সারা বিশ্বে কোথাও সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেল গুলোর স্বাধীনতা নেই। যেমন নেই নিরপেক্ষ বলে কোন ধরনের কোন বিষয় এ জগতে। সংবাদপত্র বা টিভি যারা সত্যিকারের মানুষ তাদের কথা বলেনা। যারা এ জগতে মিডিয়ার ষহযোগিতা পেতে চায়, বন্ধুত্ব চায় তারা মিডিয়ার কাছ থেকে কোন সমর্থন পায়না। চলমান জগতে সাতশ’ কোটি মানুষের মধ্যে পাঁচশ’ কোটি মানুষ মৌলিক অধিকারের কাছাকাছি কোথাও পৌঁছাতে পারেনা। এই পাঁচশ’ কোটি মানুষের জন্যে মিডিয়া কখনই কোন কথা বলেনা। এইতো মানবতা বিরোধী ইরাক যুদ্ধের সময় আমেরিকানরা ছয়শ’ এম্বেডেড বা অনুগত সাংবাদিককে প্রশিক্ষন দিয়ে ইরাকে পাঠিয়েছিল তাদের পক্ষে রিপোর্ট পাঠাবার জন্যে। আমেরিকার সরকার ও কর্পোরেট হাউজ গুলো সে দেশের বড় বড় মিডিয়া নিয়ন্ত্রন করে। এখানে জনগণের স্বাধীনতা বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কখনই থাকেনা। সাংবাদিকরা যে ভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা ভাবে সে ধরণের স্বাধীনতা কোথাও নেই। ক’দিন আগে মার্ডক মিডিয়া সাম্রাজ্যের কেলেংকারীর কথা প্রকাশ হয়ে পড়েছে। সেটাও বৃটিশ সরকার ও বড় পুঁজির মালিকদের আভ্যন্তরীন লড়াইয়ের ফল। বারলোসকোনির মিডিয়া গুলো তাঁর দুর্দিনে তাঁর বিরুদ্ধে লিখে সুনাম কুডিয়েছে। এটাও এক ধরনের কৌশল। সেই মিডিয়াই আরেক সময় বারলোসকনির ক্ষমতায় ফিরে আসার ব্যাপারে লড়াই করবে।
সুদুর অতীতে সংবাদপত্রের মালিক থাকতেন জমিদার রাজা মহারাজা ও সম্রাটগণ। সংবাদপত্রে যারা কাজ করতেন তাঁরা হচ্ছেন কর্মচারী। সে যুগ পেরিয়ে আমরা গণতন্ত্রের যুগে এসেছি। পশ্চিমারা দাবী করে তাঁরা গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক। তারাই বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র রক্ষায় নিবেদিত রয়েছে। তাঁদের গণতন্ত্রের নমুনা আমাদের দেশে বা এশিয়া আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে তারা প্রতিস্ঠা করতে চায়। সংবাদপত্র গুলোকেও পশ্চিমারা সেভাবে প্রভান্বিত করে চলেছে। পশ্চিমারাই আমাদের সাংবাদিকদের ট্রেনিং দেয়। যাদের ট্রেনিং দেয় তাদের সারাজীবনের জন্যে অনুগত রাখতে চায়। পশ্চিমা গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ধারণা থেকে আমরা কখনই বেরিয়ে আসতে পারিনি আমাদের ঔপনিবেশিক মানসিকতার কারণে। এ ধরণের মানিকতার কারণেই পশ্চিমারা আমাদের হেয় চোখে দেখে। পশ্চিমাদের অনুসরন না করেই চীনারা আজ জগতের শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্রমনা নয়। ফলে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতাও গণতান্ত্রিক চর্চা করতে প্রায় ভুলে গেছে। পশ্চিমা জগতের প্রায় সব বিখ্যাত কাগজই কর্পোরেট হাউজ গুলোর নিয়ন্ত্রন প্রভাবাধীন রয়েছে। এরা সত্য কথা বলেনা, লিখেনা। ইতোমধ্যে সেখানে তৃতীয় মতের কাগজ ও অনলাইন নিউজপেপার