Feeds:
Posts
Comments

Archive for September, 2012


আমাদের রাজনীতিতে আওয়ামী ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব / এরশাদ মজুমদার

স্কুলে পড়ার সময় থেকেই আমি রাজনীতির সাথে জড়িত হই। ফেণীতে আমরাই প্রথম ১৯৫৩ সালে ছাত্র ইউনিয়নের শাখা খুলি।কেন ছাত্র ইউনিয়নের শাখা করেছি তা এখন ব্যাখ্যা করে বলতে পারবোনা। আমরা দেখেছি যে, ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যরা মহকুমা শহরের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।তারা কবিতা লেখে, নাটক করে, আবৃতি করে, দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করে, শহরের যে কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে। শিক্ষকদের সাথেও তাদের সম্পর্ক ভাল।অভিভাবকরাও তাদের পছন্দ করে।কিন্তু সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন তাদের ভাল নজরে দেখতে পারতোনা। ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা নাকি বামপন্থী ছিল। মানে কমিউনিস্টদের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল। তখন দেশে মুসলীম লীগ সরকার ছিল। মুসলীম লীগাররা বাম চিন্তাধারার লোকদের দেখতে পারতোনা। এমন কি বাম চিন্তাধারার বই বা ম্যাগাজিন পড়লেও গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা তাড়া করতো। আমাদের স্কুল জীবন এভাবেই কেটেছে।৫৪ সালের নির্বাচনের পরেও পরিস্থিতির তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কারণে পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলার নির্বাচিত সরকার বেশীদিন টিকেনি। ৯২ক ধারা জারী করে কেন্দ্রীয় সরকার প্রদেশের দায়িত্ব গ্রহন করে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের গ্রেফতার করে জেলখানায় পাঠানো হয়।আমাদের এলাকার জনপ্রতিনিধি ছিলেন প্রখ্যাত জননেতা খাজা আহমদ সাহেব। তিনি তখন খুবই জনপ্রিয় বামপন্থী নেতা ছিলেন। তাঁর দল ছিল গণতন্ত্রী দল। তখন মির্জা গোলাম হাফিজ ও আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও এই দল থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। যুক্তফ্রন্টে বহু দলের সমাবেশ ছিল। তবে মূল দল ছিল আওয়ামী মুসলীম লীগ। জনগণের ভয়েই দলের নামের সাথে মুসলীম শব্দটি রাখা হয়েছিল। যুক্তফ্রন্টের প্রথম চীফ মিনিস্টার ছিলেন কেএসপি নেতা শেরে বাংলা একে ফজলুল হক। যদিও যুক্তফ্রন্টের প্রধান নেতা ছিলেন আওয়ামী মুসলীম লীগের মাওলানা ভাসানী। সোহরাওয়ার্দী সাহেব সবেমাত্র ভারত থেকে পূর্ব বাংলায় এসেছেন। কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে দেখতে পারতোনা।ফলে চীফ মিনিস্টার হওয়ার জন্যে একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন প্রবীণ নেতা শেরে বাংলা। যুক্তফ্রন্টের কি দশা হয়েছিল তা বংগবন্ধুর আত্মজীবনী পড়লেই পাঠক সমাজ জানতে পারবেন।
এক সময় ভাল ছাত্রদের সংগঠণ ছিল ছাত্র ইউনিয়ন। এখন আর সে সব দিন নাই। এখন ছাত্র নেতা হতে হলে ভাল ছাত্র হওয়া লাগেনা। ছাত্র লীগ অতীতে যেমন ছিল এখনও তেমন আছে।প্রসংগত বলতে চাই রাজনীতিতে ৪৭ সালের পূর্বে যে ভাষা ছিল তা পরবর্তী পর্যায়ে আস্তে আস্তে পরিবর্তিত হতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলার রাজনীতি বহু যুগ ধরে উকিল মোক্তার ডাক্তার ও বিত্তবান সমাজ নিয়ন্ত্রন করেছে। তাঁরাই মুসলীম লীগ গঠন করেছেন, তাঁরাই পাকিস্তান আন্দোলন করেছেন এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছেন। পূর্ব বাংলার সাধারন মানুষ হিন্দু জমিদার ও পোদ্দারদের হাত থেকে বাঁচতে চেয়েছেন। শেরে বাংলা ও স্যার নাজিমুদ্দিন ঋণ সালিশী বোর্ড করে মুসলমান কৃষকদের রক্ষা করেছিলেন। পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল শুধুমাত্র হিন্দুদের অত্যাচারের কারণে। গান্ধীজী ও নেহেরুর নমণীয় মনোভাব থাকলে ভারত কখনও ভাগ হতোনা। দ্বিজাতি তত্ব মুসলমানেরা শুরুতে কখনও পেশ করেনি। পাকিস্তান প্রস্তাবইতো এসেছে ১৯৪০ সালে। মুসলমানেরা উপায় না দেখে নিজেদের আত্মরক্ষার জন্যে এ প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। আপনারা একবার ভারতীয় মুসলমানদের বর্তমান অবস্থার দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন। মাঝে মাঝে তাদের করুণ অবস্থার প্রতিবেদন আংশিক প্রকাশিত হয়। সেখানে সাধারন মুসলমানেরা অচ্যুতের জীবন যাপন করেন। ভারতীয় বাংলায় মুসলমানের সংখ্যা ৩০ ভাগ। কিন্তু সরকারী ও আধা সরকারী চাকুরীতে তাদের উপস্থিতি এক ভাগেরও কম। অপরদিকে বাংলাদেশে মাইনরিটি বা সংখ্যালঘুদের অবস্থান ১০ ভাগের মতো। সরকারী আধা সরকারী সংস্থায় তাদের উপস্থিতি ১৫ ভাগের মতো। পরিসংখ্যানে কিছুটা ভুল হতেও পারে। শুধুমাত্র অবস্থান বুঝাবার জন্যেই আমি এর উল্লেখ করেছি। যদি পাকিস্তান না হতো তাহলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ৩০ কোটি মুসলমানের অবস্থা ভারতীয় অচ্যুতদের মতো হতো। কিন্তু সেই সাধের ও স্বপ্নের পাকিস্তান টিকেনি শুধুমাত্র পাকিস্তানের এক শ্রেণীর রাজনীতিক ও সেনা বাহিনীর কারণে। তাদেরই কারণে ৭১ সালের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ও পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্যে কর্মী হিসাবে বংগবন্ধু যে লড়াই করেছেন তার বিবরণ তাঁর বইতে আছে। তাঁর ওই বইতে তত্‍কালীন সমাজচিত্রও ফুটে উঠেছে। কিভাবে তিনি হিন্দু সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন তাও রয়েছে ওই বইতে। কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার পর তিনি দেখলেন এক ভিন্ন দৃশ্য। বৃটিশ শাসন আমলের মতোই আবার শুরু হলো জেল জুলুম। ফলে জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্যে সাধারন মানুষের জন্যে একটা রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।
এর আগে অনেক বারই বলেছি আওয়ামী মুসলীম লীগের জন্মের ইতিহাস। মাওলানা ভাসানী ছিলেন আসাম মুসলীম লীগের সভাপতি। সেখানে তিনিই মুসলীম লীগকে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীন পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানে এসে মুসলীম লীগে তাঁ কোন স্থান হলোনা। পূর্ব পাকিস্তানে মুসলীম লীগের যাঁরা নেতা হলেন তাঁদের সাথে সাধারন কর্মীদের সাথে তেমন কোন সম্পর্ক ছিলনা। করাচী বা ইসলামাবাদ থেকে তাঁদের চালানো হতো। ক্ষমতাসীন মুসলীম লীগ নেতারা মনে করতেন দেশ মাত্র স্বাধীন হলো এখনি ভিন্নমত পোষণের কি প্রয়োজন। মাওলানা ভাসানী এবং তাঁর ভক্ত ও সমর্থকরা মনে করতেন পূর্ব বাংলার সাধারন মানুষের জন্যেই নতুন দেশতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুরুতেই সাধারন মানুষের সমস্যার সমাধান করতে হবে। জিন্নাহ সাহেব ১৯৩৬ সালের দিকে পূর্ব বংগ সফরে এসে এখানকার গরীব কৃষক ও প্রজাদের অবস্থা দেখে বলেছিলেন, বাংলার সাধারন মানুষের জন্যেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প কিছুদিন পরেই জিন্নাহ সাহেব মারা গেলেন। পরবর্তী নেতারা সারা পাকিস্তানের গরীব নির্যাতিত মানুষের কথা ভুলে ক্ষমতার কোন্দলে জড়িত হয়ে পড়লেন। শেখ সাহেব এবং মাওলানা ভাসানী জনগণের সামনে যে ভাষায় কথা বলতেন তা কখনই দেশ পরিচালনার ভাষা ছিলনা। ওইসব ভাষা ছিল জনগণকে মুগ্ধ করার ভাষা। ওই ভাষায় ছিল জনগণকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখাবার শব্দ ও প্রতিশ্রুতি। মাওলানা সাহেবের জন্যে ওই ভাষা ছিল শোভনীয়। কারণ তিনি কখনই ক্ষমতায় যেতে চাননি। তিনি ছিলেন বংশীবাদকের মতো। কিন্তু শেখ সাহেবতো ক্ষমতার রাজনীতি করতেন। তিনি ৫৪ সালেই অল্প বয়সেই নেতা ও মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু ভাষার পরিবর্তন হয়নি। তিনি ক্ষমতা এবং জনগণের কাছে থাকা বা চিরদিনের জন্যে জনগণের নেতা থাকতে চাইতেন। ফলে ক্ষমতায় গিয়েও তিনি রাস্তার ভাষা বা জনসভার ভাষা ব্যবহার করতেন। এ ধরণের ভাষার মূল লক্ষ্য হলো যেন তেন প্রকারে নিজের জনপ্রিয়তা রক্ষা করা। সেই ধারা আজও অব্যাহত আছে। আমার ব্যক্তিগত আশা ছিল সাধারন মানুষকে ধোকা দিয়ে ভোট আদায় করা এবং ক্ষমতায় যাওয়ার দিন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর শেষ হয়ে যাবে। না শেষ হয়নি। বরং বেড়ে গেছে। অবশ্য, রাজনীতির এমন ধারার ভাষা ভারত পাকিস্তানেও জারী আছে। তা না হলে জুলফিকার আলী ভুট্টো কেমন করে বলেন, লোকেরা বলে আমি শরাব পান করি। সত্যি কথা আমি শরাব পান করি, কিন্তু গরীবের খুন চুষে পান করিনা। একথা শুনে জন সাধারন হাত তালি দিয়েছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভুমি বাংলাদেশের গরীব মানুষ গুলোও ও রকম। সস্তা কথায় হাত তালি দেয় আর সারাদিন ভুখা থেকে বিকেলে বাড়ি ফিরে যায়। এ দেশে এক সময় বড় বড় নেতারা বুকে ডিক্সনারী বেঁধে রেখে জনসভায় কোরাণ বলে প্রচার করতেন। যে কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে হাত তুলে মুনাজাত করতেন আর বলতেন এখানে একজন বড় বুজর্গ মানুষ শুয়ে আছেন। আমাদের নেতারা এখনও বলেন, দশ টাকা সের দরে চাল খাওয়াবো। পরে বলেন, এমন কথা কখনও বলেননি। যুক্তফ্রন্ট আমলে শুনেছি, নেতারা বলতেন দশ টাকা মন চাল খাওয়াবো। অসুখে যে মানুষটা মারা গেছে তার লাশ এনে ভুখা মিছিল বের করার ইতিহাস আমাদের দেশে আছে। পুলিশের গুলিতে কোন কর্মী মারা গেলে সকল দলই দাবী করে ওই কর্মীটি তাদের দলের।
