বাংলাদেশের রাস্ট্রপতির পদ একটি সম্মানিত সাংবিধানিক অবস্থান। বেশ কয়েক বছর আগে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন সাহেব বলেছিলেন, কবর জিয়ারত আর মিলাদ পড়া ছাড়া রাস্ট্রপতির কোন কাজ নেই। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় রাস্ট্রপতির পদ একটি অলংকার। তিনি রাস্ট্র নামক প্রতিস্ঠানের পতি। যদিও পতি হিসাবে সংসার চালাবার কোন দায় দায়িত্ব তাঁর নেই। সবাই তাঁকে সম্মান করেন তাই তিনি সম্মানিত। আমাদের দেশের মানে রাস্ট্রের ম্যানেজার বা নায়েব হচ্ছে সরকার। সরকার রাস্ট্রপতিকেও যেকোন মূহুর্তে বিদায় করে দিতে পারে। কারণ সরকারই রাস্ট্রপতির নিয়োগ দান করে। পাকিস্তান আমলের কথা আজ নাইবা বললাম। ওই আমলে গণতন্ত্র কখনই বিকশিত হতে পারেনি। ৭০ সাল নাগাদ ২৩ বছরে পাকিস্তানে সামরিক সরকারই ক্ষমতায় ছিল ১৩ বছর। রাজনীতিবিদরা কখনই শান্তিতে দেশ চালাতে পারেনি। আমলারাও সব সময় রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে লেগে ছিলেন। এসব কারণে পাকিস্তান ভেংগে গেছে। ভাংগা পাকিস্তানটার অবস্থাও তেমন ভাল নয়। সেখানে সেনা বাহিনী দেশের নির্বাচিত সরকারকে ধমকি দেয়। ৭১ সালে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী নিজেরাই দেশটাকে ভেংগে দিয়েছে। বংবন্ধু ছিলেন নির্বাচিত মেজরিটি পার্টির নেতা। তাঁর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে জেনারেল ইয়াহিয়া জুলফিকার আলী ভুট্টোর উসকানীতে নানা টালবাহানা করেন। তবুও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা যেতো। পাকিস্তানের সেনা বাহিনী তা না করে সামরিক হামলা চালিয়ে সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিল। ওই হামলার ফলে ভারতের প্রিক্রিয়া কি হতে পারে তা পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ভাবেনি অথবা গুরুত্ব দেয়নি। সামরিক হামলার ফলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিতে পারে তা ভাবেনি।পাকিস্তানের বন্ধু চীন বা আমেরিকা পাকিস্তানের ভূমিকাকে সমর্থন জানায়নি। অপরদিকে ভারত রাশিয়া জোট বেঁধে পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছে। জন্মলগ্ন থেকেই ভারত পাকিস্তানের সাথে শত্রুতা জারী রেখেছিল। ৭০ এর আগে দুইবার যুদ্ধে জড়িত হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান। ৭১ সাল ছিল ভারতের জন্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সুযোগ। ভারত ষোলয়ানা এই সুযোগের ব্যবহার করে। পাকিস্তানকে পরাজিত করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘হাজার সালকা বদলা লিয়া’। কেন তিনি এই বাক্যটি ব্যবহার করেছিলেন তার একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত রয়েছে। এর আগে এ বিষয়ে বহুবার বলেছি। আজ আর উল্লেখ করতে চাইনা।
বংগবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফিরে এসেছেন নতুন রাস্ট্রের রাস্ট্রপতি হিসাবে। মুক্তিযুদ্ধের গঠিত প্রবাসী সরকারেরও তিনি ছিলেন রাস্ট্রপতি। কিছুদিন পর তিনি হয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রী। একদলীয় বাকশাল সরকার গঠণ করে তিনি আবার হলেন রাস্ট্রপতি। পরবর্তী সরকার প্রধানগণ বাকশালী সরকারের রাস্ট্রপতির ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন। রাস্ট্রপতি হিসাবে বংগবন্ধু কখনই সরাসরি নির্বাচিত হননি।তাঁর দলীয় সংসদই তাঁকে নির্বাচিত ঘোষণা করেছে। তিনি যখন যা চেয়েছিলেন তাই হয়েছেন। তখন মনে হতো তিনিই সবকিছু। সংবিধানের কোন বালাই নেই ।তিনি যা ভাববেন তাই হবেন। কারো কিছু বলার নেই। ঠিক এ সময়ে তাঁর ভাগ্নে যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলুল হক মনি তাঁর নিজের কাগজ বাংলার বাণীতে লিখলেন ‘ আইনের শাসন নয়, মুজিবের শাসন চাই’। পল্টনের বক্তৃতায় শেখ মনি আরও বললেন, জাতির পিতার কোন সমালোচনা করলে জ্বিব টেনে ছিঁড়ে ফেলা হবে। চাটুকার দল বংগবন্ধুকে জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। চারিদিকে এক আতংকের পরিবেশ তৈরী হয়েছিল। বিরোধী দল বলতে তেমন কিছু ছিলনা।
স্বৈর শাসক জেনারেল এরশাদের পতনের পর আওয়ামী লীগের চাপে পড়ে বিএনপিকে সংসদীয় সরকার পদ্ধতির প্রস্তাব আনতে হয়েছিল। তেমন আলোচনা ছাড়াই সরকার ও বিরোধী দলের যৌথ উদ্যোগে সংসদীয় সরকার প্রতিস্ঠিত হলো। রাস্ট্রপতির সব ক্ষমতা রয়ে গেল প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তাড়াহুড়োর মাঝে কারো মনেই ছিলনা ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা। ফলে সংসদীয় সরকার পদ্ধতি চালু হলেও পুরো ক্ষমতা রাস্ট্রপতির স্থলে প্রধানমন্ত্রীর হাতে রয়ে গেল। এবং এখনও তাই আছে। ক্ষমতায় গেলে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা ওয়াজেদ সেই ক্ষমতা ভোগ করেন বা ব্যবহার করেন। ফলে সংসদ বা সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা ঠুটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে। ষে কোন ভাবেই হোক, দল একবার নির্বাচিত হলেই দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত বা মনোনীত হন আর সকল ক্ষমতার অধিকারী হন। তিনি হয়ে যান আধুনিক রাস্ট্রের রাজা বাদশা। আমেরিকা বা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিনিয়ত সংসদ ও জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে কোথাও জবাবদিহি করতে হয়না। সংসদ হয়ে পড়ে তাঁর বশংবদ বা আজ্ঞাবহ। নেতার কাছে সংসদের আজ্ঞাবহতা শুরু হয়েছে ৭২ সাল থেকে। মানে নেতা সংসদের চেয়ে অনেক বড়। বংবন্ধু ছিলেন একজন মহা বড় নেতা। তাঁর সামনে কথা বলার মতো কোন লোক ছিলনা। সংসদেও বিরোধী দলের হাতে গোণা মাত্র কয়েক জন সদস্য ছিল। তাঁদেরকেও বংগবন্ধু নিজের কর্মী মনে করতেন। ফলে বংগবন্ধু বুঝতে পারতেন না দল সরকার ও তাংর মাঝে ফারাক কি। তিনি মনে করতেন বাংলাদেশ তাঁর, তিনি বাংলাদেশের। ইতোমধ্যে অনেকেই লিখেছেন দেশের নাম বংগবন্ধুদেশ। এক সময় শ্লোগান ছিল এক নেতা এক দেশ, বংগবন্ধু বাংলাদেশ। বংগবন্ধু যে ক্ষমতা নিজের জন্যে রেখেছিলেন তা পরবর্তী পর্যায়ে চলে এসেছিল রাস্ট্রপতিদের হাতে। এখন আছে প্রধানমন্ত্রীদের হাতে।
