Feeds:
Posts
Comments

Archive for the ‘Articles’ Category


আমাদের রাজনীতিতে আওয়ামী ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব / এরশাদ মজুমদার

স্কুলে পড়ার সময় থেকেই আমি রাজনীতির সাথে জড়িত হই। ফেণীতে আমরাই প্রথম ১৯৫৩ সালে ছাত্র ইউনিয়নের শাখা খুলি।কেন ছাত্র ইউনিয়নের শাখা করেছি তা এখন ব্যাখ্যা করে বলতে পারবোনা। আমরা দেখেছি যে, ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যরা মহকুমা শহরের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।তারা কবিতা লেখে, নাটক করে, আবৃতি করে, দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করে, শহরের যে কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে। শিক্ষকদের সাথেও তাদের সম্পর্ক ভাল।অভিভাবকরাও তাদের পছন্দ করে।কিন্তু সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন তাদের ভাল নজরে দেখতে পারতোনা। ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা নাকি বামপন্থী ছিল। মানে কমিউনিস্টদের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল। তখন দেশে মুসলীম লীগ সরকার ছিল। মুসলীম লীগাররা বাম চিন্তাধারার লোকদের দেখতে পারতোনা। এমন কি বাম চিন্তাধারার বই বা ম্যাগাজিন পড়লেও গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা তাড়া করতো। আমাদের স্কুল জীবন এভাবেই কেটেছে।৫৪ সালের নির্বাচনের পরেও পরিস্থিতির তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কারণে পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলার নির্বাচিত সরকার বেশীদিন টিকেনি। ৯২ক ধারা জারী করে কেন্দ্রীয় সরকার প্রদেশের দায়িত্ব গ্রহন করে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের গ্রেফতার করে জেলখানায় পাঠানো হয়।আমাদের এলাকার জনপ্রতিনিধি ছিলেন প্রখ্যাত জননেতা খাজা আহমদ সাহেব। তিনি তখন খুবই জনপ্রিয় বামপন্থী নেতা ছিলেন। তাঁর দল ছিল গণতন্ত্রী দল। তখন মির্জা গোলাম হাফিজ ও আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও এই দল থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। যুক্তফ্রন্টে বহু দলের সমাবেশ ছিল। তবে মূল দল ছিল আওয়ামী মুসলীম লীগ। জনগণের ভয়েই দলের নামের সাথে মুসলীম শব্দটি রাখা হয়েছিল। যুক্তফ্রন্টের প্রথম চীফ মিনিস্টার ছিলেন কেএসপি নেতা শেরে বাংলা একে ফজলুল হক। যদিও যুক্তফ্রন্টের প্রধান নেতা ছিলেন আওয়ামী মুসলীম লীগের মাওলানা ভাসানী। সোহরাওয়ার্দী সাহেব সবেমাত্র ভারত থেকে পূর্ব বাংলায় এসেছেন। কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে দেখতে পারতোনা।ফলে চীফ মিনিস্টার হওয়ার জন্যে একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন প্রবীণ নেতা শেরে বাংলা। যুক্তফ্রন্টের কি দশা হয়েছিল তা বংগবন্ধুর আত্মজীবনী পড়লেই পাঠক সমাজ জানতে পারবেন।
এক সময় ভাল ছাত্রদের সংগঠণ ছিল ছাত্র ইউনিয়ন। এখন আর সে সব দিন নাই। এখন ছাত্র নেতা হতে হলে ভাল ছাত্র হওয়া লাগেনা। ছাত্র লীগ অতীতে যেমন ছিল এখনও তেমন আছে।প্রসংগত বলতে চাই রাজনীতিতে ৪৭ সালের পূর্বে যে ভাষা ছিল তা পরবর্তী পর্যায়ে আস্তে আস্তে পরিবর্তিত হতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলার রাজনীতি বহু যুগ ধরে উকিল মোক্তার ডাক্তার ও বিত্তবান সমাজ নিয়ন্ত্রন করেছে। তাঁরাই মুসলীম লীগ গঠন করেছেন, তাঁরাই পাকিস্তান আন্দোলন করেছেন এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছেন। পূর্ব বাংলার সাধারন মানুষ হিন্দু জমিদার ও পোদ্দারদের হাত থেকে বাঁচতে চেয়েছেন। শেরে বাংলা ও স্যার নাজিমুদ্দিন ঋণ সালিশী বোর্ড করে মুসলমান কৃষকদের রক্ষা করেছিলেন। পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল শুধুমাত্র হিন্দুদের অত্যাচারের কারণে। গান্ধীজী ও নেহেরুর নমণীয় মনোভাব থাকলে ভারত কখনও ভাগ হতোনা। দ্বিজাতি তত্ব মুসলমানেরা শুরুতে কখনও পেশ করেনি। পাকিস্তান প্রস্তাবইতো এসেছে ১৯৪০ সালে। মুসলমানেরা উপায় না দেখে নিজেদের আত্মরক্ষার জন্যে এ প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। আপনারা একবার ভারতীয় মুসলমানদের বর্তমান অবস্থার দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন। মাঝে মাঝে তাদের করুণ অবস্থার প্রতিবেদন আংশিক প্রকাশিত হয়। সেখানে সাধারন মুসলমানেরা অচ্যুতের জীবন যাপন করেন। ভারতীয় বাংলায় মুসলমানের সংখ্যা ৩০ ভাগ। কিন্তু সরকারী ও আধা সরকারী চাকুরীতে তাদের উপস্থিতি এক ভাগেরও কম। অপরদিকে বাংলাদেশে মাইনরিটি বা সংখ্যালঘুদের অবস্থান ১০ ভাগের মতো। সরকারী আধা সরকারী সংস্থায় তাদের উপস্থিতি ১৫ ভাগের মতো। পরিসংখ্যানে কিছুটা ভুল হতেও পারে। শুধুমাত্র অবস্থান বুঝাবার জন্যেই আমি এর উল্লেখ করেছি। যদি পাকিস্তান না হতো তাহলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ৩০ কোটি মুসলমানের অবস্থা ভারতীয় অচ্যুতদের মতো হতো। কিন্তু সেই সাধের ও স্বপ্নের পাকিস্তান টিকেনি শুধুমাত্র পাকিস্তানের এক শ্রেণীর রাজনীতিক ও সেনা বাহিনীর কারণে। তাদেরই কারণে ৭১ সালের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ও পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্যে কর্মী হিসাবে বংগবন্ধু যে লড়াই করেছেন তার বিবরণ তাঁর বইতে আছে। তাঁর ওই বইতে তত্‍কালীন সমাজচিত্রও ফুটে উঠেছে। কিভাবে তিনি হিন্দু সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন তাও রয়েছে ওই বইতে। কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার পর তিনি দেখলেন এক ভিন্ন দৃশ্য। বৃটিশ শাসন আমলের মতোই আবার শুরু হলো জেল জুলুম। ফলে জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্যে সাধারন মানুষের জন্যে একটা রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।
এর আগে অনেক বারই বলেছি আওয়ামী মুসলীম লীগের জন্মের ইতিহাস। মাওলানা ভাসানী ছিলেন আসাম মুসলীম লীগের সভাপতি। সেখানে তিনিই মুসলীম লীগকে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীন পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানে এসে মুসলীম লীগে তাঁ কোন স্থান হলোনা। পূর্ব পাকিস্তানে মুসলীম লীগের যাঁরা নেতা হলেন তাঁদের সাথে সাধারন কর্মীদের সাথে তেমন কোন সম্পর্ক ছিলনা। করাচী বা ইসলামাবাদ থেকে তাঁদের চালানো হতো। ক্ষমতাসীন মুসলীম লীগ নেতারা মনে করতেন দেশ মাত্র স্বাধীন হলো এখনি ভিন্নমত পোষণের কি প্রয়োজন। মাওলানা ভাসানী এবং তাঁর ভক্ত ও সমর্থকরা মনে করতেন পূর্ব বাংলার সাধারন মানুষের জন্যেই নতুন দেশতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুরুতেই সাধারন মানুষের সমস্যার সমাধান করতে হবে। জিন্নাহ সাহেব ১৯৩৬ সালের দিকে পূর্ব বংগ সফরে এসে এখানকার গরীব কৃষক ও প্রজাদের অবস্থা দেখে বলেছিলেন, বাংলার সাধারন মানুষের জন্যেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প কিছুদিন পরেই জিন্নাহ সাহেব মারা গেলেন। পরবর্তী নেতারা সারা পাকিস্তানের গরীব নির্যাতিত মানুষের কথা ভুলে ক্ষমতার কোন্দলে জড়িত হয়ে পড়লেন। শেখ সাহেব এবং মাওলানা ভাসানী জনগণের সামনে যে ভাষায় কথা বলতেন তা কখনই দেশ পরিচালনার ভাষা ছিলনা। ওইসব ভাষা ছিল জনগণকে মুগ্ধ করার ভাষা। ওই ভাষায় ছিল জনগণকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখাবার শব্দ ও প্রতিশ্রুতি। মাওলানা সাহেবের জন্যে ওই ভাষা ছিল শোভনীয়। কারণ তিনি কখনই ক্ষমতায় যেতে চাননি। তিনি ছিলেন বংশীবাদকের মতো। কিন্তু শেখ সাহেবতো ক্ষমতার রাজনীতি করতেন। তিনি ৫৪ সালেই অল্প বয়সেই নেতা ও মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু ভাষার পরিবর্তন হয়নি। তিনি ক্ষমতা এবং জনগণের কাছে থাকা বা চিরদিনের জন্যে জনগণের নেতা থাকতে চাইতেন। ফলে ক্ষমতায় গিয়েও তিনি রাস্তার ভাষা বা জনসভার ভাষা ব্যবহার করতেন। এ ধরণের ভাষার মূল লক্ষ্য হলো যেন তেন প্রকারে নিজের জনপ্রিয়তা রক্ষা করা। সেই ধারা আজও অব্যাহত আছে। আমার ব্যক্তিগত আশা ছিল সাধারন মানুষকে ধোকা দিয়ে ভোট আদায় করা এবং ক্ষমতায় যাওয়ার দিন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর শেষ হয়ে যাবে। না শেষ হয়নি। বরং বেড়ে গেছে। অবশ্য, রাজনীতির এমন ধারার ভাষা ভারত পাকিস্তানেও জারী আছে। তা না হলে জুলফিকার আলী ভুট্টো কেমন করে বলেন, লোকেরা বলে আমি শরাব পান করি। সত্যি কথা আমি শরাব পান করি, কিন্তু গরীবের খুন চুষে পান করিনা। একথা শুনে জন সাধারন হাত তালি দিয়েছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভুমি বাংলাদেশের গরীব মানুষ গুলোও ও রকম। সস্তা কথায় হাত তালি দেয় আর সারাদিন ভুখা থেকে বিকেলে বাড়ি ফিরে যায়। এ দেশে এক সময় বড় বড় নেতারা বুকে ডিক্সনারী বেঁধে রেখে জনসভায় কোরাণ বলে প্রচার করতেন। যে কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে হাত তুলে মুনাজাত করতেন আর বলতেন এখানে একজন বড় বুজর্গ মানুষ শুয়ে আছেন। আমাদের নেতারা এখনও বলেন, দশ টাকা সের দরে চাল খাওয়াবো। পরে বলেন, এমন কথা কখনও বলেননি। যুক্তফ্রন্ট আমলে শুনেছি, নেতারা বলতেন দশ টাকা মন চাল খাওয়াবো। অসুখে যে মানুষটা মারা গেছে তার লাশ এনে ভুখা মিছিল বের করার ইতিহাস আমাদের দেশে আছে। পুলিশের গুলিতে কোন কর্মী মারা গেলে সকল দলই দাবী করে ওই কর্মীটি তাদের দলের।
রাজনীতিতে অস্ত্রের ভাষা চালু হয়েছে বিশেষ করে জেনারেল আইুবের আমলে। পরে ভাষা ফেলে দিয়ে পাকিস্তানের সেনা বাহিনী পাকিস্তান রক্ষা না করে ভেংগে দিয়েছে। লিয়াকত আলী বলেছিলেন ‘শের কুচাল দেঙে’, মানে মাথা গুড়িয়ে দেবো। এক সময়ে তাঁরা বলতেন ভারতীয় কুত্তা। এখনও এসব বলা হয়। রাজনীতিতে অস্ত্রের ভাষা এখন অবারিত ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইজরায়েল আমেরিকা আর ইরাণের নেতাদের ভাষার দিকে তাকান। একদিকে শান্তির বলছেন, আবার শুধু আক্রমনের কথা বলছেন। পশ্চিম বাংলার মমতা নাকি মমতা দিয়ে কথাই বলতে পারেন না। কথা বললেই নাকি তাঁর মুখ থেকে বুলেট বের হয়। সাদা সিধে জীবন যাপন করে মানুষের মন জয় করে ক্ষমতায় এসেছিলেন। মমতার মমতা বিহীন আচরণের জন্যে শিল্পপতিরা পশ্চিম বাংলা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। ভারতের সাংবাদিকরা বলেন, মমতা হচ্ছেন ভারতের শেখ হাসিনা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও বংবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা কথা না বলে থাকতে পারেন না, বললেই এতম বোমা। এইতো দেখুন না, পদ্মা সেতু নিয়ে তিনি বিপ্লব শুরু করেছিলেন। একেবারে দূর্গার রূপ, দূর্গতনাশিনী। কবি মন দিয়ে দেখলে দেখা যাবে আমাদের প্রধামন্ত্রীর দশ হাত ও দশ মাথা আছে। তাই তিনি দশ মুখে কথা বলেন আর দশ হাতে কাজ করেন। পদ্মাসেতু অর্থায়নে ঋণদাতা বিশ্বব্যান্ক ও দেশগুলো এখনও আসেনি, শুধু ঘোষণা দিয়েছেন। আর আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিদেশের মাটি বসে বলছেন, বিশ্বব্যান্কের ঋণ বাতিল করার জন্যে যারা কাজ করেছে তাঁদের তিনি খুঁজে বের করবেন। তাঁর রাজনীতির ডাবল স্ট্যান্ডার্ড সম্পর্কে দেশ ও বিদেশের মানুষ অবগত হয়েছে। তিনি বিশ্বব্যান্ককে রক্তচোষা ও দূর্ণীতিবাজ বলেছেন। বেশ কয়েকদিন বিশ্বব্যান্ক সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে গালাগাল দিয়েছেন। আবার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ভাবে বিশ্বব্যান্কের ঋণ পাওয়ার জন্যে৪ দেন দরবার করেছেন। যখন বিশ্বব্যান্ক বললো দেখি, আমরা ঋণটি পূণর্বহাল করা যায় কিনা। তখন একদিকে বিশ্বব্যান্ককে ধন্যবাদ জানালেন আর কারা ঋণ বাতিল করিয়েছে তার তদন্ত করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
বংগবন্ধুর বক্তৃতা ও ভাষণ রীতি নকল করে ইতোমধ্যাই আওয়ামী লীগের নানক, সেলিম , তোফায়েল বেশ নাম করে ফেলেছেন। আওয়ামী ভাষার একটা সুবিধা হলো, নেতারা ক্ষমতায় থাকলে এবং ক্ষমতার বাইরে থাকলে একই ভাষায় কথা বলেন। অনেকেই বলেন, এই উপমহাদেশে আওয়ামী লীগের মতো বিরোধী দল আর নেই। কেয়ারটেকার বা তত্তাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করার জন্যে আওয়ামী সারা যে তান্ডব চালিয়েছিল তা দেশবাসী ভুলে গেছেন কিনা জানিনা। এখন সেই দলটিই বলছে তত্তাবধায়ক ব্যবস্থা ভাল নয়। তাই সংসদে সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে এক মিনিটে ওই ব্যবস্থা বাতিল করে দিল। এইতো ক’দিন আগে তোফায়েল সাহেব বললেন, বিএনপি কোন ইস্যুই তৈরী করতে পারছেনা। আজ এক কথা বলেতো কাল আরেক কথা বলে। অনেকেই বলেন, আজ যদি আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলে সরকার ও দেশ অচল হয়ে যেতো। আওয়ামী নেতরাই বলেন, বিরোধী দল কাকে বলে তা জানতে ও শিখতে বিএনপির এক হাজার বছর লাগবে। সব ব্যাপারেই আওয়ামী লীগ প্রথম থাকতে চায়। বিরোধী দলে থাকলেও গলাবাজিতে এক নম্বর, সরকারী দলে থাকলেও এক নম্বর। ইতোমধ্যে দূর্ণীতির অভিযোগে সুরণ্জিত বাবু, আবুল হোসেন, মশিউর জনতার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন। তবুও প্রধানমন্ত্রী নানা ভাবে তাঁদের সহায়তা সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। আবুল হোসনকে দেশপ্রেমিক বলে সার্টফিকেট দিয়েছেন। এতকিছুর পরেও সুরণ্জিত বাবু প্রতিদিন যাত্রার ঢংয়ে পালা করে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী বলে চলেছেন, পদ্মাসেতুতে কোন প্রকার দূর্ণীতি হয়নি। কারণ বিশ্বব্যান্ক কোন টাকাইতো দেয়নি। তাহলে দূর্ণীতি হলো কেমন করে? দেশের সাধারন মানুষকে বোকা বানাবার অবাক অপকৌশল। কাজ পাওয়ার জন্যে ঘুষের লেনদেন বহু পুরাণো ব্যবস্থা। কানাডার লাভালিন কোম্পানী কাজ পাওয়ার জন্যেই বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টদের টাকা দিয়েছেন বলে প্রচারিত হয়েছে। এজন্যে কানাডা পুলিশ অনেকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রী ও উপদেস্টার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে রাজী হননি। এখনও তিনি বলেছেন তাঁর লোকেরা ঘুষ লেনদেন করেননি।
ডেস্টিনি ও হলমার্কের জালিয়াতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি কথাও এখনও বলেনি। কিছু না বলাতে জনমনে এ নিয়ে নানা সন্দেহ দেখা দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তিন চার হাজার কোটি টাকা কোন টাকাই নয়। ডেস্টিনির প্রধান উপদেস্টা ছিলেন আওয়ামী জেনারেল সাবেক সেনা প্রধান সেনাপতি হারুন সাহেব। তবুও আওয়ামী গলা ও ভাষা এক তালে ও লয়ে চলছে। বিচারপতির দূর্ণীতি নিয়ে সুস্পস্ট অভিযোগ হওয়ার পরেও আইনমন্ত্রী বলেছেন, বিচারপতির বিরুদ্ধে কোন ব্যক্তি বিশেষের অভিযোগ আনার অধিকার নেই। সরকারী ব্যন্ক গুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় আওয়ামী নেতা কর্মীদের শক্তিশালী অবস্থান। ব্যন্কগুলোতে এখন আর টাকা নেই। দিনরাত সবাই ভাগ বাটোয়ারা করে নিচ্ছে। আমানতকারীরা টাকা চাইলে তা ফেরত দেয়ার ক্ষমতা একটি ব্যন্কেরও নেই। আওয়ামী কোম্পানী ও ব্যক্তিদের উদর পূর্তি ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে। সরকারী ব্যন্ক গুলো সরকারী প্রতিস্ঠানের এলসি খুলছেনা। সরকারকে গ্যারাণ্টি দিতে হবে। আর সরকারই টাকা পাবে কোথায়।
যুক্তফ্রন্টের দাবী ছিল পুর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের জন্যে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব প্রধানমন্ত্রী হয়ে বললেন ৯৮ ভাগ স্বায়ত্বশাসন দেয়া হয়ে গেছে। অমনি আওয়ামী নেতারা মাঠে নামে গেলেন ৯৮ ভাগ স্বায়ত্ব শাসনের শ্লোগান নিয়ে। সে সময় আওয়ামী লীগ ছিল আমেরিকার ভক্ত। আমেরিকা যা করতো তা ষোল আনাই ভাল। সোহরাওয়ার্দী সাহেব জিরো প্লাস জিরো তত্ব দিয়েছিলেন। এর মানে ছিল শূণ্যের সাথে এক যোগ করলেই দশ হয়। তুমি যদি ডাবল শূণ্য হও তাহলে আমেরিকাকে সাথে নিয়ে একশ’ হও। অমনি মাঠে নেমে গেলো আমেরিকার পক্ষে। বাংলাদেশ হওয়ার পর হঠাত্‍ করে ভারত আর রাশিয়ার ভক্ত হয়ে গেলো। বংগবন্ধু বললেন, ‘আমিই সমাজতন্র কায়েম করবো। তিনি সারাজীবন কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। মাওলানা ভাসানী যখন পূর্ণাংগ স্বায়ত্ব শাসনের জন্যে জোরদার লড়াই শুরু করেছিলেন তখন আওয়ামী লীগ তাঁর উপর আক্রমন চালায়। আওয়ামী লীগ ও আমেরিকা সমর্থক ইত্তেফাক মাওলানা সাহেবকে লুংগি মাওলানা ও লাল মাওলানা বলে গালি গালাজ করে। বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল ভারত নিজে সমাজতন্ত্রের পথে না গিয়ে বাংলাদেশ পরামর্শ দিয়েছিল সমাজতন্ত্রী হওয়ার জন্যে। তার ফলাফল আমরা দেখেছি। তা ছিল লুটপাটের সমাজতন্র বা আওয়ামী লীগের সমাজতন্ত্র। এস মুজিবুল্লাহ তখন ইত্তেফাকে লিখেছিলেন, ‘দে মা তবিলদারী লুটেপুটে খাই’। এই শিরোনামে তিনি সিরিজ লিখেছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের পুঁজি গঠণের জন্যে এক সময় আন্দোলন হয়েছিল। বাংলাদেশ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ দলীয় পুঁজি গঠণের অবাধ সুবিধা পেয়েছিল।
আওয়ামী লীগ আজও ঠিক করতে পারেনি বংগবন্ধু কোন তারিখে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২৫শে মার্চ রাতে না ৭ই মার্চ প্রকাশ্য জনসভায়। এ নিয়ে গবেষকরা রীতিমত গবেষণা করছেন। কবীর চৌধূরী সাহেব বলেছিলেন ৭ই মার্চকেই স্বাধীনতার ঘোষণা বলতে হবে। এর পরেও বংগবন্ধু কিন্তু ছয় দফা নিয়ে ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর সাথে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেই আলোচনার ফলাফল দেশবাসী আজও জানেনা। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বংগবন্ধুর জীবদ্দশায় কোন রকমের বিতর্ক বা কন্ট্রোভার্সি হয়নি। জিয়া সাহেব বলেননি, তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। এটাতো স্পস্ট যে, তিনি বংগবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। সারা দুনিয়া শুনেছে জিয়া সাহেবের ঘোষণা। এই নিয়ে আওয়ামী লীগ বিতর্ক তৈরী করেছে। এবং আওয়ামী ভক্তরা ঘেউ ঘেউ কা কা করতে শুরু করে দিয়েছে। এ কথা মহাসত্য যে আওয়ামী ভাষা ও আচার আচরনের কাছে সবাই আজ পরাজিত।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
ershadmz40@yahoo.com
ershadmz@gmail.com

Read Full Post »