রাজনীতিতে অস্ত্রের ভাষা চালু হয়েছে বিশেষ করে জেনারেল আইুবের আমলে। পরে ভাষা ফেলে দিয়ে পাকিস্তানের সেনা বাহিনী পাকিস্তান রক্ষা না করে ভেংগে দিয়েছে। লিয়াকত আলী বলেছিলেন ‘শের কুচাল দেঙে’, মানে মাথা গুড়িয়ে দেবো। এক সময়ে তাঁরা বলতেন ভারতীয় কুত্তা। এখনও এসব বলা হয়। রাজনীতিতে অস্ত্রের ভাষা এখন অবারিত ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইজরায়েল আমেরিকা আর ইরাণের নেতাদের ভাষার দিকে তাকান। একদিকে শান্তির বলছেন, আবার শুধু আক্রমনের কথা বলছেন। পশ্চিম বাংলার মমতা নাকি মমতা দিয়ে কথাই বলতে পারেন না। কথা বললেই নাকি তাঁর মুখ থেকে বুলেট বের হয়। সাদা সিধে জীবন যাপন করে মানুষের মন জয় করে ক্ষমতায় এসেছিলেন। মমতার মমতা বিহীন আচরণের জন্যে শিল্পপতিরা পশ্চিম বাংলা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। ভারতের সাংবাদিকরা বলেন, মমতা হচ্ছেন ভারতের শেখ হাসিনা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও বংবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা কথা না বলে থাকতে পারেন না, বললেই এতম বোমা। এইতো দেখুন না, পদ্মা সেতু নিয়ে তিনি বিপ্লব শুরু করেছিলেন। একেবারে দূর্গার রূপ, দূর্গতনাশিনী। কবি মন দিয়ে দেখলে দেখা যাবে আমাদের প্রধামন্ত্রীর দশ হাত ও দশ মাথা আছে। তাই তিনি দশ মুখে কথা বলেন আর দশ হাতে কাজ করেন। পদ্মাসেতু অর্থায়নে ঋণদাতা বিশ্বব্যান্ক ও দেশগুলো এখনও আসেনি, শুধু ঘোষণা দিয়েছেন। আর আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিদেশের মাটি বসে বলছেন, বিশ্বব্যান্কের ঋণ বাতিল করার জন্যে যারা কাজ করেছে তাঁদের তিনি খুঁজে বের করবেন। তাঁর রাজনীতির ডাবল স্ট্যান্ডার্ড সম্পর্কে দেশ ও বিদেশের মানুষ অবগত হয়েছে। তিনি বিশ্বব্যান্ককে রক্তচোষা ও দূর্ণীতিবাজ বলেছেন। বেশ কয়েকদিন বিশ্বব্যান্ক সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে গালাগাল দিয়েছেন। আবার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ভাবে বিশ্বব্যান্কের ঋণ পাওয়ার জন্যে৪ দেন দরবার করেছেন। যখন বিশ্বব্যান্ক বললো দেখি, আমরা ঋণটি পূণর্বহাল করা যায় কিনা। তখন একদিকে বিশ্বব্যান্ককে ধন্যবাদ জানালেন আর কারা ঋণ বাতিল করিয়েছে তার তদন্ত করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
বংগবন্ধুর বক্তৃতা ও ভাষণ রীতি নকল করে ইতোমধ্যাই আওয়ামী লীগের নানক, সেলিম , তোফায়েল বেশ নাম করে ফেলেছেন। আওয়ামী ভাষার একটা সুবিধা হলো, নেতারা ক্ষমতায় থাকলে এবং ক্ষমতার বাইরে থাকলে একই ভাষায় কথা বলেন। অনেকেই বলেন, এই উপমহাদেশে আওয়ামী লীগের মতো বিরোধী দল আর নেই। কেয়ারটেকার বা তত্তাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করার জন্যে আওয়ামী সারা যে তান্ডব চালিয়েছিল তা দেশবাসী ভুলে গেছেন কিনা জানিনা। এখন সেই দলটিই বলছে তত্তাবধায়ক ব্যবস্থা ভাল নয়। তাই সংসদে সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে এক মিনিটে ওই ব্যবস্থা বাতিল করে দিল। এইতো ক’দিন আগে তোফায়েল সাহেব বললেন, বিএনপি কোন ইস্যুই তৈরী করতে পারছেনা। আজ এক কথা বলেতো কাল আরেক কথা বলে। অনেকেই বলেন, আজ যদি আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলে সরকার ও দেশ অচল হয়ে যেতো। আওয়ামী নেতরাই বলেন, বিরোধী দল কাকে বলে তা জানতে ও শিখতে বিএনপির এক হাজার বছর লাগবে। সব ব্যাপারেই আওয়ামী লীগ প্রথম থাকতে চায়। বিরোধী দলে থাকলেও গলাবাজিতে এক নম্বর, সরকারী দলে থাকলেও এক নম্বর। ইতোমধ্যে দূর্ণীতির অভিযোগে সুরণ্জিত বাবু, আবুল হোসেন, মশিউর জনতার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন। তবুও প্রধানমন্ত্রী নানা ভাবে তাঁদের সহায়তা সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। আবুল হোসনকে দেশপ্রেমিক বলে সার্টফিকেট দিয়েছেন। এতকিছুর পরেও সুরণ্জিত বাবু প্রতিদিন যাত্রার ঢংয়ে পালা করে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী বলে চলেছেন, পদ্মাসেতুতে কোন প্রকার দূর্ণীতি হয়নি। কারণ বিশ্বব্যান্ক কোন টাকাইতো দেয়নি। তাহলে দূর্ণীতি হলো কেমন করে? দেশের সাধারন মানুষকে বোকা বানাবার অবাক অপকৌশল। কাজ পাওয়ার জন্যে ঘুষের লেনদেন বহু পুরাণো ব্যবস্থা। কানাডার লাভালিন কোম্পানী কাজ পাওয়ার জন্যেই বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টদের টাকা দিয়েছেন বলে প্রচারিত হয়েছে। এজন্যে কানাডা পুলিশ অনেকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রী ও উপদেস্টার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে রাজী হননি। এখনও তিনি বলেছেন তাঁর লোকেরা ঘুষ লেনদেন করেননি।
ডেস্টিনি ও হলমার্কের জালিয়াতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি কথাও এখনও বলেনি। কিছু না বলাতে জনমনে এ নিয়ে নানা সন্দেহ দেখা দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তিন চার হাজার কোটি টাকা কোন টাকাই নয়। ডেস্টিনির প্রধান উপদেস্টা ছিলেন আওয়ামী জেনারেল সাবেক সেনা প্রধান সেনাপতি হারুন সাহেব। তবুও আওয়ামী গলা ও ভাষা এক তালে ও লয়ে চলছে। বিচারপতির দূর্ণীতি নিয়ে সুস্পস্ট অভিযোগ হওয়ার পরেও আইনমন্ত্রী বলেছেন, বিচারপতির বিরুদ্ধে কোন ব্যক্তি বিশেষের অভিযোগ আনার অধিকার নেই। সরকারী ব্যন্ক গুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় আওয়ামী নেতা কর্মীদের শক্তিশালী অবস্থান। ব্যন্কগুলোতে এখন আর টাকা নেই। দিনরাত সবাই ভাগ বাটোয়ারা করে নিচ্ছে। আমানতকারীরা টাকা চাইলে তা ফেরত দেয়ার ক্ষমতা একটি ব্যন্কেরও নেই। আওয়ামী কোম্পানী ও ব্যক্তিদের উদর পূর্তি ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে। সরকারী ব্যন্ক গুলো সরকারী প্রতিস্ঠানের এলসি খুলছেনা। সরকারকে গ্যারাণ্টি দিতে হবে। আর সরকারই টাকা পাবে কোথায়।
যুক্তফ্রন্টের দাবী ছিল পুর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের জন্যে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব প্রধানমন্ত্রী হয়ে বললেন ৯৮ ভাগ স্বায়ত্বশাসন দেয়া হয়ে গেছে। অমনি আওয়ামী নেতারা মাঠে নামে গেলেন ৯৮ ভাগ স্বায়ত্ব শাসনের শ্লোগান নিয়ে। সে সময় আওয়ামী লীগ ছিল আমেরিকার ভক্ত। আমেরিকা যা করতো তা ষোল আনাই ভাল। সোহরাওয়ার্দী সাহেব জিরো প্লাস জিরো তত্ব দিয়েছিলেন। এর মানে ছিল শূণ্যের সাথে এক যোগ করলেই দশ হয়। তুমি যদি ডাবল শূণ্য হও তাহলে আমেরিকাকে সাথে নিয়ে একশ’ হও। অমনি মাঠে নেমে গেলো আমেরিকার পক্ষে। বাংলাদেশ হওয়ার পর হঠাত্‍ করে ভারত আর রাশিয়ার ভক্ত হয়ে গেলো। বংগবন্ধু বললেন, ‘আমিই সমাজতন্র কায়েম করবো। তিনি সারাজীবন কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। মাওলানা ভাসানী যখন পূর্ণাংগ স্বায়ত্ব শাসনের জন্যে জোরদার লড়াই শুরু করেছিলেন তখন আওয়ামী লীগ তাঁর উপর আক্রমন চালায়। আওয়ামী লীগ ও আমেরিকা সমর্থক ইত্তেফাক মাওলানা সাহেবকে লুংগি মাওলানা ও লাল মাওলানা বলে গালি গালাজ করে। বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল ভারত নিজে সমাজতন্ত্রের পথে না গিয়ে বাংলাদেশ পরামর্শ দিয়েছিল সমাজতন্ত্রী হওয়ার জন্যে। তার ফলাফল আমরা দেখেছি। তা ছিল লুটপাটের সমাজতন্র বা আওয়ামী লীগের সমাজতন্ত্র। এস মুজিবুল্লাহ তখন ইত্তেফাকে লিখেছিলেন, ‘দে মা তবিলদারী লুটেপুটে খাই’। এই শিরোনামে তিনি সিরিজ লিখেছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের পুঁজি গঠণের জন্যে এক সময় আন্দোলন হয়েছিল। বাংলাদেশ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ দলীয় পুঁজি গঠণের অবাধ সুবিধা পেয়েছিল।
আওয়ামী লীগ আজও ঠিক করতে পারেনি বংগবন্ধু কোন তারিখে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২৫শে মার্চ রাতে না ৭ই মার্চ প্রকাশ্য জনসভায়। এ নিয়ে গবেষকরা রীতিমত গবেষণা করছেন। কবীর চৌধূরী সাহেব বলেছিলেন ৭ই মার্চকেই স্বাধীনতার ঘোষণা বলতে হবে। এর পরেও বংগবন্ধু কিন্তু ছয় দফা নিয়ে ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর সাথে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেই আলোচনার ফলাফল দেশবাসী আজও জানেনা। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বংগবন্ধুর জীবদ্দশায় কোন রকমের বিতর্ক বা কন্ট্রোভার্সি হয়নি। জিয়া সাহেব বলেননি, তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। এটাতো স্পস্ট যে, তিনি বংগবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। সারা দুনিয়া শুনেছে জিয়া সাহেবের ঘোষণা। এই নিয়ে আওয়ামী লীগ বিতর্ক তৈরী করেছে। এবং আওয়ামী ভক্তরা ঘেউ ঘেউ কা কা করতে শুরু করে দিয়েছে। এ কথা মহাসত্য যে আওয়ামী ভাষা ও আচার আচরনের কাছে সবাই আজ পরাজিত।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
ershadmz40@yahoo.com
ershadmz@gmail.com

