় ঐক্যের উদ্যোগ নেয়ার আহবান জানাচ্ছি। এদেশে কোন ভাবেই বিভেদকে উসকিয়ে দেয়া যায়না। বিভেদ সৃষ্টিকারীরা দেশের বাইরে থেকে খেলছে। তারা চায় বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তাদের ফায়দা লুটতে। এদেশে কেউ কারো শত্রু নয়। এক ভাষা, এক সংস্কৃতি,এক চেহারা, সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া এক ধর্ম। তাহলে জাতীয় ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠা করতে বাধা কোথায়? এমত হওয়ার জন্যে আমরা যাত্রা শুরু করি। রাজনৈতিক সুবিধা আদায় বা নির্বাচনে জয়লাভের জন্যে নিজের দেশকে দাবার গুটি হিসাবে ব্যবহার করবেননা। প্রজন্ম চত্বরের নেতাদের বলবো, তোমরা জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার ডাক দাও, দেশের ১৬ কোটি লোকই তোমাদের সাথে থাকবে। এখন যা করছো তা ইতোমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে। ইসলামী দল ও ১৮ দলীয় জোট তোমাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। গায়ের জোরে,কিছু আবেগপূর্ণ শ্লোগান দিয়ে তোমরা বেশীদূর এগোতে পারবেনা।
তোমরা শুধু একবার তোমরা দক্ষিণ আফ্রিকার মানবতাবাদী বিশ্বনেতা নেলসন ম্যান্ডেলার কথা ভাবো। সাদা শাসকদের জেলে তিনি ২৬ বছর ছিলেন। জেল থেকে বেরিয়ে জগত্‍ বিখ্যাত ভাষন দিলেন। বললেন, সাদারাও এদেশের সন্তান। তাদেরও সমান অধিকার। যে লোকটি তাঁকে জেলে রেখেছিলেন তাঁকে নিয়েই ম্যান্ডেলা সরকা গঠণ করলেন। তিনি যদি শুধু ইশারা করতেন তাহলে লাখ লাখ সাদা দাংগার শিকার হতো। ম্যান্ডেলা তা করেননি। কারণ তিনি খুবই উঁচু মানের একজন মানবতাবাদী নেতা।
তোমরা স্মরণ করো আমাদের মহানবীর(সা) কথা।তাঁর মদীনা সনদ বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। তিনিই জগতের প্রথম গণমানুষের রাস্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। মদীনায় তিনি ছিলেন মহাজের। তিনি ছিলেন মাইনরিটি। শুধুমাত্র মেধা মনন ও নেতৃত্বের গুণে তিনি মদীনার ইহুদী ও নাছারাদের মদীনা চুক্তিতে আবদ্ধ করেছিলেন। মদীনা রাস্ট্রের সকল নাগরিক রাসুলকে(সা) মদীনা রাস্ট্রের প্রধান হিসাবে মেনে নিয়েছিল।
বাংলাদেশ আজ রাজনৈতিক ভাবে দ্বিধা বিভক্ত। খুবই ধ্বংসাত্মক এই বিভক্তি। বিভক্তির এই মানসিকতা থাকলে বাংলাদেশ টিকবেনা। তখন বংগবন্ধু বা জিয়া কেউই থাকবেননা। আমি দেশবাসীকে বলবো ,আপনারা জাতি হিসাবে আপনাদের বায়া দলিল খুঁজুন। আসল দলিল ছাড়া নকল দিয়ে বেশীদিন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবেননা। আপনাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে আপনাদের পূর্ব পুরুষের নব্বই ভাগই এক সময় মনুসংহিতায় বর্ণিত অচ্যুত,হরিজন বা আনটাচেবল ছিলেন। দেখতে মানুষ হলোও ধর্মীয়ভাবে তাদের মানবিক মর্যাদা ছিলনা। তারা ছিল দাসের চেয়েও অধম। এক সময় তারা অমানবিক জীবন থেকে মুক্তিলাভের জন্যে সাম্যবাদী ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এটা ছিল তাদের জন্যে একটা বিপ্লব। মানুষ হয়ে উঠার বিদ্রোহ। তাই আজ আপনারা স্বাধীন একটি ভুখন্ডের মালিক। শত শত বছরের অপেক্ষার পর, আপনাদের পূর্ব পুরুষের সীমাহীন ত্যাগের ফলেই আজ আপনি একটি স্বাধীন দেশের সম্মানিত নাগরিক। পূর্ব পুরুষদের ত্যাগকে জানুন, মানুন এবং জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করুন। আবারও বলছি,খুবই ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলছি, জাতি হিসাবে নিজেদের বায়া দলিল রক্ষা করুন। মিস্টি কথার বন্ধুদের কথায় বিভ্রান্ত হবেননা।

Advertisements

Read Full Post »


আমরা দেখছি শাহবাগে তরুণদের একটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তরুণদের বুদ্ধি পরামর্শ দেয়ার জন্যে সেখানে নিয়োজিত আছেন কিছু পরিচিত চেহারা। তরুণদের সরকার চালানোর জন্যে চেনামুখ গুলো সামনে আসছেনা। শুরুতে শুনেছিলাম,তরুণরা শুধু যুদ্ধাপরাধিদের ফাঁসী চায়। এখন সকল রাজাকারের ফাঁসী চায়। এখন জামাত আর শিবিরকে নিষিদ্ধ করতে চায়। সাথে ইসলামী অর্থনীতি বন্ধ করতে চায়। আবার শাহবাগ বলছে কিছু কাগজ, টিভি ও অনলাইন মিডিয়া বন্ধ করতে হবে। বিশ্ববাসী শাহবাগে একটি গণজাগরণ দেখলো যা সরকারের পক্ষে। সরকার চায় বাংলাদেশ থেকে ইসলাম উত্‍খাত করতে। শাহবাগও তাই চায়।
কেউ যদি দাবী তোলে ইহুদী,খৃষ্টান, হিন্দূ ও বৌদ্ধ অর্থনীতি বন্ধ করতে হবে।তখন কি হবে। ইহুদীদের সকল মিডিয়া বন্ধ করে দিতে হবে। পাকিস্তান আমলে বলেছি , অবাংগালীদের ব্যবসা বাণিজ্য দখল করে নিতে হবে। তাই পহেলা মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত বহু অবাংগালী প্রতিষ্ঠান লুট হয়েছে। যারা লুট করেছে তারা এখন বাংলাদেশের ধনী। সমাজতান্ত্রিক কারণে অনেকেই অবাংগালীদের প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক নিযুক্ত হয়ে দুটো পয়সা কামিয়েছেন। সবাই এখন স্বাধীন বাংলাদেশের সম্মানিত সামাজিক ব্যক্তিত্ব।
এখন পাকিস্তান নাই,তাই তরুণদের সারল্যকে কাজে লাগিয়ে বলা হচ্ছে ইসলামিক ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করে দাও এবং সরকার যেন ইসলামিক ব্যবসা গুলো দখল করে নেয়। তরুণদের ক’জন নেতা আবার নাস্তিক। তারা আল্লাহ, রাসুল(সা),কোরআনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। সেই যুদ্ধকে সমর্থন দিয়েছে সরকার। আমরা ভাবতে পারিনা বংগবন্ধুর কন্যা ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে এমন অবস্থান নিতে পারেন। আওয়ামী লীগ আসলে এ রকমই। দলই ধর্ম, দলই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।
তরুণদের সরকারের সুবিধা হলো তারা শুধু শ্লোগান দিবে,আর সংগে সংগে সংসদে আইন পাশ হয়ে যাবে। ৭২ সালের দিকে চার খলিফার নাম শুনেছি। তারা যা নির্দেশ দিতেন তাই হতো। ১১ দফার সময়েও নেতারা অবাংগালী ফার্মের কাছ থেকে বন্ধুত্ব গ্রহণ করতেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বিভিন্ন হলে ডানপন্থী নেতাদের ধরে নিয়ে সম্মান করা হতো। সীমা অতিরিক্ত সেবা ও মেহমানদারীর ফলে অনেকেই অসুস্থ হয়ে বিদায় নিয়েছেন। অনেকেই সুন্দরী মেয়েদের বিয়ে করেছেন। আমার শহরেও ৭২এ এমন ঘটনা ঘটেছে। একজন বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা এলাকায় ফিরে প্রথমেই তার মনের কন্যাটাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন

শাহবাগে নাকি দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। এই যুদ্ধের নাকি প্রথম শহীদ নাস্তিক থাবাবাবা। মানে তিনি থাবা মারলে কেউ বাঁচবেনা দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের জেনারেল এই থাবাবাবা বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সালাম ও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। জাতীয় পতাকায় ঢেকে থাবাবাবাকে মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দেয়া হয়েছে। ২১ বার তোপধ্বনি হয়েছে কিনা জানিনা।