আমাদের স্বপ্নের রাস্ট্রটি এখন কোথায় ? এরশাদ মজুমদার

সোনালী ব্যান্ক যা ন্যাশনাল ব্যান্ক অব পাকিস্তান ছিল তার সাথে এক সময় আমার খুব ঘনিষ্ট যোগাযোগ ছিল। এমনও দিন ছিল আমি প্রতিদিনই এ ব্যান্কে যেতাম। পাকিস্তান আমলে যখন জিএম চৌধুরী সাহেব এই ব্যান্কের পূর্বাঞ্চলের প্রধান বা ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন তখন এর সাথে আমার পরিচয় হয়। বংগবন্ধু এভিনিউ যা এক সময়ে জিন্নাহ এভিনিউ ছিল সেখানে ন্যাশনাল ব্যান্কের সদর দফতর ছিল। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার(বাসস) সাবেক সম্পাদক ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডিপি বড়ুয়ার মাধ্যমেই জিএম চৌধূরী সাহেবের সাথে আমার পরিচয় হয়। চৌধুরী সাহেব ছিলেন একজন মহা ভদ্রলোক খান্দানী মানুষ। পিয়ন চাপরাশী থেকে সবাইকে চৌধূরী সাহেব আপনি করে বলতেন। চৌধুরী সাহেব সম্পর্কে সুযোগ পেলে আরেকদিন বিস্তারিত বলবো। ন্যাশনাল ব্যান্ক অব পাকিস্তান ছিল একটি সরকার নিয়ন্ত্রিত ব্যান্ক। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রফতানী সম্পদ পাটকে অর্থায়ন করার জন্যে। পূর্ব পাকিস্তানে এর প্রথম শাখা নারায়নগঞ্জে খোলা হয়। যদিও সদর দফতর ছিল করাচীতে। ন্যশনাল ব্যান্ক সরকারের ট্রেজারী হিসাবেও কাজ করতো। এক সময় বাংগালী উদ্যোক্তারা পাটকল স্থাপনের উদ্যোগ নিলে ন্যাশনাল ব্যান্ক অর্থায়ন করে। বাংলাদেশ হওয়ার পর এটা ষোলয়ানা সরকারী মালিকানায় সোনালী ব্যান্ক হিসাবে যাত্রা শুরু করে। পাকিস্তান আমলে এটা ছিল সরকারী ও বেসরকারী মালিকানার যৌথ প্রতিষ্ঠান। সমাজতান্ত্রিক চিন্তা চেতনার কারণে সরকার তখন সব ব্যান্ক বীমা জাতীয়করণ করে মালিকানা সরকারের হাতে নিয়ে নেয়। আর যায় কোথায়? শুরু হলো ব্যান্ক গুলোর দূর্গতি। অর্থ মন্ত্রণালয় সরকারের পক্ষ থেকে মালিকানা দেখা শুনা করেন। লাভ লোকসানের ব্যাপার নাই সরকারের কথা শুনলেই হলো। সরকারের কথা মানে সচিবের কথা, মন্ত্রীর কথা, এমপির কথা আর আর সর্বশেষ একান্ত সচিব ও সহকারী সচিবের কথা। এভাবেই বিগত ৪২ বছর ধরে সরকারী ব্যান্ক গুলো চলছে। ইউনিয়ন নেতাদের কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। ইউনিয়ন নেতারাও দামী গাড়ীতে চলাফেরা করেন। বিচারপতি সাত্তারের আমলে ব্যান্কগুলোকে জিম্মি করে ফেলেছিল ইউনিয়ন নেতারা। বিচারপতি সাত্তার ১১শ কর্মচারীকে একদিনে বরখাস্ত করে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন। তারপরে নেতারা কিছুটা দমে গিয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব থেকে ব্যান্ক গুলো কখনই মুক্ত হয়নি। বেসরকারী বা প্রাইভেট ব্যান্ক গুলোকে নিয়মিত চুষে খাচ্ছেন পরিচালকবৃন্দ। আর সরকারী গুলোকে খাচ্ছেন সরকারী লোকেরা। এখন সরকারী ব্যান্ক গুলো রক্তশূণ্য হয়ে পড়েছে। হয়ত বেশী দিন আর বাঁচবেনা। ভারত পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় বহু সরকারী ব্যান্ক আছে। সেখানে কেউ ব্যান্ক গুলোকে চুষে খাচ্ছেনা। সরকারী ব্যান্ক গুলোর সম্পদ ও দায়দেনার হিসাব করলে এগুলোতে এখন আর তেমন কিছু নেই। চাহিবামাত্র সাধারন মানুষের আমানতের টাকা ফেরত দিতে পারবেনা।
আপনি যদি কখনও সোনালী বা অন্য যেকোন সরকারী ব্যান্কে যান দেখতে পাবেন কিছু মৃত মানুষ বসে আছেন, তাদের জীবনী শক্তি ফুরিয়ে গেছে। আমানতকারী বা গ্রাহক দেখলে তাঁরা বিরক্ত হন। তাঁদের জীবনহীন জীবনের হয়ত কোন কারণ আছে। বেসরকারী ব্যান্কের তুলনায় তাঁরা অনেক কম বেতন পান। ফলে তাঁরা হয়ত হতাশায় ভোগেন। অপর দিকে বেসরকারী ব্যান্কের তরুণ অফিসাররা বলেন, তাঁরা সরকারী ব্যান্কের অফিসারদের তূলনায় দশ গুণ বেশী কাজ করেন। দেশের প্রথম বেসরকারী ব্যান্ক ন্যাশনাল ব্যান্ক প্রতিষ্ঠার সময়ে আমি এর সাথে জড়িত ছিলাম আমার মুরুব্বী হায়দার চৌধুরী সাহেবকে সহযোগিতা করার জন্যে। ব্যান্ক শুরু হওয়ার আগেই প্রথম নিয়োগ পায় আমার বন্ধু মোহাম্মদ আলী পান্নু। সে উত্তরা ব্যান্ক ছেড়ে হায়দার চৌধুরী সাহেবের সাথে যোগ দিয়েছিলো। ব্যান্ক শুরু করার প্রথমিক কাজ গুলো করার ব্যাপারে পান্নু হায়দার চৌধুরী সাহেবকে সহযোগিতা করেছিল। এ সময়ে হায়দার চৌধুরী সাহেব সম্পর্কে দুটো কথা না বললে অবিচার করা হবে। তিনিই ন্যাশনাল ব্যান্কের প্রতিষ্ঠাতা। তিনিই সরকারী ব্যান্কের চাকুরী ছেড়ে ব্যান্ক প্রতিষ্ঠার জন্যে উদ্যোগী হন। ন্যাশনাল ব্যান্কের উদ্যোক্তাদের বেশীর ভাগই ছিলেন ফেণীর ব্যবসায়ীরা। কারণ চৌধুরী সাহেবের বাড়ি ফেণী। চট্রগ্রাম থেকে উদ্যোক্তা জোগাড় করেছেন গোলাম রহমান। তিন কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন জোগাড় করতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়েছে। এজন্যে ২৬ জন উদ্যোক্তা নিয়ে ন্যাশনাল ব্যান্কের যাত্রা শুরু হয়েছিল। মাত্র কয়েকজন উদ্যোক্তা ২৫ লাখ টাকা করে দিয়েছিলেন। বেশীর ভাগই দিয়েছেন ১০ লাখ টাকা করে। ফেণী এবং চট্টগ্রামের উদ্যোক্তাদের ভিতর দলাদলি ফলে ব্যান্কটি এখন ফরিদপুরের শিকদার গ্রুপের কাছে চলে গিয়েছে। শিকদার গোপনে বাজার থেকে বহু শেয়ার কিনেছেন। এখনতো একটি ব্যান্ক প্রতিষ্ঠা করতে ৪০০ কোটি টাকা লাগে। এটা হলো মূলধন। এর বাইরে অনুমতি লাভের জন্যে খরচ করতে আরও ৪।৫শ’ কোটি টাকা। অনেকেই ২৫ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন ১০০কোটি টাকা দিয়ে। এটাই প্রমান করে যে বিগত ২৫ বছরে ব্যবসায়ীরা কি পরিমাণ সম্পদ বা নগদ টাকা জমিয়েছে। বেশীর ভাগ টাকাই হলো সরকারের পাওনা কর ও শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার টাকা। ৮২/৮৩ সালের অনেকেই ১০ লাখের সাদা টাকা দেখাতে অক্ষম হয়েছেন। তখন বলা হয়েছিল ব্যান্ক প্রতিষ্ঠায় বিনিয়োগ করলে সাদা টাকা লাগবেনা। সরকারী ব্যান্ক যত দরিদ্র হচ্ছে বেসরকারী ব্যান্কের মালিকেরা বা উদ্যোক্তারা তত ধনী হচ্ছেন। বহু উদ্যোক্তা সরকারী ব্যান্ক থেকে টাকা নিয়েও ব্যান্ক করেছেন। পরে সরকারী ব্যান্কের কর্তা ব্যক্তিদের নিজেদের ব্যান্কে চাকুরী দিয়েছেন। আবার অনেক ব্যবসায়ী হাউজ বা গ্রুপ অবসর নেয়ার পর ব্যান্কারদের নিজেদের কোম্পানীতে চাকুরী দিয়েছে। একজন ব্যান্কার আমি চিনি বেসরকারী ব্যান্কের দ্বিতীয় বা তৃতীয় ধাপের অফিসার থাকার সময়ে নিজে ব্যান্ক প্রতিস্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ভদ্রলোক এখন আর জীবিত নেই। কিন্তু তাঁর আত্মীয় স্বজন সবাই এখন ব্যান্কের ডিরেক্টর।
আজ এমন একটা সময়ে আমরা অতিক্রম করছি যখন জনসেবা কাকে বলে আমরা ভুলতে বসেছি। যেদিকে তাকাবেন, দেখবেন আপনি অথৈ সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে। মন্ত্রীরা বলেন তাঁরা জনগণের প্রতিনিধি। সরকারী কর্মচারীরা বলেন তাঁরা জনগণের খাদেম। জনগণের খেদমত করাই তাঁদের কাজ। বলুন দেখি কোন অফিসে গেলে আপনি দেখবেন একজন সেবক এগিয়ে এসে বলবেন,সালাম, আমি আপনার জন্যে কি করতে পারি। স্কুল কলেজ মাদ্রাসা মক্তব, হাসপাতাল, পোস্ট অফিস, সঞ্চয় অফিস, তহশীল অফিস, জমির জমা খারিজ অফিস যেখানেই যান না কেন আপনাকে টাকা দিয়ে কাজ করাতে হবে। এমন কি ওয়াসা অফিস, গ্যাস অফিস বা বিদ্যুতের অফিসের কথা আর কি বলবো। এই দেখুন না, গ্যাসের কানেকশন বন্ধ, কিন্তু কানেকশন হচ্ছে নিয়মিত। আপনার ডিমান্ড নোট জমা দেয়া থাকলে দালাল আপনারবড়িতেই আসবেন। বলবেন স্যার আমরা কানেকশন নিয়ে দেবো, একটু বেশী টাকা লাগবে। সেই বেশী টাকাটা হলো কয়েক লাখ টাকা। ওদিকে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান সাহেব বলছেন, বাসা বাড়িতে কানেকশন দেয়ার মতো গ্যাস তাঁদের কাছে। কিন্তু সবজান্তা সাবেক সিএসপি অফিসার, যিনি এখন প্রধানমন্ত্রী সাহেবার উপদেস্টা বলছেন, আমরা এখন বাড়িতে গ্যাস দিতে পারবোনা। এখন চারিদিকে গুণ্জন উঠেছে নির্বাচনের আগে ভোটের জন্যে সরকার গ্যাস কানেকশনের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে।
বাহাত্তুর সালে বেসরকারী খাতে বিনিয়োগের সীমা ছিল মাত্র দশ লাক টাকা। কারন তখন বংগবন্ধু দেশের সমাজতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন অসমাজতান্ত্রিক আোয়ামী কর্মীদের দিয়ে। আমার আজও বিশ্বাস হয়না শেখ সাহেব এমন একটা কাজ করতে পারেন। ভারত তকনও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির দিকে যায়নি। ফলে ্যা হবার তাই হলো। সে সময়েই এস মুজিবুল্লাহ নামের এক ভদ্রলোক ইত্তেফাকে লিখলেন, দে মা তবিলদারী, লুটে পুটে খাই। সমাজতন্ত্রের নামে দেশে শুরু হয়ে গেল লুটপাট। যারা পান দোকান চালাতে পারেনা তাদের করা হলো বড় বড় মিলের প্রশাসক। রাতারাতি আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা হয়ে উঠলেন ধনবান। তখন বেসরকারী বিনিয়োগের সীমা দশ লাখ টাকা রাখলে চলেনা। এবার করা হলো তিন কোটি টাকা। শুরু হলো পুঁজির বিকাশ। স্বাধীনতার সুফল হলো বিগত ৪০ বছরে একশ’টাকার মালিক এক লাখ টাকার মালিক হয়েছে। রাজনীতিবিদরাও যে কোন ভাবেই হোক সুখে আসন্তিতে আছেন। ক্ষমতায় থাকলে নিজেরাই কিছু করে নিচ্ছেন। ক্ষমতার বাইরে থাকলে ব্যবসায়ীরা তাদের কিছু করে দেন। বিগত ৪০ বছরে দেশে দরিদ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। দৈনিক মুজুরী দুই টাকার যায়গায় দুইশ’ টাকা হয়েছে। দুই টাকার সময়ে দিন মুজুর হিসাবে কাজ করতো, এখনও করে। আগে তাদের বউরা বাইরে কাজ করতোনা এখন করে। বার্ষিক প্রবেদ্ধি যদি ছয় পারসেন্ট হয়, গরীবের প্রবৃদ্ধি হয় এক পারসেন্ট। ফলে দারিদ্র বেড়েই চলেছে। বার্ষিক বাজেট যদি দুই লাখ কোটি টাকার মতো হয় সেখান থেকে ঘুষ ইত্যাদি বাবত ব্যবসায়ী ও সরকারী কর্মচারীদের পকেটে চলে যায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। পাকিস্তান আমলে আমরা লেখালেখি করেছি পূর্ব পাকিস্তানের পুঁজির বিকাশের জন্যে। ৪০ বছরে পুঁজির বিকাশ ভালই হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে এক হাজার লোক অংশ গ্রহণ করলে প্রত্যেককে এক কোটি টাকা করে দেয়ার মতো লোক এখন আছে। পুরো সংসদকে নিজের প্রভাবে রাখার মতো প্রভাব প্রতিপত্তি অনেকের আছে। রাস্ট্র এখন ধনীদের খেদমতে ব্যস্ত। ফাঁকে বেশ খেদমত পাচ্ছেন রাজনীতিক,সরকারী কর্মচারী। যে কথা বলে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল তার কিছুই হয়নি। হাসপাতালে চিকিত্‍সা নেই, স্কুলে সিট নেই, শিক্ষিত বেকারদের চাকুরী নেই । চারিদিকে অশ্লীল কদর্য অর্থ দেখলে মাথা খারাপ হয়ে যায়। গুলশান মেই এভিনিউতে নাকি প্রতি কাঠা জমি দশ পনেরো কোটি টাকায় বিক্রি হয়। কোন দরাদরি নেই,একেবারেই গোোন ভাবে লেনদেন হচ্ছে। মতিঝিলেও নাকি একই অবস্থা। কিন্তু রাজউক বা সরকারী ভাবে জমির দাম এখনও কয়েক লাখ টাকা। এমন কি ফুর্বাচল বা ঝিলমিলে জমির বরাদ্দপত্র বিক্রি হয় কাঠা পাঁচ লাখ টাকা করে।
যেমন ধরুন, বর্তমান সরকার রাজনৈতিক কারণে ৬/৭টা ব্যান্ক স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। যারা অনুমতি পেয়েছেন তাঁরা কেউই ব্যবসায়ী নন। তাঁরা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ব্যান্কের অনুমতি পত্রের কাগজ বাজারে বেচা হচ্ছে প্রতিয়ামে। যিনি অনুমতি পেয়েছেন তাঁর এক পয়সাও পুঁজি লাগবেনা। এর মানে তিনি রাতারাতি ২০/২৫ কোটি টাকা মালিক হয়ে যাবেন। বিগত ৪০ বছর ধরে রাস্ট্র কিছু লোকের দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে ও শোষিত হচ্ছে। কিন্তু কারো কোন হুঁশ নেই। অন্ধ ভাবে কেউ এ দল সমর্থন করছে, কেউ ওই দল ামর্থন করছে। সাধারন মানুষের কথা বাদ দিলাম। শিক্ষিত লোকেরাও বহু ভাগে বিভক্ত। বাংলাদেশের পক্ষে আমি কাউকে দেখতে পাইনা। বিদেশে যেয়েও বাংলাদেশের লোকেরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত। লেখাটি শুরু করেছিলাম আমাদের রাস্ট্রের জনসেবা নিয়ে কিছু কথা বলবো বলে। শুধু জনসেবার কথা বলতে পারলামনা। রাস্ট্রটাই যখন কিছু মানুষ দখল করে নিয়েছে তখন জনসেবা আর কে করবে। বহু স্বপ্নের দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। নেতারা ও মুরুব্বীরা আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন পাকিস্তান হলে মুসলমানরা সুখী হবে, বিশেষ করে গরীব মুসলমানেরা বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু স্বপ্ন ভংগ হলো। দুই মুসলমান এক সাথে থাকতে পারলোনা। হিসাব নিকাশ পাওনা দেওনা নিয়ে মারামারি লেগে গেল। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বেঁধে গেল। পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান বা বাংগালী নেতারা ভাবলেন দেশ স্বাধীন হলে কেউ আর বাংগালীদের শোষণ করতে পারবেনা। এবারও স্বপ্নভংগ হলো বা হতে চলেছে। ৪০ বছরেও সাধারন মুসলমান বা বাংগালীদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি, যা হওয়ার কথা ছিল। কারণ দেশ বা রাস্ট্রটা এখন খুব শক্ত লুটেরাদের হাতে পড়ে গেছে। ৭২ সালে লুটরোদের সাইজ ছিল ইঁদুরের মতো। এখন হাতীর মতো। এক শ্রেণীর রাজনীতিক আর লুটেরা মিলে দেশটাকে দূর্ণীতির স্বর্গরাজ্য বানিয়ে ফেলেছে। এইতো দেখুন না, চলমান সরকারের আমলে দূর্ণীত রাস্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়েছে। লুটেরারা দাঁত বের করে হাসছে। দেশের মানুষকে পরাজিত করে এ যেন যুদ্ধের বুটি। এ সরকার দূর্ণীতির সাগরে ডুবে গেছে। কিন্তু তবুও কোন শরম নেই। বিশ্ব ব্যান্কের কাছে ঋণ চায় আবার বিশ্ব ব্যান্কের বিচার চায়। হলমার্কের ডাকাতরা ব্যান্ক থেকে সবার অনুমোদন নিয়ে চার হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেল, সেই নিয়েও সরকারী দল রাজনীতি করছে। রামু বা উখিয়াতে বৌদ্ধ মন্দির গুলো জ্বালিয়ে দিয়ে সারা বিশ্বের কাছে জাতি হিসাবে আমাদের হেয় করেছে, সেখানেও সরকারী দল রাজনীতি করছে। প্রধানমন্ত্রীর বলা উচিত ছিল এমন হিন কাজ যারা করেছে তাদের আমরা শাস্তি দেবো এবং বিশ্ববাসীর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং তিনি বিরোধী দলকে দোষী সাব্যস্ত করে ভাষণ দিচ্ছেন।
ডেস্টিনি মার্কা কোম্পানী গুলো অনেকদিন ধরে বাংলাদেশে চালু রয়েছে। এর আগে যুবকের ঘটনা ঘটেছে। ডেস্টনির ঘটনাটা খুবই বিস্ময়কর। এর প্রধান হলেন জেনারেল হারুন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং আওয়ামী পন্থী। সরকারের চোখের সামনেই ডেস্টিনি কাগজ বের করেছে, টিভি খুলেছে, বাগান বানাচ্ছে, এয়ারলাইন খুলেছে। সবকিছুই করতে পেরেছে রাজনীতির ছায়া তলে।
দূর্ণীতি নিয়ে দুদকের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান সাহেব মাঝে মাঝে , ইদানিং প্রতিদিন যা বলে তাতে দেশবাসী অবাক ও বিস্মিত হন। ক’দিন আগে আবুল সাহেবকে তিনি সার্টিফিকেট দিয়েছেন। তারই ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী আবুলকে দেশপ্রেমিক বলেছেন। দুদক সুরঞ্জিত বাবুকেও ভালো মানুষের সনদ দিয়েছেন। এখন বলছেন, পিয়ন চাপরাশীর কথায় বিচার চলেনা। পিয়নতো একজন নাগরিক, একজন ভোটার। আইনে কি কোথাও লেখা আছে পিয়ন হলে সাক্ষী নেয়া যাবেনা বা ভোট নেয়া যাবেনা। ড্রইভার আজমের রহস্য হলো সে বেশ কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে ছিল। ্ঠাত্‍ করে একেবারে সরাসরি আরটিভিতে যেয়ে উপস্থিত। এই টিভির মালিক আবার আওয়ামী পন্থী মোরশেদুল আলম। তিনি জেনারেল মঈনের সরকারের আমলে এটার মালিক হয়েছেন। কেমন করে মালিক হয়েছেন সে রহস্য এখনও কেউ জানেনা। সেই মোরশেদ সাহেবের টিভিতে যেয়ে হাজির ড্রাইভার আজম। কে তাঁকে সেখানে নিয়ে গেল? এতদিন সে কোথায় ছিল? তাহলে সরকারের ভিতরে কি কোন অদৃশ্য সরকার আছে? তাহলে কি আজমকে টোপ হিসাবে রাখা হয়েছে? সময় মতো কাজে লাগানো হবে।
পদ্না সেতুতে কোন দূর্ণীতি হয়নি। এটা প্রধানমন্ত্রীর সাফ কথা। তবুও দূর্ণীতিবাজদের সরাবার ব্যাপারে সরকার রাজী হলেন কেন? একদিকে বলছেন বিশ্বব্যান্ক দূর্ণিতিবাজ। অপরদিকে বিশ্বব্যান্কের টাকা পাওয়ার জন্যে নানা রকম লবী করছেন। নিউইয়র্কে বসেই প্রধানমন্ত্রী বলে দিলেন বিশ্বব্যান্কের ঋণ বন্ধ করার জন্যে যারা চেস্টা করেছেন তাদের খুঁজে বের করা হবে। একথা বলার পরেই বিশ্বব্যান্ক ঘোষণা করলো তারা নিজেরাই দূর্ণীতির তদন্ত করবেন। প্রধানমন্ত্রীর নানা ধরণের কথায় অনেকের মনে ধারণা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিশ্বব্যান্কের ঋণ চান না। যদি চাইতেন থাহলে তিনি এত কথা বলতেন না। অপরদিকে যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এখনও বলছেন মালয়েশিয়া পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করবে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল বলেছেন, বিশ্ব ব্যান্কের তদন্ত কমিটি গঠিত হওয়ায় তিনি খুশী হয়েছেন। হয়ত তিনি আন্তরিক ভাবেই চান বিশ্বব্যান্কের ঋণ আসুক।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক
ershadmz0@yahoo.com

Read Full Post »


আমার সাংবাদিকতার শিক্ষক এবিএম মুসা / এরশাদ মজুমদার

এই লেখাটি আমি লিখেছিলাম মনের তাগিদে। কারো অনুরোধে নয়। তখন মুসা ভাই জীবিত ছিলেন। এবিএম মুসা( আবুল বাশার মুহম্মদ মুসা)। আমার মুসা ভাই। যদিও মুসা ভাই ডাকি,আসলে তিনি আমার সাংবাদিকতার শিক্ষক। আমি যখন অবজারভারের শিক্ষানবীশ ইকনমিক রিপোর্টার তখন তিনি সারা পাকিস্তানের ডাক সাইটে বার্তা সম্পাদক। সে সময়ে ঢাকায় তিনিই ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ বার্তা সম্পাদক। সত্যি কথা বলতে কি অবজারভারেই আমি সাংবাদিকতা শিখেছি।
মুসা ভাইকে সবাই ভয় করতো। আমিতো কোন নস্যি। এসাইনমেন্ট দেয়া এবং সেভাবে কাজ আদায় করার যোগ্যতায় তাঁর সমকক্ষ আর কেউ ছিলনা। সে সময়ে অবজারভারে রিপোর্টার ছিলেন শহীদুল হক,এনায়েত উল্লাহ খান, তওফিক আজিজ খান, এটিএম মেহেদী সহ আরও অনেক নামজাদা মানুষ। সেখানে আমি ছিলাম শিশু।
বার্তা সম্পাদক হিসাবে তিনি সমাজের অনেক দায়িত্ব পালন করেছেন। যেমন গাড়িতে বাংলা নাম্বার প্লেট লাগানো, সাইনবোর্ডে বাংলা চালু করা সহ এ দেশের বহু আন্দোলনে অবজারভারের অসীম অবদান রয়েছে। খেলার জগতেও মুসা ভাইয়ের ছিল এবং আছে। তিনি ব্রাদার্স ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক ছিলেন।
ভাষা আন্দোলনে অবজারভারের অবদান সীমাহীন। ওই সময়ে অবজারভারের জগত বিখ্যাত সম্পাদক আবদুস সালাম জেলে যান। কাগজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। পূর্ব ও পশ্চিমের অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়ে জনগণের কাছে তুলে ধরার ব্যাপারে অবজারভারের সমকক্ষ কোন কাগজই ছিলনা। এ ব্যাপারে অবজারভার গ্রুপ ছিল প্রধান সৈনিক। কিভাবে অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা লিখতে হবে তা আমাকে শিখিয়েছিলেন মুসা ভাই বিশেষ ভাবে যত্ন করে। এ শিক্ষাই আমি সারা জীবন কাজে লাগিয়েছি। এরপরে আমি পূর্বদেশের প্রধান অর্থনৈতিক রিপোর্টার হিসাবে কাজ করেছি যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে সারা পাকিস্তানে তোলপাড় চলছিলো। এ সময়ে পূর্বদেশের সম্পাদক মাহবুবুল হক ছিলেন সংসদ কাঁপানো সংসদ সদস্য। মাহবুবুল হককে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেছিলেন বংগবন্ধু। মুসা ভাই কিছুদিন দৈনিক জনপদের উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন। সে সময়ে আমি ছিলাম চীফ রিপোর্টার।
১৯৭৭ সালে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেইন সাপ্তাহিক নিউ নেশন বের করলে মুসা ভাই উপদেস্টা সম্পাদক নিযুক্ত হন। সম্পাদক হিসাবে মোতাহার হোসেন চৌধুরী সাহেবের নাম ছাপা হতো। ক্লাবে দেখা  দেখা হলে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, নিউ নেশনে কাজ করবো কিনা। না করতে পারলাম না। তাঁর মুখের উপর না করার মতো ক্ষমতাও আমার ছিলনা
মুসা ভাই এখন পরলোকে। সকল সমালোচনার উর্ধে। এ জগত ছেড়ে চলে যাওয়ার কিছুদিন আগে তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয়। বইয়ের লেখাগুলি দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই লেখাগুলিই প্রথমা সংকলিত করে বই আকারে প্রকাশ করে। বইয়ের কিছু বিষয় নিয়ে আমার দ্বিমত ছিল। তাই এই লেখাটি তৈরি করার উদ্যোগ গ্রহণ করি। বইয়ের নাম ‘আমার মুজিব ভাই’।
বইটি তেমন বড় নয়। মাত্র একশ’ চার পৃষ্ঠা। আমার মতো পাঠকের জন্যে দুই বেলার খোরাক। আমি আবার এক সাথে তিন চারটা বই পড়ি। তখন পড়ছিলাম হামিদুল হক চৌধুরী সাহেবের স্মৃতিকথা। এটা  ইংরেজীতে লেখা তিনশ’ ছিয়াশী পৃষ্ঠা। প্রকাশিত হয়েছে ১৯৮৯ সালে। এই স্মৃতিকথাতেও প্রচুর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক উপাদান আছে। চৌধুরী সাহেবের স্মৃতিকথা ৯০ সালেই একবার পড়েছি। চলমান লেখাটি তৈরি করার জন্যে আবার পড়ি। ঠিক এ সময়েই আমি বংগবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ছিলাম। বংগবন্ধুর আত্মজীবনীতেও প্রচুর ঐতিহাসিক তথ্য উপাত্ত আছে। তিনি যে একজন মুসলীম নেতা ছিলেন তা আত্মজীবনীতে সুস্পস্ট হয়ে উঠেছে। তিনি সারা জীবন বাংগালী মুসলমানের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে লড়াই করেছেন। রাজনীতি শুরু করেছিলেন একজন মুসলমান ছাত্র ও মুসলীম লীগ কর্মী হিসাবে। ৪৭ এর পর তাঁকে আবার ক্ষমতাসীন মুসলীম লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করতে হয়েছিল। সেই লড়াই থেকেই মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগের জন্ম হয়। শুরু হলো বাংগালী মুসলমানদের নতুন লড়াই। পূর্ব বাংলা বা  পূর্ব পাকিস্তানের ৯৯ভাগ মানুষ ছিল অতি সাধারন। ৪৭ এর আগের মুসলীম লীগ ছিল মুসলমানদের জন্যে একটি আলাদা রাস্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যে। ৪৭ এর পরে মুসলীম হয়ে গেল সাধারন মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন। ক্ষমতাসীন মুসলীম লীগ হয়ে গেলো কিছু নামীদামী মানুষের সংগঠণ। মাওলানা নিজেই দলের নাম ঠিক করেছিলেন। তিনি বলতেন, তাঁর দল হলো জনগণের মুসলীম লীগ আর অন্যটা হলো সরকারী মুসলীম লীগ। পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যবিত্ত ও সাধারন মানুষ দলে দলে যোগ দিলো নতুন মুসলীম লীগে।