বেরিয়েছে। এসব মিডিয়া জনগণের চাঁদায় চলে। কর্পোরেট হাউজের মালিকাধীন কাগজ গুলোর মুখোশ খুলে দেয়াই এসব ইনফরমাল মিডিয়ার কাজ। আমেরিকা ইউরোপের বিখ্যাত কলামিস্টরা তৃতীয় মতের মিডিয়ায় লিখে চলেছেন। পশ্চিমা দেশের কর্পোরেট হাউজ ও রাজনীতিকদের মুখোশও খুলে দিচ্ছে জনগণের এই মিডিয়া। সত্য তথ্য প্রকাশ করার কারণে উইকিলিকসের প্রতিস্ঠাতা এ্যাসান্জ এখন জেলে আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকরা নিহত হচ্ছেন। নির্যাতনের কথা নাইবা বললাম। কোন সংগঠণ বা সংস্থা সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধ করতে পারেনি। কারণ ধনী কর্পোরেট হাউজ গুলো রাজনীতিকদের সাথে আঁতাত করেই জনগণকে শোষন করে। অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনকে সরকার গুলো কিভাবে দমন করেছে বা এখনও করছে তা আপনারা সবাই জানেন। আমরিকার সাধারন মানুষ দেশের অর্থনীতির মাত্র এক পারসেন্ট নিয়ন্ত্রণ করে। বাকী ৯৯ ভাগ অর্থনীতি কায়েমী স্বার্থবাদী কর্পোরেট হাউজ গুলো নিয়ন্ত্রন করছে। অকুপাই আন্দোলনটি হচ্ছে আমেরিকার সাধারন মানুষের আন্দোলন। চলমান অর্থনীতি কোন ভাবেই আমেরিকার জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত নয়। আমেরিকানরা বুঝতে পেরেছে তাদের পুঁজিপতিরা তাদের কি নির্মম ভাবে শোষণ করছে। রা্ট্র হিসাবে আমেরিকাও তার জন কল্যাণমুখী আদর্শ হারাতে বসেছে। এখন আমেরিকার নেতারা বলতে শুরু করেছেন আগামী শতক এশিয়ার। আমেরিকাকে এশিয়ার দিকেই নজর দিতে হবে। এর মানে হচ্ছে আমেরিকার সরকার তার দেশের পুঁজিপতিদের জন্যে এশিয়ায় নতুন বাজার খুঁজতে মাঠে নিমেছে। তাই আমেরিকা ও তার ইউরোপীয় দোসররা এশিয়ায় নানা ধরণের গোলযোগ সৃস্টি করে চলেছে। একমাত্র চীন ছাড়া এশিয়ার প্রায় সব দেশকে নিজেদের হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। ভারতকে চীনের মোকাবিলা করাবার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। চীন এ ব্যাপারে খুবই সজাগ। কিন্তু ভারতের মিডিয়া এই ব্যাপারে একেবারেই মূর্খ দেশ প্রমিকের ভুমিকা পালন করছে।
৭০ সালের আগে পূর্ব পাকিস্তানের মিডিয়া নিজ অঞ্চলের জনগণের অধিকারের ব্যাপারে অনেক সোচ্চার ছিল। সামবাদিকরাও এ ব্যাপারে অনেক লড়াকু ভুমিকা পালন করেছে। তখন কাগজের মালিকরা আজকের মালিকদের মতো ছিলেন না। রক্ষণশীল পাকিস্তানপন্থী মালিকরাও পূর্ব পাকিস্তানের অধিকারের কথা সোচ্চার গলায় বলেছেন। কিন্তু ৭২ সাল থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের মিডিয়া আর স্বাধীন থাকেনি। মুক্তিযুদ্ধ আর বংগবন্ধুর কথা বলে ছোটখাট সাপ্তাহিক পত্রিকা ছাড়া সব কাগজ সরকারের দালালে পরিণত হয়েছিল। শ্লোগান ছিল এক নেতা এক দেশ, বংবন্ধু বাংলাদেশ। তখন অনেকেই বলেছেন, আইনের শাসন নয়, মুজিবের শাসন চাই। সাংবাদিকেরা সরকার ও বংগবন্ধুর আনুগত্য লাভের জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। অনেকেই বাড়ি গাড়ি পদ পদবী পেয়েছিলেন। বংবন্ধু নিজেও মনে করতেন বা ভাবতেন, তিনি যখন দেশকে, দেশের মানুষ ভালবাসেন তাহলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কি প্রয়োজন। তিনিতো দেশের জন্যেই সবকিছু করছেন। বিরোধী দল বলতে তখন তেমন কিছু ছিলনা। এর পরেও তিনি এক দলীয় রাজনীতি ও সরকারী ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। সব পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে চারটি সরকারী কাগজ রেখেছিলেন। সাংবাদিকরা বুকে পোস্টার লাগিয়ে শ্লোগান দিয়েছেন, আমরা সবাই বংগবন্ধুর কলম সৈনিক। বহুদলীয় সরকার ব্যবস্থা রহিত করার বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা কোন কথা বলেনি। হাজার হাজার সাংবাদিক বেকার হয়ে পড়লেও সাংবাদিকরা কোন কথা বলার সাহস পাননি। কারণ সবাই ভাবতেন সরকারের সমালোচনা করলেই বিপদ হতে পারে। অনেকেই ভাবতেন সরকারের পক্ষে থাকাটাই দেশপ্রেমের পরিচয়। বাকশাল নামক একদল দিয়ে বংগবন্ধু সমাজতান্রিক রাস্ট্র ব্যবস্থা চালু করার চেস্টা করেছিলেন।
বাংলাদেশে এখন বেশীর ভাগ কাগজ ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মালিক বড় বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ গুলো। এসব গ্রুপ তৈরী হয়েছে জনগণের সম্পদ লুন্ঠন করে। লুন্ঠিত সম্পদ রক্ষা করার জন্যে তাঁরাই মিডিয়ার মালিক হয়েছেন। ৮৩ সালে যে উদ্যোক্তা ব্যান্ক প্রতিস্ঠা করতে দশ লাখ টাকা জোগাড় করতে পরতেন না বা পারেননি সে উদ্যোক্তাই এখন একাই এক হাজার কোটি টাকা দিয়ে ব্যান্ক প্রতিস্ঠা করতে চান। এসব কর্পোরেট হাউজই এখন সরকার ও গণতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রন করতে চায়। সাংবাদিকরা অনায়াসেই এসব হাউজের কাগজ ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে চাকুরী করে যাচ্ছেন। সম্পাদকদের বেতন বাড়ি গাড়ি সহ লাখ দেশেকে উঠে গেছে। কিছু কিছু সম্পাদক নিজেরাও কাগজের শেয়ার পাচ্ছেন। কবি সাহিত্যিকরাও এসব কাগজে আনন্দে চাকুরী করছেন। এক কাগজ অন্য কাগজের বিরুদ্ধে লিখে চলেছে। মালিক যা বলছে সাংবাদিকরা তাই লিখে যাচ্ছেন। আমি এমন কথা বলছিনা যে, চাকুরী করে সাংবাদিকরা মন্দ কাজ করছেন। তাঁরা শ্রমজীবী মানুষ জীবিকার জন্যে কারখানার মালিকের নির্দেশেই কাজ করবেন। নিয়মিত বেশী বেশী মুজুরী পাওয়াই সাংবাদিকদের লক্ষ্য। দেশে এখন বহু কাগজ আছে যারা অনেক সময় বুঝে অথবা না বুঝে বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কথা বলে। কিসে বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণ হতে পারে সে ব্যাপারেও সংবাদপত্র গুলোও একমত হতে পারেনা।