চলমান আওয়ামী লীগ সরকারের অবস্থাও ৭২-৭৫ এর সংসদ ও সরকারের মতো। সংসদে বিরোধী দল বলতে তেমন কিছু নেই। যাঁরা আছেন তাঁরাও সরকার দলীয় সদস্যদের জ্বালায় অনেকদিন ধরে সংসদে যান না। ফলে এটি একদলীয় সরকারে পরিণত হয়েছে। বংবন্ধু ২৯৩ জন সদস্য নিয়েও সন্তুস্ট ছিলেন না। তাই তিনি সকল দলের বিলুপ্তি ঘটিয়ে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। এখন তাঁর কন্যা শেখ হাসিনাও তাঁর পিতার পদাংক অনুসরন করছেন। মনে হয় দেশে এখন শুধু আওয়ামী লীগই আছে। দেশটা আওয়ামী লীগের হয়ে গেছে। দল সরকার আর রাস্ট্র এখন এক হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা শুনলে মনে হয় দেশ চালাবার একমাত্র অধিকার শুধু আওয়ামী লীগের। মনে হয় শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের রাজনীতিই এখন বাংলাদেশ রাস্ট্রের রাজনীতি। রাস্তায় পুলিশ আনসার রেব সবই বিরোধী দল দমনের জন্যে সরকারী রাজনৈতিক বাহিনী হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সোজা কথায় বলা যেতে পারে দেশে গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের কোন নমুনা নেই। সভ্য দেশ গুলোতে মানবাধিকার কমিশন রয়েছে। সভ্যদেশের লেবেল পেতে হলে একটি মানবাধীকার কমিশন দরকার। তাই এটি গঠিত হয়েছে একজন আওয়ামী পন্থী শিক্ষককে এর চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়ে। তবে ড. মিজান মাঝে মাঝে খুবই চমক লাগানো কথাবার্তা বলেন এবং পাঠক দর্শক ও শ্রোতারা তাঁর কথায় আনন্দিত হন।
চলমান সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় রাস্ট্রপতির ক্ষমতা কি তা এতক্ষণে পাঠকরা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। তাহলে চলমান সংলাপের গুরুত্ব কতটুকু। রাস্ট্রপতি সাহেব এখন রাউন্ড টেবিল মার্কা আলোচনা সভার আয়োজন করেছেন সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ বা নির্দেশে। তবে আশা করছি, রাস্ট্রপতি সাহেব সকল দলের সাথে আলোচনা শেষ হলে একটি রিপোর্ট সরকারের কাছে পাঠাতে পারবেন। ইতোমধ্যে মহাজোট ছাড়া বাকী সব রাজনৈতিক দল কোয়ার টেকার সরকার ব্যবস্থা চালু করার জন্যে রাস্ট্রপতি সাহেবকে অনুরোধ জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সুরও পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই আওয়ামী লীগ বলেছে রাস্ট্রপতি সাহেব চাইলে তাঁরা কেয়ার টকার সরকার ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা করতে রাজী আছে। তাহলেতো আর কোন দ্বিধা দন্ধ থাকতে পারেনা। কেয়ার টেকার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু করা দরকার। দেশবাসী দেশে কোন ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সংঘাত দেখতে চায়না। তাই শান্তিপূর্ণ ভাবে সকল সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত। সুসভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আদব কায়দা চালু হওয়া দরকার। শুধু মাত্র শুদ্ধ ও সুস্থ রাজনৈতিক আচার ব্যবহারের