মুসা ভাইয়ের লেখা এবং দেখা ‘মুজিব ভাই’ বইটি কোন ইতিহাস ভিত্তিক বই নয়। ইতিহাসের প্রয়োজনে কাজে লাগতে পারে তেমন কোন তথ্য উপাত্ত এই বইতে নাই। তিনি তাঁর মুজিব ভাইকে যেমন দেখেছেন তার কিছু ঘনিষ্ঠ খন্ড চিত্র বইতে আছে। বংগবন্ধুর রাজনৈতিক ও শাসক জীবন নিয়ে তেমন কিছুই নেই এই বইতে। বংগবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে নিজেই বলেছেন, তিনি স্কুল জীবন থেকেই সংগঠণ প্রিয় ছিলেন। সব সময়ই সাধারন মানুষের পক্ষে থাকতে ভালবাসতেন। বংগবন্ধুর এই আত্মজীবনী পড়লেই জানা যাবে বাংলার মুসলীম লীগ পাকিস্তান হওয়ার আগেই কোলকাতায় দ্বিখন্ডিত হয়ে গেছে। তারই ফল হলো পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী না হয়ে হলেন স্যার খাজা নাজিমুদ্দিন। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সমর্থকরা রাতারাতি খাজা সাহেবের দলে চলে গেলেন। অনেকেই সরকারী সুযোগ সুবিধাও পেয়েছেন। বংগবন্ধু ছিলেন সোহরাওয়ার্দী ও হাসেম সাহেবের গ্রুপে। ফলে ঢাকায় এসে বংগবন্ধু সরকার বিরোধী গ্রুপে পড়ে গেলেন। ঢাকায় তাঁর থাকার মতো তেমন জায়গা ছিলনা। তখনও তিনি ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মী। সরকারী দল সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সমর্থকদের সহ্যই করতে পারতেনা। পুরাণো ঢাকার সর্দার ও নেতারা সমর্থন করতো সরকারী দলকে। অনেকেই মনে করতেন, সবেমাত্র পাকিস্তান হয়েছে এখন বিরোধী দল বা বিরোধী গ্রুপের কি প্রয়োজন? সরকারী মুসলীম লীগের অগণতান্ত্রিক ও স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের কারণে খুব দ্রুত গতিতে বিরোধি গ্রুপ তৈরি হয়ে গেল। বিশেস করে ভাষার দাবীতে ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ শেখ সাহেব সহ ৭০ জন নেতা ও কর্মীকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এসব হয়েছে সরকারী নেতাদের অসহিষ্ণুতার কারণে। ১৯৫০ সালেই রাজশাহীর খপড়া  ওয়ার্ডে সরকার গুলি চালায়। সরকারের ব্যবহারের কারণেই  এভাবেই একদিন মুসলীম লীগের আসল কর্মীরা নতুন দল করার জন্যে তৈরী। হতে লাগলো । ইতোমধ্যে আসাম থেকে এলেন মাওলানা ভাসানী। ভাসনী সাহেব ছিলেন এক ধরনের বিপ্লবী চরিত্রের মানুষ। তিনি আসাম প্রাদেশিক মুসলীম লীগের সভাপতি ছিলেন। তাঁরই নেতৃত্ব আসামে মুসলীম লীগ মন্ত্রীসভা গঠণ করেছিল কয়েকবার। সেই মাওলানা সাহেব ঢাকায় এসে মুসলীম লীগের কাছে কোন পাত্তাই পেলেন না। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে  নাজিমুদ্দিন সরকার ঢাকায় ঢুকতে দিচ্ছেনা। ১৯৪৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর জিন্নাহ মারা গেলে নাজিমুদ্দিন সাহেব গভর্ণর জেনারেল হন আর নুরুল আমিন সাহেব পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। এ সময়ে কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে লিয়াকত আলী  খান সাহেব মহা শক্তিধর ব্যক্তিতে পরিণত হলেন। তিনি কোন ধরণের সমালোচনা বা বিরোধিতা একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না।

শেখ সাহেব বাম চিন্তাধারার ছাত্রকর্মীদের তেমন পছন্দ করতেন না। এদের তিনি উগ্রপন্থি বলতেন।  শেখ সাহেবের আত্মজীবনী পড়লেই জানতে পারবেন তিনি কমিউনিস্টদের পছন্দ করতেন না। তিনি উল্লেখ করেছেন, ১৯৪৭ সালে যে মুসলীম লীগকে লোকে পাগলের মতো সমর্থন করেছিল সেই মুসলীম লীগের প্রার্থীকে পরাজয় বরন করতে হলো কেন? তিনিই বলছেন, কোটারি, কুশাসন, জুলুম, অত্যাচার ও অর্থনৈতিক কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা না করার ফলে। দেশ স্বাধীন, জনগণ নতুন কিছু আসা করেছিল, ইংরেজ চলে গেলে তাদের অনেক উন্নতি হবে এবং শোষন থাকবেনা। আজ দেখছে ঠিক তার উল্টা।  এমনি এক পরিস্থিতিতে ১৯৪৯ সালের ২৩ শে জুন আওয়ামী মুসলীম লীগ গঠিত হলো মাওলানা ভাসানীকে সভাপতি করে। শামসুল হক সাহেবকে করা হয়েছিল সাধারন সম্পাদক। শেখ সাহেব তখন জেলে ছিলেন এবং জেলে থেকেই নতুন দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। নতুন দল গঠন হওয়ার পর রাজবন্দীরা আস্তে মুক্তি পেতে থাকেন। কিন্তু লিয়াকত আলী সাহেব ও তাঁর দলের নেতাদের গালাগালি বন্ধ হয়নি। তিনি কথায় কথায় মাওলানা ভাসানী সাহেবকে ভারতের লেলিয়ে দেয়া কুকুর বলে গালমন্দ করতেন। তখনকার মুসলীম লীগ নেতাদের সকলেরই বুলি ছিল কেউ বিরোধিতা করলেই ভারতের কুকুর বলা হবে। যে অখন্ড বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ ও রাস্ট্র হওয়ার কথা ছিল তা  নানা ষড়যন্ত্রের কারণে আজকের এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। অখন্ড স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশী বিরোধিতা করেছেন গান্ধীজী, প্যাটেল ও নেহেরুজী। মুসলীম লীগের কিছু নেতাও অর্ধেক বাংলা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। পাকিস্তান হওয়ার পর মুসলীম লীগ নেতারা  পুর্ব পাকিস্তানের নির্যাতিত মুসলমানদের উন্নতির কথা ভুলে গিয়ে দলাদলিতে লিপ্ত হয়ে গেলেন।

মুসা ভাই বংগবন্ধু বা তাঁর প্রিয় মুজিব ভাইয়ের চিত্র তুলে ধরেছেন তা একেবারেই হালকা চটুল গাল পল্পের চিত্রে পরিণত হয়েছে। আপদ বিপদ ও মসিবত বিষয়টি একটি একেবারেই হালকা মেজাজের ঠাট্টার গল্প। এর মানে হচ্ছে এই তিনজনকে বংগবন্ধু আদর করতেন। এরকম আরও হাজারো গল্প আছে বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে। তবে মুসা ভাইয়ের সাথে আমি একমত যে বংগবন্ধু বিশাল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। অপরাধ করে কেউ সামনে গেলেই ক্ষমা পেয়ে যেতেন। সুদূর অতীতে দয়াবান রাজারা এ রকমই ছিলেন। তবে রাস্ট্রীয় ক্ষমতায় বসে আইনী বা বেআইনী ভাবে দয়া বিতরন করা কতটা সমীচীন বা নৈতিকতার পক্ষে তা অবশ্যই বিবেচনার বিষয়। তবে তিনি যখন শুধুই নেতা ছিলেন তখন তিনি  তাঁর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল সাংবাদিকের বিশেষ ভাবে খবর রাখতেন। কোন সাংবাদিকই কখনও তাঁর উপর গোস্বা করতে পারেনি। তাঁকে সমর্থন করেনা এমন সাংবাদিকের সাথে সুসম্পর্ক ছিল। মুসা ভাই যে কাগজে কাজ করে পাকিস্তান বা বিদেশে খ্যাত হয়েছেন সেই কাগজের মালিকের সাথে সেখ সাহেবের মতভেদ ছিল। কিন্তু অবজারভারের সকল কাগজই পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষায় অন্য সকল কাগজের চেয়ে অনেক বেশী ভুমিকা রাখতো। পাকিস্তান আমলে একমাত্র ইমরেজী কাগজ অবজারভারই ছিল বাংগালী বা পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলতো। হামিদুল হক সাহেবও তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন যে আওয়ামী লীগের সকল বক্তৃতা বিবৃতি ছিল অবজারভার থেকে সংগৃহিত তথ্য উপাত্তের উপর নির্ভর করে।

হামিদুল হক চৌধুরী সাহেব ৪৭ সালে পুর্ব পাকিস্তানের প্রথম  কেবিনেটের মন্ত্রী ছিলেন। ওই মন্ত্রী সভায় আরও যাঁরা ছিলেন, তাঁরা হলেন স্যার নাজিমুদ্দিন( চীফ মিনিস্টার), চীফ জাস্টিস একেএম আকরাম ও নুরুল আমিন। স্যার ফেডারিক বোর্ণ ছিলেন প্রথম গভর্ণর। আজিজ আহমদ ছিলেন গভর্ণরের প্রধান সচীব। প্রথম কেবিনেটে চৌধুরী সাহেব শিল্প বাণিজ্য অর্থ ছাড়া কিছুদিন ভুমি ও ভুমি সংস্কার মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বেই ছিলেন।  এ প্রসংগ গুলো উল্লেখ করছি এ কারণে যে, শেখ সাহেব ও চৌধুরী সাহেবের স্মৃতিকথা অনেকটা একই সময় বা কালকে নিয়ে লেখা। দুজনেরই বিষয় ছিল শোষিত ও অবহেলিত পূর্ব পাকিস্তানকে নিয়ে। একজন মন্ত্রী , বিভিন্ন কমিটির সদস্য  ও একজন আইন বিশারদ  হয়ে আরেকজন মাঠে ময়দানে জনমত সংগ্রহ করে। দুজনেরই লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ মুক্ত করা। কিন্তু শত চেস্টা করেও পাকিস্তানের শাসক গোস্ঠিকে বুঝানো যায়নি। তারা মনে করতো এসব ভারত করাচ্ছে। চৌধুরী সাহেব লিখেছেন, পাকিস্তানের কেন্দ্রের সাথে ‘আমার প্রধান বিরোধ ছিল, আমি পুর্ব বাংলার জন্যে অধিকতর স্বায়ত্ব শাসন ও অর্থ বরাদ্দ চেয়েছিলাম। কারণ, এই অঞ্চল দুশো বছরের শোষণের ফলে একেবারেই দারিদ্র পীড়িত হয়ে পড়েছিল। ’ পুর্ববাংলাকে কিভাবে অর্থনৈতিক ভাবে উন্নত করা যায় তা নিয়ে আমি একটি পেপারও তৈরি করেছিলাম। ৪৭ আগস্টে নাজিমুদ্দিন কেবিনেটের সদস্য হয়ে আমি পুর্ব পরিকল্পত কর্মসূচী  বাস্তবায়নের দিকে নজর দিলাম। নাজিমুদ্দিন সাহেব আমাকে সর্বতো ভাবে সহযোগিত করেছেন। কিন্তু জিন্নাহ সাহেবের মৃত্যুর পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়ে গেল।

মুসা ভাইয়ের বইতে একটা বিষয় খুবই স্পস্ট যে ,তাঁর সাথে বংগবন্ধু ও তাঁর পরিবারের খুবও ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি যে কোন সময়ে তাঁদের বেডরুমে চলে যেতে পারতেন। এবং বেগম মুজিব তাঁকে পান সাজিয়ে খাওয়াতেন। আমরা আরও জানলাম যে বেগম মুজিব সব সময় পানের বাটা সাথে সাথেই  রাখতেন। বংগবন্ধু বিয়ে করেছিলেন তাঁর চাচাতো বোনকে। যখন বিয়ে বেগম মুজিবের বয়স ছিল তিন কি চার বছর। মুরুব্বীদের নির্দেশেই এই বাল্য বিবাহের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তখন বংগবন্ধুর বয়সও ১২/১৩র বেশী ছিলনা। বেগম মুজিব  বাল্যকাল থেকেই বংগবন্ধুর মায়ের কাছে বড় হয়েছে। অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লেই দেখা যাবে বেগম ফজিলতুন নেসা সারা জীবন কিভাবে বংগবন্ধুকে সাহায্য করেছেন। পুরো বইতে বংগবন্ধু  বেগম মুজিবকে রেনু বলেই সম্বোধন করেছেন। বুঝা যায় দুজনের ভিতর খুব ভাব ছিল। ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের কারণেইতো দেশে ফিরে এসেই মুসা ভাইকে বিটিভির ডিজি করেছিলেন। পরে মর্ণিং নিউজের সম্পাদক হয়েছিলেন। শুরুতেই ফয়েজ  ভাইকে করেছিলেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সম্পাদক। গাফফার সাহেব স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে বংগবন্ধুর সহযোগিতায় লন্ডন চলে গিয়েছিলেন। দেশে থাকলে তিনিও পদ পেতেন। ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেই ৭৩ সালে মুসা ভাই আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচন করে জাতীয় সংসদের সদস্য হয়েছিলেন। একটা গল্প আছে , মুসা ভাই নাকি মর্ণিং নিউজের চাকুরীতে ইস্তফা না দিয়েই নির্বাচন করতে গিয়েছিলেন। হয়ত তিনি ভেবেছিলেন নির্বাচনে জয়ী হতে না পারলে আবার মর্ণিং নিউজের সম্পাদক পদে যোগ দিবেন। কিন্তু বংগবন্ধু তাঁকে সে সুযোগ দেননি।  মুসা ভাইকে সরিয়ে বংগবন্ধু হুদা ভাইকে সম্পাদক করেছিলেন। এ সময়ে আরও গল্প চালু হয়েছিল। তা হলো মুসা ভাইয়ের বিশ্বাস ছিল নির্বাচিত হয়ে এলে বংগবন্ধু তাঁকে তথ্যমন্ত্রী বানাবেন। এই মর্মে নাকি লন্ডনের কোন কাগজে ছাপা হয়েছিল ‘মুসা তথ্যমন্ত্রী হবেন’। অগ্রিম এ খবর ছাপা হওয়াতে নাকি বংগবন্ধু মুসা ভাইকে আর মন্ত্রী করেননি। মুসা ভাই সারা জীবন বংগবন্ধুর প্রাণের লোক হয়েও প্রায় সকল সরকারের অধিনেই চাকুরী করেছেন। তিনি আইউব সরকারের আমলে সাংবাদিক হিসাবে মোহাম্মদপুরে জমি নিয়েছেন। অন্যান্য সাংবাদিকরাও নিয়েছেন। আবার ৭৩ সালে এমপি হয়ে গুলশানে জমি নিয়েছেন। আমি দেখেছি আমাদের বহু মুরুব্বী সাংবাদিক সকল সরকারের চাকুরী ও অনুকুল্য লাভ করেও বলতেন এতো হচ্ছে পেশাদারিত্ব। ফয়েজ ভাইতো মোশতাক সরকারের প্রতিনিধি হয়ে চীন গিয়েছিলেন কূটনৈতিক স্বীকৃতি আদায় করার জন্যে। একই ভাবে হলিডে’র এনায়েত উল্লাহ খান সাহেব বামপন্থী হয়েও সকল সরকারের আমলেই মন্ত্রী রাস্ট্রদূত সম্পাদক হয়েছেন। লোকে বলে , কাগজ বন্ধ করার জন্যে বংগবন্ধু যে কমিটি করেছিলেন তার সদস্য ছিলেন খান সাহেব। কথাগুলো এ কারণে বললাম যে, মুসা ভাই উল্লেখ করেছেন বংগবন্ধুর কাছ থেকে তিনি তেমন আনুকুল্য গ্রহন করেননি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের দুই অবিসংবাদিত নেতা  মাওলানা সাহেব ছিলেন ভারত সরকারের নজরবন্দী হয়ে। আর বংগবন্ধু ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে। জানিনা , এই অবস্থাকে গুণীজন কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন। অপরদিকে মুসা ভাই বলেছেন , ৭ই জুন বংগবন্ধু যুদ্ধ ঘোষনা করেছিলেন। স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। পচিশে মার্চ পর্যন্ত অবাংগালীদের বিরুদ্ধে বাংগালীরা রাগ ও আক্রোশের পরিচয় দিয়েছে। সারাদেশে লুটতরাজ হয়েছে। যুদ্ধ ঘোষণা করে বংগবন্ধু জেনারেল ইয়াহিয়ার সাথে কি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন তা কিন্তু দেশবাসী আজও জানেনা। কি কারণে বংগবন্ধু সবাইকে চলে যেতে বলে নিজে পাকিস্তান আর্মির কাছে ধরা দিলেন তাও আজ পর্যন্ত খোলাসা হয়নি। পাকিস্তানে যখন বংগবন্ধুর বিচার চলছিলো তখন কি বলেছিলেন? তিনি কি বলেছিলেন, হাঁ, আমি স্বাধীনতা চাই, এবং সেজন্যেই যুদ্ধ ঘোষনা করেছি। রাস্ট্রদ্রোহিতার ওই মামলার এফিডেভিটে তিনি কি বলেছিলেন তা আমাদের কে জানাবে? মুসা ভাই ঠিকই বলেছেন যে, ১৫ই আগস্টের হৃদয় বিদারক ঘটনার পেছনে বিদেশী কারা কারা জড়িত এ প্রশ্নের সুরাহা এখনও হয়নি। কে জানে কখন হবে? সবাই আন্দাজ করে বলেন, আমেরিকা ও পাকিস্তান জড়িত। আমিতো মনে করি এজন্যে বন্ধু দেশ জড়িত। একই ভাবে জিয়াউর রহমানের হত্যার পিছনে কোন দেশ জড়িত। জেনারেল মঞ্জুরকে কারা হত্যা করেছে? আসলে রাজনেতিক হত্যা গুলোর কোন কুল কিনারা হয়না। যেমন গান্ধী হত্যা, জিন্নাহকে বিষ প্রয়োগ(?), লিয়াকত আলীকে হত্যা, ইন্দিরা হত্যা, রাজীব গান্ধী ও সঞ্জীব গান্ধী হত্যা, ভুট্টোর ফাঁসি, জেনারেল জিয়াউল হকের হত্যা, বংগবন্ধুর হত্যা, জিয়া হত্যা এবং সর্বশেষ বেনজির হত্যা। এসব হত্যার রহস্য কি কখনও উদ্ঘাটির হবে? রাজনীতিতে হত্যা হাজার বছর বছর ধরে চলে আসছে।

সব শেষ একটা কথা উল্লেখ না করে পারছিনা। তাহলো আইউবের গোলটেবিল বৈঠকে অংশ গ্রহণের জন্যে বংগবন্ধুর মুক্তিলাভ করা। মুসা ভাই বলেছেন, বেগম মুজিব বংগবন্ধুকে শাসিয়েছেন। তিনি যদি প্যারোলে মুক্তির জন্যে বেল পিটিশন সাইন করেন তাহলে বেগম মুজিব বই নিয়ে বসে থাকবেন। তিনি আর ৩২ নম্বরে ফিরে আসতে পারবেন না। আরেকটি তথ্য মুসা ভাই দিয়েছেন, তাহলো শেখ সাহেব মাওলানা সাহেবকে অনুরোধ করেছেন তাঁর মুক্তির জন্যে আন্দোলন করতে। যখন ইসলামাবাদে জোর লবী চলছে বংগবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে গোলটেবিলে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। তখন ইসলামাবাদে উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ নজরুল, খোন্দকার মোশতাক ও তাজউদ্দিন। তাঁরা বলেছেন, শেখ সাহেব মুক্তি না পেলে তাঁরা গোলটেবিলে অংশ গ্রহন করবেননা। তবে লিখিত ভাবে গোলটেবিলের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবেন। একই সময়ে ভাসানী সাহেব শেখ সাহেবের মুক্তির জন্যে জ্বালাও ও ঘোরাও আন্দোলন শুরু করেছেন। বিচারপতিদের  আদালতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। সবুর সাহেব তখন সরকারী দলের নেতা। তিনি মৌলবী করিদ আহমদকে দিয়ে ফোন করালেন জেনারেল মুজাফফরের কাছে শেখ সাহেবের কথা বলার জন্যে। মৌলভী ফরিদ শেখ সাহেবকে অনুরোধ জানালেন তিনি যেন প্যারোলে মুক্তি না নেন। কারণ কয়েকদিনের মধ্যেই আগরতলা মামলা বাতিল হয়ে যাবে। সেনা বাহিনী আইউবের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। মৌলভী ফরিদের কথা বিশ্বাস করলেন শেখ সাহেব এবং বেলবন্ডে দস্তখত করলেননা। তাজউদ্দিন সাহেবেরা বিষয়টা জানতেন না বলেই প্যারোলে মুক্তি কথা বলেছিলেন। এর ফলে শেখ তাজউদ্দিনের ভিতর ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছিল। মুসা ভাইয়ের তথ্য অনুযায়ী বেগম মুজিবের বটি কাহিনীর কারণে কোন ঘটনাই ঘটেনি। মাওলানা সাহেব ও ভুট্টো গোলটেবিল বৈঠকে অংশ গ্রহণ করেননি। শেখ সাহেবকেও তাঁরা অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু শেখ সাহেব মাওলানা সাহেবের অনুরোধ শুনেননি।
জীবনের শেষ সময়ে এসে মুসা ভাই টিভি টকশো’তে অনেক সত্য ও কড়া কথা বলে সরকারের বিরাগ ভাজন হয়েছিলেন। ফলে,তাঁর মৃত্যুর পর সরকার বা আওয়ামী লীগ তেমন কিছু করেনি। এমন কি সাবেক সংসদ সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধার সম্মানটুকুও দেয়া হয়নি। একেই বলে ভাগ্য। একই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছিল অবজারভারের সম্পাদক সালাম সাহেবকে। সারাজীবন সালাম সাহেব পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ ও গণতন্ত্রের কথা বলেছেন। তার জন্যে জেল জুলুম সহ্য করেছেন। এ মানুষটাকে স্বাধীনতার পর পরই চাকুরী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

লেখক:  এরশাদ মজুমদারের জন্ম ১৯৪০ সালের ৮ই মার্চ ফেণী শহরের উকিল পাড়ার মজুমদার বাড়িতে। ১৯৬১ সালের অক্টোবরে অবজারভারের শিক্ষানবীশ ইকনমিক রিপোর্টার হিসাবে সাংবাদিকতা শুরু করেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের কবিতাপত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ইতোমধ্যে তাঁর তিনটি উপন্যাস ও সাতটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। আরও আটটি বই প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। তিনি আন্তর্জাতিক সাহিত্য সংগঠণ পিইএন এর সদস্য। বর্তমানে তিনি আধ্যাত্ববাদ নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বাংলাদেশের ‘রূমী ষ্টাডি সার্কেল’এর সভাপতি।

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »


স্কুল জীবন থেকেই আমি লিখতে ও বলতে ভালবাসি। তারপর একদিন লেখালেখিটা পেশা হয়ে গেছে। আমার প্রথম লেখা মানে কবিতা ‘ফেণীর রাজা’ খাজা সাহেবের কাগজে ছাপা হয়েছে ৫২ কি ৫৩ সালে। তখন আমি ফেণী হাইস্কুলে সপ্তম কি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। বিখ্যাত হেড মাস্টার জালাল সাহেব ৫২ সালে ফেণি হাইস্কুলে সবেমাত্র যোগ দিয়েছেন হেড মাস্টার হিসাবে। ৫০ এর দাংগার পর হেডমাস্টার সম্মানিত মণীন্দ্র মুখার্জী ফেণী ছেড়ে  ভারতে চলে যান। দাংগার পর স্কুল কিছুদিন বন্ধ ছিল। দাংগায় সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল উকিল পাড়া ও মাস্টার পাড়া। আমাদের বাড়ি( বাসা নয়) ছিল উকিল পাড়া। এখনও আছে। তবে হিন্দু উকিল বাবুরা কেউই নেই। ৫০ থেকে ৫২র মধ্যে বাড়ি গুলো  কিনে নিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা। দাংগার বছর আমি ফেণী মডেল স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। তখনও স্কুলটি হাই স্কুলে পরিণত হয়নি। এই স্কুলের হেড মাস্টার ছিলেন আবদুল বারীক সাহেব। তিনি তখন অনারারী ম্যাজিস্ট্রেটো ছিলেন। স্কুলের কাছেই ছিল স্যারের বাড়ি( মুন্সী বাড়ি )। কিন্তু স্কুলটি চালাতেন সেকেন্ড স্যার কাজী আবদুল গফুর। তাঁর বাড়ি গোবিন্দপুর কাজী বাড়ি। কাজী সাহেব বারীক সাহেবের আত্মীয় ছিলেন। ৫১ সালে ষষ্ঠ  শ্রেণী পাস করে আমি ফেণী হাই স্কুলে চলে যাই। ৫২ সালের ঢাকার ভাষা আন্দোলনের জোয়ার লেগেছে ফেনীতে ১৯৫৩ সালে ফেণী কলেজ মজলিসের সাধারন সম্পাদক ও ছাত্রনেতা আমির হোসেনের নেতৃত্বে। রানৈতিক ভাবে এই  আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন খাজা আহমদ সাহেব। তখন তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেননি। বাম চিন্তাধারার গণতন্ত্রী দল করতেন। মির্জা গোলাম হাফিজ ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতও এই দল করতেন। খাজা সাহেব ৫৪ সালের নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন গণতন্ত্রী দল থেকেই এবং প্রদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমির হোসেন সাহেব ছিলেন আমার নিকট আত্মীয়। আমাদের বাড়িতেই থাকতেন। তিনি ছিলেন খুবই মেধাবী একজন ছাত্র। আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। তিনি সারা মহকুমায় ছাত্র ধর্মঘটের  আহবান করেছিলেন। আমার উপর দায়িত্ব পড়েছিল বারিক মিয়া সাহেবের স্কুলে ধর্মঘট করানো। আমি তখনও জানিনা কিভাবে ধর্মঘট হয়। ভয়ে বুক কাঁপছিলো। ছাত্রদের সাথে আগে কথা বললে সবকিছু ফাঁস হয়ে যাবে এই ভয়ে কাউকে কিছু জানাইনি। বড়রা আমাকে বুঝিয়ে দিলেন তুমি শুধু স্কুলের ঘন্টাটা পিটিয়ে দিয়ে পালিয়ে যাবে। বেলা এগারটার দিকে আমি তাই করলাম। এটাকে ছুটির ঘন্টা মনে করে ছাত্ররা সব বেরিয়ে পড়লো। কিন্তু ইতোমধ্যে সবাই জেনে গেছে আমি একাজটি করেছি। ব্যাস, আর যায় কোথায়! বিকেল চারটার দিকে পুলিশ আমায় গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। পুলিশ আমার সাথে কোন খারাপ ব্যবহার করেনি। একটা টুলের উপর বসিয়ে রেখেছিল। আমি নিজেকে খুবই একাকী বোধ করলাম। মনে হলো , এ জগতে আমার কেউ নেই। আমি ভয় পেয়ে কাঁদছিলাম। এ সময়ে আমার মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিলো। ৫১ সালের অক্টোবর মাসে আমার মা আশরাফ উন নেসা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তখন আমি মাত্র এগারো। আমার মা’ই আমার প্রথম শিক্ষক ছিলেন। তিনি কিছু পড়ালেখা জানতেন। প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণীতে তিনি আমাকে অংক করাতেন। তিনি খুব কড়া ছিলেন। মায়ের অনুপস্থিতে আমি একটু স্বাধীন হয়ে গিয়েছিলাম। মায়ের স্মৃতি আমাকে চিরদিন পোষাকের মতো জড়িয়ে রয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয় মা’তো সাথেই আছেন। আমার প্রথম ছাপা বইয়ের নাম ‘মায়ের চিঠি। এতা প্রকাশ করেছিলেন বিখ্যাত ব্যান্কার মুজিবুল হায়দার চৌধুরী। সেই থেকেই আমার প্রকাশনা শুরু হয়েছে। এরপরে আরও অনেক গুলো বই। তিনটি উপন্যাস ইতোমধ্য প্রকাশিত হয়েছে। আরও একটি প্রকাশর অপেক্ষায় আছে। ইতোমধ্য আমি আমি দেশী বিদেশী অনেক গুলো এওয়ার্ড পেয়েছি।

আমার বাবা আবদুল আজিজ মজুমদার ছিলেন খুবই নরম প্রকৃতির মানুষ। আমাকে সীমাহীন ভালবাসতেন। আমার কোন কাজে বাধা দিতেন না। সে বছরই  মানে ৫৩ সালে ফেণীতে ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হয়। কাজী মেসবাহ বা মনির ভাই ছিলেন মহকুমা সম্পাদক। যতদূর মনে পড়ে আমি ছিলাম সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক। যা হোক, বিকেল ছ’টার দিকে আমার বাবা আমাকে মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিলেন। বাবাকে দেখে আমি আরও জোরে হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগলাম। এরপরে ক্রমাগত রাজনীতির সাথে জড়িয়ে যেতে লাগলাম। কোন দলীয় রাজনীতির বন্ধনে আমাকে কখনও আকৃষ্ট করেনি। যদিও কিছুদিন ন্যাপের সাথে জড়িত ছিলাম। আসলে মানবতাবেধই আমাকে রাজনীতি সমাজ সেবার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলেছে। মানুষের সেবা করা আমার জীবনের প্রধান ব্রত।

সে সময়ে ফেণী ছিল সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের বিরাট একটি কেন্দ্র। মাস্টার পড়ায় রবীন্দ্র পাঠাগার গড়ে উঠেছিল। সেই পাঠাগারে স্কুল কলেজের শিক্ষকরাও যেতেন। মনে আছে আমি একবার হাজী মহসিন ও শরত্‍চন্দ্রের ছবি এঁকে পুরস্কার পেয়েছিলাম। ফেণী হাই স্কুল থেকে প্রথম ছাপানো দেয়াল পত্রিকা ‘আলো’ প্রকাশিত হয়েছিল ৫৫ সালে। আমি ছিলাম আলোর সম্পাদক। কবি শামসুল ইসলাম ছিল সহকারী। আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষক সাত্তার সাহেব ছিলেন প্রকাশনা কমিটির সভাপতি। তিনি ছিলেন রামপুর সওদাগর বাড়ির সন্তান। খুবই অমায়িক মানুষ ছিলেন। তখন ফেণীতে খাজা সাহেবের সংগ্রাম ছাড়া কোন সাপ্তাহিক কাগজ ছিলনা। থাকলেও আমার মনে পড়ছেনা। খাজা সাহেব তখন থাকতেন তাকিয়া বাড়ির ভিতরেই একটা ঘরে। সেখান থেকেই কাগজ বের হতো। এই সময়েই আমি আজাদের মুকুলের মাহফিলের সদস্য হই। সদস্য হিসাবে তখন নাম ছাপা হতো। এরপরে আমি খেলাঘরেরও সদস্য হই। ৫৬ সালে ফেণী কলেজে গিয়ে  আমি লেখালেখির সাথে আরও বেশী জড়িত হই। কলেজে জোছনা বাবু আমাদের বাংলার শিক্ষক। যদিও আমি কমার্স পড়তাম। কমার্সের হেড ছিলেন কাজী লুত্‍ফুল হক। জোছনা বাবুর সাথে আমি আর রফিক ভুঁইয়ার সম্পর্ক ছিল খুবই মধুর। আমাদের সকল সাংস্কৃতিক কর্মসূচীর সাথে তিনি থাকতেন। ফেণী কলেজে থাকতেও আমি কলেজ ম্যাগাজিনের প্রকাশনার জড়িত ছিলাম। এরপর ঢাকায় চলে আসি লেখাপড়ার জন্যে। এখানে এসে আমি পুরোপুরি সাহিত্য জগতের সাথে জড়িয়ে পড়ি। বিশেষ করে নামজাদা কবি সাহিত্যিকদের সাথে দেখা করা ও সমবয়সী কবিদের সাথে আড্ডা মারা ছিল আমার প্রতিদিনের রুটিন। সাথে ঢাকার কাগজ  গুলোতে কবিতা ছাপা হতে শুরু করলো। তারপরেতো আমি ৬১ সালে অবজারভারে নবীশ ইকনমিক রিপোর্টার হিসাবে যোগ দিই। ৬১ সাল থেকেই কাগজ গুলোতে আমার কবিতা ছাপা শুরু হয়। কবিতা দিলেই ছাপা হয়ে যায়। মনে হলো বাছ বিচার নেই। যেহেতু আমি খবরের কাগজে চাকুরী করি সেহেতু সবাই চিনতো। নাম দেখেই কবিতা ছাপিয়ে দেয়। এক সময় মনে হলো কবিতা ছাপিয়ে কি লাভ। আমিতো আর কখনই কবি হবোনা।

২০০২ সালে কবিতার জন্যে আমেরিকা থেকে কবিতার জন্যে এওয়ার্ড পাওয়ার পর আমি আবার সিরিয়াসলি কবিতায় মনো নিবেশ করি। এখন আমি নিয়মিত কবিতা লিখি। জাতীয় প্রেসক্লাবের কবিতা সংগঠণ কবিতাপত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। প্রতিমাসে কবিতা পাঠের আসর বসে। কবিতাপত্র নামে একটি  একটি মাসিক নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। প্রখ্যাত গীতিকার ও কবি কেজি মোস্তফা কবিতাপত্রের সম্পাদক। দশ বছর ধরে তিনি এতার সম্পাদনা করছেন। এছাড়াও আমি আন্তর্যাতিক বহু কবিতা সংগঠনের সদস্য। শুরুতেই বলেছি বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই লিখে চলেছি। নিয়মিত খবরের কাগজে কলাম লিখতে হয়। কলাম লেখার চাপের পরে থাকে অনুরোধের লেখার চাপ। না করা যায়না। পারিশ্রমিক বা সম্মানী দিবার কথা বললেও অনেক সময় লিখা হয়ে উঠেনা। অনেকদিন হলো হাতে লিখতে পারিনা। ডান হাত চলেনা। বাঁ হাত দিয়ে শুধু প্রয়োজনীয় দস্তখত করি। তাও আমার বড়ছেলে নওশাদ শিখিয়ে দিয়েছে। ভাগ্য ভালো কম্পিউটারে কম্পোজ করতে শিখেছিলাম।  বিগত ১৫ বছর ধরেই কম্পিউটারে কম্পোজ করছি, ইমেইল করছি। একাজটিও ছেলেরা আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে। মাঝে তারা বকা ঝকাও করে। বলে, এত বছর হয়ে গেলো ভাল করে কম্পিউতারে কাজ করতে পারোনা। আমি বলি বাবা, যা পারি এটাতেই আল্লাহপাকের হাজার শোকর আদায় করছি। আমার বয়সী সাংবাদিকদের ভিতর ১০/১৫ জন কম্পিউটার ব্যবহার করতে জানে। কবিরা বেশীর ভাগই কম্পিউটার ব্যবহার করতে চায়না।

এখন আমার সময় কাটে শুধুমাত্র লেখালেখি করে। দুপুরে তিন ঘন্টা প্রেসক্লাবে আড্ডা মারি। ওখানেই খাই। ক্লাবেও মাঝে মাঝে কম্পিউটার ব্যবহার করতে হয় জরুরী কাজ পড়ে গেলে। আমাদের ক্লাবে একটা মিডিয়া সেন্টার আছে। সেখানে বিনে পয়সায় কম্পিউটার শিখানো হয়। এখন অনেকেই এখানে বসে রিপোর্ট তৈরি করে ইমেইলে অফিসে পাঠিয়ে দেয়। কম্পিউটার জানা এখন সাংবাদিকদের জন্যে বাধ্যতামূলক।

Read Full Post »


আল্লাহর রাসুল হজরত মোহাম্মদ(সা) বলেছেন, জ্ঞান অর্জনের জন্যে তোমরা সুদূর চীন দেশ পর্যন্ত যাও। মুসলমান নরনারীর জন্যে জ্ঞান অর্জন ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য। আল্লা্পাক নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন, পর তোমরা তোমাদের প্রভুর নামে। এটাই হলো পবিত্র কালামে পাকের প্রথম বাণী মানব জাতির জন্যে। আল্লাহর রাসুল(সা) বলেছেন, তোমরা যতদিন আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাতকে বুকে ধারণ করবে ততদিন দুনিয়ার ইমামত তোমাদের কাছে থাকবে। সেই ইমামত এখন মুসলমানদের হাতে নেই। বরং মুসলমানরা দরিদ্র ও অশিক্ষিত হয়ে পড়েছে। চলমান বিশ্বে মুসলমানরা সবচেয়ে বেশী অপমানিত ও নির্যাতিত। কারণ তারা জ্ঞানের পথ ছেড়ে অন্যপথে চলতে শুরু করেছে। বলা হয় সারা বিশ্বে এখন ১৫০ কোটি মুসলমান আছে। আসলে এই সমখ্যাটি শুধুই একটি সংখ্যা। এই সংখ্যা ইতিবাচক বা গুণবাচক কিছুই বুঝায়না। রাসুলের জামানায় তিনশ’ মুজাহিদ  এক হাজার অবিশ্বাসীকে পরাজিত করেছে। খলিফাদের জামানায় অর্ধেক পৃথিবী মুসলমানদের অধিকারে এসেছিল। মুসলমানরাই সারা বিশ্বে জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়েছিল। এখনতো আমাদের সন্তান এবং নতুন প্রজন্মের নাগরিকরাতো বিশ্বাসই করতে চায়না এক সময় মুসলমানরা বিশ্বব্যাপী জ্ঞান বিস্তার করেছে। এক সময় মুসলমানরা যে অর্ধেক বিশ্বকে শাসন করেছে।যখন বলি বাংলাদেশ এক সময় সুজলা সুফলো ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সওদাগররা আসতো এই দেশে ব্যবসা করার জন্যে। আজ বাংলাদেশ একটি গরীব নিরক্ষরের দেশ। কেমন করে নতুন প্রজন্ম বিশ্বাস করবে এই দেশটা সুজলা সুফলা ছিল। সন্তানেরা বলে, তোমরা অতীতের ভিতর নিজেদের লুকিয়ে রেখনা, ভবিষ্যত নিয়ে ভাবো। ভাবো কেমন করে নিরক্ষরতা আর দারিদ্র দূর করবে। কেমন করে মালয়েশিয়া সিংগাপুর তাইওয়ান দক্ষিণ কোরিয়া নিজেদের দারিদ্র দূর করেছে।ইসলাম কখনই দারিদ্র ও অশিক্ষাকে সমর্থন করেনা । তাহলে মুসলমাদের আজ এই দূরাবস্থা কেন এই প্রশ্ন আসতেই পারে । এ ব্যাপারে মুসলমান স্কলারদের কি উত্তর আমি জানিনা। আমিতো মনে করি মুসলমানরা সঠিক পথে নেই। ১৫০ কোটি নামের মুসলমান। আরবী নাম থাকলেই কেউ মুসলমান হয়ে যায়না। স্বাভাবিক ভাবেই ইমানের প্রশ্ন এসে যায়।

ইমানের সাথে বিদ্যা বিশ্বাস এবং জ্ঞান অর্জনের বিষয়টি এসে যায়। আমি মসজিদে বহু গরীব মুসল্লীকে দেখেছি যারা নামাজের কিছুই জানেন না। কিন্তু নিয়মিত মসজিদে আসেন বিশ্বাসের কারণে। অন্যদের দেখে দেখে নামাজ পড়েন। এমন মুসলমানদের নিয়েই জগতে এখন ১৫০ কোটি মুসলমান। ফলে ঈমানের দূর্বলতা থেকেই যায়। আমিতো মনে করি শুধু সংখ্যা বন্দী মুসলমান দিয়ে চলমান বিশ্বে মুসলমান বা ইসলাম কোন অবদান রাখতে পারবেনা।মালয়েশিয়ার মুসলমান নেতৃত্ব  বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে  মুসলমানরা   দেশ  ও জাতির খেদমত করে উন্নতি সাধন করতে পারে। মহাথির মেহাম্মদ   বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে মুসলমানরা পারে। আরব বিশ্বের কথা বাদ দিলাম।সেখানে ইসলামও নেই মানবতাও নেই। সেখানে কিছু মুসলমান নেতা জনগণের ধন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। আল্লাহপাক বহু আরব দেশকে ধন সম্পদ দিয়েছেন তাদের প্রতি সদয় হয়ে। কিন্তু তারা সেই সম্পদকে যথেচ্ছা ব্যবহার করছেন ইসলামের বিধানের বিরুদ্ধে। অথচ তারা নিজেদের মুসলিম উম্মাহর খাদেম বা নেতা বলে দাবী করেন। এই আরব নেতারা দীর্ঘদিন ধরে ইহুদীদের প্রভাবান্বিত খৃস্ট নেতাদের পদলেহন করে আসছে। আজ তারা পশ্চিমা নেতাদের দ্বারা পদদলিত ও অপমানিত। আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমারা আজ যে ইসলাম বিরোধী অভিযান চালিয়েছে সেই অভিযানকে সমর্থন দিয়ে চলেছে আরব নেতারা।আমেরিকা এবং তার বন্ধুদের প্রধান টার্গেট এখন ইসলাম। মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসাবে চিহ্নিত করে সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ ঘোষণা করেছে জুডিও খৃস্ট নেতারা।আর মুসলমানরা মার খাচ্ছে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত। এমন কি আমেরিকা বা জুডিও খৃস্ট নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক ও বন্ধুত্ব রাখার জন্যে নিজদেশের মুসলমানদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে। ইসলামের চর্চা করেন বা ইসলামী জীবন যাপন করেন এমন লোকদের মৌলবাদী বা সন্ত্রাসী বলা হচ্ছে। আমেরিক ও তার বন্ধুরা এ কাজের জন্যে বিভিন্ন দেশের সরকার গুলোকে অর্থ সরবরাহ করছে। বাংলাদেশও তেমন অর্থের হিস্যাদার। পুলিশতো এখন হাতে ধর্মীয় পুস্তক দেখলেই পিটায়, গ্রেফতার করে। এক সাথে একদল  একদল মাদ্রাসা ছাত্র দেখলেই বলে ওরা ষড়যন্ত্র করছিলো। বা নাশকতামূলক কাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। আমাদের বাংলাদেশে এসব এখন হরহামেশাই হচ্ছে। চলমান সরকারের কাঁধে স্যেকুলারিজম বা ধর্ম নিরপেক্ষতার ভুত চেপে বসেছে। ধর্ম নিরপেক্ষতার সাইনবোর্ড ঝুলালে জুডিও খৃস্ট নেতারা টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য  করে।

এইতো ক’দিন আগে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বললেন, ইসলামের নামে যারা সন্ত্রাস করে তারা মুসলমান নয়।একথা পশ্চিমের সব নেতাই বলছেন। সন্ত্রাস দমনের নাম করে পশ্চিমারা বাংলাদেশের মতো দেশ গুলোতে সরকারকে টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করছে। পশ্চিমা প্রোপাগান্ডার ফলে মনে হয় ইসলাম সন্ত্রাস আর মুসলমান এক শব্দ হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে দিল্লী ওয়াশিংটন লন্ডন প্যারিস যা বলে আমাদের সরকারও বলে। আমাদের দেশে ১৫ কোটি মুসলমান। আমাদের দেশে স্যেকুলার(ধর্মহীন), জাগতিক, পরকালে বিশ্বাস করেনা এমন একটা গোষ্ঠি আছে যারা রাস্ট্রকে স্যেকুলার বানাতে চায়। আবার অনেকেই  আছেন যারা বলেন, স্যেকুলার মানে ধর্ম ব্যক্তিগত ব্যাপার,এতে রাস্ট্রের কিছু করার নেই। রাস্ট্র স্যেকুলার থাকবে আর জনগণ নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। সোজা কথায় রাস্ট্র কোন ধর্মের পক্ষে থাকবেনা। আরেক গ্রুপ আছে যারা বলেন , সমাজ ধর্মহীন থাকবে। শুধু ব্যক্তি নিজের উদ্যোগে ধর্ম পালন করবে। তারা জানে যে , বাংলাদেশ একটি  সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান দেশ। দেশের ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান। আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি সেজন্যে আমরা বাংগালী। কিন্তু আমাদের দেশের বা রাস্ট্রের নাম বাংলাদেশ তাই আমরা বাংলাদেশী। এ ব্যাপারে স্যেকুলারিস্ট বা ধর্মহীনদের( এদের সংখ্যা হয়ত কয়েক হাজার হবে। তবে এরা প্রভাবশালী। এরা অফিস আদালত, স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে আছে। আদালতে কোরাণ ও সুন্নাহর বিরুদ্ধে রায় দেয়। এরা ইসলাম বিরাধী নারী অধিকার পাশ করাবার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে। এরা পশ্চিমা ধাঁচের নারী স্বাধীনতা চায়। এরা নারীদের পর্দা বিরোধী। এরা পশ্চিমা অর্থে লালিত পালিত এনজিওদের পয়সায় জীবন ধারন করে। এরা পশ্চিমাদের খেদমত করে স্যার উপাধি সংগ্রহ করে আর কিছুলোক এদের বাহবা দেয়। আমি নিজেও অনুভব করি ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে মুসলমানরা মাইনরিটি হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি অনেকদিন থেকেই চলছে। বিএনপি- জামাত আমলেও এর কোন পরিবর্তন হয়নি। তারা কোন বিপ্লবী বা সংস্কারবাদী দল নয়। তাছাড়া বাংলাদেশ কোন ইসলামী রাস্ট্র নয়। এদেশের আইন কানুন কিছুই ইসলামী নয়। এদেশের মুল আইন হলো বৃটিশ কলোনিয়াল আইন। একানকার পারিবারিক আইন গুলো কিছুটা ধর্ম ভিত্তিক। এখানকার সংসদের উত্‍পত্তিও পশ্চিমা ধারণা থেকে উদ্ভুত হয়েছে।

এইতো দেখুন না, জাতীয় সংসদ আর উচ্চ আদালতের ভিতর এখন খুব জোরে শোরে ঠোকাঠুকি চলছে। কে বড়? কে আর উপর খবরদারি করবে। খুব মজার ব্যাপার আমরাতো এতদিন শুনে এসেছি সংসদ সার্বভৌম। যদিও কোরাণ বলে আল্লাহই সার্বভৌম। জগতে কোন কিছুই সার্বভৌম নয়। সবকিছুই আল্লাহপাকের অধীন। মানুষই যেখানে সার্বভৌম নয় সেখানে মানুষের তৈরি সংসদ কিভাবে সার্বভৌম হয়? প্রসংগত এখানে মাওলানা রুমীর সিংহ আর খরগোশের গল্পটি উল্লেখ করতে চাই। বুদ্ধির বলেই খরগোশ সিংহকে পরাজিত করতে পেরেছিল। রুমী মনে করেন সংখ্যার চেয়ে হেকমত ও ইমানের দৃঢতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশী। দূর্বল ইমান ও হেকমত নিয়ে  শুধু সংখ্যার জোরে বিজয়ের সম্ভাবনা কম। মাওলানা রুমীই বলেছেন, পানি নৌকার নীচে থাকতে হবে, ভিতরে ঢুকলেই মরণ। ভাল পানি জীবন বাঁচায়, মন্দ পানি জীবন হরণ করে। আল্লাহপাক মানুষকে উদ্দেশ্য করে বার বার বলেছেন, জ্ঞান অর্জন করা অবশ্য কর্তব্য বা প্রধানতম ফরজ। যে জ্ঞান করবেনা সে পূর্ণাংগ মানুষ নয়। অশিক্ষা মানেই হলো অন্ধকার বা জুলুমাত। আর বিদ্যা বা জ্ঞান হলো আলো বা নুর। আল্লাহপাকের সর্বশেষ কিতাব পবিত্র কালামে পাক আলকোরাণ হচ্ছে মানব জাতির জন্যে নুর ও পথ প্রদর্শক। আমরা মুসলমানেরা এসব কথা মুখে বলি, কিন্তু আমল করিনা। বিশেষ করে বাংলাদেশে  এ অবস্থা মহামারির মতো দেখা দিয়েছে। এখানে নাগরিকরা যেমন নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও  তেমন। দেশবাসীর যোগ্যতার উপরেই নির্ভর করে সে দেশের শাসক কেমন হবে। আমাদের অবস্থা আজ সে রকমই। আমরা মহাথির, লি কুয়াং, নেলসন ম্যান্ডেলার মতো নেতা পাইনি। বংগবন্ধু আর শহীদ জিয়াকে হত্যা করেছে আমাদের সেনাবাহিনীর কিছু অফিসার। কিন্তু ওই অফিসারদের পিছনে কারা ছিল দেশবাসী কোনদিনও জানতে পারবেনা। বংগবনহদু আর শহীদ জিয়া ছিলেন শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী নেতা। দুজনই নিজ নিজ যোগ্যতা ও দৃষ্টিকোন থেকেই বাংলাদেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নেয়ার চেস্টা করেছিলেন। কিন্তু কারা এই দুইজনকে সরিয়ে দিয়েছে? জিয়া সাহেবের স্বপ্ন ছিল মহাথিরের মতো। সমাজতন্ত্রে বংগবন্ধুর কোন আস্থা বা বিশ্বাস ছিলনা। কিন্তু ভারত ও রাশিয়ার ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর কন্যার অবস্থাও এখন সে রকম। ভারত ও তার সকল সরকার শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বন্ধু। কিন্তু ভারত ও তার সরকার গুলো ভারতের স্বার্থেই বাংলা দেশের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশকে নানা ভাবে ভারত নির্যাতন করে চলেছে।শেখ হাসিনা ও তাঁর দল বাংলাদেশের স্বার্থ  ত্যাগ করে অন্ধ ভাবে ভারতের স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছে এবং আজীবন তাঁকে ক্ষমতায় রাখতে চায়। ভারত চায় বাংলাদেশ নেপাল ভুটান ও মালদ্বীপের মতো ব্যবহার করুক। শুধুমাত্র ভারতের পক্ষে এবং তার স্বার্থ পাহারা দেয়ার জন্যে শেখ হাসিনা গওহর রিজভীর মতো একজন অজানা অচেনা মানুষকে এনে উপদেস্টা নিয়োগ দিয়েছেন।

Read Full Post »


রাজনীতির ক্ষমতা আর ক্ষমতার রাজনীতি  /    এরশাদ মজুমদার

সরাজা বাদশা্দের যুগ পেরিয়ে আমরা আধুনিক এসেছি বলে ঢোল পিটিয়ে  দেশে বিদেশে সবাই বলছে। এক সময়ে রাজারা দিগ্বিজয়ে বের হতেন। মানে জোর করে অন্যের দেশ দখল করতেন আর বাহবা পেতেন। আমরা আলেকজান্ডার দি গ্রেটের নাম জানি। তিনি গ্রীসের মেসিডোনিয়া থেকে দেশ জয় করতে করতে ভারতবর্ষের  উত্তরে  এসেছিলেন। সে কথা আমরা জানি পুরুর সাথে তাঁর যুদ্ধের গল্প থেকে। পরাজিত পুরুকে নাকি আলেকজান্ডার জিগ্যেস করেছিলেন, আপনি আমার কাছে কি রকম ব্যবহার আশা করেন। পুরু নাকি বলেছিলেন, রাজার কাছে রাজা যে রকম ব্যবহার পেতে পারে সে রকম। পুরুর কথা শুনে আমরা খুব খুশী। হেরে গেলেও আমাদের রাজার সাহস আছে। সে সময়ে ভারতীয়রা এ রকম বহুবার বহু জায়গায় হেরেছে আর বিদেশীদের জয়গান গেয়েছে। এইতো দেখুন না, রাম বলে কেউ নেই এ কথা বহুবার বলা হয়েছে।স্বয়ং কবিগুরু বলেছেন রামের জন্ম কবির মনোভূমিতে। কিন্তু কে কার কথা শুনে। কবি কল্পনা করে  রামায়ন নামের মহাকাব্য লিখেছেন। সেই কাব্যই এখন প্রায় ধর্মগ্রন্থে পরিণত হয়েছে। বিদেশী রাজার এমন বিজয়গাঁথা জগতে কেউ কখনও দেখেছে কিনা জানিনা। শেষ পর্যন্ত বিদেশী বিজয়ী রাজাকে অবতার ও দেবতা বানানো হয়েছে। আর দেশী পরাজিত রাজা রাবণকে বানানো হয়েছে রাক্ষস। তেমনি বিদেশী দখলদার ইঁরেজদের আমরা আজও স্মরণিয় বরণীয় মনে করি। আজও আমরা কমনওয়েলথের সদস্য। এর মানে একদিন আমরা তাদের দখলে ছিলাম এবং তাদের প্রজা ছিলাম সে কথা আমরা জোর গলায় জাহির করছি।। একনও আমাদের দেশের লোক স্যার টাইটেল পেলে খুশীতে আটখানা হয়ে যায়।দেশী ভাই বেরাদরের সহযোগিতার ইংরেজরা এই দেশটাকে ১৯০ বছর শাসন ও শোষণ করেছে। কি রকম শোষণ করেছে তা এখন আমাদের বন্ধু বান্ধব ও নতুন প্রজন্মের সন্তানেরা হয়ত ভুলে গেছে। আমাদের নতুন প্রজন্মের সন্তানেরা ইতিহাস নিয়ে তেমন মাথা ঘামায়না। তারা আজ নিয়ে ভাবে। গতকাল নিয়ে ভাবেনা। হয়ত এমন অনেক তরুণ আছে যারা ভাল করে দাদার নামও জানেনা। হয়ত ওই নামটা তার কখনও প্রয়োজন হয়নি। হয়ত দাদা একেবারেই নগণ্য একজন মানুষ ছিলেন। তাই বাপ তার নিজের বাপের  পরিচয় দিতে লজ্জা পেতেন। হয়তবা ধনী হয়ে নিজের অতীতকে মুছে দিয়েছেন। এমন তরুণ বা তাদের বাবাদের ইতিহাস না জানলেও চলে। এ কারণেই আমাদের ইতিহাস নিয়ে এত কথা। প্রায় সবাই বলছেন, ইরহাস বিকৃতি হচ্ছে। কোনটা সত্য ইতিহাস তা নিয়ে আমরা বিভ্রান্ত। যে দল যখন ক্ষমতায় আসে সে দল নিজের মতো করে ইতিহাস বলে। একদল বলে বংগবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও আমরা কেউ তাঁর ঘোষণা শুনিনি। আদালত বলেছেন বংগবন্ধুই ঘোষনা দিয়েছেন। তাই এ নিয়ে আর কোন কথা চলবেনা। হাজার হলেও আদালতের ফরমান। ইতোমধ্যে বংগবন্ধুর ইতিহাস নিয়ে প্রখ্যাত উপন্যাসিক হুমায়ুন আহমদ বে কায়দায় পড়েছেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী হুমায়ুনকে লেখা বদলাতে হবে। এতোদিন হুমায়ুন বানিয়ে বানিয়ে গল্প লিখতেন। কিন্তু ইতিহাস নিয়ে  লিখতে গিয়েই ধরা  পড়ে গেলেন।

জাতি হিসাবে আমাদের বায়া দলিল মানে ইতিহাস  আজও বিতর্কিত। কোনটা সঠিক তা আজ আর বুঝা যায়না। আমি প্রায়ই বলি জমির যদি বায়া দলিল থাকে, বংশের যদি বায়া দলিল থাকে তাহলে দেশের বায়া দলিল থাকবেনা কেন? আমরাতো আজও সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি আমরা কি শুধুই বাংগালী, না বাংগালী মুসলমান। বিশ্ব বাংগালী নামে এখন নতুন শ্লোগান শুনতে পাচ্ছি। বিদেশের মাটিতে বিশ্ব বাংগালী সম্মেলন অনুস্ঠিত হয়। সেখানে সারা বিশ্বের বাংগালীরা উপস্থিত হয়। এই সম্মেলনে যারা উপস্থিত হন তাদের মধ্যে শুধু বাংলাদেশীদেরই একটি স্বাধীন রাস্ট্র আছে, বাকি বাংগালীদের কোন রাস্ট্র নেই। পৃথিবীর ৩০ কোটি বাংগালীর মধ্যে ১৫ কোটি বাংগালীর কোন স্বাধীন রাস্ট্র বা দেশ নেই। পরাধীন বাংগালীরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাস করে ও কাজ করে। বিদেশী যারা বাস করেন তারা কেউ ভারতীয়, কেউ  বৃটিশ বা কেউ অন্যকোন দেশের। বাংগালী হলেও সবাই বাংলাদেশী নয়। এমন কি আমাদের উপজাতিরাও নিজেদের বাংগালী মনে করেন না। জাতীয় সংসদে বংগবন্ধু যখন আহবান জানালেন, তোরা পাহাড়ীরা সবাই বাংগালী হয়ে যা। তখন মানবেন্দ্র লারমা প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, আমরা বাংগালী নই। আমরা বাংলাদেশী।

রাজনীতির প্রধানতম উদ্দেশ্যই নাকি ক্ষমতায় যাওয়া। কারন ক্ষমতায় না গেলে আদর্শ বা উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা যায়না। তাই ক্ষমতা যাওয়ার জন্যে রাজনীতির প্রয়োজন। দল ছোট হোক বা বড় হোক রাজনীতি করলে একদিন ক্ষমতায় যাওয়া যাবেই। তার প্রমাণ ক্ষমতাসীন মহাজোট। শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন কোনদিনও দেখেননি। ভোট করে ৩/৪শ’র বেশী ভোট পান না। ভগবান বুদ্ধ বড়ুয়ার দিকে মুখ তুলে ছেয়েছেন। তাই দিলীপ বড়ুয়া আজ মন্ত্রী। মেনন ও ইনুরও একই অবস্থা। ক্ষমতা  যাওয়ার জন্যে কৌশলগত কারণে নিজের মার্কা ত্যাগ করে নৌকা মার্কায় নির্বাচন করেছেন। ২০০৮ সালের ওই নির্বাচনে জয় লাভ ছিল ১০০ ভাগ গ্যারাণ্টিড। মেনন একবার জিয়া সাহেবের আমলে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। ইনুর সে সুযোগও হয়নি। জীবনে একবারও এমপি বা সংসদ সদস্য হননি এমন অজানা অচেনা লোকেরাও মন্ত্রী হয়েছেন। উর্দুতে একটা কথা আছে।‘ খোদা মেহেরবানতো, গাধা ভি পাহলোয়ান’। হাসিনা যাঁর উপর খুশী হয়েছেন তিনিই মন্ত্রী হয়ে গেছেন। নির্বাচন না করেও মন্ত্রী হয়েছেন। নির্বাচনে যাঁরা শলা দিয়েছিলেন জিতার জন্যে তাঁরাও আজ মন্ত্রীর পদ মর্যাদায় উপদেস্টা। লোকে বলে উপদেস্টাদের ক্ষমতা নাকি মন্ত্রীদের চেয়ে হাজার গুণ বেশী। হাসিনার ক্ষমতা আছে তাই তিনি নিকট দূর বহু আত্মীয় স্বজনকে পাহলোয়ান বানিয়ে দিয়েছেন। বংগবন্ধুর আমলেও তাঁর আত্মীয় স্বজনরা ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছিলেন। শুনেছি, গণচীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইকে বিদেশী সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, আপনার জীবনে সাফল্যের প্রধান কারণ কি? চৌ উত্তরে বলেছিলেন, আমি আত্মীয়দের সব সময়ে দূরে রেখেছি। শহীদ জিয়ার ক্ষেত্রেও তাই শুনেছি। জিয়া সাহেব নাকি আত্মীয় স্বজনদের কখনই কাছে ঘেঁষতে দেননি। শেরে বাংলা অখন্ড বংগদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে নিজের এক অযোগ্য ভাগিনাকে চাকুরী দিয়েছিলেন। সংসদে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, প্রার্থীর যোগ্যতা সে প্রধানমন্ত্রীর ভাগিনা। বংগবন্ধুর ভাগিনারাও তাঁর ক্ষমতা থাকা কালে নানা ধরণের সুযোগ পেয়েছিলেন। বংবন্ধুর ভগ্নিপতিকেও নাকি তিনি রাতারাতি সচিব করে দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর নাম জানা বেয়াই সাহেবকে মন্ত্রী বানিয়েছেন। তাঁর পরম স্নেহের ছেলে জয় নানা সময়ে সরকারের উপদেস্টা হিসাবে করছেন।তিনিই নাকি ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রস্টা। তাঁর কন্যা পুতুলও এখন নানা কাজে সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছেন। ক্ষমতা থাকলে এবং ক্ষমতায় থাকলে ক্ষমতাবানরা নিজের নামে এবং আত্মীয় স্বজনের নামে অনেক কিছু করেন। টাকা কিন্তু জনগনের। জনগনের নামে বিদেশ থেকে ধার করে আনা অথবা জনগনের কাছে আদায় করা টাকা থেকে। জিন্নাহর নামের রাস্তা এখন বংগবন্ধুর নামে। এটা বংগবন্ধ থাকতেই হয়েছে। জনগনই নাম পালটে দিয়েছেন। ইংরেজ আমলে তাদের নামে রাস্তা হয়েছে, বড় বড় মহল হয়েছে। পাকিস্তান আমলে অনেক নাম বদলে গেছে। বাংলাদেশ আমলে সেসব আবার বদলেছে। যেমন ধরুন, ইংরেজ আমলে ব্যবসাটা ছিল হিন্দুর, পাকিস্তান আমলে সেটা হয়েছে অবাংগালী মুসলমানের। বাংলাদেশ হওয়ার পর সেই ব্যবসা হয়ে গেল বাংগালী আওয়ামী মুসলমানদের। ৭১ সালেও দেখেছি, হিন্দুরা ভারতে চলে গেলে বাংগালী মুসলমানেরা তাদের বাড়ি ঘর লুট করেছে। ক্ষমতার ধারা এমনিই চলে। আপনার ক্ষমতা থাকলেই হলো। আইনের স্বীকৃতি প্রাপ্ত ক্ষমতা, না হয় দলের স্বীকৃতি প্রাপ্ত ক্ষমতা। রাজনীতি করলেও আপনার এই ক্ষমতা থাকতে পারে, আবার রাস্ট্র আপনার হাতে বা পাশে থাকলেও হতে পারে।

রাজনীতি না করেও ক্ষমতায় আসা যায়। যেমন সামরিক জারী করে , দেশের সংবিধান বাতিল করে সেনা প্র৫ধান ক্ষমতায় আসতে পারেন। সেখানে তাঁর সমর্থক থাকবেন সৈনিকরা আর সেনা অফিসাররা। পাকিস্তান আমল থেকে আমাদের দেশে বহুবার সামরিক শাসন জারী হয়েছে। সেনা প্রধানরা ক্ষমতায় এসে রাস্ট্র প্রধান, প্রেসিডেন্ট বা রাস্ট্রপতি হয়েছেন। বংগবন্ধুর ইন্তিকালের( স্থান পরিবর্তন) পর সামরিক শাসন জারী করে তাঁরই বন্ধু খোন্দকার মোশতাক ক্ষমতায় আসেন। তাঁকে সমর্থন দিয়েছেন সেনা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের একাংশ। পরে সেই ক্ষমতা হাত বদল হয়ে চলে যায় সে সময়ের সেনা প্রধান জেনারেল জিয়ার কাছে। এর মধ্যে একমাত্র জেনারেল জিয়াই ছিলেন জনপ্রিয় শাসক। সেটা প্রমানিত হয়েছে তাঁর জানাজায় লাখো মানুষের অংশ গ্রহনে। এদেশে কারো জানাজায় এত মানুষের সমাগম হয়নি।নেনারেল জিয়াকে যাঁরা দেখতে পারেন না তাঁদের মত অবশ্য ভিন্ন। সামরিক আইন নিয়ে জাস্টিস মুনিমের একটি বই আছে। এটা ছিল তাঁর পিএইচডি থিসিস। জেনারেল আইউবের সামরিক আইন জারী নিয়ে নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি সামরিক আইনের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। ইংল্যান্ডে প্রথম রাজারা এই আইন ব্যবহার করেন। তবে বলা হয়েছে এটা কোন আইন নয়। যুদ্ধের সময়েই শুধু এ আইন ব্যবহার করা যেতে পারে, শান্তির সময় নয়। জেনারেল আইউব যখন  সামরিক আইন জারী করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন তখন কোন যুদ্ধাবস্থা ছিলনা।  এইতো কিছুদিন আগে  জেনারেল মঈন দেশে জরুরী অবস্থা জারী করতে তত্‍কালীন প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনকে বাধ্য করেন। জেনারেল মঈন  একটা সিভিল সরকার নিয়োগ করে দেশ পরিচলনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সারাদেশে সেনা অফিসাররা প্রশাসন চালাবার দায়িত্ব নেয়। দূর্ণীতির মূলোচ্ছেদ করার নামে দেশের অর্থনীতিকে তছনছ করে ফেলে। দেশের মানু মনে করে জরুরী অবস্থা জারী করার প্রেক্ষিত তৈরি করেছে গোয়েন্দা বাহিনী।  আর আওয়ামী লীগ  বিশৃংখল অবস্থা সৃস্টির হাতিয়ার হিসবে ব্যবহৃত হয়েছে। অথবা বলা যেতে পারে জেনারেল মঈনের ক্ষমতা গ্রহনকে আওয়ামী লীগ সমর্থন করেছে। আর এ জন্যে পুরস্কার হচ্ছে ২০০৮ সালের নির্বাচন।এক সময় বলা হতো ‘মাইট ইজ রাইট’। জোর যার মুল্লুক তার। মাঝখানে মনে হয়েছিল সেসব দিন বাসি হয়ে গেছে। না, এখনও সেসব দিন বাসি হয়নি। এখনও শক্তি থাকলে উপায় হয়। রাস্ট্র শক্তি থাকলেতো কথাই নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি রাস্ট্র যদি কারো দখলে থাকে তাহলেতো আর কথাই নেই। যিনি ক্ষমতায় থাকবেন বা ক্ষমতা দখল করবেন রাস্ট্র তার কথা মতো চলবে। কিন্তু বলা হবে আইনের শাসন চলছে। আগেই বলেছি আইন গুলোতো তৈরি হয়েছে যারা রাস্ট্র চালাবেন তাদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্যে। এমন দেশে জনগণের নামে সবকিছু হবে, কিন্তু জনগণ থাকবেনা।

জেনারেল আইউব গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়ে, রাজনীতিকদের হেনস্থা করে প্রায় দশ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। পরে আন্দোলনের মুখে জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে ক্ষমতা দিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন। আর জেনারেল ইয়াহিয়া সাধারন নির্বাচন দিয়েও পাকিস্তানকে রক্ষা করতে পারেননি। বাংলাদেশের জেনারেল এরশাদও গণরোষের মুখে পদত্যাগ করে জেলে গিয়েছিলেন। এখনও তাঁর বিরুদ্ধে বহু মামলা রয়েছে। এরশাদ ক্ষমতা দখল করে বলেছিলেন, তিনি দিল্লীর সাথে কথা বলেছেন। আওয়ামী লীগও এরশাদকে সমর্থন করেছিল। ৮৬ সালে নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ এরশাদের সাথে হাত মিলিয়েছিল। এখনও এরশাদ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সাথে রয়েছেন। মূলত; এরশাদের ক্ষমতার উত্‍স স্থল হচ্ছে দিল্লী। দিল্লী বাংলাদেশে ছোট বড় তিন চারটি পলিটিকেল টিম রেখে রাজনীতির মাঠে খেলাধুলা করে। জেনারেল আইউব ক্ষমতা দখল করে বেসিক ডেমোক্রেসী চালু করেছিলেন। বংগবন্ধু একদলীয় শাসন চালু করেছিলেন নিজের ক্ষমতাকে পোক্ত করার জন্যে। এখন শেখ হাসিনা বলছেন, তিনি জানেন বিরোধী দলকে সোজা পথে আনতে হয়। কোথায় যেন এক টুকরো খবর দেখলাম, প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, আগামী ২৫ বছরে বাংলাদেশে হিন্দু প্রধানমন্ত্রী হয়ে প্রমান করবেন যে, বাংলাদেশ একটি মহান স্যেকুলার দেশ। দিল্লীর উসকানীতে বাংলাদেশকে স্যেকুলার ভুতে পেয়েছে। আওয়ামী লীগ এ বিষয়টা গভীর ভাবে অনুধাবন করতে পারছেনা দিল্লীকে তুস্ট করার জন্যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেই নানা ধরনের মামলায় জড়িয়ে পড়েছে। প্রায় চার বছর পার করতে চলেছে বর্তমান সরকার শুধু মামলা নিয়েই নিজেদের ব্যস্ত রেখেছে। দেশের উন্নয়ন নিয়ে সরকারের কোন মাথা ব্যথা নেই। সরকারের সামনে দেশের মানুষ নেই, বিরোধি দল নেই। অবিষয়কে বিষয় বানিয়ে সরকার নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে। যেমন ধরুণ, গ্রামী ব্যান্ক ও ড. ইউনুস সমস্যা । কেন যে হঠাত্‍ গ্রামীন ব্যান্ক সরকারের জন্যে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে তা দেশবাসী বুঝতে পারছেনা। শখ হাসিনার একটি সুবিধা আছে, তা হলো তিনি যা বলেন তাঁর পারিষদ দল বলেন তার হাজার গুণ বেশী। লোক কথা হচ্ছে , এক শিয়ালে ডাল দিলে শত শিয়াল হুক্কা হুয়া শুরু করে। কোন শিয়ালই কারণ অকারণ জানতে চায়না। এটা অবশ্য দলের খুব ভাল। আমরা যারা বিগত ৫০ বছর ধরে আওয়ামী সংস্কৃতি ও ঘরাণার রাজনীতি দেখে আসছি , লক্ষ্য করেছি যে, এখানে শক্তিই প্রধান দর্শণ, যুক্তি বা জ্ঞান কখনই কাজ করেনি।

দল হিসাবে আওয়ামী লীগের চরিত্র আর দেশ হিসাবে আমেরিকার চরিত্র প্রায় একই রকম। জোর করে আদর্শ প্রচার করা উভয়েরই সংস্কৃতি। আমেরিকার ৮০ ভাগ মানুষই অতি সাধারন, দেশের রাজনীতি বা রাজনীতিবিদদের নিয়ে তারা কখনই চিন্তা করেনা।  তারা নিয়মিত সপ্তাহের মুজুরী পেলেই খুশী। দেশ কারা চালায় , কিভাবে চালায় সে নিয়ে আমেরিকার সাধারন মানুষের কোন মাথা ব্যথা নেই। ফলে দুটি রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা আর ধনীরা দেশটা চালায়। ফলে আমেরিকা সারা পৃথিবীকে অশান্ত করে রেখেছে । প্রতি নিয়ত সারা পৃথিবীর মানুষকে ধমকের ভিতর রেখেছে। কথা শুনতে বিভিন্ন দেশকে বাধ্য করছে। সেই আমেরিকাই আবার মানবতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার নিয়ে বিশ্ববাসীকে জ্ঞান দান করতে চায়। গণচীনের মতো দেশকেও আমেরিকা মানবতা ও গণতন্ত্র শিক্ষা দেয়ার জন্যে উদগ্রীব হয়ে থাকে। নোবেল বিজয়ী বিশ্বখ্যাত জার্মান কবি গুন্টার গ্রাস বলেছেন, যে দেশের কাছে আনবিক বোমা নেই সেই দেশকে শায়েস্তা করার জন্যে আমেরিকা ও তার বন্ধুরা উঠে পড়ে লেগেছে। আর যার কাছে আনবিক বোমা আছে তার ব্যাপারে কারো কোন কথা নেই।মারণাস্ত্র আছে বলে ইরাকের সাদ্দামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে শান্ত দেশটাকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। সেখানে এখন প্রতি নিয়ত মানুষ মারা যাচ্ছে। এখই অবস্থা করেছে লিবিয়ার। এখন বলছে ইরাণ আক্রমনের জন্যে আমেরিকা প্রস্তুত। বিশ্ব জনমত আমেরিকা ও তার বন্ধুদের বিরুদ্ধে, কিন্তু ক্ষমতা জনমতের বিরুদ্ধে।

বংগবন্ধু শেখ মুজিব মুসলীম লীগ করেছন, পরে আওয়ামী মুসলীম লীগ করেছেন। মুসলীম শব্দ বাদ দিয়ে শুধু আওয়ামী লীগ করেছেন। কিন্তু কিছুতেই তিনি আরাম পাচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করার জন্যে বাকশাল করে সকল দল নিষিদ্ধ করেছিলেন। অথচ গণতন্ত্রের জন্যে তিনি বছরের পর বছর জেল জুলুম নির্যতন সহ্য করেছেন। দেশ হোয়ার সময় তিনি পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন। সারা জীবন আমেরিকাকে সমর্থন করে বাংলাদেশে ফিরে এসে ভারতের অনুপ্রেরণায় একদলীয় গণতন্ত্র প্রতিস্ঠা করেন। মাওলানা ভাসানী যখন পূর্ণ স্বায়ত্ব শাসনের কথা বললেন, বংগবন্ধুর নেতা সোহরাওয়ার্দী সাহেব বললেন ৯৮ ভাগ স্বায়ত্ব শাসন দেয়া হয়ে গেছে। আর যারা স্বায়ত্ব শাসনের দাবীদার ছিলেন তাদের লাঠিপেটা করার জন্যে ধেয়ে গেছে বংগবন্ধুর ভক্তরা। পরে দেখা গেল বংগবন্ধু নিজেই পূর্ণাংগ স্বায়ত্ব শাসনের দাবীদার হয়ে গেছেন। ৭০-৭১ সাল পর্যন্ত বংগবন্ধু কখনই সমাজতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন না। কিন্তু বাংলাদেশ হওয়ার পর তিনি হয়ে গেলেন সবচেয়ে বড় সমাজতান্ত্রিক নেতা। রাশিয়া হয়ে গেল তাঁর সবচেয়ে বড় বন্ধুদেশ।

কেউ কেউ বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় আওয়ামী লীগ হলো সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধী দল। ক্ষমতায় গেলেও আওয়ামী লীগ নিজেকে বিরোধি দলই মনে করে। আওয়ামী নেতারা নিজেরাই বলেন, ক্ষমতায় থাকলেও আমরা রাজপথ ছাড়ি নাই। ফলে, আওয়ামী লীগের দলীয় ভাষা ক্ষমতায় এবং ক্ষমতার বাইরে একই সমান।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »


আর কতদিন আমরা একটি মানবিক রাস্ট্র প্রতিস্ঠার অপেক্ষায় থাকবো ?       এরশাদ মজুমদার

 