Advertisements

Read Full Post »


আমাদের স্বপ্নের রাস্ট্রটি এখন কোথায় ? এরশাদ মজুমদার

সোনালী ব্যান্ক যা ন্যাশনাল ব্যান্ক অব পাকিস্তান ছিল তার সাথে এক সময় আমার খুব ঘনিষ্ট যোগাযোগ ছিল। এমনও দিন ছিল আমি প্রতিদিনই এ ব্যান্কে যেতাম। পাকিস্তান আমলে যখন জিএম চৌধুরী সাহেব এই ব্যান্কের পূর্বাঞ্চলের প্রধান বা ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন তখন এর সাথে আমার পরিচয় হয়। বংগবন্ধু এভিনিউ যা এক সময়ে জিন্নাহ এভিনিউ ছিল সেখানে ন্যাশনাল ব্যান্কের সদর দফতর ছিল। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার(বাসস) সাবেক সম্পাদক ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডিপি বড়ুয়ার মাধ্যমেই জিএম চৌধূরী সাহেবের সাথে আমার পরিচয় হয়। চৌধুরী সাহেব ছিলেন একজন মহা ভদ্রলোক খান্দানী মানুষ। পিয়ন চাপরাশী থেকে সবাইকে চৌধূরী সাহেব আপনি করে বলতেন। চৌধুরী সাহেব সম্পর্কে সুযোগ পেলে আরেকদিন বিস্তারিত বলবো। ন্যাশনাল ব্যান্ক অব পাকিস্তান ছিল একটি সরকার নিয়ন্ত্রিত ব্যান্ক। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রফতানী সম্পদ পাটকে অর্থায়ন করার জন্যে। পূর্ব পাকিস্তানে এর প্রথম শাখা নারায়নগঞ্জে খোলা হয়। যদিও সদর দফতর ছিল করাচীতে। ন্যশনাল ব্যান্ক সরকারের ট্রেজারী হিসাবেও কাজ করতো। এক সময় বাংগালী উদ্যোক্তারা পাটকল স্থাপনের উদ্যোগ নিলে ন্যাশনাল ব্যান্ক অর্থায়ন করে। বাংলাদেশ হওয়ার পর এটা ষোলয়ানা সরকারী মালিকানায় সোনালী ব্যান্ক হিসাবে যাত্রা শুরু করে। পাকিস্তান আমলে এটা ছিল সরকারী ও বেসরকারী মালিকানার যৌথ প্রতিষ্ঠান। সমাজতান্ত্রিক চিন্তা চেতনার কারণে সরকার তখন সব ব্যান্ক বীমা জাতীয়করণ করে মালিকানা সরকারের হাতে নিয়ে নেয়। আর যায় কোথায়? শুরু হলো ব্যান্ক গুলোর দূর্গতি। অর্থ মন্ত্রণালয় সরকারের পক্ষ থেকে মালিকানা দেখা শুনা করেন। লাভ লোকসানের ব্যাপার নাই সরকারের কথা শুনলেই হলো। সরকারের কথা মানে সচিবের কথা, মন্ত্রীর কথা, এমপির কথা আর আর সর্বশেষ একান্ত সচিব ও সহকারী সচিবের কথা। এভাবেই বিগত ৪২ বছর ধরে সরকারী ব্যান্ক গুলো চলছে। ইউনিয়ন নেতাদের কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। ইউনিয়ন নেতারাও দামী গাড়ীতে চলাফেরা করেন। বিচারপতি সাত্তারের আমলে ব্যান্কগুলোকে জিম্মি করে ফেলেছিল ইউনিয়ন নেতারা। বিচারপতি সাত্তার ১১শ কর্মচারীকে একদিনে বরখাস্ত করে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন। তারপরে নেতারা কিছুটা দমে গিয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব থেকে ব্যান্ক গুলো কখনই মুক্ত হয়নি। বেসরকারী বা প্রাইভেট ব্যান্ক গুলোকে নিয়মিত চুষে খাচ্ছেন পরিচালকবৃন্দ। আর সরকারী গুলোকে খাচ্ছেন সরকারী লোকেরা। এখন সরকারী ব্যান্ক গুলো রক্তশূণ্য হয়ে পড়েছে। হয়ত বেশী দিন আর বাঁচবেনা। ভারত পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় বহু সরকারী ব্যান্ক আছে। সেখানে কেউ ব্যান্ক গুলোকে চুষে খাচ্ছেনা। সরকারী ব্যান্ক গুলোর সম্পদ ও দায়দেনার হিসাব করলে এগুলোতে এখন আর তেমন কিছু নেই। চাহিবামাত্র সাধারন মানুষের আমানতের টাকা ফেরত দিতে পারবেনা।
আপনি যদি কখনও সোনালী বা অন্য যেকোন সরকারী ব্যান্কে যান দেখতে পাবেন কিছু মৃত মানুষ বসে আছেন, তাদের জীবনী শক্তি ফুরিয়ে গেছে। আমানতকারী বা গ্রাহক দেখলে তাঁরা বিরক্ত হন। তাঁদের জীবনহীন জীবনের হয়ত কোন কারণ আছে। বেসরকারী ব্যান্কের তুলনায় তাঁরা অনেক কম বেতন পান। ফলে তাঁরা হয়ত হতাশায় ভোগেন। অপর দিকে বেসরকারী ব্যান্কের তরুণ অফিসাররা বলেন, তাঁরা সরকারী ব্যান্কের অফিসারদের তূলনায় দশ গুণ বেশী কাজ করেন। দেশের প্রথম বেসরকারী ব্যান্ক ন্যাশনাল ব্যান্ক প্রতিষ্ঠার সময়ে আমি এর সাথে জড়িত ছিলাম আমার মুরুব্বী হায়দার চৌধুরী সাহেবকে সহযোগিতা করার জন্যে। ব্যান্ক শুরু হওয়ার আগেই প্রথম নিয়োগ পায় আমার বন্ধু মোহাম্মদ আলী পান্নু। সে উত্তরা ব্যান্ক ছেড়ে হায়দার চৌধুরী সাহেবের সাথে যোগ দিয়েছিলো। ব্যান্ক শুরু করার প্রথমিক কাজ গুলো করার ব্যাপারে পান্নু হায়দার চৌধুরী সাহেবকে সহযোগিতা করেছিল। এ সময়ে হায়দার চৌধুরী সাহেব সম্পর্কে দুটো কথা না বললে অবিচার করা হবে। তিনিই ন্যাশনাল ব্যান্কের প্রতিষ্ঠাতা। তিনিই সরকারী ব্যান্কের চাকুরী ছেড়ে ব্যান্ক প্রতিষ্ঠার জন্যে উদ্যোগী হন। ন্যাশনাল ব্যান্কের উদ্যোক্তাদের বেশীর ভাগই ছিলেন ফেণীর ব্যবসায়ীরা। কারণ চৌধুরী সাহেবের বাড়ি ফেণী। চট্রগ্রাম থেকে উদ্যোক্তা জোগাড় করেছেন গোলাম রহমান। তিন কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন জোগাড় করতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়েছে। এজন্যে ২৬ জন উদ্যোক্তা নিয়ে ন্যাশনাল ব্যান্কের যাত্রা শুরু হয়েছিল। মাত্র কয়েকজন উদ্যোক্তা ২৫ লাখ টাকা করে দিয়েছিলেন। বেশীর ভাগই দিয়েছেন ১০ লাখ টাকা করে। ফেণী এবং চট্টগ্রামের উদ্যোক্তাদের ভিতর দলাদলি ফলে ব্যান্কটি এখন ফরিদপুরের শিকদার গ্রুপের কাছে চলে গিয়েছে। শিকদার গোপনে বাজার থেকে বহু শেয়ার কিনেছেন। এখনতো একটি ব্যান্ক প্রতিষ্ঠা করতে ৪০০ কোটি টাকা লাগে। এটা হলো মূলধন। এর বাইরে অনুমতি লাভের জন্যে খরচ করতে আরও ৪।৫শ’ কোটি টাকা। অনেকেই ২৫ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন ১০০কোটি টাকা দিয়ে। এটাই প্রমান করে যে বিগত ২৫ বছরে ব্যবসায়ীরা কি পরিমাণ সম্পদ বা নগদ টাকা জমিয়েছে। বেশীর ভাগ টাকাই হলো সরকারের পাওনা কর ও শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার টাকা। ৮২/৮৩ সালের অনেকেই ১০ লাখের সাদা টাকা দেখাতে অক্ষম হয়েছেন। তখন বলা হয়েছিল ব্যান্ক প্রতিষ্ঠায় বিনিয়োগ করলে সাদা টাকা লাগবেনা। সরকারী ব্যান্ক যত দরিদ্র হচ্ছে বেসরকারী ব্যান্কের মালিকেরা বা উদ্যোক্তারা তত ধনী হচ্ছেন। বহু উদ্যোক্তা সরকারী ব্যান্ক থেকে টাকা নিয়েও ব্যান্ক করেছেন। পরে সরকারী ব্যান্কের কর্তা ব্যক্তিদের নিজেদের ব্যান্কে চাকুরী দিয়েছেন। আবার অনেক ব্যবসায়ী হাউজ বা গ্রুপ অবসর নেয়ার পর ব্যান্কারদের নিজেদের কোম্পানীতে চাকুরী দিয়েছে। একজন ব্যান্কার আমি চিনি বেসরকারী ব্যান্কের দ্বিতীয় বা তৃতীয় ধাপের অফিসার থাকার সময়ে নিজে ব্যান্ক প্রতিস্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ভদ্রলোক এখন আর জীবিত নেই। কিন্তু তাঁর আত্মীয় স্বজন সবাই এখন ব্যান্কের ডিরেক্টর।
আজ এমন একটা সময়ে আমরা অতিক্রম করছি যখন জনসেবা কাকে বলে আমরা ভুলতে বসেছি। যেদিকে তাকাবেন, দেখবেন আপনি অথৈ সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে। মন্ত্রীরা বলেন তাঁরা জনগণের প্রতিনিধি। সরকারী কর্মচারীরা বলেন তাঁরা জনগণের খাদেম। জনগণের খেদমত করাই তাঁদের কাজ। বলুন দেখি কোন অফিসে গেলে আপনি দেখবেন একজন সেবক এগিয়ে এসে বলবেন,সালাম, আমি আপনার জন্যে কি করতে পারি। স্কুল কলেজ মাদ্রাসা মক্তব, হাসপাতাল, পোস্ট অফিস, সঞ্চয় অফিস, তহশীল অফিস, জমির জমা খারিজ অফিস যেখানেই যান না কেন আপনাকে টাকা দিয়ে কাজ করাতে হবে। এমন কি ওয়াসা অফিস, গ্যাস অফিস বা বিদ্যুতের অফিসের কথা আর কি বলবো। এই দেখুন না, গ্যাসের কানেকশন বন্ধ, কিন্তু কানেকশন হচ্ছে নিয়মিত। আপনার ডিমান্ড নোট জমা দেয়া থাকলে দালাল আপনারবড়িতেই আসবেন। বলবেন স্যার আমরা কানেকশন নিয়ে দেবো, একটু বেশী টাকা লাগবে। সেই বেশী টাকাটা হলো কয়েক লাখ টাকা। ওদিকে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান সাহেব বলছেন, বাসা বাড়িতে কানেকশন দেয়ার মতো গ্যাস তাঁদের কাছে। কিন্তু সবজান্তা সাবেক সিএসপি অফিসার, যিনি এখন প্রধানমন্ত্রী সাহেবার উপদেস্টা বলছেন, আমরা এখন বাড়িতে গ্যাস দিতে পারবোনা। এখন চারিদিকে গুণ্জন উঠেছে নির্বাচনের আগে ভোটের জন্যে সরকার গ্যাস কানেকশনের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে।
বাহাত্তুর সালে বেসরকারী খাতে বিনিয়োগের সীমা ছিল মাত্র দশ লাক টাকা। কারন তখন বংগবন্ধু দেশের সমাজতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন অসমাজতান্ত্রিক আোয়ামী কর্মীদের দিয়ে। আমার আজও বিশ্বাস হয়না শেখ সাহেব এমন একটা কাজ করতে পারেন। ভারত তকনও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির দিকে যায়নি। ফলে ্যা হবার তাই হলো। সে সময়েই এস মুজিবুল্লাহ নামের এক ভদ্রলোক ইত্তেফাকে লিখলেন, দে মা তবিলদারী, লুটে পুটে খাই। সমাজতন্ত্রের নামে দেশে শুরু হয়ে গেল লুটপাট। যারা পান দোকান চালাতে পারেনা তাদের করা হলো বড় বড় মিলের প্রশাসক। রাতারাতি আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা হয়ে উঠলেন ধনবান। তখন বেসরকারী বিনিয়োগের সীমা দশ লাখ টাকা রাখলে চলেনা। এবার করা হলো তিন কোটি টাকা। শুরু হলো পুঁজির বিকাশ। স্বাধীনতার সুফল হলো বিগত ৪০ বছরে একশ’টাকার মালিক এক লাখ টাকার মালিক হয়েছে। রাজনীতিবিদরাও যে কোন ভাবেই হোক সুখে আসন্তিতে আছেন। ক্ষমতায় থাকলে নিজেরাই কিছু করে নিচ্ছেন। ক্ষমতার বাইরে থাকলে ব্যবসায়ীরা তাদের কিছু করে দেন। বিগত ৪০ বছরে দেশে দরিদ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। দৈনিক মুজুরী দুই টাকার যায়গায় দুইশ’ টাকা হয়েছে। দুই টাকার সময়ে দিন মুজুর হিসাবে কাজ করতো, এখনও করে। আগে তাদের বউরা বাইরে কাজ করতোনা এখন করে। বার্ষিক প্রবেদ্ধি যদি ছয় পারসেন্ট হয়, গরীবের প্রবৃদ্ধি হয় এক পারসেন্ট। ফলে দারিদ্র বেড়েই চলেছে। বার্ষিক বাজেট যদি দুই লাখ কোটি টাকার মতো হয় সেখান থেকে ঘুষ ইত্যাদি বাবত ব্যবসায়ী ও সরকারী কর্মচারীদের পকেটে চলে যায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। পাকিস্তান আমলে আমরা লেখালেখি করেছি পূর্ব পাকিস্তানের পুঁজির বিকাশের জন্যে। ৪০ বছরে পুঁজির বিকাশ ভালই হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে এক হাজার লোক অংশ গ্রহণ করলে প্রত্যেককে এক কোটি টাকা করে দেয়ার মতো লোক এখন আছে। পুরো সংসদকে নিজের প্রভাবে রাখার মতো প্রভাব প্রতিপত্তি অনেকের আছে। রাস্ট্র এখন ধনীদের খেদমতে ব্যস্ত। ফাঁকে বেশ খেদমত পাচ্ছেন রাজনীতিক,সরকারী কর্মচারী। যে কথা বলে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল তার কিছুই হয়নি। হাসপাতালে চিকিত্‍সা নেই, স্কুলে সিট নেই, শিক্ষিত বেকারদের চাকুরী নেই । চারিদিকে অশ্লীল কদর্য অর্থ দেখলে মাথা খারাপ হয়ে যায়। গুলশান মেই এভিনিউতে নাকি প্রতি কাঠা জমি দশ পনেরো কোটি টাকায় বিক্রি হয়। কোন দরাদরি নেই,একেবারেই গোোন ভাবে লেনদেন হচ্ছে। মতিঝিলেও নাকি একই অবস্থা। কিন্তু রাজউক বা সরকারী ভাবে জমির দাম এখনও কয়েক লাখ টাকা। এমন কি ফুর্বাচল বা ঝিলমিলে জমির বরাদ্দপত্র বিক্রি হয় কাঠা পাঁচ লাখ টাকা করে।
যেমন ধরুন, বর্তমান সরকার রাজনৈতিক কারণে ৬/৭টা ব্যান্ক স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। যারা অনুমতি পেয়েছেন তাঁরা কেউই ব্যবসায়ী নন। তাঁরা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ব্যান্কের অনুমতি পত্রের কাগজ বাজারে বেচা হচ্ছে প্রতিয়ামে। যিনি অনুমতি পেয়েছেন তাঁর এক পয়সাও পুঁজি লাগবেনা। এর মানে তিনি রাতারাতি ২০/২৫ কোটি টাকা মালিক হয়ে যাবেন। বিগত ৪০ বছর ধরে রাস্ট্র কিছু লোকের দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে ও শোষিত হচ্ছে। কিন্তু কারো কোন হুঁশ নেই। অন্ধ ভাবে কেউ এ দল সমর্থন করছে, কেউ ওই দল ামর্থন করছে। সাধারন মানুষের কথা বাদ দিলাম। শিক্ষিত লোকেরাও বহু ভাগে বিভক্ত। বাংলাদেশের পক্ষে আমি কাউকে দেখতে পাইনা। বিদেশে যেয়েও বাংলাদেশের লোকেরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত। লেখাটি শুরু করেছিলাম আমাদের রাস্ট্রের জনসেবা নিয়ে কিছু কথা বলবো বলে। শুধু জনসেবার কথা বলতে পারলামনা। রাস্ট্রটাই যখন কিছু মানুষ দখল করে নিয়েছে তখন জনসেবা আর কে করবে। বহু স্বপ্নের দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। নেতারা ও মুরুব্বীরা আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন পাকিস্তান হলে মুসলমানরা সুখী হবে, বিশেষ করে গরীব মুসলমানেরা বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু স্বপ্ন ভংগ হলো। দুই মুসলমান এক সাথে থাকতে পারলোনা। হিসাব নিকাশ পাওনা দেওনা নিয়ে মারামারি লেগে গেল। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বেঁধে গেল। পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান বা বাংগালী নেতারা ভাবলেন দেশ স্বাধীন হলে কেউ আর বাংগালীদের শোষণ করতে পারবেনা। এবারও স্বপ্নভংগ হলো বা হতে চলেছে। ৪০ বছরেও সাধারন মুসলমান বা বাংগালীদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি, যা হওয়ার কথা ছিল। কারণ দেশ বা রাস্ট্রটা এখন খুব শক্ত লুটেরাদের হাতে পড়ে গেছে। ৭২ সালে লুটরোদের সাইজ ছিল ইঁদুরের মতো। এখন হাতীর মতো। এক শ্রেণীর রাজনীতিক আর লুটেরা মিলে দেশটাকে দূর্ণীতির স্বর্গরাজ্য বানিয়ে ফেলেছে। এইতো দেখুন না, চলমান সরকারের আমলে দূর্ণীত রাস্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়েছে। লুটেরারা দাঁত বের করে হাসছে। দেশের মানুষকে পরাজিত করে এ যেন যুদ্ধের বুটি। এ সরকার দূর্ণীতির সাগরে ডুবে গেছে। কিন্তু তবুও কোন শরম নেই। বিশ্ব ব্যান্কের কাছে ঋণ চায় আবার বিশ্ব ব্যান্কের বিচার চায়। হলমার্কের ডাকাতরা ব্যান্ক থেকে সবার অনুমোদন নিয়ে চার হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেল, সেই নিয়েও সরকারী দল রাজনীতি করছে। রামু বা উখিয়াতে বৌদ্ধ মন্দির গুলো জ্বালিয়ে দিয়ে সারা বিশ্বের কাছে জাতি হিসাবে আমাদের হেয় করেছে, সেখানেও সরকারী দল রাজনীতি করছে। প্রধানমন্ত্রীর বলা উচিত ছিল এমন হিন কাজ যারা করেছে তাদের আমরা শাস্তি দেবো এবং বিশ্ববাসীর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং তিনি বিরোধী দলকে দোষী সাব্যস্ত করে ভাষণ দিচ্ছেন।
ডেস্টিনি মার্কা কোম্পানী গুলো অনেকদিন ধরে বাংলাদেশে চালু রয়েছে। এর আগে যুবকের ঘটনা ঘটেছে। ডেস্টনির ঘটনাটা খুবই বিস্ময়কর। এর প্রধান হলেন জেনারেল হারুন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং আওয়ামী পন্থী। সরকারের চোখের সামনেই ডেস্টিনি কাগজ বের করেছে, টিভি খুলেছে, বাগান বানাচ্ছে, এয়ারলাইন খুলেছে। সবকিছুই করতে পেরেছে রাজনীতির ছায়া তলে।
দূর্ণীতি নিয়ে দুদকের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান সাহেব মাঝে মাঝে , ইদানিং প্রতিদিন যা বলে তাতে দেশবাসী অবাক ও বিস্মিত হন। ক’দিন আগে আবুল সাহেবকে তিনি সার্টিফিকেট দিয়েছেন। তারই ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী আবুলকে দেশপ্রেমিক বলেছেন। দুদক সুরঞ্জিত বাবুকেও ভালো মানুষের সনদ দিয়েছেন। এখন বলছেন, পিয়ন চাপরাশীর কথায় বিচার চলেনা। পিয়নতো একজন নাগরিক, একজন ভোটার। আইনে কি কোথাও লেখা আছে পিয়ন হলে সাক্ষী নেয়া যাবেনা বা ভোট নেয়া যাবেনা। ড্রইভার আজমের রহস্য হলো সে বেশ কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে ছিল। ্ঠাত্‍ করে একেবারে সরাসরি আরটিভিতে যেয়ে উপস্থিত। এই টিভির মালিক আবার আওয়ামী পন্থী মোরশেদুল আলম। তিনি জেনারেল মঈনের সরকারের আমলে এটার মালিক হয়েছেন। কেমন করে মালিক হয়েছেন সে রহস্য এখনও কেউ জানেনা। সেই মোরশেদ সাহেবের টিভিতে যেয়ে হাজির ড্রাইভার আজম। কে তাঁকে সেখানে নিয়ে গেল? এতদিন সে কোথায় ছিল? তাহলে সরকারের ভিতরে কি কোন অদৃশ্য সরকার আছে? তাহলে কি আজমকে টোপ হিসাবে রাখা হয়েছে? সময় মতো কাজে লাগানো হবে।
পদ্না সেতুতে কোন দূর্ণীতি হয়নি। এটা প্রধানমন্ত্রীর সাফ কথা। তবুও দূর্ণীতিবাজদের সরাবার ব্যাপারে সরকার রাজী হলেন কেন? একদিকে বলছেন বিশ্বব্যান্ক দূর্ণিতিবাজ। অপরদিকে বিশ্বব্যান্কের টাকা পাওয়ার জন্যে নানা রকম লবী করছেন। নিউইয়র্কে বসেই প্রধানমন্ত্রী বলে দিলেন বিশ্বব্যান্কের ঋণ বন্ধ করার জন্যে যারা চেস্টা করেছেন তাদের খুঁজে বের করা হবে। একথা বলার পরেই বিশ্বব্যান্ক ঘোষণা করলো তারা নিজেরাই দূর্ণীতির তদন্ত করবেন। প্রধানমন্ত্রীর নানা ধরণের কথায় অনেকের মনে ধারণা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিশ্বব্যান্কের ঋণ চান না। যদি চাইতেন থাহলে তিনি এত কথা বলতেন না। অপরদিকে যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এখনও বলছেন মালয়েশিয়া পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করবে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল বলেছেন, বিশ্ব ব্যান্কের তদন্ত কমিটি গঠিত হওয়ায় তিনি খুশী হয়েছেন। হয়ত তিনি আন্তরিক ভাবেই চান বিশ্বব্যান্কের ঋণ আসুক।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক
ershadmz0@yahoo.com

Read Full Post »


আমার সাংবাদিকতার শিক্ষক এবিএম মুসা / এরশাদ মজুমদার

এই লেখাটি আমি লিখেছিলাম মনের তাগিদে। কারো অনুরোধে নয়। তখন মুসা ভাই জীবিত ছিলেন। এবিএম মুসা( আবুল বাশার মুহম্মদ মুসা)। আমার মুসা ভাই। যদিও মুসা ভাই ডাকি,আসলে তিনি আমার সাংবাদিকতার শিক্ষক। আমি যখন অবজারভারের শিক্ষানবীশ ইকনমিক রিপোর্টার তখন তিনি সারা পাকিস্তানের ডাক সাইটে বার্তা সম্পাদক। সে সময়ে ঢাকায় তিনিই ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ বার্তা সম্পাদক। সত্যি কথা বলতে কি অবজারভারেই আমি সাংবাদিকতা শিখেছি।
মুসা ভাইকে সবাই ভয় করতো। আমিতো কোন নস্যি। এসাইনমেন্ট দেয়া এবং সেভাবে কাজ আদায় করার যোগ্যতায় তাঁর সমকক্ষ আর কেউ ছিলনা। সে সময়ে অবজারভারে রিপোর্টার ছিলেন শহীদুল হক,এনায়েত উল্লাহ খান, তওফিক আজিজ খান, এটিএম মেহেদী সহ আরও অনেক নামজাদা মানুষ। সেখানে আমি ছিলাম শিশু।
বার্তা সম্পাদক হিসাবে তিনি সমাজের অনেক দায়িত্ব পালন করেছেন। যেমন গাড়িতে বাংলা নাম্বার প্লেট লাগানো, সাইনবোর্ডে বাংলা চালু করা সহ এ দেশের বহু আন্দোলনে অবজারভারের অসীম অবদান রয়েছে। খেলার জগতেও মুসা ভাইয়ের ছিল এবং আছে। তিনি ব্রাদার্স ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক ছিলেন।
ভাষা আন্দোলনে অবজারভারের অবদান সীমাহীন। ওই সময়ে অবজারভারের জগত বিখ্যাত সম্পাদক আবদুস সালাম জেলে যান। কাগজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। পূর্ব ও পশ্চিমের অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়ে জনগণের কাছে তুলে ধরার ব্যাপারে অবজারভারের সমকক্ষ কোন কাগজই ছিলনা। এ ব্যাপারে অবজারভার গ্রুপ ছিল প্রধান সৈনিক। কিভাবে অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা লিখতে হবে তা আমাকে শিখিয়েছিলেন মুসা ভাই বিশেষ ভাবে যত্ন করে। এ শিক্ষাই আমি সারা জীবন কাজে লাগিয়েছি। এরপরে আমি পূর্বদেশের প্রধান অর্থনৈতিক রিপোর্টার হিসাবে কাজ করেছি যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে সারা পাকিস্তানে তোলপাড় চলছিলো। এ সময়ে পূর্বদেশের সম্পাদক মাহবুবুল হক ছিলেন সংসদ কাঁপানো সংসদ সদস্য। মাহবুবুল হককে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেছিলেন বংগবন্ধু। মুসা ভাই কিছুদিন দৈনিক জনপদের উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন। সে সময়ে আমি ছিলাম চীফ রিপোর্টার।
১৯৭৭ সালে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেইন সাপ্তাহিক নিউ নেশন বের করলে মুসা ভাই উপদেস্টা সম্পাদক নিযুক্ত হন। সম্পাদক হিসাবে মোতাহার হোসেন চৌধুরী সাহেবের নাম ছাপা হতো। ক্লাবে দেখা  দেখা হলে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, নিউ নেশনে কাজ করবো কিনা। না করতে পারলাম না। তাঁর মুখের উপর না করার মতো ক্ষমতাও আমার ছিলনা
মুসা ভাই এখন পরলোকে। সকল সমালোচনার উর্ধে। এ জগত ছেড়ে চলে যাওয়ার কিছুদিন আগে তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয়। বইয়ের লেখাগুলি দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই লেখাগুলিই প্রথমা সংকলিত করে বই আকারে প্রকাশ করে। বইয়ের কিছু বিষয় নিয়ে আমার দ্বিমত ছিল। তাই এই লেখাটি তৈরি করার উদ্যোগ গ্রহণ করি। বইয়ের নাম ‘আমার মুজিব ভাই’।
বইটি তেমন বড় নয়। মাত্র একশ’ চার পৃষ্ঠা। আমার মতো পাঠকের জন্যে দুই বেলার খোরাক। আমি আবার এক সাথে তিন চারটা বই পড়ি। তখন পড়ছিলাম হামিদুল হক চৌধুরী সাহেবের স্মৃতিকথা। এটা  ইংরেজীতে লেখা তিনশ’ ছিয়াশী পৃষ্ঠা। প্রকাশিত হয়েছে ১৯৮৯ সালে। এই স্মৃতিকথাতেও প্রচুর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক উপাদান আছে। চৌধুরী সাহেবের স্মৃতিকথা ৯০ সালেই একবার পড়েছি। চলমান লেখাটি তৈরি করার জন্যে আবার পড়ি। ঠিক এ সময়েই আমি বংগবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ছিলাম। বংগবন্ধুর আত্মজীবনীতেও প্রচুর ঐতিহাসিক তথ্য উপাত্ত আছে। তিনি যে একজন মুসলীম নেতা ছিলেন তা আত্মজীবনীতে সুস্পস্ট হয়ে উঠেছে। তিনি সারা জীবন বাংগালী মুসলমানের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে লড়াই করেছেন। রাজনীতি শুরু করেছিলেন একজন মুসলমান ছাত্র ও মুসলীম লীগ কর্মী হিসাবে। ৪৭ এর পর তাঁকে আবার ক্ষমতাসীন মুসলীম লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করতে হয়েছিল। সেই লড়াই থেকেই মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগের জন্ম হয়। শুরু হলো বাংগালী মুসলমানদের নতুন লড়াই। পূর্ব বাংলা বা  পূর্ব পাকিস্তানের ৯৯ভাগ মানুষ ছিল অতি সাধারন। ৪৭ এর আগের মুসলীম লীগ ছিল মুসলমানদের জন্যে একটি আলাদা রাস্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যে। ৪৭ এর পরে মুসলীম হয়ে গেল সাধারন মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন। ক্ষমতাসীন মুসলীম লীগ হয়ে গেলো কিছু নামীদামী মানুষের সংগঠণ। মাওলানা নিজেই দলের নাম ঠিক করেছিলেন। তিনি বলতেন, তাঁর দল হলো জনগণের মুসলীম লীগ আর অন্যটা হলো সরকারী মুসলীম লীগ। পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যবিত্ত ও সাধারন মানুষ দলে দলে যোগ দিলো নতুন মুসলীম লীগে।

মুসা ভাইয়ের লেখা এবং দেখা ‘মুজিব ভাই’ বইটি কোন ইতিহাস ভিত্তিক বই নয়। ইতিহাসের প্রয়োজনে কাজে লাগতে পারে তেমন কোন তথ্য উপাত্ত এই বইতে নাই। তিনি তাঁর মুজিব ভাইকে যেমন দেখেছেন তার কিছু ঘনিষ্ঠ খন্ড চিত্র বইতে আছে। বংগবন্ধুর রাজনৈতিক ও শাসক জীবন নিয়ে তেমন কিছুই নেই এই বইতে। বংগবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে নিজেই বলেছেন, তিনি স্কুল জীবন থেকেই সংগঠণ প্রিয় ছিলেন। সব সময়ই সাধারন মানুষের পক্ষে থাকতে ভালবাসতেন। বংগবন্ধুর এই আত্মজীবনী পড়লেই জানা যাবে বাংলার মুসলীম লীগ পাকিস্তান হওয়ার আগেই কোলকাতায় দ্বিখন্ডিত হয়ে গেছে। তারই ফল হলো পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী না হয়ে হলেন স্যার খাজা নাজিমুদ্দিন। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সমর্থকরা রাতারাতি খাজা সাহেবের দলে চলে গেলেন। অনেকেই সরকারী সুযোগ সুবিধাও পেয়েছেন। বংগবন্ধু ছিলেন সোহরাওয়ার্দী ও হাসেম সাহেবের গ্রুপে। ফলে ঢাকায় এসে বংগবন্ধু সরকার বিরোধী গ্রুপে পড়ে গেলেন। ঢাকায় তাঁর থাকার মতো তেমন জায়গা ছিলনা। তখনও তিনি ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মী। সরকারী দল সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সমর্থকদের সহ্যই করতে পারতেনা। পুরাণো ঢাকার সর্দার ও নেতারা সমর্থন করতো সরকারী দলকে। অনেকেই মনে করতেন, সবেমাত্র পাকিস্তান হয়েছে এখন বিরোধী দল বা বিরোধী গ্রুপের কি প্রয়োজন? সরকারী মুসলীম লীগের অগণতান্ত্রিক ও স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের কারণে খুব দ্রুত গতিতে বিরোধি গ্রুপ তৈরি হয়ে গেল। বিশেস করে ভাষার দাবীতে ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ শেখ সাহেব সহ ৭০ জন নেতা ও কর্মীকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এসব হয়েছে সরকারী নেতাদের অসহিষ্ণুতার কারণে। ১৯৫০ সালেই রাজশাহীর খপড়া  ওয়ার্ডে সরকার গুলি চালায়। সরকারের ব্যবহারের কারণেই  এভাবেই একদিন মুসলীম লীগের আসল কর্মীরা নতুন দল করার জন্যে তৈরী। হতে লাগলো । ইতোমধ্যে আসাম থেকে এলেন মাওলানা ভাসানী। ভাসনী সাহেব ছিলেন এক ধরনের বিপ্লবী চরিত্রের মানুষ। তিনি আসাম প্রাদেশিক মুসলীম লীগের সভাপতি ছিলেন। তাঁরই নেতৃত্ব আসামে মুসলীম লীগ মন্ত্রীসভা গঠণ করেছিল কয়েকবার। সেই মাওলানা সাহেব ঢাকায় এসে মুসলীম লীগের কাছে কোন পাত্তাই পেলেন না। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে  নাজিমুদ্দিন সরকার ঢাকায় ঢুকতে দিচ্ছেনা। ১৯৪৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর জিন্নাহ মারা গেলে নাজিমুদ্দিন সাহেব গভর্ণর জেনারেল হন আর নুরুল আমিন সাহেব পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। এ সময়ে কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে লিয়াকত আলী  খান সাহেব মহা শক্তিধর ব্যক্তিতে পরিণত হলেন। তিনি কোন ধরণের সমালোচনা বা বিরোধিতা একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না।

শেখ সাহেব বাম চিন্তাধারার ছাত্রকর্মীদের তেমন পছন্দ করতেন না। এদের তিনি উগ্রপন্থি বলতেন।  শেখ সাহেবের আত্মজীবনী পড়লেই জানতে পারবেন তিনি কমিউনিস্টদের পছন্দ করতেন না। তিনি উল্লেখ করেছেন, ১৯৪৭ সালে যে মুসলীম লীগকে লোকে পাগলের মতো সমর্থন করেছিল সেই মুসলীম লীগের প্রার্থীকে পরাজয় বরন করতে হলো কেন? তিনিই বলছেন, কোটারি, কুশাসন, জুলুম, অত্যাচার ও অর্থনৈতিক কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা না করার ফলে। দেশ স্বাধীন, জনগণ নতুন কিছু আসা করেছিল, ইংরেজ চলে গেলে তাদের অনেক উন্নতি হবে এবং শোষন থাকবেনা। আজ দেখছে ঠিক তার উল্টা।  এমনি এক পরিস্থিতিতে ১৯৪৯ সালের ২৩ শে জুন আওয়ামী মুসলীম লীগ গঠিত হলো মাওলানা ভাসানীকে সভাপতি করে। শামসুল হক সাহেবকে করা হয়েছিল সাধারন সম্পাদক। শেখ সাহেব তখন জেলে ছিলেন এবং জেলে থেকেই নতুন দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। নতুন দল গঠন হওয়ার পর রাজবন্দীরা আস্তে মুক্তি পেতে থাকেন। কিন্তু লিয়াকত আলী সাহেব ও তাঁর দলের নেতাদের গালাগালি বন্ধ হয়নি। তিনি কথায় কথায় মাওলানা ভাসানী সাহেবকে ভারতের লেলিয়ে দেয়া কুকুর বলে গালমন্দ করতেন। তখনকার মুসলীম লীগ নেতাদের সকলেরই বুলি ছিল কেউ বিরোধিতা করলেই ভারতের কুকুর বলা হবে। যে অখন্ড বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ ও রাস্ট্র হওয়ার কথা ছিল তা  নানা ষড়যন্ত্রের কারণে আজকের এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। অখন্ড স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশী বিরোধিতা করেছেন গান্ধীজী, প্যাটেল ও নেহেরুজী। মুসলীম লীগের কিছু নেতাও অর্ধেক বাংলা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। পাকিস্তান হওয়ার পর মুসলীম লীগ নেতারা  পুর্ব পাকিস্তানের নির্যাতিত মুসলমানদের উন্নতির কথা ভুলে গিয়ে দলাদলিতে লিপ্ত হয়ে গেলেন।

মুসা ভাই বংগবন্ধু বা তাঁর প্রিয় মুজিব ভাইয়ের চিত্র তুলে ধরেছেন তা একেবারেই হালকা চটুল গাল পল্পের চিত্রে পরিণত হয়েছে। আপদ বিপদ ও মসিবত বিষয়টি একটি একেবারেই হালকা মেজাজের ঠাট্টার গল্প। এর মানে হচ্ছে এই তিনজনকে বংগবন্ধু আদর করতেন। এরকম আরও হাজারো গল্প আছে বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে। তবে মুসা ভাইয়ের সাথে আমি একমত যে বংগবন্ধু বিশাল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। অপরাধ করে কেউ সামনে গেলেই ক্ষমা পেয়ে যেতেন। সুদূর অতীতে দয়াবান রাজারা এ রকমই ছিলেন। তবে রাস্ট্রীয় ক্ষমতায় বসে আইনী বা বেআইনী ভাবে দয়া বিতরন করা কতটা সমীচীন বা নৈতিকতার পক্ষে তা অবশ্যই বিবেচনার বিষয়। তবে তিনি যখন শুধুই নেতা ছিলেন তখন তিনি  তাঁর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল সাংবাদিকের বিশেষ ভাবে খবর রাখতেন। কোন সাংবাদিকই কখনও তাঁর উপর গোস্বা করতে পারেনি। তাঁকে সমর্থন করেনা এমন সাংবাদিকের সাথে সুসম্পর্ক ছিল। মুসা ভাই যে কাগজে কাজ করে পাকিস্তান বা বিদেশে খ্যাত হয়েছেন সেই কাগজের মালিকের সাথে সেখ সাহেবের মতভেদ ছিল। কিন্তু অবজারভারের সকল কাগজই পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষায় অন্য সকল কাগজের চেয়ে অনেক বেশী ভুমিকা রাখতো। পাকিস্তান আমলে একমাত্র ইমরেজী কাগজ অবজারভারই ছিল বাংগালী বা পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলতো। হামিদুল হক সাহেবও তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন যে আওয়ামী লীগের সকল বক্তৃতা বিবৃতি ছিল অবজারভার থেকে সংগৃহিত তথ্য উপাত্তের উপর নির্ভর করে।

হামিদুল হক চৌধুরী সাহেব ৪৭ সালে পুর্ব পাকিস্তানের প্রথম  কেবিনেটের মন্ত্রী ছিলেন। ওই মন্ত্রী সভায় আরও যাঁরা ছিলেন, তাঁরা হলেন স্যার নাজিমুদ্দিন( চীফ মিনিস্টার), চীফ জাস্টিস একেএম আকরাম ও নুরুল আমিন। স্যার ফেডারিক বোর্ণ ছিলেন প্রথম গভর্ণর। আজিজ আহমদ ছিলেন গভর্ণরের প্রধান সচীব। প্রথম কেবিনেটে চৌধুরী সাহেব শিল্প বাণিজ্য অর্থ ছাড়া কিছুদিন ভুমি ও ভুমি সংস্কার মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বেই ছিলেন।  এ প্রসংগ গুলো উল্লেখ করছি এ কারণে যে, শেখ সাহেব ও চৌধুরী সাহেবের স্মৃতিকথা অনেকটা একই সময় বা কালকে নিয়ে লেখা। দুজনেরই বিষয় ছিল শোষিত ও অবহেলিত পূর্ব পাকিস্তানকে নিয়ে। একজন মন্ত্রী , বিভিন্ন কমিটির সদস্য  ও একজন আইন বিশারদ  হয়ে আরেকজন মাঠে ময়দানে জনমত সংগ্রহ করে। দুজনেরই লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ মুক্ত করা। কিন্তু শত চেস্টা করেও পাকিস্তানের শাসক গোস্ঠিকে বুঝানো যায়নি। তারা মনে করতো এসব ভারত করাচ্ছে। চৌধুরী সাহেব লিখেছেন, পাকিস্তানের কেন্দ্রের সাথে ‘আমার প্রধান বিরোধ ছিল, আমি পুর্ব বাংলার জন্যে অধিকতর স্বায়ত্ব শাসন ও অর্থ বরাদ্দ চেয়েছিলাম। কারণ, এই অঞ্চল দুশো বছরের শোষণের ফলে একেবারেই দারিদ্র পীড়িত হয়ে পড়েছিল। ’ পুর্ববাংলাকে কিভাবে অর্থনৈতিক ভাবে উন্নত করা যায় তা নিয়ে আমি একটি পেপারও তৈরি করেছিলাম। ৪৭ আগস্টে নাজিমুদ্দিন কেবিনেটের সদস্য হয়ে আমি পুর্ব পরিকল্পত কর্মসূচী  বাস্তবায়নের দিকে নজর দিলাম। নাজিমুদ্দিন সাহেব আমাকে সর্বতো ভাবে সহযোগিত করেছেন। কিন্তু জিন্নাহ সাহেবের মৃত্যুর পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়ে গেল।