এ পর্যন্ত যা শুনে এসেছি বা জেনে এসেছি তাতে মনে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ যারা করেনি বা দেখেনি তাদের জন্যেই নাকি শাহবাগের এই বিরাট সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। আর তা হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। চেতনা শব্দটি চালু করেছে আওয়ামী লীগ ও সেই ঘরাণার বুদ্ধিজীবী ও গবেষকরা। এর মানে হলো আওয়ামী লীগে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। অথবা শুরু থেকেই আওয়ামী লীগে তেমন মুক্তিযোদ্ধা তেমন ছিলনা। চেতনা জিনিষটা কি তা আপনি স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন করতে পারেন। কেউ বলেন,আওয়ামী লীগকে সমর্থন করলেই আপনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমৃদ্ধ হতে পারেন। চেতনার এটা একটা ধাপ। অপর ধাপটি হলো আপনাকে ধর্মহীন হতে হবে। ইংরেজীতে যাকে বলা হয় সেক্যুলারিস্ট। মানে ধর্মের যার কোন আগ্রহ নেই। ধর্ম বাদ দিয়ে জীবন চালাতে চান। তৃতীয় ধাপ হলো রাস্ট্রকে ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে অথবা রাস্ট্রকে ধর্মহীন হতে সাহায্য করবেন।
বিষয়টা খুবই জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে বাংলাদেশে ধর্মহীন রাজনৈতিক চেতনার ধারক ও বাহক কারা? খোলা চোখে দেখছি ধর্মহীন চেতনার নেতৃত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগ,যে দলটির এক সময় নাম ছিল আওয়ামী মুসলীম লীগ। সভাপতি ছিলেন মাওলানা ভাসানী। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন আওয়ামী লীগে কি তাহলে ধর্মপ্রাণ মানুষ নেই? আমি বলবো নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু তাঁরা মনে করেন ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয়। রাজনীতির সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। যেমন এক সময় চীন রাশিয়া এবং তাদের ভক্ত দেশ গুলো ধর্ম নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। যুক্তি ছিল ধর্ম মানুষকে অন্ধ করে দেয়। যুক্তিহীন করে দেয়। ধর্ম প্রগতির বিরুদ্ধে। অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ওইসব দেশে মসজিদ ও গীর্জায় তালা লেগে গিয়েছিল। রাস্ট্রের ভয়ে বড়রা ধর্ম চর্চা ছেড়ে দিয়েছিলেন। নবীনরা ধর্মচর্চা একেবারেই ভুলে গিয়েছিল। চীন রাশিয়া আবার ধর্মের স্বাধীনতায় ফিরে গেছে। এখন সেখানে ধর্মচর্চা শুরু হয়েছে। রাস্ট্র ধর্মচর্চায় সহযোগিতা না করলেও বাধা দিচ্ছেনা। ইউরোপ আমেরিকায় ধর্মচর্চা বন্ধ হয়নি।
আওয়ামী লীগ জন্মের পর থেকে বলে আসছে কোরাণ ও সুন্নাহ বিরুদ্ধে কোন আইন করবেনা। কিন্তু রাজনৈতিক দল ও সংগঠণ হিসাবে বর্তমান আওয়ামী লীগের ঝোঁক ধর্মহীনতার দিকে। আওয়ামী লীগ এক বিস্ময়কর রাজনৈতিক দল। রাস্ট্রধর্ম ইসলাম মানে, আবার সেক্যুলারিজম বা ধর্মহীনতাও চায়। ধনবাদী গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা চায়, আবার সমাজতন্ত্রও চায়। আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দী সাহেব বলেছিলেন,পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলা ৯৮ ভাগ স্বায়ত্ব শাসন পেয়ে গেছে। বংগবন্ধু সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ওই বক্তব্য সমর্থন করেছিলেন। স্বাধীন নিরপেক্ষ পররাস্ট্র নীতির প্রবক্তা ছিলেন মাওলানা ভাসানী। দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক মানিক মিয়া সাহেব মাওলানা সাহেবকে লাল মাওলানা বলে গালি দিতেন। এক সময়ে সোহরাওয়ার্দী সাহেব ও বংগবন্ধু মিলে মাওলানা সাহেবকে আওয়ামী লীগ থেকে বের করে দিয়েছিলেন। সর্বদলীয় রাস্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ছিলেন মাওলানা ভাসানী। শেখ সাহেব ছিলেন জেলে। তিনি জেল থেকেই রাস্ট্রভাষার আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে আপনারা অলি আহাদ সাহেব ও বদরুদ্দিন ওমর সাহেবের বই পড়তে পারেন। এক কথায় বলা যেতে পারে পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশের যত আন্দোলন হয়েছে শুরুতে আওয়ামী লীগ এর বিরোধিতা করে দলীয় চরিত্রের কারণে। পরে গোয়েবলসীয় কায়দায় ঢোল বাজাতে থাকে তারাই আন্দোলনটা করেছে।
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্ব শাসনের দাবী সর্ব মহলে গৃহীত হলে শেখ সাহেব ছয় দফা দিয়ে বাজার গরম করলেন। শেখ সাহেবের চরিত্র ছিল তিনি সকল অবস্থায় জনপ্রিয় থাকতে চাইতেন। যেমন জয়বাংলা শ্লোগানটা জয় হিন্দের পরিবর্তে। প্রথমে তিনি এই শ্লোগান দিতে চান নি। সিরাজুল আলম খানেরা ওই শ্লোগান তাঁর মুখে তুলে দিয়েছে। মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের পতাকা তিনি হাতে নিতে চাননি, আসম আবদুর রব তাঁর হাতে তুলে দিয়েছেন। এর পরেও তিনি ৭ই মার্চের ভাষণের্ শেষে বলেছিলেন, জয়বাংলা ও পাকিস্তান জিন্দাবাদ। আমি মাঠে ছিলাম, নিজকানে শুনেছি। এমন কি সর্বশেষ মূহুর্তে, মানে ২৫শে মার্চ রাত এগারটায় তাজউদ্দিন সাহেব লিখে টেপ রেকর্ডার সহ বংগবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িতে গিয়েছিলেন স্বাধীনতার ঘোষণা রেকর্ড করতে। তিনি রাজী হননি। বরং বলেছেন,তোরা আমাকে রাস্ট্রদ্রোহী বানাতে চাস। পাকিস্তানের আদালতেও তিনি বলেছেন, তিনি স্বাধীনতার ঘোষনা দেননি।ড.ওয়াজেদ তাঁর বইতে বলেছেন,রাত ১২টা পর্যন্তও বংগবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। এখন আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার চ্যাম্পিয়ন। শুধু আওয়ামী লীগই স্বাধীনতার আন্দোলন করেছে। আর কেউ কিছু করেনি। সাজেদা চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কেউ থাকতে পারবেনা। অন্য কেউ যদি এদেশে থাকতে চায় তাহলে আওয়ামী লীগ হয়ে থাকতে হবে। কল্পনা করুন, জামাতে ইসলাম যদি আগামী কাল নাম পরিবর্তন করে বলে আমরা হলাম আওয়ামী জামাতে ইসলাম। তাহলে কি হবে? তখন বংগবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ওয়াজেদ বলবেন, জামাতের ভিতর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এসে গেছে।
মিশরের ফোরাউন তার দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলতো, হে আমার দেশবাসী, মুসা নবুয়তের দাবী করে। সে একজন গরীব অযোগ্য মানুষ। সে দাবী করে আল্লাহর নবী। আমিইতো খোদা। তোমাদের কি আর খোদা আছে? জনগণ ভয়ে বলতো, না আমাদের খোদা তুমিই। আমি প্রাণ দিতে পারি, নিতেও পারি। মুসার আল্লাহ কি পারে? প্রাণ ভয়ে জন সাধারন বলতো , না পরেনা। আমি খাওয়া বন্ধ করে দিলে তোমরা কি খেতে পারবে? না পারবো না। তাহলে স্বীকার করো, আমিই তোমাদের খোদা। চলমান সরকারের সংসদে দুই তৃতীয়াংশ সিট আছে। তাই ষখন তখন আইন বানাচ্ছে। শাহবাগে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আছে। সাথে যোগ হয়েছে সংসদের চেতনা। ব্যস আর যায় কৈ? মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে যেমন ইচ্ছা তেমন আইন তৈরী হচ্ছে। কিছু লোককে ফাঁসী দিতে হবে , কিছু রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করতে হবে। রাস্তা বলবে অমুকের ফাঁসী চাই,সংগে সংগে সংসদে আইন পাশ হয়ে যাবে।
৭১ সালে অশিক্ষিত পাকিস্তানী মিলিশিয়ারা রাস্তায় লোকজনকে ধরে জিজ্ঞাসা করতো,তুম মুসলমান হ্যায়? লোকজন দলবেধে বলতো,হাঁ মুসলমান হ্যায়। সবুদ ক্যায়া হ্যায়? কালেমা বললে অনেককে ছেড়ে দিতো। আবার সময় কাপড় খুলে দেখতো। সে সময় আবার এসে গেছে মনে হয়। আওয়ামী লীগ ও তার সরকারী বাহিনী রাস্তাঘাটে জানতে চাইবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আছে কিনা। জয় বাংলা বা জয় বংগবন্ধু বলে চেতনার প্রমান দিতে হবে। কাপড় তুলে দেখাতে হবে আপনি সেক্যুলার কিনা? আওয়ামী রাজনীতির মূলমন্ত্র হলো গোত্র বা কৌম প্রীতি। নিজেরা যা ভাবে তাই অকাট্য সত্য। ভীড় দেখলেই আওয়ামী লীগ সেখানে ঝাপিয়ে পড়ে, মবোক্রেসিতে বিশ্বাস করে। এই দেখুন না, থাবাবাবা ছদ্ধ নামের এক তরুন নাস্তিক খুন হয়েছে। কোন কিছুর খোঁজ খবর না নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দৌড়ে চলে গেলেন তাঁর বাড়িতে সমবেদনা জানাবার জন্যে। সংসদে সবাই হৈ হৈ করে বলে উঠলেন নাস্তিক থাবাবাবা শহীদ হয়েছে। শহীদ শব্দটা কি তা আওয়ামী জানেনা। এখন হিন্দুরাও এই শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করেছে। থাবাবাবা কোরআন, রাসুল(সা) ও আল্লাহপাকের বিরুদ্ধে যা লিখেছে তা এ পর্যন্ত দেশে বিদেশে অন্য ধর্মের লোকেরাও লিখেনি। থাবাবাবা স্বঘোষিত একজন ধর্মহীন ব্লগার। তারপরেও আওয়ামী লীগ তাকে বীর শহীদ খেতাব বা তগমা দেয়ার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে। সংসদে আইনমন্ত্রী বলেছেন,থাবাবাবা খুব ভাল একটা ছেলে। সে ধর্মহীন কোন কাজ করতে পারেনা।
আমি এর আগে আমার লেখায় শাহবাগের অবুঝ মহা উদ্দীপ্ত তারুণ্যের প্রতি সম্মান জানিয়েছি। তরুণরা কারো দ্বারা ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে তাও বলেছি। সরকার ও আওয়ামী লীগ মা বাবা, মুরুব্বী, অভিবাবক ও শিক্ষকের দায়িত্ব পালন না করে তাদের উসকিয়ে দিয়েছে নিজেদের হীন রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে। প্রধানমন্ত্রী তরুণদের মা বাবার উত্‍কন্ঠা অনুভব করতে পারেননি। কারণ, তাঁর সন্তানেরা কেউই বাংলাদেশে থাকেনা, দেশে লেখাপড়াও করেনি। আমি বেশ ক’জন মা বাবা ও মুরুব্বীর সাথে আলাপ করেছি। তাঁরা অতীব দু:খের সাথে বলেছেন ছেলে মেয়েরা আগের জামানার মতো মা বাবার শোনেনা। তারা পড়ালেখা না করেই জাতীয় বীর হতে চায়। তারা নাকি আগামী দিনের রাস্ট্র নায়ক হবে। দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের নায়ক ও শহীদ হবে। শহীদ হলে জাতীয় পতাকা ও স্যেলুট দিয়ে দাফন করা হবে। তারা জানাজা চায়, দাফন হতে চায়,আবার নাস্তিকও হতে চায়।
আদালতের একজন বিচারক একটি দৈনিক পত্রিকার খবর ফটোকপি করে বিচারকদের ভিতর বিলি করেছেন সেজন্যে তাঁর শাস্তি দাবী করেছেন আওয়ামী নেতারা। বিচারপতিদের সব সময়ই আওয়ামী লীগ নানাভাবে হেনস্থা করে। আদালত আক্রমন করে। আদালত এলাকায় মেথরদের নিয়ে হাজির করে। কি অপরাধ বিচারপতি মিজানের তা দেশবাসী জানতে চায়। বিচারপতি সামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক সাহেব কাগজ দেখে নিজেই উদ্যোগ নিয়ে বিচারের ব্যবস্থা করেন। তখন তিনি কোন অপরাধ করেন না। কারণ তিনি নাকি আওয়ামী লীগ করেন। তাঁর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আছে। তাঁকে নিয়ে মাঝে মাঝে সংসদও গরম হয়ে উঠে। কিন্তু তাঁর কোন অপরাধ হয়না। বিচারপতি একটি কাগজের ফটোকপি করে কয়েকজন বিচারপতি দিয়েছেন তাই তাঁর অপরাধের শেষ নাই। সমস্যা হচ্ছে ভদ্রলোক বিএনপি আমলে বিচারপতি হয়েছেন।
লেখক: কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »


শাহবাগের রাজনীতি ও তরুণ সমাজ / এরশাদ মজুমদার

শাহবাগ ঢাকার নবাবদের জায়গা ছিল এক সময়। ঢাকার প্রথম থ্রীস্টার হোটেল ছিল হোটেল শাহবাগ। এখানেই সরকারী বে সরকারী বড় বড় অনুষ্ঠান গুলো হতো। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুসলীম লীগ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। পিজির সামনে রাস্তার পাশে যেখানে পুবালী ব্যান্ক আছে তা ছিল মুসলীম লীগের অফিস। পেছনে ছিল হোটেল শাহবাগ। হোটেলকে বংগবন্ধু পিজি হাসপাতালে রূপান্তরিত করেন। যা এখন বংগবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত। যে জায়গায় সারা ভারতের মুসলীগের জন্ম হয়েছে সেখানেই তরুণ সমাজ গণ জাগরণের ডাক দিয়েছে। এটা খুবই আনন্দের খবর। বাপদাদারা এখানে মিলিত হয়েছিল নিজেদের দাবী দাওয়া আদায়ের কৌশল নির্ধারনের জন্যে। প্রশ্ন উঠতে পারে কেন মুসলীম লীগ গঠণের প্রয়োজন হয়েছিল। ভারতবাসীর দাবী দাওয়া আদায়ের জন্যে ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কংগ্রেসইতো যথেষ্ট ছিল। কংগ্রেসের হিন্দু নেতারা যদি একটু উদার হতেন তাহলে মুসলমানদের জন্যে আরেকটি রাজনৈতিক দল মুসলীম লীগ গঠণের কোন প্রয়োজনই ছিলনা। প্রায় ২১ বছর কংগ্রেসের ভিতর থেকে মুসলমানেরা চেষ্টা করেছিল নিজেদের দাবী দাওয়া তুলে ধরার জন্যে। কংগ্রেস নেতারা বলতেন,আমরা সবাই ভারতবাসী। ভারতবর্ষ বহু জাতির দেশ। মুসলমানরা আলাদা কিছু নয়। কিন্তু মুসলমান নেতারা তা মানতে রাজী হননি। কিন্তু জিন্নাহ সাহেব শুরুতে কংগ্রেসে থেকেই দাবী দাওয়া নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন। ১৯১৩ সাল পর্যন্ত তিনি কংগ্রেসেই ছিলেন। পরে তাঁর ভুল ভাংলে তিনি মুসলীম লীগে যোগ দেন। অখন্ড ভারতে মুসলমানরা ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠি। ১২০০ সাল থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত মুসলমান রাজা বাদশাহ নবাবরাই দিল্লীকে রাজধানী করে ভারত শাসন করেছেন। এ সময়ে ফার্সীই ছিল ভারতের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ভাষা। ১৭৫৭ সালে হিন্দুদের সহযোগিতায় ইংরেজরা বংগদেশ দখল করে নেয়। ১৮৫৮ সালে দিল্লী দখল করে সারা ভারত তাদের কব্জায় নেয়। ১৭৫৭ সাল থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত একশ’বছর ভারতে আলেম সমাজ ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ফলে ইংরেজ শাসন আমলে মুসলমানরা তাদের শত্রু থেকে যায়। মুসলীম গঠণের পেছনে এটাই ইতিহাস।