আমাদের রাস্ট্র ব্যবস্থায় মানবতা এবং মানবাধিকার বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়না। এর আগেও আমি এ বিষয়ে লিখেছি। আমাদের রাস্ট্র মানুষের চেয়ে অনেক বড়। রাস্ট্রকে আমাদের নেতারা  অনেক বেশী ক্ষমতা দিয়ে ফেলেছেন। মানুষের কল্যাণ ও মংগলের ব্যাপারে আমাদের রাস্ট্রের কোন দর্শন নেই। রাস্ট্র একটি আধুনিক ব্যবস্থা। জনগণের ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিস্ঠার চিন্তা থেকেই রাস্ট্র ব্যবস্থার জন্ম হয়েছে। বড় বড় দার্শনিক রাস্ট্র বিজ্ঞানের পন্ডিতগণ আধুনিক রাস্ট্র ব্যবস্থার প্রচারক ছিলেন।  ইতোমধ্যেই এই ব্যবস্থা বেশ পুরাণো হয়ে গেছে। কিছু লেখক সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী ও চিন্তকজন এই ব্যবস্থা ঘুণেধরা বুর্জোয়া শোষণকামী ব্যবস্থা বলে গালাগাল দিচ্ছে। কমিউনিস্ট রাস্ট্র ব্যবস্থা মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারেনি। প্রায় একশ’ বছর ধরে এই ব্যবস্থা নিয়ে কমিউনিস্ট নেতারা পরীক্ষ নিরীক্ষা চালিয়েছেন। সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের মাধ্যমে কমিউনিস্ট রাস্ট্র ব্যবস্থার ব্যবহারিক দিকের পতন হয়েছে। কিন্তু দর্শন হিসাবে এটা এখনও জীবিত। আমি মনে করি সমাজতান্ত্রিক রাস্ট্র ব্যবস্থার চিন্তকরা ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। এইতো ক’দিন আগেই কার্ল মার্কসের দেশ’ বছর পালিত হয়েছে। জগত বিখ্যাত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী হিসাবে চে’কে তরুণরা ভুলতে পারেনা। চে’র ছবিওয়ালা টি’শার্ট এখনও তরুণদের খুবই প্রিয়। ইয়েমেনের তরুণরাও চে’র ছবি নিয়ে মিছিল করছে।

কার্ল মার্কস নিজেই ইসলামকে রেডিকেল ধর্ম হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। এর আগেও আমি বলেছি , মার্কস যদি পুরো কোরাণ শরীফ পড়তেন তাহলে হয়ত তিনি ডাস ক্যাপিটেল এ ভাবে রচনা না করে কিছুটা আরও মানবিক করে তুলতে পারতেন। পবিত্র কোরাণ শরীফে আল্লাহ ও বান্দাহ সম্পর্কিত আয়াত বা বাণী অতি অল্প।জগতের সকল কিতাবই দাবী করেছে মানুষকে আল্লাহ সৃস্টি করেছেন। সকল ধর্মের মানুষই বিশ্বাস করে মানুষ আল্লাহ, ভগবান, ইশ্বর, গড, ইলোহা, ইলাহার কর্তৃক সৃস্ট। কিতাবও এসেছে যুগে যুগে। শেষ কিতাব হচ্ছে আল কোরাণ। কিছু মানুষ পুরাণো কিতাব এবং এর ধ্যান ধারণাকে আঁকড়ে ধরে আছে। নতুন কিতাব আল কোরাণের আবেদনকে গ্রহণ করেনি। হয়ত এটাই মানুষের ভাগ্য। সেমিটিক ধর্মগুলো মূলত একই সূত্রে গ্রথিত। মূল সুর একই। হজরত ইব্রাহিম সকল জাতিরই পিতা। একই পিতার সন্তানেরা বিভিন্ন মতে বিভক্ত হয়ে গেছে। একে অন্যের সাথে মারামারি করছে। এমন কি আল কোরাণও হজরত মোহাম্মদে যাঁরা ঈমান এনেছেন তাঁদের ভিতরও অনেক বিভক্তি।

ইসলামকে ধর্ম মনে না করে একটা সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থা হিসাবে মনে করেও নতুন দুনিয়ার ব্যবস্থা প্রতিস্ঠা করা যেতে পারে। এর মধ্যা ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই বিশ্ববাসীর দৃস্টি আকর্ষণ করেছে। অন্য ধর্মাবলম্বীরাও ইসলামী ব্যংকিং ব্যবস্থাকে গ্রহণ করেছে। ইসলামে রাস্ট্রব্যবস্থা, বিচার, চিকিত্সা, শিক্ষা, কৃষি শিল্প, নির্বাচন, সরকার গঠন, প্রশাসন, সম্পদ বন্টণ, ওয়ারিশয়ানা সহ সকল বিষয়ে সুস্পস্ট ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে গবেষণার দুয়ারও খোলা রাখা হয়েছে। দেড় হাজার বছর আগে ইসলামই প্রথম মানবতা ও মানবাধিকার নিয়ে কথা বলেছে। আল্লাহর রাসুল হজরত মোহাম্মদ (সা ) এ জগতে সর্ব প্রথম  অধিকার হারা সাধারন মানুষের রাস্ট্র প্রতিস্ঠা করেন। সেই রাস্ট্র শুধু মুসলমানদের জন্যে ছিলনা। সেই রাস্ট্রে সকল ধর্ম মতের মানুষের অধিকার প্রতিস্ঠিত হয়েছিল। সে সময়ে সাধারন মানুষের অধিকার বা রাস্ট্রের কোন ধারণাই ছিলনা। মুসলমানেরা সে ধরণের কোন রাস্ট্র আজও প্রতিস্ঠা করতে পারেনি। পূর্ণাংগ ইসলামিক রাস্ট্র প্রতিস্ঠিত হয়নি। যেমন আমাদের রাস্ট্র বাংলাদেশ। এ রাস্ট্রের কোন দর্শন বা আদর্শ আমি দেখতে পাইনা। বাংলাদেশ নামক রাস্ট্রের প্রধানতম সমস্যা হলো এ দেশের মানুষ গুলো মুসলমান। হাজার বছর ধরেই মুসলমান। সামাজিক মর্যাদা, সম অধিকার পাওয়ার আশাতেই তখনকার মজলুম মানুষ গুলো ইসলাম গ্রহণ করেছে। এর আগে  ধর্মীয় বর্ণবাদ তাদের শোষণ করতো। তখন ইসলামের মতো প্রগতিশীল আর কোন ধর্ম, মতবাদ বা দর্শণ ছিলনা। তখন সমাজে সাধারন কোন মুক্ত ছিলনা। রাস্ট্রও ছিলনা, গণতন্ত্রও ছিলনা। ক্ষমতাবানরাই দেশ ও সমাজ চালাতো। যার শক্তি ছিল সেই ছিল শাসক বা রাজা বাদশাহ। আধুনিক রাস্ট্র ব্যবস্থার ধারণা  নিয়ে এসেছে ইংরেজরা এ দেশে। যা অচল হতে চলেছে। নতুন কোন ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয় বলেই পুরাণো অচল ব্যবস্থাটাই চলছে। আমাদের বাংলাদেশ ওই পুরাণো ব্যবস্থাতেই চলছে। যে ব্যবস্থায় এক ভোট বেশী পেয়েই একজন নির্বাচিত হয়। সংসদের এক সিট বেশী থাকলেই একটি দল বা গ্রুপ ক্ষমতা দখল করে। ভোট পাওয়ার প্রশ্নে কোন নিয়ম নীতি বা নৈতিকতার ব্যাপার নেই। সোজা কথায় ভোট পেলেই হলো। কিভাবে পেয়েছে তা বিবেচ্য বা বিচার্য বিষয় নয়। নেতা নির্বাচনে নৈতিকতার বিষয়টা এখন আর কোন গুরুত্পূর্ণ বিষয় নয়।নেতার গুণের বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভোট পেলেই হলো। ফলে আমাদের জাতীয় সংসদে এখন আর তেমন ভাল মানুষ নেই। ৪৬ বা ৫৪তে যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন এখন সে ধরণের মানুষের কোন প্রয়োজন নেই। নমিনেশনের সময়েই বলা হয় টাকা না থাকলে নমিনেশন পাওয়া যাবেনা। তাহলে আমরা জানতে পারলাম এক নম্বর যোগ্যতা টাকা। তারপরের যোগ্যতা কত মটর সাইকেল, জীপ আর অস্ত্র আছে। সর্বশেষ যোগ্যতা হলো প্রার্থীর নিয়ন্ত্রণে কত মাস্তান আছে। এক সময় নির্বাচনে প্রার্থীরা ছিলেন উকিল ও সমাজসেবীরা। এখন যে কোন লোকই হতে পারেন। একবার নির্বাচিত হলেই তিনি বা তাঁরা সমাজের এলিটে পরিণত হন। আর নির্বাচিত না হলেও তাঁরা সবেক এমপি, মন্ত্রী ও উপদেস্টা। সবার বাড়ির সামনে নেমপ্লেট থাকে সাবেক অমুক। তাঁদের ছেলেমেয়দেরও সমাজে দাম বাড়ে। আমাদের মতো দেশে যাঁরা ক্ষমতায় থাকবেন তাঁদের মানবাধিকার থাকবে। আর থাকবে রাস্ট্রের ও রাস্ট্রের কর্মচারীদের। আপনি যদি যমতার বাইরে থাকেন তাহলে পুলিশ, বিজিবি, রেব সহ আরও যাঁরা আছে সবাই গায়ে হাত তুলতে পারবেন। আপনার বিরুদ্ধে রাস্ট্রদ্রোহিতার মামলা দিতে পারবে। আপনি সাবেক মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হলেও কিছু আসে যায়না। আপনারা  নিয়মিত টিভিতে দেখেন পুলিশের কি ক্ষমতা আছে। পুলিশ সরকার, সরকারের আমলা, সরকারের সকল রকমের শালা ছাড়া সকলের গায়ে হাত তোলার অধিকার রাখেন। পুলিশ খুব বিনয়ের সাথে বলবে, স্যার আমরা রাস্ট্রের গোলাম, আর রাস্ট্র চালায় সরকার। রাস্ট্রের আইন আর সরকারের নির্দেশেই আমরা আপনাদের গায়ে হাত তুলি। বলতে পারেন আমরা জনগণের খাদেম। জনগণের প্রতিনিধি হলেন নির্বাচিত সরকার। আরও বলবে স্যার, রাস্ট্র আর সরকারের খেদমত করা মানেই মানবতার খেদমত করা আর মানবাধিকার রক্ষা করা। আপনি যদি বলেন সংবিধান আমার সকল মৌলিক অধিকার ড়শা করেছে। তখন পুলিশ অফিসার বলবে, স্যার ওসব কাগুজে কথা। কাগজেতো কত কথাই লেখা থাকে। শুধু কাগজে থাকলেই কি দখলি স্বত্ব থাকে? না থাকেনা। এইতো দেখুন না, বিরোধী দলের চীফ হুইফ জয়নাল আবেদীন সাহেবের কি হাল হয়েছিল? তাঁকে যে পুলিশ অফিসার কিল ঘুসি মেরেছিলেন তিনি প্রমোশন পেয়ে গেছেন। রাজনীতিতেও তাই, যিনি যত বেশী পুলিশের কিল ঘুসী খাবেন তিনি তত বেশী উন্নতি লাভ করবেন। এইতো দেখুন না , সরকারী দলের এক নেত্রী যখন বিরোধী দলে ছিলেন তখন বিনা কারণেই রাস্তায় শুয়ে পড়তেন। তিনিতো এখন খুবই সম্মানিত একজন মন্ত্রী। আপনারা মার খেয়ে, জেলে গিয়ে মন্ত্রী হন, আর আমরা মার দিয়ে, জেলে পাঠিয়ে প্রমোশন পাই। একেই বলে রাস্ট্র ব্যবস্থা। রাস্ট্র থাকলে তার কতগুলো পোষাক থাকতে হয়। তেমনি পোষাক হলো মানবতা, মানবাধিকার, আইন আদালত, সংসদ। রাস্ট্র থাকলে সভ্য বলে গণ্য হওয়ার জন্যে এসব রাখতে হবে এবং পরতে হবে। এইতো দেখুন না নামজাদা ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আহমদ বংগবন্ধুকে নিয়ে উপন্যাস লিখতে গিয়ে ফেঁসে গেছেন। আদালত উপন্যাসটি শুদ্ধ করে লেখার জন্যে নির্দেশ দিয়েছেন। দেয়াল নামক ইতিহাস ভিত্তিক উপন্যাসটি লেখার জন্যে প্রকাশক হয়ত অগ্রিম দিয়ে বসে আছেন। এছাড়া হুমায়ুন ক্যান্সারের চিকিত্‍সার জন্যে বিদেশে থাকার সময় প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের প্রচুর ভালবাসা পেয়েছেন বলে আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছি। হয়ত ভালবাসার প্রতিদান দিতে গিয়েই এখন আদালতের ভালবাসা নিতে হচ্ছে।

এইতো দেখুন , ক’দিন আগে বিরোধী জোটের ৩০/৩৫ জন নেতাকে জেলে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে গারি পোড়ানো ও বোমা ফোটানোর অভিযোগ এনেছে পুলিশ। আগেই বলেছি পুলিশ যারা ক্ষমতায় থাকেন তাঁদের জন্যে কাজ করেন। যদিও মাঝে মাঝে সরকারী কর্মচারীরা বলেন, আমরা রাস্ট্রের কর্মচারী, কারো ভৃত্য নই। রাস্ট্র যেহেতু যে বেশী ভোট পায় সেই চালায় তাই পুলিশ সহ সকল বাহিনী তাঁদের কথা শোনেন। এখানে মানবাধিকার বা মানবতার কথা আসবে কেন। সরকারতো মানবতা আর মানবাধিকারের জন্যে কাজ করছে। তাহলে সরকার বা তার বেতনভুক কর্মচারীরা শব্দ দুটি লংঘন করবেন কেমন করে। যিনি বা যাঁরা রক্ষা করেন তিনি বা তাঁরা কিভাবে লংঘন ভংগন  করবেন। সোজা কথায় বলা যেতে পারে পুলিশ ও সরকারী বাহিনী মনে করেন সরকারের সমালোচক বা বিরোধী দলকে পিটানো , তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া তাঁদের পবিত্র দায়িত্ব। তাঁরাতো এ কাজটি বৃটিশ আমল থেকেই করে আসছেন। ৫২র ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের সময়েও পুলিশ বাহিনী এ কাজটি খুবই দক্ষতার সাথে করেছেন। আইন আদালততো বৃটিশ আমলেরই রয়ে গেছে। তাই আইনের কাছে  সবার হাত পা বাঁধা। চলমান আওয়ামী লীগ সরকারতো মহান পবিত্র মুক্তিযুদ্ধের সরকার। এ সরকারের সাথে নানা ধরনের পবিত্রতার সম্পর্ক রয়েছে। এই পবিত্রতা নিয়ে কোন কথা বলা যাবেনা। আমাদের আদালতও এখন মুক্তিযুদ্ধের আদালত। তাই বলতে হবে মহান মুক্তিযুদ্ধ , মহান আদালত, মহান বিচারপতি। এতদিন আমরা শুধু বলতাম মহান সেনাবাহিনী, এখন সবার নামের আগে মহান বা পবিত্র লেখা ভাল হবে বা মানান সই হবে। বৃটিশ আমলে মহান বা মহামান্য সরকার বাহাদুর বলে অনেকেই দামী দামী খেতাব পেয়েছেন। এখনও মহান মহামান্য সরকার বাহাদুর বললে সরকার খুশী হন এবং নানা রকম পদক ও সম্মানী প্রদান করেন। হাজার হাজার বছর আগেও এসব রেওয়াজ ছিল। তখন রাজা বাদশাহ ও শাসকদের গুণগ্রাহী ছিলেন খুবই কম ছিলেন। কারণ বেশীর ভাগ প্রজা বা মানুষ ছিলেন অবোধ অচেতন এবং অধিকার হারা। তাঁরা জানতেন না মানবতা বা মাবাধিকার কাকে বলে। তাঁরা জানতেন না প্রজা হিসাবে তাঁদের কোন ক্ষমতা আছে কিনা। সাধারন মানুষের ধারণা ছিল রাজা আর পারিষদ দেশ চালাবেন। এতে প্রজার কি করার আছে। প্রজারা কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। গ্রামের একজন চৌকিদারই ছিলেন সরকার বা বাদশাহর প্রতিনিধি।

মানব জাতির জন্যে নির্ধারিত ও নির্দেশিত কিতাব আল কোরাণ দেড় হাজার বছর আগেই ঘোষণা করেছে জগতে মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই। মানুষই শ্রেষ্ঠ, তাহার উপরে নেই। মানুষ তার স্রস্টা ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করবেনা। মানুষকে পদানত করার জন্যে যুগে যুগে হাজার বছর ধরে শক্তিমানরা  চেস্টা চালিয়ে গেছে। সবাই মানুষের ঐক্যবদ্ধ  শক্তির কাছে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু শক্তিমানরা যতদিন শক্তি থাকে ততদিন এই সত্যটি বুঝতে পারেনা বা বুঝার চেস্টা করেনা। মানুষের সার্বভৌমত্ব স্বাধীনতার এই খবরটি সুস্পস্টভাবে আজও মানুষের কাছে পৌঁছেনি। এর মানে আল কোরাণের এই মহান বাণী জগতের ঘরে ঘরে পৌঁছেনি। আল্লাহ রাসুল হজরত মোহাম্মদের(সা) বাণী আজও সকল মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। তাই মানুষের অন্তরের সকল অন্ধকার আজও দূরীভুত হয়নি। প্রকৃতিগত ভাবেই মানুষ স্বাধীন। তাঁর চিন্তার স্বাধীনতা আরশীল আজিম পর্যন্ত। সেই মানুষকে শক্তির জোরে, খোদা বিরোধী আইনের জোরে যারা  পরাভূত করে রাখতে চায় তারা খোদাদ্রোহী। তারা ফেরাউন নমরুদ আর সাদ্দাদের বংশধর। কোরাণ জানলেই মানুষ স্বাধীন হয়ে যাবে। জগতের কোন কিছুই মানুষকে আর শৃংখলিত করতে পারবেনা। কোরাণের কাজ  শুধু ভাল মানুষকে বেহেশত দান করা নয়। কোণের কাজ হচ্ছে, জগতে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিস্ঠা করা। শুধু অল্প সংখ্যক মানুষ কোরাণের মর্মবাণী  বুঝতে পেরেছে। তাই বিশ্বের সকল ফেরাউন আজ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে কোরাণের বিরুদ্ধে, সত্যের বিরুদ্ধে ও মানুষের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে। ফেরাউনী শক্তির ছায়া ও বাতাস বাংলাদেশেও এসে পৌঁছেছে। বুশ বা ওবামা জেহাদ শব্দটিকে ভয় পায়। বাংলাদেশেও শয়তানী শক্তি এই শব্দটিকে ভয় পায়। আপনারা প্রায় শুনবেন পুলিশ জেহাদী বই সহ অমুক জায়গা থেকে অতজনকে আটক করেছে। সেই জায়গায় বহু জেহাদী বই পাওয়া গেছে। কিন্তু আমরা জানিনা ওই জেহাদী বই গুলো কি? ৫০ থেকে ৬০ দশকের দিকে আমরা যখন স্কুলে কলেজে পড়তাম তখন ‘সোভিয়েত দেশ’ বা পিকিং রিভিউ হাতে দেখলেই পুলিশ তাড়া করতো। তখন বিশ্বব্যাপী সরকার গুলো কমিউনিজমকে ভয় পেতো। ভাবতো এসব বই পড়লেই পোলা পাইন নস্ট হয়ে যাবে। বা মা’রাও তাই মনে করতেন। পত্র পত্রিকা গুলোও ‘লালমিয়া” বলে গালাগাল দিতো। বিশ্বের ফেরাউনী শক্তি এখন ইসলাম ও কোরাণের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছে। আল কোরাণ নাকি মানুষকে সন্ত্রাসী করে তোলে। বিদ্রোহ বিপ্লবের কথা বাদ দিয়ে কোরাণ তাফসীর বা ব্যাখ্যা করতে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। মুসলমান অমুসলমান সব সরকারই মনে করে কোরাণের জেহাদী আয়াতগুলো বাদ রাখা দরকার।‘জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের বিদ্রোহ ফরজ।’ এটাই হচ্ছে আলকোরাণের পবিত্র বাণী। আলকোরাণ হচ্ছে গণ মানুষের মুক্তির সনদ।

আমাদের দেশটি আল্লাহর আইনে চলেনা। চলে বৃটিশ আইন মোতাবেক। এসব কথা এর আগেও আমি আমার কলামে বহুবার বলেছি। সোনার বাংলার  আদালত, বিচার ব্যবস্থা, সরকার ব্যবস্থা, সংসদ  সবকিছুই চলে বৃটিশ আইনে। এদেশের ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান। বেশীর ভাগ মানুষ নিরক্ষর দরিদ্র। নিজেদের অধিকার সম্পর্কে তাঁরা অবহিত নয়। তাঁদের অধিকার প্রতিস্ঠার জন্যেই একদিন পাকিস্তান প্রতিস্ঠা হয়েছিল। কিন্তু অধিকার প্রতিস্ঠা হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৪০ বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু সাধারন মানুষের মুক্তি আসেনি। এমন রাস্ট্র ব্যবস্থায় মজলুমের মুক্তি নেই একথা তাঁরা জানেন না। যে আলেম ওলামারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন তাঁদের উত্তরসূরীরা  এখন কোথায়? রাস্ট্র স্বাধীন হলেই মানুষ স্বাধীন হয়না। তার বড় প্রমাণ পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। বিশ্বে আরও বহুদেশ আছে যেখানে ভুগোল আর কিছু নেতা স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু মানুষ স্বাধীন হয়নি। একথা এখন নিশ্চিত ভাবে প্রমানিত হয়ে গেছে যে, রাস্ট্র স্বাধীন হলেই মানুষ স্বাধীন হয়না। প্রচলিত ধ্যান ধারণা দিয়ে মানুষের সামগ্রিক মুক্তি কখনই আসবেনা। সরকার গুলো রাজা বাদশাহ আর ফেরাউদের প্রতিনিধি। সেই প্রতিনিধিদের আড্ডাখানা হলো জাতিসংঘ, বিশ্বব্যান্ক, আইএমএফ ইত্যাদি।

চলমান সরকারের জুলুম নির্যাতন নিয়ে আমি তেমন মাথা ঘামাইনা। দেশের প্রচলিত আইনই সরকারকে জুলুমবাজ করে তুলেছে। মানুষের নামে মানুষের কল্যাণের জন্যে  যেসব আইন তৈরি হয়েছে তা কখনই মানুষের পক্ষে ছিলনা, এখনও নাই। বার বার করে বলছি, বলেছি চলমান আইন দিয়ে এদেশে কখনই মানুষের অধিকার প্রতিস্ঠা করা যাবেনা। এদেশে সংসদকে বলা হয় সার্বভৌম। যেখানে নিয়মিত মানুষের বিরুদ্ধে আইন পাশ হয়। যেখানে দিনরাত অসত্য বাক্য বিনিময় হয়। আদালতেও মিথ্যা সাক্ষী সত্য হিসাবে গৃহীত হয়। এমন সব আদালত যেখানে কোন গরীব কোনদিনও পৌঁছাতে পারেনা। কোন দল ভাল আর কোন দল মন্দ একজন কলাম লেখক এটা  বিবেচনার দায়িত্ব আমার নয়। এখন মনে হচ্ছে চলমান সরকারের মতো এত অত্যাচার এর আগে কোন সরকারই করেনি। একথা আমরা সব সময়েই বলে থাকি। একজন লেখক হিসাবে আমি মনে করি মানুষের অধিকার প্রতিস্ঠা করার জন্যে কলম ধরাই  আমার প্রথম ও প্রধান কাজ। বাংলাদেশকে গণ মানুষের রাস্ট্রে পরিণত করতে হবে। সাধারন মানুষ যখন বুঝবে এ রাস্ট্রটা তার তখন সকল দিক থেকেই দেশ উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। জানিনা, বাংলাদেশ গণমানুষের রাস্ট্রে পরিণত হতে আর কতদিন লাগবে?

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »


বাংলাদেশের মানুষ তিনটি নববর্ষ পালন করে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র ও কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলা  নববর্ষ পহেলা বৈশাখ পালনের জন্যে নানা ধরণের মিছিল বের করে। অন্যান্য নববর্ষের তূলনায় বাংলা নববর্ষ অনেক বেশী জাঁকজমকের সাথে পালিত হয়। বলা হয়ে থাকে পহেলা বৈশাখ ও একুশে ফেব্রুয়ারী হচ্ছে দুটি প্রধানতম সার্বজনীন উত্‍সব। পহেলা মহররমও পালিত হয় হিজরী ক্যালেন্ডার হিসাবে। দেশের সম্প্রদায় কারবালার বেদনাময় ঘটনার কথা স্মরণ করে মিছিল বের করেন। সুন্নী মুসলমানরা ঘরে ঘরে ফিরনী ও রুটি বিতরন করেন। অনেকেই মিলাদ মাহফিলের ব্যবস্থা করেন। হিজরী সন চালু হয়েছে রাসুলে পাকের(সা) হিজরতের বছরকে স্মরণ করে। পহেলা মহররম ও ১০ই মহররমকে স্মরণ করে সারা দেশেই মসজিদে বিশেষ মহফিল ও মুনাজাতের ব্যবস্থা করা হয়। সারা বিশ্বের মুসলমানরা পহেলা মহররম পালন করে। বাংলাদেশেও সরকারী ছুটি থাকে। কিন্তু সবার উপরে গুরুত্ব লাভ করেছে ইংরেজী সন। ইংরেজরা এ দেশটি শাসন করেছে মাত্র ১৯০ বছর। কিন্তু এর প্রভাব সর্বগ্রাসী। আমাদের জীবনে এবং সরকারী অফিস আদালতে এখনও ইংরেজীর অবস্থান শক্তিশালী ও সবচেয়ে বেশী। এর মানে হচ্ছে কলোনিয়াল বা উপনিবেশিক শাসনের প্রভাব এখনও খুব শক্তিশালী ভাবে বলবত আছে। শত চেস্টা করেও বাংলা তার স্থান করে নিতে পারছেনা। এর কারণ আমাদের সরকার ,রাজনীতিক, আমলা, বুদ্ধিজীবীরা ভালই জানেন। বরং ইংরেজীর প্রভাব দিন দিন বেড়েই চলেছে। ফেব্রুয়ারী মাস এলেই খবরের কাগজ ও টিভি গুলো এ নিয়ে হেচৈ ও মাতম শুরু করে দেয়। এতে তাদের ব্যবসাও ভাল হয়। অর্থনীতির বিষয়টাকে আমি সব সময় সমর্থন করি।যে কোন জাতি বা দেশের শক্তিশালী অবস্থানের জন্যে শক্তিশালী অর্থনীতির প্রয়োজন। আমাদের সরকারী হিসাব নিকাশ এখনও ইংরেজী সন মোতাবেকই হয়ে থাকে। বাজেটও তৈরি হয় ইংরেজী সনকে অনুসরণ করে। সরকারী ক্যালেন্ডার ডায়েরী ছাপা হয় ইংরেজী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। দেশী বিদেশী বড় বড় কোম্পানি, বিদেশী দূতাবাস গুলোও ইংরাজী সন মোতাবেকই তাদের কার্যাবলী পরিচালনা করে। বর বড় হোটেল গুলো ইংরেজী সনের হিসাবেই অনুস্ঠান কর্মসূচী তৈরি করে। এমন কি তারা খ্রিস্ট মাস পালন করে। ওই সময়ে সব হোটেলে সান্তা ক্লজের ছবি দেখা যায়। সমাজের এক শ্রেণীর তরুণ যুবক ও বৃদ্ধরা থার্টি ফার্স্ট নাইট ও নিউ ইয়ার পালন করে নাচ গান, হৈচৈ ও মাতলামী করে। নামজাদা হোটেল ও ক্লাবগুলোতে মদের ঢল নামে। রাতগুলোকে সামাল দেয়ার জন্যে পুলিশ বিভাগ বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। পুলিশের নিরাপত্তা বেস্টনী ভেদ করেও কিছু তরুণ তরুণী ক্লাব বা নিজেদের আড্ডা ছেড়ে রাস্তায় নামে এবং অশ্লীলতাত প্রকাশ ঘটায়। পুলিশ এদের গ্রেফতার করলেও ছেড়ে দেয় প্রভাবশালীদের কারণে।  পহেলা বৈশাখে  এরা খাঁটি বাংগালী সাজে আবার  থার্ট ফার্স্ট নাইটে পশ্চিমাদের অনুসরন করে। এমন ধারার কিছু শিক্ষক, সাংবাদিক ,বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিক আছেন যাঁরা গভীর ভাবে পহেলা বেশাখ  ও থার্টি ফার্স্ট নাইট পালন করেন। তাহলে আপনারা বুঝতে পারছেন, আমরা কোন পথে এগিয়ে চলেছি। আমাদের রাজনীতি ও সংস্কৃতি কোন পথে ধাবিত হচ্ছে।

এর আগেও আমি আপনাদের বলেছি, মনোজগতে আমরা এখনও পূর্ণাংগ স্বাধীনতা লাভ করিনি। ফলে, বিদেশী সাংস্কৃতি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসন অব্যাহত রয়েছে। তাতে জড়িত হয়েছে আমাদের দেশের  একশ্রেণীর রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক, বিদ্ধিজীবি ও এনজিও নেতা। আমাদের দেশের পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের মালিকদের মৌলিক কোন আদর্শ নেই। এই মিডিয়া মালিকদের সাথে হাত মিলিয়েছে একশ্রেণীর সাংবাদিক। ওই সাংবাদিকরা নিজেরাই বলেন, আমরা শ্রমজীবী মানুষ। যিনি বা যাঁরা বেশী বেতন বা মুজুরী দিবেন তার জন্যে কাজ করবো। দিন মুজুরের আদর্শের কোন প্রশ্ন উঠেনা। পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের মালিক চোর ডাকাত বা হার্মাদ হলেও কোন আপত্তি নেই। আমাদের দেশে বেশ কিছু পত্রিকা বা চ্যানেল আছে যাদের আদর্শ ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে। এদের বেশীর ভাগই দিল্লী বা পশ্চিমাদের তাবেদারী করেন। ওদেরই হালুয়া রুটি খেয়ে নিজের বিরুদ্ধে কলম ধরে ও সেমিনারে বক্তৃতা করে। শুনেছি, সত্য নাও হতে পারে, দিল্লী বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে। যে জাতির সাংস্কৃতিক পরাজয় ঘটে তার স্বাধীনতা আর বেশীদিন টিকেনা। যেমন , সিকিম সংসদে আইন পাশ করেই ভারতের সাথে যোগ দিয়েছে। বাংলাদেশে নামে মুসলমান, কর্মে মোনাফেক এমন বুদ্ধিজীবী রয়েছে রয়েছে কয়েক হাজার। এদের গলা বড়। নিয়মিত খবরের কাগজে কলাম লেখে। এরা বই রাচনা করে প্রভুদের নির্দেশে। এর আগে আমি বহুবার বলেছি আমরা ভাষাগত জাতি নই। আমরা শুধু বাংগালী নই। আর তা নই বলেই আজ আমরা স্বাধীন। শুধু বাংগালী যারা তারা দিল্লীর অধীনতা মেনেই সুখে শান্তিতে আছে।

বর্তমান বাংলা সন চালু করেছেন বাদশাহ আকবর। তিনি এ কাজটি করেছেন বাংলার রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে। প্রখ্যাত জ্যোতিষ বিজ্ঞানী ফতেউল্লাহ শিরাজী বাদশাহর নির্দেশে হিজরী সনের সাথে মিল রেখে বাংলা সন। তখন দিল্লী সরকারের অফিসিয়াল ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা ছিল হিজরী সন। আর বাংলায় চালু ছিল বঙাব্দ, যা চালু করেছিলেন রাজা শশাংক। রাজা শশাংকের বঙাব্দ আর চলমান বাংলা সন এক নয়। যদিও আমাদের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী চলমান সনকে বঙাব্দ বলে চালাতে চান।  যখন ফসলী সন চাল হয় তখনও মাসের নাম বর্তমানের মতোই বৈশাখই ছিল। যদিও বৈশাখ হিন্দু দেবীর নাম। জনসাধারন বা কৃষক সমাজের সুবিধার্থেই শিরাজী সাহেব মানের নাম আগের মতেই রেখে দিয়েছেন। এটা ছিল স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি দিল্লীর সম্মান প্রদর্শন। সেই থেকেই বৈশাখ মাসে জমিদার, নবাব ও তালুকদারেরা খাজনা বা রাজস্ব আদায় করতো। এখনও তহশীল অফিস গুলো বৈশাখ চৈত্র হিসাবে খাজনা আদায় করে। এই সময়ে এখনও গ্রাম বাংলায় ব্যবসায়ীরা হালখাতা পালন করেন। হাল শব্দটি ফার্সী, খাতা শব্দটি আরবী ও ফার্সী। দুটো শব্দ মিলিয়ে হালখাতা হয়েছে। হাল মানে বর্তমান বা কারেন্ট। নাগাদ শব্দটিও ফার্সী। দুটো শব্দ মিলিয়ে হয়েছে হালনাগাদ। পহেলা বৈশাখে জমিদার বাড়িতে পূণ্যা বা রাজস্ব আদায়ের উত্‍সব পালিত হতো। সেদিন প্রজারা দলে দলে এসে তাদের পুরাণো খাজনা পরিশোধ করতো। পূণ্যা শব্দটি এসেছে পূণ্য শব্দ থেকে। এর মানে হলো ওইদিন খাজনা পরিশোধ করলে পূণ্য লাভ হবে। এই শব্দ চালু হওয়ার কারণ ইংরেজ আমলে বেশীর ভাগ জমিদার ছিলেন হিন্দু। তারাই এই শব্দটি চালু করেছেন।তাহলে আমরা বুঝতে পারছি যে,  পহেলা বৈশাখ রাজস্ব সংক্রান্ত একটি একটি দিন।  চৈত্র মাসের শেষ অথবা পহেলা বৈশাখে গ্রাম বাংলার সর্বত্র মেলা হয় বহুকাল থেকে। শহর বা নগরবাসী  এয় মেলাকে তেমন গুরুত্ব দিতোনা। এয় মেলা ব্যবস্থা ও গ্রামের সংস্কৃতিকে শহুরেরা তেমন মর্যাদাও দিতেন না। এখন তারা পহেলা বৈশাখকে মহা গুরুত্ব দেন তাদের প্রভুদের নির্দেশে। শহুরেদের কাছে পহেলা বেশাখের মানে আলাদা ও ভিন্ন । রাজধানী ঢাকা সহ কয়েকটি শহরে পহেলা বৈশাখ একটি সাংস্কৃতিক অনুস্ঠানে পরিণত হয়েছে। এই অনুস্ঠানের প্রধান উদ্যোক্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের ছাত্র ও কিছু শিক্ষক। এঁরা পহেলা বৈশাখের উত্‍সবে মংগল প্রদীপ যাত্রা চালু করেছেন। মিছিলে অংশ গ্রহণকারীরা পশু পাখির মুখোশ পরে মিছিল করে। মুখ সহ শরীরের বিভিন্ন অংগে উল্কি আঁকে। এই আনন্দ উত্‍সবে অংশ গ্রহণের জন্যে রাজধানীতে মানুষের ঢল নামে। সাধারন মানুষের সাথে মংগল প্রদীপ মিছিলের কোন সম্পর্ক নেই। তারা জানেনও না কেন এই পশু পাখির মিছিল। কি উদ্যেশ্য এই মিছিলের। এটা নাকি সার্বজনীন উত্‍সব। রাস্তায় যে বিশাল আলপনা আঁকা হয়েছে তার সম্পর্কে প্রখ্যাত শিল্পী কাইউম চৌধুরী ও রফিকুন্নবী বলেছে, এটা বাংগালীদের উত্‍সব। আমরাও এই দেশে বাস করি, যেমন বাস করেন শ্রদ্ধেয় কাইউম চৌধূরী ও রফিকুন্নবী। দশ পনের বছর ধরে হঠাত্‍ করে ঢাকায় এই উত্‍সব চালু হয়েছে। কিন্তু এই মিছিলের পেছনে কোন অদৃশ্য শক্তি আছে তা আজও পরিস্কার হয়নি। কারা এই মিছিলের জন্যে অর্থ জোগান দেন তাও স্পস্ট নয়। আমাদের বাপদাদারা কখনও পহেলা বৈশাখ এমন করে পালন করেননি।কাইউম চৌধুরী ও রফিকুন্নবী সাহেবের বাপদাদারাও এমন ধারার পহেলা বেশাখ পালন করেননি। এমন কি পশ্চিম বাংলার দাদারাও পহেলা বেশাখ নিয়ে এমন মাতামাতি করেন না। পশু পাখির মিছিল নের করেন না। তাহলে বাংলাদেশে এসব হচ্ছে কেন? কারা এসব করাচ্ছে। কিইবা তাদের উদ্দেশ্য? পশ্চিম বাংলার জ্ঞানীজনতো পহেলা বৈশাখ নিয়ে এমন মারামাতি করছেননা। সত্যি কথা বলতে, কোলকাতা এখন আর বাংগালী দাদাদের দখলে নেই। বৃটিশ সাহেবদের রাজধানী কোলকাতা এখন ভিন্ন ভাষীদের দখলে। পশ্চিম বাংলার রাস্ট্র ও সরকারী ভাষা এখন হিন্দী। স্কুল কলেজে হিন্দী পড়া এখন বাধ্যতামূলক।

একটা কথা খুব বেশী করে স্পস্ট হওয়া দরকার। তা হলো এ জগতে শুধু বাংগালী বলে কোন কথা বা শব্দ নেই। যখন সুবাহ বাংলা ছিল তখনও ছিল বাংগালী, বিহারী ও উড়িয়া। শুধু বঙদেশ (অখন্ড) বললেও শুধু বাংগালী নেই। অখন্ড বংগদেশে হিন্দু মুসলমান ও ধর্মাবলম্বীরা ছিলেন। এ কারণেই ১৯০৫ সালে বাংলা মায়ের জন্যে কাঁদতে কাঁদতে বুক ভাসিয়েছেন তাঁরা ৪৭ সালে এসে বাংলা মাকে দ্বিখন্ডিত করলেন। ৪৭ সালে তাঁরা হাসতে হাসতেই বাংলাকে দুই ভাগ করেছেন। মুসলমানেরা চেয়েছিলেন অখন্ড বংগদেশ। কিন্তু হিন্দু দাদারা ও কংগ্রেস নেতারা তা চাননি। এসব হলো ইতিহাসে বিষয়। আমাদের তরুণ প্রজন্ম এ ইতিহাস জানতে চায়না। তারা নাকি এসব নিয়ে ভাবেনা। এর মানে তারা নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে তারা ভাবেনা। কেউ কেউ এটাই চান। কারণ যে জাতি নিজের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে ভাবেনা বা সজাগ নয় তাদের স্বাধীনতা থাকেনা। বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি  রবীন্দ্রনাথ  কবিগুরু হয়েও শুধু হিন্দু ছিলেন। তাঁর চিন্তা চেতনা ও দর্শনে তিনি তিনি কখনও ধর্মচিন্তা ত্যাগ করেননি। আমি মনে করি তিনি ঠিক কাজটিই করেছেন। নিজ ধর্ম ত্যাগ  করা কোন গৌরবের কাজ নয়। বরং তিনি এবং তাঁর পরিবার হিন্দু ধর্ম সংস্কারের চেস্টা করেছেন।  আমাদের এই বাংলাদেশে তাঁকে অনেকেই দেবতার আসনে বসাবার আপ্রাণ চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও এইসব লোক প্রকাশ্যে নিজেদের দেবতা বা ধর্মহিন বলে দাবী করেন। কবিগুরু নিজেকে কখনই দেবতা মনে করেননি এবং দেবতূলা মর্যাদাও দাবী করেননি। কবিগুরু একজন মানুষ, তা আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা। মনুষ্য সীমাবদ্ধতার উপরে তিনি কখনই ছিলেননা। আজকের এই নিবন্ধে কবিগুরু জমিদারী ও সওদাগরী জীবন নিয়ে কোন আলোচনা করতে চাইনা। কবি হিসাবেও তিনি নকখনও মহাগুরু, কখনও বিশ্ব মানবতার প্রাণ ও মান। আমি নিজেও তাঁর সংগীতের একজন পরম ভক্ত। তবুও মাঝে মাঝে মনে হয় তিনি খখনই বেদ উপনিষদ ও গীতার বাইরে আসতে পারেননি। ঘুরে ফিরেই তিনি হিন্দুত্বের কাছে ফিরে গেছেন। আমাদের কিছু মানুষ কবিগুরুকে ধর্মহীন মানুষ হিসাবে প্রতিস্ঠা করতে উঠে পড়ে লেগে গেছেন।

নাগরিক জীবনের পহেলা বৈশাখ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রাসংগিক কিছু কথা বলেছি। বাংলাদেশের জন জীবন বা গণজীবনে এর কোন প্রভাব নেই। গ্রাব বাংলায় এটি শুধুই একটি আর্থ সামাজিক দিন। এদিন বকেয়া খাজনা বা বকেয়া সওদাগরী পাওনা আদায় হবে। এছাড়া মেলা বসে গ্রামীন দেনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় সকল পণ্য বেচাকেনা করার জন্যে। সময়টা কৃষকের জন্য ভাল। ফসল তোলার পর কৃষকের হাতে বেশ কিছু পয়সা আসে। আসল কথা হলো পহেলা বৈশাকের জন্মই হয়েছে অর্থনৈতিক কারণে। মোগলরা বুঝতে পেরেছিলেন বাংলার অর্থনীতির জন্যে বৈশাখ দিয়ে বছরের যাত্রা কল্যানকর। যা আজও আমাদের নেতারা বুঝতে পারেননি। ফসল ও গ্রামীন অর্থনীতির কথা চিন্তা করে আমাদের বাজেট শুরু হওয়া দরকার পহেলা বৈশাখ বা  পহেলা এপ্রিল থেকে। স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও কোন সরকার এই উদ্যোগ নিতে পারেনি। কারণ , আমাদের নেতারা মনো জগতে এখনও  স্বাধীন নন।

পহেলা বৈশাখ নিয়ে রাজনীতি ও মাতামাতি করা এখন একটা ফ্যাশানে পরিণত হয়েছে। পহেলা বৈশাখ নিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে আমি সমর্থন করি। পশু পাখির মুখোশ লাগিয়ে, বা গাঁজা ভাং খেয়ে অশ্লীল নৃত্য দেশের কোন মানুষই সমর্থন করেনা। এসব অশ্লীল বেলেল্লপনা শুরু হয়েছে বিগত কয়েক বছর ধরে। হঠাত্‍ করে কে বা কারা তরুণদের উসকিয়ে এসব করাচ্ছে তার মূলে যাওয়া দরকার। কেনইবা অদৃশ্য শক্তি আমাদের তরুণদের দিয়ে এসব করাচ্ছে, তাদের লক্ষ্য কি সেটা আজ খুবই জরূরী। ভারতীয়দের ধর্মে নানা ধরণের পশু পাখির প্রভাব রয়েছে। তাঁদের দেবতারা ওইসব পশু পাখি ভর করে ভ্রমণ করেন। এমন কি ইঁদুরও তাঁদের দেবতার সম্মান পান। গ্রামীন মেলাতে মুখোশ বেচাকেনা হয়। তা ব্যবহার করে শিশুরা ক্ষণিকের আনন্দ লাভের জন্যে। কিন্তু রাজধানীতে রাস্ট্রীয় সম্মতি নিয়ে পশু পাখির মিছিল আমাদের সাধারন মানুষ কখনই সমর্থন করেনা। রাজধানীর পহেলা বৈশাখের বর্তমান রূপ এদেশের এর আগে কখনই দেখেনি।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে ফ্যাশান কোম্পানী গুলো নানা রকমের পোষাক তৈরি করে। যাতে অনেক সময় পশু পাখির ছাপ থাকে। যা আমাদের তরুণ তরুণীরা খেয়াল করেনা। আমি আগেই বলেছি পহেলা বৈশাখের সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে আমি সমর্থন করি। কিন্তু শাড়ি , কামিজ, জামায় যা ছাপা  হচ্ছে তার সাথে আবহমান বাংলার  মানুষের  সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের  কোন মিল নেই। পশ্চিম বাংলার ঐতিহ্যের সাথেও এর কোন মিল বা সাযুজ্য নেই। পহেলা বৈশাখের বিজ্ঞাপনের দিকে  একটু নজর দিন,  দেখতে পাবেন  পশু পাখির ছবি দিয়ে  বহু ধরণের বিজ্ঞাপন  দিয়ে সবাইকে আমন্ত্রন জানানো হয়েছে। প্রখ্যাত শিল্পী রফিকুন নবী বলেছেন, মঙল শোভা্যাত্রা শুরু হয়েছে ১৯৮৫ সালে যশোর থেকে। আপনাদের অবশ্যইো মনে রাখতে যশোর জেলার আশে পাশের  জেলা নিয়ে একটি স্বাধিন বংগভুমি  আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেখান থেকেই  ওই মংগল শোভাযাত্রা চালু হয়েছে  রাজধানীতে।  এবং এখনও চলছে। এর পেছনে রয়েছে কোন এক অদৃশ্য মহলের রাজনৈতিক অভিলাষ। যা খোলা চেখে আমাদের  তরুণ তরুণীরা দেখতে পায়না। তারা ভাবছে এটা বাংগালীপনা বা বাংগালিয়ানা।  তারা মনে করছে বা তাদের বলে দেয়া হচ্ছে মংগল শোভাযাত্রা বাংলাদেশের ঐতিহ্য। তারা ভুলে যায়, ভাষা এক হলেও দুই বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এক নয়। বাংলাদেশীরা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক। আলাদা ঐতিহ্যের কারণেই বাংলাদেশ নামের ভৌগলিক এলাকাটা আজ স্বাধীন। ভৌগলিক লোকজ ও ধর্মীয় ঐতিহ্য এক হয়েই আমরা একটি আলাদা জাতিতে পরিণত হয়েছি। আর ওই একই কারণেই পশ্চিম বাংলার বাংগালীরা  দিল্লীর অধীনে তেকেই নিজেদের স্বাধিন মনে করছে। তারা চান বাংলাদেশের মানুষ তাঁদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে মিশে যাক। সোজা কথায় বলা যেতে পারে এক অদৃশ্য শক্তি আমাদের সাংস্কৃতিক ভাবে পদানত ও পরাজিত করতে চায়। আমরা যারা বাংলাদেশের আলাদা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির কথা বলি আমাদের সাম্প্রদায়িক ও পাকিস্তানী মনোভাবাপন্ন  বলে গালি গালাজ দেয়া হয়। বাংলাদেশী শব্দটা নাকি পাকিস্তানী মনোভাবাপন্ন  সাম্প্রদায়িক গোস্ঠি চালু করেছে। আপনি যখনই ইসলাম বা মুসলমানের কথা বলবেন তখনি আপনাকে গালমন্দ করা হবে। এই গোস্ঠি নিজেদের অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল মনে করে। কিন্তু এদের চিন্তাধারা বিকাশ ঘটেছে বেদ উপনিষদ থেকে। এরা মনে করে সনাতনী হিন্দু ঐতিহ্যই বাংলাদেশীদের সংস্কৃতি। বিগত ৪০ বছরে বাংলাদেশের কোথাও কোন সাম্প্রদায়িক দাংগা হয়নি। কিন্তু একই সময়ে ভারতে কয়েক হাজার দাংগা হয়েছে। এইতো ক’দিন আগে কোলকাতায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃস্টি হয়েছিল। ভারত নিজেকে স্যেকুলার অসাম্প্রদায়িক দেশ বলে বড় গলায় জাহির করে , বাস্তবে ভারত কখনই অসাম্প্রদায়িক ছিলনা। অসাম্প্রদায়িকতা ভারতের এক খোলস ও চাণক্য নীতি।

তবে একথা সত্যি যে ভৌগলিক কারণে বাংলাদেশের মানুষ কিছু লোকজ সনাতনী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে লালন করে। যার সাথে  হিন্দু সমাজের মিল রয়েছে। যেমন রয়েছে হিন্দুদের ভিতর বহু মুসলমানী ভাবধারা। এসবই সাংস্কৃতিক মেল বন্ধনের ফলাফল। বাংগালী হয়েও বাংলাদেশের মুসলমানেরা হাজার বছর ধরে নিজেদের আলাদা ঐতিহ্য রক্ষা করে আসছে। যা আর কোনদিনও বাংগালী হিন্দুর মতো হওয়ার নয়।( নয়া দিগন্ত, ২০ শে এপ্রিল,২০১২ )

লেখক; কবি ও সাংবাদিক

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »


কবিতা ও জাহাঙীর ফিরোজ  /   এরশাদ মজুমদার

কবিতার সাথে আমার সম্পর্ক সেই বাল্যকাল থেকে। কবিতা পড়ি, কবিতা লিখি। কবিতা হয় কিনা জানিনা। আমি জানি ছাপা হলেই কোন কবিতা  কবিতা হয়ে উঠেনা। যে কবিতার জন্ম হয়নি তা কখন জন্ম নিবে তা কবি নিজেও জানেনা। কবিতার ক্ষেত্রে কবি নেজেই মা  বাবা এবং ধাত্রী। হঠাত  করেই  সময়কে তোয়াক্কা না করে মাঝরাতে কবিতার লাইন উঁকি জুঁকি দেয়। আরামের ঘুম হারাম করে দিয়ে লাফ দিয়ে উঠ। তা না হলে এ কবিতার যে মরণ হবে। সদ্য জন্ম নেয়া কবিতার জন্যে আহা কী মায়া! ক’দিন পরেই মনে হলো এমন ল্যাংড়া খোঁড়া কবিতা জীবনে দেখিনি। ভাল বা মন্দ কবিতা নিয়ে তাই কোন শেষ কথা নেই। কবি যেটি বাতিল করে দিয়েছে, দেখা গেল পাঠক বলছে সেটাই শ্রেষ্ঠ কবিতা। কবিতা নিয়ে এভাবে কথা বলার অধিকার আমার নেই। তবুও বলার তাগিদেই বললাম।

কলম ধরেছি আমার বন্ধু জাহাঙীর ফিরোজ কে নিয়ে কিছু বলার জন্যে। জাফিকে যাঁরা চিনেন তাঁরা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন তিনি একজন জাত কবি। তাঁর জীবন কাহিনী শুনলে আপনি বলবেন তাঁর জন্ম হয়েছে শুধু কবি হওয়ার জন্যে। জাফি অবিরাম কবিতা লিখে চলেছেন। তাঁর কবিতা আমি নিয়মিত পড়ি জাতীয় প্রেস ক্লাবের কবিতাপত্রের কল্যাণে। প্রায় দশ বছর ধরে প্রতি মাসে কবিতাপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। এতে নিয়মিত জাফির কবিতা প্রকাশিত হয়। এছাড়াও জাতীয় দৈনিক গুলোর সাহিত্য পাতায় ও বিভিন্ন সাহিত্য ম্যাগাজিনে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়। কবি জাহাঙীর ফিরোজের যে ক’টি কবিতার বই বেরিয়েছে তার প্রায় সবকটিই আমি পড়েছি। তবে মোট ক’টা বই বেরিয়েছে তা ঠিক বলতে পারছিনা। এই মূহুর্তে আমার টেবিলে ‘লালনের পাখি উড়ে যায়’ কাব্য গ্রন্থটি আছে। বলা হচ্ছে জাফি ৭০ দশকের অন্যতম প্রধান কবি। কবি ৫৫ সালের ৬ই এপ্রিল এ জগতে এসেছেন। কিন্তু একজন কবির জন্যে এসব তথ্যের কোন প্রয়োজন নেই। সবচেয়ে বড় তথ্য হলো জাহাঙীর ফিরোজ একজন জাত কবি। কবিতাই তাঁর প্রাণ , কবিতাই তাঁর ধ্যান। জাফি একজন দরাজ দিল মানুষ। কবিতা নিয়ে তাঁর নানা স্বপ্ন আছে। স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝে জাফি একা দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তাঁর কল্যাণ কামনা করি। শেষের আগে জাফির একটি কবিতার অংশ উল্লেখ করলাম।

এক পলকের আলো তুমি

চোখ ধাঁধানো রূপ

তোমার ছোঁয়ায় মুগ্ধ বিবশ

আমি যে নিশ্চুপ।

Read Full Post »


বাজেট কেন এবং কাদের জন্যে   /    এরশাদ মজুমদার

 

আমি অর্থনীতিবিদ নই। বাজেট প্রনয়নকারী বিশেষজ্ঞও নই। তবে সাংবাদিক হিসাবে দীর্ঘকাল ধরে বাজেট নিয়ে কাজ করেছি। এ ছাড়া দেশের উন্নয়নে আমার নিজস্ব একটি চিন্তা ও ধারণা আছে। আমাদের চলমান বাজেট ব্যবস্থা কখনই দেশের সকল মানুষের একশ’ভাগ কল্যাণ বা উন্নয়ন সাধন করতে পারবেনা। বাজেট রচনা বা প্রনয়নে যাঁরা মাথা ঘামান বা রাতদিন পরিশ্রম করেন তাঁরা গতানুগতিক ভাবেই তা তৈরী করেন। বৃটিশ আমল বা পাকিস্তানী আমলের সাথে চলমান বাজেট তৈরীর প্রক্রিয়ার কোন বড়  ফারাক নেই। একেবারেই সেকেলে ঘুণেধরা ব্যবস্থা। আমাদের বাজেট প্রণয়ন পদ্ধতি বা ব্যবস্থা না ধনতান্ত্রিক, না সমাজতান্ত্রিক, না ইসলামিক। একটা  জগাখিছুড়ি। বর্তমান অর্থমন্ত্রী একজন সাবেক আমলা। তিরিশ বা তারও বেশী সময় পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সরকারের খেদমত করেছেন আমলা হিসাবে। পাকিস্তান বা বৃটিশ আমলে বহু বাংগালী মুসলমান রাজনীতিক ইচ্ছা করলে বড় আমলা হতে পারতেন। যেমন ধরুন, শেরে বাংলা, হোসেন সোহরাওয়ার্দী, স্যার খাজা নাজিমুদ্দিন, মৌলবিী তমিজ উদ্দিন, নরুল আমিন। এঁরা সকলেই মেধাবী ছিলেন। কিন্তু আমলা না হয়ে রাজনীতিতে এসেছেন দেশের সেবা করার জন্যে।

তত্‍কালীন পূর্ববাংলা ও বর্তমান বাংলাদেশে জমিদারী ব্যবস্থা উচ্ছেদ করা হয়েছে ১৯৫০ সালে মুসলিম লীগ  আমলে। সরকারের এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন বড় বড় জমিদার বাবুরা, যারা সমাজে প্রগতিশীল বলে পরিচিত ছিলেন। জিন্নাহ সাহেব একবার বলেছিলেন পাকিস্তানের প্রয়োজন পূর্ববংগের গরীব মুসলমান কৃষকদের মুক্তির জন্যে। এর মানে, পূর্ববংগের মুসলমানরা  এত বেশী শোষিত হয়েছেন যে, তাদের মুক্তির জন্যে পাকিস্তান প্রতিস্ঠা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। যদিও পাকিস্তান প্রতিস্ঠার পর পাকিস্তানের শাসক গোস্ঠি ও পূর্ববংগের মুসলিম লীগ নেতারা সে কথা ভুলে গিয়েছিলেন। জমিদারী ব্যবস্থা বাতিল বা উচ্ছেদ করাটা ছিল একটি বিপ্লবী পদক্ষেপ, যার প্রশংশা করেছিল রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি। পূর্ববংগের বেশীর ভাগ জমিদারই ছিলেন হিন্দু এবং তাঁরা ছিলেন কোলকাতার অধিবাসী। শুনেছি  ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা কালে জমিদার বাবুরা মুসলিম লীগের ওই বিপ্লবী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। এ কথা আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, যুক্তফ্রন্ট গঠণের সময় তাতে যোগ দিয়েছিল কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি। জমিদার বাবুদের অনেকেই কংগ্রেস করতেন। মুসলিম লীগ যে এমন একটি বিপ্লবী কাজ করতে পারে তা কংগ্রেসী জমিদার বাবুরা বিশ্বাস করতে পারেননি। এই মুসলিম লীগই মুসলমান প্রজাদের ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্যে ঋণ সালিশী বার্ড গঠণ করেছিল। যা শেরে বাংলা বাস্তবায়ন করেছিলেন। বিষয়টি উল্লেখ করলাম আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্যে। মুসলিম লীগের মতো একটি দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলও সাধারন মানুষের মুক্তির জন্যে এমন একটি প্রগতিশীল  রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল। বাংলাদেশে এখন মুসলীম লীগ নাই বললেই চলে। তবে আমি নিজেও মনে করি মুসলিম লীগ কখনই গণমানুষের রাজনৈতিক দল ছিলনা। যদিও মুসলিম লীগকে নির্যাতিত মুসলিম জনসাধারন সমর্থন দিয়েছিল সময়ের চাহিদার কারনে।

১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন রোজ গার্ডেনে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ বিরোধী বিরোধী রাজনৈতিক দল আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। মাওলানা সাহেব বলতেন, আমরা হলাম জনগণের মুসলিম লীগ, আর শুধু মুসলিম লীগ হলো  খাজা গজার দল। আওয়ামী মুসলীম লীগে যাঁরা যোগ দিয়েছিলেন তাঁরা সবাই ছিলেন সাধারন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মানুষ। মুসলিম লীগ পাকিস্তান প্রতিস্ঠা করেছে এই দম্বেই আত্মহারা ছিল। ফলে ৫৪ সালের সাধারন নির্বাচনের আগেই দলটি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। মাওলানা ভাসানী  শেরে বাংলা ও সোহরাওয়ার্দ্দীকে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করলেন। যা মুসলিম লীগকে পুর্ববংগের রাজনীতি থেকে বিদায় দিয়েছে। তারপর মুসলিম লীগ এদেশের রাজনীতিতে আর ফিরে আসতে পারেনি। রাজনীতি থেকে শেরওয়ানী, চোস্ত পাজামা আর জিন্নাহ টুপি বিদায় নিলো। আসলো লুংগি, শার্ট, পাজামা, পাঞ্জাবী। রাজনীতি উকিল মোক্তার, জমিদার জোতদার তালুকদারদের চেম্বার ও কাচারী ঘর থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল অতি  মধ্যবিত্তের দুয়ারে। এখন রাজনীতি বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। বাংগালীরা , বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণী রাজনীতি না করে থাকতে পারেনা। এখন রিকসাচলক, ফেরিওয়ালা ও সংবিধানের কথা বলে। গ্রাম আধা শহর ও পুরো শহরে মধ্যবিত্তরা চায়ের কাপে রাজনীতির ঝড় তোলে। দুই টাকার কাগজ না পড়লে তাদের ভাতই হজম হয়না।

বাংলাদেশ প্রতিস্ঠিত হয়েছে ৪০ বছর পার হয়ে গেছে। মধ্যবিত্তের রাজ প্রতিস্ঠিত হয়েছে। ৭২ সালে ব্যান্কের কোরাণী বা ক্লার্ক ছিলেন এমন ব্যক্তি এখন ব্যান্কের চেয়ারম্যান হয়েছেন। আমদানী অফিসের কেরাণী এখন পাঁচ হাজার কোটি টাকার শিল্প গ্রুপের মালিক। ৭২ সালে যেখানে এক কাঠা জমির দাম দুই হাজার টাকা ছিল তা একন দুই কোটি টাকা। রাজউক বা ডিআইটি যে জমি পাঁচ হাজার টাকায় বরাদ্দ দিয়েছিল তা এখন একশ’ কোটি টাকা। সরকারী সহযোগিতা বা অনুকম্পা পেয়ে যারা  সরকারী জমি পেয়েছেন তারা রাতারাতি ধনী হয়ে গেছেন। ৮২ সালে একটি ব্যান্ক প্রতিস্ঠা করতে তিন কোটি লেগেছে উদ্যোক্তাদের। সেই তিন কোটি টাকা যোগাড় করতে ২৫/২৬ জন উদ্যোক্তার প্রয়োজন হয়েছে। এখন একটি ব্যান্ক প্রতিস্ঠা করতে চারশ’ কোটি টাকা লাগবে। অনুমতি পাওয়ার জন্যে  আরও চার পাঁচশ’ কোটি টাকা লাগে বলে শুনেছি। এমন উদ্যোক্তাও আছেন যিনি একাই এক হাজার কোটি টাকা দিয়ে ব্যান্ক প্রতিস্ঠা করতে চান। অর্থমন্ত্রী বলেছেন রাজনৈতিক কারণে নতুন ব্যান্কের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। যাদের ব্যান্কের লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে তাঁরা তা বিক্রি করে হয়ত পাবেন একশ’কোটি টাকা। রাজউক এতদিন পর বলছে , এখন থেকে আর জমি বরাদ্দ দেয়া হবেনা। এখন  মধ্যবিত্তদের ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া হবে। জানিনা রাজউকের এই ওয়াদা কতটুকু সত্য হবে। রাজনৈতিক দল গুলো নিজেদের ভালবাসার মানুষদের ধনী বানাবার এর চাইতে সহজ পথা আর কোথায় পাবে।

রাজধানীর চারিদিকে এখন নদী দখল চলছে। এই দখলি ব্যবসাটা করছে রাজনৈতিক আশ্রয়ে পরিপুস্ট শক্তিধর ব্যক্তিরা। গরীব মানুষের জমি দখল করে রাজউক এবং ধনীরা প্লট বানিয়ে বিক্রি করছেন। আপনারা প্রতিদিন খবরের কাগজে ও টিভিতে জমি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখেন। নামমাত্র মূল্যে জমি দখল করে সে জমি হাজার কোটি টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর চারিদিকে এখন শুধু হাউজিংয়ের বিজ্ঞাপন। পত্রিকা ওয়ালারাও বেশ খুশী। যত বেশী রঙিন বিজ্ঞাপন ততবেশী কম স্বাধীনতা। খুবই আনন্দের খবর।একটা সময় ছিল যখন পত্রিকার প্রথম পাতায় চব্বিশ ইঞ্চির বেশী বিজ্ঞাপন ছাপা হতোনা। পাঠকের অধিকার বলেওতো একটি কথা আছে। এখন পাঠকদের সেই অধীকার নেই। সাংবাদিকরা বলবেন, আমরা শ্রমিক মানুষ, ভাল বেতন পেলেই খুশী। পত্রিকা যদি বেশী বেশী বিজ্ঞাপন না পায় তাহলে আমাদের অস্টম ওয়েজ বোর্ড দিবে কোত্থেকে।আগেই বলেছি রাজনীতি এখন মধ্যবিত্তের দুয়ারে। ধনীরা রাজনৈতিক দলগুলোকে ভালবেসে চুমা খায়। চাওয়া মাত্রই টাকা দেয়। সরকারে থাকলে  মাসে পাঁচশ’ কোটি, আর বিরোধী দলে থাকলে মাসে পঞ্চাশ কোটি। এবার আপনারাই বলুন বেচারা রাজনৈতিক দলগুলো টাকার এই ভালবাসাকে কিভাবে উপেক্ষা করবে। গ্রামে গণ্জে, হাটে বাজারে চাঁদাবাজির এই ব্যবস্থা ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষমতাসীন দলের ইউনিয়ন নেতারও মাসে লাখ খানেক টাকা চাঁদা আদায় হয়। যদি কখনও প্রশ্ন করেন, ভাই কেমন আছেন? ভাই উত্তরে বলবেন, বোঝেনইতো দল ক্ষমতায় থাকলে যা হয়। সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হয়। ব্যবসা বাণিজ্য কিছু করছেন নাকি? সময় কোথায় বলুন? তাহলে? দল চালাতে হলেতো কিছু চাঁদা নিতেই হয়। জন সাধারন ভালবেসেই মাসে মাসে কিছু টাকা দেন। এছাড়া আমাদের ছেলেরাইতো উন্নয়নের কাজ করছে। টেন্ডারগুলো তারাই পায়। বুঝতেইতো পারেন রাজনীতি করতে হলে এসবতো করতে হবে।

রাজধানীর পর্যায়ে চাঁদাবাজির কথা আগেই বলেছি। এছাড়া রাজনীতিতে উপরি পাওনাতো আছেই। সুরন্জিত বাবুর গল্পতো আপনারা জানতেই পেরেছেন। ওনার ছেলেও ছ’মাস চাকুরী করে পাঁচ কোটি টাকা জমা দিয়ে টেলি ব্যবসা জোগাড় করেছেন। তিনি দুদকে জবানবন্দী দিয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন বন্ধুরা তাঁকে টাকা দিয়েছেন। সুরন্জিত বাবুর ছেলের মতো এদেশে আরও বহু ছেলে আছে যাদের বন্ধুরা  সরকারী ব্যবসা পাওয়ার জন্যে এভাবে টাকা দেয়না। কারণ, তাদের বাবা মন্ত্রী নয়। শুনেছি এ জামানায় সংসদ সদস্য হতে নির্বাচনে চার পাঁচ কোটি টাকা খরচ করতে হয়। মন্ত্রীত্ব পেতেও নিশ্চয়ই টাকা খরচ করতে হয়। দল যদি নির্বাচন করতে হাজার কোটি টকা খরচ করে সে টাকা দলনেতা কোথায় পাবেন? বাধ্য হয়েই দলনেতাকে বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে ওয়াদা করতে হয় ক্ষমতায় গেলে পুষিয়ে দেবো। পদ্মা সেতুর ঘটনাটা হয়ত তেমনি একটা কিছু। তাই ব্যবসায়ী আবুল সাহেবকে কিছু করা যায়নি। সুরঞ্জিত বাবুর ঘটনাটা  একটু ভাবুন। তাঁর ওজারতি যেয়েও যায়নি। তিনি এখন উজিরে খামাখা। এর মানে হলো দপ্তর বিহীন মন্ত্রী। উর্দুতে বলে উজিরে খামাখা। মানে কাজ নেই, নিয়মিত সরকারী তহবিল থেকে টাকা পয়সা নিয়ে সংসার চালাবেন।

আমাদের দেশের দূর্ণীতি সম্পর্কে টিআইবি( ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) বহুদিন ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। সে প্রতিবেদন আমাদের জন্যে মর্যাদার কিছু নয়। এতে বিশ্ব বাসীর কাছে আমাদের মাথা হেট হয়ে যায়। তবে দূর্ণীতির বিষয়টি এখন আর কেউ গায়ে মাখেনা। সরকারী অফিসের পিয়ন থেকে সচিব মন্ত্রী পর্যান্ত সবাই পদ মর্যাদার খাজনা , সেলামী বা সম্মানী আদায় করেন। ছেলেবেলায় চাপরাশী বাড়ির কথা শুনেছি। এটি একটি সরকারী চাকুরী। চাপরাশীর চাকুরী করে ভদ্রলোক আয় রোজগার করে সমাজে সম্মান অর্জন করেছিলেন। এমন কি সারাজীবন উমেদারের চাকুরী করেও সামাজিক মর্যাদা বৃস্ষি করেছেন এমন লোক ছিল। উমেদার হচ্ছে , যিনি চাকুরীর জন্যে আবেদন করেছেন, এখনও পাননি। কিন্তু বিনা বেতনে বা বিনে পয়সায় কাজ করছেন বা শিখছেন। উমেদারকেও লোকে খুশী হয়ে দু’চার পয়সা হাতে গুঁজে দিতো। এতো গেলো সরকারী অফিসের উপরি লেনদেনের কিসসা। আপনারা ইতোমধ্যেই জানতে পেরেছেন আগামী বাজেটের সাইজ হবে এক লক্ষ আশি হাজার কোটি টাকা। সরকারী কর্মচারীরা যদি মাত্র দশ পার্সেন্ট করে উপরি গ্রহণ করেন তাহলে তার পরিমাণ হবে বছরে ১৮ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে উপরি আদায়ের পরিমাণ বা পার্সেন্টেজ আপনারা নিশ্চয়ই জানেন। আমিতো বলি, দশ পার্সেন্ট  হাত খরচ জাতি দিতেই পারে। ছেলেবেলায় শুনেছি যে বাজার করে সে পান বিড়ির জন্যে দু’চার পয়সা রাখতো। শুনেছি , করাচীতে  বাসা বাড়ির বাংগালী কেয়ারটেকাররা শর্ত দিতো বাজার করার সুযোগ দিতে হবে। বড় বড় হোটেল বা রেস্টুরেন্ট গুলোতে টিপস দেয়া একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। কোন হোটেলে টিপসা বিলের সাথে যোগ করে দেয়া হয়। এক সময় এই টিপসকে বকশিস বলা হতো।

এতক্ষণ ধরে আপনাদের কাছে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতির পারিপার্শিক অবস্থার কথা বলেছি। আমার মূল আলোচনা হচ্ছে বাজেট নিয়ে। আমাদের সবার জীবনই বাজেট আছে। যারা চাকুরী করেন তাঁরা বেতন এবং উপরি, বাড়তি বা ঘুষ নিয়ে মাসিক বাজেট করেন।বর বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, জমি ডেভেলপাররা সংসার খরচের জন্যে তেমন বাজেত তৈরী করেন না। কারণ তাদের কাছে প্রচুর টাকা থাকে। সে টাকা ব্যান্কের বা  ব্যবসার। এ ব্যাপারে মরহুম সাইফুর রহমান সাহেব বলতেন, শি্প বা ব্যবসার অবস্থা খারাপ। খিন্তু মালিকের অবস্থা খুবই ভাল। তারা পাজেরো বা বিএমডব্লিউতে চড়েন। বর বড় ভিলা বানান। কর্মচারীর বেতন ঠিক সময় দেননা। একই ভাবে সরকারও বাত্‍সরিক বাজেট তৈরি করেন রাজস্ব আদায়, বিদেশী ঋণ, দেশী ঋণের উপর নির্ভর করে। ইদানিং বিদেশী ঋণের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। পুরাণো বিদেশী ঋণ অনেক বাকি পড়ে গেছে। নিয়মিত কিস্তি শোধ হচ্ছেনা। চলতি সরকার মনের মাধুরী মিশিয়ে বাণিজ্যিক ব্যান্ক থেকে ঋণ নিয়ে সরকার চালাচ্ছেন। ডিপোজিটের উপর সুদের হার ঠিক নেই জন সাধারণ সরকারী প্রতিস্ঠানে এখন আর সঞ্চয় রাখতে চায়না। এক লক্ষ আশি হাজার কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে সরকারের কর্মচারীর বেতন, রক্ষণাবেক্ষন, পেনশন বাবতই খরচ হয় সিংহ ভাগ টাকা। এর মানে হচ্ছে একশ’ টাকার ব্যবসা চালাতে গিয়ে ম্যানেজারের বেতন দিতে হয় দেড়শ’ টাকা। তাহলেই বুঝতে পারেন এ ব্যবসা কতদিন চলবে। সরকারের সাইজও দিন দিন বেড়ে চলেছে। ১/১১র সরকারের দিকে একবার নজর দিন। সরকারের বেতনভুক কর্মচারীরাই সরকার দখল করে দুই বছর দেশবাসীকে হেনস্থা করেছে। এখন তাঁরা দেশত্যাগী হয়েছেন। যাওয়ার সময় গণতন্ত্রের জোব্বা পরিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়ে গেছেন। মইনুদ্দিন ফখরুদ্দিনের কাছ থেকে ২৪০ সিট নিয়ে আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়।বলা যেতে পারে  ১/১১র সরকারের বৈধ ওয়ারিশ হচ্ছে আওয়ামী লীগ। গণতন্ত্র আর দেশ রক্ষার জন্যে এখন আওয়ামী লীগ ও সরকার লড়াই করে যাচ্ছে পুলিশ, বিজিবি আর রেবের মাধ্যমে। তাই আমরা প্রতিদিন টিভিতে পুলিশ আর রেবের বক্তৃতা শুনি।

প্রশ্ন হলো বাজেটের বেনিফিট কাদের কাছে পৌঁছে? কারা বেনিফিসিয়ারী তা ইতোমধ্যে আপনারা কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন। একজন চৌকিদারও এই বাজেটের বেনিফিট পায়। পায়না শুধু এদেশের কোটি কোটি সাধারন কৃষক ও কৃষি উত্‍পাদক শ্রেণী। এদেশে কৃষকদের কোন শক্তিশালী সংগঠন নেই। কৃষক ছাড়া বাকি সবার দরকষাকষির সংগঠন আছে। দেশে লাখ লাখ মানুষ আছেন যাঁরা কখনও টাকা দেখেননা বা তাঁদের টাকার (কারেন্সী) প্রয়োজন হয়না। তাঁরা শ্রমের বিনিময়ে চাল পান, দুপুরের খাবার পান। ধানের চাতালে যে সব মা বোন কাজ করেন তাঁরা দিনের শেষে মুজুরী হিসাবে চাল পান।বর্গা আর প্রান্তিক চাষীদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। বড় চাষী বা কৃষক বা জমির মালিকগণ শুধু চাষের উপর নির্ভর করেন না। তাঁদের আরও অনেক ব্যবসা আছে। তাঁদেরই শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা চাকুরী করেন। তাঁদের হাতে নগদ অর্থ থাকে। আমাদের অর্থনীতি এখনও কৃষি এবং কৃষকদের পক্ষে নয়।ফলে সরকারের বা রাজনৈতিক দলগুলোর দর্শন  আদর্শ ও কর্মসূচী কৃষকদের পক্ষে নয়। বহু বছর আগে জিয়া সাহেবের আমলে যখন আজিজুল হক সাহেব কৃষি উপদেস্টা ছিলেন তখন কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি আমাকে প্রশ্ন করেছিলো আমি কৃষির পক্ষে না কৃষকের পক্ষে। কমিটি আমাকে জানালেন, সরকার কৃষি / খাদ্য উত্‍পাদন বৃস্ষির জন্যে কাজ করছে। আপনার কাগজ ফসলতো কৃষকদের স্বার্থের জন্যে কাজ করছে। আমরা মনে করি আপনি কৃষকদের উসকানী দিচ্ছেন। এই তথ্য থেকেই আপনারা বুঝতে পারছেন বাংলাদেশ সরকারের আদর্শ কি এবং কোন পথে। পাকিস্তানের ২৩ বছর আর বাংলাদেশের ৪০ বছর মিলিয়ে ৬৩ বছর পার হতে চলেছে। কিন্তু কৃষকদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। ফলে দেশের যে উন্নতি ও অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিলতা হয়নি। কৃষকদের সজাগ করার জন্যে কাজ করে অনেকেই সরকারী পুরস্কার পান। কৃষি এখনও দেশের ৬০ ভাগ মানুষের কর্ম সংস্থান করে। এর মানে হলো কোন পথ অবলম্বন করলে দেশের অর্থনীতি স্বাধীন হবে সে পথে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো চলছেনা। আপনারা ইতোমধ্যেই জানতে পেরেছেন বরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে ধানের দাম একেবারেই পড়ে গেছে। লাভ হবে মিল মালিক ও কৃষিপণ্যে বিনিয়োগকারীদের। শুনা যাচ্ছে কৃষকরা এবার সর্বস্বান্ত হবে। বেশী উত্‍পাদন একটি মহা আনন্দের খবর হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু হয়েছে বেদনার খবর। বেশী ফলন আমাদের কৃষকদের বহুকাল থেকে কস্ট দিচ্ছে শুধুমাত্র সরকারের নীতির ফলে। পৃথিবীর বহুদেশ এ সমস্যার সমাধান করেছে কৃষকদের কল্যাণার্থে। সে সব দেশের অর্থনীতিও বিকশিত হয়েছে কৃষকদের সমর্থনে। জাপান পৃথিবীর অন্যতম প্রধান শিল্পোন্নত দেশ হওয়া সত্বেও আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও কৃষি ত্যাগ করেনি। নয়া কৃষি নীতির কারণে জাপানের কৃষকরা এখন খুবই সুখে আছে। জাপানের একশ’ ভাগ কৃষকই এখন আধুনিক শিল্প পণ্যের ভোক্তা। কৃষিতে যতবেশী ভর্তুকী ততবেশী শিল্পের বিকাশ। জাপানের এবং ভিয়েতনামের কৃষকগণ এখন সবচেয়ে সম্মানিত নাগরিক। আমাদের দেশের কৃষকদের কোন সম্মান নেই। কারণ তাঁরা অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী নন। সুতরাং এই বাজেটের সাথে কৃষকদের কোন সম্পর্ক নেই। চলমান সরকার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা কৃষকদের মিত্র নয়। দেশের ষোল বা পনের কোটি মানুষের ভিতর দুই/তিন কোটির সম্পর্ক রয়েছে বাজেটের সাথে। এমনধরণের বাজেট হাজার বছরেও কৃষকের কল্যাণ বয়ে আনবেনা।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ershadmz40@yahoo.com

Read Full Post »

« Newer Posts - Older Posts »