অভাবে বাংলাদেশ তার কাংখিত লশ্যে পৌঁছাতে পারেনি। যতদিন না রাজনীতিবিদরা এ সত্য উপলব্ধি করবেন ততদিন এদেশের উন্নতি অসম্ভব। কেউ ভাল কথা বললেও রাজনীতিবিদরা ক্ষ্যাপে উঠেন। এইতো ক’দিন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার উপরে কথা বলে অর্থমন্ত্রীর রোষে পড়েছেন। আশি বছরের বৃদ্ধ অর্থমন্ত্রী জীবনের বেশীর ভাগ সময়ে ছিলেন সরকারী আমলা। অবসর গ্রহণের পর বিদেশে ঘুরে ঘুরে বিশ্বব্যান্কের কনসাল্টেন্সী খুঁজে বেড়াতেন। এরশাদ সাহেব এনে চাকুরি দিয়েছিলেন। বেশ কয়েক বছর এরশাদ সরকারের খেদমত করেছেন। এখন শেখ হাসিনার খেদমত করছেন। কথায় কথায় মানুষকে স্টুপিড রাবিশ বলে গালাগাল করেন। রাস্ট্রপতিকে সংলাপে লাগিয়ে দিয়ে আওয়ামী নেতারা সংলাপ বিরোধী অস্ত্রের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছেন। মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন জামাতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার জন্যে। যে দলটির জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। যে দলটি মোট ভোটারের ৮ থেকে ১২ ভাগ ভোটারের সমর্থন পেয়ে থাকে। মহাজোটের শরীক এরশাদের জাতীয় পার্টি ছাড়া বাকী সব দল মিলে এক ভাগ ভোটও নেই। মেনন বা ইনু সাহেবের এক হাজার ভোটও নেই। নৌকা না হলে তাঁরা চলতে পারেননা। সেই মেনন ইনু সাহেব এখন দেশের ভাগ্য বিধাতার ভুমিকা পালন করতে মাঠে নেমেছেন। এদেরকেই বংগবন্ধু বলেছিলেন, সাইনবোর্ড ফেলে দিয়ে আসার জন্যে। কিন্তু তাঁরা এখনও সাইনবোর্ড ফেলেননি। কারণ সাইনবোর্ড থাকলে তাঁরা লাভবান হন। আইন প্রতিমন্ত্রী চৌধুরী সাহেব সম্পর্কে সহজে কেউ মুখ খুলতে চান না। কারণ তাঁর মুখের ধার অন্য সবার চেয়ে বেশী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হয়ত তাঁর মুখ অনেক মিস্টি। রাজনীতিতে তিনি হয়ত মুখের জন্যেই পদ পদবী পেয়েছেন। ধারালো বা ছুরির ভাষায় কথা বললে তাঁর প্রভু হয়ত খুশী হন। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে আমি তাঁর কোন দোষ দেখিনা। ভারতের প্রেসিডেন্ট জ্ঞানী জৈল সিং বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী চাইলে তিনি ঝাড়ু দিতেও রাজী আছেন। আমাদের দেশেও এরশাদ সাহেবের একজন মন্ত্রী এ ধরণের কথা বলেছিলেন। আস্ত্রের ভাষায় কথা বলে আলোচনা করা যায়না। সকল অবস্থায় আলোচনা অব্যাহত না থাকলে গণতন্ত্র রক্ষা করা যাবেনা। ৫৮ সালে দেশে সামরিক শাসন জারী হয়েছিল আওয়ামী লীগের অগণতান্ত্রিক আচরনের জন্যে। ৭০ সালের অভূতপুর্ব বিজয়ের পরেও পাকিস্তানের সামরিক সরকারকে আলোচনার টেবিলে আটকিয়ে রাখতে পারেননি বংগবন্ধু। একজন নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ নেতা হিসাবে এটা ছিল বংগবন্ধুর অদূরদর্শিতা। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরে দেশে ফিরে এসেও বংবন্ধু একজন মহান গণতান্ত্রিক নেতা হিসাবে নিজেকে বিকশিত করতে পারেননি। কোন অদৃশ্য কারণে তিনি একদলীয় রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়লেন তা দেশবাসী আজও জানেনা। দেশবাসীতো তাঁকে বিশ্বাস করেছে। ৭০ সালে নিখিল পাকিস্তানের একচ্ছত্র নেতা বানিয়েছে। ৭৩ সালেও তাঁর দল আওয়ামী লীগ ৩শ’ সিটের ভিতর ২৯৩ সিট পেয়েছিল। কিন্তু তিনি জনগণের আস্থা রক্ষা করতে পারেননি। ফলে দেশে সামরিক শাসন জারী হয়েছে। ২০০৬ সালেও আওয়ামী লীগের অস্ত্রের ভাষা ব্যবহার ও অগণতান্ত্রিক আচরনের ফলে জেনারেল মইন ইউ আহমদের সরকার প্রতিস্ঠিত হয়। শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন, ওই সরকার তাঁদেরই আন্দোলনের ফসল। সরকারকে আওয়ামী লীগ সমর্থন জানাবে। জেনারেল মইন ক্ষমতা দখল করে নিজেকে ফোর স্টার জেনারেল বানালেন। যেমন আইউব খান নিজেকে ফিল্ড মার্শাল বানিয়েছিলেন। আজ জেনারেল মইন ও ফখরুদ্দিন নির্বাসনে জীবন যাপন করছেন। জেনারেল মাসুদকে ঘুষ দিয়ে সরকার দূরে সরিয়ে রেখেছে। এ ঘুষ না পেলে মাসুদ যেকোন সময়ে মুখ খুলতে পারে।
এসব কথা হলো প্রাসংগিক কথা। শুধুমাত্র পাঠকদের অনুধাবনের জন্যে। আওয়ামী লীগের সমস্যা হলো তারা সহজে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারেনা। আর আওয়ামী লীগ মনে করে ক্ষমতাটা শুধু তাঁদেরই জন্যে। বিশেষ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁরা মনে করেন দেশটা শাসন করার একমাত্র অধিকার তাঁদেরই। ফলে বিগত ৪০ বছরে দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও আদব কায়দা গড়ে উঠেনি। রাস্ট্রপতি সাহেব নিজেও একজন পুরাণো আওয়ামী লীগার। সারাজীবন বংবন্ধু ও আওয়ামী লীগ খেদমত করেছেন। এখনও তিনি বংবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার খেদমত করছেন। সারা জীবনের ত্যাগের বিনিময়ে তিনি রাস্ট্রপতি পদে সম্মানিত হয়েছেন। একজন রাজনীতিক হিসাবে এটা তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওনা। প্রশ্ন হলো, সরকারী দলের নির্দেশে সংলাপ করে তিনি কি কোন সমাধানে পৌঁছাতে পারবেন? সরকারের আলোচনার বিষয় হলো নির্বাচন কমিশন। বিরোধী দলগুলোর আলোচনার বিষয় হলো কেয়ারটেকার সরকার। সরকার কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছেন আদালতের এক রায়ের ছুতা ধরে। কেয়ারটেকার ব্যবস্থা বাতিল করার পেছনে সরকারের নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য আছে। সহনশীল সুন্দর রাজনৈতিক কালচার না থাকার ফলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে জনগণের কোন আস্থা নেই। ভাবতে অবাক লাগে এই আওয়ামী লীগই একদিন কেয়ারটেকার সরকার প্রতিস্ঠার জন্যে সারা দেশে জালাও পোড়াও আন্দোলন করেছিল। হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ নস্ট করেছে। সে সময়ে বিএনপি সরকার এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করলেও পরে সংসদে বিল এনে তা পাশ করে।