১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন আওয়ামী মুসলীম লীগ গঠিত হয় মাওলানা ভাসানী ও শামসুল হকের নেতৃত্বে। মুসলীম লীগের গণতান্ত্রিক নেতা কর্মীদের নিয়ে নতুন দল গঠিত হয়েছিল পুরাণো ঢাকার রোজ গার্ডেনে। মাওলানা সাহেব ছিলেন আসাম মুসলীম লীগের সভাপতি। কেন নতুন রাজনৈতিক দল আওয়ামী মুসলীম লীগ গঠণ করতে হয়েছিল তা বংগবন্ধুর আত্মজীবনীতে সুস্পষ্টভাবে তিনি উল্লেখ করেছেন। মাওলানা সাহেব জনসভায় বলতেন,ওতা হচ্ছে খাজা গজার সরকারী মুসলীম লীগ আর এটা হচ্ছে জনগণের মুসলীম লীগ। সে সময়ে মুসলীম লীগের বিরুদ্ধে কথা বলা কঠিন ছিল। ঢাকায় জনসভা করতে হয়েছিল ঢাকার সর্দারদের সমর্থন নিয়ে। বংগবন্ধু ছিলেন আওয়ামী মুসলীম লীগ বা শুধু আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান সংগঠক। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের পর আওয়ামী মুসলীম লীগ দল থেকে মুসলীম শব্দটি বাদ দেয়। কিন্তু নীতি ও আদর্শের দিক থেকে এটি ছিল বাংগালী মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক দল। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শিক্ষিত উকিল মোক্তার,ডাক্তার কবিরাজ, ব্যবসায়ীরা মুসলীম লীগ ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিতে লাগলেন।
১৯৫৫ সালে আতাউর রহমান খান সাহেবের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে পূর্ববাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানে সরকার গঠণ করে আর ১৯৫৬ সালে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্বে কেন্দ্রে মানে সারা পাকিস্তানের সরকার গঠণ করে। মাওলানা সাহেব তখন দলের সভাপতি। কিন্তু দলের বিদেশ বিষয়ক নীতির প্রশ্নে মাওলানা সাহেবের সাথে সরকারের দ্বিমত হওয়ায় তিনি দল ত্যাগ করেন এবং ন্যাপ বা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন। বিদেশনীতির প্রশ্নে আমেরিকার সমর্থক হয়ে যায়। সোহরাওয়ার্দী সাহেব ‘জিরো প্লাস জিরো’ থিওরী দিলেন। বললেন,আমেরিকা হলো এক,তার বন্ধুত্ব হলে আমাদের মূল্য বাড়বে। তা না হলে আমরা জিরো থেকে যাবো। শেখ সাহেব সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নীতিকে সমর্থন দিলেন। আওয়ামী লীগ ৭১ সাল নাগাদ আমেরিকার সমর্থক ছিল। তখন আওয়ামী লীগ ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল। সকল বামপন্থী রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতো।
৭২ সালে আমরা দেখলাম, আওয়ামী লীগ রাতারাতি সমাজতন্ত্রের কথা বলতে শুরু করেছে এবং আমেরিকার সমর্থকদের উপর লাঠিসোটা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ছে। প্রতিপক্ষকে লাঠিসোটা দিয়ে পিটানো আওয়ামী লীগের অভ্যাস। এমন কি বংগবন্ধুর ওস্তাদ মাওলানা ভাসানী সভা ভাংগতেও আওয়ামী লীগ কুণ্ঠাবোধ করেনি। জুলিও কুরি পুরষ্কার পেয়ে তিনি বলতে লাগলেন,তিনিই বিপ্লব করবেন। তিনিই সমাজতন্ত্র কায়েম করবেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ কখনই সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ছিলনা।
রাশিয়া ভারত ও রাশিয়ার জোটভুক্ত দেশগুলোর উসকানীতে শেখ সাহেব হঠাত্‍ করে রাতারাতি গেজেট জারী একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করে দিলেন। সরকারী টিভি আর পত্রিকা ছাড়া বাকি সব পত্রিকা ও রাজনৈতিক নিষিদ্ধ করে দিলেন। এভাবেই নাকি সমাজতন্ত্র চালু করতে হয়। আমি হলফ করে বলতে পারি বংগবন্ধু দেশকে ভালবাসতেন। তিনি খুবই ইমোশনাল বা আবেগী মানুষ ছিলেন। মার্চের জাতকরা নাকি জীবনের সবকিছু হৃদয় দিয়ে বিবেচনা করেন, মাথা দিয়ে নয়। তাঁর আবেগকে কাজে লাগিয়েছে তাঁর শত্রুরা। তাঁর শত্রুরাই ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট ক্ষমতা থেকে অপসারিত করে এবং আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা খোন্দকার মোশতাককে ক্ষমতায় বসায়। খোন্দকার সাহেব সামরিক শাসন জারী করে আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়েই তাঁর মন্ত্রীসভা গঠণ করেন। তিনি উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মাত্র ৯০ দিন ক্ষমতায় ছিলেন এবং প্রধান বিচারপতি সায়েম সাহেবের কাছে ক্ষমতা দিয়ে বিদায় নেন। খোন্দকার সাহেব জেনারেল জিয়াকে সেনা বাহিনীর প্রধান হিসাবে নিয়োগ দেন। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যে জেনারেল জিয়া দেশ পরিচালনার জন্যে সার্বিক ক্ষমতার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
দেশবাসী জিয়া সাহেবের নাম প্রথম শুনেন ১৯৭১ সালের ২৬/২৭শে মার্চ। এর আগে তাঁর কেউ জানতোনা এবং কেউ শোনেওনি। তিনিই কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে উদাত্ত কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। প্রথমে বলেছিলেন, বিপ্লবী সরকারের প্রধান হিসাবে আমি মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিচ্ছি। আওয়ামী লীগের নেতাদের তৈরি আরেকটি ঘোষণাপত্রও জিয়া সাহেব পাঠ করেছিলেন দ্বিতীয়বার। দ্বিতীয় ঘোষণায় জিয়া সাহেব বলেন,বাংলাদেশের অবিসম্বাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিচ্ছি। জিয়া সাহেবের এই ঘোষণা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং দিশেহারা দেশবাসী উজ্জীবিত ও সংঘবদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বংগবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন কিন্তু কোন ঘোষণা না দিয়েই তিনি ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কাছে সারেন্ডার করেন। তাঁর সাথে ছিলেন ড.কামাল হোসেন। কামাল হোসেনের শ্বশুরবাড়ি করাচীতে। ওই নয় মাস তিনি করাচীতে শ্বশুরবাড়িতেই ছিলেন। এটা ইতিহাসের অংশ। বংগবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এটা হলো মিথ বিশ্বাস ও বদ্ধমূল ধারণা। ড.ওয়াজেদও তাঁর বইতে এ কথা বলেছেন কিন্তু কার কথা কে শোনে। আওয়ামী লীগের একটা সুবিধা হলো, একবার নেতা নেত্রী কোন কথা বললে সবাই সে কথা বলতে শুরু করে। হিটলারের দলের ও এ অভ্যাস ছিল। সত্য মিথ্যা বিচার না করাই হচ্ছে দলের আদর্শ। বিশ্বজিত হত্যাতো আপনারা চোখের সামনেই দেখেছেন। দলের নেতা নেত্রী সোজা সাফটা বলে দিলেন যারা হত্যা করেছে প্রকাশ্যে তারা কেউই ভাত্রলীগের সদস্য নয়। কলেজের, ভার্সিটির,স্কুলের শিক্ষকদের নিয়মিত পিটাচ্ছে। দলের আদর্শ এ ব্যাপারে ষোলয়ানা ঠিক আছে। আদর্শ হলো বেমালুম অস্বীকার করা। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাথে প্রিযোগিতা করতে পারে তেমন একটি দলও বাংলাদেশে নেই।প্রথম আলোর প্রকাশনী প্রথমা প্রকাশিত এক বইতে তাজউদ্দীন সাহেব বলেছেন,বংবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। পাকিস্তানের কারাগারে থাকাকালীন সময়ে বংগবন্ধুর বিরুদ্ধে আনীত রাস্ট্রদ্রোহিতার মামলার আর্জিতে বংগবন্ধু সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধ ঘোষণা করেন নি। বিবিসির আর্কাইভসে রয়েছে মেজর জিয়ার ঘোষণার রেকর্ড। ভারতের দলিল দস্তাবেজেও রয়েছে জিয়ার ঘোষণা। আমি মনে করি বংগবন্ধুর ঘোষণা দেয়া এবং না দেয়াতে কিছু আসে যায়না। তাঁর নামেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা। জীবদ্দশায় বংগবন্ধুকে নিয়ে ঘোষণার বিতর্ক কখনই হয়নি। পরবর্তী পর্যায়ে আওয়ামী লীগ এই বিতর্ক চালু করেছে দিল্লীর পরামর্শে। জিয়া সাহেব হচ্ছেন একজন ভাগ্যবান সৈনিক,যিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছিলেন। ভাগ্যই জিয়াউর রহমানকে বার বার টেনে মঞ্চে নিয়ে এসেছে। ১৯৭৫ সালের ৭ই নবেম্বর বন্দী অবস্থা থেকে মুক্তি লাভ করে তিনি সেনাবাহিনী প্রধান হয়েছেন। এবং একদিন বাংলাদেশের রাস্ট্রপতি হয়েছেন। আমিতো মনে করি সবকিছুই হয়েছে আল্লাহর হুকুমে।
মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে সত্য কথা, ইতিহাসের কথা জনসাধারনের কাছে তুলে ধরার ব্যাপারে বিএনপির ব্যর্থতা ১০০ ভাগ। বিএনপিতে রয়েছে সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধারা। বিএনপি একথাটা জোর গলায় বলতে পারেনি। এ ব্যাপারে কোথায় যেন দলের দূর্বলতা আছে। কেন যেন মনে হয়,বিএনপি এ সত্য কথাটা বলতে লজ্জা পায়। মুক্তিযুদ্ধকে দলের প্রধান আদর্শ হিসাবে প্রচার করতে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে। জিয়া সাহেব মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছেন এবং এই মর্মে ঘোষণা দিয়েছে। একথাটা আজ দেশের ভুলতে বসেছে। কারণ বিএনপি মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের এবং দলের প্রতিষ্ঠাতার গৌরব হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়াও জিয়া সাহেব যে আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা এ কথাটিও বলতে বিএনপি ভুলে গেছে। বিএনপির মহান সম্পদ হলো মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী। তিনি জিয়াউর রহমানকে বিপদের দিনে সমর্থন করেছেন ও দোয়া করেছেন। নতুন প্রজন্মকে জিয়ার নাম ভুলিয়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ভুল ইতিহাস রচনার জন্যেই শাহবাগ রচিত হয়েছে। শাহবাগের ব্যাপারে বিএনপি ডিফেন্সিভ আত্মরক্ষা মূলক ভূমিকা পালন করছে। বিএনপি নিজের অবস্থান ব্যাখা করে বিবৃতি দিয়েছে। এটা খুবই দু:খের এবং বেদনা দায়ক। জিয়া সাহেব আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার জন্যে জাতীয় ঐক্য ও সমন্বয়ের রাজনীতি শুরু করেছিলেন। বংগবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করেছিলেন আর জিয়া সাহেব সকল মত ও পথের লোকজন নিয়ে দল গঠন করেছিলেন বিভেদ দূর করে দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেয়ার জন্যে। কিন্তু আদর্শ ছিল মুক্তিযুদ্ধ। লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা। মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী তাঁর দলের প্রতীক ধানের শীষ জিয়াউর রহমানকে দিয়ে গেছেন। বিএনপির প্রধান শক্তি এখনও মাওলানা সাহেবের দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি(ন্যাপ)। হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে বিএনপি মুসলীম লীগ মার্কা একটি দলে পরিণত হয়েছে। মনে হচ্ছে এই দলের অতীতও নেই,ভবিষ্যতও নেই।

শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের তরুণরা সুস্পষ্ট করে পেছনের এই ইতিহাসটা জানেনা। তাই উল্লেখ করলাম। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাল্পনিক বহু বই রচিত হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে ওইসব রচিত হয়েছে ভাড়াটিয়া লেখক বা বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে। আমি কোন ইতিহাসবিদ নই। বুদ্ধিজীবীও নই। একজন সজাগ ছাত্র হিসাবে পাকিস্তান আমল থেকে কাছাকাছি থেকে দেশের রাজনীতি দেখে এসেছি। ৬১ সাল থেকে সাংবাদিক হিসাবে রাজনীতি দেখছি। মাওলানা ভাসানী ও বংগবন্ধুকে খুব কাছে থেকে দেখেছি। দুজনকেই আমি গভীর ভাবে ভালবাসি ও শ্রদ্ধা করি। বংগবন্ধুকে নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তা একমাত্র শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের হীনমন্যতার কারণে। বংগবন্ধুকে সবার চেয়ে বড় এবং একমাত্র বড় দেখাতে গিয়ে শেখ হাসিনা তাঁকে বার বার ছোট করে চলেছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ মনে করে বংগবন্ধু শুধু তাঁদেরই নেতা। বংগবন্ধুর জীবদ্দশায় শেখ মনি তাঁকে বিতর্কিত করেছে। মনিতো একবার লিখেই দিলো আইনের শাসন নয়, মুজিবের শাসন চাই। বংগবন্ধুর বিরুদ্ধে কথা বললে জ্বিব ছিঁড়ে ফেলা হবে। এর ফলেই দেশের মানুষ মনে মনে খুব কষ্ট পেয়েছে।আগেই বলেছি, একদলীয় শাসন ব্যবস্থা তিনি চালু করতে চাননি। এ ব্যবস্থা তাঁর উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। একই রকম পরিস্থিতি এখন দেডখা দিয়েছে। সকল প্রকার বামপন্থী,সেক্যুলারিস্ট, ধর্মীহীন ও ধর্ম বিরোধীরা শেখ হাসিনার উপর ভর করেছে। টোপ দিয়েছে, আমাদের কথা শোনো, আবার ক্ষমতায় আসতে পারবে। শাহবাগে সহজ সরল অবুঝ তরুণদের মগজে প্রবেশ করেছে বামপন্থী ধর্মহিন ও ধর্ম বিরোধীরা।
তরুণদের বুঝাতে হবে তোমরা জাতীয়তাবাদী আধুনিক বাংলাদেশের প্রতিনিধি। এখন তথাকথিত আবেগের সময় নয়, এখন দেশগড়ার সময়। নেশন বিল্ডিং ব্রিগেড গঠন করে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে হবে। হতে হবে সিংগাপুর, মালয়েশিয়ার মতো দেশ। ১৯৬০ সালে সিংগাপুর ও মালয়েশিয়া বাংলাদেশের চেয়ে অনেক গরীব দেশ ছিল। তাদের তরুণরাই দেশকে অধুনিক রাস্ট্রে পরিণত করেছে।
ব্লগিং করে দেশ গড়া যাবেনা। কথা বলা যাবে, শ্লোগান দেয়া যাবে। ব্লগে রাসুল(সা) ও আল্লাহপাকের বিরুদ্ধে যেসব অশ্লীল প্রচারণা দেখেছি তা বাংলাদেশের সকল মানুষের মনে আঘাত হেনেছে। ব্লগারদের মা বাপ, শিক্ষক ও মুরুব্বীরা নিশ্চয়ই ব্লগের এসব বিষয় জানেন না। কে বা কারা তাঁদের সন্তানদের নবী রাসুল ও আল্লাহর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে তা পিতা মাতাকে অবশ্যই জানতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির দাবী তুলেছে তরুণরা অত্যন্ত সরলভাবে। তাদের সরলতা ও দেশপ্রেমকে লাখো কোটিবার সালাম। সারাদেশের মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়। কিন্তু বিচার আন্দোলনের গভীরে প্রবেশ করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কারা ষড়যন্ত্র করছে তা জাতিকে এবং জাতির তরুণ সমাজকে অবশ্যই বুঝতে হবে। তরুণরাতো আমার আপনার সকলের সন্তান। তারা বাংলাদেশেরই সন্তান। তাদেরকেই রক্ষা করতে হবে বাংলাদেশকে। দেশী বিদেশী সকল ষড়যন্ত্রকেই নস্যাত করতে হবে।
লেখক: কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »


বক্ষমান কলাম বা নিবন্ধের শিরোনাম শুধু ভাষার রাজনীতি ও অর্থনীতি বললেই চলতো। কিন্তু বাংলাদেশ কথাটি বিশেষ কারণে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছি। বাংলাদেশে ভাষা নিয়ে হাজার হাজার বস্তা বই , প্রবন্ধ , নিবন্ধ ও নাটক সিনেমা তৈরি হয়েছে। আমাদের ভাষায় একটি শ্লোক আছে। তা হলো ‘লাখে লাখে সৈন্য মরে কাতারে কাতার, শুমার করিয়া দেখো মাত্র কয়েক হাজার। এ রকম আরও বহু বাণী ও শ্লোক আছে। সরকারী ব্যান্ক ও অফিস আদালত নিয়ে প্রায়ই সংবাদপত্রে লেখা হয় ‘কাজীর গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই’। এসব বানী বা বাক্য অন্য কোন দেশে বা ভাষায় আছে কিনা জানিনা। ভাষার অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে কিছু কথা বলবো।
চলতি ফেব্রুয়ারী মাস ভাষার মাস। এ মাস উত্‍সবের মাস। এ মাসেই ৫২ সালে ভাষার দাবীতে ছাত্র যুবকরা জীবন দিয়েছে। আর জীবন নিয়েছে রাস্ট্র শক্তি। দৈনিক অর্থনীতি প্রতিদিনে ৭ই ফেব্রুয়ারী সংখ্যায় ভাষা নিয়ে প্রকাশিত রণেশ মৈত্রদার লেখাটি পড়ে আমার এ লেখাটি লিখলাম। রণেশদা আমার খুব প্রিয় মানুষ। এক সময়ে এক সাথে কাজ করেছি সংবাদে। আমাদের চিন্তার জগতও ছিল প্রায় এক রকম। ভাষা নিয়ে রণেশদার লেখাটি মূলত: রাজনৈতিক। তিনি ভাষার রাজনীতি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি জিন্নাহ সাহেবের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ভাষার প্রশ্নে জিন্নাহর অবস্থানের কথা বলেছেন। ভারতীয়রা কি কারণে তাদের বাপুজীকে হত্যা করেছেন তা নিয়ে রণেশদা একটি কথাও বলেননি। কি করাণে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হয়েছেন সে কথাও তিনি উল্লেখ করেননি। দুজন নেতাই সাম্প্রদায়িক কারণে নিহত হয়েছেন।
বাংলাদেশে বা বংগদেশ নামক ভুখন্ডে বাংলা কখনই সরকারী ভাষা ছিলনা। শুনেছি ত্রিপুরা মহারাজার দাফতরিক ভাষা বাংলা ছিল। ফলে নায়েবের অফিসের ভাষাও ছিল বাংলা। তখন সরকারী দফতর বা অফিসের সাথে সাধারন মানুষের তেমন যোগাযোগ বা সম্পর্ক ছিলনা। সরকারী রাজস্ব আদায় হতো মুলত: ব্যবসা বাণিজ্য থেকে। চৌকিদারী ট্যাক্স ছিলনা। জমির খাজনাও তেমন ছিলনা। সাধারন মানূষের কোন জমিজমা ছিলনা। এক সময়ে সামান্য কিছু লেখাপড়া বা ফারসী জানলেই মুন্সী পদবী নিয়ে অফিসে আদালতে ওকালতি করা যেতো। লেখাপড়া জানা লোকদের মুন্সী বলা হতো। কিছুদিন আগেও গৃহশিক্ষককে মুন্সী বলা হতো। চট্টগ্রামে গদীর ম্যানেজারকে মুন্সী বলা হতো। অন্যান্য জায়গায় সরকার বলা হতো। প্রায় সাতশ’বছর ফার্সী ভারতের সরকারী ভাষা ছিল। ফার্সীর আগে ভারতের কোন কেন্দ্রী ভাষা ছিলনা,কেন্দ্রীয় কোন সরকারও ছিলনা। চলমান বাংলা ভাষায় কয়েক হাজার বিদেশী শব্দ আছে। সবচেয়ে বেশী শব্দ এসেছে ফার্সী থেকে। আমাদের অফিস আদালতে বহু ফার্সী শব্দ ব্যবহৃত হয়। নিত্যদিন আমরা যে ভাষায় কথা বলি তাতে বহু ফার্সী শব্দ ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বাংলা ভাষায় আরও রয়েছে আরবী,উর্দু, ইংরেজী,পর্তুগীজ,গ্রীক ও সংস্কৃত। সব মিলিয়ে চলমান জীবিত বাংলা ভাষা। পাকিস্তান বা উর্দু বাংলা ভাষায় তেমন কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। ভারতের রাস্ট্র ভাষা হিন্দী কোন এলাকা বা জাতির ভাষা নয়। এতা ভারতের লিংগুয়াফ্রাংকা। মানে সবার ব্যবহারের জন্যে একটা ভাষা। ভারতে শত শত ভাষা আছে। সেগুলো আঞ্চলিক ভাষা। শুরুতে কথা ছিল ভারতের কমন ভাষা হবে উর্দু। সমস্যা দেখা দিলো স্ক্রীপট বা হরফ নিয়ে। উর্দুর হরফ যেহেতু আরবী থেকে এসেছে আরবী থেকে সেজন্যে তা গৃহীত হয়নি। কিন্তু উর্দুর জন্ম ভারতেই। উর্দু পাকিস্তানেরও কোন অঞ্চলের ভাষা নয়। ১৭৫৭ সালে ইমরেজরা বংগদেশ দখল করলেও চট করে সরকারী ভাষার পরিবর্তন করেনি। ১৮৩০ বা ৩১ সালের দিকে সরকারী ভাষা হিসাবে ইংরেজীকে আনা হয়। মুসলমানরা তখন ইংরেজদের প্রধানতম শত্রু। তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তারাই সর্ব প্রথম ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে হিন্দুরা হয়ে গেল ইংরেজদের বন্ধু,কোলাবোরেটর বা রাজাকার। মোগল বা নবাবী আমলেও হিন্দুরা ফার্সী শিখে অফিস আদালতে চাকুরী করেছে। এর সবচেয়ে বড় প্রমান হলো কবিগুরুর পরিবার। এ পরিবারে ফার্সী ভাষার প্রচলন ছিল। রাজভাষা শিখেই ঠাকুর পরিবার সম্মানিত হয়েছেন। ইংরেজী ভাষাও তাঁরা সবার আগে শিখেছেন। ফার্সী ভাষায় শিক্ষিত নীলরতন ঠাকুর ১৭৬৫ সালে বিহার ও উড়িষ্যা ইংরেজদের দখলে এলে উড়িষ্যার দেওয়ানীতে আমিনগিরির চাকুরী পান। একই সালে মানে ১৭৬৫ সালে বিহারের পতনের পর স্বাধীনতার কবি কাজী নজরুলের পূর্ব পুরুষ যিনি প্রধান বিচারপতি ছিলেন তিনি আত্ম গোপন করে পালিয়ে বর্ধমানের আসানসোলে আ্শ্রয় গ্রহণ করেন। অনেকেই বলেন,ইংরেজদের বিরুদ্ধে অসহযোগ বা নন কোঅপারেশন করে মুসলমানেরা ভুল করেছে এবং পিছিয়ে পড়ে। ইংরেজ আমলে সরকারী চাকুরীতে হিন্দুদের অবস্থান ছিল শতকরা ৮০ ভাগ। বাকি ২০ ভাগ ছিল মুসলমান ও অন্যান্য মাইনরিটি।
পাকিস্তান আমলে বাংলা রাস্ট্র ভাষার স্বীকৃতি পেয়েছে ১৯৫৬ সালে। কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরীতে যারা গিয়েছে তাদের বাংলা উর্দু দুটোই শিখতে হয়েছে। সাথে ইংরেজীতো ছিলই। কই অফিসে আদালতে আজও বাংলা চর্চা ষোলয়ানা শুরু হয়নি। বরং ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল গুলোর কদর বেড়ে গেছে আগের চেয়ে। মহা প্রগতিশীল বাবাদের সন্তানরাতো বাংলা বলতেই পারেনা। রণেশদা বাংগালী ছেলেমেয়েদের চাকুরীর ব্যাপারে ভাষা নিয়ে যে বক্তব্য পেশ তা সঠিক নয়। পাকিস্তানের সৃষ্টি বা জন্ম নিয়ে রণেশদা যা বলেছেন তার সাথেই আমি দ্বিমত পোষণ করি। পাকিস্তান নামক রাস্ট্রটির জন্ম হয়েছে কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণে। অখন্ড বংগদেশও বিভক্ত হয়েছে কংগ্রেস নেতাদের সাম্প্রদায়িক মানসিকতার কারণে। যখন বলা হলো অখন্ড বংগদেশ একটি স্বাধীন রাস্ট্র হতে চায়। তখনি গান্ধীজী বললেন,শুধুমাত্র মেজরিটির সিদ্ধান্তে হবেনা। হিন্দু-মুসলমানের দুই তৃতীয়াংশের সিদ্ধান্ত হতে হবে বা ঐকমত্য হতে হবে। মুসলীম মেজরিটি এলাকা নিয়ে পাকিস্তান হবে। কিন্তু মুসলীম মেজরিটি অখন্ড বংগদেশ পুরোটা পাকিস্তানে আসলোনা, আলাদা স্বাধীন দেশও হতে পারেনি। ধর্মের ভিত্তিতে মুসলমানেরা কখনই একটি আলাদা স্বাধীন দেশ চায়নি। পাকিস্তানের প্রস্তাব এসেছে ১৯৪০ সালে। যদি কংগ্রেস নেতারা মুসলমানদের দাবী গুলো মেনে নিতো তাহলে পাকিস্তান প্রস্তাব কখনই গৃহীত হতোনা। হায়দ্রাবাদ আর কাশ্মীরতো মুসলীম মেজরিটি ছিল। এ দুদতি দেশতো ভারত দখল করে নিয়েছে। পাকিস্তান মুসলমানদের দেশ বলে সাম্প্রদায়িক হয়ে গেলো, ভারত হিন্দুদের দেশ হয়েও অসাম্প্রদায়িক রয়ে গেলো।
যাক এবার ভাষার অর্থনীতি নিয়ে কিছু বলা যেতে পারে। মাতৃভাষার কল্যাণে পশ্চিম বাংলার হিন্দুরা তেমন কিছুই করেননি। যদিও পশ্চিম বাংলার হিন্দুরা মনে করে বাংলা বাংগালী হিন্দুদের ভাষা। ভারতে সরকারী চাকুরী পেতে হলে হিন্দী জানা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশের অবস্থা সে রকম নয়। এখানে ইংরেজী আর বাংলা জানলেই চলে। বাংলা এখন একটি রাস্ট্রের অফিসিয়াল ভাষা। কিছুদিনের মধ্যেই জাতিসংঘের ভাষার মর্যাদা পাবে। এছাড়া পশ্চিম বাংলার বাংলাভাষা আর বাংলাদেশের বাংলাভাষা এক নয়। পশ্চিম বাংলায় মোট জনসংখ্যার ৩০ ভাগ মুসলমান থাকলেও সাহিত্য সংস্কৃতিতে তাদের কোন উপস্থিতি নেই। বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা ১০ ভাগ হচ্ছে হিন্দু। কিন্তু সরকারী চাকুরী, সাহিত্য সংস্কৃতি,রেডিও টেলিভিশনে তাদের উপস্থিতি শতকরা ২০ ভাগ।

Read Full Post »