মুসা ভাইয়ের বইতে একটা বিষয় খুবই স্পস্ট যে ,তাঁর সাথে বংগবন্ধু ও তাঁর পরিবারের খুবও ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি যে কোন সময়ে তাঁদের বেডরুমে চলে যেতে পারতেন। এবং বেগম মুজিব তাঁকে পান সাজিয়ে খাওয়াতেন। আমরা আরও জানলাম যে বেগম মুজিব সব সময় পানের বাটা সাথে সাথেই  রাখতেন। বংগবন্ধু বিয়ে করেছিলেন তাঁর চাচাতো বোনকে। যখন বিয়ে বেগম মুজিবের বয়স ছিল তিন কি চার বছর। মুরুব্বীদের নির্দেশেই এই বাল্য বিবাহের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তখন বংগবন্ধুর বয়সও ১২/১৩র বেশী ছিলনা। বেগম মুজিব  বাল্যকাল থেকেই বংগবন্ধুর মায়ের কাছে বড় হয়েছে। অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লেই দেখা যাবে বেগম ফজিলতুন নেসা সারা জীবন কিভাবে বংগবন্ধুকে সাহায্য করেছেন। পুরো বইতে বংগবন্ধু  বেগম মুজিবকে রেনু বলেই সম্বোধন করেছেন। বুঝা যায় দুজনের ভিতর খুব ভাব ছিল। ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের কারণেইতো দেশে ফিরে এসেই মুসা ভাইকে বিটিভির ডিজি করেছিলেন। পরে মর্ণিং নিউজের সম্পাদক হয়েছিলেন। শুরুতেই ফয়েজ  ভাইকে করেছিলেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সম্পাদক। গাফফার সাহেব স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে বংগবন্ধুর সহযোগিতায় লন্ডন চলে গিয়েছিলেন। দেশে থাকলে তিনিও পদ পেতেন। ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেই ৭৩ সালে মুসা ভাই আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচন করে জাতীয় সংসদের সদস্য হয়েছিলেন। একটা গল্প আছে , মুসা ভাই নাকি মর্ণিং নিউজের চাকুরীতে ইস্তফা না দিয়েই নির্বাচন করতে গিয়েছিলেন। হয়ত তিনি ভেবেছিলেন নির্বাচনে জয়ী হতে না পারলে আবার মর্ণিং নিউজের সম্পাদক পদে যোগ দিবেন। কিন্তু বংগবন্ধু তাঁকে সে সুযোগ দেননি।  মুসা ভাইকে সরিয়ে বংগবন্ধু হুদা ভাইকে সম্পাদক করেছিলেন। এ সময়ে আরও গল্প চালু হয়েছিল। তা হলো মুসা ভাইয়ের বিশ্বাস ছিল নির্বাচিত হয়ে এলে বংগবন্ধু তাঁকে তথ্যমন্ত্রী বানাবেন। এই মর্মে নাকি লন্ডনের কোন কাগজে ছাপা হয়েছিল ‘মুসা তথ্যমন্ত্রী হবেন’। অগ্রিম এ খবর ছাপা হওয়াতে নাকি বংগবন্ধু মুসা ভাইকে আর মন্ত্রী করেননি। মুসা ভাই সারা জীবন বংগবন্ধুর প্রাণের লোক হয়েও প্রায় সকল সরকারের অধিনেই চাকুরী করেছেন। তিনি আইউব সরকারের আমলে সাংবাদিক হিসাবে মোহাম্মদপুরে জমি নিয়েছেন। অন্যান্য সাংবাদিকরাও নিয়েছেন। আবার ৭৩ সালে এমপি হয়ে গুলশানে জমি নিয়েছেন। আমি দেখেছি আমাদের বহু মুরুব্বী সাংবাদিক সকল সরকারের চাকুরী ও অনুকুল্য লাভ করেও বলতেন এতো হচ্ছে পেশাদারিত্ব। ফয়েজ ভাইতো মোশতাক সরকারের প্রতিনিধি হয়ে চীন গিয়েছিলেন কূটনৈতিক স্বীকৃতি আদায় করার জন্যে। একই ভাবে হলিডে’র এনায়েত উল্লাহ খান সাহেব বামপন্থী হয়েও সকল সরকারের আমলেই মন্ত্রী রাস্ট্রদূত সম্পাদক হয়েছেন। লোকে বলে , কাগজ বন্ধ করার জন্যে বংগবন্ধু যে কমিটি করেছিলেন তার সদস্য ছিলেন খান সাহেব। কথাগুলো এ কারণে বললাম যে, মুসা ভাই উল্লেখ করেছেন বংগবন্ধুর কাছ থেকে তিনি তেমন আনুকুল্য গ্রহন করেননি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের দুই অবিসংবাদিত নেতা  মাওলানা সাহেব ছিলেন ভারত সরকারের নজরবন্দী হয়ে। আর বংগবন্ধু ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে। জানিনা , এই অবস্থাকে গুণীজন কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন। অপরদিকে মুসা ভাই বলেছেন , ৭ই জুন বংগবন্ধু যুদ্ধ ঘোষনা করেছিলেন। স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। পচিশে মার্চ পর্যন্ত অবাংগালীদের বিরুদ্ধে বাংগালীরা রাগ ও আক্রোশের পরিচয় দিয়েছে। সারাদেশে লুটতরাজ হয়েছে। যুদ্ধ ঘোষণা করে বংগবন্ধু জেনারেল ইয়াহিয়ার সাথে কি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন তা কিন্তু দেশবাসী আজও জানেনা। কি কারণে বংগবন্ধু সবাইকে চলে যেতে বলে নিজে পাকিস্তান আর্মির কাছে ধরা দিলেন তাও আজ পর্যন্ত খোলাসা হয়নি। পাকিস্তানে যখন বংগবন্ধুর বিচার চলছিলো তখন কি বলেছিলেন? তিনি কি বলেছিলেন, হাঁ, আমি স্বাধীনতা চাই, এবং সেজন্যেই যুদ্ধ ঘোষনা করেছি। রাস্ট্রদ্রোহিতার ওই মামলার এফিডেভিটে তিনি কি বলেছিলেন তা আমাদের কে জানাবে? মুসা ভাই ঠিকই বলেছেন যে, ১৫ই আগস্টের হৃদয় বিদারক ঘটনার পেছনে বিদেশী কারা কারা জড়িত এ প্রশ্নের সুরাহা এখনও হয়নি। কে জানে কখন হবে? সবাই আন্দাজ করে বলেন, আমেরিকা ও পাকিস্তান জড়িত। আমিতো মনে করি এজন্যে বন্ধু দেশ জড়িত। একই ভাবে জিয়াউর রহমানের হত্যার পিছনে কোন দেশ জড়িত। জেনারেল মঞ্জুরকে কারা হত্যা করেছে? আসলে রাজনেতিক হত্যা গুলোর কোন কুল কিনারা হয়না। যেমন গান্ধী হত্যা, জিন্নাহকে বিষ প্রয়োগ(?), লিয়াকত আলীকে হত্যা, ইন্দিরা হত্যা, রাজীব গান্ধী ও সঞ্জীব গান্ধী হত্যা, ভুট্টোর ফাঁসি, জেনারেল জিয়াউল হকের হত্যা, বংগবন্ধুর হত্যা, জিয়া হত্যা এবং সর্বশেষ বেনজির হত্যা। এসব হত্যার রহস্য কি কখনও উদ্ঘাটির হবে? রাজনীতিতে হত্যা হাজার বছর বছর ধরে চলে আসছে।

সব শেষ একটা কথা উল্লেখ না করে পারছিনা। তাহলো আইউবের গোলটেবিল বৈঠকে অংশ গ্রহণের জন্যে বংগবন্ধুর মুক্তিলাভ করা। মুসা ভাই বলেছেন, বেগম মুজিব বংগবন্ধুকে শাসিয়েছেন। তিনি যদি প্যারোলে মুক্তির জন্যে বেল পিটিশন সাইন করেন তাহলে বেগম মুজিব বই নিয়ে বসে থাকবেন। তিনি আর ৩২ নম্বরে ফিরে আসতে পারবেন না। আরেকটি তথ্য মুসা ভাই দিয়েছেন, তাহলো শেখ সাহেব মাওলানা সাহেবকে অনুরোধ করেছেন তাঁর মুক্তির জন্যে আন্দোলন করতে। যখন ইসলামাবাদে জোর লবী চলছে বংগবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে গোলটেবিলে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। তখন ইসলামাবাদে উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ নজরুল, খোন্দকার মোশতাক ও তাজউদ্দিন। তাঁরা বলেছেন, শেখ সাহেব মুক্তি না পেলে তাঁরা গোলটেবিলে অংশ গ্রহন করবেননা। তবে লিখিত ভাবে গোলটেবিলের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবেন। একই সময়ে ভাসানী সাহেব শেখ সাহেবের মুক্তির জন্যে জ্বালাও ও ঘোরাও আন্দোলন শুরু করেছেন। বিচারপতিদের  আদালতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। সবুর সাহেব তখন সরকারী দলের নেতা। তিনি মৌলবী করিদ আহমদকে দিয়ে ফোন করালেন জেনারেল মুজাফফরের কাছে শেখ সাহেবের কথা বলার জন্যে। মৌলভী ফরিদ শেখ সাহেবকে অনুরোধ জানালেন তিনি যেন প্যারোলে মুক্তি না নেন। কারণ কয়েকদিনের মধ্যেই আগরতলা মামলা বাতিল হয়ে যাবে। সেনা বাহিনী আইউবের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। মৌলভী ফরিদের কথা বিশ্বাস করলেন শেখ সাহেব এবং বেলবন্ডে দস্তখত করলেননা। তাজউদ্দিন সাহেবেরা বিষয়টা জানতেন না বলেই প্যারোলে মুক্তি কথা বলেছিলেন। এর ফলে শেখ তাজউদ্দিনের ভিতর ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছিল। মুসা ভাইয়ের তথ্য অনুযায়ী বেগম মুজিবের বটি কাহিনীর কারণে কোন ঘটনাই ঘটেনি। মাওলানা সাহেব ও ভুট্টো গোলটেবিল বৈঠকে অংশ গ্রহণ করেননি। শেখ সাহেবকেও তাঁরা অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু শেখ সাহেব মাওলানা সাহেবের অনুরোধ শুনেননি।
জীবনের শেষ সময়ে এসে মুসা ভাই টিভি টকশো’তে অনেক সত্য ও কড়া কথা বলে সরকারের বিরাগ ভাজন হয়েছিলেন। ফলে,তাঁর মৃত্যুর পর সরকার বা আওয়ামী লীগ তেমন কিছু করেনি। এমন কি সাবেক সংসদ সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধার সম্মানটুকুও দেয়া হয়নি। একেই বলে ভাগ্য। একই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছিল অবজারভারের সম্পাদক সালাম সাহেবকে। সারাজীবন সালাম সাহেব পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ ও গণতন্ত্রের কথা বলেছেন। তার জন্যে জেল জুলুম সহ্য করেছেন। এ মানুষটাকে স্বাধীনতার পর পরই চাকুরী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

লেখক:  এরশাদ মজুমদারের জন্ম ১৯৪০ সালের ৮ই মার্চ ফেণী শহরের উকিল পাড়ার মজুমদার বাড়িতে। ১৯৬১ সালের অক্টোবরে অবজারভারের শিক্ষানবীশ ইকনমিক রিপোর্টার হিসাবে সাংবাদিকতা শুরু করেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের কবিতাপত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ইতোমধ্যে তাঁর তিনটি উপন্যাস ও সাতটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। আরও আটটি বই প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। তিনি আন্তর্জাতিক সাহিত্য সংগঠণ পিইএন এর সদস্য। বর্তমানে তিনি আধ্যাত্ববাদ নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বাংলাদেশের ‘রূমী ষ্টাডি সার্কেল’এর সভাপতি।

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »


স্কুল জীবন থেকেই আমি লিখতে ও বলতে ভালবাসি। তারপর একদিন লেখালেখিটা পেশা হয়ে গেছে। আমার প্রথম লেখা মানে কবিতা ‘ফেণীর রাজা’ খাজা সাহেবের কাগজে ছাপা হয়েছে ৫২ কি ৫৩ সালে। তখন আমি ফেণী হাইস্কুলে সপ্তম কি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। বিখ্যাত হেড মাস্টার জালাল সাহেব ৫২ সালে ফেণি হাইস্কুলে সবেমাত্র যোগ দিয়েছেন হেড মাস্টার হিসাবে। ৫০ এর দাংগার পর হেডমাস্টার সম্মানিত মণীন্দ্র মুখার্জী ফেণী ছেড়ে  ভারতে চলে যান। দাংগার পর স্কুল কিছুদিন বন্ধ ছিল। দাংগায় সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল উকিল পাড়া ও মাস্টার পাড়া। আমাদের বাড়ি( বাসা নয়) ছিল উকিল পাড়া। এখনও আছে। তবে হিন্দু উকিল বাবুরা কেউই নেই। ৫০ থেকে ৫২র মধ্যে বাড়ি গুলো  কিনে নিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা। দাংগার বছর আমি ফেণী মডেল স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। তখনও স্কুলটি হাই স্কুলে পরিণত হয়নি। এই স্কুলের হেড মাস্টার ছিলেন আবদুল বারীক সাহেব। তিনি তখন অনারারী ম্যাজিস্ট্রেটো ছিলেন। স্কুলের কাছেই ছিল স্যারের বাড়ি( মুন্সী বাড়ি )। কিন্তু স্কুলটি চালাতেন সেকেন্ড স্যার কাজী আবদুল গফুর। তাঁর বাড়ি গোবিন্দপুর কাজী বাড়ি। কাজী সাহেব বারীক সাহেবের আত্মীয় ছিলেন। ৫১ সালে ষষ্ঠ  শ্রেণী পাস করে আমি ফেণী হাই স্কুলে চলে যাই। ৫২ সালের ঢাকার ভাষা আন্দোলনের জোয়ার লেগেছে ফেনীতে ১৯৫৩ সালে ফেণী কলেজ মজলিসের সাধারন সম্পাদক ও ছাত্রনেতা আমির হোসেনের নেতৃত্বে। রানৈতিক ভাবে এই  আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন খাজা আহমদ সাহেব। তখন তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেননি। বাম চিন্তাধারার গণতন্ত্রী দল করতেন। মির্জা গোলাম হাফিজ ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতও এই দল করতেন। খাজা সাহেব ৫৪ সালের নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন গণতন্ত্রী দল থেকেই এবং প্রদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমির হোসেন সাহেব ছিলেন আমার নিকট আত্মীয়। আমাদের বাড়িতেই থাকতেন। তিনি ছিলেন খুবই মেধাবী একজন ছাত্র। আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। তিনি সারা মহকুমায় ছাত্র ধর্মঘটের  আহবান করেছিলেন। আমার উপর দায়িত্ব পড়েছিল বারিক মিয়া সাহেবের স্কুলে ধর্মঘট করানো। আমি তখনও জানিনা কিভাবে ধর্মঘট হয়। ভয়ে বুক কাঁপছিলো। ছাত্রদের সাথে আগে কথা বললে সবকিছু ফাঁস হয়ে যাবে এই ভয়ে কাউকে কিছু জানাইনি। বড়রা আমাকে বুঝিয়ে দিলেন তুমি শুধু স্কুলের ঘন্টাটা পিটিয়ে দিয়ে পালিয়ে যাবে। বেলা এগারটার দিকে আমি তাই করলাম। এটাকে ছুটির ঘন্টা মনে করে ছাত্ররা সব বেরিয়ে পড়লো। কিন্তু ইতোমধ্যে সবাই জেনে গেছে আমি একাজটি করেছি। ব্যাস, আর যায় কোথায়! বিকেল চারটার দিকে পুলিশ আমায় গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। পুলিশ আমার সাথে কোন খারাপ ব্যবহার করেনি। একটা টুলের উপর বসিয়ে রেখেছিল। আমি নিজেকে খুবই একাকী বোধ করলাম। মনে হলো , এ জগতে আমার কেউ নেই। আমি ভয় পেয়ে কাঁদছিলাম। এ সময়ে আমার মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিলো। ৫১ সালের অক্টোবর মাসে আমার মা আশরাফ উন নেসা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তখন আমি মাত্র এগারো। আমার মা’ই আমার প্রথম শিক্ষক ছিলেন। তিনি কিছু পড়ালেখা জানতেন। প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণীতে তিনি আমাকে অংক করাতেন। তিনি খুব কড়া ছিলেন। মায়ের অনুপস্থিতে আমি একটু স্বাধীন হয়ে গিয়েছিলাম। মায়ের স্মৃতি আমাকে চিরদিন পোষাকের মতো জড়িয়ে রয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয় মা’তো সাথেই আছেন। আমার প্রথম ছাপা বইয়ের নাম ‘মায়ের চিঠি। এতা প্রকাশ করেছিলেন বিখ্যাত ব্যান্কার মুজিবুল হায়দার চৌধুরী। সেই থেকেই আমার প্রকাশনা শুরু হয়েছে। এরপরে আরও অনেক গুলো বই। তিনটি উপন্যাস ইতোমধ্য প্রকাশিত হয়েছে। আরও একটি প্রকাশর অপেক্ষায় আছে। ইতোমধ্য আমি আমি দেশী বিদেশী অনেক গুলো এওয়ার্ড পেয়েছি।

আমার বাবা আবদুল আজিজ মজুমদার ছিলেন খুবই নরম প্রকৃতির মানুষ। আমাকে সীমাহীন ভালবাসতেন। আমার কোন কাজে বাধা দিতেন না। সে বছরই  মানে ৫৩ সালে ফেণীতে ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হয়। কাজী মেসবাহ বা মনির ভাই ছিলেন মহকুমা সম্পাদক। যতদূর মনে পড়ে আমি ছিলাম সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক। যা হোক, বিকেল ছ’টার দিকে আমার বাবা আমাকে মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিলেন। বাবাকে দেখে আমি আরও জোরে হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগলাম। এরপরে ক্রমাগত রাজনীতির সাথে জড়িয়ে যেতে লাগলাম। কোন দলীয় রাজনীতির বন্ধনে আমাকে কখনও আকৃষ্ট করেনি। যদিও কিছুদিন ন্যাপের সাথে জড়িত ছিলাম। আসলে মানবতাবেধই আমাকে রাজনীতি সমাজ সেবার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলেছে। মানুষের সেবা করা আমার জীবনের প্রধান ব্রত।

সে সময়ে ফেণী ছিল সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের বিরাট একটি কেন্দ্র। মাস্টার পড়ায় রবীন্দ্র পাঠাগার গড়ে উঠেছিল। সেই পাঠাগারে স্কুল কলেজের শিক্ষকরাও যেতেন। মনে আছে আমি একবার হাজী মহসিন ও শরত্‍চন্দ্রের ছবি এঁকে পুরস্কার পেয়েছিলাম। ফেণী হাই স্কুল থেকে প্রথম ছাপানো দেয়াল পত্রিকা ‘আলো’ প্রকাশিত হয়েছিল ৫৫ সালে। আমি ছিলাম আলোর সম্পাদক। কবি শামসুল ইসলাম ছিল সহকারী। আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষক সাত্তার সাহেব ছিলেন প্রকাশনা কমিটির সভাপতি। তিনি ছিলেন রামপুর সওদাগর বাড়ির সন্তান। খুবই অমায়িক মানুষ ছিলেন। তখন ফেণীতে খাজা সাহেবের সংগ্রাম ছাড়া কোন সাপ্তাহিক কাগজ ছিলনা। থাকলেও আমার মনে পড়ছেনা। খাজা সাহেব তখন থাকতেন তাকিয়া বাড়ির ভিতরেই একটা ঘরে। সেখান থেকেই কাগজ বের হতো। এই সময়েই আমি আজাদের মুকুলের মাহফিলের সদস্য হই। সদস্য হিসাবে তখন নাম ছাপা হতো। এরপরে আমি খেলাঘরেরও সদস্য হই। ৫৬ সালে ফেণী কলেজে গিয়ে  আমি লেখালেখির সাথে আরও বেশী জড়িত হই। কলেজে জোছনা বাবু আমাদের বাংলার শিক্ষক। যদিও আমি কমার্স পড়তাম। কমার্সের হেড ছিলেন কাজী লুত্‍ফুল হক। জোছনা বাবুর সাথে আমি আর রফিক ভুঁইয়ার সম্পর্ক ছিল খুবই মধুর। আমাদের সকল সাংস্কৃতিক কর্মসূচীর সাথে তিনি থাকতেন। ফেণী কলেজে থাকতেও আমি কলেজ ম্যাগাজিনের প্রকাশনার জড়িত ছিলাম। এরপর ঢাকায় চলে আসি লেখাপড়ার জন্যে। এখানে এসে আমি পুরোপুরি সাহিত্য জগতের সাথে জড়িয়ে পড়ি। বিশেষ করে নামজাদা কবি সাহিত্যিকদের সাথে দেখা করা ও সমবয়সী কবিদের সাথে আড্ডা মারা ছিল আমার প্রতিদিনের রুটিন। সাথে ঢাকার কাগজ  গুলোতে কবিতা ছাপা হতে শুরু করলো। তারপরেতো আমি ৬১ সালে অবজারভারে নবীশ ইকনমিক রিপোর্টার হিসাবে যোগ দিই। ৬১ সাল থেকেই কাগজ গুলোতে আমার কবিতা ছাপা শুরু হয়। কবিতা দিলেই ছাপা হয়ে যায়। মনে হলো বাছ বিচার নেই। যেহেতু আমি খবরের কাগজে চাকুরী করি সেহেতু সবাই চিনতো। নাম দেখেই কবিতা ছাপিয়ে দেয়। এক সময় মনে হলো কবিতা ছাপিয়ে কি লাভ। আমিতো আর কখনই কবি হবোনা।

২০০২ সালে কবিতার জন্যে আমেরিকা থেকে কবিতার জন্যে এওয়ার্ড পাওয়ার পর আমি আবার সিরিয়াসলি কবিতায় মনো নিবেশ করি। এখন আমি নিয়মিত কবিতা লিখি। জাতীয় প্রেসক্লাবের কবিতা সংগঠণ কবিতাপত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। প্রতিমাসে কবিতা পাঠের আসর বসে। কবিতাপত্র নামে একটি  একটি মাসিক নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। প্রখ্যাত গীতিকার ও কবি কেজি মোস্তফা কবিতাপত্রের সম্পাদক। দশ বছর ধরে তিনি এতার সম্পাদনা করছেন। এছাড়াও আমি আন্তর্যাতিক বহু কবিতা সংগঠনের সদস্য। শুরুতেই বলেছি বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই লিখে চলেছি। নিয়মিত খবরের কাগজে কলাম লিখতে হয়। কলাম লেখার চাপের পরে থাকে অনুরোধের লেখার চাপ। না করা যায়না। পারিশ্রমিক বা সম্মানী দিবার কথা বললেও অনেক সময় লিখা হয়ে উঠেনা। অনেকদিন হলো হাতে লিখতে পারিনা। ডান হাত চলেনা। বাঁ হাত দিয়ে শুধু প্রয়োজনীয় দস্তখত করি। তাও আমার বড়ছেলে নওশাদ শিখিয়ে দিয়েছে। ভাগ্য ভালো কম্পিউটারে কম্পোজ করতে শিখেছিলাম।  বিগত ১৫ বছর ধরেই কম্পিউটারে কম্পোজ করছি, ইমেইল করছি। একাজটিও ছেলেরা আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে। মাঝে তারা বকা ঝকাও করে। বলে, এত বছর হয়ে গেলো ভাল করে কম্পিউতারে কাজ করতে পারোনা। আমি বলি বাবা, যা পারি এটাতেই আল্লাহপাকের হাজার শোকর আদায় করছি। আমার বয়সী সাংবাদিকদের ভিতর ১০/১৫ জন কম্পিউটার ব্যবহার করতে জানে। কবিরা বেশীর ভাগই কম্পিউটার ব্যবহার করতে চায়না।

এখন আমার সময় কাটে শুধুমাত্র লেখালেখি করে। দুপুরে তিন ঘন্টা প্রেসক্লাবে আড্ডা মারি। ওখানেই খাই। ক্লাবেও মাঝে মাঝে কম্পিউটার ব্যবহার করতে হয় জরুরী কাজ পড়ে গেলে। আমাদের ক্লাবে একটা মিডিয়া সেন্টার আছে। সেখানে বিনে পয়সায় কম্পিউটার শিখানো হয়। এখন অনেকেই এখানে বসে রিপোর্ট তৈরি করে ইমেইলে অফিসে পাঠিয়ে দেয়। কম্পিউটার জানা এখন সাংবাদিকদের জন্যে বাধ্যতামূলক।

Read Full Post »