হজরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ( সাবেক জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর) একটি বিরাট কার্গো কমপ্লেক্স আছে। এই বিমান বন্দর দিয়ে বিদেশ যত কার্গো বা মাল আসে তা কমপ্লেক্সেই রাখা হয়। এখান থেকেই কাস্টমস ফর্মালিটিস সমাধা করে সরকারী পাওনা বা রাজস্ব দিয়ে মাল খালাস করে নিতে হয়। এ ব্যবস্থা দেশের সকল স্থল ও জল বন্দরে আছে। পুরাণো জমানায়ও এ ব্যবস্থা ছিল। পুরাণো জামানায় রাজা বাদশাহ , নবাব সম্রাটরা খাজনা ও কর আদায় করতেন। মূলত: ব্যবসায়ীরাই শুল্ক বা কর দিতেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সাথে নবাব সিরাজ উদ দৌলার মূল বিরোধ ছিল শুল্ক বা কর আদায় নিয়ে। ইংরেজরা চেয়েছিল বিন শুল্কে বাংলায় ব্যবসা করতে। নবাব তাতে রাজী হননি। নবাবের বক্তব্য ছিল কোম্পানী বন্দরে মাল খালাস করবে শুল্ক দিয়ে আর দেশী ব্যবসায়ীরা সে মাল দেশের ভিতরে খুচরা ও পাইকারী ভাবে বেচাকেনা করবে। কোম্পানী বিনা শুল্কে বন্দরে ও দেশের ভিতরে খুচরা ও পাইকারী ব্যবসা করতে চেয়েছিল। নবাব এতে রাজী হননি। বৃটিশ নীতিবান লেখকরা বলেছেন, পলাশী যুদ্দের প্রধান নায়ক নবাব সিরাজ উদ দৌলা, কোম্পানী কর্মচারী ক্লাইভ নয়। নবাব ইচ্ছা করলে কোম্পানীর সাথে সমঝোতা করে সুখে শান্তিতে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। ফলে দেশী বিদেশী বেঈমানরা জোট বাঁধে নবাবের পতনের জন্যে। পলাশীর ষড়যন্ত্র তারই দলিল। পলাশীর ষড়যন্ত্রই পুরো ভারতের পরাধীনতা ডেকে আনে।
আমাদের শুল্ক ও আবগারী ব্যবস্থা তেমন সুস্ঠ নয়। এখানে মূল লক্ষ্য যেনতেন জোর জবরদস্তি করে দেশের জনগণের কাছে থেকে রাজস্ব আদায় করা। আমাদের শুল্ক ও কর ব্যবস্থা নিবর্তন মূলক। বলা হয় রাজস্ব আদায় করে দেশের উন্নয়নের কাজে লাগানো হবে। কিন্তু দেশবাসী যে উন্নয়ন আশা করেন তা কখনও হয়না, আগামীতে হবে কিনা তাও দেশবাসী নিশ্চিত নয়। আমাদের উন্নয়নের বাজেটের তুলনায় সরকারী কর্মচারীর বেতন ও পেনশনের বাজেট অনেক বড়। ২০ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মসূচী ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন করতে সরকার ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে। বাংদেশ রাস্ট্র পরিচালনার জন্যে যে সরকার রয়েছে তা এতবেশী বড় যে রাস্ট্র যেকোন সময় মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। এখানে সরকার দিন দিন বড় হচ্ছে আর উন্নয়ন কমে যাচ্ছে। সরকার যারা পরিচালনা (ব্যুরোক্রেসি) করেন তাঁদের মনো জগতে যা কাজ করে তা হলো তারা কখনই দেশের সাধারন মানুষকে সম্মান করেনা। আর যারা নির্বাচিত প্রতিনিধি বা রাজনীতিক তাঁরা ৪/৫ বছর ক্ষমতায় থাকেন নিজেদের আখের গোছাবার জন্যে। সরকারী কর্মচারীরাও জানেন জনপ্রতিনিধিরা তেমন লেখাপড়া জানেন না। তাই কর্মচারীরা তাঁদের পরিচালনা করেন।
ক’দিন আগে আমার এক প্রবাসী বন্ধু গিয়েছিলেন ঢাকা বিমান বন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সে কিছু আনএকম্পেনিড ব্যাগেজ খালাস করার জন্যে। ব্যাগেজে ছিল পুরাণো বইপত্র, খাতা কলম , গবেষণার কাগজপত্র, পুরাণো টিভি, ল্যাপটপ ও ব্যবহৃত পুরাণো কাপড় চোপড়। এসব ক্ষেত্রে শুল্ক ককর্মকর্তাদের উচিত যাঁর জিনিষপত্র তাঁকে ডেকে বলা আপনার এসব পুরাণো ব্যবহৃত জিনিষপত্রের জন্যে কোন প্রকার কর বা শুল্ক দিতে হবে না। কিন্তু প্রচলিত ব্যবস্থা সে রকম নয়। কর বা শুল্ক থাক বা না থাক আপনাকে ক্লিয়ারিং এজেন্টের দ্বারস্থ হতে হবে। আর ক্লিয়ারিং এজেন্ট আপনাকে সাপের পাঁচ পা দেখাবে। যিনি এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হন তাঁর এ ব্যাপারে কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকেনা। হয়ত জীবনে একবারই এবং প্রথমবার তাঁকে এ কাজ করতে হচ্ছে। ঢাক কার্গো বা কাস্টমসের যেকোন অফিসে গেলে হাজার হাজার লোক এবং দালালের ভীড়ে আপনার মনে হবে আপনি অজানা ভিন কোন দেশে এসে পৌঁছেছেন। আপনি একেবারেই অসহায়। আপনার কিছুই করার নেই। ওখানে সকলের ব্যবহার এক রকম। আপনি ন্যাশনাল জিওগ্রাফী চ্যানেল দেখুন। দেখবেন বাঘ বা সিংহ একটা হরিণকে দৌড়ে পরাজিত করে ঝাপটে ধরে খাচ্ছে। প্রথমে কয়েকটি সিংহ বা সিংহি হরিণটাকে খাবে। তারপরে আসবে একদল হায়েনা। তারপরে বন্য কুকুর থাকলে তারা আসবে। এমনি করে শকুন, হাড়গিলা পাখি, কাক ট্যাদি প্রাণীরা আসবে। ঢাকা কারগো তেমন একটি জায়গা। জবরদস্তি আপনার উপর নানা ধরনের শুল্ক বসিয়ে দেয়া হবে। আপনি নিজে তদবীর করলে হবেনা। তদবীর করবে ক্লিয়ারিং এজেন্টের লোক বা তার দালাল। ধরুন, আপনার পুরাণো জিনিসপত্রের জন্যে অবশ্যই শুল্ক দিতে হবে। প্রশ্ন হলো, ধার্যকৃত শুল্ক আপনি কত শান্তিতে দিবেন। যেখানে যত টাকা দিবেন খুচরা কোন টাকা আর ফিরে আসবেনা। এমন কি সোনালী ব্যান্কের কাউন্টারে আপনি যদি আটশ’ টাকা জমা দেয়ার জন্যে এক হাজার টাকা জমা দেন বাকি টাকা আর ফেরত পাবেন না। মানে হলো দেশে ফিরে প্রথম ক’দিন নিজ বাসা থেকে নিয়মিত ঢাকা কার্গোতে প্যারেড করুন।