ধর্মহীন বা ধর্ম নিরপেক্ষ রাস্ট্র কি ও কেমন তা আমি আজও দেখিনি। সেই স্কুল জীবন থেকে প্রগতিশীল রাজনীতির দীক্ষা পেয়েছি আমার শিক্ষকদের কাছে। যাঁদের বেশীর ভাগই ছিলেন হিন্দু। তখন স্কুল কলেজে হিন্দু শিক্ষকরাই বেশী ছিলেন। তাছাড়া যে পাড়ায় বাল্যকাল অতিক্রম করেছি তাও ছিল হিন্দু পাড়া। পাড়ার নাম ছিল উকিলপাড়া। স্কুল শেষে বিকেল বেলা যে পাঠাগারে যেতাম তার নাম ছিল রবীন্দ্র পাঠাগার। বলা হতো এটি একটি প্রগতিশীল পাঠাগার। আমাদের বাড়ীর সিনিয়াররাও ওই পাঠাগারের সদস্য ছিলেন। তখন আমি প্রগতিশীলতা কি তেমন বুঝতামনা। কলেজে গিয়েও প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম।
স্কুলে পড়ার সময়েই হাতে এসেছিল ছোটদের অর্থনীতি বইটি। চারিদিকে দারিদ্র দেখে মনটা খুবই খারাপ হতো। কিন্তু কি করবো বা কি করলে গরীব মানুষ গুলোর ভাগ্যের পরিবর্তন হবে তা জানতামনা। তারপর জানলাম, সমাজতন্ত্র কায়েম হলেই মানুষের দারিদ্র দূর হবে। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার নেশায় প্রচলিত ধারার চাকুরীতে না যেয়ে এক সময় খবরের কাগজে চাকুরী নিলাম। সময়টা ছিল ১৯৬১ সালের অক্টোবর। কাগজটি ছিল পাকিস্তান অবজারভার। কিছুদিন পরেই বুঝতে পারলাম বা জানতে পারলাম অবজারভার বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক আদর্শের কাগজ। ৬২ সালের শেষদিকে বা ৬৩ সালের শুরুতে শ্রদ্ধেয় জহুর ভাইয়ের অনুরোধে সংবাদে যোগ দিলাম। শহীদুল্লাহ কায়সার সাহেব ছিলেন তখন বার্তা বিভাগের দায়িত্বে নির্বাহী সম্পাদক। সংবাদ এক সময় মুসলীম লীগের কাগজ ছিল। ৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলীম লীগের ভরাডুবি হওয়ার পর মুসলীম লীগ আর কাগজটি চালায়নি। আমার ব্যক্তিগত চিন্তা চেতনার কারণে সরকারী গোয়েন্দারা সব সময় পিছনে লেগে থাকতো। সংবাদে যোগ দেয়ার পর গোয়েন্দা ঝামেলা আরও অনেক গুণ বেড়ে গিয়েছিল। আমি মূলত: মানবতাবাদী চিন্তাধারার মানুষ। আমার মনে হয়েছিল মাও জে দং ও লেনিনরাই মানবতার জন্যে করেছে। তাদের আদর্শই মানুষকে মুক্তি দিতে পারবে। আওয়ামী লীগকে আমি আমরা কখনই সমর্থন করিনি। পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগ ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সমর্থক। শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে থিওরী দিলেন ‘জিরো প্লাস জিরো’। মানে,আমেরিকা ছাড়া অন্যদের সাথে বন্ধুত্বের কোন দাম নেই। আমেরিকা হচ্ছে এক,আর পাকিস্তান হচ্ছে শূণ্য। দুয়ে মিলে দশ। আওয়ামী লীগ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্ব বিশ্বব্যাপী আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদীর নীতির সমর্থন করতো। তখন মানিক মিয়া সাহেবের কাগজ দৈনিক ইত্তেফাক আমেরিকাকে অন্ধভাবে সমর্থন করতো। আজও তাই করে। ৫৭ সালের দিকে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ভাসানীর সাথে নিজদলের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দ্বিমত দেখা দেয়। তখন অল্প কয়েকজন নেতা ও কর্মী ছাড়া আওয়ামী লীগের নেতারা সবাই সোহরাওয়ার্দী সাহেবের পররাষ্ট্রনীতির সমর্থন করেন। এমন কি মাওলানা সাহেবের অতি প্রিয় কর্মী বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও মাওলানা সাহেবকে ত্যাগ করেন। এমন পরিস্থিতিতে মাওলানা সাহেব নতুন দল প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হন। এভাবেই ন্যাপের জন্ম হয়। মাওলানা সাহেব সারা পাকিস্তানের বাম চিন্তা চেতনার নেতাকর্মীদের নিয়ে ন্যাপের যাত্রা শুরু করেন। পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববাংলার বাম নেতারাও মাওলানা সাহেবকে সমর্থন দেয়। ৬২ সালে মাওলানা সাহেবের উদ্যোগেই জেনারেল আইউব পূর্ব পাকিস্তানের বাম নেতাদের মুক্তি দেন। বংগবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ৭০ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ আমেরিকা পন্থী একটি রাজনৈতিক দল ছিল। হঠাত্‍ করেই ৭২ সাল থেকে আওয়ামী লীগ রাশিয়া ও ভারত সমর্থক বাম রাজনৈতিক দল গুলোর নেতা সেজে গেল। বংগবন্ধু নিজেই বলতে লাগলেন, তিনি নিজেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করবেন। ভারত ও রাশিয়ার সমর্থন নিয়ে বংগবন্ধু ডান চিন্তাধারার রাজনৈতিক দলগুলো নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। তিনি ধর্ম নিরপেক্ষতাকে রাস্ট্রের নীতি ঘোষণা করলেন। রাতারাতি বাম দল গুলো নিজেদের নীতি ত্যাগ করে বংগবন্ধুকে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক নেতা হিসাবে গ্রহন করলেন। বংগবন্ধু তাঁদের সাইন বোর্ড ফেলে দিয়ে তাঁর সাথে যোগ দিতে বললেন।
এই লেখাটি তৈরি করার জন্যে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি কালের কন্ঠে সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত শ্রদ্ধেয় যতীন সরকারের লেখাটি পড়ে। একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাস্ট্রের স্বপ্ন থেকেই যতীনদা লেখাটি লিখেছেন। যেমন আমার স্বপ্ন একটি মানবতাবাদী কল্যাণমুখি রাষ্ট্রের। বাল্যকাল থেকেই দেখে আসছি এই স্বপ্ন। আর এই স্বপ্ন নিয়েই লেখালেখি করছি ৫০ বছর ধরে। পশ্চিমে মানে ইউরোপ বা আমেরিকায় কিছু কল্যাণধর্মী রাস্ট্র গড়ে উঠেছে। কোন রাষ্ট্রই সেখানে ধর্মহীন বা ধর্ম নিরপেক্ষ নয়। বৃটেনের রাস্ট্রধর্ম প্রটেস্ট্যান্ট খৃষ্টবাদ। সেখানে রাজা বা রাজপুরুষরাই ধর্ম যাজক। বৃটেনের রাজাদের অত্যাচারে ঐতিহ্যবাহী ক্যাথলিক খৃষ্টবাদ পালিয়ে ইটালীর ভ্যাটিকানে আশ্রয় নিয়েছে। নিরো যখন বাঁশী বাজায় রোম তখন আগুনে পোড়ে। ইতিহাস হলো সম্রাট নিরো ছিলেন প্যাগান। প্রটেস্ট্যান্ট খৃষ্ট যাজকরা রোম গিয়েছিলেন ধর্ম প্রচারের জন্যে। নিরো যাজকদের বস্তিতে আগুন লাগিয়ে আনন্দে বাঁশী বাজাচ্ছিলেন বা সংগীত শুনছিলেন। একই ভাবে স্পেনের রাজা পরাজিত মুসলমানদের বলেছিলেন,তোমরা যদি মসজিদে আশ্রয় গ্রহন করো তাহলে প্রাণে বাঁচবে। মুসলমানরা রাজা ফার্ডিনান্ডকে বিশ্বাস করে মসজিদে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু বিশ্বাস ঘাতক ফার্ডনান্ড মুসলমানদের আগুন লাগিয়ে তাদের সবাইকে হত্যা করে। সেদিন ছিল এপ্রিল মাসের পহেলা তারিখ। ফার্ডিনান্ড বা খৃষ্টানরা ওই দিনটিকে নাম দিয়েছিল এপ্রিলফুল। আমরাও বহুদিন এইদিনটি পালন করেছি অজ্ঞতার কারণে।
ইতিহাস চুরি বা সত্যকে নির্বাসিত করে কাব্য রচনা করা বা ইতিহাস রচনা করা নতুন কিছু নয়। রামায়ন মহাভারত কোন ইতিহাস গ্রন্থ নয়। দুটিই মহাকাব্য মিথ্যা কাহিনীর উপর রচিত। বিজয়ীর গুণগাঁথা। সমকালীন কবিরা বিজয়ী রাজার কাহিনী রচনা করতে গিয়ে পরাজিত রাজাকে অসুর বলে আখ্যায়িত করেছেন। মহীষাসুর বা রাবণ ছিলেন ভুমিপুত্র বা স্বদেশী রাজা। বিদেশী রাজা রাম ও তাঁর স্থানীয় বেঈমানদের ষড়যন্ত্রের ফলে রাবণ ও মহীষাসুরের পরাজয় হয়। তাই রাবণ ও মহীষাসুরের চেহারা কাল্পনিক অসুরের মতো। একই ভাবে নবাব সিরাজ উদ দৌলার পরাজয়ের কাহিনী রাচিত হয়েছে হিন্দু ও খৃষ্টান ঐতিহাসিকদের দ্বারা। তাঁদের চোখে সিরাজ ছিলেন লম্পট। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সাথে আঁতাত করেছিল হিন্দু রাজা ও বণিকরা। হিন্দুদের সহযোগিতায়ই ধীরে ধীরে সারা ভারত দখল করে নিয়েছিল। ফলে ইমরেজরা এইদেশটি দখল করে রেখেছিল ১৯০ বছর আর হত্যা করেছে এদেশের লাখ লাখ দেশ প্রেমিককে। ১৭৫৭ সালের পরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন ভারতের মুসলমান আলেম সমাজ ও ধর্মীয় নেতারা। প্রথম একশ’বছর মানে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত ছিল ইংরেজদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের স্বাধীনতা যুদ্ধ। আপনারা সবাই জানেন শ্রদ্ধেয় ক্ষুদিরামের ফাঁসীর খবর। তিনি বড়লাটকে হত্যা করার চেষ্টা করে ধরা পড়েন এবং ফাঁসীতে জীবনদান করেন। কিন্তু আমরা ক’জন জানি বীর স্বাধীনতা সংগ্রামী আন্দামানে বন্দী শের আলী খানের কথা। শের আলী খান বড়লাট লর্ড মেয়োকে হত্যা করে ফাঁসীতে জীবনদান করেছেন। এই ইতিহাসটি আন্দামানের সীমানা পেরিয়ে জাগ্রত বাংগালীর কাছে আসেনি। কারণ, শের আলী খান ছিলেন একজন পাঠান স্বাধীনতা যোদ্ধা।
সম্প্রতি আমার হাতে একটি বই এসেছে যার নাম ‘দি থেফট অব হিষ্ট্রি’। লিখেছেন জ্যাক গুডি। গুডি পশ্চিমা জগতে একজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও শিক্ষক। এর আগে তিনি লিখেছেন ‘দি ইষ্ট ইন দি ওয়েষ্ট’। এই বইটিরই বর্ধিত গবেষণা হচ্ছে ‘দি থেফট হিষ্ট্রি’। প্রফেসর গুডির গবেষণা হচ্ছে শক্তিশালীরাই ইতিহাসে নির্মাতা, নিয়ামক ও প্রভাবক। আমরা সোজা ভাষায় বলি ইতিহাস হচ্ছে বিজয়ীর ইতিহাস। পশ্চিম কিভাবে পূর্বের অর্জন ও বিজয়কে চুরি করেছে তার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন প্রফেসর গুডি। আমেরিকান আর অস্ট্রেলিয়ানরা এক সময় চোর ডাকাত ছিল। তাদের নির্বাসনের জায়গা ছিল আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া। বৃটেন এক সময় সারা পৃথিবীকে দাবডিয়ে বেড়িয়েছে। আমেরিকা এখন সারা বিশ্বের একক নেতা। তার এক সময়ের প্রভু বৃটেন এখন অনুগত মিত্রে পরিণত হয়েছে। বৃটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার এখন আমেরিকার গণ সংযোগ প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করছে। আমেরিকা এখন তার অতীত ইতিহাসকে নতুন ভাবে নির্মান করার চেস্টা করছে। সত্যি কথা বলতে কি আমেরিকার কোন ইতিহাস নেই। আমাদের মানে ভারত বা বাংলাদেশের ইতিহাস হচ্ছে কয়েক হাজার বছরের পুরাণো। এক সময় পৃথিবীর মানুষ বাংলাদেশে আসতো ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যে। এখন বাংলাদেশের মানুষ যায় বিদেশে ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যে। বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশী বেশী লুণ্ঠিত হয়েছে ইংরেজদের দ্বারা। এ বিষয়ে জানার জন্যে হান্টারের বই পড়ুন।

শ্রদ্ধেয় যতিনদার লেখাটি পড়ে মনে হয়েছে তাঁর সব রাগ ধর্মের উপর। ওই সুযোগে তিনি পাকিস্তানের জন্ম নিয়েও কথা বলেছে। ইংরেজরা এ দেশে এসেছিল বণিক হিসাবে আর সাথে নিয়ে এসেছিল হজরত ইসা নবীর(আ) ধর্মগ্রন্থ। এক সময়ে তারা ষড়যন্ত্র করে রাস্ট্র বা রাজ্য ক্ষমতা দখল করে। ইংরেজের ক্ষমতা দখল ছিল হিন্দুদের জন্যে এক বিরাট আশীর্বাদ। আর বাংলা তথা ভারতীয় মুসলমানদের জন্যে ছিল পরাজয়। আমি যখন ছাত্র ছিলাম তখন মনে হয়েছিল মুসলমানরাই ইংরেজদের কোলাবোরেটর ছিল। কারণ, আসল ইতিহাস হিন্দু আর ইংরেজ গবেষকরা চুরি করেছিলেন। মোগল বা তারও বহু আগে বাংলাদেশ বা ভারতে কোন ধরণের সাম্প্রদায়িকতা ছিলনা। এটা চালু করেছে ইংরেজরা। তাদের নীতি ছিল ‘ডিভাইদ এ্যান্ড রুল’। এ পদ্ধতিতেই তারা ১৯০ বছর ভারত দখল করে রেখেছিল। ভারতে দাংগার ইতিহাস পড়ুন। যতীনদার দৃষ্টিতে পাকিস্তান খুবই একটা খারাপ দেশ বা রাস্ট্র। এদেশটার জন্মই নাকি ভুল ছিল। বাংলাদেশের জন্মের মাধ্যমে সে ভুল নাকি শুদ্ধ হয়েছে। যতীনদা বলতে চেয়েছেন ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি তা ধর্মমুক্ত হয়েছে। তাই বাংলাদেশে ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতির আর প্রয়োজন নেই। তিনি সেক্যুলার রাজনীতি চান। সেক্যুলার আর ফান্ডামেন্টালিস্ট শব্দ দুটো এসেছে বৃটেন থেকে। সেখানে রাজা আর গীর্জার ক্ষমতার দ্বন্ধ থেকেই শব্দ দুটোর উত্‍পত্তি হয়েছে। মুসলমানদের খেলাফতের জামানায় এই দ্বন্ধ ছিল। রাসুল(সা)এর জামানায় নবুয়ত,খেলাফত আর ইমামত একসাথেই ছিল। মদিনার রাস্ট্র ছিল বিশ্বের প্রথম জনগণতান্ত্রিক বা পিপলস রাস্ট্র। এই রাস্ট্রে বাস করতো ধর্মভিত্তিক সকল জাতি। মদিনা সনদেই সকল জাতি গোত্রের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল। মদিনার রেফারেন্স উল্লেখ করায় যতীনদা আমাকে মৌলবাদী বলবেন হয়ত। ইউরোপের সেক্যুলারিজম মানে ভন্ডামী। শুরুতেই বলেছি ধর্মনিরপেক্ষতা জগতের কোথাও নেই। এক কালের ধর্মহীন রাস্ট্র রাশিয়ায় সকল ধর্মই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। মসজিদ মন্দির বা গীর্জা বন্ধ ছিল। এটা ছিল রাষ্ট্রের জবরদস্তি। চীনেও একই অবস্থা ছিল। বাংলাদেশে যতীনদাদের মতে সেক্যুলারিজম মানে রাস্ট্র ধর্মমুক্ত থাকবে। এ চিন্তা গণতান্ত্রিক চিন্তা চেতনার বিপরীত। বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান। নব্বই ভাগ ভোটারও মুসলমান। এখানে জাতীয় মসজিদের পরিচালক সরকার। এখানে রাস্ট্রপ্রধান নামাজ আদায় করেন ইমামের পেছনে কাতারে দাঁড়িয়ে। সাথে রাস্ট্রপতির কর্মচারীরাও এক কাতারে দাঁড়িয়ে সালাত বা নামাজ আদায় করেন।
পাকিস্তানের জন্ম ইতিহাস যতীনদা জানলেও গোপন করেছেন। ১৮৮৫ সালে ইমরেজ সাহেব কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কংগ্রেস ছিল মূলত: একটি হিন্দু সমিতি। পরে একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। মুসলমান নেতারা শুরুতে কংগ্রেসেই ছিলেন। এমন কি স্বয়ং জিন্নাহ কংগ্রেসের নেতা ছিলেন। তিনি হিন্দু মুসলমান ঐক্য ও সম্প্রীতির চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু গান্ধীজী কংগ্রেসকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলে পরিণত করেছিলেন। হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের কারণে কংগ্রেস কখনই সার্বজনীন রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়ে পারেনি। কংগ্রেস নেতাদের ব্যবহারের প্রিক্রিয়া হিসাবে এক সময় মুসলীম লীগের জন্ম হয়। শুরুতে মুসলীম লীগ ইংরেজ শাসক ও কংগ্রেসের সাথে নিজেদের স্বার্থ অধিকার নিয়ে দর কষাকষিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। আসলে কংগ্রেস নেতারা একটি হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন। অখন্ড ভারতে মুসলমানদের অবস্থান কি হবে ব্যাখ্যা করতে হিন্দু নেতারা ব্যর্থ হন। এই কারণেই মুসলমান রাস্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব সমুখে আসে। তখন যদি ভারতকে কনফেডারেশন করার প্রস্তাব দেয়া হতো তাহলে হয়ত পাকিস্তান সৃষ্টি হতোনা।

Read Full Post »