শুরুতেই বলেছি সাংবাদিকের স্বাধীনতা মানে একজন শ্রমিকের অধিকারের স্বাধীনতা। কর্পোরেট হাউজ গুলোর অত্যাচারের কারণে পশ্চিমে তৃতীয় মত প্রকাশের অন্দোলন দিন দিন জোরদার হচ্ছে। থার্ড মিডিয়ায় এখন বিখ্যাত সব কলামিস্টরা জনগণের পক্ষে লিখে যাচ্ছেন। সাংবাদিক লেখক সাহিত্যিক কবিরা যদি সরকার ও কর্পোরেট হাউজ গুলোর কাছে সারেন্ডার করেন তাহলে গণতন্ত্র আর রক্ষা করা যায়না। সরকার গুলো স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ ও দেশের মানুষ। চলমান অবস্থায় সরকারের নেতারা মিডিয়ার বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছে। মানে সরকার অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। এর মানে কর্পোরেট হাউজ গুলো সরকারের সমালোচনা করতে শুরু করেছে। এর মানে তারা বুঝতে পেরেছেন, পুঁজি রক্ষা করতে হলে নতুন মিত্রের অনুসন্ধান করতে হবে। যেমন বিশ্বব্যাপী আমেরিকার নিস্ঠুরতা শোষণকে সে দেশের কর্পোরেট হাউজ গুলো সমর্থন করে। যখন বনিবনা হয়না তখন দেশের প্রেসিডেন্টকেই তারা হত্যা করে। আমেরিকার সরকার গুলোর টিকে থাকা নির্ভর করে কর্পোরেট হাউজগুলোর মর্জির উপর। সত্যি কথা বলতে কি আমেরিকার গণতন্ত্র মানে কর্পোরেট হাউজ গুলোর গণতন্ত্র। পশ্চিমা বিশ্বের সর্বত্রই এই অবস্থা বিদ্যমান।
বাংলাদেশে সব সরকারের আমলেই কমবেশী সংবাদপত্র দলন হয়েছে। কোন সরকার বেশী দলন চালিয়েছে, কোন সরকার কম দলন করেছে, এই যা ফারাক। সাংবাদিকরা এখন দুই রাজনৈতিক দলে বিভক্ত। ফলে সাংবাদিকদের মুজুরীর আন্দোলনও দূর্বল হয়ে পড়েছে। মানবাধিকারের অবস্থাও এখানে তেমন ভাল নেই। মানবাধিকারের বড় বড় কথা আলোচনা আছে। কিন্তু দেশের আইনের বেশীর ভাগই বৃটিশ ঔপনিবেশিক আমলে তৈরী হয়েছে এদেশের মানুষকে অত্যাচার করার জন্যে। সরকার গুলোর মনোজগতে রয়েছে সেই বৃটিশ আইন গুলো। ফলে আধুনিক বাংলাদেশ রাস্ট্রও নিজেকে রক্ষার নামে নাগরিকদের উপর অত্যাচার করে। এবং চলমান আইন রাস্ট্রকে সেই অধিকার দিয়েছে। রাস্ট্র সংবিধানের নামে বা কাগজে কলমে নাগরিকদের কাছে অনেক গুলো ওয়াদা করেছে, যা বাস্তবায়নের চেস্টা কখনই করা হয়নি। ওসব ওয়াদা হচ্ছে কাগুজে ওয়াদা। রাস্ট্র মনে করে ওসব ওয়াদা পূরণের কোন প্রয়োজন নেই। মানবতা বিরোধী ও নাগরিক বিরোধী যেসব আইন রয়েছে তা পরিবর্তনের কোন মহল আজ পর্যন্ত করেনি। বাংলাদেশের সংবিধান যাঁরা রচনা করেছেন তাঁরা পাকিস্তান আমলের সংবিধানকে অনুসরন করেছেন। পাকিস্তান তা পেয়েছিল বৃটিশদের কাছ থেকে। বৃটিশরা বহু আইন ধার করেছিল মোগলদের কাছে থেকে। রাস্ট্রনেতারা নিজেদের অজান্তেই কায়েমী স্বার্থের পক্ষে কাজ করে গেছেন। সাংবাদিকরাও একই অবস্থার শিকার। নাগরিক বা মানুষের অধিকার থাকলেইতো সংবাদপত্র ও গণতন্ত্রের সা্বাধীনতা থাকবে। দেশের বুদ্ধিজীবীদের এ বিষয়ে ভাববার সময় বহু আগেই এসে গেছে। কিন্তু মনোজগতে তাঁরা স্বাধীন নন বলেই আমাদের অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। রাস্ট্র যদি তার নাগরিকদের স্বাধীনতা অপারগ তাহলে সংবাদপত্র আর সাংবাদিকদের স্বাধীনতার কথা ভাবা একেবারেই অবান্তর।