রাস্ট্রপতির সংলাপে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল জামাতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কেন আমন্ত্রণ জানানো হয়নি তার কারণও ব্যাখ্যা করা হয়নি। বাংলাদেশে জামাত একটি বৈধ রাজনৈতিক দল। ইসলামের আদর্শ উদ্দেশ্য ভিত্তিক রাজনৈতিক দল ভারত ও পাকিস্তানে আছে। এছাড়া আরব ও আফ্রিকায় বহু ইসলামিক দল আছে। ইসলামে রাজনীতি নিষিদ্ধ নয়। ইসলাম রাজনীতি শাসণ ব্যবস্থা থেকে পৃথক বা বিচ্ছিন্ন নয়। ইসলামে রাস্ট্র ও সরকার ব্যবস্থার সুস্পস্ট ব্যাখ্যা রয়েছে। এক সময় আমাদের দেশে কমিউনিস্ট পার্ট নিষিদ্ধ ছিল। কমিউনিজম ধর্ম বিরোধী রাজনৈতিক মতবাদ মনে করা হতো। এখন পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়েছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ইসলামী আদর্শ ভিত্তিক রাজনীতি করা যাবেনা। তাই সরকারের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে রাস্ট্রপতি জামাতকের সংলাপে ডাকেননি। এর মাধ্যমে তিনি নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন। এর আগে রাজনৈতিক দল ও সংবাদপত্র এ ধরনের আশংখা প্রকাশ করেছিল। তারা বলেছিলেন সংলাপ একটি পাতানো নাটক। এক সময় জামাতের সাথে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সখ্যতা ছিল। বিএনপির বিরুদ্ধে একযোগে আন্দোলনও করেছে এই দুটি দল। কিন্তু সেই সম্পর্ক বেশীদিন টিকেনি রাজনৈতিক কারণে। আওয়ামী লীগ ও তার চিন্তার সহযোগীরা সংসদে ২৬৩ সিট মানে সংসদে দুই তৃতীয়াংশেরও বেশী সিট পেয়ে জামাত বা ইসলামী রাজনীতি বন্ধ করার জন্যে মাঠে নেমেছে। কারণ তাঁরা মনে করেন জামাত ও ইসলামী দলগুলো রাজনীতিতে থাকলে আওয়ামী লীগ কখনই ক্ষমতায় আসতে পারবেনা। দেশবাসী সবাই জানেন যে ১/১১র সরকার মানে জেনারেল মইনের সরকার ক্ষমতায় না আসলে আওয়ামী কখনই ক্ষমতায় আসতে পারতোনা। ১/১১র সরকারের লক্ষ্যই ছিল জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী রাজনীতিকে চিরতরে উচ্ছেদ করা। তাদের লক্ষ্যের ফলাফলই হচ্ছে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার। যুদ্ধাপরাধের বিচারও একই রাজনীতির লক্ষ্যে পরিচালিত। আওয়ামী লীগ ভাল করেই জানে কয়েকজন লোককে ফাঁসী দিলে জামাতের রাজনীতি বন্ধ হয়ে যাবেনা। ইসলামী রাজনীতি করার অভিযোগে মুসলমান দেশগুলোতেই বহু বিখ্যাত নেতা ও দার্শনিকদের ফাঁসী দেয়া হয়েছে। এমন কি জামাতে ইসলামী দল হিসাবে নিষিদ্ধ হয়ে গেলেও ইসলামী রাজনীতির চিন্তাধারা বন্ধ হয়ে যাবে? না, কখনও বন্ধ হবেনা। তার প্রমান মধ্যপ্রাচ্য ও আরব দেশগুলোর রাজনীতি। তিউনিশিয়ায় ইসলামী সরকার প্রতিস্ঠিত হয়েছে। মিশরে ইসলামী সরকার প্রতিস্ঠিত হতে চলেছে। ইরাণে ইসলামী বিপ্লব সফল হয়েছে। সেই বিপ্লবকে সফল ও কার্যকরী রাখার জন্যে সেই দেশের মানুষ এখনও লড়াই করছে। আমেরিকান সরকার আলকায়েদা ও তালেবানদের সাথে যুদ্ধ করে এখন ক্লান্ত। তাই তারা এখন তালেবানদের সাথে সংলাপ শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ ভুল জুতা পায়ে দিয়ে ভুল পথ অতিক্রম করার চেস্টা করছে। তার এই পথযাত্রা কখনই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেনা।আমেরিকা যুগের পর যুগ ধরে যুদ্ধ করছে। জগতকে সংঘাতময় করে তুলেছে। কিন্তু আমেরিকা কোন যুদ্ধেই জিততে পারেনি।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক